উপন্যাস
গল্প
উপন্যাস

ভুতুকাহিনি – তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

ভুতুকাহিনি

ঠিক সন্ধে নাগাদ বলাকা বেরিয়েছিলেন কিছু বাজার-দোকানপাট করতে, কেনাকাটি করে দু- হাতের দুটো ব্যাগ টায়টায় ভর্তি। রাস্তায় বেরিয়ে ডাক দিলেন, এই রিকশ-

বলাকা সারাদিন সময় পাননি, সকালে সুদর্শন যখন অফিসে বেরিয়েছিলেন তখনও মনে পড়েনি তাঁর ফিরতে রাত আটটা-নটা তো হবেই, তখন পেয়েও তাঁর লাভ হবে না, অতএব সেলফ হেল্প ইজ দি বেস্ট হেল্প এই থিয়োরি মেনে নিজেই বেরিয়ে পড়েছিলেন দুটো ব্যাগ দোলাতে দোলাতে।

বাড়ি ফিরতে প্রায় সাড়ে সাতটা, চারদিকে তখন আলো জ্বলে উঠেছে, রিকশ থেকে নেমে বাড়ির কাছে গিয়ে দেখলেন, ঠিক যা ভেবেছিলেন তাই, গেটের কাছে সুস্মিতা দাঁড়িয়ে।

অফিস থেকে সুস্মিতার ফিরতে সাধারণত সাতটা-সাড়ে সাতটা হয়, তার কাছে একটা চাবি রাখা থাকে, কিন্তু চাবি দিয়ে দরজা না খুলে অপেক্ষা করছে কেন যেন!

বলাকা ভেবেছিলেন সুস্মিতা ফেরার আগেই তিনি ফিরে আসবেন বাড়িতে, কিন্তু তাঁর একটু দেরি হয়ে গেছে, তাড়াতাড়ি বাড়ির গেটের কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, কী রে, দাঁড়িয়ে আছিস কেন?

সুস্মিতা চুপ করে থেকে তার নিজের কাঁধের ব্যাগটা সামলে তাড়াতাড়ি শাশুড়ির হাত থেকে নিয়ে নিল ব্যাগদুটো।

—তুই কি আমাকে আসতে দেখে অপেক্ষা করছিলি যে, আমি এসে দরজা খুলব!

সুস্মিতা লাজুক লাজুক মুখে দাঁড়িয়ে থাকে।

বলাকা ততক্ষণে তাঁর চাবি দিয়ে দরজা খুলে উপরে উঠতে থাকেন সিঁড়ি বেয়ে, তাঁর পিছনে পিছনে সুস্মিতা। উপরে উঠে কী যেন সন্দেহ হল বলাকার, হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলেন, তুই কতক্ষণ আগে ফিরেছিস?

সুস্মিতা বলবে-না বলবে-না করেও বলে ফেলল, তা আধঘণ্টা হবে।

—আধঘণ্টা! বলাকা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, তা নীচে দাঁড়িয়ে ছিলি কেন এতক্ষণ!

বলাকার কণ্ঠে লজ্জা-মেশানো ভয়ের স্বর, বলল, দরজায় তালা লাগানো ছিল তো!

-–তোর কাছে একটা চাবি রাখা থাকে তো এই কারণেই! যদি তুই এসে দেখিস তালা লাগানো, আমরা কোথাও গেছি, তখন—

কথাটা শেষমেশ বলেই ফেলল সুস্মিতা, আসলে এ-বাড়িতে আসার পর কখনও একা থাকিনি তো! কীরকম ভয় ভয় করছিল!

—ভয়! বলাকা কিছুটা আন্দাজ করেন সুস্মিতার ভয়ের ব্যাপারটা, হেসে বললেন, বুঝেছি, এত বড়ো বাড়িতে একা থাকলে যদি চোর-ডাকাত হঠাৎ আবির্ভূত হয়, তাই? কিন্তু কী করে কেউ ঢুকবে বল?, তুই তালা খুলে বাড়িতে ঢুকে ভিতরে গিয়েই দরজার ছিটকিনি তুলে দিবি। ব্যস্!

