এ কি অলৌকিক
ইলোমবাজার জায়গাটা ঠিক কোথায় তা জানা ছিল না না-জয়ের, না-পল্লবের। অথচ কলকাতা থেকে দূরবর্তী সেই এলাকায়, অচেনা অজানা পটভূমির এক অফিসে কোম্পানির পক্ষ থেকে অডিট করতে যেতে হবে তাদের দুজনকে। দোদুল্যমান হৃদয়ে এর কাছে ওর কাছে জিজ্ঞাসা করে যা খবর পাওয়া গেল তাতে সেখানে পৌঁছোনো খুব একটা দুরূহ জার্নি বলে মনে হল না ওদের।
অতএব এক হেমন্তের ভোরবেলায় জয় আর পল্লব ব্যাগবাক্স সহ বাড়ি থেকে রওনা হয়ে হাওড়ায় চেপে বসল শান্তিনিকেতন যাওয়ার ট্রেনে। বাইরে চমৎকার আবহাওয়া, হেমন্তকাল ঠিকই, তবে প্রথম-হেমন্তে কোনও হিমের পরশ থাকে না, তেমন গরমও থাকে না অবশ্য, অতএব বেশ মনোরম জর্নি। ট্রেনে বসেই দুজনে আলোচনা করে নিল আজ দিনের বেলাটা তারা দেখবে শান্তিনিকেতন ও তার আশপাশ, তারপর বিকেলের বাসে চড়ে তারা পৌঁছোবে ইলামবাজারে।
যাকে বলে এক ঢিলে দুটো আম পাড়া।
শান্তিনিকেতনে তারা এর আগে কখনও যায়নি, তাই স্নিগ্ধ-স্নিগ্ধ মেজাজে বোলপুর স্টেশনে নেমে দরদাম করে উঠে পড়ল একটা রিকশয়। রাস্তা মসৃণ হলে রিকশ-জার্নি বেশ আরামদায়ক, রিকশঅলাটার নামটাও পেশ জম্পেশ, ভুলভুলি। কী জানি বুলবুলির অপভ্রংশ কি না। কিন্তু তার কথাবার্তা বেশ সিপাহি-সিপাহি ধরনের। সেই সিপাহি-ভুলভুলির রিকশয় উঠে তার সঙ্গে ‘রবিন্দরনাথ’ নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করতে করতে দুজনে দেদার ঘুরল রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত জায়গাটিতে।
ইস কী সুন্দর এই শান্তিনিকেতন! আম্রকুঞ্জে গিয়ে বড়ো করে নিশ্বাস নিলে যেন আরও একটু টাটকা হয়ে ওঠা যায়। রিকশটা জায়গামতো হল্ট করিয়ে পায়ে হেঁটে একের পর এক দেখতে শুরু করল বিখ্যাত বাড়িগুলো। সিপাহি-ভুলভুলি বলেছে, বাবু, শামুলি দেখবেন, উদ্যন দেখবেন-
তার কথার খেই ধরে এখানে-ওখানে দেখতে দেখতে একটা ছোট্ট বাড়ি ভারী পছন্দ হল ওদের, সামনে-পিছনে গাছে ঢাকা, জয় কাছে গিয়ে কী সব পড়ে টড়ে নিয়ে বলল, এইটে ভুলভুলি যাকে বলেছিল উদ্যান।
তারপর আরও ঘুরল, আবিষ্কার করল সেই সুপরিচিত ছাতিমতলা, ঘুরতে ঘুরতে দেখল ভুবনডাঙার মাঠ, দেখল সাঁওতাল পল্লি, দেখল বইতে পড়া সেই ‘খোয়াই’।
যেমন দেখল, তেমনই একটার পর একটা ফোটো তুলল ক্যামেরায়।
ক্যামেরায় তুলে রাখার একটা সুবিধে হল জায়গাটার অনেক দৃশ্য কিছুকাল পরে বিস্মৃত হতে চাইলেও ফোটো দেখলে ফিরে আসে স্মৃতির সম্ভার।
তারই মাঝখানে একটা ঝকঝকে চেহারার হোটেলে ঢুকে প্রাণের ফূর্তি নিয়ে খেল সাদা ধবধবে ভাত, সুস্বাদু ডাল, সরু সরু কুড়মুড়ে আলুভাজা, আলু-বেগুনের চমৎকার তরকারি, পারসে মাছের ঝাল আর টম্যাটোর চাটনি।
হোটেলটা ভালো আপ্যায়ন জানে। দুটো বয় সারাক্ষণ যাচাই করছে, স্যার, আর কিছু নেবেন?
