উপন্যাস
গল্প
উপন্যাস

ভূতবাংলোয় রাত্রিভর – তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

ভূত-বাংলোয় রাতভর

ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের রাজত্বকালে জেলা থেকে শুরু করে মহকুমা পর্যন্ত অনেক সরকারি অট্টালিকা নির্মিত হয়েছিল যা এতকাল পরেও ঠায় দণ্ডায়মান। কোনটিরও হয়তো খসে পড়েছে পলেস্তারা, কোনওটির থাম ঝুরঝুরে, একালের সরকার বাহাদুর সেগুলি মেরামতি করে চেষ্টা করেন তাদের নিজের পায়ে দাঁড় করাতে। কিন্তু পুরোনো চাল তেমন ভাতে বাড়ে না!

মেদিনীপুর ও বাঁকুড়ার সীমান্তবর্তী এরকমই একটি ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের বাংলো বর্তমান কাহিনির পটভূমি। মেদিনীপুর থেকে বাঁকুড়াগামী হাইওয়েটি কখনও কখনও ঘন জঙ্গলে ভরা। শিরীষ, অর্জুন, শাল সেগুন, পিয়ালের গা-ঘেঁষাঘেষি উপস্থিতি রাস্তাটিকে করে তুলেছে ডাহা নির্জন। লোকালয় থেকে কিছু দূরে জঙ্গলের পটভূমিকায় একটি পুরোনো বাংলো টিকে আছে তখনও, কিন্তু বহু বছর হল কোনও ট্যুরিস্ট কিংবা সরকারি আধিকারিক সেখানে পা-ও দেননি কাজে কিংবা অকাজে। জেলা সদর থেকে সোয়া ঘন্টার পথ, এই নিরালা-নির্জন পটভূমিতে থাকার চেয়ে গাড়িতে নিজের কোয়ার্টারে ফিরে গিয়ে গা ঢেলে দেওয়াই শ্রেয়।

কিন্তু হঠাৎ সেদিন ঘটল এক ঘোর অঘটন। জেলাশাসক অশোকবরণ রায় কাছের এক ব্লক- এলাকায় ব্যাপক ঝামেলা মিটিয়ে ক্লান্ত হয়ে জেলাশহরে ফিরবেন ভাবছেন, তখনই হঠাৎ তাঁর নজরে পড়ল এই পরিত্যক্ত বাংলোটি। থানা খুব কাছেই, সেখানে গিয়ে বললেন, ওই যে একটা বাংলো দেখলাম, চারপাশে শালের জঙ্গল, ওখানে থাকা যায় রাতে?

অফিসার ইন চার্জ রুদ্রাংশু চক্রবর্তী আমতা-আমতা করে বললেন, ওখানে থাকবেন, স্যার? এই থানায় আমার সাড়ে তিন বছর হয়ে গেল, কাউকে ওখানে ঢুকতেও দেখিনি।

থানার ওসি-ও সারাদিন জেলাশাসকের সঙ্গে ছিলেন, ল অ্যান্ড অর্ডার ডিউটি করে ড্যাম ক্লান্ত, সবে ভাবছেন ডিএম সাহেব চলে গেলে ডিনার সেরে জম্পেশ করে ঘুম দেবেন, তা নয় এখন

জেলাশাসক একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, নিশ্চয় একজন চৌকিদার আছে ওখানে? মাস- মাস মাইনে নেয়? তা হলে থাকতে অসুবিধে হবে কেন? আপনি ডিনারের ব্যবস্থা করুন। খেয়েদেয়ে ওখানেই রাতটা কাটিয়ে ভোরে ফিরে যাব ডিস্ট্রিক্ট হেডকোয়ার্টারে।

জেলাশাসকের কথা মানে হুকুম, শুধু ওসি তো নয়, থানার বরিষ্ঠ অফিসার থেকে কনিষ্ঠ কনস্টেবল—সবারই আক্কেল গুড়ুম। তিনি বাংলোয় রাতে ঘুমোতে চাওয়া মানে বাকি পুলিশদের রাত্রিজাগরণ। ডিএম থাকতে চাইলে হয়তো এসপি-ও থাকতে চাইবেন। কিংবা পুলিশের অন্য সিনিয়র কর্তারাও। কিন্তু বাংলোয় তো মাত্র একখানা থাকার মতো ঘর!