—না, চোর-ডাকাতের ভয় আমার নেই, সুস্মিতা কিছুটা ইতস্তত করে, নতুন বিয়ে হয়ে এসেছে শ্বশুরবাড়িতে, বলবে-না বলবে-না করেও বলেই ফেলল তার শাশুড়ির কাছে, আসলে

আমার খুব ভূতের ভয়!

—ভূতের ভয়! বলাকার স্তম্ভিত হওয়ার পালা, এ বাড়িতে ভূত কোথায়? আমি তো আমার শ্বশুর-শাশুড়ি মারা যাওয়ার পর গত পাঁচ-ছ বছর সারাদিন একাই থাকি। তুই তো দেখছিস তোর শ্বশুর ন-টার মধ্যে খেয়েদেয়ে অফিসে চলে যায়, আসতে আসতে কোনও দিন সাতটা, কোনও দিন আটটা, ওভারটাইম থাকলে কোনও কোনও দিন ফিরতে রাত সাড়ে নটা-দশটাও হয়ে যায়। আর আমার ছেলের কোনও ঠিক আছে, আগে তো নাইট শিফট সেরে ফিরতে রাত এগারোটাও করে ফেলত। এখন না হয় দশটা-পাঁচটা অফিস হয়ে যাওয়ার পর আটটার মধ্যে ফিরে আসে। আমি তো বরাবর একাই থাকি এত বড়ো বাড়িতে!

সুস্মিতা তখন ব্যাগ রেখে ভয়-ভয় চোখে তাকিয়ে আছে শাশুড়ির দিকে।

বলাকা তার ভয় দূর করতে বলেন, ভূত-টুতে তো বিশ্বাস করত আগেকার দিনের লোক। গ্রামে-গঞ্জে শোনা যেত সে সব গল্প! কলকাতায় তো কেউ ভূতের গল্প বলে না!

সুস্মিতা চুপ করে থাকে। তার এই দুর্বলতাটুকু সে প্রকাশ করতে চায়নি শ্বশুরবাড়িতে। এখন পাকেচক্রে হয়ে গেল।

বলাকা অবশ্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তাঁর সাংসারিক কাজে। অফিস থেকে ফেরার পর সুস্মিতাও নিবিষ্ট হল তার নিত্যকর্ম পদ্ধতিতে।

রাত আটটা নাগাদ বাড়ি ফিরল দেবদ্যুতি, ফিরে এসে উঠে যাচ্ছিল তার তিনতলার ঘরে, তার আগেই বলাকা ডাকলেন তাকে, এই রুবুন, শোন-

রুবুন উঠে গিয়েছিল দুটো সিঁড়ি, নেমে এসে বলল, কী?

— আজ সুস্মিতা অফিস থেকে ফিরে এসে নীচে সিঁড়ির কাছে আধঘণ্টা একা দাঁড়িয়েছিল!

–তাই নাকি? কেন?

—ওর নাকি ভূতের ভয় করে। তুই জানিস কিছু?

দেবদ্যুতি একটু হাসল, হ্যাঁ, একদিন বলছিল আমাকে। সেই কারণেই তিনতলার ঘরে একা থাকে না। আমি না আসা পর্যন্ত তোমার কাছে থাকে।

বলাকা আরও অবাক, বলল, ও, তাই যত বলি, যা, অফিস থেকে খেটেখুটে ফিরলি, একটু বিশ্রাম নে, তারপর ঘরের কাজ করিস। তা মেয়ে কিছুতে শোনে না! নীচেই আমার কাছে ঘুরঘুর করে!

—ঠিক আছে, আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। দেবদ্যুতি জামাকাপড় বদলে ফ্রেশ হয়ে নিতে চলে গেল উপরে।

বলাকার মন থেকে খুঁতখুঁতানি যায় না!

রাতে সুদর্শন বাড়ি ফিরতেই তুললেন কথাটা, বললেন, শুনেছ কী কাণ্ড!

বলে ঘটনাটা বিবৃত করতেই সুদর্শন হাসলেন কিছুক্ষণ। ছেলের বিয়ে দিয়েছেন মাস তিনেক হল। সুস্মিতা বউ হিসেবে অসাধারণ। খুব ঠান্ডা স্বভাবের, দেখতে ভারী সুশ্রী, খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নানটান করে তাঁদের সবাইকে চা করে খাওয়ায়। অফিসে যাওয়ার আগে পর্যন্ত সাংসারিক কাজে অনেকটাই সাহায্য করে বলাকাকে। সন্ধের পর বাড়ি ফিরেও সময় নষ্ট করে না, চুপচাপ সাংসারিক কাজেই লিপ্ত রাখে নিজেকে। অকারণে কথা বলে না, কিছু জিজ্ঞাসা করলে খুব অল্প কথায় উত্তর দেয়, কোনও বকানি তো নেইই। এরকম ছেলের বউ পাওয়া ভাগ্যের কথা। তাঁদের একটাই ছেলে, মেয়ে নেই, তাই ছেলের বউকেই মেয়ের মতো দেখেন। তাকে প্রথমে তুমি বলতেন, এখন তুই বলে সম্বোধন করাটাই অভ্যাস হয়ে গেছে।

কিন্তু তার যে ভূতের ভয় আছে তা তো এতদিন জানা যায়নি!

অতএব তিনি ডাকলেন সুস্মিতাকে, কী রে, তোর নাকি খুব ভূতের ভয়!

সুস্মিতা বিব্রত চোখে তাকায় শাশুড়ির দিকে, তার যে এমন ভূতের ভয় সেটা শ্বশুরকে বলার কী দরকার ছিল! মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।

—তা হঠাৎ তোর মগজে ভূতের আবির্ভাব ঘটল কীভাবে!

সুস্মিতা সেখান থেকে পালাতে পারলে বাঁচে, কিন্তু শ্বশুরমশাইয়ের সামনে থেকে পালায় কোন সাহসে!

—তুই কি ছোটেবেলায় খুব ভূতের গল্প পড়তিস?

সুস্মিতা আর না বলতে পারে না, সুদর্শন ঠিক ধরে ফেলেছেন রহস্যটা। ছোট্ট করে ঘাড় নাড়ে, হ্যাঁ।

—কে জোগাত ভূতের গল্প?

—আমার তো খুব বই পড়ার শখ। স্কুলে কলেজে পড়ার সময় সপ্তাহে দুদিন তিনদিন লাইব্রেরিতে যেতাম বই আনতে।

—শুধু ভূতের গল্প পড়তিস?

সুস্মিতা ঘাড় নাড়ে, না, সবরকম গল্পের বইই পড়তাম।

—তা ওই বয়সে তো ছেলেমেয়েরা খুব প্রেমের উপন্যাস পড়ে, আর রাস্তায় বেরোলে প্রেমে পড়ে যায়। তা তুই কোনও ছেলের প্রেমে পড়তে পারলি না, ভূতের প্রেমে পড়লি!

সুস্মিতা আরও বিব্রত, তার শ্বশুর খুব মাই ডিয়ার ধরনের, কিন্তু–

—তার মধ্যে বেছে বেছে ভূতটাই রয়ে গেল তোর সঙ্গে?

সুস্মিতার মুখ দিয়ে আর কিছু বেরোয় না।

সুদর্শন তাঁর স্বভাবসিদ্ধ মজাদার কণ্ঠে বলতে থাকেন, তুই চল তো আমার সঙ্গে, এ-বাড়িতে কোথায় ভূত থাকে একবার আমাকে দেখিয়ে দে।

বলতে বলতে দরজার পাশে রাখা একটা ছোট্ট লাঠি বাগিয়ে নিলেন, চল আমার সঙ্গে।

সুস্মিতা তখন লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।

কিন্তু সুদর্শন থামবার পাত্র নন, বললেন, তার একবার দেখা পেলে মাথাটা লাঠির একঘায়ে চুরমুর করে দেব। এত বড়ো সাহস, আমাদের ঘরের বউকে ভয় দেখানো!

বলে আবার থামলেন, তোকে ভয় দেখিয়েছে বুঝি?

সুস্মিতা আরও বিব্রত, কোনও কথাই তার মুখে আসে না। শুধু ঘাড় নাড়ে, না।

—আমি কিন্তু ছাড়ব না সে ব্যাটাকে! তুই শুধু দেখিয়ে দিবি তাকে, বাকি কাজ আমার। কী আশ্চর্য বল্, এ-বাড়িতে বাস করছি প্রায় তিরিশ বছর, একদিনও আমার সামনে এল না! লুকিয়ে থাকত ভয়ে! যেই তোকে নতুন পেয়েছে, অমনি উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করেছে। আচ্ছা, তুই বল তো ঠিক কোথায় আছে ভূতটা?

সুস্মিতা তখন সেখান থেকে পালাতে পারলে বাঁচে।

পরদিন সুস্মিতা অফিস থেকে ফেরার আগেই ফিরে এসেছেন সুদর্শন। সুস্মিতা দেখল ডাইনিং টেবিলের উপর একটা বড়োসড়ো লাঠি। হঠাৎ লাঠি কেন টেবিলে তা নিয়ে সুস্মিতার ভুরুতে ভাঁজ। ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন সুদর্শন, দ্যাখ, কাল সারা রাত আমি জেগে বসেছিলাম বাইরের ঘরে। যদি ভূতটা বেরোয়! হাতে ছিল ছোটো লাঠিটা। পরে ভেবে দেখলাম, ভূতকে যদি নাগালে পেতে হয় তবে একটা বড়ো লাঠি দরকার। তাই আজ অফিস ফেরার পথে এই লাঠিটা কিনে নিয়ে এলাম!

সুস্মিতার কাঁধ থেকে তখন ভূত পালিয়ে যাওয়ার উপক্রম।

—তুই বল তো কোথায় থাকে ভূত?

শ্বশুরের কথার অমান্য কী করে আর করে! মিনমিন করে বলে, আসলে আমি কিছুতেই একা ঘরে থাকতে পারি না। অন্ধকারে তো আরও না। অন্ধকারে থাকলেই মনে হয় ওই বোধহয় কিছু একটা সাঁৎ করে সরে গেল সামনে!

—তোর বাপের বাড়িতে ভূত ছিল বুঝি?

সুস্মিতা লাজুক-লাজুক হাসে, ঘাড় নাড়ে, না।

—তবে? সেখানেও ভয় পেতিস?

সুস্মিতা ঘাড় নাড়ে, হ্যাঁ। দিনের বেলা তো ভয় পাই না। রাত হলেই আমার গোলমাল। রাতে বাথরুমে যাওয়ার থাকলে বাবাকে জাগিয়ে দিতাম। আমি যতক্ষণ না ফিরতাম ঘরে, বাবা গান গাইতেন।

—তাই নাকি? তা হলে এখানে কে গান গায়?

সুস্মিতা লাজুক লাজুক চোখে তাকায়, বলল, ও-ই গায়।

—ও মানে রুবুন! সুদর্শন চোখ বড়ো বড়ো করে তাকান, রুবুন গান জানে না কি! তা তো জানতাম না কখনও।

সুস্মিতা ফিক করে হেসে ফেলে, বলে, গান কি আর জানে! আমাকে বলল, ‘আমি একটাই গান জানি, জনগণমন–’, ওইটেই রোজ গায়।

সুদর্শন হাসি চেপে বলেন, তা হলে ওকে এবার গানের ক্লাসে ভর্তি করতে হবে, নাইলে রবি ঠাকুর রাগ করবেন যে!

সুস্মিতা হাসি-হাসি মুখে চা করে আনতে ঢুকে গেল রান্নাঘরে। দেবদ্যুতের ফিরতে দেরি হবে, অতএব তিন কাপ চা। সোফায় তিনজনে জমিয়ে চা খেতে বসতেই সুদর্শন আবার শুরু করলেন, বুঝলি, আমি কাল সারা রাত লাঠি নিয়ে বসে থেকে থেকে ভূত নিয়ে একটা গবেষণাই করে ফেললাম!

সুস্মিতা বুঝল ভূতের কথা বলে সে একটা ব্লান্ডার করে ফেলেছে।

—এই ধর প্রতিদিন কত মানুষ মারা যাচ্ছে। সবাই তো মরে গিয়ে নিশ্চয় এক-একটা ভূত হয়ে যাচ্ছে! তা হলে এত ভূত প্রতিদিন যাচ্ছে কোথায়! গ্রামেগঞ্জে না হয় বহু বড়ো বড়ো গাছ আছে, বট-অশত্থরা তো রয়েছেই তেনাদের অ্যাকোমোডেশনের জন্য, কিন্তু শহরের ভূতরা থাকছে কোথায়!

সুস্মিতা কী বলবে ভেবে পায় না!

—আজকাল শহরে পোড়ো বাড়িটাড়িও তেমন নেই যে, সেখানে গিয়ে জোট বাঁধবে! পোড়ো বাড়ি দেখলেই প্রোমোটাররা ঝাঁপিয়ে পড়ে ভেঙেচুরে মস্ত একটা ফ্ল্যাটবাড়ি বানিয়ে দেবে। সে সব বাড়িতে রজু রুজু জানালা, হাওয়া ঢেলখেল, বেচারি ভূতেরা তা হলে গেল কোথায়!

কিছুক্ষণ পর টেবিলে রাখা লাঠিটা হাতে তুলে নিলেন সুদর্শন, জিবে চুকচুক শব্দ করে বললেন, কিন্তু একটা বোধহয় ভুল হয়ে গেল! লাঠি দিয়ে কি ভূত মারা যাবে! তেনাদের তো শরীর নেই, তাই না! তা হলে!

প্রশ্নটা ছুড়ে দিলেন সুস্মিতার উদ্দেশে যেন সে-ই এবার উত্তরটা জোগান দেবে।

—বুঝলি, আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে। আমার এক বন্ধু লেজার রশ্মির কাজ জানে। ওকে বলি লেজার রশ্মি দিয়ে একটা লেজার-টর্চ বানিয়ে দিতে।

সুস্মিতা বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে থাকে সুদর্শনের দিকে।

—লেজার রশ্মি হচ্ছে সেই বস্তু যা এমনিতে চোখে দেখা যায় না, কিন্তু কোনও কায়াহীনের উপর পড়লে সেটি দৃশ্যমান হবে।

লেজার রশ্মির একটা নতুন সংজ্ঞা তৈরি করে সুস্মিতার জ্ঞানবৃদ্ধি করার চেষ্টা করলেন সুদর্শন। তারপর আবার বললেন, যেই না তুই ভূতের দেখা পাবি, ব্যস, আমাকে চেঁচিয়ে বলবি। বলার সঙ্গে সঙ্গে আমি লেজার রশ্মি চালিয়ে দেব তার উপর। অমনি ভূতবাবাজিকে দেখা যাবে। তারপর লাঠির এক ঘায়ে তার দ্বিতীয়বার মৃত্যু ঘটাব। বুঝলি?

সুস্মিতা তার শ্বশুরের কাণ্ড দেখে হাসবে না কাঁদবে ভেবে পায় না।

পরদিন সত্যিই সুদর্শন বাড়িতে নিয়ে এলেন একটা অদ্ভুত ধরনের টর্চ। তার সুইচ টিপলেই লাল আর নীলে মেশানো এক রকমের আলো বেরোয়। সেই আলো দেখিয়ে বললেন, আর কোনও চিন্তা নেই। যদি তোর চোখে ভূতের একটা চোখ কি কান কি লেজের একটা টুকরোও চোখে পড়ে, ব্যস, আমাকে দেখিয়ে দিবি। বাকি দায়িত্ব আমার।

বলে টর্চটা জ্বালিয়ে একবার সারা ঘর দেখে নিলেন, তারপর পুনর্বার তাকালেন পুত্রবধূর দিকে, তার একটা নতুন নামকরণ করে বললেন, ভুতু, এবার জব্দ হবেই হবে বাছাধনরা।

—ভুতু! সুস্মিতা বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে থাকে শ্বশুরের দিকে।

—তোর এই নামটাই থাক। তোকে ভুতু বলে ডাকলে ভূতরা ভাববে তুই ওদেরই খুড়তুতো জ্যেঠতুতো কেউ একটা। তোকে আর ওরা ঘাঁটাবে না। তুই আজ থেকে তার পাত্তা লাগা, ভুতু। দেখলেই–

অতঃপর ভুতু খুঁজেই চলেছে ভূতদের। কিন্তু এখনও তেনাদের দেখা পায়নি!

কিন্তু ক-দিনের মধ্যে এক কাণ্ড ঘটে গেল। সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ বাড়ি ফিরে সুদর্শন হঠাৎ বলাকাকে বললেন, শিগগির রেডি হয়ে যাও। আমার এক বন্ধুর খুব অসুখ, কাছেই একটা হাসপাতালে ভর্তি হয়ে আছে, দেখতে যেতে হবে।

তার একটু আগেই অফিস থেকে ফিরেছে সুস্মিতা, শ্বশুরের কথা শুনে আঁতকে উঠে বলল, আর আমি?

—আমি মানে! সুদর্শন যেন বুঝেও বুঝতে চাইলেন না।

—বাড়িতে আমি একা থাকব!

—ও, ব্যাপারটা যেন বুঝলেন সুদর্শন, বললেন, বেশিক্ষণ তো থাকব না, বড়ো জোর এক ঘন্টা! যাব আর আসব। তুই ততক্ষণ এক কাজ করবি। বাঁ-হাতে এই লেজার-টর্চটা ধরে রাখ, ডান হাতে এই বড়ো লাঠিটা। কিছু উল্টোপাল্টা চোখে পড়লেই টর্চটা জ্বালবি। যেই না কিছু চোখে পড়বে, অমনি লাঠি দিয়ে–

সুস্মিতার প্রায় কান্না-কান্না মুখ। কিন্তু কী করবে। বন্ধুর অসুখে দেখতে যাওয়াটাও কর্তব্য। এদিকে দেবদ্যুতির ঘরে ফিরতেও আজ নাকি একটু দেরি হবে।

সুদর্শন আর বলাকা বেরিয়ে গেলে সুস্মিতা তখন অগাধ অন্ধকারে। সব কটা ঘরের সব লাইট জ্বেলে দিয়েও মনে হচ্ছে বাইরের পৃথিবীর যাবতীয় আঁধার গ্রাস করতে আসছে তাকে। আর অঁখার মানেই ভূত। যত রাজ্যের ভূত তাদের দাঁত-নখ বিকশিত করে ঘাড় মটকাতে আসছে তাকে। পারতপক্ষে জানালার দিকে তাকাচ্ছেই না সুস্মিতা। তার খুব ভুল হয়ে গেছে, শ্বশুর- শাশুড়ি বাড়ি থাকতে-থাকতে জানালাগুলো বন্ধ করে নেওয়া উচিত ছিল! নীচের ঘরগুলো ফাঁকা পড়ে আছে বলেই যত বিপত্তি। ফাঁকা ঘরেই তো ভূতগুলো বাসা বাঁধে। তাদের বিয়ে হবে বলে নীচের ঘরে ভাড়াটে বসানো হয়নি এখনও। তাতেই আরও বিপত্তি! এতক্ষণ শুনতে পাওয়া যায়নি, যেই না সে একা হয়ে গেছে, অমনি সারাক্ষণ কীরকম খুটখাট শব্দ আসছে নীচে থেকে। তা হলে কি ভূতগুলো দল বেঁধে উপরে আসছে সব! লেজার-টর্চটা বাগিয়ে বসল সুস্মিতা। তারা ঘরে ঢুকলেই ছুড়বে টর্চের আলো। সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে আছে সুস্মিতা আর এক-একবার ঘড়ি দেখছে। সাড়ে সাতটা থেকে সাড়ে আটটা, ওঁরা বলেছেন একঘণ্টার মধ্যেই বাড়ি ফিরবেন। দেবদ্যুতি ফিরবে তারও পরে। কী করবে এখন সে! দেবদ্যুতিকে একটা ফোন করবে! কিন্তু ফোন করতে গেলে যদি ভূতগুলো ঢুকে পড়ে ঘরে!

সুস্মিতা একটা সোফার উপরে চুপটি করে বসে আছে আর চারদিক তাকাচ্ছে ফালুক-ফুলুক। এক-একবার চোখ পড়ে যাচ্ছে জানালার দিকে, আর মনে হচ্ছে কেউ যেন এসে দাঁড়িয়েছে গ্রিলের ফ্রেম ধরে। সুস্মিতা ঘাবড়ে গিয়ে লেজার টর্চটা জ্বালল একবার। নীল আর লাল মেশানো আলো গিয়ে পড়ল বাইরের অন্ধকারে। না ভূতটুত কিছু চোখে পড়ল না তার। হঠাৎ চোখে পড়ল দেওয়ালে টাঙানো দেবদ্যুতির ঠাকুরদা-ঠাকমার ফটোদুটো। তাঁরা কবেই মারা গেছেন, তাঁরা নাকি খুব ভালো বাসতেন দেবদ্যুতিকে। তা হলে তাঁরা নিশ্চয় দেখবেন দেবদ্যুতির বউয়ের কেউ ক্ষতি করতে না পারে!

সুস্মিতা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে তাঁদের ফটোর দিকে। তারপর আবার কী শুনতে পায় খুটখুট। সঙ্গে সঙ্গে লেজার-টর্চ জ্বালে। না, কোথাও কিচ্ছু নেই। তবু সুস্মিতা ঘামছে। কেন ঘামছে কে জানে! একটু পরেই আবার জোরে খুটখাট। সুস্মিতার বুকের ভিতর দমকল চলে। নিশ্চয় এবার বড়ো বড়ো ভূত। সিঁড়ির দরজা ঠেলছে।

পরক্ষণে কী মনে হল সুস্মিতার! এই খুটখাট শব্দ তার ভারী চেনা!

ছুটে সিঁড়ি বেয়ে নীচের দরজার কাছে যায়, এক হাতে লেজার-টর্চ, অন্য হাতে লাঠি। দরজায় খুলতেই দেখল সুদর্শন আর বলাকা।

তার এই রণং দেহি মূর্তি দেখে সুদর্শন হেসে বললেন, কী রে, কেউ এসেছিল?

সুস্মিতার দেহে তখন প্রাণ এসেছে, কিন্তু কথা সরছে না মুখে, ঘাড় নেড়ে বলল, না।

—একটাও ভূত আসেনি?

সুস্মিতা আবার ঘাড়ে, না।

—দেখলি তো, তুই এক ঘণ্টা একা থাকলি, কিন্তু কোনও ভূতই এল না তোর কাছে। ভূত থাকলে তো আসবে। এরকম মাঝেমাঝে আমরা সন্ধের পর কোথাও যাব। তখন দেখবি ভূত আসে কি না। দেখবি ভূত আসবেই না! শুধু শুধু তুই ভয়ে আধমরা হয়ে পড়িস। ক-দিন এরকম থাকলেই দেখবি আর ভয় করছে না!

সুস্মিতার কণ্ঠে এতক্ষণ পরে স্বর ফুটল, আপনার সেই বন্ধু ভালো আছেন?

সুদর্শন বিস্ময়ে দশখান হন, বন্ধু! কোথায় বন্ধু!

সুস্মিতা বিস্ময়ে কুড়িখান হয়, ওই যে বললেন, হাসপাতাল বন্ধুকে দেখতে যাচ্ছেন!

—সেই বন্ধু তো তুই। একঘণ্টা একা থেকে কেমন আছিস তাই দেখতে এলাম। এতক্ষণ আমি আর বলাকা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলাম। তোকে একা রেখে যাব বলেই একটা গল্প ফাঁদলাম।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *