উপন্যাস
গল্প
উপন্যাস

অলিন্দে অশরীরী – ১

এক

জেলার একটা পুরোনো রাজবাড়ি দেখতে যাবে বলে অনেকদিন ধরে গার্গীকে বলছিল জেলার

সায়ন। কলকাতা থেকে ঘণ্টা চারেকের জার্নি। সকালে গাড়ি নিয়ে বেরোলে তিন ঘণ্টায় জেলা শহর, সেখানে দুপুরের খাওয়া সেরে আরও একঘণ্টার পথ আলতাপুর রাজবাড়ি। রাজবাড়ি দেখে সন্ধের মধ্যে কলকাতা ফেরা যায়।

গার্গী আঁতকে উঠে বলেছিল, লুনাকে নিয়ে এতক্ষণের জার্নি। সারাদিনের ধকল কি নিতে পারবে ও? হঠাৎ রাজবাড়ি দেখতে কেন?

প্রসঙ্গটা ঘুরিয়ে নিয়ে সায়ন বলল, প্রথম কথা হল আমরা ওদিন রাতে ফিরে আসব না। দু-নম্বর হল, লুনা এ-যাত্রায় আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে না।

গার্গীর আশ্চর্য হওয়া পালা, বলল, হঠাৎ এরকম উদ্ভুট্টে ইচ্ছে?

—ইচ্ছেটা উদ্ভুট্টেই বটে। শুনলাম রাজবাড়িতে কিছু ইন্টারেস্টিং ঘটনা ঘটছে রাতেরবেলা। বলতে পারো ঘোস্ট টাইপ ঘটনা। দিনে-দিনে বেড়োতে গিয়ে ফিরে এলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে না। বোধহয় একটা রাত থাকতে হবে কাছেপিঠে কোথাও। অনেক রাত পর্যন্ত রাজবাড়িতে থেকে বিষয়টা বুঝতে চাই।

গার্গী ঠিক বুঝে উঠতে পারল না সায়নের ধোঁয়াশামিশ্রিত কথাগুলো। বলল, ভূত? পুরোনো রাজবাড়িগুলো নিয়ে অনেক কাহিনি পল্লবিত হয়। সেরকম কিছু?

সায়ন বেশি না-ভেঙে বলল, চলো, ঘুরেই আসি। আমার এক বন্ধু সরকারি উঁচু পদে আছে। তাকে বলে জেলার সার্কিট হাউসে থাকার একটা ব্যবস্থা করছি। শনিবার যাব, রবিবার ফিরব। লুনা থাকবে সোনালিচাঁপার কাছে।

সায়নের অতি-ইচ্ছা বুঝে একদিন শনিবার মার্চের এক কুয়াশারং ভোরে লুনাকে সোনালিচাপার হাতে সমর্পণ করে দুজনে বেরিয়ে পড়ল কলকাতা থেকে ঘণ্টা তিনেকের দূরবর্তী সেই জেলা শহরের উদ্দেশে।

এই বেড়াতে যাওয়াটা গার্গীর কাছে খুবই বিস্ময়ের কেননা কাজপাগল সায়ন হঠাৎ গার্গীকে নিয়ে আনন্দভ্রমণে বেরিয়ে পড়েছে এ যেন ভাবাই যায় না। আজ তার একটি ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখার মতো একটি দিন। তবে ঠিক আনন্দভ্রমণে নয়, অশরীরীদের আবিষ্কার করতে যাওয়ার ভ্রমণ। সত্যিই অশরীরী বলে কিছু হয় কি না এ নিয়ে গার্গীর সঙ্গে সায়ন মাঝেমধ্যে ডিবেট করে, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনও ফয়সালা হয়নি।

শহর কলকাতার, জ্যামজট পেরিয়ে হাইওয়েতে পড়তেই গাড়ি ছুটে চলল বিদ্যুতের মতো। ড্রাইভার রামলালের বয়স সাতাশ আটাশ, ছিপছিপে চেহারা, ভাগলপুরের আদি বাসিন্দা, কলকাতায় আছে ছেলেবেলা থেকে। খুব চালাক-চতুর নয়, কিন্তু গাড়ি চালানোর হাতটি বেশ ভালো। ন্যাশনাল হাইওয়ে বরাবর দুরন্ত গতিতে ছুটিয়ে দিল তার রথ।

গার্গী অবশ্য এত জোরে গাড়ি চালানো পছন্দ করে না, কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ বলল, রামলাল-

রামলাল জানে ম্যাডাম কিছু না-বলেও তার উদ্দেশে গতি কমানোর কথা বলছেন, সে পায়ের নীচে সামান্য আলগা করল অ্যাক্সিলারেটর।

হাইওয়ের দুপাশে তখন মাইলের পর মাইল মাঠখেত। বেশিরভাগ মাঠে এখন কোনও ফসল নেই, সামান্য কিছু প্লটে শাকসবজির চাষ। কখনও পথের পাশে সবুজ গাছগাছালি। বনসৃজন প্রকল্পে নানারকম গাছ পোতা হয়েছিল ক’বছর আগে, এখন সেগুলি বড়ো হয়ে কিছু ছায়া ফেলছে পথের ওপর।

কিছুক্ষণ চলার পর পুব আকাশের মাঝামাঝি সূর্য। গার্গী হঠাৎ বলল, খুব আশ্চর্য এই যে, তোমার হঠাৎ রাজবাড়ি দেখার শখ হল।

সায়ন মিটিমিটি হেসে বলে, যা শুনে এসেছি তা যদি সত্যি হয় তবে একটা অভিনব অভিজ্ঞতা হবে তোমার-আমার। শুধু রাজবাড়ি দেখতে যাচ্ছি তা নয়, একটা অদ্ভুতুড়ে প্রাপ্তি হতে পারে ভেবেই এতখানি পথ পেরিয়ে যাওয়া।

রাজবাড়ি যাত্রার আগাপাশতলা কিছু না-শুনেই গার্গী গুছিয়ে নিয়েছে একটা ট্রলি-ব্যাগ আর ছোটো একটা কিটব্যাগ। মাত্র একরাত্রির ট্যুর, যাতায়াত মিলিয়ে দেড়দিন লাগবে এমনই বার্তা দিয়েছে সায়ন। গাড়ি সঙ্গে থাকলেও হালকা হয়ে চলাই ভালো।

গাড়ি তখন হু হু করে পার হয়ে চলেছে কয়েকটা ছোটো ছোটো গ্রাম, মাঝেমধ্যে ছোট্ট গঞ্জের মতো। হঠাৎ ডানদিকে গার্গী আঙুল নির্দেশ দিতে সায়ন দেখল, একটা বড়োসড়ো পুকুর, প্রায় দিঘির আদল। তার চারপাশে সারি দিয়ে লাগানো তালগাছের দৃশ্য খুব চমৎকার লাগল এই নির্জন প্রান্তরে। আশেপাশে কোনও গ্রামও নেই যে, দিঘির মালিক কেউ বাস করবে কাছেপিঠে।

যত এগিয়ে চলেছে জেলাশহরের দিকে, রাজবাড়ির অভিজ্ঞতার কথা ভেবে একটু-একটু শিহরিত হচ্ছে গার্গী। তবে সার্কিট হাউসে থাকার ভাবনাটাও কম রোমাঞ্চকর নয়। সার্কিট হাউসের কথা নানা বইতে পড়েছে গার্গী, দেখেওছে বেশ কয়েকবার, কিন্তু থাকার সুযোগ হয়নি কখনও।

লুনা খুব জেদ ধরেছিল সেও যাবে তাদের সঙ্গে। তাকে সঙ্গে না-নিয়ে বাবা-মা যাবে তা যেন তার বিশ্বাসই হচ্ছিল না, অথচ লুনাকে বলাও যাচ্ছে না কেন শুধু তারা দুজনেই যাচ্ছে। অবশেষে ‘খুব জরুরি কাজ আছে’ বলে তাকে সোনালিচাঁপার কাছে দেখভালের ভার দিয়ে এই যাত্রা।

ঘণ্টাখানেক জার্নির মধ্যে হাইওয়ের ধারে একটা ধাবায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে সায়ন অর্ডার দিল, তিন প্লেট ডবল ডিমের ওমলেট আর ভইসের দুধের বড়ো তিন গেলাস চা।’

নিজেদের শরীরে তেল ভরে, একটা পেট্রল পাম্প থেকে গাড়ির তেল ভরে আবার শুরু করে পথ চলা।

আও দু-ঘণ্টা টানা গাড়ি চালিয়ে রামলাল পৌঁছে গেল জেলাশহরের প্রবেশপথে। দুপাশে কখনও মাঠখেত, কখনও গাছগাছালি, কখনও লোকালয় বা ছোটো গঞ্জ দেখতে দেখতে কখন যে পৌঁছে গেল জেলাশহরে বুঝেই উঠতে পারল না দুজনে।

হাতের কবজিতে চোখ রেখে সায়ন বলল, এর মধ্যে তিন ঘণ্টা পার?

জেলাশহরের প্রথমে দু-চারটে ছোটো ছোটো চালাঘর, কয়েকটা একতলা-দোতলা বাড়ি, তারপর ক্রমে শহরের আদল। একটা লম্বা দোতলাবাড়ির নীচে ঝকমকে দোকানঘর পেরিয়ে তিনরাস্তার মোড়ে পৌঁছোতে গার্গী বলল, এবার খোঁজ নিয়ে দেখো সার্কিট হাউসের রাস্তা কোনদিকে?

মোড়ে ট্রাফিক পুলিশকে জিজ্ঞাসা করে রামলাল সোজা এসে গাড়ি দাঁড়াল লম্বায় চওড়ায় মস্ত তিনতলা বাড়িটার সামনে।

সার্কিট হাউসটা শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে একটু দূরেই। অনেকখানি জায়গা জুড়ে একটা দীর্ঘ পাঁচিল, সেই পাঁচিলের গেট খোলা, পাশের ছোট্ট ঘরে একজন পুরু গোঁফওয়ালা সিকিউরিটি গার্ড।

সে বেরিয়ে এসে সায়নের হাত থেকে বুকিং স্লিপটা নিয়ে পরীক্ষা করে বলল, স্যার, কলকাতা থেকে বুকিং করে এসেছেন? কেয়ারটেকার থাকে ওই হলুদরঙের ছোট্ট ঘরটায়। আপনি ওখানে চলে যান।

গেট পেরিয়ে সোজা ভিতরে ঢুকে বিশাল তিনতলা সার্কিট হাউসের মাঝখানের গেটের সামনে এসে ব্রেক কষল রামলাল।

কেয়ারটেকার থাকে ডানপাশের একটা ছোটো একতলা ঘরে, অনেক ডাকাডাকির পর বেঁটে রোগা একটি যুবক গড়িমসি করে এসে পৌঁছোল মিনিট পাঁচেক পরে। সায়নের হাতের বুকিং স্লিপটি দীর্ঘক্ষণ পরীক্ষা করে অবশেষে দেওয়ালে ঝোলানো কি-বোর্ড থেকে একটি চাবি পেড়ে নিয়ে সায়নের হাতে দিয়ে বলল, দোতলায় উঠে ন’নম্বর ঘর।

চাবি হাতে নিয়ে সায়ন বলল, লাঞ্চের কী ব্যবস্থা এখানে?

—স্যার, কী খাবেন বলে দিলে আব্দুলকে বলে দিচ্ছি। একটার মধ্যে পেয়ে যাবেন। গার্গী ডাল-সবজি আর চিকেনের ব্যবস্থা করতে বলে পা বাড়াল সিঁড়ির দিকে। সঙ্গে লাগেজ বেশি ছিল না, মাত্র একরাতের আস্তানা, সায়নের হাতে একটা ট্রলিব্যাগ আর গার্গীর হাতে ছোটো কিটব্যাগ, দোতলায় উঠে চাবি ঘুরিয়ে ভিতরে ঢুকতেই কিছুক্ষণ দুজনে স্থাণু

সানমাইকা করা মেঝের রং ভালো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিবর্ণ, দেওয়ালগুলোতে রং করা হয়েছে খুব বেশিদিন নয়, তাও ড্যাম্প লেগে ফুলে-ফুলে উঠেছে কোথাও-কোথাও। ঘরের দুপাশে দুটো সিঙ্গল বেডেড খাট, শুধু ভাগ্য ভালো যে, দুটো ধবধবে সাদা চাদর বিছোন। বালিশ দুটোর প্রচ্ছদও সাদা।

সাদা রং গার্গীরও খুব পছন্দের। দ্রুত একবার বাথরুমের দরজা ঠেলে দেখে নিল ভিতরে কমোড আছে কি না, আছে দেখে স্বস্তি। তারপরেই ঘরের পিছনের দরজাটা খুলে ওপাশের ব্যালকনিতে গিয়ে উচ্ছ্বসিত, বলল, দেখে যাও।

পিছনে বেশ বড়ো বাগান, তার একপাশে একটা বড়ো পুকুর। পুকুরের চারপাশে সারি দিয়ে নারকেল গাছ থাকায় ভারী চমৎকার দেখাচ্ছে দৃশ্যপট। বাগানে লম্বা সারি দেওয়া একঝাক শালগাছের সঙ্গে দুটো রাজকীয় সেগুন থাকায় বেশ অরণ্য-অরণ্য পরিবেশ।

সায়ন কলকাতার বাইরে এলে বেশ কবি-কবি হয়ে ওঠে, বলল, ব্যালকনিতে দুটো চেয়ার নিয়ে বসে বেশ আড্ডা দেওয়া যাবে অনেক রাত পর্যন্ত।

বলেই ঘড়ি দেখে বলল, রাজবাড়ি এখান থেকে ঘণ্টাখানেকের পথ। চলো স্নান করে খেয়েদেয়ে একটু বিশ্রাম নিই। তারপর রাজবাড়ির উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ি। রাজবাড়িতে দেখারও অনেক কিছু আছে। দেখে সন্ধের আগেই সার্কিট হাউসে ফিরে আসব।

ছুটির দিন হলে স্নান-খাওয়ার পর সায়ন বিছানায় একটু গা ঢেলে দিতে ভালোবাসে। আজও ধবধবে বিছানায় লম্বা হয়ে বলল, বেশি নয়, একঘণ্টা। সাড়ে তিনটের মধ্যে বেরিয়ে যেতে হবে। গার্গী ঘড়িতে চোখ রেখে বলল, ঠিক আছে, আমি বই পড়ছি। ঠিক সময়ে তোমাকে ডেকে দেব।