পনেরো
এরপর হুঁ পু হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে পড়ল, “এই দ্যাখো, আসল ব্যাপারটাই ভুলে মেরে এখানে দাঁড়িয়ে আছি। কিষ্কিন্ধ্যানগর থেকে তিলের নাড়ু আসবে, তা নাকি কিষ্কিন্ধ্যানগরই খুঁজে পাচ্ছে না কেউ।”
তিলের নাড়ু শুনে বিল্টুদা খুব উৎসাহিত হল, একটু-একটু সন্টুও। সন্টুদের বাড়িতে কখনো তিলের নাড়ু হলে বিল্টুদাকে মুঠো মুঠো নাড়ু যোগায় সন্টু। কিন্তু এরা তিলের নাড়ু কী করবে কে জানে। ততক্ষণে হুঁ পু হাঁটতে শুরু করেছে। হাঁটতে হাঁটতে ফের সেই কড়াইমণ্ডির জঙ্গল। গিয়ে দেখে, সে এক এলাহি কাণ্ড। গোটা জঙ্গলের ভূত বোধহয় এক জায়গায় গোল হয়ে ঘিরে বসে জটলা করছে। জটলা নয়, মিটিং-ফিটিং গোছের একটা কিছু। মিটিং-য়ের মাঝখানে টোঁ টোঁ দাঁড়িয়ে আছে। তাহলে হুজুং বুজুং-এর ব্যাপারেই এই আলোচনা।
কেউ একজন ফর্দটা মুখে মুখে বলে যাচ্ছিল, তার খানিকটা ওরা শুনতে পেল এখন : “একরামপুর থেকে এক হাজার ঊনপঞ্চাশ টিন গাওয়া ঘি, তাঁতিয়াদহ থেকে সাত হাজার তিনশো ঊননব্বই ধামা মুড়ি, বানশাই গাঁ থেকে এক হাজার দুশো নিরানব্বই কাঁদি কলা, ঝিঝিরাপোল থেকে নিরানব্বই হাজার তিনশ মুড়ির মোয়া, পেঁজরাপোল থেকে পঁয়ষট্টি হাজার দুশো একষট্টিখানা ঝুনো নারকোল, চৈতন্যগ্রাম থেকে সাতশো হাজার তিনশো বেয়াল্লিশ টিন মধু, ইমনপুর থেকে দুশো হাজার পঁয়ষট্টি হাঁড়ি দুধ, রাঙতাপুর থেকে এক লক্ষ পাঁচশো নিরানব্বই খানা কাৎলা মাছ..”
শুনতে শুনতে সন্টুদের চোখগুলো বড়ো হতে হতে প্রায় দু টাকার সাইজ হয়ে এল। এত জিনিসপত্র কোথা থেকে আসবে, আনবেই বা কে, খাবেই বা কে? সত্যিসত্যি কি এতসব জিনিস জোগাড় হবে? আগেই শুনেছে, সাতখানা মরাই-এর চাল ফুটিয়ে ভাত রান্না হবে, রান্নাই বা হবে কীভাবে।
ভাবতে ভাবতে সন্টুর মাথা ঘুরে এল। ব্যাপারটা ক্রমশ ঘোরালো হয়ে আসছে। চারদিক থেকে নাকি সুরে নানারকম কথাবার্তা হচ্ছে, এক-একজন এক-একরকম মন্তব্য করছে।
বেশ অনেকক্ষণ শলাপরামর্শ শুনে বুঝতে পারে, এক-এক গাঁয়ের ভূত এক-একটা আইটেম জোগাড় করে আনবে। যেমন একরামপুরের ভূতেরা আনবে এক হাজার ঊনপঞ্চাশ টিন গাওয়া ঘি, তাঁতিয়াদহের ভূতেরা সাত হাজার তিনশো ঊননব্বই ধামা মুড়ি, এইরকম আর কি। ভোররাতের মধ্যেই সবাই হাজির হবে নিশিরপুরে। কিন্তু সন্টু বুঝতে পারে না, টোঁ টোঁর বাপ কুমড়োপটাস হয়েছে, তার জন্যে ভিনগাঁয়ের ভূতের এত মাথাব্যথা কিসের।
যাহোক, একত্রিশ দঙ্গল ভূত মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল একত্রিশ দিকে। গোটা সাত-আট ভূত কেবল এক জায়গায় দাঁড়িয়ে গুজগুজ ফুসফুস করছে দেখে হুঁ পু তাদের ডাকল, “এই যে বাপু নস্করপাড়ার ভূতেরা, তোরা কিষ্কিন্ধ্যানগর চিনিস নে? হতচ্ছারা পাজি, ভূতের মুখে চুনহলুদ মাখাবি তোরা?” গালাগাল খেয়ে ভূতের দঙ্গল মুখ গোঁজ করে দাঁড়িয়ে থাকে। হুঁ পু এবার একটু নরম হয়ে বলল, “তা’হলে শুনে নে, পথের হদিস দি। এখান থেকে একশো পা সোজা, তারপর ডাইনে সাত রশি, সেখান থেকে সাত হাজার একশো কড়ে আঙুল উত্তরে, সেখানে একটা বটগাছ, এগারোপাক করে ঘুরবি তার সবকটা ঝুরির চারপাশে, তারপর তেরশ পা নৈঋতে, সেখান থেকে চারশ হাত ডাইনে, চারশ হাত বাঁয়ে, তারপর এক কবরখানা, কবরখানায় গিয়ে সতেরোবার ডিগবাজি খাবি, দেখবি, একটা আকন্দগাছ, সাতটা পাতা তুলে তেত্রিশবার ফুঁ দিবি, তারপর সাতবার ডাইনে-বাঁয়ে গেলেই কিষ্কিন্ধ্যানগর।”