পল্লব খেতে খেতে আরও একটু আলু ভাজা চেয়ে নিল বয়টার কাছ থেকে। সরু আলুভাজার স্বাদই অন্যরকম।
খেয়ে একটা মস্ত ঢেকুর তুলে জয় বলল, দারুণ রাঁধে তো হোটলটা!
শান্তিনিকেতন দেখা শেষ হওয়ার আগেই ঘনিয়ে আসে বিকেল। রোদের তেজ পরখ করে পল্লব বলে ওঠে, জয়, আর দেরি করে লাভ নেই! ইলামবাজার নতুন জায়গা, বেশি দেরি করে পৌঁছোলে হয়তো রাতে থাকার জায়গার সমস্যা হয়ে যাবে।
জয় ঘাড় নাড়ে, রাইট ইউ আর। তা হলে চল্–
আবার ভুলভুলির রিকশ করে বোলপুর বাসস্ট্যান্ডে, সেখানে নানা রুটের বাস, কত-কত জায়গায় পাড়ি দিচ্ছে বাসগুলো, তাদের মধ্যে একটু খুঁজইে চোখে পড়ল ইলামবাজার যাওয়ার বাস। বাসে উঠে জানলার ধারে দুটো মনমতো জায়গাও পেয়ে গেল, জয় কলার ঝাঁকিয়ে বলল, ফার্স্ট ক্লাস!
একটু পরেই ঘন্টি বাজিয়ে ছেড়ে দিল বাসটা।
বোলপুর থেকে ইলামবাজার খুব একটা দূরত্বে তা নয়, বিকেল-বিকেল পৗঁছে চট করে খুঁজে বার করল একটা হোটেল, সামনে লেখা আছে ‘মহামায়া লজ’। তিনতলা বানি, পুরোনো ধাঁচের কাঠামো। কিছুকাল আগে রং করা হলেও তার প্রাচীনত্ব লুকোতে পারছে না।
হোটেলটা ঠিক তাদের পছন্দ হল তা নয়, কিন্তু কাছাকাছি লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারল এই ‘মহামায়া লজ’ এর চেয়ে ভালো কোনও হোটেল এতদঞ্চলে নেই।
এখানে শুধু থাকার ব্যবস্থা, তাই লজ। রাতে হোক, দুপুরে হোক, খেতে হবে বত্রাইরে।
কী আর করে তারা! যস্মিন দেশে যদাচারঃ, অতএব ম্যানেজারের কাছে ভাড়া মিটিয়ে সেই পুরোনো আমলের লজটির দোতলার একটি ঘরে ঢুকে পড়ল কাঁধের ব্যাগ নিয়ে। দোতলার অন্য ঘরগুলোয় কেউ আসে কি না বোঝা গেল না কেন না এখন সবগুলোই তালা-দওয়া।
পল্লব তাকায় জয়ের দিকে, কী রে! দোতলায় আমরা দু’জনেই কি শুধু বোর্ডার আজ!
জয় ঠোঁট ওলটায়, কী জানি! হয়তো অন্যরা কাজে গেছে, ভিরবে সময় হলে!
