উপন্যাস
গল্প
উপন্যাস

অলিন্দে অশরীরী – ২

দুই

নীচে নেমে যখন দুজনে রওনা হতে পারল ঠিক তিনটে বেজে পঁয়ত্রিশ। সায়ন চাইছিল না, তবু গাড়িতে ওঠার সময় গার্গী ব্যাগদুটো তুলে নিল গাড়ির মধ্যে। অনেক দরকারি জিনিস আছে ওঠার মধ্যে। কখন কী দরকার হয়।

সকালে যখন শহরে ঢুকেছিল, তখন প্রচুর রিকশ, টোটো আর গাড়ির চাপ ছিল, এখন একটু কম। তবে শহরের যে-পথে ঢুকেছিল, এখন চলেছে তার ঠিক বিপরীত পথে।

জেলাশহরগুলিতেও এখন রাস্তার ওপর বা রাস্তা থেকে একটু ভিতরে গজিয়ে উঠেছে বড়ো বড়ো অ্যাপার্টমেন্ট। দোতলা-তিনতলা বাড়িরও কমতি নেই। রাস্তাগুলো সামান্য খানাখন্দ ভরা হলেও মোটামুটি চলাফেরা করা যায় বেশি ঝাঁকুনি না-খেয়ে

শহর পার হয়ে ফাঁকা রাস্তায় পড়তেই রামলাল আবার স্পিড তুলল গাড়িতে।

গার্গী হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল, সত্যিই ভূত আছে ওখানে?

—ভূত আছে কি না তা ওখানে না গিয়ে বলব কী করে। তবে যারা ইদানীং ওখানে গিয়ে রাত কাটাচ্ছে, সবারই কিছু না কিছু অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছে।

—তারপর? যদি আমরা কিছু না-দেখতে পাই? এতটা জার্নি করে এলাম!

—যদি কোনও অভিজ্ঞতা নাও হয়, শুধু রাজবাড়িই না হয় দেখে আসব। কেন, তোমার রাজবাড়ি দেখতে ইচ্ছে করে না? রাজা-মন্ত্রী-রাজপুত্রদের কথা পড়েছি রূপকথার বইতে। তখন থেকেই ইচ্ছে করত রাজা-মন্ত্রীদের সত্যিই কীরকম দেখতে তা নিজের চোখে দেখা। ইচ্ছে হত রাজপুত্র হয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে উদ্ধার করে নিয়ে আসি রাজকন্যাকে।

গার্গী হেসে বলল, আমিও রূপকথার বই কম পড়িনি। তবে ছেলেদের যেমন রাজপুত্র হতে ইচ্ছে হয়, আমার কখনও রাজকন্যা হতে ইচ্ছে হয়নি। রাজকন্যা তো রাক্ষসদের ডেরায় বন্দিনী ছিল। তা আমার খুব অপছন্দের বিষয়।

সায়ন হেসে বলল, ঠিক, এটা তো কখনও ভাবিনি আগে। কিন্তু রাজপুত্রের শৌর্যবীর্যে মুগ্ধ হতে নিশ্চয়?

—তা হতাম বইকি। যাক সে কথা, কিন্তু এখন তো সেই বয়স আর নেই।

গাড়ি তখন ছুটে চলেছে দু-পাশের মাঠখেত ফেলে সামনের দিগন্ত লক্ষ করে। গ্রামবাংলার এই ছবি অতি পরিচিত, তবু যেন চিরনতুন। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ, মাঝে কয়েকদিন বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় এখন সকালে-সন্ধেয় বাতাসে সামান্য ঠান্ডার আমেজ। কিন্তু দুপুরে বেশ রোদ।

টানা ঘণ্টাখানেক পিচপথ ফুরিয়ে ফেলার পর হঠাৎ ডানদিকে পথের ধারে লেখা ‘আলতাপুর রাজবাড়ি’। অমনি ডাইনে বাঁক নিয়ে ড্রাইভার ঢুকে পড়ল অপেক্ষাকৃত সরু মোরাম রাস্তায়। রাস্তার দুপাশে মাঝেমাঝে পামগাছ। তাতে রাস্তার সৌন্দর্য অপরূপ মারকাটারি।

প্রায় এক কিলোমিটার মোরাম পথ পেরিয়ে যে-দৃশ্যের মুখোমুখি হল ওরা তা দেখে গার্গীর মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, বাহ্।

সামনে তখন পাঁচিল ঘেরা একটা লম্বা প্যাটার্নের দোতলা অট্টালিকা। এখনকার চারতলা বাড়ির সমান উঁচু। বাড়িটার রং পোড়ামাটির, খুব উঁচু ভিত। ভিতে উঠতে গেলে উঁচু সিঁড়ি, সেই সিঁড়ি বেয়ে উঠলে তবে একতলার বারান্দা।

মোরাম-বিছোন রাস্তাটা পাঁচিলের ভিতর ঢুকে সোজা চলে গেছে রাজবাড়ির সিঁড়ি পর্যন্ত। মোরামপথের দু-ধারে সারি সারি অনেকগুলি পামগাছ, তার কয়েকটির শুধু কাণ্ডটি দণ্ডায়মান, মাথাটা কাটা যাওয়ায় দেখাচ্ছে কন্দকাটার মতো। নিশ্চয় বাজ পড়েছিল কখনও।

মোরাম রাস্তার দুপাশে চমৎকার সবুজ ঘাসের লন, তার মধ্যে কিছু ফুলের কেয়ারি। তবে ভিতরে লোকজন আছে কি না তা বোঝা যাচ্ছে না বাইরে থেকে।

গার্গীও সেই কথা উচ্চারণ করল, রাজবাড়ি, কিন্তু জনহীন।

পাঁচিলের গেটের এপাশে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি কিছুক্ষণ দেখে সায়ন বলল, এককালে হয়তো খুব রমরমা ছিল রাজবাড়ির, এখন মস্ত বড়ো বিল্ডিংটাই পড়ে আছে রাজাদের স্মৃতি বহন করে। ঠিক আছে, দেখা যাক ভিতরে কেউ আছে নিশ্চয়ই। রামলাল, তুমি একবার হর্ন দাও তো।

হর্ন বাজাতেই গেটের দুপাশ থেকে ছুটে এল দুজন যুবক, তার মধ্যে একজন খুব রোগা, মাথায় মস্ত টাক, অন্যজন বেশ বলশালী, মুখে চাপদাড়ি। সায়ন জেনে নিল টাকমাথা যুবকের নাম বিল্টু। চাপদাড়ির নাম নাকি লোকের মুখে মুখে এখন ‘চাপ’। গেট খুলে দিয়ে চাপ বলল, থাকবেন রাতে?

গাড়ি ভিতরে ঢুকতে সায়ন নেমে এল, মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, না, রাজবাড়িটা একবার ঘুরে ফিরে দেখতে চাই। এত নাম শুনেছি আলতাপুরের রাজবাড়ির।

‘থাকবে না’ শুনে দুজনের কেউই ঠিক সন্তুষ্ট হল না।

কী ভেবে সায়ন জিজ্ঞাসা করল, রাতে থাকার ঘরগুলো কীরকম?

বিল্টু অমনি ভারী উৎসাহ নিয়ে বলে, চারটে স্যুট আছে, প্রতি স্যুটে দুটো করে ঘর। অ্যাটাচড় বাথরুম। তা ছাড়া আছে আরও চারটে বড়ো বড়ো রুম। সব ঘরেই অ্যাটাচড বাথরুম।

—কত করে ভাড়া?

—এখন তো অফ সিজন। স্যুট দু-হাজার টাকা প্রতিরাত। রুম এক হাজার টাকা প্রতিরাত। সায়ন চমৎকৃত হয়, তা হল সিজনটাইম কখন?

—আজ্ঞে পুজোর আগে থেকে ফেব্রুয়ারি।

—তখন ভাড়া কত?

— আজ্ঞে স্যুট চার হাজার টাকা একরাত। রুম দু-হাজার টাকা প্রতিরাত। কোনটা নেবেন? –না, আমরা অন্য জায়গায় উঠেছি। শুধু ভিতরটা ঘুরে ফিরে দেখব।

চাপ অমনি চেঁচিয়ে ডাকল, বসন্তদা।

বলেই জিজ্ঞাসা করল, রাজবাড়ি দেখে বেরিয়ে তো পিপাসা লাগবে? তখন চা খাবেন না? গার্গী উৎসাহিত হয়, চা পাওয়া যায় এখানে?

চাপও উল্লসিত, এখানে পাওয়া যায় না, ম্যাডাম। গঞ্জ থেকে আনতে হবে। ফ্লাস্কে করে নিয়ে আসব। এখানে ভালো শিঙাড়া পাওয়া যায়। লুডোর ছক্কার মতো চৌকো চৌকো আলুর কুচি দিয়ে তরকারিতে ঠাসা। আপনি টাকা দিলেই নিয়ে আসতে পারি। দুটো দুটো চারটে।

সায়ন অমনি পকেট থেকে একশো টাকার নোট বার করে বলল, তা হলে তিন কাপ চা আর ছটা শিঙাড়া। আমাদের ড্রাইভার আছে।

বিল্টু অমনি বলল, চা অর্ডিনারি, না ইস্পেশাল? স্যার? ইস্পেশালের চা ডবল, দামও ডবল। —তা হলে স্পেশাল চা-ই তিনকাপ, বলে নোটটা চাপের দিকে বাড়াতেই বিল্টু ছোঁ মেরে সায়নের হাত থেকে টাকাটা নিয়ে পিছন ফিরে হাঁটা দিয়ে বলল, স্যার, যাব আর আসব।

চাপদাড়ি অমনি প্রায় আর্তনাদ করে বলে উঠল, স্যার ওকে টাকাটা দিলেন? আমি অর্ডারটা নিলাম। আমি উড়ে যেতাম উড়ে আসতাম। ও ভেসে যাবে ভেসে আসবে।

—মানে? সায়ন বিস্মিত।

—মানে স্যার, আমার সাইকেল আছে, উড়ে যেতাম। ওর তো পা-গাড়ি। মেঘের মতো ভাসতে ভাসতে যাবে। কখন ফিরবে তার কি ঠিক আছে?

গার্গী হেসে বলল, ঠিক আছে, আমরা আগে রাজবাড়ি দেখে নিই।

—স্যার ডিনার লাগলে আমাকেই বলবেন কিন্তু। –ঠিক আছে, আগে ভিতরে ঢুকতে দাও তো।

—ঠিক আছে আসুন, স্যার-

বলে, ‘বসন্তদা, বসন্তদা’ বলে বারদুই হাঁক দেওয়ার পরেও যখন কাউকে দেখা গেল না, চাপদাড়ি বিড়বিড় করে বলল, বসন্তদা এবার বুড়ো হয়ে গেছে। কাজে মন নেই।

—আসুন, স্যার-

চাপদাড়ির পিছুপিছু সায়ন চলে এল গেট থেকে অদূরে একটা ছোট্ট একতলা বাড়িতে। অনেকটা আউটহাউসের মতো দেখতে, তার মধ্যে একটা খাটিয়ার মতো, তাতে আড় হয়ে ঝিমোচ্ছিল একজন প্রৌঢ়। চাপদাড়ির হাঁকডাকে ঝিমুনি ভেঙে উঠে বসল সেই বসন্তদা।

ঘর থেকে ধীরপায়ে বেরিয়ে এসে সেলাম ঠুকে বলল, স্যার, আমার নাম বসন্ত। বসন্ত দিগার। আসুন—

সায়ন দেখল বসন্ত দিগারের মুখটা বেশ অদ্ভুত। গায়ের রং গমবর্ণ, নাক সামান্য ভোঁতা, চোখদুটো অস্বাভাবিক রকমের উজ্জ্বল, হাঁটার ভঙ্গিমাও বেশ অন্যরকম।

ততক্ষণে গাড়ি থেকে নেমে এসেছে গার্গীও। রাজবাড়ির গঠন ও কারুকাজ দেখে গার্গীর চোখের পলক পড়ছিল না। বিশাল অট্টালিকার একদিক থেকে অন্যদিকের বিস্তার দেখতে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে হয়। হাঁটতে হাঁটতে একা চলে এসেছে বসন্ত দিগারের ঘরের সামনে। এক পলক তার ঘরের দিকে নজর রেখে নিচু গলায় গার্গী বলল, লোকটা কিন্তু বেশ ইন্টারেস্টিং। সারা ঘরে কত টুকিটাকি পুরনো জিনিসের আখড়া।

সায়ন খেয়াল করেনি, বলল, কী দেখলে?

—একটা ভাঙা পাম্পসেট, বহুকালের পুরোনো একরাশ ক্যাসেট আর সিডি, একটা সাতপুরোনো হারমোনিয়াম, একটা ভাঙা স্টিরিও সাউন্ড সিস্টেম, তার স্পিকার নেই। একটা আদ্যিকালের কলের গান। একটা ভাঙা তানপুরা। এরকম কত কী!

সায়ন গলা নামিয়ে বলল, কী আশ্চর্য, লোকটা কি গানের ইনস্ট্রুমেন্ট রিপেয়ার করে নাকি? বসন্ত তার ঘরের দরজা ভেজিয়ে দিয়ে সায়নদের নিয়ে চলল উত্তরদিক বরাবর।

গার্গী এক ঝলক দেখে নিল রামলাল গাড়িটা নিয়ে চলে গেছে একেবারে রাজবাড়ির গ্যারেজের কাছে। গ্যারেজটা বিশাল, কিন্তু গাড়ি নেই। শুধু একটা পুরোনো আমলের গাড়ি রাজবাড়ির ভাঙা গ্যারেজের ভিতর মাটিতে রূপান্তরিত হওয়ার অপেক্ষায়

চলতে শুরু করে বসন্ত হঠাৎ বলল, ওরা দুজন গেটম্যান, আমি চৌকিদার। ওদের যেন বেশি লাই দেবেন না।

সায়ন আশ্চর্য হয়ে বলল, কেন?

সে কথার উত্তর না দিয়ে বসন্ত বলল, আপনারা কি রাতে থাকবেন?

—না, রাজবাড়ি দেখব। আমরা অন্য জায়গায় উঠেছি।

—তা ভালো।

নতুন বাবুরা অন্য জায়গায় উঠেছেন জেনে লোকটিকে বিশেষ প্রসন্ন দেখাল। কেন কে জানে। বলল, আসুন তা হলে। পঞ্চাশ টাকা করে টিকিট। ভিতরে গাড়ি রাখার জন্য পঁচিশ টাকা। গাইডের আলাদা খরচ। সন্ধে ছটায় রাজবাড়ির গেট বন্ধ। পাঁচিলের গেট আরও দু-ঘণ্টা খোলা থাকে।

অর্থাৎ রাজবাড়ির ভিতরে যা দেখার তা সন্ধে ছ-টার মধ্যে দেখে বেরিয়ে আসতে হবে। কিন্তু রাজবাড়ির প্রশস্ত অঙ্গনে থাকা যাবে রাত্রি আটটা পর্যন্ত।

বিকেল পৌনে পাঁচটা। এখনও সোয়া এক ঘণ্টা সময় আছে। চৌকিদারের কাছে একশো পঁচিশ টাকা জমা দিতে গেলে তিনি হাঁ হাঁ করে উঠে বললেন, আমি কি টাকা নিতে পারি? টাকা নেবেন রমণীবাবু।

একটা দোতলা বাড়ির সামনে এসে বসন্ত বলল, ওই দেখুন, নীচের তলায় লেখা আছে, বুকিং রুম। ওখানে চলে যান। টিকিট নে আসুন।

দোতলা বাড়িটা ছোটো আকারের হলেও এই বাড়িটার গঠনসৌকর্য চমৎকার। রাজবাড়ির আদলের সঙ্গে অনেকটাই মিল এই বাড়িটারও। তার একতলায় দুপাশে দুটো ঘর, একদিকে ছোট্ট অফিস, তার ওপরে লেখা ইংরেজিতে ‘বুকিং’। অন্যদিকের ঘরটির দরজার ওপরে লেখা ‘ভিজিটর’। দুটি ঘরের মাঝখান দিয়ে ওপরে ওঠার সিঁড়ি। অফিসঘরের ভিতরে চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসে বছর পঁয়তাল্লিশের ধুতি-শার্ট পরা একজন লোক, সামনের দুটো দাঁত নেই, মাথার চুলও কাঁচাপাকা। চোখে স্টিলের ফ্রেমের চশমা। সায়নকে দেখে চোখ পিটপিট করে বললেন, থাকবেন না দেখবেন?

— দেখব।

— গাড়ি আছে সঙ্গে?

সায়ন ঘাড় নাড়তে একশো পঁচিশ টাকার বিনিময়ে পাওয়া গেল রাজবাড়ির ভিতরে যাওয়ার ছাড়পত্র।

দু’খানা রঙিন টিকিট হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলে বসন্ত আবার বলল, গাইড নেবেন, না নিজেরা দেখবেন?

— গাইড আছে নাকি?

গার্গীর প্রশ্নের উত্তরে বসন্ত তাকায় এদিক-ওদিক। বিড়বিড় করে বলল, সে ব্যাটা যে কোথায় গেল। ঘনু—। লোক হয় না তা ঘনু তো ঘুমোবেই। জনহীন প্রান্তরের মধ্যে এত বড়ো একটি রাজবাড়ি একা দাঁড়িয়ে আছে নিঃসঙ্গ হয়ে। সায়ন জিজ্ঞাসা করল, লোক হয় না কেন?

— কেন আবার? একরাত্তির থাকুন। বুঝবেন?

সায়ন আর গার্গী চোখাচোখি করে। গার্গী জিজ্ঞাসা করে, কী বুঝব?

বসন্তকে কুপিত দেখায়, আমাকে দে বলাতে চাইছেন কেন? থাকলে বুঝবেন?

বলেই হাঁক দিল, ঘনু, ঘনু–

সেই মুহূর্তে আশেপাশে কাউকে না দেখে বসন্ত আবার বিড়বিড় করে বলল, কোথায় যে যায় ব্যাটা!