সন্ন্যাসী স্যার ও বেহ্মদত্যি
সেদিন অঙ্কের ক্লাস নিতে সন্ন্যাসী স্যার যখন আমাদের ক্লাসে এলেন, ক্লাসসুদ্ধ ছাত্রের মধ্যে হিল্লোলের ঢেউ। সন্ন্যাসী স্যারকে এই কিছুদিন আগেও আমরা নতুন স্যার বলতাম, কিন্তু এখন তাঁর প্রায় ছ-মাস হয়ে গেছে, এর মধ্যে নতুন একজন অঙ্কের টিচার এসে যাওয়ায় তিনিই আপাতত নতুন স্যার, ফলে সন্ন্যাসী স্যার আর নতুন রইলেন না, এখন তাঁকে সন্ন্যাসী স্যার বলতেই আমরা অভ্যস্ত।
কিন্তু অঙ্কের ক্লাসে সন্ন্যাসী স্যার কেন! মনের গহনে গবেষণা করে বুঝে ফেলি, অঙ্কের নতুন স্যার নিশ্চয় কোনও কারণে আজ স্কুলে আসেননি, তিনি না-আসায় তাঁর জায়গায় ক্লাস নিতে এসেছেন সন্ন্যাসী স্যার। তিনি বাংলা পড়ান, আমাদের ক্লাসে প্রথম দিন থেকেই বলে আসছেন তিনি অঙ্কে ‘মহাপণ্ডিত’, স্কুল-লাইফে নাকি বরাবর অঙ্কে গাড্ডু লাভ না-করলেও কোনও ক্রমে টেনেটুনে পাশ করতেন, তারপর স্কুলের গণ্ডি পার হতেই আড়ি করে দিয়েছেন অঙ্কের সঙ্গে।
তাই আমরা বুঝে ফেলেছি, সন্ন্যাসী স্যার আজ যখন অঙ্ক পড়াবেন না, নির্ঘাত গল্প বলবেন ক্লাসে।
আসলে সন্ন্যাসী স্যার মানুষটি ভারী মজাদার, একমাথা কোঁকড়া-কোঁকড়া চুল, চুলের রং সামান্য হলেও বাদামি, সবসময় মুখে একগাল হাসি, আর বাংলার ক্লাসেও সুযোগ পেলেই কিছু না কিছু গল্প বলবেনই পড়ানোর ফুরসতে। আর তাঁর গল্পের স্টকও প্রচুর। আজও ক্লাসে ঢুকে চেয়ারে বেশ জুতজাত করে বসে বললেন, কী হে, তোমাদের নাকি এটা অঙ্কের ক্লাস?
আমরা সমস্বরে বলি, হ্যাঁ, স্যার। নতুন স্যার বলেছিলেন আজ সিঁড়ি-ভাঙা অঙ্ক শেখাবেন।
সন্ন্যাসী স্যার হেসে বললেন, বাহ্, খুব ভালো কথা! কিন্তু আমার যে আজ পায়ে ব্যথা। সিঁড়ি ভাঙতে নিষেধ করেছেন আমার ডাক্তার!
আমরা সমস্বরে বলি, তা হলে তো ভালোই হয়েছে, স্যার।
সন্ন্যাসী স্যার আরও হেসে বললেন, আমার পায়ে ব্যথা, আর তোমরা বলছ, ‘ভালো হয়েছে!’ -স্যার, বলছি এই কারণে তা হলে আজ পুরো পিরিয়ড জুড়ে গল্প শুনতে পারব। আপনি সিঁড়ি ভাঙতে পারলে তো আর গল্প বলতে পারতেন না!
—বেশ বেশ, তা কী গল্প শুনতে চাও?
—ভূতের গল্প, ভূতের গল্প, অমনি চারদিক থেকে সমস্বরে দাবি।
—বাহ, তা হলে ভূতের বাজার খুব ভালো দেখছি, সন্ন্যাসী স্যার হেসে বেশ জুতজাত হয়ে বসলেন চেয়ারে, তারপর বললেন, ঠিক আছে, তা হলে আজ একটা বেহ্মদত্যির গল্পই বলা যাক তোমাদের। একেবারে আমার নিজের চোখে দেখা বেম্মাদত্যি। তোমরা নিশ্চয় বেহ্মদত্যির নাম শুনে থাকবে।
বেহ্মদত্যির নাম তো শুনেছি, কিন্তু তাকে ঠিক কীরকম দেখতে, তার মতিগতি কী তা ঠিকঠাক জানা নেই কারও। আমি একটু জেনারেল নলেজ খাটিয়ে বলি, স্যার, শুনেছি লোকটা আসলে ব্ৰহ্মদৈত্য।
বলেই জিব কেটে বলি, স্যার, লোকটা নয়, ভূতটা।
—হ্যাঁ, ঠিকই বলেছিস, ওটা আসলে ব্রহ্মদৈত্য। থাকত গঞ্জ থেকে আমাদের বাড়ি যাওয়ার পথে একটা অশত্থগাছের মগডালে। সেই বেহ্মদত্যিটা নাকি খুব সাত্ত্বিক, রোজ ভোরে উঠে খড়ম পায়ে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় ইছামতীতে স্নান করতে।
আমরা আঁতকে উঠে বলি, স্নান করতে যায়? লোকে দেখেছে তাকে?
—কেউ না কেউ নিশ্চয় দেখেছে তাকে, তবে সে অনেককাল আগে। মুশকিল হচ্ছে ইদানীং তাকে দেখেনি কেউ, কিন্তু শুনেছে।
ব্রহ্মদৈত্যকে কেউ দেখেনি, কিন্তু শুনেছে’ এই কথাটাই কীরকম গোলমেলে। জিজ্ঞাসা করি, ইদানীং দেখেনি কেউ! শুধু শুনেছে!
—হ্যাঁ, সেরকমই শোনা যায় গাঁ-গঞ্জে। সেই কবে নাকি একবার-দুবার দেখা গিয়েছিল, কিন্তু তারপর আর দেখেনি কেউ, এখন শুধু মাসের বিশেষ-বিশেষ দিনে শুনতে পায় কেউ-কেউ।
স্যারের কথাগুলো এমনই গোলমেলে যে, ঠিকঠাক পরিষ্কার হচ্ছে না ব্যাপারটা! স্যারও বোধ হয় বুঝলেন আমাদের মনের কথা, তাই হেসে উঠে বললেন, ঠিক আছে, তা হলে শোনো ঘটনাটা।
বিষয়টা খোলসা করলেন সন্ন্যাসী স্যার, বললেন, আসলে কয়েক বছর আগে এক কাকভোরে বেহ্মদত্যিকে প্রথম দেখে ফেলে এক সাইকেল আরোহী। প্রায় জ্যান্ত দেখার মতো সেই দেখা। অশত্থ গাছের ডাল থেকে খড়ম পায়ে নেমে আসা বেহ্মদত্যি। তার আগে কেউ বেহ্মদত্যির কথা জানত না। তারপর থেকে কখনো সখনো শোনা যায় গাছ থেকে কেউ যেন খট খট শব্দ করে নামছে নীচে, যেন গাছের ডালগুলো এক-একটা পথ, সেই পথ দিয়ে হেঁটে নেমে আসছে কেউ, নীচে নামার পর শব্দটা থেমে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর হঠাৎ সেই শব্দটা চলতে শুরু করে নদীর দিকে। রাস্তার ধারেই অশত্থগাছ, সেই রাস্তাটা একদিকে ঢালু হয়ে নেমে গেছে মাঠের ভিতর, সেই মাঠের মাঝখান দিয়ে একটা মেঠোপথ, সেই মেঠোপথ দিয়ে খটখট করে হেঁটে যাচ্ছে কেউ।
আমরা জিজ্ঞাসা করি, মাঠের মধ্যে কেউ নেই, তবু খট খট করে শব্দ হচ্ছে?
সন্ন্যাসী স্যার হেসে বললেন, হ্যাঁ, বেশিরভাগ মানুষই শুনতে পায় না, তবে কেউ কেউ নাকি পায়?
—শুনতে পায়? দেখতে পায় না!
—দু-একজন নাকি দেখতেও পায় হঠাৎ।
— পায়, আমরা চিৎকার করে উঠি, কীরকম দেখতে স্যার? কঙ্কালের মতো?
–না, না, একেবারেই ওরকম নয়, তা হলে আর বেহ্মদত্যি বলছি কেন?
—তা হলে, স্যার, কীরকম?
—হ্যাঁ, তা হলে তোমাদের বলি বেহ্মদত্যি নিয়ে শোনা গল্পটা। বেহ্মদত্যি বলতে পাড়াগাঁর মানুষদের কী ধারণা!
সন্ন্যাসী স্যার একটু থেমে বললেন, শোনা যায় বহুকাল আগে ওই অশত্থগাছের কিছু দূরে একটা গ্রাম আছে, সেখানে একজন ব্রাহ্মণ বাস করতেন। খুব সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ, মাথার পিছনদিকে মস্ত বড়ো টিকি। বাড়িতে পুজোআচ্চা নিয়েই থাকতেন। তাঁর মন্ত্রোচ্চারণ ছিল শোনার মতো। সাত- দশটা গাঁয়ের মানুষ যাতায়াতের পথে তাঁর বাড়ির কাছে দু-দণ্ড দাঁড়িয়ে শুনত মন্ত্রোচ্চারণ, সেই সঙ্গে দেখত ঘণ্টা বাজিয়ে তাঁর দীর্ঘক্ষণ পুজো করাও। হঠাৎ কীভাবে যেন সেই ব্রাহ্মণ মারা যান অপঘাতে। সেই ব্রাহ্মণের কথা লোকে ভুলেই যাচ্ছিল প্রায়, সেসময় হঠাৎ একদিন একটা লোক ভোরবেলা কী কাজে যেন সাইকেলে করে যাচ্ছিল অশত্থগাছের নীচ দিয়ে। লোকটা অশত্থ গাছের কাছাকাছি হয়েছে, হঠাৎ গাছের একটা ডাল গেল মড়াৎ করে ভেঙে। কোথাও কিচ্ছু নেই, একটু হাওয়া পর্যন্ত নেই, হঠাৎ অশত্থগাছের একটা ডাল কেন ভেঙে পড়ল দেখে অবাক হল লোকটা।
একটা ডাল ভেঙে পড়ল শুনে আমরাও হতবাক।
—কী মনে হতে লোকটা সাইকেল থেকে নেমে পড়ল সেখানে। ঘাড় উঁচু করে বোঝার চেষ্টা করছিল কেন ডালটা ভেঙে পড়ল! কিছু বুঝতে না পেরে আবার সাইকেলে ওঠার কথা ভাবছে, হঠাৎ সামনেই কী যেন একটা শব্দ হল ধুপ করে! তখনও রাতের অন্ধকার পুরো কাটেনি। সেই আবছা আলোয় দেখল কে একজন লোক অস্পষ্ট শরীরে দাঁড়িয়ে আছে অশত্থ গাছের নীচে। লোকটাকে পুরোপুরি দেখতে পাচ্ছে না, শুধু তার অবয়ব দেখে বুঝতে পারছে, দীর্ঘ শরীর, খালি গা, গায়ের রং সোনার মতো, পরনে সাদা ধবধবে ধুতি, সেই ধুতির একটা অংশ খালি গায়ে জড়ানো।
আমরা তখন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছি সন্ন্যাসী স্যারের মুখের দিকে।
—লোকটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না এরকমটা ঘটল কী করে! এই ভোর রাতে এ রকম চেহারার একজন মানুষ অশত্থ গাছের ডাল ভেঙে নীচে লাফ দিয়ে পড়বে এ দৃশ্য অকল্পনীয়! তখনই লোকটা বুঝতে পারল এর মধ্যে কোথাও একটা ভৌতিক ব্যাপার আছে। মনে হওয়ামাত্র সাইকেল হাতে নিয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করল। মনে হচ্ছে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে সাইকেলসুদ্ধ।
বলে কিছুক্ষণ থামলেন সন্ন্যাসী স্যার।
তাঁর এই সাময়িক বিরতি তখন অসহ্য লাগছে আমাদের, ভাবলাম নিশ্চয় অনেকক্ষণ একটানা গল্প বলে ক্লান্ত হয়ে গেছেন স্যার। কিছুক্ষণ তাঁকে জিরোতে দিয়ে বললাম, স্যার, তারপর?
—তারপর কী তা শুনতে চাইছ? আমি আবার তোমাদের কারও কারও মুখ দেখে ভাবলাম হয়তো পছন্দ হচ্ছে না গল্পটা।
—না স্যার, হচ্ছে, হচ্ছে। তারপর লোকটা কী করল?
সন্ন্যাসী স্যার হাসলেন একটু, বললেন, লোকটা অজ্ঞান হয়ে যায়নি। ভিতরে ভিতরে কাঁপছে, কিন্তু সেখানে দাঁড়িয়ে রইল একদৃষ্টে সেই অবয়বটার দিকে তাকিয়ে। অবয়বটা তখন হাঁটতে শুরু করেছে। কিন্তু কীরকম একটা শব্দ হচ্ছে, খট খট খট খট……
সন্ন্যাসী স্যার নিজেও তখন যেন দুলছেন একটা ঘোরের মধ্যে, আর একটানা বলে চলেছেন, খট খট খট খট…
আমরাও কীরকম হতভম্ব হয়ে শুনছি সেই শব্দটা।
—বুঝলি, লোকটা তখন ঠিক বুঝতে পারেনি কীসের শব্দ ওটা। ঠায় দাঁড়িয়ে কান করে শুনতে পেল ওটা আসলে যেন খড়মের শব্দ। লোকটা তখন বিস্ফারিত চোখে দেখছে সেই অবয়বটা লম্বা লম্বা পায়ে চলেছে ইছামতীর দিকে। মাঠের নরম মাটি, কিন্তু তা সত্ত্বেও তার চলার পথে শব্দ উঠছে খট খট খট খট খট খট……..
—স্যার, শুধু শব্দ শুনতে পাচ্ছে লোকটা!
—না, যেমন শব্দ হচ্ছে, তার সঙ্গে সেই সাদা ধুতি পরা অবয়বটা আধো অন্ধকারে ঢাকা মেঠোপথ বেয়ে চলেছে জোরপায়ে।
—তারপর? তারপর স্যার? সেই অবয়বটা দেখতে পায়নি লোকটাকে?
আমাদের যেন দেরি সইছে না একটুও।
—দেখতে পেয়েছিল কি না সে কথা জানা যায়নি, কিন্তু মূর্তিটা যেন মিলিয়ে গেল মেঠোপথ ধরে, খড়মের শব্দটাও আস্তে আস্তে গিয়ে দাঁড়াল ইছমতীর ঘাটে। অমনি লোকটা সাইকেলে উঠে দে দৌড় দে দৌড়।
গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে যাওয়াতে আমাদের ঠিক মন ভরল না, বললাম, তারপর? আর কিছু হল না, স্যার?
—না, তখন আর কিছু ঘটেনি, কিন্তু সেই গল্পটা তখন হু হু করে ছড়িয়ে পড়ছে দশ-বিশটা গাঁয়ের লোকের মুখে মুখে। মোড়ল-মাতব্বর লোকেরা আলোচনা করে বলল, ‘নির্ঘাৎ বেহ্মদত্যি’। তার আগে বেহ্মদত্যির নাম শুনেছে অনেকে, কিন্তু দেখেনি কেউ। সারা গঞ্জে আলোচনা চলছে সেই বেহ্মদত্যি নিয়ে। সবাই বলাবলি করছে, ‘এতকাল বেহ্মদত্যি নামটাই শুনিছি, সেই বেহ্মদত্যি কিনা বাস করছে আমাদের গাঁয়ের অশত্থ গাছের ডালে! নিশ্চয় ওই ব্রাহ্মণ! ‘ তারপর ক-দিন শুধু বেহ্মদত্যি নিয়ে আলোচনা সবার মুখে। চারদিক থেকে লোকজন হুড়িয়ে এল বেহ্মদত্যি দেখতে।
—দেখতে এল সবাই? দেখতে পেয়েছিল?
কী করে দেখতে পাবে? তারা তো আসছে সবাই দিনের বেলা। চারদিকে ফকফক করছে রোদ্দুর, সেই রোদের মধ্যে অশত্থগাছের ঝাঁকড়া পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে লোকে চেষ্টা করছে বেহ্মদত্যি দেখতে। দেখা যায়!
—স্যার, রাতের বেলা কেউ আসেনি?
—মাথা খারাপ? গাঁয়ের মানুষ এমনিতেই ভূতের ভয়ে মরে। তারা আসবে রাতের বেলা বেহ্মদত্যি দেখতে! বরং সন্ধে হওয়ার আগেই যে যার ঘরের পথেফিরতে লাগল। এমনকী, হাটের দিন সবারই ফিরতে রাত হওয়ার কথা, কিন্তু এখন আর কেউ রাত করে না, সন্ধের আগেই হাট শেষ, তাতে কারও কারও আনাজপাতি সব বিক্রিও হয় না, তার আগেই বিক্রিবাটা বন্ধ। সে এক মহা গোলমাল দশ-বিশটা গাঁয়ে।
—তারপর, স্যার? আমাদের কৌতূহল তখন চরমে।
—তারপর লোকজন একটু-একটু করে সাহস সঞ্চয় করতে শুরু করে। যাদের ফিরতে একটু দেরি হচ্ছে, সন্ধে পার হয়ে যাচ্ছে, তারা ফিরতে লাগল দল বেঁধে। আর যেই না সেই অশত্থ গাছের কাছে আসে, অমনি তারা জোরে জোরে গান গাইতে শুরু করে। গান গাইতে গাইতে পার হয়ে যায় অশত্থ গাছের নীচটা। কেউ কেউ ভয়ে চোখ বুজে থাকে ওই সময়টা।
—কিন্তু স্যার, দশ-বিশটা গাঁয়ের মানুষ, কারও ইচ্ছে হল না সত্যিই বেহ্মদত্যি বলে কিছু আছে কি না দেখে আসি!
—হ্যাঁ, তাও কি আর চেষ্টা হয়নি! মাঝেমধ্যে এক-একদল মানুষ বলে ওঠে, ‘ধুস্, ওসব বাজে কথা। চল আমরা রাতের বেলা দেখে আসি।’ কিন্তু তাদের সেই অভিযান কখনও খুব কার্যকরী হয়নি। একবার একদল লোক নাকি মাঝরাত্তিরে গিয়ে হাজির হয়েছিল এক হাতে লাঠি, অন্য হাতে টর্চ নিয়ে।
—লাঠি কী হবে, স্যার? লাঠি দিয়ে কি ভূত তাড়ানো যায়?
আমাদের প্রশ্নে সন্ন্যাসী স্যারও হাসতে থাকেন, সে-কথা কি আর তারা জানত না! কিন্তু হাতে একটা লাঠি থাকলে বোধ হয় মনে খুব সাহস থাকে। তারা অশত্থ গাছের কাছে গিয়ে দেখার চেষ্টা করেছিল কোথাও কিছু দেখা যায় কি না! প্রথমে অন্ধকারে চোখ চালিয়ে দেখার চেষ্টা করল, তারপর একসঙ্গে আট-দশটা টর্চ জ্বেলে আঁতিপাঁতি খুঁজেছে ডালের পাতার ফাঁকফোকরে, কিন্তু কোনও কিছুই দেখা যায়নি! এমনকি খড়মের শব্দ বলে যা প্রচারিত হয়, তার শব্দও শোনেনি কেউ।
—স্যার, এত লোকজন দেখে সেই বেহ্মদত্যি কি আর দেখা দেবেন?
—ঠিকই বলেছ। কিন্তু গ্রামদেশে যা একবার লোকমুখে আলোচিত হয়, তা আর জীবনযাপন থেকে মুছে ফেলা যায় না। তার পরেও নাকি একজন লোক সন্ধের পর সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিল অশত্থ গাছের নীচে দিয়ে, হঠাৎ মাথায় ঠুল খেয়ে পড়ে গেল সাইকেল থেকে। সাইকেল তুলে নিয়ে পড়ি কি মরি করে সেখান থেকে পালিয়ে গিয়ে বাড়িতে পৌঁছে ভিরমি খেয়ে পড়ে আর কি! পরদিন সেই কথা শুনে আবার অনেকে মিলে সেখানে এসে দেখল অশত্থগাছের একটা ঝুরি বড়ো হয়ে গেছে, তারই এক প্রান্ত নেমে এসেছে রাস্তার উপর, কিন্তু তাতে অন্য কেউ ঠুল খায় না, শুধু সেই সাইকেল-আরোহী ছিল বেশ লম্বা লোক, তাই মাথায় ঠুল খেয়ে-
আমরা তখনও গল্পের শেষটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, কিন্তু সেই খড়মের শব্দ?
—হ্যাঁ, সেই খড়মের শব্দ কিন্তু লোকে শুনতে পায়। লোকে অনেকদিন ধরে গবেষণা করে বলাবলি করতে লাগল পুর্ণিমে-আবুশ্যের তিথিতেই নাকি শুনতে পাওয়া যায় বেশি। সেসময় কখনও মধ্য রাতেও শোনা যায় গাছের এক ডাল থেকে আর এক ডালে ঘুরে বেড়াচ্ছে শব্দটা। শুনে মনে হয় সেই অশরীরী খড়ম পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে গাছটার এ-ডালে ও-ডালে।
—স্যার, সত্যিই কি বেহ্মদত্যিটা বাস করে ওখানে?
আমাদের প্রশ্ন শুনে সন্ন্যাসী স্যার হেসে বললেন, হ্যাঁ, পাঁচজনের মুখে বেহ্মদত্যিটার কথা শুনে আমাদের মনে হল ব্যাপারটা একবার সরেজমিনে দেখে আসা দরকার। আমার সেই বন্ধু, রবিন্দর, যার কথা আগে একদিন তোমাদের বলেছি, খুব সাহসী, তাকে বললাম, কী রে, গাঁয়ের সব লোক ভীতু বলে আমরাও কি ভীতু হয়ে থাকব। চল, একবার চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জন করে আসি।
আমরা এবার উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞাসা করি, গেলেন আপনারা?
—হ্যাঁ, দুজনে ঠিক করলাম একদিন অমাবস্যার তিথিতে মাঝরাতে অ্যাডভেঞ্চার করে বুঝতে চাই আসলে কেসটা কী! ব্যস, একদিন রাতের খাবার খেয়ে দুজনে সাইকেল চালিয়ে যখন সেই অশত্থগাছের নীচে এলাম, তখন ঘুটঘুট করছে অন্ধকার।
—স্যার, টর্চ আর লাঠি নিয়েছিলেন?
—না, না। বেহ্মদত্যি দেখতে বেরিয়েছি, তার সঙ্গে লাঠি নিয়ে তো কোনও চালাকি চলবে না! আর টর্চের আলো জ্বাললে তিনি কি বলবেন, ‘এই, আলো নেবাও!’ একেবারে খালি হাত দুজনের। সেখানে পৌঁছে সাইকেলদুটো কাছের একটা জিউলিগাছে ঠেসান দিয়ে রেখে দাঁড়িয়ে আছি ঘাপটি মেরে। কেউ কোথাও নেই, তিনি গাছের ডাল থেকে লাফ দিয়ে নেমে আসেন কি না সেই অপেক্ষা। তারপর দাঁড়িয়ে আছি তো আছিই, কোনও শব্দ নেই, মাঝেমধ্যে এক-আধটা ছুটকো ডাল শুকনো হয়ে পুট করে ঝরে পড়ল কোথাও, কিন্তু যার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি তেনার কোনও পাত্তা নেই!
—স্যার, পেলেন না দেখা?
—শোনোই না, সন্ন্যাসী স্যার একটু যেন অসহিষ্ণু, বললেন, তারপর হঠাৎ কোথাও যেন একটা শব্দ হল, খট খট খট খট। আমি আর রবিন্দর গা ঘেঁসাঘেঁসি করে দাঁড়িয়ে। দুজনেরই নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। দুজনেই বোঝার চেষ্টা করছি শব্দের উৎস ঠিক কোথায়! কিন্তু শব্দটা একজায়গায় থেমে নেই, যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায়। আমি তাকিয়ে আছি রবিন্দরের দিকে, রবিন্দর তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ভাবছি শব্দটা ঠিক কী! কিন্তু শব্দটা গাছের কোনও ডাল থেকে আসছে, না নীচে কোনও জায়গায় তা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না!
সন্ন্যাসী স্যার একটু আগেই একটা ছোট্ট ধমক দিয়েছেন, তা সত্ত্বেও কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে জিজ্ঞাসা করি, স্যার, শব্দটা কি নদীর দিকে চলে গেল আস্তে আস্তে?
—আসলে আমাদের তখন মনে হচ্ছে শব্দটার উৎস মোটেই গাছের ডাল নয়, কাছেই নদী, সেই নদীর দিক থেকেই আসছে শব্দটা। অমনি দুজনে চললাম নদীর ধারে। তখনও মনে হচ্ছে শব্দটা যেন চলছে আমাদের আগে আগে। আমরা তবু একটুও ভয় না পেয়ে চললাম সেই শব্দ অনুসরণ করে। তারপর একসময় পৌঁছেও গেলাম নদীর কিনারে। গিয়ে দেখি নদীর ঘাটে পড়ে আছে একটা ভাঙা নৌকো। তার মস্ত লোহার নোঙর বিধে আছে মাটির অনেক গভীরে। সেই নৌকোটা কে বা কারা ফেলে চলে গেছে, কবে গেছে কে জানে, তার আর মালিকানা নেই। মাসের অন্যদিনগুলোয় জোয়ারের জল বেশি দূর ওঠে না, নৌকোও ভাসে না, কিন্তু পূর্ণিমা বা অমাবস্যায় নদীতে যখন ভরা জোয়ার আসে, তখনই নৌকোটা ভাসে, তার ঢেউ এসে ধাক্কা দেয় নৌকোটায়, নৌকোটা ধাক্কা মারে তার নোঙরের লোহার সঙ্গে, অমনি একটা শব্দ হয় খট, এরকম ক্রমাগত হতে থাকে খট খট খট খট…
—কিন্তু স্যার গাছের উপর খড়মের শব্দ? সেটা কী করে?
—আশ্চর্য এই যে, নোঙরের সঙ্গে নৌকোর ধাক্কায় যে-শব্দটা হচ্ছে, তখন শব্দ যত না বেশি, তার চেয়েও বেশি হচ্ছে যখন সেই শব্দ বাতাসে ভেসে গিয়ে ধাক্কা দিচ্ছে অশত্থ গাছের ডালে। সেই শব্দের একটানা প্রতিধ্বনি শুনে মনে হয় গাছের ডালে কেউ ঘুরে বেড়াচ্ছে খড়ম পরে।
আমরা হাঁপ ছেড়ে বলি, স্যার, তা হলে সেই বেহ্মদত্যি সত্যি-সত্যি নেই?
সন্ন্যাসী স্যার হো হো করে হেসে উঠে বললেন, না, আছে। গাঁ-গঞ্জে একবার ভূতের গল্প চালু হয়ে গেলে তা কখনও মিলিয়ে যায় না! আমরা যেইমাত্র সবাইকে বললাম নৌকো আর নোঙরের গল্প, হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলল, তোমরা তেনাকে দেখবা কী করে! সবাই তো তেনাকে দেখতি পায় না! যাদের যাদের হালকা রাশি, শুধু তারাই দেখতে পায়!
—স্যার, হালকা রাশি কোনটা?
সন্ন্যাসী স্যার হেসে বললেন, তুলা রাশি।