অবশ্য শেষপর্যন্ত এসপি আর অ্যাডিশনাল এসপি পুরোনো বাংলোয় থাকার অ্যাডভেঞ্চার না দেখিয়ে এটা-ওটা অজুহাত দর্শিয়ে চলে গেলেন জেলাসদরে। এসডিপিও কী আর করেন, বললেন, বড়োবাবু, ডিএম-কে ফেলে আমি কী করে ফিরে যাই! আমার জন্যও একটা ব্যবস্থা করুন।

বাংলোয় একজন কেয়ারটেকার আছেন, যার কোনও রিটায়ারমেন্ট নেই। বয়স সত্তর প্লাস। তাঁর সঙ্গে একটু গল্প করে ডিএম বোঝার চেষ্টা করছিলেন কেন কেউ এই বাংলোয় রাত্রিবাস করেন না!

ওদিকে শুধু ডিএম সাহেবের জন্যই ডিনারের আয়োজন করে ডিউটি শেষ হল না ওসি-র, ব্যবস্থা করতে হল আরও কয়েকটি প্লেটের। এ সব ক্ষেত্রে গ্রামে-গ্রামে মুর্গিরা প্রস্তুত থাকে আত্মত্যাগের, অতএব গরম-গরম মুরগির ঝোল আর ধবধবে সাদা ভাত দামি প্লেটে সাজিয়ে দিতে সাহেবরা ড্যাম খুশি।

সেই ফুরসতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলছে বহুদিন ব্যবহার না-করা বাংলোর পুনরুজ্জীবনের। তাতে একটাই ঘর, সেখানে থাকবেন ডিএম, ফলে অন্য অফিসারদের জন্য আনানো হল কয়েকটা টেন্ট। সেই তাঁবুগুলি বাংলো থেকে অদূরে টাঙানো হল বহু মেহনত করে।

ডিএম সাহেব অবশ্য সে সব নিয়ে মাথা ঘামালেন না, ডিনার শেষ হতে মস্ত একটা ঢেকুর তুলে শুতে চলে গেলেন বাংলোর ভিতর ঝড়ের মতো তৈরি করা ধবধবে বিছানায়। বহুদিনের অব্যবহৃত ঘর, ভিতরে একটা সোঁদা গন্ধ, কিন্তু সব কটা জানালা খুলে দেওয়ায় মিষ্টি এক-এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়িয়ে এল চোখ। কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলেন জানেন না, হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল কী একটা শব্দে। কেউ কি দরজায় টোকা দিচ্ছে! চোখ খুলতেই মিশ অন্ধকার। কিছুই চোখে পড়ছে না! কান খাড়া করে শুনতে চাইলেন শব্দটা ঠিক শুনেছেন কি না, না কি স্বপ্ন!

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না শব্দের উৎস কোথায়! এই মধ্যরাতে জেলা শহর থেকে দূরবর্তী বাংলোর দরজায় কে শব্দ করতে পারে ভেবে কালক্ষেপ করলেন কিছুক্ষণ।

একটু পরেই কোথাও যেন শুনতে পেলেন পায়ের শব্দ। ঘরের মধ্যে, না কি বারান্দায় তা বোঝার চেষ্টা করলেন। বাংলোর চত্বরে নিশ্চয় পাহারায় আছে কেউ, তার বা তাদের পায়ের শব্দ!

পরক্ষণে হঠাৎ শুনলেন দরজায় কেউ যেন শব্দ করছে, টক টক টক টক।

ডিএম সাহেব বিছানায় উঠে বসলেন এবার। থানার ওসি তাঁর বালিশের পাশে একটা তিন ব্যাটারির টর্চ রেখে দিয়েছেন যাতে প্রয়োজনমতো ব্যবহার করতে পারেন ডিএম। সেটি জ্বালতেই ঘর ঝকঝক করে উঠল আলোয়। কিন্তু ঘরের মধ্যে তো কেউ নেই! পরক্ষণে এও ভাবলেন ঘরের ভিতর কারও থাকার তো প্রশ্নই নেই!

