উপন্যাস
গল্প
উপন্যাস

অলিন্দে অশরীরী – ৫

পাঁচ

সায়ন আর গার্গী দুজনেরই চোখ বিদ্ধ হল তিন যুবকের বিচিত্র সাজপোশাকের দিকে। সায়নই এগিয়ে গেল তাদের সঙ্গে আলাপ করতে। যে-যুবকের একটি কানে দুল ঝুলছে, মাথার পিছনে ধুঁধুলের ছোবড়ার মতো ঝুলছে চুলের ঝুঁটি, তাকে জিজ্ঞাসা করল, শুনলাম আপনারা কাল থেকে এ বাড়িতে আছেন?

যুবকটি ঘাড় নাড়ল, হ্যাঁ।

তিন যুবকের চোখেও এই দম্পতি সম্পর্কে কৌতূহল। মাথার দু-পাশ নিখুঁত করে কামানো, অথচ মাথার মাঝখানে উঁচু উঁচু চুল, নাকটা একটু বেশি রকম টিকলো, সেই এগিয়ে এসে বলল, আপনারাও থাকছেন নাকি এখানে?

সায়ন মাথা নাড়ল, না। আমরা উঠেছি জেলাশহরের সার্কিটহাউসে। অনেককাল ধরে আলতাপুর রাজবাড়ির কথা শুনেছিলাম, হঠাৎ মনে হল যাই দেখে আসি।

তিনজনের মধ্যে বাকি দু’জনের চিবুকে একটু করে দাড়ি, বলল, থাকুন না এখানে। খুব ইন্টারেস্টিং ঘটনা ঘটে রাতের বেলা।

সায়ন অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় গার্গীর দিকে। ঘনশ্যাম চলে যেতে গার্গী হেসে বলল, গাইড যদি ইন্টরেস্টিং ঘটনাগুলো বলে দেয়, তা হলে গাইডের ভরণ-পোষণ চলবে কী করে?

সায়ন বলল, কী ইন্টারেস্টিং ঘটনা?

তিন যুবকের প্রথমজন বলল, তার আগে আপনাদের সঙ্গে পরিচয় করে নিই।

সায়ন বলল, আমার পরিচয় বলতে তেমন কিছু নেই। কলকাতায় একটা বিজনেস আছে আমাদের। দুজনে মিলে ব্যবসাটা দেখি। আমি সায়ন চৌধুরি, উনি আমার স্ত্রী গার্গী। আপনাদের পরিচয় বলুন।

কানে দুল, চুলে পনিটেল বলল, আমার নাম টপ্পা। আর ওই যে চিবুকে দাড়ি যার, এর নাম মাদল। আর ওই টিকালো নাক যার, তার নাম রিদম।

রিম, যার মাথার চুল ঊর্ধ্বমুখী, বলল, আমরা তিনজনেই সেক্টর ফাইভে একটা কর্পোরেট অফিসে চাকরি করি। তবে তিনজনেরই একটু কালচারাল ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। টপ্পা গান গায়, আমি বাজাই সিনথেসাইজার, আর মাদল বাজায় ড্রাম। মাঝেমধ্যে পাড়ার জলসায় ডাক পাই। হাততালিও পাই প্রচুর। আমাদের ব্যান্ডের নাম দিয়েছি থ্রি পেনি অপেরা। তা ছাড়া আমাদের আরও একটা জায়গায় মিল আছে। আমরা তিনজন একটু আনকমোন জায়গায় ট্যুর করতে ভালোবাসি।

—আপনাদের নামগুলো কিন্তু অদ্ভূত।

টপ্পা হেসে উঠে বলল, বুঝতেই পারছেন ওগুলো আমাদের আসল নাম নয়। অফিসে আমাদের নাম অন্য। ব্যান্ডে আমরা এই নামে পরিচিত।

গার্গী জোরে হেসে উঠে বলল, দারুণ নাম।

সায়ন তাদের একটু বাজিয়ে দেখতে চাইল, তা ভূ-ভারতে এত জায়গা থাকতে হঠাৎ আলতাপুর রাজবাড়িতে কেন? পুরোনো রাজবাড়ি বলেই আনকমন?