শুনতে শুনতে সন্টুর মাথা বনবন করে ঘুরছিল। কিন্তু নস্করপাড়ার ভূতগুলো বুঝে গেল জলের মত। শোনামাত্র ধাঁ করে উধাও হয়ে গেল পলক না ফেলতে। তারা চলে যেতে হুঁ পু বলল, “আমাকে এখন তেত্রিশটা টিয়াপাখির ডিম জোগাড় করতে হবে। চল্ তো, হিজলডাঙ্গার জঙ্গলে যাই।”
সে আবার কোথায় কে জানে। হুঁ পু-র পিছু পিছু ওরা তো লেগে আছে ফেবিকলের মতো, একটু এদিক-ওদিক হবার জো নেই। কেন যে ওদের দুজনকে চোখে চোখে রেখেছে, কে জানে। সেই কখন থেকে বনবন করে লাট্টুর মতো ঘুরপাক খাচ্ছে তো খাচ্ছেই।
ঠিক এইসময় একটা সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটল। হিজলডাঙ্গার জঙ্গলে যাবার পথে একটা বিশাল শিরীষগাছের ডাল থেকে লাফ দিল একটা কিম্ভূতকিমাকার চেহারা। একনজর তাকিয়ে ওদের রক্তে যেন অ্যাটম বোম ফাটল। অনেকটা বিড়ালের মত মাথাটা, কালোভুস রঙের, চোখদুটো জ্বলছে আগুনের মত, মুখে বীভৎস হাসি। চেরা-চেরা গলায় গম্ভীর স্বরে বলল, “থাম্।” তার কণ্ঠস্বরে হুঁ পু-ও যেন নিশ্চল। মন্ত্রের মত থেমে গেল তিনজনের পা।
সেই থমথমে গলা আবার চমকে দেয় ওদের, “আমি কে জানিস তো। রক্তখেকো পিশাচ। এই শিরীষ গাছের ডালে দু’বছর ধরে আছি। অথচ তোরা কেউ আমার দিকে নজর করিস না জানিস রেগে গেলে আমি কী করতে পারি?”
হুঁ পু-র গলার স্বরে কিরকম ভয়-ভয়, “বলুন, আপনার জন্যে কী করতে পারি?”
“এত জমজম করে একটা রিণ্ডা হল, আমাকে তোরা নজর (নেমন্তন্ন) জানাসনি। বেশ সাম্বা করে কাটালি।”
তার গলার স্বরটা এমন যেন বুকের ভেতর আলপিন গেঁথে দিচ্ছে, সন্টু বিল্টুদার গায়ের সঙ্গে প্রায় মিশে আছে। ভালুকের মতো বড়োসড়ো চেহারা, অথচ বিড়ালের মত মুখ। পিশাচটা আবার বলল, বেঁচে থাকতে আমি ছিলাম সুদখোর গঙ্গারাম। লোকে বলত, পিশাচ গঙ্গারাম, এক পয়সা সুদ কেউ কম দিলে তার রক্ত চুষে খেতাম, ভিটেয় ঘুঘু চরত তার। মরে পিশাচ হবার পর সেই রক্ত চোষার অব্যেসটা যায়নি। এখন এই শিরীষগাছের তলা দিয়ে কোনো জ্যান্ত মানুষ গেলে তার রক্ত চুষে খাই। পর পর কটা খাবার পর কেউ আর এ পথ মাড়ায় না। দু’মাস উপোস যাচ্ছে। রিণ্ডার সময় নজর করিস নি। আবার শুনছি হুজুং-বুজুং হবে। অন্তত গোটা চার জ্যান্ত মানুষ চাই। বুঝলি।
হুঁ পু যে খুব বিষণ্ণ হয়ে পড়েছে তা সন্টু বুঝতে পারল। কোনরকমে ‘আচ্ছা, দেখছি’ বলে পিশাচটার পাশ কাটিয়ে যাবার উদ্যোগ করতেই সে দুম করে একটা ল্যাং মারল, অমনি হুঁ পু দুম করে উল্টে পড়ল মাটিতে, ভাগ্যিস হুঁ পু একটা ভূত, নইলে এতক্ষণ হাসপাতালে ছুটতে হত।
হুঁ পু উঠে বোকার মতো চেয়ে রইল পিশাচের দিকে, এমন সাংঘাতিক পাল্লায় সে কখনো পড়েনি এর আগে। পিশাচটা বলল, “তুই এড়িয়ে যাচ্ছিস যে বড়ো। রেগে গেলে কি করব জানিস তো। তোর লেজুড় ওই পো-ভূতদুটোকে দুই বগলের মধ্যে রেখে স্রেফ কয়েক ফোঁটা হাওয়া করে দেব, কিংবা শিরীষগাছে দুটো পাতা করে রেখে দেব, জন্মেও আর খুঁজে পাবি নে।”
কি ভয়ংকর কথা, পিশাচটা এমন বিশ্রীভাবে ওদের দুজনের দিকে চাইতে লাগল যে, সন্টুর মনে হয় ওর শরীরের উপর দিয়ে দুটো গোখরো সাপ পার হয়ে যাচ্ছে। হুঁ পু বলল, “আচ্ছা হবে।”
“ঠিক আছে, মনে থাকে যেন। না হলে সব সাম্বা এক হুড়কোয় খাম্বা করে দেব।” পিশাচটা দাঁতে দাঁত চেপে সত্যিই হুড়কো দেয়ার মতো ভাবভঙ্গি করল, সাম্বা মানে যেমন মজা, খাম্বা শব্দটার মানে হল দুঃখ, সন্টু এটা জেনে ফেলেছে।
পিশাচটার কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে ওদের ধড়ে প্রাণ এল, ওদের মানে সন্টুর আর বিল্টুদার, নিশ্চয় হুঁ পু-র নয়। হুঁ পু-র ধড়ে প্রাণ এলে ওরা দুজনে বেঁচে যেত, কিন্তু তা তো আর হবার নয়। যা হোক, তিনজনে দ্রুত পার হয়ে গেল সেই নির্জন পথটা, একটা পুকুর পাড়ে এসে থমকে দাঁড়াল হুঁ পু। কী চমৎকার জায়গাটা, পুকুরের চারপাশেই বাঁধানো ঘাট, তরতর করছে স্বচ্ছ জল, আর চারপাশের পাড়ে সার করে নারকেল গাছ লাগানো। এমন একটা পুকুরে মাছ ধরতে ভারী সুখ।
কিন্তু হুঁ পু তো আর মাছ ধরতে এখানে আসেনি, সে চটপট তার হাত লম্বা করে বাড়িয়ে দেয় নারকেল গাছের কোটরে, আর মুহূর্তে কোটর থেকে বার করে আনলো ক’টা ডিম। মুরগির ডিমের চেয়েও ছোটো ছোটো, কিন্তু নীলচে রঙ। হুঁ পু হাত বার করতেই দুটো টিয়াপাখি হুটপাট করে উড়ে বেরিয়ে গেল, আর তারস্বরে চিৎকার করতে লাগল চারপাশে ঘুরে ঘুরে। ডিমগুলো বিন্টুদার কাছে দিয়ে বলল, “ধর।” তারপর আবার আর একটা নারকেল গাছের কোটরে হাত গলিয়ে দিল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সন্টু আর বিল্টুদার আলখাল্লার পকেট ভারী হয়ে ওঠে। চারপাশে তখন সবুজ টিয়াপাখিগুলো চিৎকার করে উড়ে বেড়াচ্ছে। আহা, বেচারিদের ডিমগুলো মাঝরাতে এমনভাবে খোয়া গেল! কিন্তু কেবল ডিমই পাড়ল হুঁ পু, একটা টিয়াপাখি যদি ধরে দিত হুঁ পু, তাহলে বেশ হত। কতদিন ধরে একটা টিয়াপাখি পোষবার শখ সন্টুর।
খানিকপরেই বিন্টুদা বলে উঠল, “তেঁত্রিশটা হঁয়ে গেছে।”
“তাহলে চলো এবার, নিশিরপুরে যাই।” হুঁ পু এবার তার কোটর-অভিযানে ক্ষান্ত দিল। “তার আগে একবার টোঁ টোঁ-র সঙ্গে দেখা হওয়া দরকার। কালোমানিকের বাড়ি ঢুঁ মেরে এসেছে কি না দেখি।”
ষোলো
টোঁ টোঁর সঙ্গে দেখা হতে হুঁ পু প্রায় ধমক দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কালোমানিকের বাড়ি গিয়েছিলি? যা-যা বলেছিলাম, করেছিস?”
টোঁ টোঁ বেচারি তো ভূতের রাজত্বে এসে এমন এক ধাক্কায় পড়েছে যে তার অবস্থা কাহিল। আলখাল্লার ভিতরে তার মুখখানা ঢাকা রয়েছে বলে ঠাহর হচ্ছে না, নচেৎ তার মুখ নিশ্চয় আমসি মেরে যাবে!
টোঁ টোঁ জানায় সে গিয়েছিল পাশের গাঁয়ে কালোমানিক চাটুজ্জের বাড়ি। এ তল্লাটের মস্তো বড়োলোক কালোমানিক চাটুজ্জে। কয়েকশ বিঘে ধেনোজমির মালিক। অনেকগুলো বড়ো বড়ো গোলা। নিশিরপুরের মাঠে একটা মস্ত বেলগাছ আছে, তার পাশে একটা ছোটো অশ্বত্থ আর নিমগাছ। লোকে তাই এর নাম দিয়েছে ত্রিবটি। বছর বছর নাকি হাজরাঠাকুরের পুজো হয় এর তলায়। রাশি রাশি ভাত তরকারি রেঁধে রেখে আসে পাড়ার লোকজন, সকালে উঠে সবাই দেখে, সব থালাবাটি কড়াই-গামলা ফরসা। ঠাকুর নাকি রাতের বেলা খেয়ে যায়। টোঁ টোঁ গিয়ে কালোমানিক চাটুজ্জেকে আড়াল থেকে বলে এসেছে, “সাত মরাই-এর চাল রেঁধে হাজরা-ঠাকুরকে পুজো দে”, এবার ফসল হলে চোদ্দো মরাই ভরে যাবে।
ভয়ানক কেপ্পন মানুষ এই কালোমানিক চাটুজ্জে, কিন্তু ডবল ফসলের লোভে এর মধ্যে সাত-সাতটা গোলার চাল বড়ো বড়ো উনুনে বসিয়ে দিয়েছে।
টোঁ টোঁ-র মুখে এসব শুনে হুঁ পু বেশ সন্তুষ্ট হল, বেশ বেশ। তাহলে তোর বাপ এবার বেহ্মদত্যির অংশ হয়ে যাবে।
ইতিমধ্যে আরো কয়েকটা ভূত এসে হুঁ পু-কে জানিয়ে গেল, চারদিকে নেমন্তন্ন সব শেষ। নেমন্তন্ন করতে করতে এগারোটা গাঁয়ের ভূতকে জানান দিয়ে এসেছে, তার জন্যে হুজুং কুজুং হবে। ঝিমঝিম পুরে নাকি একটা সিপহি-ভূত এসেছে, তার জন্য একটা পাগড়ি চাই। পাগড়ি না হলে সে নাকি হুজুং-বুজুং-এ আসতে পারবে না। বিশ্রামগঞ্জের জমিদার অনেকদিন হল মরেছে, তার চাই একজোড়া নাগরাই জুতো, আর হেলান দেয়ার জন্য মখমলের তাকিয়া। ধপধপি গাঁয়ের এক ধোপা মরে গিয়ে ভূত হয়েছে, কিন্তু তার গাধাটা এখনো জলজ্যান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, প্রিয় গাধাটি ছেড়ে সে কিছুতেই আসতে চাইছে না। রমনার এক শাঁখচুন্নির বায়না, তার অন্তত সাতটা বোয়াল মাছ ভাজা চাই। মৌগ্রামের একজন মেঠোভূত বলেছে দু-টিন মধু যেন তার বরাদ্দে থাকে। রোরো নদীর জলভূতরা আসতে পারবে না, ডাঙায় উঠলেই নাকি তাদের শীত করে। তাদের দাবি, হয় সাতশো তেষট্টিখানা উলের আলখাল্লা পাঠাতে হবে, নচেৎ প্রত্যেকের জন্যে দুডাণ্ডি ভাত আর এক ঝুড়ি করে মাছ ভাজা পৌঁছে দেওয়া চাই। বৌচুরি মাঠে তালগাছের ডগায় বসে থাকা একঠেঙে ভূতরা জানিয়েছে ঝাঁইঝাঁই আর ঝিনঝিনের রিণ্ডায় ওদের নজর দেওয়া হয়নি, তাই এবারের হুজবুজে ওরা চুণ্ডু করবে। চুণ্ডু মানে স্ট্রাইক ধরনের একটা কিছু। তবে এক ডাণ্ডি করে বাদামভাজা পেলে ওরা চুণ্ডু তুলে নেবে। ভুনশা-র জঙ্গলে অনেক টাম্বু করে ভূতদের খুঁজে পাওয়া যায়নি, কোথায় গেছে কেউ জানে না। অনেকে বলছে, জঙ্গলে শুকনো পাতা পুড়িয়ে দেবার জন্য কারা আগুন জ্বেলেছিল সেই ভয়ে সব ভূতেরা জঙ্গল ছেড়ে নিরুদ্দেশ।
ফিরিস্তির পর ফিরিস্তি জোগাতে লাগল ভূতের দঙ্গল। হুঁ পু একমনে শুনে যাচ্ছে আর মাঝে মাঝে একে-ওকে ডেকে কীসব নির্দেশ দিচ্ছে। কিন্তু সবচে জবর খবর জোগালো ঝিম্পিং নামের এক ভূত, সে নাকি নেমন্তন্ন করে ফিরে আসছে, এমন সময় বিদ্যুৎ পাঠিয়ে তাকে ডেকে নিয়ে গেল রমংঝাণ্ডা জঙ্গলের ভূতরাজ রাং রাং। ঝিম্পিং-কে জানিয়েছে, রমংঝাণ্ডা জঙ্গলের সাত হাজার ভূত নিয়ে সে হুজুংবুজুং খেতে আসবে নিশিরপুরের মাঠে। রানি মিং মিং-কে যেন খবরটা জানিয়ে দেয়া হয়।
