ডাক বাংলোর রহস্য
প্রায় মরচে-ধরা তালাটায় বহু কসরতে চাবি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অবশেষে বাংলোর দরজা খুলে ফেলতে সক্ষম হল দুখিরাম। নামে বনবাংলো হলেও লোকে ভূতবাংলো বলে থাকে। ভূতেরা বাস করে বলেই এর আগে বহুবার চিচিং ফাঁক বলা সত্ত্বেও দরজাটা কিছুতেই খুলছিল না। অবশ্য চিচিং ফাঁকটা আমিই বলেছিলাম মনে মনে। দরজা খুলতে পাল্লা দুপাশে ঠেলে দিয়ে বাংলোর প্রায়-বৃদ্ধ চৌকিদার দুখিরাম বলল, স্যার বাঁচালেন।
ভিতরে চোখ পড়তেই আমি আঁতকে উঠে বুঝে উঠতে পারলাম না কেন বাঁচল সে! বাংলোর ভিতরে মাকড়সা, চামচিকে আর টিকটিকির মহোৎসব চলছিল তখনও। আমাদের দেখে কে কোথায় ছুটে পালাবে দিশে না পেয়ে আমাদেরই চোখে মুখে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল সদলবলে। সরে গিয়ে বললাম, কেন, আমি এমন বিপদ সেধে ঘাড়ে নিচ্ছি বলে তুমি বাঁচলে।
ঘাড়ে বিপদ কি না জানি না, কেন না এই বনবাংলোয় বহুকাল কোনও অতিথি আসে না। আসে না বলেই বাংলোটা খোলারও কোনও প্রয়োজন হয় না। আমার আরজি শুনে চৌকিদার চোখ ব্ৰহ্মতালুতে তুলে বলল, আপনি এই ঘরে রাত কাটাবেন?
—কেন, তোমার আপত্তি আছে?
— না, স্যার। না, স্যার। আপত্তি কেন থাকবে! আপনি থাকবেন সে তো আমার সৌভাগ্যি। একটু বসুন স্যার। আমি এখনই পোষ্কার করে দিচ্ছি।
—কতক্ষণ লাগবে পরিষ্কার করতে?
—তা, স্যার, ঘণ্টাখানেক তো বটেই। কতদিন কোনও বাবু আসেননি। আপনি ততক্ষণে একটু ঘুরে ফিরে আসনু না এদিক-ওদিক।
— তা নয় যাচ্ছি। কিন্তু দুদিন থাকব। খাওয়া-দাওয়ার কী হবে?
চৌকিদার ভারী মুশকিলে পড়ে। বহুদিন এই বাংলোয় কেউ থাকেনি। খাওয়া তো দূরের ব্যাপার। এখন আমি হঠাৎ উল্কার মতো উদয় হয়ে দুখিরামকে দুদিন থাকা-খাওয়ার গল্প বললে তার তো ভিরমি খাওয়ার কথা। মাথা চুলকে বলল, হাঁড়ি-কড়া-বাসনকোসন তো সবই আছে। একটু চাল-ডাল যে লাগবে। কাছেই দোকান আছে। সব পাওয়া যায়। আমি ঘরটা পোষ্কার করেই দোকানে যাচ্ছি। তবে মুরগি পেতে হলে শহরে যেতে হবে।
—ঠিক আছে, আমি তাহলে একটু শহরের দিকে যাই। মুরগি আনি। ঘর পরিষ্কার হয়ে গেলে তুমি দুটো চাল-ডাল-তেল-মশলা নিয়ে এসো।
—ঠিক আছে, বাবু।
বলে দুখিরাম সেই দুর্গন্ধ বাংলোয় কীটপতঙ্গময় ঘরে ঢুকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ঝাড়পৌঁছ করতে শুরু করে। অন্তত ঘণ্টাখানেকের পরিশ্রম তার। তারপরও এই ঘরে রাত কাটানো যাবে কি না আমার নিজেরই সন্দেহ। রাত হলেই নাকি বাংলোর ঘরে ভূত, না কি পেনিদের নাচ শুরু হয় রোজ। ভৃত্যের নৃত্য দেখতেই তো এই ভূতবাংলোয় আমার এত পথ উজিয়ে আসা। আজ তিন বছর ধরেই সেই ভূতের নৃত্য নাকি চলছে।