দু-এক মুহূর্ত অপেক্ষা করার পর চেঁচিয়ে বললেন, কে?

কিন্তু বাইরে থেকে কোনও উত্তর এল না।

শুধু আবার টক টক টক—

মধ্য রাতে দরজায় টক টক টক টক শব্দ শুনে চমকে উঠলেন ডিএম সাহেব।

পুরোনো আমলের ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের বাংলোর চারপাশে কোনও এক কালে পাঁচিল ছিল, এখন তার এখানে-ওখানে অজস্র ফাঁকফোকর। কেউ থাকেন না বলে মেরামতিও করা হয়নি বহুকাল। জেলার কর্ণধার ডিএম সেই বাংলোয় রাত কাটাচ্ছেন বলে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা। বাংলোর ঠিক বাইরে, বারান্দার নীচে সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী আছে দু-জন। বাংলোর পিছনেও দু-জন। গেটের কাছে একটা চেয়ারের উপর বসে আছেন একজন এস আই। ডিএম আঁচ করার চেষ্টা করলেন হঠাৎ কোনও কারণে তাদেরই কি কেউ দরজায় শব্দ করছে টক টক টক টক।

কিন্তু কেন মধ্য রাতে ঘুম ভাঙিয়ে ডেকে তুলতে চাইছে তাঁকে! তাহলে কি আইনশৃঙ্খলাজনিত যে-সমস্যাটা নিয়ে সারাদিন কাটিয়েছেন, মনে হয়েছিল মিটে গেছে, সেই সমস্যাটা কি মাথা চাড়া দিয়ে উঠল আবার!

বার দুই ‘কে’ বলার পরও কোনও উত্তর এল না বাংলোর বাইরে থেকে। আবার বিছানায় শুয়ে চোখ বুজলেন কিছুটা উদবিগ্ন হয়ে। কিন্তু আর তাঁর চোখে ঘুম আসে না! একরাশ অস্বস্তি আর বিরক্তিতে ভরে উঠেছে ভিতরটা। সারাদিন খুব ধকল গেছে, রাতও হয়েছে অনেক, এখন চোখে ঘুম না এলে–

পরক্ষণেই আবার পদশব্দ শুলেন বারান্দায়। তারপর দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে কেউ টোকা মারতে শুরু করল, টক টক টক টক–

একবার নয়, পর পর তিন-চার বার শব্দটা হতেই তড়াক করে উঠে বসলেন বিছানার উপর। চেঁচিয়ে বললেন, কে?

এবারও কোনও উত্তর এল না বাইরে থেকে। জবাব না পেয়ে, ভারী বিরক্ত মুখে টর্চ হাতে নিয়ে মশারির বাইরে এসে খুললেন দরজার ছিটকিনি। কিন্তু বাইরে তো কেউ নেই! একটু দূরে দাঁড়ানো দুই নিরাপত্তারক্ষী তাঁকে হঠাৎ বেরোতে দেখে সন্ত্রস্ত হয়ে তাকিয়ে দাঁড়ায় অ্যাটেনশন ভঙ্গিতে। আরও দূরে চেয়ারে বসা এসআই উঠে দাঁড়িয়ে অ্যাটেনশন। রায় সাহেব বারান্দা থেকে নীচে নেমে ডাকলেন এসআইকে, শুনুন-

এসআই ছুটতে ছুটতে এলেন, স্যার-

—আপনারা কেউ আমার দরজায় টক টক শব্দ করছিলেন?

এসআই আশ্চর্য হয়ে বললেন, না, স্যার।

—তা হলে নিশ্চয় বাইরের কেউ এসে দরজায় ধাক্কা মারছিল!