খবরটা শুনে হুঁ পু থমকে গেল, রাজা রাং রাং এমন একটা বিশাল বাহিনী নিয়ে আসবে এটা কেউ ভাবতে পারেনি। হুঁ পু ছুটল রানি মিং মিং-কে খবর দিতে। রাজা রাং রাং একবার এই
কড়াইমণ্ডির জঙ্গল নিজের দখলে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু সেবার রানি মিং মিং-এর বুদ্ধির জন্যে ওদের ইচ্ছে সফল হয়নি। আবার এখানে কেন আসছে কে জানে।
খবরটা শুনে রানি মিং মিং অবশ্য খুব একটা উত্তেজিত হলেন না। তাঁর হাতের লাল বলটা এগারোবার ছাদের দিকে ছুড়ে এ কথাই বুঝিয়ে দিলেন যে, কড়াইমণ্ডির রাজত্বে এগারোটা গাঁয়ে এগারো হাজারের বেশি ভূত আছে, সুতরাং রাজা রাং রাং-এর সাত হাজার ভূতের ধকল সামলানো খুব একটা কঠিন ব্যাপার নয়। রাজা রাং রাং যদি বেশি তেণ্ডাইমেণ্ডাই করে, তবে রানির মাথায় যে দু লক্ষ ছারপোকা ভূত আছে, তা রাজা রাং রাং ও তার সাত হাজার বাহিনীর দিকে লেলিয়ে দেয়া হবে। ওরা কেঁদে কূল পাবে না।
সত্যি, রানি মিং মিং-এর বুদ্ধিটা তারিফ করার মত। হুঁ পু খুশি হয়ে বেরিয়ে এল।
ঘুরে-ঘুরে ঘুরে-ঘুরে প্রায় ভোররাতের দিকে ওরা নিশিরপুরের বল খেলার মাঠে এসে পৌঁছোল। এসে দেখে, সে এক দশাসই কাণ্ড। মাঠের দুপাশে দুটো গোলপোস্ট, মাঠের বাইরে এককোণে মস্ত এক বেলগাছ, বেলগাছের তলায় বড়ো বড়ো হাঁড়িতে ভাত। রান্না সেরে কালোমানিক চাটুজ্জের রাঁধুনিরা উনুন নিবিয়ে চলে যেতে এখন তার চারদিকে গিজগিজ করছে ভূত-পেত্নি আর শাঁখচুন্নির দল। তাদের কিচিরমিচির আর নাকি সুরে কান পাতাই দায়। আর ধাঁ ধাঁ করে নানা গাঁয়ের ভূতরা ঝুড়ি, টিন, ডাণ্ডি ভরে ভরে খাবারদাবার এনে বোঝাই করে ফেলছে অত বড়ো মাঠখান। যত খাবার আসছে, তত নাকি সুরের উল্লাসে ভরে যাচ্ছে চারদিক। সন্টু তো হাঁ করে চারদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে রকমারি ভূত আর তাদের কাণ্ডকারখানা দেখছে।
দেখতে দেখতে সমস্ত মাঠ খাবারে ভর্তি, এত রসগোল্লা, চমচম আর পান্তুয়া কোথায় ছিল কে জানে। বোধহয় এ-তল্লাটের সমস্ত ময়রার দোকান ফাঁক করে দিয়েছে ভূতের দল। শুধু কি মিষ্টি! সারা গাঁয়ের কারো বাড়ি বোধহয় আর খাবার জিনিস কিছু রইল না, সব এনে একে একে জড়ো করল নিশিরপুরের মাঠে। এর মধ্যে সন্টু বা বিল্টুদার বাড়ির খাবার আছে কি না কে জানে। যাই হোক, এত সব খাবারের গন্ধে সন্টুর প্রাণ আনচান করতে লাগল।
টোঁ টোঁ-র বাপ গোঁ গোঁ অপঘাতে মরেছে বলে টোঁ টোঁ-কে তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। প্রায়শ্চিত্ত করার কথা এর আগে সন্টু শুনেছে। এখন দেখল ভূতের প্রায়শ্চিত্ত। রিংখাল নামের একটা ভূত টোঁ টোঁর মাথায় দূর থেকে এক-একটা টিয়াপাখির ডিম ছুড়ে মারবে। যতক্ষণ না ডিমটা ভেঙে যায়, ততক্ষণ ছুড়তেই থাকবে। এভাবে তেত্রিশবার। টোঁ টোঁ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল তার প্রায়শ্চিত্তের সময়।
তারপর টোঁ টোঁর উপর ভার পড়ল, যেখানে যত ভূত আর পেনি আর শাঁখচুন্নির যত বায়নাক্কা ছিল, সব মেটানোর। হুঁ পু এক-এক করে সেসব বায়নার ফর্দ বলে যায়, আর টোঁ টোঁ বাদামের ডাণ্ডি, ভাতের হাঁড়ি, মাছের ঝুড়ি সব ঘাড়ে বয়ে বয়ে দিয়ে আসতে থাকে। সেই• অন্তহীন ফর্দের ফরমাস বইতে বইতে বেচারি টোঁ টোঁর হাড়ে দুব্বোঘাস গজিয়ে গেল।
বেশ কিছুক্ষণ পর টোঁ টোঁ-র কাজ শেষ। কিন্তু সবাই তখনো ভাবছে, রাজা রাং রাং ও তার বাহিনী এখনো এল না কেন।
ঠিক এই সময় হুঁ পু-র মনে পড়ল, ওই যাহ, সবার বায়নাক্কা তো ঠিকঠাক মেটানো হল, কিন্তু সেই যে শিরীষ গাছের ভীষণচোখো পিশাচটার কথা তো মনে পড়েনি। রানি মিং মিং-কে সেকথা জানাতেই তিনি বললেন, পিশাচটা বড্ডো বেড়েছে, ওকে গেছোভূত করে দেব একদিন। যাক, তোমরা এবার জিম্বা (খাওয়া) শুরু করো।
কিন্তু জিম্বা শুরু করার আগেই এক কাণ্ড, হঠাৎ জ্যোৎস্নায় ফুরফুর করা রাত্তিরটায় মেঘ জমতে শুরু করে। অমন থালার মতো গেল চাঁদখানা মেঘে ঢেকে যেতে সে এক অদ্ভুত দৃশ্য।
মাঠভর্তি খাবারের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল ভূত-পেত্ন-শাঁখচুন্নির দঙ্গল। যত না খাওয়া, তার চারগুণ খাবার মাটিতে ছড়ানো। এক হাঁড়ি ভাতের উপর হয়তো হুমড়ি খেয়ে পড়েছে কোন একটা ভূত, কোথা থেকে এক শাঁখচুন্নি এসে ধাঁ করে সেই ভাতের হাঁড়ি নিয়ে ছুট। হুঁ পু ক’টা ঝুড়ি নিয়ে এসে সন্টু আর বিল্টুদাকে বলল, হাঁ করে দেখছিস কী, হাত লাগা। দেরি হলে কিছুই পাবি না।
ঠিক কথাই বলেছে হুঁ পু, একটা ভাতের ঝুড়ি আর মাছভাজার ডাণ্ডি। টেনে নিল ওরা। চারদিকে তখন সেই ভূতনৃত্য চলছে। কিন্তু খাবে কি, যেই না জুতজাত করে ঘাসের উপর বসেছে, অমনি কোথা থেকে একটা অদৃশ্য হাত এসে ওদের খাবারের পাত্র আকাশে উড়িয়ে নিয়ে চলল। শুধু ওদের পাত্রই নয়, সারা মাঠে যেখানে যত খাবারের পাত্র ছিল, পলক না ফেলতে দেখা গেল সব আকাশের দিকে উড়ে যাচ্ছে। গোল চাঁদখানা মেঘে ঢেকে যাওয়ায় চারপাশে অন্ধকার, ফলে ভালো করে বুঝতেও পারা গেল না ঠিক কি ঘটেছে। সন্টুদের মতো সমস্ত ভূতের দঙ্গল হাঁ করে চেয়ে আছে সেই উড়ন্ত খাবারগুলোর দিকে, ভাল করে জিম্বা আরম্ভও করেনি অনেকে।
একমাত্র শাঁখচুন্নিগুলো উড়ন্ত খাবারের আশা ছেড়ে দিয়ে হামড়ি খেয়ে পড়ল মাঠের ঘাসে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা খাবারের উপর।
কেউ কিছু বলার আগেই হঠাৎ দূর থেকে শোনা গেল একরাশ হাসির শব্দ, আর অস্পষ্ট আওয়াজ, “বেশ জব্দ করা গেছে ওদের।” তবে কি এসবই রাজা রাং রাং আর তার বাহিনীর কাজ? নিশ্চয়ই তাই। রানি মিং মিং-এর কাছে হুঁ পু ছুটল। গিয়ে দেখে, রাগে দাঁত কড়মড় করছেন রানি হুঁ পু-কে দেখেই বললেন, “এর শোধ নিতেই হবে। আজ থেকে তিনদিনের মধ্যে রমংঝাণ্ডায় আমরা ঘচাং (যুদ্ধ) চালাব, সবাইকে প্রস্তুত করো। আর বীরখণ্ডির জঙ্গল থেকে নিয়ে এসো শুঁয়োপোকার কাঁটা, ভীমরুলের হুল আর বাবলার ডাল। ঘচাং চাই, ঘচাং।”
সমস্ত ভূতবাহিনী চেঁচিয়ে উঠল ঘচাং চাই, ঘচাং। আকাশের দিকে তাকিয়ে সন্টুর মনে হল, এ মেঘ থেকে নির্ঘাত ঝড় উঠবে। কিন্তু তাদের জন্য আরো বিস্ময় অপেক্ষা করছিল, কোথা থেকে যেন শোনা গেল সেই পিশাচটার থমথমে গলা, “হি হি হি, যেমন আমাকে নজর দিসনি; তেমনি জব্দ করেছি বেশ।” আওয়াজটা মিলিয়ে যেতে রানি মিং মিং-এর দাঁত আবার কিড়মিড় করে উঠল, “তোরা মামদো ভূতের ঘুম ভাঙা। দুটো রনি (কচি ছেলে) খেতে চেয়েছিল, তাই জোগাড় কর। প্রতিশোধ নিতেই হবে।”
হুঁ পু-র গলাটাও বেশ গম্ভীর শোনাল, দুটো রনি আমার জোগাড় করাই আছে, এবার হয় এস্পার নয়, ওস্পার।
শুনে সন্টুর বুক শুকিয়ে গেল।
সতেরো
আলখাল্লার ভিতরে দুজনেই ঘামছে, অথচ কীভাবে এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে তা ভেবে পাচ্ছে না। আর হুঁ পু-ও একেবারে চোখে-চোখে আগলে রেখেছে ওদের, একলহমার জন্য হাতছাড়া করছে না। এখন কী উপায়? কীভাবে এর কাছ থেকে ছাড়া পাওয়া যায়। বিল্টুদা একবার ফিসফিস করে বলেছিল, “বুঝলি সন্টু, একটু চোখের আড়াল হলেই দুজনে ছুট দেব, একছুটে পগার পার। কিন্তু সামনাসামনি কখনো ছুটবি নে, তাহলে আর ঘরের ছেলে ঘরে ফেরা যাবে না। রনির ঘাড় চুষে খাবে ওরা।”
সেটা এতক্ষণে সন্টুও বুঝে ফেলেছে। সারারাত ঘুরে যে-সব বিদঘুটে, বিটকেল আর কিম্ভূতকিমাকার দৃশ্য দেখেছে, তারপরে আর ঘরে ফেরার কথা ভাবা যাচ্ছে না। ওরা নিজেরা বেঁচে আছে কি না, এ ব্যাপারেও সন্দেহ হচ্ছে। দুচারবার চিমটি কেটে দেখেছে, সাড় পাওয়া যাচ্ছে কি! একবার মনে হল, সত্যিই শরীরে সাড় নেই। সেটা ভয়ে না অন্য কারণে তাও জানে না। এরপর যদি গোটা এলাকা জুড়ে ভূতযুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে তার দৌড় কদ্দুর পৌঁছোবে কে জানে। অবশ্য তার আগেই মামদো ভূত তাদের ঘাড় মটকে রক্ত চুষবে। একতাল মেঘের মধ্যে ক’ফোঁটা রক্ত হয়ে জমে থাকবে দুজনে। কী ভয়ংকর ব্যাপার। এমন মজার আর ভয়ঙ্কর ব্যাপার তাদের জীবনে কখনো ঘটেনি।
চারপাশে সাঁ সাঁ করে ভূতের দঙ্গল আসছে, যাচ্ছে, একটা যুদ্ধং দেহি ভাব সবার ঘোরাফেরার মধ্যে। হুঁ পু ব্যস্তসমস্ত হয়ে চারদিকের ভূতদের সঙ্গে গুজগুজ ফুসফুস করছে। হয়তো যুদ্ধের শলাপরামর্শ। একটু পরে বলল, “তোরা এই শিরীষগাছের ডালে দুদণ্ড বোস। আমি মামদোভূতের টাঙ্গু নিয়ে আসি।” বলে হাত লম্বা করে দুজনকে শিরীষগাছের মগডালে বসিয়ে রেখে কোথায় হাওয়া হয়ে গেল।
হুঁ পু চোখের আড়াল হতেই বিল্টুদা বলল, “সন্টু, এই সুযোগ, চ’ নেমে পড়ি। মামদো ভূত জাগবার আগেই আমাদের কেটে পড়তে হবে।”
অনেক কষ্টে ওরা গাছ থেকে নেমে দেখল সামনে একটা ঝোপ-ঝোপ জঙ্গল, তার ভেতর দিয়ে একটা কাঁচা পথ। পথটা জঙ্গলের ভিতরে এগিয়ে গিয়েছে, সেই পথ বরাবর ছুট লাগাল ওরা দুজনে। মুখের ঢাকাটা ওরা সরিয়ে ফেলেছে, তাতে দেখতে অসুবিধে হচ্ছে না বটে, কিন্তু লতাপাতা, ঝোপঝাড়ের ভিতর দিয়ে ছুটতে প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে।
ছুটতে ছুটতে হঠাৎ বিল্টুদা সন্টুর হাত ধরে চট করে থেমে গেল, তারপর দুজনে লুকিয়ে পোড়ল একটা বড়োসড়ো কাঁঠালগাছের পিছনে। দুটো ছায়ামূর্তি এগিয়ে আসছে হনহন করে। সন্টুর বুকটা কেঁপে উঠল, ওদের দেখে ফেলেনি তো ছায়ামূর্তি দুটো!
একটু পরেই আলখাল্লা পরা মূর্তিদুটো লম্বা-লম্বা পা ফেলে ওদের পাশ দিয়ে চলে গেল। ভাগ্যিস ওদের দেখতে পায়নি! একটু এদিক-ওদিক তাকিয়ে বিল্টুদা বলল, “আয় সন্টু, পালাই।” আবার ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল দুজনে। অনেকক্ষণ এক নাগাড়ে ছোটার পরে ওরা থামল একটা মাঠের কাছে। মাঠে নতুন লাঙল দেওয়া হয়েছে বলে, দৌড়োতে পারছে না ওরা, পায়ে জুতো নেই, তার উপর আলখাল্লাটা ফেলতেও পারছে না। একদণ্ড জিরোবার জন্য ওরা মাঠের পাশে হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়ল।
আর যেই না বসেছে, অমনি চোখে অন্ধকার দেখল দুজনে। কে যেন তাদের দুজনের গলা চেপে ধরে শূন্যে তুলে ধরেছে, আর ঝড়ের বেগে নিয়ে যাচ্ছে অন্য কোথাও। চুল-টুল খাড়া হয়ে উঠেছে, গায়ের আলখাল্লা উড়ছে পতাকার মতো। কোথায় চলেছে তারা?
আঠারো
সন্টুর মনে হল তাদের পিঠে কেউ যেন একজোড়া করে পাখা লাগিয়ে দিয়েছে, আর তাতে ভর করে ঝড়ের মতো ছুটে চলেছে তারা। সম্ভবত তাদের পালাবার ব্যাপারটা ছায়ামূর্তিদের কেউ দেখে ফেলেছে। এতক্ষণ ভূতের রাজ্যে দিব্যি ধাপ্পা দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল ওরা, কিন্তু এবার আর নিস্তার নেই। সন্টুর বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল, এবার নির্ঘাত ঘাড় মটকে মেরে ফেলা হবে ওদের।
ঝড়ের বেগে উড়তে-উড়তে তারা এসে নামল ইস্কুল-ঘরের মতো বিরাট লম্বা একটা বাড়ির সামনে। জায়গাটা সন্টুর বেশ চেনা-চেনা। এই মাঠে সে ফুটবল-খেলা দেখতে এসেছে অনেকবার।
এই মাঠে তারা নিজেরাই নেমে এল, না কেউ তাদের নামিয়ে দিল, সন্টু বুঝতে পারল না। বিল্টুদাও ওর দিকে ছানাবড়া চোখে তাকিয়ে আছে, কথা বলতে পারছে না, কীভাবে এখানে ঝড়ের মতো উড়ে এল বুঝতে পারছে না। আলখাল্লার ভেতর থেকে মুখটা বার করে সন্টু বলল, “বিল্টুদা, কী হবে?”
বলতে বলতে দেখতে পেল, একটা ছায়ামূর্তি হনহন করে হেঁটে আসছে। দেখতে পেয়ে তাদের বুকের ভেতর আবার হিম হয়ে এল। নাহ্। তারা এই ভূতের রাজ্য থেকে আর নিস্তার পাবে না।
ছায়ামূর্তি কাছে আসতেই সন্টু চিনে ফেলল, এর নাম গাঁ-পে। হুঁ-পুরই বন্ধু। কিছুক্ষণ আগে একে রানির সভায় দেখেছে, একটা শকুনের ডিম বেশি খেয়ে ফেলেছিল বলে রানি খুব বকে দিয়েছিল। এর আবার কী মতলব কে জানে! গাঁ-পে ওদের দেখতে পেয়েই বলে উঠল, “এই যে পো-ভূতদুটো, কোথায় কেটে পড়ছিলি দুজনে। হুঁ-পু তো তোদের খোঁজে কী কোনপাড়ে করছে তা জানিস! এখন তোদের শাস্তি হবে কী শাস্তি তাও হুঁ পু জানিয়ে দিল। ওদের দুজনকেই এখন চুয়াল্লিশটা করে শকুনের ডিম খেতে হবে। একটু পরেই হুঁ পু এসে হাজির। বলল, চল রানির দরবারের রানির হুকুম। কচমচ করে চিবোতে হবে শকুনের ডিম।
শুনে তো ওদের প্রাণ উড়ে যাবার জোগাড়। হুঁ পু ওদের রানির দরবারের পাশের ঘরে এনে হাজির করে বলল, “বোস্, খানসামা ডাকি, শকুনের ডিম আনুক।” আলখাল্লার ভিতর দিয়ে দুজনে দুজনের দিকে তাকাল। এবার কী করবে ওরা?
এবার আর নিস্তার নেই। ভাবতে ভাবতে টুপি পরা খানসামা এল, দু-গামলা ভর্তি শকুনের ডিম নিয়ে। ইয়া বড়ো বড়ো ডিম। দেখে তো ওদের দুজনের ভিরমি খাবার যোগাড়।
হুঁ পু এসে বলল, “নে, চটপট খেয়ে নে।” আলখাল্লার ভিতর দিয়ে ওরা আবার চোখাচোখি করল, তারপর বিল্টুদা এক কাণ্ড করে বসল। চট্ করে পকেট থেকে বার করল একটা দেশলাই, কখন যেন পথে কুড়িয়ে পেয়েছিল। ফশ্ করে দেশলাই জ্বালতেই অবাক কাণ্ড। কোথায় হুঁ পু, আর কোথায় রানি মিং-মিং। মুহূর্তে ভূতের রাজত্ব একেবারে ফরসা। সন্টুর ধড়ে এবার যেন প্রাণ ফিরে এল, আর বিল্টদাও আনন্দে সন্টুকে নিয়ে তুলে ধরল উঁচুতে, তা-থৈ তা-থৈ নৃত্য করতে লাগল। আর সেই ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে গেল সন্টুর। দেখে, সামনে দাঁড়িয়ে বিল্টুদা, হাতে ফলসার রাশ। বলছে, “কী রে, গল্পের বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিস এখানে।”
***