জেলার এই প্রত্যন্ত এলাকায় এককালে বহু খরচ করে তৈরি করা সুদৃশ্য বাংলোটি এখন ভূতবাংলো নামেই খ্যাত। আমার ভূতফুতে একেবারেই বিশ্বাস নেই শুনে আমার এক জেলাশাসক বন্ধু বলল, তা হলে তুমি একবার লালপুর বাংলোয় রাত কাটিয়ে এসো। আজ তিন বছর হল কেউ ওই বাংলোয় থাকতে যায়নি। রাত হলেই নাকি ভূতেরা উদ্বাহু হয়ে নাচকেত্তন করে।
জেলাশাসক স্বয়ং যখন বাংলো সম্পর্কে এত বড়ো সার্টিফিকেট দিলেন তখনই ভেবেছি ব্যাপারটা একবার চর্মচক্ষে দেখে আসতে হয়। সেই কারণেই এ যাত্রা লালপুর অঞ্চলে একটা কাজের ছুতো নিয়ে আসা। বাংলোর পাস আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিল জেলাশাসক, বলেওছিল বাইরে পাহারা দিতে কয়েকজন পুলিশ পাঠিয়ে দেব। আমার বন্ধুর কোনও ক্ষতি না হয় তা দেখবে হবে তো।
হেসে বলেছি, কোনও ভাবেই উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই তোমার। ভূত আমার টিকিটিও ছুঁতে পারবে না।
বলেছি বটে কিন্তু তখনও ভাবতে পারিনি বাংলোর ভিতরে এমন ভূতগ্রস্ত অবস্থা। সারা ঘরে এমন জঞ্জাল ভরে আছে যে, মানুষ তো নয়ই, ভূতের বসবাসেরও অযোগ্য। ভূতদের কি রুচিবোধ একেবারেই নেই!
দুখিরাম তার কাজে লেগে গেল, ততক্ষণে আমি কাঁধের ব্যাগটা দুখিরামের জিম্মায় রেখে বেরিয়ে পড়ি শহরের উদ্দেশে। আসার সময় রিকশ নিয়েছিলাম। প্রায় দেড়কিলোমিটার। কিন্তু এখন সেই পথ পায়ে হেঁটে উজোতে উজোতে জায়গাটার মাহাত্ম্য বুঝতে চেষ্টা করি।
জেলার শেষপ্রান্তে ছোটো মফস্বল শহরে ব্লক, থানা, জে এল আর ও অফিস সবই আছে। খুব জমজমাটি না হলেও এই পুরোনো ধরনের শহরটিতে লোকজনের ভিড় আছে। গাড়ি বা রিকশর সংখ্যাও কম, তবে বাজারটা বড়ো। তার মধ্যে ঘুরে একটা মাঝারি মুরগি পছন্দ করে ফেলি। প্লাস্টিকের ব্যাগে তাকে ভরে বাংলোয় ফিরে দেখি প্রায় ম্যাজিক করে ফেলেছে দুখিরাম।
দুখিরামের কর্মতৎপরতায় বাংলোর ভিতরটা এতক্ষণে ভূতেদের তো বটেই, মনুষ্য বসবাসেরও যোগ্য হয়ে উঠেছে। বারান্দায় মুরগির ব্যাগটা রেখে সবে হাঁপ ছাড়ছি, সে সময় তার ডাক শুনে চোখ ফিরিয়ে দেখি সে ধুলোমাখা হাত নেড়ে বলছে, স্যার, ঘর সাফসুফ করে ফেলেছি, একবার ঢুকে দেখুন।
অবাক হয়ে বলি, এর মধ্যে হয়ে গেল।
ভেবেছিলাম সরকারি চৌকিদার কি সত্যিই ধুয়ে-পুঁছে সাফ করে ফেলবে। নিশ্চয়ই আমাকে এমন একটা ঘর উপহার দেবে যা দেখে বলব, না দুখিরাম থাকা যাবে না এ ঘরে।
কিন্তু তার পরিবর্তে প্রায় নতুন ঘরে রূপান্তরিত সেই ধুলোভর্তি ঘর। দেখেই বুঝলাম এককালে সবই ঝকঝকে ছিল। খাট-বিছানা থেকে সোফা-ডাইনিং হল সবকিছুই। সে ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে দুখিরাম স্বস্তির শ্বাস ফেলে বলল, দ্যাখেন, স্যার, আপনার পায়ের ধুলো পড়ে যদি বাংলোটা আবার লোক চলাচলের জায়গা হয়।
—ঠিক আছে, তুমি এখন দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থা করো। খুব খিদে পাচ্ছে।
জেলা শহর থেকে বেরিয়েছি সেই ভোরবেলা। ছিলাম সার্কিট হাউসের আরামে। তার পরিবর্তে এই ছোট্ট গঞ্জের ভূতবাংলোয় কতটা আরাম পাব তাই নিয়ে গবেষণা করি মনে মনে তবে আরামের চেয়ে কৌতূহলটাই বড়ো। রাতে ভূত, কিংবা পেনির নাচ দেখব এই রোমাঞ্চটাই আপাতত প্রধান।
মুরগিটার একটা ব্যবস্থা করে দুখিরাম টাকা নিয়ে চলে গেল চাল-ডাল-তেল-মশলা কেনাকাটি করতে। ততক্ষণে আমি বাংলোর বিছানায় কিছুক্ষণ এ-গোড় ও-গোড় করে বাসজার্নি আর হাঁটার ক্লান্তিটা ঝেড়ে ফেলতে থাকি শরীর থেকে। চাদরটা বেশ নোংরা দেখে সেটা সরিয়ে আমার ব্যাগ থেকে বার করি কাচা চাদর। ভূতবাংলোয় সব ঠিকঠাক পাওয়া যাবে না জেনেই তো আসা। তবু যা পেয়েছি তা-ই তো ঢের।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দুখিরাম বাজার সেরে ফিরে আসে বাংলোয়। তার এখন আরও কিছুক্ষণ লাগবে লাঞ্চ প্রস্তুত করতে। ততক্ষণে আমি বিছানা থেকে উঠে বেরিয়ে পড়ি বাংলোর পিছন দিকটায়। বেরোতেই কিন্তু প্রসন্ন হয়ে উঠল মন। আহ্, কী চমৎকার বাংলোর পরিবেশটা। এমন চমৎকার বাংলোয় কিনা শুধু ভূতেরা বাস করবে। তা আমি হতেই দেব না।
বাংলোর চারপাশটা একবার ঘুরে ফিরে দেখি। বাংলোর পিছনেই একটা সরু নদী। তাতে ক্ষীণস্রোত। তার কিনারে একঝাঁক নারকেল গাছ ঝুঁকে পড়ে সারাক্ষণ মুখ দেখে জলের আয়নায়। একটু খেয়াল করতেই দেখি নারকেলগাছের লম্বা কাণ্ডে অনেক ফোকর—তা থেকে সারাক্ষণ বেরোচ্ছে ঢুকছে টিয়ার দল। বাংলোর প্রাঙ্গণে কয়েকটা পামগাছ গম্ভীরভাবে দাঁড়িয়ে। কিছু জবা আর গোলাপের ঝাড় ফুলন্ত করে রেখেছে প্রাঙ্গণটিকে। সব মিলিয়ে থাকার পক্ষে ভারী চমৎকার কোথাও ভূতদের চিহ্নমাত্র নেই। কেন যে লোকে এটাকে ভূতবাংলো বলে ব্যবহার করে না!
সকালের কমলা রঙের রোদ্দুরে বেশ খোলতাই হয়ে উঠেছে গোটা জায়গাটাই। যে-পাশে নদী, ঠিক তার উল্টোদিকেই অনেকগুলো ঝাঁকড়া আমগাছ। কয়েকটা সুপারিগাছও সরু ঠ্যাঙে দাঁড়িয়ে চুপচাপ। তবে বেশ কিছু আগাছা থাকায় কোথাও কোথাও ঘন ঝোপ। আছট্টি, ভাঁট, নয়নতারা, শিয়ালকাঁটা। কয়েকটা বাজবরণও। একপাশে একটা বাজ পড়া তালগাছ।
বাংলোর এক কোণে একটা তালাবন্ধ ঘর দেখে উকিঝুঁকি দিই আধখোলা জানালা দিয়ে। ভিতরে অবশ্য আবর্জনা আর ভাঙা আসবাবপত্র। দুখিরামকে ডেকে জিজ্ঞাসা করি, কী আছে এই ঘরটায়?
—যা দ্যাখলেন, বাবু। বাংলোয় যা কিছু ফেলনা জিনিস, সবই ওর মধ্যে ঢুকিয়ে দি। আমি আবার কোনও কিছু ফেলে দিইনে।
—গুড। ইংরেজিতে নিজের ভালো-লাগাটা প্রকাশ করে প্রশংসা করি চৌকিদারের। এতক্ষণে মনে হয় বাংলোটা সব মিলিয়ে বেশ মনোরম। দুখিরাম স্টোভ জ্বেলে মুরগি চাপাতেই বাংলোবাস আরও রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে এই ঘোর দুপুরে। ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে রান্নায় ব্যস্ত থাকা দুখিরামকে বলি, আচ্ছা, ভূতেরা কি রোজই আসে বাংলোয়?
দুখিরাম তার নাকে কানে হাত দিয়ে বলে, স্যার, তেনাদের নিয়ে মস্করা করতে নেই। কখন কী থেকে কী হয় কে জানে। তেনারা তো আসেন না, ঘরেই থাকেন।
—ঠিক আছে, দুপুরে খাওয়ার পর তেনাদের সঙ্গে একটু গপ্পো করা যাবে’খন।
দুখিরাম চোখ বিস্ফারিত করে তাকিয়ে থাকে আমার মুখের দিকে। এরকম বে-আক্কেলে লোক বোধহয় তার জন্মে দেখেনি।
যাই হোক দুখিরাম রাঁধে ভারী চমৎকার। তার রাঁধা সরু চালের ভাত আর মুরগির ঝোল খেয়ে দারুণ একটা ঘুম দি গোটা দুপুর। বিকেলে ঝরঝরে শরীর নিয়ে দুখিরামকে বলি, কই দুখিরাম, তেনারা কখন আসবেন?
দুখিরাম কিছুই বলে না, শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকায় আমার মুখের দিকে।
— তেনাদের তুমি কখনও দেখেছ?
—না স্যার, যে সব বাবুরা তখন রাতে থাকত তাঁদের মুখে শুনিছি। তবে রাতে তেনাদের ঘুঙুরের আওয়াজ হয়। নিজির কানে শুনিছি।
—যাক, তাহলে আমারও ঘুঙুরের নাচ শোনা হবে আজ কী বলো।
দুখিরামের মুখে কথা জোগায় না।
লালপুরে এসেছি কিছু কাজ নিয়ে। সেটা কাল দুপুরে শহরে গিয়ে করব। আজ পরিপূর্ণ বিশ্রাম নেওয়াই আপাতত আমার লক্ষ্য। আমার অনেক শখের একটা হল নতুন-নতুন বাংলোয় গিয়ে রাত্রিবাস করা। প্রতিটি বাংলোই আমার কাছে ভারী উপভোগ্য মনে হয়। অভিজ্ঞতার ঝুলিও ভারী হয় আস্তে আস্তে। এর আগে আরও বহু ডাকবাংলো, সার্কিট হাউসে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা হয়েছে প্রধানত আমার চাকরির কল্যাণে। তবে ভূতবাংলোয় রাত্রিবাস এই প্রথম। সন্ধেয় দুখিরাম বলল, স্যার, রসগোল্লা খাবেন? এখানকার ছানার খাবার খুব বিখ্যাত। বিখ্যাত যখন খেতে তো হবেই। টাকা বার করে দিতেই বোম্বাই আকারের জ্যান্ত রসগোল্লা হাজির। অন্তত গণ্ডা তিনেক। স্বাভাবিকভাবে তার দু গণ্ডা দুখিরামের পেটে। চারটে খেয়েই আমার মনে হল গামা পলোয়ান হয়ে গেছি। আহ্ এমন রসগোল্লময় বিকেল কতকাল পরে!
সন্ধে হয়ে গেছে তবু দুখিরাম নিশ্চেষ্ট বসে আছে দেখে বলি, আলো-টালো কিছু জ্বালো। ইলিকাট্রিসিটি তো নেই। ল্যাম্পোট্যাম্পো কিছু আছে? না কি ভূতেদের অপেক্ষায় বসে আছো?
—এই স্যার, জ্বালি, বলে দ্রুত উঠে গিয়ে একটা ভালো ডিমলাইট জ্বেলে নিয়ে এল ঘরের মধ্যে। তারপর দুঃখ-দুঃখ গলায় বলল, অফিস থেকে তো সবই জোগান দিত। কিন্তু আপনেরা আসেন না বলে এখন দেয় না বেশি।
রাতে অবশিষ্ট মুরগি গলাধঃকরণ করে এবার মশারির ভিতর শরীর সেঁধিয়ে দেব। কষে একটা ঘুম দিতে হবে ধবধবে সাদা বিছানায়। দরজা বন্ধ করছি দেখে দুখিরাম কীরকম অদ্ভুত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, স্যার, দরকার হলে রাতে ডাকবেন কিন্তু।
হেসে বলি, না হে। দরকার হবে না। ভূত যদি আসেও তার সঙ্গে দু-দণ্ড গল্প করব খনে। অনেকদিন তেনাদের সঙ্গে দেখা হয় নাই।
দরজা বন্ধ করে নিবিয়ে দিই ডিমলাইট। পাড়াগাঁর অন্ধকার ঝাঁপিয়ে ঢুকে পড়ল ঘরের ভেতর। মশারির ঘেরাটোপে নিজেকে সেঁধিয়ে দিয়ে বালিশের আরামে সঁপে দিই নিজেকে।
বেশ জব্বর ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বোধহয়। হঠাৎ কীসের শব্দে ভেঙে গেল গাঢ় ঘুম। চোখ মেলে দেখি মশারির বাইরে ঝুপ অন্ধকার। মাথার দিকের জানালাটা খোলা ছিল, কিন্তু বোধহয় আজই অমাবস্যার রাত নইলে এমন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার কেন বাইরে। ঠিক এই সময় আমার মনে হল মশারিটা অল্প-অল্প দুলছে। কিছু দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। নিশ্চয়ই হাওয়া এই ভেবে চোখ বুজিয়ে দ্বিতীয়বার ঘুমোনো চেষ্টা করি।
কিন্তু ঘুম আসতে চাইল না সহজে, কোথায় যেন ঝুমঝুম শব্দ হচ্ছে একনাগাড়ে। ঝুমঝুম শব্দ! এই বাংলোর অন্ধকারে। ভালো করে চোখ চালিয়ে দেখতে চেষ্টা করি মশারির বাইরে কিছু দেখা যায় কিনা। কানের ভুল ভেবে চোখ বন্ধ করে অন্য চিন্তায় মন দিই। সারাদিন বেশ আলস্যে কেটেছে আজ। অনেকদিন এমন নির্ভেজাল ছুটি কাটাইনি। আজ ভূতবাংলোয় রাত কাটাতে এসে কী আরাম।
আমার চিন্তাজাল ছিঁড়ে কোথাও আবার ঝুমঝুম শব্দ। ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম। শব্দটা এগিয়ে আসছে মশারির দিকে। সত্যি না কি স্বপ্ন তা নিয়ে এক লহমা গবেষণা করি। নির্জন বাংলো। ভালো করে বন্ধ করেছি দরজা। একটা জানালাই যা খোলা। কিন্তু ঝুমুরের শব্দটা আসছে পায়ের দিক থেকে। একটানা ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম। ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম। শব্দটা এবার বেশ জোরেই হচ্ছে কাছেই কোথাও। কী মুশকিল। সত্যিই ভূতের নাচকেত্তন শুরু হবে নাকি!
ভাবনাটা ঝেড়ে ফেলে চট করে বিছানায় লাফ দিয়ে উঠি। ভূতেদের সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য আমার একমাত্র অস্ত্র তিন ব্যাটারির একটা টর্চলাইট। বেশ জোরালো আলো বেরোয় তার কাচ ভেদ করে। টর্চ জ্বালতেই কি আশ্চর্য, সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল সেই ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম আমি তৎক্ষণাৎ লাফ দিয়ে নামি মশারি তুলে। শব্দের উৎস আমাকে জানতেই হবে। মশারির বাইরে এসে তন্নতন্ন খুঁজতে থাকি কে ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম। করে বাইরে মেঝেয় শব্দ তুলছে।
কী অবাক কাণ্ড কোথাও কিচ্ছু নেই। শুধু জানালার বাইরে হাওয়ার সোঁ সোঁ শব্দ। বাকি পৃথিবী স্তব্ধ, শুনশান। টর্চ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গোটা ঘর খুঁজে দেখি কে বা কারা এই শব্দের জন্মদাতা। কিন্তু না, টর্চ জ্বালিয়ে আঁতিপাতি খোঁজার কোনও ফলই ফলল না। একবার জানালা দিয়ে বাইরেও আলো ফেলি। টর্চটাকে দু চক্কর ঘুরিয়ে শুধু নিরীহ পৃথিবীটাকেই চোখে পড়ল। কেউ কোথাও আমাকে ভয় দেখানোর জন্যে জেগে নেই এই মধ্যরাতে।
টর্চ নিবিয়ে আবার ঢুকে পড়ি বিছানায়। নিশ্চয়ই দুখিরামের কাছে ভূতের গল্প শুনে প্রভাবিত হয়েছি কোনওভাবে। ভূত যদি থাকবেই তা হলে টর্চ জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গে কেনই বা থেমে যাবে শব্দটা! আমি কি সত্যিই এতদিনে ভয় পেতে শুরু করেছি। সে তো তাহলে ভারী লজ্জার কথা। অমনি পাশ ফিরে আবার ঘুমোনোর চেষ্টা চালাই। এক দুই তিন….