এসআই খুবই বিস্মিত ডিএম সাহেবের কথায়, বললেন, তা কী করে হবে, স্যার? বাংলোর সামনে -পিছনে গার্ডরা দাঁড়িয়ে ডিউটিতে। আমি বসে আছি গেটের মুখে। কারও পক্ষে সম্ভব নয় এতগুলো চোখ এড়িয়ে বাংলোর বারান্দায় ওঠা।

একটু দূরে সাদাচুলো কেয়ারটেকারের দিকে নজর পড়তে দেখলেন তার চোখ রক্তবর্ণ। ব্যাটা খুব ঘুম দিচ্ছিল আউটহাউসটায়!

কিছুটা অবিশ্বাস আর দোদুল্যমান মনে অশোকবরণ রায় আবার চলে এলেন ঘরের ভিতরে। টর্চ জ্বেলে তন্নতন্ন দেখলেন ঘরের ভিতরটা, খুললেন বাথরুমের দরজাও, কিন্তু কোনও অস্বাভাবিক কিছু না দেখতে পেয়ে ছিটকিনি এঁটে আবার চেষ্টা করলেন ঘুমোনোর।

মধ্যযামের পৃথিবী নিঃঝুম, শুনশান। এখনও ঘুমোতে পারলে তিন-চার ঘন্টা ঘুমোনো যায়। দু-একবার এপাশ ওপাশ করে, হাই তুলে ধ্যান করতে লাগলেন নিদ্রাদেবীর, কিন্তু ঘুমের চটকা একবার ভেঙে গেলে দ্বিতীয়বার আসতে চায় না। ঠিক তখনই মনে হল বারান্দায় কারও পায়ের শব্দ হচ্ছে। একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল কারও। পরক্ষণে ঠিক আগের মতো দরজায় টক টক টক টক—

একবার নয়, দু-দুবার শব্দটা স্পষ্ট শুনে আবার উঠে বসলেন বিছানায়। এবার তিনি নিশ্চিত হলেন কানে ভুল শোনেননি! অথচ এসআই বেশ জোর দিয়ে বললেন কাউকে কম্পাউন্ডে ঢুকতে দেখেননি! এখন তাঁর মনে হচ্ছে গার্ড বা এসআই যে-যার ঘুমে ঢুলছে, সেই সুযোগে কোনও দুষ্টু লোক কম্পাউন্ডে ঢুকে মজা করছে তাঁর সঙ্গে।

তিনি টর্চ না-জ্বেলেই আস্তে আস্তে নামলেন বিছানা থেকে। একটা কিছু করতেই হবে তাঁকে। রাতদুপুরে যে-ই তাঁর সঙ্গে মস্করা করুক না কেন, তার হেস্তনেস্ত দেখে ছাড়বেন!

এরপর দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন চুপিচুপি। সেই মুহূর্তে স্পষ্ট শুনলেন দরজার বাইরে আবার সেই শব্দ, টক টক টক টক—

অমনি প্রবল ক্রুদ্ধ হয়ে একটানে খুলে ফেললেন দরজার পাল্লা, একেবারে হাতেনাতে ধরবেন কালপ্রিটকে এই ভেবে ঝটকা দিয়ে বেরিয়ে এলেন বারান্দায়।

কিন্তু বেরিয়ে কী আশ্চর্য, কেউ তো কোত্থাও নেই বারান্দায় বা বারান্দার নীচে! একটু দূরে দাঁড়িয়ে দুই নিরাপত্তারক্ষী, অদূরে চেয়ারে বসে এসআই। তারা তিনজনেই তাঁকে আবার বেরোতে দেখে শশব্যস্ত অ্যাটেনশন। ছুটে এলেন এসআই, বললেন, স্যার, কোনও প্রব্লেম?

ডিএম সাহেবের তখন স্থির বিশ্বাস সবাই চোখ বুজে ঢুলছে, তাদের অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে কেউ একজন নষ্ট করছে তাঁর রাতের ঘুম। এসআইকে সামনে পেয়ে উগরে দিলেন তাঁর ক্রোধ, বললেন, আপনারা কী গার্ড দিচ্ছেন এখানে বসে! কেউ একজন আমার দরজায় বারবার ঘা দিচ্ছে, আর আপনারা কেউ দেখছেন না! যতবার ঘুমোবার চেষ্টা করছি, অমনি ডিস্টার্ব করছে

এসআই মধ্যবয়সি মানুষ, অবাক হয়ে বললেন, সে কী, স্যার, আবার? আমি তো সারাক্ষণ নজর রেখেছি বারান্দার দিকে। কেউ তো বারান্দায় ওঠেনি!

ডিএম তখন বেজায় ক্রুদ্ধ, কিছুতেই মানতে চাইলেন না এসআইয়ের কথা, বললেন, আপনি নজর রেখেছেন? ইউ আর অ্যা লায়ার। চেয়ারে বসে বসে ঘুমোচ্ছেন, ভাঙা পাঁচিলের ভেতর দিয়ে কে না কে কম্পাউন্ডে ঢুকে পড়ে ধোঁকা দিচ্ছে আপনাদের, আর আমার ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে! ইউ আর মোস্ট ইররেসপনসিবল! আপনাকে এই মুহূর্তে চাকরি থেকে সাসপেন্ড করলাম।

ডিএমের ক্রোধ তখন এমনই পর্যায়ে যে, এসআই আর কিছু বলার সাহস অর্জন করতে পারলেন না, হায়ারার্কি অনুযায়ী তাঁর কথা বলার এক্তিয়ারও নেই এই মুহূর্তে। খবর পেয়ে তক্ষুনি ছুটে এলেন পুলিশের অন্য কর্তাব্যক্তিরা। ডিএমের কথা শুনে তাঁরাও নিশ্চিত হলেন পাঁচিলের ফাটল গলে কেউ একজন ঢুকে পড়েছে কম্পাউন্ডের ভিতরে, আর বিরক্ত করছে জেলার সর্বোচ্চ কর্তাকে।

এসডিপিও ঘুম ভেঙে এসেছেন ছুটতে ছুটতে। সব শুনে তিনিও হতবাক।

রাতেই এসআইয়ের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হল সাসপেনশন অর্ডার। বাকি রাত ঘুমের প্রশ্নই নেই, সকাল হতে তখনও ঢের দেরি। ডিএম সাহেব বললেন, ‘গাড়িকে খবর দিন, আমি ফিরে যাব।’ সেই এসআই তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনেক অনুনয়বিনয় করে বললেন, স্যার, আমরা কেউই এরকম কোনও লোককে বাংলো চত্বরে দেখিনি। ডিএম সাহেব কী শব্দ শুনলেন তা বুঝতে পারছি না!

তাঁর আবেদন পৌঁছে দেওয়া হল ডিএম সাহেবের কাছে, কিন্তু তিনি তাঁর আদেশে অনড়, বারবার বলছেন, আমি স্পষ্ট শুনেছি দরজায় টকটক আওয়াজ। তা হলে কি বলতে চাইছেন ভূতে দরজায় শব্দ করছে?

ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সাতপুরোনো বাংলো থেকে বেরিয়ে আর কোনও দিকে তাকালেন না জেলাশাসক। চারদিকে অখণ্ড নিশুতি। শালগাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে সদাজাগ্রত প্রহরীর মতো। ড্রাইভার বাংলোর সামনে গাড়ি লাগাতেই তিনি উঠে বসলেন সিটে। অতঃপর ড্রাইভার গাড়িতে স্টার্ট দিতে হু হু করে পেরিয়ে চললেন লম্বা পিচপথ।

রাস্তার দু-পাশে ঘন জঙ্গল, গাছগাছালি ঝুঁকে আছে রাস্তার উপর। তখনও ভালো করে ভোর হয়নি, অন্ধকার তার রেণু ছড়াচ্ছে পৃথিবীর মাটিতে। রাতের ঘুম তাঁর দু-চোখে ভিড় করে আছে। হয়তো বা একটু তন্দ্রা এসেছিল চোখে, হঠাৎ শুনলেন তাঁর গাড়ির ভিতরেই কেউ যেন ফিসফিস করে বলল, কাজটা কি ভালো করলেন, রায়সাহেব?

