উপন্যাস
গল্প
উপন্যাস

ভূতুড়ে দুপুর – ১০

দশ

রানির জিম্মায় নতুন আগন্তুকদের বুঝিয়ে দিয়ে হুঁ পু আবার জঙ্গলের ভিতরে চলে এল, বাবা বেহ্মদত্যি নাকি তাকে স্মরণ করেছে। কড়াইমণ্ডির জঙ্গল পার হয়ে ওরা তিনজন চলে এল শহরের একপ্রান্তে। তিনতলা বাড়ি, বাড়িতে কেউ বাস করে বলে মনে হল না। ঘরে-বারান্দায় ভীষণ ধুলো জমে আছে। ঘরের সামনে একটা বিশাল লন, সেখানে বড়ো-বড়ো ঘাস।

দু-তিনটে ঘরের ধুলো মাড়াতে মাড়াতে হঠাৎ একজনের মুখোমুখি হল ওরা। তার পরনে সাদা ধবধবে একটা আলখাল্লা, মুখটা কিন্তু ঢাকা নয়। মুখে দাড়ির মতো রয়েছে। বেশ লম্বা চেহারা, হাতে একটা কমণ্ডলু। হুঁ পুকে দেখে বলল, “এসেছিস, এক সের তিল চাই, নইলে ভুজ্যি হবে না।”

হুঁ পু বোধহয় বাবা বেহ্মদত্যির খাবার-টাবার এনে দেয়, তাই এই তলব।

হুঁ পুকে তিলের হুকুম দিয়ে বেহ্মদত্যি খড়মের শব্দ তুলে তিনতলা থেকে একতলা, একতলা থেকে তিনতলা ঘুরে বেড়োতে লাগল।

হুঁ পু বলল, “এই বাড়িটায় আমাদের নতুন আস্তানা হয়েছে। এক বুড়ো-বুড়ি থাকত এই বাড়িতে, তা একদিন বাসি খাবার খেয়ে দুজনেই পটল তুলেছে। কিন্তু দুজনের কেউই এবাড়ি ছেড়ে নড়ে না। বুড়ো, পুজো-আচ্চা করত, অনেক পুণ্যি করেছিল বলে মরে গিয়ে বেহ্মদত্যি হয়ে গেছে, আর বুড়ি খুব লোভী ছিল, তাই সে হয়েছে শাঁখচুন্নি। এখন কড়াইমণ্ডির জঙ্গলে এক শ্যাওড়াগাছে থাকে। দুজনে মিলে এ-বাড়ির চার-চারটে ভাড়াটাকে তাড়িয়েছে।

“এখন রানি মিং সিং সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে মাঝেমধ্যে এ-বাড়িতে মিটিং করে যায়, ভোজসভা বসায়। শুধু হপ্তায় হপ্তায় বেহ্মদত্যিকে তিল, সেদ্ধভাত, চি-পরোটা দিয়ে যেতে হয় খোরাকি হিসেবে।”

হঠাৎ আর একটা লিকলিকে চেহারার কালো ছায়ামূর্তি দেখে ওরা সজাগ হয়ে উঠল। হুঁ পু কী একটা কাজে দোতলায় গেছে, বিল্টু ফিসফিস করে বলল, “এটা ভূত নয় রে সন্টু, বোধহয় আরেকটা শাঁখচুন্নি।”

ছায়ামূর্তিটা কেমন যেন লেংচাতে লেংচাতে আসছে। সন্টু বলল, “বোধহয় এটাই ব্রহ্মদৈত্যের বউ ছিল।”

বিল্টুদা বলল, “বোধহয় এবার একটা মজা হবে।” ইতিমধ্যে হুঁ পু এসে গেল ওখানে। শাঁখচুন্নিকে দেখে বলল, “এই যে চিনচিন ঠাকরুন, কেমন চলছে? শুক্কুরবারের ভোজসভায় এলে না কেন?”

খ্যানখেনে গলায় শাঁখচুন্নি চেঁচাল, “ও মা, শুক্কুরবার তো রায়েদের বাড়ি পৈতে ছেল, একটিন রসগোল্লা সরিয়ে এনেছিলাম যে, সে এক মহাভোজ হয়েছে সেদিন।”

সন্টুর মনে পড়ল রায়েদের বাড়ি একটিন রসগোল্লা পাওয়া যাচ্ছে না বলে কী হই-চই সেদিন! তাহলে সেই ব্যাপারটা এই চিনচিন ঠাকরুনের কাণ্ড!

শাঁখচুন্নিটা এ-বাড়িতে কেন এসেছে, একটু পরে বোঝা গেল। লেংচে-লেংচে খুঁজে বার করল ব্রহ্মদৈত্যক, তারপর বলল, “শ্যাওড়াগাছে ঝুলে থাকতে কী মজা! চলো, শ্যাওড়াগাছে থাকবে, তোমার জন্যে একটা ভালো ডাল বেছে রেখেছি।”

ব্রহ্মদৈত্যের বিশাল আকারের শরীরটা ঘুরে দাঁড়াল, তার গমগমে গলা পাকাবাড়িখানা কাঁপিয়ে দিল যেন, “আবার এসেছিস তুই, বেঁচে থাকতেও খাই-খাই, আর এখন মরে গিয়েও লোভ গেল না তোর। যা ভাগ, বুড়ি শাঁখচুন্নি। আমি এখন আহ্নিক করতে বসব।”

আহ্নিকের নাম শুনে ছুটে পালিয়ে গেল বুড়ি চিনচিন।

এগারো

বেহ্মদত্যির আখড়া থেকে বেরিয়ে হুঁ পু বলল, “আমাকে একবার কন্দকাটার আস্তানায় যেতে হবে, খুব নাকি চটে আছে রানির ওপর।”

কন্ধকাটা কে তা এখনো জানে না সন্টুরা। কতরকম ভূতের সন্ধান যে পেয়ে যাচ্ছে ভূতের রাজত্বে এসে তার ঠিক নেই। তাছাড়া রানির ওপর যে ভূত চটে আছে সে নিশ্চয়ই দারুণ বদমেজাজি। একটা বড়ো মাঠের কাছে এসে হুঁ পু বলল, “তোরা দুজনে এখানে একটু দাঁড়া, আমি কন্ধকাটার খবর নিয়ে আসি।”

হুঁ পু তখনো নাগালের বাইরে যায়নি। বিল্টুদা বলল ফিসফিস করে, “চ, আমরা পায়ে-পায়ে ওদিকটায় এগিয়ে দেখি সটকে পড়ার কোনো উপায় আছে কি না।” একটু এগোতেই দেখল একটা কবরখানার মতো, ইঁটের তৈরি একটা কবরের পাশে কী সব ইংরেজিতে লেখা। বিল্টুদা বলল, “আরে, এটা তো আমার চেনা জায়গা। একটা সৈন্যসমেত ঘোড়াকে কবর দেওয়া আছে এখানে। যুদ্ধের সময় ইংরেজরা কবর দিয়েছিল ওদের।”

অল্প-অল্প জ্যোৎস্না উঠেছে, দুজনে হনহন করে মাঠের যেদিকটায় আমবাগান, একটু ঝোপঝাপ, সেদিকে এগোতে লাগল। হঠাৎ দেখে, সামনের কাঁচা রাস্তা বেয়ে দুটো লোক আসছে। সন্টু বলল, “বিল্টুদা, এরাও তো মানুষ, এদের কাছে একটু হেল্প চাইলে বোধহয় আমরা বাঁচতে পারি।” কিন্তু লোকদুটো হঠাৎ এত রাতে, এই নির্জন মাঠের ধারে অমন আলখাল্লায় ঢাকা মূর্তি দেখে ভূত ভূত’ বলে দড়াম করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। দেখেশুনে সন্টুদের তো আক্কেল

গুড়ুম। ব্যাপারটা কী। তারা কি তাহলে সত্যি-সত্যিই ভূত হয়ে গেছে দুজনে! কখন মরে গেল তারা?

দু-দুটো সংজ্ঞাহীন মানুষকে পথের ওপর রেখে বিভ্রান্তভাবে কেটে পড়ল ওরা। অল্প-অল্প জ্যোৎস্না মাঠে বেশ ঘোর-ঘোর ভাব জাগিয়েছে। ঠিক এই সময় সন্টুর পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত ইলেকট্রিক শক লাগল। জ্যোৎস্না-ভেজা রাত্রে অল্প আলোয় মাঠের মাঝখানে তারা যা দেখল তাতে যে-কোনো মানুষেরই বুকের রক্ত হিম হয়ে যাবার কথা। দেখে, সেই কবর ফুঁড়ে হুশ করে বেরিয়ে এল একটা প্রকাণ্ড ঘোড়া, কালো মিশমিশে রং, ভীষণ তেজি আর শক্তিশালী, তার ঘাড়ের লোমগুলো যেমনি চকচকে তেমনি ঝাঁকড়া। আর তার সওয়ারি হয়ে একটা—কী বলা যায়, মুণ্ডহীন ধড় বসে আছে। লোকটা কবন্ধ, অথচ দিব্যি শরীর টান করে সওয়ারি হয়ে বসে আছে, পড়ছে তো না-ই, উপরন্তু ঘোড়া নিয়ে চরকির মতো ঘুরতে শুরু করল মাঠের চারদিকে। টগবগ-টগবগ শব্দ তুলে যেভাবে ছুটে বেড়োচ্ছে কবন্ধটা তাতে দুজনেরই নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল।

বিল্টুদা ফিসফিস করে বলল, “এরই নাম কন্ধকাটা রে। হুঁ পু এর কথাই বলছিল।” ঠিক এই সময় ঘোড়াটা সন্টুদের পাশ দিয়ে ছুটে যেতেই ওরা ভয়ে সিঁটিয়ে গেল। কবন্ধটার হাতে একটা বড়ো খাপ খোলা তলোয়ার জোছনার আলোয় ঝিকমিক-ঝিকমিক করছে।

বিল্টুদা আবার ফিসফিস করে বলল, “এর কথাই তো শুনেছিলাম রে, রোজ রাতে কবর থেকে উঠে এসে মাঠময় ছোটোছুটি করে, অনেকে দেখে ভিরমি খেয়ে মরেছে। শুধু তাই নয়, তার খোলা তলোয়ারের সামনে যে-কেউ পড়বে, অমনি কুচ করে গলাটা কাটা যাবে তার। আর তখন থেকে সেই লোকটাও কন্ধকাটা ভূত হয়ে ঘুরে বেড়োবে।

ঘোড়াটা সারা মাঠ ঘুরে ঘুরে এসে দাঁড়াল প্রায় তাদের কাছাকাছি। ঘোড়াটা থামতেই, সেই কবন্ধ লাফ দিয়ে নামল ঘাসের উপর। গলা পর্যন্ত ঢাকা আলখাল্লা, হাতে চকচকে তলোয়ার। সে দুহাত তুলে কী যেন ইশারা করল।

সন্টুরা বুঝতে পারল না, কবন্ধটা ওদের ইশারা করছে কি না। এসময় হুঁ পু কোত্থেকে এসে হাজির হয়ে ওদের বাঁচাল। হুঁ পু তার কাছে যেতেই ঘোড়াটা বিকট একটা আওয়াজ করে উঠল, আর কবন্ধ-ভূত তার তলোয়ার বনবন করে ঘুরিয়ে নানারকম সংকেত জানাল। বোঝা গেল, সে দারুণ রেগে রয়েছে। একটু পরে সে ঘোড়া ছুটিয়ে ফের কবরে ঢুকে গেল।

হুঁ পু হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে বলল, “নাও ঠ্যালা, কন্ধকাটার জন্যে এখন একশো বাদুড় জোগাড় করতে হবে, সে নাকি কতকাল বাদুড় খায়নি।”

হুঁ পুর পিছনে ছুটতে ছুটতে সন্টু ভাবল, কন্ধকাটারা যে বাদুড় খেতে ভালবাসে তা তো জানত না। কিন্তু ভাববার বেশি সময় নেই, হুঁ পু ততক্ষণে অনেকটা এগিয়ে গেছে।

বারো

হুঁ পু বলল, “এখন আমরা যাবো ঝিনাইদহের ঝিলে।”

এখান থেকে দুটো গাঁ পেরোলে তবে ঝিনাইদহ, সন্টু ওখানকার ঝিল কখনো দেখোনি, তবে ঝিলের গল্প অনেক শুনেছে। দেখলে নাকি চোখ জুড়িয়ে যায়, ধুধু জল, সে জলের রং নাকি রূপোর মতো। শান-বাঁধানো ঘাটে দাঁড়ালে শনশন বাতাসে জুড়িয়ে যায় গা, আর জলে পা চুবোলে নাকি শরীর বরফের মতো ঠান্ডা। বিল্টুদার সঙ্গে একবার ফন্দি এঁটেছিল ঝিনাইদহের ঝিলে যাবে বলে, কিন্তু সন্টুর মা কিভাবে যেন জেনে ফেলেছিলেন তাদের এই অ্যাডভেঞ্চারের কথা, ফলে আর যাওয়া হয়নি। এতদিন পরে হুঁ পুর সঙ্গে সেই সুযোগ। বিল্টুদার সঙ্গে আবার চোখাচোখি হল ওর।

হুঁ পু বলে, “সে এক দারুণ সাম্বা আজ, শিগগির চলো, নইলে তোমরা ঝাঁই ঝাঁই আর ঝিনঝিন-এর রিন্ডা দেখতে পাবে না।” সাম্বা মানে যে মজা সেটা ওরা বুঝে ফেলেছে কিন্তু রিল্ডা শব্দটা ওদের মগজে সেঁধুল না। ঝাঁই-ঝাঁই আর ঝিনঝিন নিশ্চয় দুটো ভূতের নাম। কিন্তু তারা আজ ঝিনাইদহের ঝিলে কী করবে? মাছ ধরবে নাকি? ঝিনাইদহের ঝিলে যে প্রচুর মাছ পাওয়া যায় তা ওরা শুনেছিল। একমুঠো মুড়ি ফেললে নাকি কাতারে কাতারে মাঝ শানের ঘাট পর্যন্ত চলে আসে। এক-একটা কাতলার ওজন নাকি বিশ-তিরিশ মণ।

লম্বা লম্বা পা ফেলে হেঁটে যাচ্ছে হুঁ পু, তার পিছু পিছু ওরা দুজন, প্রায় ছুটতে হচ্ছে ওদের। এক গাঁ পেরিয়ে আরেক গাঁ। নিঝুম রাত, গাঁয়ের একটা লোকও জেগে নেই, বোধহয় সব্বাই ঘুমে টইটম্বুর। কেবল ওদের দুজনের চোখেই আজ ঘুম নেই।

ঝিনাইদহের ঝিলে পৌঁছে সত্যিই চোখ জুড়িয়ে গেল ওদের। ঝিল নয়তো, যেন সমুদ্র, তার কোথাও কিনারা নেই। থইথই জল দূর আকাশের দিকে মিলিয়ে গেছে, কেবল তারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে শান-বাঁধানো মস্ত ঘাট, সিঁড়িগুলো নেমে গেছে ধাপে ধাপে। ঝিলের পাড়ে ক’টা বড়ো বড়ো তালগাছ। কিন্তু ঝিলের রূপ দেখে যেমন চোখ জুড়িয়ে গেল, তেমনি বুক কেঁপে উঠল একটু পরেই। অল্প অল্প চাঁদের আলোয় দেখল, ঝিলের পাড়ে জমা হয়েছে গুচ্চের ভূত, লম্বা আলখাল্লায় ঘুরে বেড়োচ্ছে সব। বেশ ফূর্তির মেজাজে আছে সবাই। দু-একজন ঘাসের উপর ডিগবাজি খাচ্ছে, কেউ বা একলাফে চড়ে বসছে তালগাছের মাথায়।

খানিক পরেই ভূতে গিজগিজ করতে লাগল জায়গাটা, এত ভূত কোথায় ছিল কে জানে। কেবল যে শুধু ভূতই এসেছে তা নয়, পেত্নিও আছে, সঙ্গে শাঁখচুন্নিদেরও ডেকে এনেছে।

হুঁ পু বলল, “চার-পাঁচটা গাঁয়ের ভূত এসেছে এখানে। কি সাম্বা আজ, রিণ্ডা দেখতে কে না ভালবাসে।”

তবু রিণ্ডা ব্যাপারটা ওদের মাথায় ঢুকল না। এমন সময় একটা ধূসর রঙের শিয়ালের পিঠে চড়ে রংচঙে আলখাল্লা পরা একটা ভূত এসে পৌঁছল ওখানে, তার চারপাশে হাত-পা তুলে নাচছে আরো ক’টা ভূত।

হুঁ পু বলল, “এই যে বর এসে গেল।” “বর’ শব্দটা শুনেই ওরা বুঝে গেল, রিণ্ডা মানে বিয়ে। তার মানে ঝিলের পাড়ে আজ ঝাঁই ঝাঁই আর ঝিনঝিনের বিয়ে হবে। বাহ্ বেশ মজা তো। ভূতেদের মধ্যে যে বিয়েটিয়ে হয়, তা তো জানত না ওরা।

ভাবতে না ভাবতে আরেকটা শিয়ালের পিঠে চড়ে এল একটা পেনি। নিশ্চয়ই এর নাম ঝিনঝিন। পেনিগুলো দেখতে ছোটোখাটো হয়। আর বিয়ের কনে বলে তার মাথায় একরাশ লাল-নীল পাখির পালক। আলখাল্লার রংটাও বেশ ঝলমলে। তাকে ঘিরে নাচছে চারপাঁচটা পেনি। বর-কনে দুজনে পৌঁছোতে ভূতের দঙ্গলে বেশ সাড়া পড়ে গেল। সবাই গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে একটু সময় ঘুরপাক খেয়ে নিল, দু-একজন তাদের ঠ্যাং তুলে মাথায় ছুঁয়ে ঝিল্লা জানাল নতুন বর-কনেকে।

সন্টুদের থেকে একটু দূরে দুটো ভূত তালগাছে ঠেস দিয়ে কিসব গুজগুজ ফুসফুস করছিল, তারা ফূর্তিতে যোগ দেয়নি বলে, তালগাছের ডগায় বসে থাকা একটা ভূত তার লম্বা পা ঝুলিয়ে দিয়ে দুজনের মাথা ফট্ করে ঠুকে দিল। দুটো খুলিতে ঠুকে গিয়ে এমন জোরে শব্দ হল যে, সন্টু চমকে ওঠে। ভূতদুটোর দুরবস্থা দেখে অন্য ভূতেরা হি-হি করে হেসে উঠল। সন্টু ভয়ে ভয়ে তালগাছের মাথায় তাকিয়ে দেখে, ওটা একঠেঙে ভূত কিনা। ততক্ষণে ভূতটা অবশ্য তার লম্বা ঠ্যাং তুলে নিয়েছে। সন্টু ভয়ে সিটিয়ে থাকে, কারণ সে আর বিল্টুদাও এক জায়গায় দাঁড়িয়েছিল চুপচাপ, ভূতটা যদি তাদের মাথাদুটো অমনিভাবে ঠুকে দেয়, তাহলে নির্ঘাত মাথাটা ফেটে ঘিলু বেরিয়ে পড়বে।

ততক্ষণে ঝিলের পাড়ে এক মজার কাণ্ড শুরু হয়ে গিয়েছে। ঝাঁই ঝাঁই-এর সঙ্গে যে ভূতগুলো এসেছিল, তারা ঝিনঝিন নামের পেনিটাকে ধাঁ করে ঠেলে ফেলে দিল ঝিলের জলে, অমনি রুপোলি জলে ঢেউ তুলে মিলিয়ে গেল ঝিনঝিন। আর তারপরই ঝাঁইঝাঁইকে ধাওয়া করল ঝিনঝিন-এর সহচরীরা, খানিকক্ষণ বেশ লুকোচুরি খেলা চলল এভাবে। অতগুলো ভূতের দঙ্গলের ভিতর ঝাঁই ঝাঁই টুপ করে লুকিয়ে পড়ছে, আর পেনিগুলো তাকে খুঁজে হদ্দ হয়ে যাচ্ছে। পেত্নিগুলোর দুর্দশা দেখে অন্য ভূতগুলোর কী সাম্বা, সবাই হি হি হি হি করে হাসছে, আর মজা পাচ্ছে। এর মধ্যে ঝাঁই ঝাঁই সোঁ করে তার লম্বা ঠ্যাং তুলে উঠে গেল তালগাছের মাথায়। তার পিছু-পিছু ছুটলো পেনিগুলো। তালগাছের ডগায় সে কি হুটোপুটি। ঝপ্ করে খসে পড়ল একটা তালপাতা, তার উপরে বসে থাকা একটা পেনিসুদ্ধ। সঙ্গে সঙ্গে ভূতের দঙ্গলে আরো সাম্বা। হুঁ পু ঠিকই বলেছে, রিণ্ডায় বেশ সাম্বা হয়।

পেনিটা সবে তার আলখাল্লা ঝেড়েঝুড়ে আবার তালগাছে উঠতে যাবে, এমন সময় ঝাঁইঝাঁইকে অন্যসব পেত্নিরা তালগাছের ডগা থেকে পাকড়াও করে সোজা ছুড়ে দিল ঝিলের জলে।

তাহলে লড়াই-এ জিতে গেল পেনিগুলো, দারুণ সাম্বায় তারা তখন একপাক নেচে নিল, কিন্তু ঝিনঝিন সেই যে ঝিলের জলে ডুব দিয়েছে, তার আর পাত্তা নেই। পেনিটা কি বিয়ে করতে এসে ঝিনাইদহের ঝিলে ডুবে গেল নাকি।

এদিকে ঝাঁইঝাঁই তখন জলের ভিতর তোলপাড় করে ফেলছে। অন্যসময় শনশন হাওয়া বয়ে যায় ঝিলের জলে, আজ একরত্তি বাতাস নেই। অথচ ঝাঁইঝাঁই সেই থমথমে ঝিলের জলে এমন ঢেউ তুলছে যে গাঁয়ের লোক কেউ দেখতে পেলে ভড়কে যেত।

সন্টু বুঝতে পারছে ঝিনঝিনকে খুঁজে বেড়াচ্ছে ঝাঁইঝাঁই। খুঁজতে খুঁজতে কত দূর চলে গেল! ঝিনঝিনকে খুঁজতে যত দেরি হচ্ছে, তত সাম্বা পাচ্ছে পেনিগুলো, তারা ঘাসের উপর কখনো নাচ করছে, কখনো খুশিতে ডিগবাজি খাচ্ছে।

কোথায় একটা শাঁখচুন্নি ছিল। হঠাৎ খ্যানখেনে গলায় বলল, “কি জাঁহাবাজ পেনি রে বাবা, সেই যে ডুব মেরেছে, আর দেখা নেই।”

হুঁ পু উদ্‌বিগ্ন হয়ে তাকিয়ে ছিল জলের দিকে, বিড়বিড় করে উঠল, “কি জানি বাবা, জলভূতে নিল নাকি রে?”

জলভূত কী সন্টুরা জানে না। কিন্তু সেকথা তো আর হুঁ-পু কে বলা যায় না, কায়দা করে জিজ্ঞাসা করল, “এই ঝিলে অনেক জঁলভূত আছে বুঝি?” শুনে হুঁ পু বলল, “সে কি একটা-দুটো, ফি-বছর বেশ ক’টা মানুষ জলে ডুবে মরে যে! তারা সব জলভূত হয়ে ঘুরে বেড়ায় জলের ভিতর। যেই না কেউ চান করতে নামে, অমনি ঠ্যাং ধরে দেয় টান, আর খুঁজে পাওয়া যায় না। অবিশ্যি সাঁতার জানলে আলাদা কথা। আর শানের ঘাটে দাঁড়িয়ে চান করলেও জলভূতরা জব্দ।”

সন্টুর বুকে এবার সাহস এল, সে ভালোই সাঁতার জানে। তা ছাড়া তাদের পুকুরে কেউ কোনদিন জলে ডুবে মরেনি। এইজন্যেই তার মা অচেনা পুকুরে চান করতে মানা করে, কোথায় যে জলের ভিতর জলঝাঝি লুকিয়ে থাকে, কে জানে। জলঝাঝি, না জলভূত?

খুঁজতে খুঁজতে ঝাঁইঝাঁই বেশ অনেকটা দূরে চলে গেছে, আর অমনি কিনারের কাছে ঝিনঝিন হুশ করে ভেসে উঠল। ডাঙায় দাঁড়িয়ে পেনিগুলো হই-হই করে ওঠে, ঝাঁইঝাঁই বেশ ঠকেছে। দূর থেকে ঝাঁইঝাঁইকে ফের আসতে দেখে ঝিনঝিন তো আবার ডুব।

বেশ কিছুক্ষণ এরকম আণ্ডুগাণ্ডু (লুকোচুরি খেলার পর ঝাঁইঝাই পাকড়াও করে ফেলে ঝিনঝিনকে। দুজনে ডাঙায় উঠতে আবার বেশ ফূর্তির আমেজ। হুঁ পু বলল, “আরেকটা জম্পেশ ভোজ হবে এবার। চলো, পাতা পড়েছে, বসে পড়ি।”

সত্যিই সারা মাঠ জুড়ে পাতা সাজানো হয়েছে। কখন এসব হল জানতেই পারেনি ওরা। ক’জন ভূত ব্যস্তসমস্ত হয়ে খাওয়ার আয়োজন করছে। আরে, ওপাশে রংচঙে আলখাল্লা পরে কে ঘুরছে। রানি মিং মিং না? সন্টুকে অবাক হতে দেখে হুঁ পু বলল, “বাহ্, রিণ্ডার দিনে রানি তো আসবেই। ঝিনঝিন তো অন্য গাঁয়ের পেনি, সে এবার থেকে কড়াইমণ্ডির জঙ্গলে থাকবে। তাই রানিকে তো তোয়াজ করতে হবে। ঝিল্লা জানাতে হবে।”

হুঁ পু-র একপাশে বিল্টুদা, অন্যপাশে সন্টু। চারপাশে কত ভূত যে গিজগিজ করছে, তার ইয়ত্তা নেই। সবাই খেতে বসেছে, আর অন্য ক’টা ভূত ঝপাঝপ করে পাতায় কী সব নামিয়ে রাখছে। এবার কী খেতে দেবে কে জানে? সেই শকুনের ডিম, আর মরা গিরগিটি নয় তো?

কিন্তু না, এবার ঝপাঝপ করে ওদের পাতার উপর যা পরিবেশন করা হল, তা হচ্ছে বোঁটকা গন্ধঅলা সব আস্ত ধেড়ে ইঁদুর, আর এক-এক রাশ তেলাপোকা। পিছু-পিছু আরেকটা ভূত যা নিয়ে এল তা হচ্ছে আস্ত সব বোয়াল মাছ। এগুলো নাকি ঝিনাইদহের ঝিলের মাছ।

আহা, মাছগুলো ভেজে দিলেও না-হয় খাওয়া যেত। চুপিচুপি আলখাল্লার পকেটে ঢুকিয়ে ওরা আগেরবারের মত মুখ নাড়তে লাগল। কিন্তু তাতেও রক্ষে নেই, ওদের পাতে এবার পড়ল শাদা জেলির মতো থলথলে ডিম। কিসের ডিম কে জানে, হাত দিতেও ঘেন্না করে। কিন্তু সেই ডিমগুলো নিয়ে হুঁ পু যা করল তা এক অদ্ভুত ব্যাপার। সে চট করে কটা ডিম তুলে নিয়ে তার বগলের মধ্যে চেপে ধরল, আর কমুহূর্ত পরে হাত দিয়ে বার করতেই সন্টুরা শিউরে ওঠে, হুঁ পু-র হাতে ক’টা সাপ। আর সেই সাপগুলো কচকচ করে চিবোতে লাগে সে।

শুধু হুঁ পু-ই নয়, চারপাশের সব ভূতরাই তাই করছে। সন্টুরা চুপ করে আছে দেখে হুঁ পু বলল, “খাও না, বসে আছো কেন? সাপ খেতে ভারী সাম্বা।”

সন্টু আবার ঘামতে লাগল, কী করবে ওরা। সাপের ডিমগুলো বগলে চেপে ধরলে যদি সাপ না হয় তাহলেও মুশকিল, সাপ হলে তো আরো কেলেঙ্কারি। শাঁখের করাতের আসল মানেটা এবার হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছে ওরা। চারদিকের সেই সর্পভক্ষণের মধ্যে বসে দুজনের এবার উভয়সঙ্কট।

কিন্তু সেই ভূতবৃন্দই রক্ষে করল ওদের। হঠাৎ ক’জন ভূত পট করে উঠে বসে দুটো বড়ো বড়ো সাপ নিয়ে টানাটানি করতে লাগল, সাপদুটো ময়াল সাপের মত বড়ো আর ভীষণ। লি-পু নামের এক ভূতের পাতে এই ডিম দুটো পড়েছিল, তার বগল থেকেই বেরিয়েছে সাপ দুটো। ফলে আশপাশের ভূতরা ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপরে, তারাও ময়াল সাপের ভাগ চায়।

হুঁ পু ছুটল তাদের কোন্দল থামাতে। এই সুযোগে সন্টুরা পাতা দিল উল্টে। আর তারপর দুজনে ছুটল পুকুর পাড়ে, ধেড়ে ইঁদুর আর তেলাপোকা ঝেড়ে ফেলতে। পকেট হালকা করে যেই না চলে আসবে ওরা, অমনি কোথা থেকে একটা শাঁখচুন্নি ধাঁ করে এসে পড়ে ওখানে, নাকিসুরে বলে, “এ্যাই পোঁ-ভূতের দল, তোরা ইঁদুর খাসনি কেন রে?” হু পু-কে ডেকে বলে দিলেই তো চিত্তির। সন্টুর হাত-পা ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল।

কিন্তু শাঁখচুন্নিটা সেসব দিকে গেলই না, চুকচুক শব্দ করে তাদের ফেলে দেয়া খাবারের উপর হামড়ি খেয়ে পড়ল আর গিলতে লাগল গোগ্রাসে। বিল্টুদা ফিসফিস করে বলল, “চল, শিগগির কেটে পড়ি।”

তেরো

হুঁ পু খুঁজছিল ওদের, দুজনকে দেখেই বলল, “রিণ্ডার আসল সাম্বাই তো হয়নি এখনো, চল্, বাংসার জঙ্গলে যাই, আকাশে চান্দি উঠেছে তো, দারুণ নাচ জমবে।”

একটু পরেই বুঝল বাংসার জঙ্গল মানে বাঁশবাগান। চারপাশে ঘন বাঁশঝাড়, কড়াইমণ্ডির জঙ্গল থেকে এটা কত দূরে কে জানে। মস্ত বাঁশবাগানে জড়ো হয়েছে অনেকগুলো ভূত-পেত্‌ন, মাঝখানে ঝাঁইঝাঁই আর ঝিনঝিন। একপাশে রানি মিং মিং একটা চেয়ারে বসে, তার পাশে এবং পিছনে ভূত-পেত্নির দঙ্গল। আকাশে গোল ‘চান্দি’ রয়েছে বলে ঝিরঝির করছে জ্যোৎস্না। সেই শ্লোকটা মনে পড়ছে সন্টুর, বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই/মাগো তোমার শোলক-বলা কাজলা দিদি কই। কাজলা-দিদির বদলে হুঁ পু এবার চেঁচিয়ে উঠল।

ঝাঁইঝাই থাকে তাল রুম্বায়
ঝিনঝিন থাকে নিমরুম্বায়
জঙ্গলে তাই সাম্বা সাম্বা
গোল চান্দি সাম্বা সাম্বা।।

সঙ্গে সঙ্গে যে-দৃশ্য দেখল ওরা, তাতে প্রাণটা উড়েই গেল বোধহয়। অল্প হাওয়ায় নড়ছে বাঁশপাতা, আর জ্যোৎস্নার আলোয় তার ছায়া মাটিতে কেঁপে কেঁপে উঠছে। এই আলো-আঁধারি পরিবেশে হঠাৎ বিশ-তিরিশটা ভূত টপাটপ তাদের গায়ের আলখাল্লা খুলে ফেলল, খুলে ফেলেই সাদা ধবধবে কঙ্কালের উদ্দাম নাচ। হাড়ে হাড়ে ধাক্কা লেগে খটখট শব্দ হয়। সেই ভয়ংকর দৃশ্য দেখে সন্টুর হাত-পায়ে খিল লেগে যাবার উপক্রম। একসঙ্গে এতগুলো কঙ্কাল তো আর কখনো দেখেনি। অন্য ভূতগুলো কিন্তু বেশ উপভোগ করছে সেই নাচ। ক’টা ভূত আবার নাচ দেখতে দেখতে হঠাৎ ওদের আশপাশ থেকে উঠে আলখাল্লা খুলে ফেলে, তারপর তারাও সেই নাচের দলের সঙ্গে যোগ দেয়। দর্শক হয়ে বসে থাকা ভূতগুলো হি-হি করে পিলে চমকানো হাসি হেসে উঠছে ঘনঘন। রানি মিং মিং তো ওদের সেই হাড়-খটখটি নাচ দেখে কখনো চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াচ্ছেন উত্তেজনায়, কখনো হাততালি দিচ্ছেন।

এর মধ্যে কয়েকটা পো-ভূত আবার ‘সাম্বা সাম্বা’ বলে উঠে দাঁড়াল, তারপর আলখাল্লা খুলে নাচতে লাগে দু-হাত তুলে। সবাইকে যেন নাচের নেশায় পেয়ে বসেছে। হুঁ পু হঠাৎ বিল্টুদাকে বলল, যা না, আলখাল্লা খুলে তোরাও খানিক নেচে আয়। খুব সাম্বা লাগবে।

সর্বনাশ! হুঁ পু-র কথা শুনে আকাশ ভেঙে পড়ল ওদের মাথায়। আলখাল্লা খুলে ফেললেই তো ওরা ধরা পড়ে যাবে। এতক্ষণ যা হোক সবাইকে বেশ ধোঁকা দিয়ে এসেছে, কিন্তু এখন আর রেহাই পাবার কোনো উপায় নেই।

কিন্তু ভূত না ভগবান কে ওদের সহায় হল, কে জানে। এই সময় একটা কাণ্ড ঘটল।

বাঁশগাছের ডগায় কটা ভূত উঠে বসেছিল আগে থেকেই। বোধহয় উপর থেকে নাচটা ভাল করে দেখতে পাবে বলে তাদের এই কিম্ভূত আচরণ। তা ছিল বেশ, হঠাৎ দুটো ভূতের ভিতর লাগল নাচের দোলন। সেই মগডালেই তারা তালে তালে নাচতে শুরু করে। কিন্তু ভূতের নাচ তো, একবার শুরু হলে আর রক্ষে নেই, তারা এমন বেদম নাচ করতে লাগল যে বাঁশগাছসুদ্ধ ভেঙে হুড়মুড়িয়ে পড়ল নাচের দঙ্গলের মাঝখানে। গোটা দুই ভূত তো চাপাই পড়ল বাঁশগাছের নীচে। একটুর জন্যে বেঁচে গেছেন রানি মিং মিং।

যে ভূতগুলো বাঁশগাছে চেপেছিল, রানি মিং মিং তো তাদের উপর রেগে খাপ্পা। চিঁ চিঁ স্বরে কীসব গালাগাল করলেন প্রথমে, তারপর তিনবার সাত আঙুল তুলে বিড়বিড় করে সংকেত দিয়ে চলে গেলেন দুই লাফে।

হুঁ পু বলল, আহা বেচারি পিঁ পোঁ আর ঢ্যাং ঢ্যাং, ভারী কষ্টে পড়ল ওরা।

বিল্টুদা আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞাসা করল, “কি বললেন রানি মিং মি?”

“আর বোলো না, গাম্বু (বোকা) দুটো আজ থেকে সাতদিন নিমগাছের ডালে পা বাধিয়ে ঝুলে থাকবে মাথাটা নীচের দিকে করে। পরের সাতদিন গাছের ডাল এক হাতে ধরে ঝুলে থাকবে। যদি এর মধ্যে মাটিতে তার পা ঠেকে যায়, কিংবা দুহাতে ধরে ফেলে ডাল, তাহলে শাস্তি বেড়ে যাবে আরো সাতদিন। তারপরও যদি ফেল করে, তবে চিরকালের মত ওরা গেছোভূত হয়ে থাকবে, আর মাটিতে নামতে পারবে না।”

সত্যিই বেশ কঠিন শাস্তি। সারাক্ষণ কি গাছে ঝুলে থাকা যায়? হুঁ পু-র কথা শেষ না হতে গাঁ পে নামের একটা ভূত এসে বলল, “খুব তো বকবক করছো, এদিকে আবার একটা গেরো।”

“কেন, কী হল?”

‘বাংসাগাছ চাপা পড়ে একটা ভূত কুমড়োপটাস। ভূতটার নাম গোঁগোঁ। তিন বছর আমাদের রুম্বায় এসেছে। তার ছেলে সদ্য পো-ভূত হয়েছে, তার বাপ কুমড়োপটাস হতে সে এখন ভভম্ করে কাঁদছে।”

শুনে হুঁ পু আবার হন্তদন্ত হয়ে চলল সেদিকে। সত্যিই একটা ফাটা কুমড়ো পড়ে আছে মাটিতে, আর তার পাশে বসে একটা পো ভূত নাকি সুরে কাঁদছে, ঠিক শকুনের বাচ্চা যেমন সুর করে কাঁদে।

হুঁ পু গিয়ে পো-ভূতটাকে এক তাড়া লাগায়, “ওরে রনি (পো-ভূত), ভমভম করে কাঁদছিস যে বড়ো। বাপ কুমড়োপটাশ হলে কেউ কাঁদে নাকি। দশটা ভূত কুমড়োপটাশ হলে একটা বেহ্মদত্যি, আর একশটা ভূতে একটা মামদো ভূত। চল্, সবাই মিলে সাম্বা করে হুজুং বুজুং করি। সব গাঁয়ে আর জঙ্গলে রম্বি (কুশল) জানিয়ে আয়, তোর বাপ বেহ্মদত্যির অংশ হয়ে যাবে।”

পো-ভূতটার নাম টোঁ টোঁ। সে ভভম্ ভুলে গিয়ে তাকিয়ে থাকে হুঁ পু-র দিকে। সদ্য পো-ভূত হয়েছে সে, সন্টুদের মতো হুজুং বুজুং কি বস্তু তা বুঝতে পারেনি। ভূতের রাজ্যের নিয়মকানুন জানা নেই তার, হুঁ পু তাই মুখে মুখে একটা ফর্দ করে দিল। মানুষ মরলে যেমন শ্রাদ্ধ হয়, হুজুং বুজুং তেমনি ধরনের একটা কিছু। টোঁ টোঁ; চট করে আকাশ থেকে একটা জর্দার কৌটোয় ভরে মেঘ নিয়ে আয়, যত ভূত-পেত্‌নি-শাখচুন্নি দেখবি, সবার কপালে একটা করে মেঘের টিপ পরিয়ে দিবি। আর লাগবে এক গণ্ডুষ মরা দিঘির জল, এক আঁজলা জ্যান্ত নদীর কুয়াশা, এক ছিলিম রাঙামাটির ধোঁয়া। মুখে মুখে এমন একটা বড়ো ফর্দ বলে গেল হুঁ পু যে লিখে ফেললে এক মাইল লম্বা একটা কাগজ ভরে যাবে।

ফর্দ শুনে টোঁ টোঁর ভমভম থেকে মুখটা হয়ে গেল থমথম। দেখে হুঁ পু বলল, “অমন থমথমে হয়ে গেলি যে, দেখবি একটু পরে নিশিরপুরের বলখেলার মাঠ চমচমে ভরে যাবে, আর চান্দির আলোয় কেমন জমজমে হুজুং বুজুং হচ্ছে। তোর বাপ এবার ড্যাং ড্যাং করে বেহ্মদত্যি হয়ে যাবে।”

চোদ্দো

রিন্ডার পর ফের একটা হুজুং বুজুং-এর খবর শুনে ভূতমহলে যেন সাম্বার জোয়ার বয়ে গেল। চারদিক থেকে ভূতবর্গ এসে টাম্বু করছে, কখন হবে, কোথায় হবে, কতটা জাঁকজমক। হুঁ পু তখন টোঁ টোঁকে নিয়ে পড়েছে, তার এখন অনেক কাজ, প্রথমেই তাকে যেতে হবে কালোমানিক চাটুজ্জের বাড়ি। তার জন্যে তাকে এখন সূক্ষ্মশরীর ধরতে হবে। আর একদল ভূত যাবে পিপ্পলি গাঁয়ে, সেখান থেকে আসবে জলভরা পিঁপড়ের ডিম।

এর মধ্যে রানি মিং মিং-এর তলব এল। সেপাই-ভূত এসে তার একটা পা কপালে ছুঁইয়ে বলল, “ঝিল্লা। রানি মিং মিং আপনার সাথে শলা করবেন। বড়ো পিণ্ডি না ছোটো পিণ্ডি।”

…..রানি মিং মিং-এর তলব এল। সেপাই ভূত এসে তার একটা ছুইয়ে বলল, “ঝিল্লা। রানি মিং মিং আপনার আপনার সাথে শলা শালা করবে, বড়ো পিণ্ডি না ছোটো পিণ্ডি।”

হুঁ পু রানির বড়ো লম্বু। শলাটা জরুরি, তাই হুঁ পু চপপট চলল রানির দরবারে। যাবার পথে একটা মাঠের মাঝে সন্টুদের বসিয়ে বলল, “এখানে দুদণ্ড দাঁড়া। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবি, নিশিরপুরে বল-খেলার মাঠে আজ ভোরে হুজুং বুজুং, সবাই যেন আমার সাথে দেখা করে।”

হুঁ পু চলে যেতে ওরা একটু স্বস্তি পাবে ভাবল, কিন্তু কোথায় স্বস্তি। সাঁত সাঁত করে রকমারি ভূত মাঠের ভেতর দিয়ে যাতায়াত করছে। ওরা হুজুং বুজুং হয়ে খবর দেবে ভাবছে, কিন্তু উল্টে দু-একজন ওদের বলল, বসে আছিস যে বড়ো নিশিরপুরের মাঠে হুজুং বুজুং হচ্ছে, যাবি নে? একজন আবার বলল, “এবার একটা আস্ত শকুন চাই-ই আমার। তোরা কী নিবি ধেড়ে ইঁদুর খেতে পারিস।”

অন্য একজন জিজ্ঞাসা করল, “কতো মরাই-এর হুজুং বুজুং? চৌষট্টি, তেইশ না সাত?” তার কথা সন্টুরা কিছুই বুঝল না। আলখাল্লার ভেতর হাঁ করে তাকিয়ে রইল। ভূতটা জবাব না পেয়ে বলল, “কিছুই টাম্বু রাখো না। বসে বসে ঘাস গুনছো।” সে এমন একটা ভঙ্গি করল, যেন ওদের দু’জনকে পারলে চিবিয়ে খায়।

বিন্টু চট করে বলল, “সাত।”

“কীসের পিণ্ডি হবে ওখানে? জলভরা পিঁপড়ের ডিম না বিষভরা সাপের ডিম?”

এর উত্তরটা বিন্টুদার জানা, বলল, “জলভরা পিঁপড়ের ডিম।”

“উত্তর মেরু না দক্ষিণ মেরু?” জিজ্ঞাসা করেই ভূতটা আবার বিড়বিড় করল, “বোধহয় উত্তর মেরু।” বলেই সে চলে গেল। ভাগ্যিস চলে গেল, আরো কি জিজ্ঞাসা করত কে জানে? সারাক্ষণ একনাগাড়ে যেসব অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে, তাতে ওরা দুজনেই দিশেহারা। দুজনেই ভূতকে যেমন ডোন্ট কেয়ার করত, তেমনি কিম্ভূত সব ভূতের পাল্লায় পড়ে এখন, ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’র মত অবস্থা। এখন যে এখান থেকে পালাবে সে উপায়ও নেই।

হুজুং বুজুং ব্যাপারটা চারপাশের গাঁয়ে কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে গেল, সেটাই ওদের কাছে রহস্য। যেন এক বিশাল খবর পেয়ে গোটা এলাকার ভূতরা জেগে উঠেছে।

বিল্টুদা ফিসফিস করে বলল, এখন মনে হচ্ছে, পৃথিবীতে মানুষের চেয়ে ভূতের সংখ্যা বেশি। চারদিকে যেখানে তাকাই, সবই তো ভূত।

সন্টু বলতে যাচ্ছিল, ‘ঠিক বলেছ, বিল্টুদা। একবার ঘরে ফিরতে পারলে আর আগানে- বাগানে ঘুরছিনে, ঢের শিক্ষে হয়েছে।’ কিন্তু বলা হল না, একটা অদ্ভুত চেহারার ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়াল ওদের সামনে। ছায়ামূর্তিটা অন্য ভূতের মতো নয়। তার শরীর খুব পাতলা একটা ধূসর আবরণে ঢাকা, কিন্তু আবরণের নীচে তার চোখদুটোর দিকে তাকাতে ওদের শরীর হিম হয়ে এল, ঠিক মানুষের মতো চোখ, অথচ তার দৃষ্টি কি ভীষণ! ছায়ামূর্তিটা হিহি করে হেসে বলল, “তোদের চিনতে পেরেছি।”

ওদের বুকের ভেতরটা ছাঁত করে উঠল, কী চিনতে পেরেছে ও। তাহলে কি ওরা ধরা পড়ে গেল নাকি?

—ওরে পো-ভূত, তোরা বেশ ডুবে ডুবে জল খাচ্ছিস যে, বাড়ি যাবি নাকি? ওই যে দ্যাখ, তোদের বাড়ি। ছায়ামূর্তিটা যেই সে কথা বলেছে ওমনি ওরা দুজনেই দেখল, যেখানে এতক্ষণ ধু ধু ধু মাঠ ছিল, সেটা মিলিয়ে গিয়ে ওদের বাড়ি দেখা যাচ্ছে। এত রাত হয়েছে, তবুও টিমটিম করে আলো জ্বলছে।

প্রথমটা ওদের বুক আনন্দে এক পাক নেচে উঠল, পরমুহূর্তে ছায়ামূর্তির দিকে তাকাল সন্দেহের চোখে। ছায়ামূর্তির মুখে তখনো হাসি, “যা না, একছুটে বাড়ি যা। কেউ তোদের কিচ্ছু বলবে না।”

দুজনে তখন নিজেদের বাড়ি দেখে আনন্দে তাথৈ তাথৈ করছে। চোখের নিমেষে ওয়ান-টু-থ্রি বলে দিল এক দৌড়, একলহমাও পিছন ফিরে তাকাল না। দৌড় দৌড়। বেশ একঝটকা ছুটে ফেলে দ্যাখে বাড়িটা তখনো সেই একই দূরত্বে, যা তারা একটু আগে দেখেছিল। তবু আর থামা নেই। প্রাণপণে দুজনে দৌড়ে যাচ্ছে সোজাসুজি। কতক্ষণ দৌড়েছে, তা জানে না। খানিক পরেই দুজনে বেজায় হাঁপিয়ে গেল, তবু আশ্চর্য হয়ে দেখে, তাদের বাড়ি তখনো সেই একই দূরত্বে।

এর মধ্যে কোত্থেকে হাজির হল হুঁ পু। বলল, “আরে থাম, থাম, কোথায় ছুটছিস?”

অমনি দেখে কোথায় তাদের বাড়ি! সেই ধু ধু শুনশান মাঠ যেমনকে তেমনি রয়ে গেছে। মাঝখানে স্বপ্নের মত কয়েকটা মুহূর্ত। ওরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে হুঁ পু-র দিকে। হুঁ পু বলল, ‘বুঝেছি, তোরা মেঠোভূতের পাল্লায় পড়েছিলি। এই মেঠোভূতটার নাম পিপি। ক’দিন আকে কুঁ কুঁ নামের একটা মেঠোভূতের পাল্লায় পড়ে একটা হেটুরে লোক মরেছিল। সেই পাজিটা এখন পিঁ পিঁ। মাঠে রাতদুপুরে একলা লোক পেলে এরা এতোলবেতোল ঘোরায়, তারপর ছুটতে ছুটতে একসময় বেঘোরে মারা গেলে আরো একটা মেঠোভূতের জন্ম হয়। এই মাঠে এখন তিনশো তেত্রিশটা মেঠোভূত আছে। তা তোদের পেছনে কেন লেগেছিল কে জানে। পাজিটা তো সবে মেঠোভূত হয়েছে, মানুষ আর পো-ভূতের তফাত বোঝেনি।”

সন্টু মনে মনে বলল, কেন যে পিঁ পিঁ আমাদের পেছনে লেগেছিল সে আমরাই জানি, আমরা তো আর সত্যিসত্যি পো-ভূত নই।

হুঁ পু তখনো বিড়বিড় করছে, “মেঠোভূতগুলো বড্ড জ্বালাচ্ছে আজকাল, রানি মিং মিং-কে নালিশ জানালে একযোগে সবকটা কাম্বুবান হয়ে থাকবে।”

কাম্বুবান আবার কি বস্তু! জাম্বুবান মানে তো হনুমান, কিন্তু কাম্বুবান শব্দটা কখনো শোনেনি ওরা

ওদের অবাক হতে দেখে হুঁ পু আবার বলল, “বুঝলি না তো, ইচ্ছে করলে রানি মিং মিং এমন তুক করবে যে, সবকটা মেঠোভূত মাঠের গর্তে মুখ গুঁজে পা উপরে তুলে ঠায় উল্টো দাঁড়িয়ে থাকবে চিরকাল।”