পরক্ষণেই আবার ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম, একটু থেমে ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম, আবার একটু থেমে ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম। শব্দটা এবার খুব কাছেই। প্রায় মশারির ধার ঘেঁসে। কেউ কি দাঁড়িয়ে আছে মশারির ধার ঘেঁসে! কে দাঁড়িয়ে আছে, কেনই বা! কোনও একটা ছায়ামূর্তি কি এসে দাঁড়িয়ে আছে মশারির কোনা ধরে! একটু আগেই বিছানা ছেড়ে নীচে নেমে তন্নতন্ন দেখে এসেছি গোটা ঘর। কেউ কোথাও নেই, থাকার কোনও সম্ভাবনাও নেই। ছোট্ট ঘর। মাঝখানে একটা সিঙ্গল বেড খাট ছাড়া আর কিছুই নেই ঘরের মধ্যে। বাইরের লোক আসার কোনও প্রশ্নই নেই। তা হলে কেন এই ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম শব্দ।
জোর করে ঘুমোবার চেষ্টা করি। আমার মনে হয় এবার চোখে ঘুম এলেই একঘুমে পুইয়ে যাবে রাত। ব্যস, তাহলেই ভয় কেটে যাবে মনের ভিতর থেকে। আর একটা রাত থাকতে পারলেই ভূতের ভয় যাবে কেটে। অতএব টেনে ঘুমই এখন একমাত্র ওষুধ।
তখনই আবার সেই ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম শব্দ। তক্ষুনি লাফিয়ে নেমে পড়ি মশারি তুলে। টর্চটা জ্বেলে এবার ধরবই ধরব ভূতটাকে। ভূত না কি পেনি, কে জানে। রাতে তেনারাই নাচে কি না তা আজ জানতেই হবে। কিন্তু টর্চ জ্বালার আগেই বোধহয় আমার লাফিয়ে নামার শব্দ পেয়েছেন তিনি। তাতেই পালিয়ে গেল সেই ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম শব্দ। যেন কোনও একটি মেয়ে পায়ের মল বাজিয়ে মিলিয়ে গেল কোন অলক্ষ্যে। টর্চ জ্বেলে আবার খুঁজতে থাকি শব্দের উৎস। মেঝের সর্বত্র ফুঁড়ে ফেলতে থাকি জোরালো আলোয়।
দেওয়ালে কোনও ফাটল আছে কি না তা পরখ করতে শুরু করে দিই দেওয়ালে ঘা মেরে মেরে। কিন্তু না, কোথাও অলৌকিকতার চিহ্নমাত্র নেই।
একবার ভাবলাম চৌকিদারকে ডাকব কি না। এই নাচের শব্দই নিশ্চয় চৌকিদার রোজ রাতে শোনে। কিন্তু ভাবনাটা মিলিয়ে গেল আবার। ভয় পেয়ে চৌকিদারকেই যদি ডাকি তা হলে তো লোকটা খুবই মজা উপভোগ করবে। না, চৌকিদারকে ডাকা চলবে না।
কিছুক্ষণ পর ভারী বোকা বনে গিয়ে টর্চ নিবিয়ে আবার শুয়ে পড়ি বিছানায়। নাহ্, খুব জ্বালাচ্ছে তো ভূতটা। সারাদিন থাকলাম বিছানায়, তখন কোনও ভূত কিংবা পেনি তো জোটেনি কপালে। রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে তখনই কি না তেনাদের দৌরাত্ম্য!
কিছুক্ষণ ঘনঘোর নৈঃশব্দ্য। যে নাচ করছিল সে যেন বিশ্রাম নিচ্ছে কিছুক্ষণের জন্য। আমিও শুয়ে আছি চোখের পাতা মেলে। হঠাৎ মনে হল ঘরের মধ্যে এক অশরীরী মূর্তি। দুলছে গাছের পাতা যেমন দোলে। আমি অপেক্ষা করতে থাকি। আর একটু কাছে আসুক তারপরেই এস্পার ওস্পার করব। কিন্তু ছায়ামূর্তিটা পিছিয়ে গেল সহসা। একেবারে দেওয়ালের কাছ ঘেঁসে। সেখানে হঠাৎই শুরু হয়ে গেল ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম। একটু পরে আবার ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম।
বেশ ঘেমে যাচ্ছি এবারে। ছায়ামূর্তিটা আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে নাকি! কেন যে কেউ গত তিনবছর এ বাংলোয় থাকতে আসেনি তা এবারে উপলব্ধি করছি বেশ। কিন্তু যে-আমি কখনও ভূতে বিশ্বাস করিনি, ভূত নিয়ে ইয়ার্কি করেছি বন্ধুদের সঙ্গে, এমনকী এক দুদে প্রশাসক—এই জেলার জেলাশাসকের সঙ্গেও প্রায় বাজি ফেলার মতো চ্যালেঞ্জ নিয়ে থাকতে এসেছি লালপুর বনবাংলোয়, সেই আমিই কি না কাল সকালে উঠে বলব, না মশাই, সত্যিই ভূত বাস করে এই বাংলোয়!
আমি দ্রুত টর্চ জ্বালিয়ে দেখতে থাকি গোটা ঘর, কিন্তু কী আশ্চর্য কোথাও কিচ্ছু নেই, এমনকী থেমে যাচ্ছে ঘুঙুরের আওয়াজও। এ যে পি সি সরকারের ম্যাজিকের চেয়েও বিস্ময়কর!
টর্চ নিবিয়ে অপেক্ষা করতে থাকি সেই নাচুনে ছায়ামূর্তির জন্যে। চোখ বুজিয়ে থাকি যাতে সে ছায়ামূর্তির চেহারা দেখে ভয় না পাই। তবু গলগল করে ঘাম বেরোচ্ছে, ঘামে ভিজে যাচ্ছে বিছানা-বালিশ। বুকের ভেতর কোথাও বিস্ফোরণ ঘটছে একের পর এক, আর বুঝতে পারছি প্রবল ভয়ে সেঁধিয়ে আসছে হাত-পা, জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছি চোখ বুজিয়ে। তার মানে ভয় পেয়েছি বেশ। ভূতে বিশ্বাস করি না বলে ভূত আরও জাপ্টে ধরেছে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে।
তখনই আবার সেই শব্দ ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম/ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম/ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম। একটানা শব্দ ক্রমশ এগিয়ে আসছে আমার পায়ের দিকে মশারির দিকে। চোখ খুলব-না খুলব না করেও খুলতে বাধ্য হলাম শেষ পর্যন্ত। কেন না পায়ের কাছে মশারিটা দুলে-দুলে উঠছে বারবার। কেউ যেন ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে আমার শরীর। ততক্ষণে সেই ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম এসে পৌঁছেছে পায়ের কাছের মশারিতে। দেখি সেই অশরীরী একেবারে আমার কাছেই। যেন এই মুহূর্তে জাপটে ধরবে আমার গলা।
গলায় তখন স্বরটুকুও অবশিষ্ট নেই আর। শরীরে শক্তিও নেই একটু। টর্চটা জ্বালাব সে শক্তিও নেই হাতে। জীবনে এত ভয় কখনও পাইনি। পাবার ফুরসতও হয়নি কেন না এত কাছ থেকে ভূতও কখনও পাইনি। কিন্তু পায়ের কাছে একনাগাড়ে ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম হয়েই চলেছে, আর আমি ভয়ে কাঠ হয়ে শুয়ে আছি এ দৃশ্যও কখনও ভাবিনি তো।
পরক্ষণে ঠিক করলাম যা হয় হবে, ভূতের সঙ্গে লড়াই করে তবে মরব। তৎক্ষণাৎ শরীরে শক্তি সঞ্চয় করতে চেষ্টা করি। টর্চটা খুঁজব, না কি ঝাঁপিয়ে পড়ব ছায়ামূর্তির উপর তা ঠিক করতে দু-এক মুহূর্ত সময় নিই, পরক্ষণে উঠে বসে ঝাঁপিয়ে পড়ি মশারি সমেত। সামনেই দাঁড়িয়েছিল ছায়ামূর্তিটা, তাকে জড়িয়ে ধরব নিশ্চিত ছিলাম। কিন্তু কী হল, তাকে তো ধরতে পারলামই না, উপরন্তু মশারিসুদ্ধ পড়লাম মেঝেয়। সশব্দে। হাঁটুতে চোটও পেলাম বেশ। ঘুঙুরের শব্দও মিলিয়ে গেল সুইচ অফ করা আলোর মতো।
কোনও রকমে হাঁচড়পাঁচড় করে বেরিয়ে আসি মশারির বাইরে। হাঁটুর ব্যথায় কাতরাচ্ছি তখন। আর একটু হলেই দেওয়ালে ঠুকে যেত মাথাটা। তাহলে আরও বেশি জখম হতাম নিশ্চিত। অন্ধকারে একবুক আতঙ্ক নিয়ে তখন ভাবছি বাইরে বেরিয়ে ডাকব চৌকিদারকে। বলব, বাকি রাত বাইরে কাটাব। তারপর ভোর হলেই রওনা দেব বাড়ির পথে। বেঘোরে প্রাণ দেওয়ার কোনও মানে হয় না। হাত যে ডিম নাইট আর দেখা নাইটা খুঁজে জ্বালতে যাব সে সময় আবার সেই ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম। লাফিয়ে উঠি সেই মুহূর্তে। ভূতটা একেবারে পাশেই কোথাও। হাতের দেশলাই কাঠিটাও ঠকঠক করে কাঁপছে তখন। তবু ভয় পেয়ে মরে যাওয়ার চেয়ে ডিমলাইটটা জ্বালানোই শ্রেয়। কাঁপা কাঁপা হাতে আলোটা জ্বালতেই বুকের সাহস ফিরে এল। ভূতেরা আলোয় জারিজুরি খাটাতে পারে না বলেই জানি।
উঠে দাঁড়িয়েছি সবে এমন সময় আবার ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম। তারপর আবার ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম। বেশ অবাক হওয়ার পালা তখন। এত আলোতেও কিনা ভূতের নাচ ঘরের মধ্যে চোখ চালিয়ে ভূতটা কোথায় তখন খুঁজছি, দেখি কি মশারির মধ্যে সেই শব্দ ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম। ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম। কী একটা যেন মশারির মধ্যে জড়িয়ে শব্দ তুলছে ঝুমুর ঝুম ঝুমুর ঝুম। তক্ষুণি ডিমলাইট হাতে নিয়ে গিয়ে চোখ পাততেই দেখি কিছু একটা আটকে পড়েছে মশারির মধ্যে। ডিমলাইট পাশে রেখে ততক্ষণে আবিষ্কার করেছি মশারির ভিতরে একটা ইঁদুর। বেশ বড়ো আকারের। তার শরীরে বাঁধা একটি ঘুঙুর।
সঙ্গে সঙ্গে সবটাই টিউবলাইটের আলোর মত পরিষ্কার। এই ঘুঙুরটা নিশ্চয়ই কেউ বেঁধে দিয়েছে ইঁদুরটার গায়ে। কোনও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যেই। ইঁদুরটাকে মশারিসুদ্ধ ধরে বাইরে বেরিয়ে ডাকাডাকি করে তুলি চৌকিদারকে। বলি, কী ব্যাপার বলো তো দুখিরাম! এটা কে ঢুকিয়ে দিয়েছে ঘরে!
দুখিরাম প্রথমে অস্বীকার করার চেষ্টা করছিল, পরে ধমক দিতেই হাউমাউ করে কেঁদে বলল, স্যার, ওই যে ওরা।
—কারা! আমার স্বরে তখন বিস্ময়।
জেরায় জানা গেল বাংলোর পিছনে যে আর একটা আবর্জনাভর্তি ঘর আছে সেটা এই এলাকার কয়েকজন কুখ্যাত ডাকাতের স্টোররুম। বাংলোয় যেন কেউ না আসে সে কারণেই তারা এই ফন্দি করে গত তিনবছরে কাউকে বাংলোর কাছে ঘেঁসতে দেয়নি। রাতে ডাকাতি করে তাদের মালপত্র জমা রাখে এই নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে। পরে সুবিধামতো সময়ে ভাগযোগ করে নিজেদের মধ্যে। দুখিরাম প্রথমে আপত্তি করেছিল, পরে তাদের হুমকিতে বাধ্য হয় তাদের পাপকাজের শরিক হতে।
বাংলো থেকে ফিরে জেলাশাসককে জানাই সব ঘটনা। দুখিরামকে জেরা করতেই যাবতীয় ডাকাতদের নাম ঠিকানা পেয়ে যান জেলাশাসক। আমাকে একলক্ষ ধন্যবাদ দিয়ে বললেন, জানেন, এই রহস্য ভেদ করতে কতজনকে পাঠিয়েছি, সবাই মাঝরাতে আতঙ্কে নীল হয়ে বেরিয়ে এসেছে বাইরে।
আমি অবশ্য আমার ভয় পাওয়ার ঘটনাটা বেমালুম চেপে গেলাম। তবে এটাও বুঝলাম মানুষ ভয় পেলে অন্ধকারে অশরীরীর উপস্থিতিও দেখতে পায়। কোনও অশরীরী না থাকলেও!