ডিএম চমকে তাকিয়ে দেখলেন গাড়ির ভিতরটা। হঠাৎ কে বলল কথাটা! সামনে ড্রাইভারের সিটে বসে আছে তাঁর ড্রাইভার পল্লব, অন্ধকার পথ গাড়ির হেডলাইট দিয়ে চিরতে চিরতে সজোরে চলেছে জেলা সদরের পথ ধরে। পল্লব খুব কমই কথা বলে গাড়ি চালানোর সময়। তার কাজ শুধু রোবটের মতো মাইলের পর মাইল পথ চলা। সে ছাড়া গাড়ির ভিতর আর কারও থাকার কোনও সম্ভাবনা নেই। তা হলে কে বলল কথাটা?

গাড়ির ভিতরকার অন্ধকারের মধ্যে চোখ চালিয়ে কাউকে আবিষ্কার করতে পারলেন না অসিতবরণ রায়। খুব অস্বস্তিতে পড়লেন জেলার কর্ণধার। তা হলে রাত্রিবেলা বাংলোয় ঢোকার পর যা-যা ঘটেছে সবই কি তাঁর মনের ভুল! তা হলে কি সাব-ইনস্পেক্টরটির কোনও দোষ নেই! শুধু-শুধু সাসপেন্ড করেছেন তাকে! একটি নির্দোষ পুলিশ অফিসারকে বিনা কারণে দোষী সাব্যস্ত করলেন! সাসপেনশন অর্ডারটি কি রদ করে দেওয়া উচিত?

পরক্ষণে উপলব্ধি করলেন এ ক্ষেত্রে ভুল স্বীকার করলে বিষয়টি অন্য মাত্রা নেবে! এই অর্ডার তুলে নিলে হয়তো হাসাহাসি হবে সবার মধ্যে। বিরূপ প্রতিক্রিয়াও হতে পারে! একেই তো বাংলোয় উপস্থিত সবাই তাঁর এই আচরণের কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পায়নি!

কিছুক্ষণের মধ্যে ড্রাইভার পল্লব রাতের ফাঁকা রাস্তা ফুঁড়ে ঝড়ের গতিতে গাড়ি নিয়ে এসে দাঁড় করাল তাঁর বাংলোর সামনে। তখন সবে ভোর হচ্ছে, তবু বাংলোর ঘরের নরম বিছানা পেতে জম্পেশ করে ঘুম দিয়ে নিলেন অনেক বেলা অবধি। ঘুম ভাঙত না হয়তো, কিন্তু হঠাৎ কেউ যেন কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, কাজটা কি ভালো করলেন, রায়সাহেব?

আবার ঠিক রাতের মতই ধড়মড় করে উঠে বসলেন ডিএম। যাতে ভালো করে ঘুম হয় সেই উদ্দেশ্যে তাঁর স্ত্রী রমলা সব দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘরটা আধো অন্ধকার করে দিয়ে গেছে, সেই আঁধার-আঁধার পরিবেশের মধ্যে চোখ চালিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলেন কথাটা উচ্চারণ করল কে! ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলেন, না কি সত্যিই কেউ–

ঘড়িতে চোখ রেখে দেখলেন বেলা প্রায় দশটা। এত বেলা পর্যন্ত খুব কমই ঘুমিয়েছেন আগে দ্রুত স্নান করে ঢুকে গেলেন তাঁর অফিস চেম্বারে। নানা কাজের মধ্যে, টেলিফোনে অন্যের সঙ্গে কথা বলতে-বলতেও ভাবছিলেন সত্যিই কি কেউ কথা বলছিল তাঁর সঙ্গে, না মনের ভুল! সবটাই কি ভূতুড়ে!

যদি রাতের সব কথা বিশ্বাস করতে হয়, তা হলে তো ভূতের অস্তিত্ব স্বীকার করতে হয়!

সেদিন বিকেলের দিকে কোনও একটা কাজের ছুতোয় পুলিশ সুপার ঢুকে পড়লেন তাঁর চেম্বারে, এ-কথা সে-কথার পর বললেন, ডিএম সাহেব, আমি কাল রাতে ওখান থেকে চলে আসার পর কি ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের বাংলোয় কোনও অসুবিধে হয়েছিল?