টপ্পা তার পনিটেল ঝাঁকিয়ে বলল, প্রথমে সেই কারণেই এই রাজবাড়িটা সিলেক্ট করেছিলাম। কিন্তু পরে আরও একটা খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করলাম আলতাপুর যেতেই হবে ও রাতে থাকতেই হবে।

সায়ন আরও একটু খোঁচায়, আর একটা কী খবর?

মাদল তার চিবুকের দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলল, আসলে কী জানেন, আমরা কেউ ভূতে বিশ্বাস করি না। কিন্তু কলকাতায় রটে গেছে যে, আলতাপুর রাজবাড়িতে ভূত আছে, আর সেই কারণেই এককালে এই রাজবাড়িতে বহু মানুষ আসতেন বেড়াতে, এখন কেউ আসেন না।

সায়নের কৌতূহল বেড়ে যায়, বলল, তা হলে আপনারা সবাই এলেন যে।

রিম হঠাৎ আলোচনায় ছেদ ঘটিয়ে বলল, আপনারা দুজনেই আমাদের চেয়ে অনেকটাই বড়ো। আমাদের তুমি বলবেন, সায়নদা।

সায়ন হেসে বলল, ঠিক আছে। এখন বলো কেন এসেছ তোমরা?

টপ্পা একটু বেশি উৎসাহী, বলল, আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলাম, যখন ভূতে বিশ্বাস করি না তখন আমরা কেন রাজবাড়িতে একটা রাত কাটিয়ে আসি না।

গার্গীর মনেও তখন প্রচুর কৌতূহল, বলল, শুনলাম তোমরা কাল রাতে এখানে ছিলে? —হ্যাঁ। ছিলাম। কারণ কলকাতায় গিয়ে তো বলতে হবে আলতাপুর রাজবাড়িতে কোনও ভূত নেই।

—তা কাল রাতে নিশ্চয় কোনও অভিজ্ঞতা হয়নি। তাই আজকেও থেকে গেলে?

টপ্পা মিটিমিটি হেসে বলল, কারও কোনও অভিজ্ঞতা হয়নি তা নয়। তবে আমরা কেউই ভূতে বিশ্বাস করি না। তাই এ বাড়িতে ভূত আছে জানা সত্ত্বেও এসেছি ব্যাপারটা বুঝতে।

গার্গীর ভিতরেও অজস্র কৌতূহল, বলল, কিছু পেয়েছ কাল রাতে?

টপ্পা মুখে কীরকম একটা অভিব্যক্তি ফুটিয়ে বলল, সামথিং গোলমাল।

সায়নও কৌতূহলী, কী রকম গোলমাল?

রিম বোধহয় একটু বেশি সাহসী, বলল, গোলমালটা ঠিক যে কী তা বুঝে উঠতে পারলাম না বলেই আজ রাতটা থেকে গেলাম।

গার্গী জিজ্ঞেস করল, কীরকম গোলমাল তা খুলে বলা যাবে না।

টপ্পা বলল, খুলে বললে আপনি ভাববেন তা হলে নিশ্চয় ভূত আছে। তবে দোতলা থেকে শব্দগুলো ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না বলেই আমরা একতলায় থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম।

সায়ন একটু অসহিষ্ণু হয়ে বলল, কী ধরনের শব্দ?

রিদম্ বলল, এই ধরুন হঠাৎ যেন কেউ হেসে উঠল।

টপ্পা বলল, তাও আবার মেয়েলি কণ্ঠ।

গার্গী জানতে চাইল, কোথায় হচ্ছে শব্দটা?

—মনে হল নীচের ঘরগুলো থেকে।

— শুধু হাসির শব্দ?

—না, কখনও দুজনের ডায়লগ। একটা কণ্ঠ পুরুষের, একটা কণ্ঠ মেয়ের।

সায়ন আর গার্গী পরস্পরের চোখাচোখি করল।

গার্গী বলল, আর?

—মনে হচ্ছে কোথাও যেন শব্দ হচ্ছে ঘুঙুরের।

—কখন শুনলে শব্দগুলো?

টপ্পা বলল, প্রায় সারা রাত ধরেই শুনেছি। রিদম আমাদের দুজনকে বলল, ‘চল দেখি তো কোথায় হচ্ছে শব্দগুলো? মনে তো হচ্ছে নীচের তলাতেই হচ্ছে শব্দ।’ তো আমরা তিনজনে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এলাম, কিন্তু দোতলা থেকে একতলায় যাওয়ার জায়গাটায় একটা প্লাইউডের গেট নামিয়ে বন্ধ করে রাখা হয় রাতে। তার ফলে পৌঁছোতে পারলাম না শব্দের কাছে।

মাদল বলল, বুঝলেন সায়নদা, দিনের বেলা কিন্তু প্লাইউডের গেট থাকে না। তখন ভিজিটরদের জন্য খোলা থাকে নীচে থেকে ওপরের যাওয়ার রাস্তা বা ওপর থেকে নীচে আসার রাস্তা।

গার্গী বলল, বুঝেছি।

সায়ন বলল, রাতের বেলা গেটটা বন্ধ করে দেওয়া হয় নিশ্চয় কোনও কারণে। যাইহোক, তোমাদের আজকের অভিজ্ঞতা কী হবে তাই ভাবছি।

রিদম বলল, আপনাদের যদি ভূতের ভয় না থাকে তা হলে আপনারাও আজ থাকুন না। গার্গী সায়নের দিকে চোখ রাখে, কিন্তু আমাদের তো ওখানে বুকিং রয়েছে।

সায়ন বলল, সে না হয় কাল সকালে ওখানে গিয়ে বিল মিটিয়ে দেব। এখন দেখি এখানে রাতে থাকতে দেয় কি না।

সন্ধে হয়ে এসেছে, বাইরের দিকে একবার চোখ রেখে টপ্পা বলল, চলুন দেখি। ব্রনবাবুর কাছে নিয়ে যাই আপনাদের। ব্রনবাবুকে বলে দেখুন আপনাদের থাকার ব্যবস্থা করতে পারেন কিনা।

পাঁচজনে মিলে রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে চলে এল উত্তরদিকের দোতলা বাড়িটিতে। রাস্তায় টিমটিম করছে ইলেকট্রিকের আলো। চারপাশ এতটাই অন্ধকার যে, বেশ গা ছমছম পরিবেশ। গার্গীর অবশ্য বেশ ভালোই লাগছিল এখানে এসে। কলকাতার ব্যস্ত জীবনের বাইরে একেবারে অন্য পরিবেশ।

দোতলা বাড়ির কাছে গিয়ে টপ্পা মুখ বাড়ায় একতলার ঘরটায়, রমণীবাবু, এঁরা ব্রনবাবুর সঙ্গে একবার কথা বলতে চান। খবর দাও তো ওঁকে।

রমণীবাবু বিরক্তি প্রকাশ করে বলল, কী দরকার এখন?

—কলকাতা থেকে এই দুজন এসেছেন, রাজবাড়িতে রাত কাটাবেন বলে। রমণীবাবুর কণ্ঠে উৎসাহ, বললেন, কেন, ওঁরা যে বললেন শুধু দেখবেন।

সায়ন বলল, রমণীবাবু, তখন বলেছিলাম শুধু দেখব, কিন্তু এখানে এসে চেনা মানুষ পেয়ে গেলাম। রাজবাড়ি দেখে এত ভালো লেগে গেছে, ভাবলাম আমরাও থেকে যাই।

রমণীবাবু উল্লসিত হয়ে বললেন, তাহলে দাঁড়ান। আমি ব্রনবাবুকে খবর দিই।

রমণীবাবু ওপরে চলে গেলে টপ্পা বলল, সায়নদা, আমরা বাইরে অপেক্ষা করছি। আপনারা কথা বলুন।

ব্রনবাবু মানুষটাকে বিকেলে দেখেনি সায়নরা। তিনি বোধ হয় ওপরেই থাকেন বেশিরভাগ সময়। গাইডের কাছ থেকে তাঁর কিছু পরিচয় আগেই পেয়েছে। তাঁর ভালো নাম রণিত সিংহরায়, ডাকনাম ব্রনবাবু। আলতাপুর রাজবাড়িতে তিনিই এখন একমাত্র রাজবাড়ির প্রতিনিধি।

রমণীবাবুর কাছে খবর পেয়ে নেমে এলেন চটিতে ফটফট তুলে। বেশ লম্বা গড়ন, দোহারা চেহারা, পরনে একটা সিল্কের হলুদ রঙা কারুকাজ করা পাঞ্জাবি ও সাদা ধবধবে চুক্ত পাজামা। বয়স চল্লিশের আশেপাশে, হাঁটার ভঙ্গি বেশ সাবলীল। তবে দু-গালের ত্বক কিছুটা রুক্ষ, অল্প বয়সে খুব ব্রন হওয়ার ফলে এই দুর্দশা।

নীচের বসার ঘরটির একদিকে একটা সিংহাসনপ্রতিম সোফা, তার উল্টোদিকে কয়েকটি রেক্সিনমোড়া সুদৃশ্য চেয়ার। ব্রনবাবু সায়নদের সবাইকে চেয়ারে বসতে বলে নিজে বসে পড়লেন সোফাটিতে। বসন্তকে ‘ঠিক আছে তুমি বাইরে অপেক্ষা করো’ বলে সায়নকে বললেন, বলুন, কী বলতে এসেছেন?

সায়ন বলল, আলতাপুরের রাজবাড়ির কথা বহুদিন ধরে শুনেছি। তাই—

গার্গীকে দেখিয়ে সায়ন বলল, আমরা এসেছিলাম রাজবাড়ি দেখতে। সত্যি বলতে কি রাজবাড়ি বলতে যা পড়েছি রূপকথার বইতে, তা আজ স্বচক্ষে দেখলাম।

ব্রনবাবুর মুখে খুশির উদ্ভাস, বললেন, হ্যাঁ। আমি চেষ্টা করছি যাতে আমাদের পিতৃপুরুষের গড়ে তোলা রাজবাড়ির চেহারা অক্ষুণ্ণ থাকে। কিন্তু এখন যারা শহরে বাস করে, তারা চায় এখানে মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং হোক। চুটিয়ে ব্যবসা হোক।

গার্গী লক্ষ করছিল ব্রনবাবু মানুষটার মধ্যে একটা আভিজাত্য আছে যা রাজবাড়ির সঙ্গে বেশ মানানসই। জিজ্ঞাসা করল, মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং কেন? কীসের ব্যবসা?

ব্রনবাবুর মুখে বিরক্তি বললেন, এখন রাজবাড়িতে ভাড়া দেওয়ার মতো ঘর আর কটা? তাতে কত আর আয় সারা বছরে? ফলে আমাদের কেউ কেউ চাইছে আলতাপুরের রাজবাড়ির ঐতিহ্য ভাঙিয়ে ব্যবসা করতে।

গার্গী কৌতূহলী হয়, কারা তাঁরা?

—কারা আবার? আমাদের এক ভাই, কলকাতায় থাকে। আপনারাই বলুন, এত সুন্দর রাজবাড়ির পিছনে একটা পাঁচতলা বিল্ডিং হলে রাজবাড়ির আভিজাত্য আর বজায় থাকবে? জীবনে টাকাটাই সব? ডিজগাস্টিং।

বলে মুখ বিকৃত করলেন ব্রনবাবু।

গার্গী ঘাড় নাড়ে, আপনি ঠিক বলেছেন। তা হলে তাজমহলের পিছনে একটা পনেরো তলা বাড়ি তুলে ব্যবসা করার মতোই অসুন্দর মনে হবে এই পরিকল্পনাটাও।

খুব খুশি হয়ে ব্রনবাবু বললেন, থ্যাঙ্ক ইউ, ম্যাডাম। বলুন, কী বলতে এসেছেন আপনারা? সায়ন এতক্ষণে বলার সুযোগ পেয়ে বলল, রাজবাড়িটা বাইরে থেকে ঘুরে ফিরে দেখলাম। আমাদের ইচ্ছে আজ রাতটা এখানে কাটাতে।

ব্রনবাবু হেসে বললেন, তা থাকুন না। দোতলায় অনেকগুলো ঘর আছে, যে-ঘরে ইচ্ছে থাকুন। এখন অফ সিজনে ভাড়াও অর্ধেক।

গার্গী বলল, কিন্তু আমাদের ইচ্ছে রাজবাড়ির নীচের তলায় থাকব।

—নীচের তলায়? ব্রনবাবুকে একটু অসহায় দেখাল, বলল, দেখুন, নীচের তলার ঘরগুলো এমন করে তৈরি যা এখন রাতে থাকার মতো নয়। টপ্পাবাবুরা গত রাতে ওপরেই ছিলেন, আজ ওঁদের ইচ্ছে হয়েছে নীচে থাকার। থাকতে দিলাম, কিন্তু ওঁরা বুঝতে পারবেন, নীচের ঘরগুলো ঠিক বসবাসের যোগ্য নয়। সেভাবে এখন আর রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। আমি শুধু ওপরের ঘর থেকে তিনটে বালিশ আর তিনটে বেডশিট পাঠিয়ে দিয়েছি নীচের ঘরটায়। সে না হয় আমি আরও দু-সেটের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি বসন্তকে দিয়ে। কিন্তু সমস্যা অন্য।

সায়ন জানতে চাইল, কী সমস্যা?

—তেমন কিছুই নয়। এ যুগের মানুষ আধুনিক প্যাটার্নের টয়লেট ব্যবহার করতে অভ্যস্ত। বিশেষ করে আপনারা কলকাতার মানুষ, পুরোনো আমলের টয়লেট ব্যবহার করতে গিয়ে সমস্যায় পড়বেন।

গার্গী বলল, কোনও সমস্যা হবে না। আমরা রাত্রিটা এখানে কাটিয়ে ভোরে উঠে চলে যাব জেলাশহরের সার্কিট হাউসে।

—ঠিক আছে, তাই হোক। বলে শরীরটা বাঁকিয়ে সোফার পিছনের দেওয়ালে একটা সুইচে আঙুল দিয়ে চাপ দিতেই দরজায় দেখা গেল বসন্তের মুখ। বললেন, বসন্ত, তুমি ওই দরবার ঘরটাই খুলে দাও ওঁদের জন্য।

বসন্ত কী কারণে যেন থমকে গেল, তারপর কণ্ঠে বিরক্তি এনে বলল, আসুন তা হলে। বসন্তের পিছু পিছু বাইরে বেরিয়ে এল ওরা দুজন। অদূরে উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছিল থ্রি পেনি অপেরা। গার্গীদের দেখে এগিয়ে এসে বলল, পেয়েছেন ঘর?

গার্গী বলল, হ্যাঁ। একরাত্রির জন্য রাজা হয়েছি বলা যায়। দরবার ঘরে বিচারসভা বসাতে হবে আজ রাতে।

সায়ন বলল, থাকার ব্যবস্থা তো হল। খাওয়ার ব্যবস্থা কী আছে এখানে?

টপ্পা পনিটেল ঝাঁকিয়ে বলল, ও কিছু ভাববেন না, সায়নদা। রাজবাড়িতে খাওয়ার ব্যবস্থা কিছু নেই। দুই গেটম্যান বিল্টু আর চাপ – দুজনেই সদাপ্রস্তুত এখানকার গঞ্জের হোটেল থেকে খাবার আনিয়ে দিতে। আমরা চাপকে তিন প্লেট রাইস চিকেনের অর্ডার দিয়েছি। আরও দু-প্লেটের কথা বলে দিচ্ছি মোবাইলে ফোন করে। নো প্রব্লেম, দাদা।

—না, দুই নয়, তিন প্লেটের কথা বলতে হবে। আমাদের ড্রাইভার রামলাল তা হলে না খেয়ে থাকবে। দাঁড়াও, রামলালকে বলছি চাপের সঙ্গে যোগাযোগ করতে।

বলে সায়ন মোবাইলে রামলালকে বলল, দরকার হলে ওদের কাউকে গাড়িতে তুলে নিয়ে আলতাপুর গঞ্জ থেকে রাতের খাবার নিয়ে এসো।

সায়ন মোবাইল বন্ধ করতে গার্গী হেসে বলল, ভোজনং যত্রতত্র শয়নং হট্টমন্দিরে। খাওয়ার ব্যবস্থা হল তো শোওয়ার ব্যবস্থা। এখানে রাত কাটাব তেমন তো ভাবা ছিল না। ভাগ্যিশ গাড়িতে বড়ো ব্যাগটা তুলে নিয়েছিলাম।

রামলালকে ফোন করে বড়ো ব্যাগটা রাজবাড়ির ভেতর দিয়ে যেতে বলল গার্গী।

রাতের খাওয়া সেরে নিতে রাত্রি দশটা। রামলাল ব্যাগটা দিয়ে যেতে এবার গার্গীর মাথাব্যথা কী করে এরকম একটি বিশাল ও বেঢপ ঘরে ব্যবস্থা করবে রাত্রিযাপনের। দরবার ঘর মানে সেকালের মিটিংরুম। সেখানে খাট নেই, যা আছে বড়ো বড়ো সোফা। তাও পুরোনো আমলের।

বড়ো ব্যাগটার মধ্যে দুটো বালিশের তোয়ালে আর দুটো সিঙ্গল বেডের চাদর নিয়ে এসেছে গার্গী। বড়ো হোটেলে বা গেস্ট হাউসে উঠলে এগুলোর প্রয়োজন হয় না। একমাত্র এরকম ‘এমার্জেন্সি’র সময় কাজে লেগে যায় খুব।

দুজনে দুটো সোফা বেছে নিয়ে তার ওপর পেতে নিল দুটি সিঙ্গল বেডের চাদর। মাথা দেওয়ার জন্য দুটো বালিশের ওপর তোয়ালে পেতে নিতে সায়ন দু-হাত তুলে আড়ামোড়া খেয়ে বলল, ফার্স্ট ক্লাস। তবে থ্রি পেনি অপেরা যেরকম ভয় দেখিয়েছে তাতে রাতে ঘুম হবে কি না তা বলা যাচ্ছে না।

গার্গী হেসে বলল, তুমি তো রাতে ঘুমোবার জন্য এখানে রাত কাটাচ্ছ না।

সায়নও হেসে ফেলে বলল, ঠিক। ঠিক।

তাদের কথা শেষ হওয়ার আগেই বাইরে টপ্পার গলা, সায়নদা।

সায়ন বেরোতেই বলল, আমরা এখন শুতে যাচ্ছি। যদি কিছু শুনতে পাই বা অস্বাভাবিক কিছু ঘটে, আপনাদের দরজায় নক করব কিন্তু।

সায়ন বলল, ও সিওর। সিওর।

ওরা চলে যেতে সায়ন ভিতরে এসে ঘরের চারিদিকে তাকিয়ে বলল, যে-রাজা এই অট্টালিকাটি বানিয়েছিলেন, তাঁর কিন্তু রুচিবোধ অসাধারণ। প্রত্যেকটা ঘর তৈরির পিছনে অনেক ভাবনাচিন্তা ছিল রাজার। যে-ঘরে বসে প্রজাদের সুবিধা-অসুবিধার কথা শুনবেন, তাদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার করবেন, তার পরিসরের সঙ্গে মানানসই কারুকাজের নির্দেশ দিয়েছিলেন কারিগরদের। এরকম একটা প্রশস্ত, সুন্দর ঘরে বসে প্রজাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনলে মন আপনিই ভরে উঠবে সহানুভূতি আর সুবিচারের লক্ষ্যে।

একটু পরেই গার্গী শুনতে পেল সায়নের ঈষৎ নাসিকা গর্জন।