কিন্তু ঘরের তালা খুলে ভিতরে ঢুকে আরও বেজার হল তাদের মুখ। নতুন রং করা ঘর, কিন্তু কেমন স্যাঁতসেঁতে ভিতরটা। কিন্তু কিছু করার নেই! একটা টেবিলের উপর কাঁধের ব্যাগ নামিয়ে রেখে জয় বলল, চল পল্লব, বেশিক্ষণ লজে থেকে না হাঁপিয়ে বরং আশেপাশে কোথাও একটু ঘুরে আসি।
পল্লব ইতস্তত করে বল, কোথায় যেতে চাইছিস?
—যেদিকে দু-চোখ যায়। নতুন জায়গা, যা দেখবি তা-ই ভালো লাগবে। অন্তত এখানে ঘরবন্দি হওয়ার চেয়ে ভালো।
—কী জানি কোথায় যাবি! নতুন জায়গা, কিছুই চিনি জানি না!
জয় বলল, তা ছাড়া এই লজে খাওয়ার কোনও ব্যবস্থা নেই। আমাদের তো বাইরে বেরোতেই হবে খেতে। কিছুক্ষণ ঘুরে ফিরে কোনও একটা হোটেলে খেয়ে ফিরব সেই রাতে।
পল্লব তবু দোনামনা করছে দেখে জয় অসহিষ্ণু হয়ে বলল, তা হলে তুই এই লজঝড়ে হোটেলে একা থাক। আমি একটু বেরিয়ে আসি।
পল্লব বাধ্য হয়ে বলল, চল তা হলে।
দুজনে রুমে তালা দিয়ে ক্যামেরা কাঁধে ঝুলিয়ে নেমে এল একতলায়। রিসেপশনে থাকা ম্যানেজারকে জয় খুব স্মার্টলি জিজ্ঞাসা করল, এখানে কোথায় বেড়ানোর জায়গা আছে।
—বেড়ানোর জায়গা?
—মানে যেখানে একটু সিনসিনারি আছে।
ম্যানেজার লোকটি ইতস্তত করে বলল, তেমন দেখার জায়গা তো এখানে নেই। তবে একটা কালীমন্দির আছে কিছুটা দূরে, ওদিকটায় যেতে পারেন।
—কালীমন্দির! তাই সই। বাইরে বেরিয়ে একটু ধর্ম করা যাক তা হলে। কোন দিকে যাব?
—লজ থেকে বেরিয়ে পুবদিকের রাস্তা ধরবেন। খানিকটা গিয়ে দেখবেন বাঁয়ে একটা মাটির রাস্তা। ওই পথ ধরে গেলেই—
অতএব দুজনে বেরিয়ে পড়ল লজের বাইরে। নজের সামনে থেকে বড়ো পিচরাস্তাটা চলে গেছে পুব থেকে পশ্চিমে। কালীমন্দিরটা পুবদিকে হওয়ায় সেই দিকেই হাঁটতে শুরু করল জোর পায়ে। রাস্তাটা কোথাও কোথাও খানাখন্দঅলা। মাঝেমধ্যে একটা দুটো রিকশ ছাড়া কোনও যানবাহন নেই। এ-রাস্তা দিয়ে বাস চলাচল করে, কিন্তু সেও অনেকক্ষণ পর পর।
বিকেলের শেষপর্ব চলছে এখন, আর একটু পরেই সন্ধের নিবন্ত আলো আঁচড় কাটতে শুরু করবে পৃথিবীর গায়ে। দ্রুত হেঁটে কিছুটা এগিয়ে দেখল—ম্যানেজার যেমন বলেছিলেন বাঁদিকে নেমে গেছে একটা মেটে রাস্তা। সেই রাস্তায় কিছুটা এগিয়ে দেখল বেশ পুরোনো একটা কালী মন্দির। মন্দিরের মাথায় একটা অশত্থগাছের মৃদু বেড়ে ওঠা
মন্দির থেকে কিছুটা দূরে তাকালেই একটা বড়োসড়ো নদী। জয় আন্দাজ করে বলল, এটা নিশ্চয় অজয় নদ।
—কী করে বুঝলি?
—বীরভূমে একটা বড়ো নদীর নাম অজয়। বড়ো নদীকে বল নদ। যা চেহারা এই নদীটার তাতে অজয় না হয়ে যায় না।
—চল তা হলে, অজয়ের কাছে গিয়ে আমরা ফোটো তুলব।
জয় বলল, তুলব, তার আগে মন্দিরটার একটা ফটো তুলি।
ক্যামেরা তাক করতে গিয়ে জয় তাকায় পল্লবের দিকে, কত শতাব্দীর হবে বল তো মন্দিরটা? পল্লব মুখ কাঁচুমাচু করে, তা কী করে বলব?
—গেস্?
—এই রে, মন্দির নিয়ে তো ডক্টরেট করিনি যে চেহারা দেখে তার প্রতিষ্ঠাকাল বলব। জয় বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল, ধর, সপ্তদশ শতাব্দী।
পল্লব হেসে বলল, তাই হবে।
—বা রে, সঙ্গে সঙ্গে মেনে নিলি? একটু তর্ক করবি না?
পল্লব হেসে বলল, বিশ্বাসে মিলয়ে বস্তু, তর্কে বহু দূর। কী হবে তর্ক করে!
ততক্ষণে ক্যামেরা তাক করে জয় ফোটো তুলল মন্দিরটার, তারপর স্ক্রিনে দেখতে গিয়ে হতাশ হয়ে বলল, এ কী!
পল্লব চমকে ওঠে, কী হল?
—ফটোটা ওঠেনি তো!
— কই দেখি, পল্লব ঝুঁকে পড়ে স্ক্রিনের উপর, তারপর দেখে বলল, সত্যিই তো! আচ্ছা দেখি, ফোটোটা আমিই তুলি।
পল্লব অনেক কায়দা-কেরামতি দেখিয়ে ক্লিক করল ক্যামেরায়, তারাপর স্ক্রিনে দেখতে গিয়ে সেও আশ্চর্য হয়, বলল, কী ব্যাপার বল তো!
জয়ও ঝুঁকে পড়ে, সে কি রে! ওঠেনি।
তাদের দুজনের এই অহেতুক কথার মধ্যে হঠাৎ ‘ব্যোম কালী’ বলে প্রায় হুঙ্কার দিয়ে এক জটাজুট ধারী সন্ন্যাসী বেরিয়ে এল মন্দিরের পিছন থেকে। লোকটির মাথাভর্তি পিঙ্গল রঙের জটা, সেই জটা লতিয়ে-লতিয়ে নেমে এসেছে তার ঘাড়ে পিঠে। মুখময় কৃষ্ণবর্ণ শ্মশ্রু। তার কালচে কপাল জুড়ে এক মস্ত সিঁদুরের ফোঁটা। গলায় ঝুলছে ছোটো-বড়ো একগুচ্ছ রুদ্রাক্ষের মালা। তার চেয়েও অদ্ভুত তার চাউনির ধরন, চোখের বাদামি রঙের মণিদুটো যেন সাপের জিবের মতো চঞ্চল আর তীব্র।
পল্লব কিছুটা শঙ্কিত কণ্ঠস্বরে বলল, জয়, চল নদীর দিকে যাই।
জয়ের আবার এ ধরনের অদ্ভুত চরিত্রের মানুষদের সম্পর্কে ভারী কৌতূহল, বলল, দাঁড়া না, কী বলে লোকটা শুনি। সন্ন্যাসী তো।
পল্লব ঘাড় নেড়ে বলল, না রে, এ লোকটা তান্ত্রিক। এরা মন্দিরে থাকে, শ্মশানে পুজো করে। নিশ্চয় কাছাকাছি কোথাও শ্মশান আছে।
—তান্ত্রিক! জয় আরও উৎসাহিত বোধ করে, বলে, তা হলে তো লোকটার সঙ্গে একটু কথাবার্তা বলা যায়। তান্ত্রিকের কথা পড়েছি বইতে, কখনও দেখিনি!
ততক্ষণে সেই তান্ত্রিক কাছাকাছি এসে গেছে, জয় আর পল্লবকে উদ্দেশ করে কিছু একটা বলল হেঁড়ে গলায়। জয় দেখছিল তান্ত্রিক লোকটির বিচিত্র বেশবাস ও চেহারা। লাল টকটকে কৌপীন তার পরনে, আদুল গায়েও লাল উড়নি।
পল্লব ভয় পেয়ে বলল, না না, জয়, চল এখান থেকে।
পল্লব ফিরতে চাইছিল তাদের হোটেলের দিকেই, কিন্তু সেদিকের রাস্তার উপর এখন তান্ত্রিকের অবস্থান। অতএব তাদের যেতে হবে উলটো দিকে। প্রায় জোর করেই জয়ের হাত ধরে পল্লব চলল অজয় নদীর দিকে। বলল, নদীকে নিয়ে ফোটো তুলি কয়েকটা।
মন্দির থেকে কিছুটা নিরাপদ দূরত্বে এসে নদীর সঙ্গে তাদের দেখা। বিশাল নদী, কিন্তু কোথাও সোনালি বালির চড়া। নদীর খাত বরাবর নেমে তেমনই একটি চড়ায় পৌঁছে পল্লব বলল, এবার তোর একটা ফোটো তুলি।
জয় অমনি হিরো-হিরো পোজ দিয়ে দাঁড়ায় নদীখাতের দিকে পিছন করে। পল্লব ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ফোটো তুলে তাকায় স্ক্রিনের দিকে। তারপর ভালো করে তাকায় নদীখাতের দিকে, হঠাৎ কী দেখে চিৎকার করে উঠল, জয়, দেখে যা।
জয় এগিয়ে এল পল্লবের দিকে, বলল, চেঁচাচ্ছিস কেন?
—এই দ্যাখ, তোর ফোটোটা কীরকম অদ্ভুত উঠেছে।
জয় ঝুঁকে পড়ল স্ক্রিনের উপর, দেখি—
জয় দেখল নদীখাতের দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে থাকা তার ফটোর ঠিক পিছনে একটা লাল-হলুদ রঙের আগুনের গোলার মতো। অথচ নদীখাতের সেই জায়গাটায় সোনালি রঙের বালি ছাড়া কিচ্ছু নেই। জয় বারদুয়েক একবার ফোটোর দিকে, একবার নদীখাতের দিকে তাকিয়ে বলল, কী আশ্চর্য, এই লাল গোলাটা কোত্থেকে এল ফোটোয়?
পল্লব ঠিক একই পোজে দাঁড়াতেই জয় সেই একই জায়গায় ফোটো তুলল, আর কী আশ্চর্য, স্ক্রিনে দেখা গেল পল্লবের ঠিক পিছনে সেরকমই একটা আগুনের গোলা!
পল্লভ এতক্ষণে ছটফট করে উঠে বলল, জয়, চল হোটেলের দিকে রওনা দিই। আমার মোটেই ভালো লাগছে না এখানকার ধরনধারণ।
জয় ভয় পাচ্ছিল না, কিন্তু আশ্চর্য হচ্ছিল। ততক্ষণে সন্ধে তার অন্ধকারের তুলি নিয়ে হিজিবিজি আঁচড় কাটছিল নদীর প্রান্তরে। দুজনে হোটেলে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এতক্ষণে কীরকম একটা অলৌকিক মনে হচ্ছে ফোটোর ব্যাপারটা। ফটোতে নদীখাতের যেখানটায় আগুনের গোলা ফুটে উঠছে, সেখানে আদৌ কোনও আগুনের গোলা নেই, থাকার কথাও নয়।
দ্রুত পা চালিয়ে যখন ওরা মন্দিরের জায়গাটা পেরোল, সন্ধে পার হয়ে ডানা মুড়ে এসে বসেছে রাত্রি। জয় কী যেন বলতে শুরু করেছিল, পল্লব ফিসফিস করে বলল, এখন একটাও কথা বলিস নে, সেই তান্ত্রিকটা কোথাও আছে আশেপাশে।
জয় অন্ধকারের মধ্যেও মন্দিরের দিকে চোখ চালায় তান্ত্রিকের খোঁজে, মন্দিরের ভিতর একটা ছোট্ট প্রদীপের আলো ছাড়া আর কিছুই দৃশ্যমান নয়। হঠাৎ এক ঝলক হাওয়া এমন জোরে ঝাপট দিল ওদের গায়ে যে, কীরকম ছমছম করে উঠল মনের ভিতরটা।
কিছুটা এগোতেই মেটে রাস্তা পার হয়ে পাকা রাস্তা। একটা রিকশ দ্রুত চলে গেল শহরের দিকে। তিনজন পথচারীও গল্প করতে করতে হেঁটে গেল বিপরীত দিকে। হঠাৎ অদূরে একটা মাঠে প্যান্ডেল বেঁধে কী সব গানটান হচ্ছে শোনার পর ক্রমে দুজনের শরীরে একটু সাহস ফিরে আসে।
পল্লব বলল, নিশ্চয় তান্ত্রিকেরই কাণ্ড, বুঝলি? আমরা তার কথা শুনিনি যে!
জয় বুঝে উঠতে পারছিল না বিষয়টা। পল্লবের মধ্যে নানা সংস্কার আছে, বহু বিষয়ে খুঁতখুঁতানি আছে, এখনও সেই মানসিকতাই কাজ করছে এরকম মনে হচ্ছে জয়ের।
হোটেলে ঢোকার আগে গঞ্জের মধ্যে একটা হোটেলে দুটো ডাল-ভাত-মাছ খেয়ে ফিরে এল ‘মহামায়া লজ’-এ। এখন কি লোডশেডিং। হোটেলে ঢুকতেই এক অদ্ভুত অন্ধকার গ্রাস করল ওদের দুজনকে। বিকেলে যখন বেরিয়েছিল, বেশ কিছু লোকজনকে ঘোরাফেরা করতে দেখেছিল নীচে, এখন গোটা হোটেলটাই ডাহা অন্ধকার। মোবাইলের লাইট জ্বেলে-জ্বেলে রিসেপশনে গিয়ে দেখল সেখানে কেউ নেই।
পল্লব শঙ্কিত কণ্ঠে বলল, কী হল বল্ তো।
জয় বলল, লজের নীচের তলার ঘরগুলোও সব বন্ধ। কিন্তু যখন লজে ঢুকেছিলাম, একতলায় দু-তিনটে ঘরে লোক ছিল দেখেছিলাম। চল তো দোতলায় যাই—
দোতলায় গিয়ে দেখল সব ঘরই সেই আগের মতো তালা দেওয়া। সমস্ত দোতলাটা যেন ছমছম করছে গাঢ় অন্ধকারে। লজের বারান্দা থেকে বাইরের দৃশ্যপটেরও কিছু বোধগম্য হচ্ছে না এখন।
পল্লব ভয় পেয়ে বলল, চল, জয়, ঘরের মধ্যে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়ি।
জয়েরও এতক্ষণে বেশ ছমছম করছে গা। যেন তারা দুজন এসে পৌঁছেছে একটা ভূতুড়ে বাড়ির মধ্যে। চারপাশে কেউ কোথাও নেই, শুধু তারা দুজন দাঁড়িয়ে আছে একটা গা-শিরশির করা জায়গায়।
বাধ্য হয়ে জয়ও বলে, চল, শুয়ে পড়ি, তারপর যা হয় হবে। মরি মরব, বাঁচি বাঁচব।
দরজার তালা খুলে দুজনে ডাবল বেডেড খাটটায় শুয়ে পড়ল, একটা জানলাও খুলল না ভয়ে। সারাদিনের ক্লান্তিতে চোখে ঘুম আসতে বেশি দেরি হয় না। প্রথমে ঘুম ভাঙে পল্লবের, সে জয়ের গায়ে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে, জয়, আমরা মরিনি, বেঁচে আছি।
জয় ঘুম ভেঙে চারপাশে তাকায়, পল্লবের দিকে তাকিয়ে স্বস্তির হাসি হাসে, তারপর উঠে প্রথমে খুলে দিল জানলাদুটো। বাইরে তখন রোদে রোদ। পৃথিবীর কলকোলাহলও শোনা যাচ্ছে ঘর থেকে। তাড়াতাড়ি দুজনে ঘরের বাইরে এসে দেখল দোতলার আরও ক-টা ঘরে লোকজন আছে। পরক্ষণে নেমে গেল নীচে। রিসেপশনে এখন অন্য লোক। একতলার ঘরেও কিছু কিছু লোক আছে দেখে এতক্ষণে হাঁপ ছেড়ে বাঁচে।
কিন্তু কাল রাতের রহস্যটা কী তা তো জানা প্রয়োজন। রিসেপশনের লোকটিকে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি হেসে বললেন, লজে রাতের বেলা লোক পাবেন কী করে! এখানকার সব লোক তো যাত্রা শুনতে গিয়েছিল।
—যাত্রা!
—হ্যাঁ, ওই যে মাঠের মধ্যে প্যাণ্ডেল বেঁধে যাত্রা হচ্ছিল তার আওয়াজ কানে যায়নি আপনাদের।
তাই তো! জয় ঘাড় নাড়ে, প্যান্ডেলের রহস্য পরিষ্কার হয় এতক্ষণে।
—কলকাতার নামী দল। সবাই সেই যাত্রা শুনে অনেক রাতে লজের ঘরে ফিরেছে। আপনি যখন লজে ফিরে এসেছেন, তখন সবাই যাত্রা দেখতে ব্যস্ত। তাদের ঘরে পাবেন কী করে! তা ছাড়া আমাদের এদিকটায় কাল অনেক রাত পর্যন্ত লোডশেডিং ছিল যে! যাত্রা হয়েছে জেনারেটর চালিয়ে।
রহস্য পরিষ্কার হতে তখন তারা কাল বিকেলের ধোঁয়াশা সরাতে চায়, জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা, মন্দিরে এক তান্ত্রিককে দেখলাম!
—হ্যাঁ, কী সব সাধনভজন করেন। এখানকার লোকের ধারণা অবিশ্বাসী মন নিয়ে তান্ত্রিকদের কাছাকাছি না-যাওয়াই ভালো।
জয় বেমালুম চেপে গেল মন্দিরের ফোটো তোলার ব্যাপারটা। জিজ্ঞাসা করল, আর ওই যে নদীখাত আছে না। ও-জায়গাটা কীরকম!
—ওখানটায় এককালে শ্মশান ছিল। ওখানে ওই তান্ত্রিক রাতের বেলা কীসব পুজোটুজো করেন।
জয় এবার চোখাচোখি করে পল্লবের সঙ্গে। অনেক রহস্য পরিষ্কার হলেও কেন মন্দিরের ফোটো ওঠেনি তা বুঝে উঠতে পারল না। তাদের তোলা ফোটোর পিছনে আগুনের গোলাটার রহস্যও ভেদ হল না এই মুহূর্তে। ওই আগুনের গোলাটা দেখা যাচ্ছে কি তাদের ক্যামেরার কোনও সমস্যার কারণে, নাকি ওটা সত্যিই অলৌকিক।