ডিএম সাহেব জোরে জোরে ঘাড় নেড়ে চেষ্টা করলেন তাঁর উৎকণ্ঠা কাটানোর। বললেন, হ্যাঁ, কে একজন বারান্দায় উঠে–

পুলিশ সুপার হাসলেন, বললেন, যাই হোক ওখান থেকে চলে এসে ভালো করেছেন! ডিএম চমকে উঠে বললেন, কেন বলুন তো!

পুলিশ সুপার হাসলেন, অর্থবহ সে হাসি, বললেন, আসলে কি জানেন, বহুদিন ওই বাংলোটায় কেউ রাত্রিবাস করেননি। খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি কোনও একজন অফিসার বহুকাল আগে ওই ঘরটায় রাতে থাকার সময় সুইসাইড করেছিল। তারপর থেকে যে কেউ রাতে থাকতে এসেছে, কোনও না কোনও ঝামেলায় পড়েছে। ওসি জানতেন ঘটনাটা, কিন্তু আপনাকে বলতে সাহস পায়নি পাছে আপনি ভাবেন সেখানে রাত্রিবাস করতে ওসি নিরুৎসাহ করছেন আপনাকে!

ডিএমের ভুরুতে কোঁচ, আপনি বলছেন ভূতের উপদ্রব?

—না, আমিও ও সবে বিশ্বাস করি না। তবে কেউ রাতে আর থাকতে চায় না বলে ওদের দপ্তর থেকে আর মেরামতি করতেও চায় না। ওই একজন কেয়ারটেকার আছে, তার বয়স সত্তর হতে চলল, তাকেই রেখে দিয়েছে কীভাবে যেন!

ডিএম বললেন, কাল ওই কেয়ারটেকারও এরকম একটা গল্প বলার চেষ্টা করছিল, তাতে আমি ভেবেছিলাম লোকটি নিশ্চয় কুঁড়ে, বাবুরা কেউ এসে থাকলে তাঁদের দেখভাল করতে গেলে খাটতে হবে, তাই ভূতের গল্প বলে আমাকে ডিসকারেজ করছে!

এসপি-ও বললেন, থানার ওসি-র কথা আমিও বিশ্বাস করিনি। ভেবেছিলাম বড়ো অফিসাররা ওই বাংলোয় থাকলে থানার অর্ধেক স্টাফকে রাত জাগতে হয় বলে হয়তো এরকম একটা গল্প চাউর করে দিয়েছে এলাকায়।

ডিএম সাহেব এখনও স্বীকার করতে চাইছেন না তিনি কোনও ভূতের পাল্লায় পড়েছিলেন কাল রাতে। এমনও হতে পারে ভূতের গল্পটা মগজের ভিতর ঘুরঘুর করছিল বলে অবচেতন মনে কাজ করছিল ভূতের এপিসোডটা।

এসপি পরক্ষণে বলেন, এসআই কাল রাত্রি থেকে খুব কান্নাকাটি করছে, বলছে তার কোনও দোষ নেই, সে চেয়ারে বসে জেগেই ছিল, সারা রাত দু-চোখের পাতা এক করেনি।

ডিএম ইতস্তত করে বললেন, আমাকে কী করতে বলছেন?

—এসআই বার বার ক্ষমা চেয়ে বলছে, তার কোনও দোষ নেই। তাকে যদি এবারের মতো ক্ষমা করে দেন।

ডিএম বিষয়টা নিয়ে ভাবলেন কিছুক্ষণ, অতঃপর বললেন, দেখুন, সাসপেনশন অর্ডার যখন একবার দিয়েই ফেলেছি, তখন তা আর এরকমভাবে তুলে নেওয়া যায় না! কেউ সাসপেন্ডেন্ড হলে তাকে কারণ দর্শানোর জন্য চিঠি দেওয়া হবে। সেই চিঠি পাওয়ার পর এসআইকে লিখিত ভাবে বলতে হবে, ‘আমার কোনও দোষ নেই। এবারের মতো আমাকে রেহাই দেওয়া হোক।’ আমি তার উত্তরে ‘স্যাটিসফায়েড’ হয়ে বলব, কনসিডাড, অ্যান্ড হি ইজ হেয়ারবাই রি- ইনস্টেটেড।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *