উপন্যাস
গল্প
উপন্যাস

ছাঁ ভূত – তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

ছাঁ-ভূত

শিরীষ গাছের একটা কচি ডালে বসে নীচের রাস্তার দিকে চোখ পেতে একমনে ঠ্যাঙারু দোলাচ্ছিল ছাঁ-ভূত। তবে ঠ্যাঙারুটা ইচ্ছে করে বেশ লম্বা করে দিয়েছে যাতে তার ঠ্যাঙারুটা মাঝেমধ্যে ছুঁয়ে যেতে পারে খোয়া-ওঠা রাস্তার ভাঙা খোয়াগুলো। ততে বেশ আরাম বোধ করছিল ছাঁ-ভূত। কিন্তু উপরের মগডাল থেকে তার পেতনি-মা নিষেধ জারি করল, অ্যাই ছাঁ, ঠ্যাঙারু বেশি লম্বা করিস নে, কার না কার মাথায় তোর ঠ্যাঙারু ঠেকে যাবে, সে অমনি ভিরমি খেয়ে পড়ে থাকবে গাছের নীচে।

মানুষের যেটা ঠ্যাং, ভূতেদের জগতে সেটাই ঠ্যাঙারু। ইচ্ছে করলেই তারা ঠ্যাং লম্বা করতে পারে বলেই এরকম নাম। যেমন হাতকে বলে হাতারু, মুণ্ডকে বলে ঘামুণ্ডি, আর শরীরের নাম কঙ্কাল সে তো বালকেও জানে।

কিন্তু ঠ্যাঙারু দোলাতে ভালোই লাগছে বলে ছাঁ-ভূত তার পেতনি-মাকে অগ্রাহ্য করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু পেত্নি-মা অমনি তার হাতারুটা ইয়া লম্বা করে দিয়ে ছাঁ-ভূতের ঘামুণ্ডিতে একখানা চাঁটাং।

হ্যাঁ, চাটিকে চ্যাটাংই বলে ওরা।

ছাঁ-ভূতের খুব রাগ হয়ে গেল তার পেতনি-মায়ের উপর। সন্ধে হয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগেই, তার এখন একটু খিদেং-খিদেং লাগছে, কিন্তু পেতনি-মায়ের কাছে খেতে চাইলেও তো দেবে পচা ব্যাঙের গুচ্ছের ঠ্যাং কিংবা আরশোলার মরা পাখনা। একই খাবাং রোজ চারবেলা খেয়ে খেয়ে অরুচি ধরে গেছে তার। কিন্তু পেতনি-মাকে কথাটা বললেই বলবে, তা আমি মানুষদের মতো পোলাও-বিরিয়ানি-মণ্ডা-মিঠাই কোথায় পাব। ভূতেদের যা খাবাং তাই তো খাবি!

ভূতেদের খাবাং কি খেতে পারে ছাঁ-ভূত। পচা ব্যাঙের ঠ্যাং, চামচিকের পাখনা, মরা পাখির পালক—এরকম সব বিদঘুটে খাবার তাদের বরাদ্দ। এইসব খাবাং কি তার দাঁতং-এ রোচে! এই তো সেদিনও সে ছিল একটা মানুষের পো। লেখাপড়ায় ভালোই ছিল, অঙ্কে একশোয় একশো, ফটাং ফটাং করে ইংরেজি বলত, কুইজে ছিল তুখোড়, হঠাৎ পিকনিকে গিয়ে নৌকো চড়তে গিয়েই তো হল কাল। সে অমনি একটা ছাঁ-ভূত হয়ে চলে এল এই শিরীষ গাছটার ডালে।

অতএব খিদেটা পেটে মরতে দিয়েই ঠ্যাঙারু দোলাতে থাকে ছাঁ-ভূত, কিন্তু দোলাতে গিয়ে এবার সত্যিই তার ঠ্যাঙারু-টা ঠেকে গেল একটা ছোটোখাটো মাথায়। ইঁক করে একটা শব্দ করল বছর দশ-এগারোর একটি বালক, তারপর মাথা উঁচু করে দেখতে থাকে শিরীষগাছের ডালগুলোর দিকে। কিন্তু কিছু দেখতে না পেয়ে জোরে পা চালাতে শুরু করে কেন না সে জানে এই শিরীষ গাছটার ডালে নাকি কখনও ভূত দেখেছে গাঁয়ের মানুষ।

ছাঁ-ভূতের হঠাৎ কী মনে হল এক লাফ দিয়ে ঘাড়ে চেপে বসল সেই বালকটির। অমনি পিছন থেকে তার পেতনি মায়ের গলা শুনতে পেল, এই, ছাঁ এ কীং করছিস? এ কীং করছিস? হট্টাচট্টা চলে আয়, তোদের খাবাং দেব।

কিন্তু ছাঁ-ভূতের আজ খুব রাগ হয়েছে তার পেতনি-মায়ের উপর। কথায় কথায় শুধু বকুনিং আর বকুনিং। ভালো কিছু খাবাং চাইলে দেবে তো না-ই উপরন্তু বকুনিং। পেতনি-মায়ের কথা গেরাহ্যি না করে সে বালকটির ঘাড়ে চেপে চলল অন্ধকারের মধ্যে। বালকটির কাঁধে একটা পেট-মোটা ঝোলা ব্যাগ, তার মধ্যে নির্ঘাত কিছু মোটা মোটা বই আর খাতা আছে। ছাঁ-ভূত জানে মানুষের ছাঁ-গুলো সকাল-সন্ধে বইয়ের পাতা খুলে খুব চেঁচায়, যেন বইগুলোর উপর তাদের খুব রাগ।

একটু পরেই বালকটির ঘাড়ে চেপে ছাঁ-ভূত পৌঁছে গেল তাদের পাকাবাড়িটার ভিতর। এর আগে বাড়িটার ভিতরে উঁকিঝুঁকি মেরে দেখে এলেও তার ভিতরে কখনও পা দেয়নি ছাঁ-ভূত। এখন দেখল বেশ পেল্লাই ঘরখানা, উপরে অ্যাজবেস্টসের চাল, কিন্তু ভিতরটা বেশ ঝকঝকে। এরকম ঘরে থাকার একটা অন্য আরাম আছে, কিন্তু তাদের ভূত বাহিনী গাছের কাণ্ডে, পাতালতায় ঝুলে থাকতেই পছন্দ করে, ছাঁ-ভূতের বরাতে সেই ঝুলে থাকাই বরাদ্দ।

কিন্তু আপাতত এই বাড়ির বালকটির ঘাড় তার পক্ষে খুব মানানসই। সে ভিতরে ঢুকতেই তার মা চেঁচিয়ে বকুনিং শুরু করল, বিলু, তোকে কতদিন না বলেছি, টিউশন পড়ে সোজা বাড়ি চলে আসবি। তুই আজ আবার রাত করে বাড়ি ফিরলি? ওই শিরীষ গাছটার তলা দিয়ে! তোর সাহস বলিহারি! জানিস ওই শিরীষ গাছটা নিয়ে লোকে কী বলাবলি করে!

ছাঁ-ভূত সেই মানুষ-মায়ের বকুনিং শুনে চমকে উঠছিল বেশ। তা হলে শুধু তার পেতনি-মা-ই বকুনিং দেয় না, মানুষ-মায়েরাও এরকম বকুনিং দেয়! ধুস, মা-গুলো শুধু যেন বকুনিং দিতেই শিখেছে।

কিন্তু সে যার ঘাড়ে চেপে বসে আছে, সেই বিলু নামের বালকটি তখন কলতলায় গিয়ে হাত-মুখ ধুচ্ছে জল ছিটিয়ে, সেই জল ছিটকে ভিজিয়ে দিচ্ছে ছাঁ-ভূতকেও, ‘আ রে, মানুষের পো-টা তাকে পুরো ভিজিয়ে দেবে নাকি, অ্যাঁ?’ বিলু তখন তাদের বাথরুম থেকে একটা গামছা টেনে নিয়ে ভলো করে মুখ মুছছে, কিন্তু ছাঁ-ভূত কী করবে! তার শরীরটাও তো ভিজে একশো!

জলে ডুবে যাওয়ার পর থেকে জলে বড়ো ভয় তার! আর বিলু কিনা তাকে—

ছাঁ-ভূত অমনি মুখ মুছতে বিলুর হাত থেকে গামছাটা টেনে তার মুখ-গা মুছে নিল চট করে। তার গামছাটা কেউ টেনে নিচ্ছে দেখে বিলু অবাক, কিন্তু কাউকে তো দেখতে পাচ্ছে না, তাই গামছাটা যথাস্থানে রেখে এসে বলল, মা, খেতে দাও।

একটু পরেই বিলুর মা বিলুকে থালা ভরে খাবাং দিল, তাদের খাবাং মানে ভাত-তরকারি, সঙ্গে একটা কাৎলামাছের বড়ো দাগা আর বাটিভর্তি চাটনি। বিলু হাপুস-হুপুস শব্দে খেতে শুরু করতেই ছাঁ-ভূতের জিবেও জল এসে যাওয়ার কথা, কিন্তু তার মুখের ভিতর তো জিব নেই, শুধু দাঁতং। তারও ইচ্ছে করছিল সাদা দুধের মতো ভাত মুঠোমুঠো খেয়ে নেয় এখনই। কিন্তু খাবে কি, বিলুর চোখে পড়ে যাবে যে! অতএব বিলুর চোখের আড়ালে খেতে হবে। তখনই তার মাথায় একটা দুষ্টবুদ্ধি খেলে গেল, সে একটা বিড়ালছানার রূপ ধরে দরজার কাছে শব্দ করল, ম্যাও ম্যাও।

বিলু বিড়ালছানাটা দেখেই ছটফট করে উঠে বলল, ‘দেখেছ, মা, কোথা থেকে একটা বিড়োাল এসে জুটেছে! অ্যাই, যাহ্, যাহ্’ বলে খাওয়ার আসন ছেড়ে উঠে গেল বাঁ-হাতে একটা লাঠি নিয়ে, এ্যাই, যাহ্-

বিলু উঠে যাওয়ার পরক্ষণে ছাঁ-ভূত পট করে তার মাছের দাগাটা তুলে নিয়ে সোজা হাঁং-এ। বাহ্, বেশ খেতে তো রান্না করা কাৎলা মাছ! কতদিন এ সব খাবাং খায়নি সে! সঙ্গে কয়েকমুঠো সাদা ভাতও মুখে পুরে ফেলে বেজায় উল্লাস তার। তার পেনি-মায়ের কাছ থেকে এমন খাবাং কবে খেতে পেয়েছে!

বিলু ফিরে এসে চেঁচিয়ে উঠল, ও মা, কী হবে! আমার মাছটা ওই বিল্লিটা খেয়ে নিয়েছে। কখন খেল জানতেই পারলাম না! ও মা, কী হবে?

বিলুর মা সব দেখেশুনে হতবাক। বলল, তুই দেখতে পেলি নে তোর সামনে দিয়ে বিড়ালটা মাছ খেয়ে নিয়ে চলে গেল! কী হাঁদা গঙ্গারাম ছেলে হলি তুই?

বিলু বসে আছে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে। কী আশ্চর্য, সে দেখতেই পেল না!

বিলুর মা বলল, ঠিক আছে, কী আর করা যাবে? আমার মাছটা দু-টুকরো করে তুই-আমি ভাগ করে খাই, বলে আর একটা দাগা মাছের আধখানা দিয়ে গেলেন বিলুর পাতে। ছাঁ-ভূত ঠিক করল এই মাছটাও তার খাওয়া চাইই, অমনি করল কি, বিলুর ঘামুণ্ডির চুল ধরে একটা টান মারল পিছন থেকে, বিলু অবাক হয়ে যেই না পিছন ফিরে দেখতে গেছে কে তার চুল ধরে টানল, অমনি বাকি মাছটাও ছাঁ-ভূতের হাঁং-এ।

ছাঁ-ভূত মহানন্দে মাছটার স্বাদ নিচ্ছে, সেসময় বিলু পিছনে কাউকে দেখতে না পেয়ে অবাক, তারপর মনের ভুল ভেবে সামনের দিকে তাকায়, তাকিয়েই আবিষ্কার করে তার পাতের বাকি মাছখণ্ডটিও পেয়ে সে তখন বিস্ময়ের চরমে। কিন্তু মাকে কিছু বলতেও পারছে না, কেন না মা এবার শুনলে তার কথা বিশ্বাসই করতে চাইবে না, উল্টে বলবে, এসব তোর চালাকি, তুই খাচ্ছিস, আর দোষ চাপাচ্ছিস বিড়ালের ঘাড়ে।

বিলু মুখ বুজে বাকি ভাত খাওয়াই সাব্যস্ত করে, কিন্তু তার আরও এক সমস্যা হল আজ ভাত খেয়ে তার যেন ঠিক পেট ভরল না, অন্যদিনের চেয়ে অনেকটা কম খাওয়া হল। পেটে খিদে থাকলে তার আবার ঘুম আসে না চোখে, তাই না-বলে পারল না, মা, আর একটু ভাত দেবে?

বিলুর মা বেশ অবাক হল, তা হলে তোর বেশ খিদে বেড়েছে, বল?

বলে আরও দু-মুঠো ভাত দিয়ে গেল তার পাতে।

ছাঁ-ভূত কিন্তু বেশ মজাই পাচ্ছিল গোটা ব্যাপারটায়, সে বিলুকে নানাভাবে উত্যক্ত করে অন্যমনস্ক করে দিচ্ছে, আর তার থালা থেকে টপাটপ ভাত খেয়ে তৃপ্তিও পাচ্ছে খুব। আহ্, কী যে আরাম লাগছে তার। এরকম সুস্বাদু খাবাং সে কত দিন খায়নি। বিলু ভাত মেখে রাখছে থালায়, আর সে বিলুর ঘামুণ্ডিতে চ্যাটাং মেরে, তাকে উত্ত্যক্ত করে তার থালা থেকে টপাটপ খাবাং খাচ্ছে বেশ।

দ্বিতীয়বার ভাত খেয়েও বিলুর ঠিক যেন খিদে মিটল না, কিন্তু মাকে তো আর বলা যাবে না সে-কথা। মা তা হলে নির্ঘাত বলবে, কেন রে, তোর হল কি আজ, পেটে কি রাক্ষস ঢুকেছে? রোজ যা খাস, তার চেয়েও দু-মুঠো বেশি খেতে দিলাম যে।

অতএব পেটে খিদে নিয়েই বিলু শুতে এল তার বিছানায়। ছাঁ-ভূতও অমনি তার ঘাড়ং-এ চেপে চলে এল শুতে। কিন্তু বিছানায় শুয়ে ছাঁ-ভূত পড়ল মুশকিলে। তার শোয়া অব্যেস গাছের ডালে, এ ক-মাসে অব্যেসটা কায়েম হয়ে বসেছে তার শরীরে, তার বদলে কি না নরম বিছানায়! একটু পরেই বিলুর চোখে ঘুম, তার অল্প-অল্প নাকও ডাকছে, সে সময় ছাঁ-ভূত পড়ল মুশকিলে। তার কি এরকম মানুষের বিছানায় ঘুম আসবে! নাহ্, এ বিছানা চলবে না তার। সে অমনি বিছানা থেকে উঠে একলাফে উঠে পড়ল অ্যাজবেস্টসের চালের নীচে আড়ায়। বেশ কায়দা করে ঝুলে রইল সারা রাত যতক্ষণ না বিলুর ঘুম ভাঙল।

বিলু ঘুম ভেঙে উঠে যেই না বাইরে বেরিয়েছে, অমনি ছাঁ-ভূত তার ঘাড়ং-এ, কিন্তু দিনের আলো আবার তার চোখে সহ্য হয় না, চোখ বন্ধ করবে সে উপায়ও নেই, তার চোখের খোঁদলটা আছে, কিন্তু তার পাতা তো নেই। ফলে কী করবে এমন ভাবছে, সেসময় বিলু দাঁত মাজতে শুরু করে পেস্ট আর ব্রাশ নিয়ে। ছাঁ-ভূতেরও ইচ্ছে করছিল বিলুর মতো সেও তার দাঁতগুলো মেজে নেয় অমনি, তার দাঁতগুলো কতদিন যে মাজা হয়নি। কিন্তু বিলুর হাত থেকে পেস্ট-লাগানো ব্রাশটা কেড়ে নিলে এখনই হইচই পড়ে যাবে। বিলু নির্ঘাত বুঝতে পেরে যাবে কিছু একটা ঘটছে তার চোখের আড়ালে। হয়তো ভাববে এ নিশ্চয় কোনও ভূতের কাণ্ড। তখনই হয়তো এমন শোরগোল পড়ে যাবে যে, পাড়ার লোক কোথা না কোথা থেকে ডেকে নিয়ে আসবে একটা কপালে মস্ত সিঁদুরের ফোঁটা লাগানো ওঝা। তখন ছাঁ-ভূত আর না-পালিয়ে বাঁচবে না। তার চেয়ে দাঁতং মাজার ইচ্ছেটা আপাতত বিদায় দিয়ে সে ঝুলে রইল বিলুর ঘাড়ং-এ।

বিলু ততক্ষণে ঘরের মধ্যে এসে তার চেয়ার-টেবিলে বসে একটা ঢাউস বই খুলে চেঁচাতে শুরু করল তারস্বরে। ছাঁ-ভূত ঠিক বুঝে উঠতে পারল না কেন বিলু বইগুলোকে অত বকুনিং দিচ্ছে, আর বকুনিং দিচ্ছে তো দিচ্ছেই, কিন্তু বইগুলো কীরকম নির্বিকার, কিছু উত্তর করছে না বিলুর মুখে-মুখে। নিশ্চয় বইগুলো ভারী কিছু অন্যায় করেছে, তাই তার এত বকুনিং পাওনা।

ছাঁ-ভূত ঝুঁকে পড়ে দেখছে অজস্র বকুনিং খেয়ে বইগুলোর কী দশা, সেসময় বিলুর মায়ের প্রবেশ। বিলুর টেবিলে চাওমিনের একটা মস্ত বাটি রেখে যেতে ছাঁ-ভূতের কী উল্লাস। সে তখন ভাবছে কী করে চাওমিনের বটিতে ভাগ বসাবে সে।

আর মওকাও জুটে গেল অমনি। বিলু হাত ধুতে যেই না জলের কলের দিকে গেছে, অমনি ছাঁ-ভূত গপাগপ অনেকটা চাওমিন তুলে নিল বাটি থেকে। এমনি দু-তিন গাল। কিন্তু তার মধ্যেই বিলু এসে গেল টেবিলের কাছে। চাওমিনের বাটিটা হাতে তুলে কেমন যেন সন্দেহ হল তার। তার বাটির চাওমিন কি কমে গেছে হঠাৎ। মা তো বাটি ভরেই চাওমিন দিয়েছিল মনে হচ্ছে। বাটি ভরে না-দিলে সে তো নেবেই না মায়ের হাত থেকে।

কী মনে হতে সে চাওমিনের বাটি নিয়ে গেল রান্নাঘরে, মা, ও মা, তুমি মাত্র এইটুকু চাওমিন দিয়েছ? আজ না স্কুলের ছুটি, সেই কখন বেলা দুটোয় ভাত খেতে দেবে, আর এখন এইটুকু চাওমিন?

বিলুর মা অবাক হয়ে বলল, তোকে বাটি ভরে চাওমিন দিয়েছি, নিশ্চয় খেয়ে নিয়েছিস খানিকটা, এখন কিনা বলছিস কম দিয়েছি!

— মা কালী বলছি, মা, আমি খাইনি একটুও। তুমিই কম দিয়েছ।

বিলুর মা রেগে গিয়ে বললেন, মা কালীর নামে এরকম মিথ্যে বলতে নেই। ঠাকুর পাপ দেয়। ঠিক আছে, আর একটু দিচ্ছি। তুই একা খেয়ে নিলে তোর দিদি, বোন ওরা খাবে কি।

বিলুর মা আবার এক হাতা চাওমিন দিতেই বিলু এসে বসল তার টেবিলে। এবার সে চাওমিনটা বেশ তারিয়ে তারিয়ে খাবে। ঠিক এই সময় জানলার ওপাশ থেকে কেউ যেন ডাকল, বিলু, এই বিলু, একটা নতুন ভিডিও গেম এসেছে। খেলবি?

পাশের বাড়ির রঞ্জুর মুখ জানালার ওপাশে। বিলুর চোখ চকচক করে ওঠে, কী গেম রে?

—কুইজ। দারুণ ইন্টরেস্টিং।

—কুইজ! বিলু থমকে গেল এক লহমা। কুইজে আবার রঞ্জু পাকা, আর সে ঢের কাঁচা। রঞ্জু ওকে বলে-বলে হারাবে।

রঞ্জুদের বাড়িতে একটা নতুন কমপিউটার এসেছে, তার ভিতর নিত্যনতুন গেম লোড করছে রঞ্জু, সময় পেলেই সেই ভিডিও গেম দুই বন্ধু মিলে দেখে। আজ তার ভিডিও গেমের নাম শুনে লাফিয়ে উঠল বিলু। তার মা অবশ্য পই পই করে নিষেধ করে দিয়েছে, ‘খবরদার বিলু, একদম ভিডিও গেম খেলবি নে। ওতে ব্রেন ডাল হয়ে যায়।’ কিন্তু কুইজ তো দারুণ ভালো, তাতে ব্রেন আরও শার্প হবে। কুইজ খেলবে শুনলে মা নিশ্চয় তেমন রাগারাগি করবে না।

হোমটাস্ক শেষ করে বইখাতা রেখে মাকে গিয়ে বলল, মা, রঞ্জুদের বাড়ি কুইজ খেলতে যাব?

মা তেরিয়া হয়ে বলল, কুইজ মানে? সেই ভিডিও গেম? কক্ষনো না।

—না, ভিডিও গেম না। কুইজ। একটা প্রশ্নের চারটে করে উত্তর থাকবে, তার ঠিক উত্তর দিলেই পয়েন্ট। খেলব আমি আর রঞ্জু। দেখি কে জেতে?

কুইজ বিষয়ে আরও কিছুক্ষণ বক্তৃতা দিয়ে মাকে রাজি করতে পেরেই বিলু উড়তে উড়তে রঞ্জুদের বাড়ি। তার ঘাড়ে চড়ে ছাঁ-ভূতও। কুইজ যে কী বস্তু তা ছাঁ-ভূত ভালোমতো বোঝে। কুইজে চাম্পিয়ন হয়েছে কতবার!

রঞ্জু তার কমপিউটার খুলে অপেক্ষা করছিল বহুক্ষণ। বলল, এত দেরি?

—দাঁড়া, মাকে রাজি করাতে হবে তো! ভিডিও গেম শুনলেই রেগে যায় মা।

রঞ্জু ততক্ষণে খুলে ফেলেছে কুইজের ফাইল। একই সেট প্রশ্ন থাকবে দুই প্রতিপক্ষের জন্য, দুজনকেই নির্দিষ্ট বোতাম টিপতে হবে। ঠিক হলে একপয়েন্ট, ভুল হলে জিরো। রঞ্জু মাউসে ক্লিক করে খুলল প্রথম প্রশ্ন : ‘ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম’ বইটি কার লেখা। চারটে অপশন আছে : ১. জওহরলাল নেহরু, ২. স্বামী বিবেকানন্দ, ৩. মৌলনা আবুল কালাম আজাদ, ৪. মহাত্মা গান্ধী।

বিলু ভাবতে বসল কী উত্তর হবে? রঞ্জু এক চান্সে এক নম্বর উত্তরে মাউস টেপে, অর্থাৎ জওহরলাল নেহরু। বিলুর মনে হল রঞ্জু ঠিকই উত্তর লিখেছে, সেও এক নম্বরে মাউসে ক্লিক করতে চাইল, কিন্তু কে যেন তার আঙুলটা তিন নম্বর উত্তরের জায়গায় নিয়ে গিয়ে ক্লিক করিয়ে দিল, অর্থাৎ কিনা মৌলনা আবুল কালাম আজাদ। বিলু আশ্চর্য হল তার আঙুলের এই বেয়াড়াপনায়, কিন্তু আরও আশ্চর্য হল যখন কমপিউটার জানিয়ে দিল বিলুর উত্তরই ঠিক।

রঞ্জু থমকে গিয়ে বলল, তুই কি বইটা পড়েছিস?

বিলু গম্ভীর গলায় বলল, না পড়লে কী করে ঠিক উত্তর লিখলাম!

পরের প্রশ্ন : কোন ভারতীয় ক্রিকেটার একাত্তর টেস্টে খেলে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি করেছিলেন? তার চারটে অপশন দেওয়া আছে— ১. সুনীল গাভাসকার, ২. গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ, ৩. রাহুল দ্রাবিড়, ৪. শচীন তেন্ডুলকার।

এবার বিলু প্রথমে মাউস টিপবে, তার মনে হল এই উত্তরটা নির্ঘাত গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ হবে। সে দু-নম্বর বোতামে ক্লিক করতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আঙুল কীভাবে যেন চলে গেল চার নম্বর বোতামে। রঞ্জু হেসে উঠে বলল, ‘ধূস, এটার উত্তর কখনও শচীন তেন্ডুলকার হতে পারে? পৃথিবীর এক নম্বর ব্যাটসম্যান।’ বলে সে নিজে তিন নম্বর বোতামে আঙুল ছোঁয়। কিন্তু কী বরাত, বিলুর উত্তরই ঠিক। রঞ্জু অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইল বিলুর মুখের দিকে। আর বিলু নিজেও বুঝতে পারছে না সে কী করে ঠিক উত্তরে বোতাম টিপছে!

পরের প্রশ্ন : কোন কেমিক্যাল কম্পাউন্ড ‘লাফিং গ্যাস’ নামে পরিচিত? উত্তরের তালিকায় আছে : ১. সোডিয়াম ক্লোরাইড, ২. নাইট্রিক অক্সাইড, ৩. নাইট্রাস অক্সাইড, 8. ট্রাই-নাইট্রো-টলিউন।

এবার প্রথমে ক্লিক করবে রঞ্জু, সে কিছুক্ষণ ভেবে দু-নম্বর বোতামে টিপে অপেক্ষা করতে লাগল বিলু কী উত্তর লেখে! বিলুর কাছে চার নম্বর উত্তরটা বেশ মজার বলে মনে হচ্ছিল, শব্দটা তার শোনা-শোনা। সে চার নম্বর বোতামে মাউস ক্লিক করতে যাচ্ছিল, কিন্তু কীভাবে যেন তার আঙুল চলে গেল তিন নম্বর বোতামে। আর তার উত্তরই ঠিক প্রমাণ করল কমপিউটার।

রঞ্জু যেমন বিস্মিত হচ্ছিল বিলুর সঠিক উত্তর দেওয়া দেখে, বিলু নিজেও কম অবাক হচ্ছিল না। কিন্তু বারবারই তার মনে হচ্ছিল তার আঙুল যেন তার নিজের বশে নেই, কেউ যেন অলক্ষে থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে তার আঙুল। ঘণ্টাখানেক পরে এমন দাঁড়াল, রঞ্জুর পয়েন্ট একশোয় চল্লিশ তো বিলু একশোয় একশো। রঞ্জু অবশেষে হার স্বীকার করে বলল, তোর জেনারেল নলেজ খুব বেড়ে গেছে, বিলু। খুব বইটই পড়ছিস, কী বল?

বিলুর তখন কলার তুলে ঘুরে বেড়ানোর মত অবস্থা, বিনয় দেখিয়ে বলল, ওই একটু-আধটু। না-পড়ে মুখ্যু হয়ে থাকা কি ভালো, বল?

ছাঁ-ভূত বেশ মজাই পাচ্ছিল রঞ্জু নামের ছেলেটাকে বিপর্যস্ত করতে। আসলে বিলু তো জেতেনি, জিতেছে সে-ই। সে যখন স্কুলে পড়ত বরাবরই কুইজে ফার্স্ট হত, সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বেশ আরাম পাওয়া গেল আজ, কিন্তু কৃতিত্বটা পেল বিলুই।

বিলু এমন হাবভাব করছিল যেন সে এখন সবজান্তা। তাই দেখে ছাঁ-ভূতের ভারী রাগ হয়ে গেল বিলুর উপর। তুমি জিতেছ নিজের কৃতিত্বে নয়, এই ছাঁ-ভূতের সৌজন্যে, বুঝলে?

বিলু রেলা দেখিয়ে বলল, চল, আজ পুকুরে স্নান করে আসি।

—স্নানে যাব এখন? রঞ্জু ঠিক চাইছিল না সাঁতারে যেতে, কারণ বিলু আবার সাঁতারে এক্সপার্ট। কুইজে হেরেছে, আবার যদি সাঁতারেও হারে, তা হলে দিনটা বরবাদ হয়ে যাবে তার।

—চল না, অনেকদিন সাঁতার কাটা হয়নি।

ছুটির দিনে পুকুরে হাঁপাই জোড়া বিলু আর রঞ্জুর একটা বিলাসিতা। শেষে অনেক ইন্টুবিন্টু করার পর সাঁতার কাটতে রাজি হয়ে গেল রঞ্জু। বিলু বাড়ি গিয়ে একটা গামছা নিয়ে বলল, মা, পুকুরে স্নান করতে যাচ্ছি। আজ কী রান্না করেছ?

বিলুর মা যা-যা রান্না করেছে তাতে ছাঁ-ভূতের জিবং-এ জল আসার কথা, কিন্তু তার দাঁত আছে, জিবং নেই তো জল আসবে কী করে!

কিন্তু ছাঁ-ভূত বেজায় উল্লসিত, তা হলে আজ একটা জবরদস্ত খাবার অপেক্ষা করে আছে তার জন্য! ছাঁ-ভূত মনে মনে তৈরি হল দুপুরের খাবাং-এর অপেক্ষায়। বিলু ততক্ষণে কাঁধে একটা গামছা নিয়ে পুকুরঘাটে। ছাঁ-ভূতের আবার জলে ভয়, কিন্তু সে তো থাকবে বিলুর ঘাড়ে চড়ে, প্রয়োজনে মাথায় উঠে বসবে জল থেকে নিজেকে বাঁচাতে। পুকুরঘাটে তখন রঞ্জুও এসে গেছে কোমরে গামছা জড়িয়ে।

বিলু বলল, তোর আজকে হারার দিন রে, রঞ্জু!

বলতে বলতে লাফিয়ে ঝাঁপাল পুকুরের জলে, দেখাদেখি রঞ্জুও। দুজনে সাঁতার কেটে পুকুরের ওপারে চলল দু-হাত পাখির ডানার মতো ভাসিয়ে। বিলু হু হু করে এগোতে চাইল রঞ্জুকে ছাড়িয়ে, কিন্তু কী আশ্চর্য, আজ তাকে কে যেন টেনে ধরে আছে, সে কিছুতেই এগোতে পারছে না। আর রঞ্জু বড়ো করে হাত বাড়িয়ে জল কেটে এগোচ্ছে তরতর করে। কী আশ্চর্য, বিলুর আজ হলটা কী! রঞ্জু আজ অনেকটা আগেই পৌঁছে গেল ওপারে। পায়ের নীচে মাটি পেতে জোরে হেসে উঠে বলল, কি রে বিলু, তুই আজ এত্তা লেট।

বিলু কিছুক্ষণ পরে ওপারে পৌঁছে বলল, আজ কী হল কে জানে, কিছুতেই হাত চলছিল না যেন!

রঞ্জু তখন জয়ের স্বাদ পেয়েছে, বলল, বিলু আর একবার হয়ে যাক। তোতে আমাতে মিলে আবার পার হই পুকুরটা।

বিলু কিছুতেই তার হার মেনে নিতে পারছিল না, তাই চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করে বলল, ঠিক আছে, এবার দেখা যাক কে জেতে।

ছাঁ-ভূত বেশ মজার রসদ পেয়েছে বিলুকে জব্দ করতে পেরে। সে ঠিক করল বিলুকে হারিয়ে দেবে এবারও।

বিলু রঞ্জুকে হারাতে বদ্ধপরিকর, সে হঠাৎ ঝপ করে ডুব দিল যাতে ডুব সাঁতার দিয়ে অনেকটা এগিয়ে যায়, তারপর জোরে সাঁতার কেটে হু হু পৌঁছে যায় ওপারে। আর তাতেই হল কাল। ছাঁ-ভূতও তার সঙ্গে ডুবে গিয়ে অমনি হাঁসফাঁস করে চেঁচাতে থাকে, ও পেনি-মা, শিগগির বাঁচাও। বাঁ-চা-ও-

ছাঁ-ভূতের তখন সাংঘাতিক অবস্থা। জলেই তার ভয়, আর শেষমেশ জলেই ডুবতে বসেছে সে বিলুর পাল্লায় পড়ে!

পেনি-মা কোথায় ছিল, ছাঁ-ভূতের চেঁচানি শুনে তার লম্বা হাতারু বাড়িয়ে ঘামুণ্ডিটা চেপে ধরল ছাঁ-ভূতের, তারপর ধাঁ করে নিয়ে তাকে বসিয়ে দিল শিরীষগাছের ডালে, পরক্ষণে শুরু করল বকুনিং, ও রে হাঁদা-ভূতের পুত, তোর খুব নোলা হয়েছে, অ্যাঁ? মানুষের বাচ্চার সঙ্গে তাদের বাড়ি গিয়ে ভালোমন্দ খাবাং খেতে ইচ্ছে হয়েছে, অ্যাঁ! আয়, শিগগির, খেতে বোস—

বলে গুচ্চের পচা ব্যাঙের ঠ্যাং, চামচিকের পাখনা আর আরশুলার খোসা দিয়ে বলল, খা, সোনামুখ করে খেয়ে নে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *