উপন্যাস
গল্প
উপন্যাস

ভূতে পাওয়ার গল্প – তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

ভূতে পাওয়ার গল্প

ইস্কুল থেকে পিচরাস্তা বরাবর আসার পথে বাঁয়ে শ্মশানকালীতলা। খুব জাগ্রত কালী। বছরে একবার সারারাত ধরে ডে-লাইট জ্বেলে খুব ধুমধাম করে পুজো হয়। অন্যসময় খাঁ খাঁ করে শ্মশান। শ্মশানের পাশেই মস্ত অশত্থ গাছ, তার অসংখ্য ঝুরি নেমে এসে ভিড় করেছে চারপাশে। সে ঝুরির কত না গড়ন, কিছু এসে ঝুলে আছে ঠিক মাটির উপর পর্যন্ত। কিছু এমনভাবে নেমে এসেছে রাস্তার দিকে যে, চলতে গেলে ঠেকে যায় মাথার তালুতে। কয়েকটা মোটা ঝুরি আবার মাটিতে গেঁথে গিয়ে শিকড় গজিয়েছে তার থেকে। সেগুলো কয়েকটা এমনই দেখতে যেন তারাই একেকটা ছোটোখাটো গুঁড়ি। আর মূলগুঁড়িটা দেখতে তো ভয়াল আকারের। তার চারপাশে এই ঝুরিঅলা গুড়িগুলো ঘিরে থাকায় পুরো জায়গাটা প্রায় গোলকধাঁধার মতো। অনায়াসে চোরপুলিশ খেলা যায়।

শঙ্খরা অনেকবার ইস্কুল থেকে ফেরার পথে থম্ হয়ে দাঁড়িয়ে লক্ষ করেছে এই গুঁড়িটার গড়ন। কিন্তু ভুলেও কখনও চোর-পুলিশ খেলার সাধ জাগেনি তাদের। কারণ এই অশত্থগাছের ডালেই থাকে নানান ধরনের ভূত-প্রেত। পাড়াগাঁয়ে বউঝিদের মুখে তেনাদের নিয়ে কত না গল্পগাথা।

এই শ্মশানকালীতলা পেরোতে গিয়েই তো আর একবার ভূতে ধরল হিরেদাকে। এই নিয়ে তিনবার। এর আগে আরও দু’দফায় তার ঘাড়ে ভূত চেপেছে। প্রথমবার তিনদিন, দ্বিতীয়বার সাতদিনের মাথায় অনেক কষ্টে তার ঘাড় থেকে ভূত নামিয়েছিল একাদশী ওঝা। এবার ধরেছে ফের, আর মনে হচ্ছে বেশ জম্পেশ করে ধরেছে। প্রথমদিনেই বলে ফিরেছে, এবার আর নড়ছি নে। এই ভট্টাচায্যিবাড়িতেই পাকাপাকি থেকে যাব।

শুনে গাঁয়ের মাতব্বর রথতলার গণেশবাবু বলেছেন, আর হিরেকে ভূতে ধরবে না তো কাকে ধরবে। বেটাছেলে হয়ে মেয়েদের মতো লম্বা-লম্বা চুল রাখে—

ঈশ্বরীপুরে হিরে আর কড়িকে সবাই একডাকে চেনে। দু’জনেরই গলায়-গলায় ভাব। দুজনেই মেয়েলিস্বভাবের লোক। তাদের কথাবার্তার ঢঙ, হাঁটাচলা সবই মেয়েদের মতো। চুলও

কাঁধ ছাড়িয়ে পড়েছে নিচে। পরনে সরুপাড় ধুতির উপর আঁজি-আজি শার্ট, কনুই পর্যন্ত হাতা-গোটানো।

দু’জনের মধ্যে হিরেদার চেহারা লম্বাটে ধরনের, দোহারা গড়ন। তুলনায় কড়িদা একটু বেঁটে, মোটা না হলেও স্বাস্থ্য বেশ ভালোই। এটুকু অমিল ছাড়া তাদের মধ্যে আর সব ব্যাপারেই ঘোরতর মিল। প্রায়শ তাদের দু’জনকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখা যায় হাতে হাত ধরে, গায়ে- গায়ে ঘেঁষে। পিছন থেকে তাদের হাঁটার ধরন দেখলে মনে হবে ঠিক দু’জন মেয়েই যেন। তিরিশের কাছাকাছি বয়স দু’জনেরই, কারোরই বিয়ে হয়নি। গাঁয়ের লোকে মস্করা করে বলে, বিয়ে দিতে গেলে তো কোনো পুরুষমানুষের সঙ্গেই বিয়ে দিতে হবে ওদের।

তাদের এই মেয়েলি ঢঙের অবশ্য খানিকটা কারণ আছে। পাড়ায় বা গঞ্জে কোনও যাত্রা হলে হিরে আর কড়িই মেয়েদের রোলে অভিনয় করে। শাড়ি পরে মঞ্চে নামলে কার সাধ্যি বোঝার যে, ওরা মেয়ে নয়। কখনো সাবিত্রী বা সীতা, কখনো লুৎফা, কখনো অনসূয়া-প্রিয়ম্বদাও।

এহেন হিরেদাকে ভূতে ধরতে শঙ্খরা বেশ ভয়ই পেয়ে গেল। শ্মশানকালীতলার পাশ দিয়ে হেঁটে আসতে গিয়ে তারা বরাবরই খুব আতঙ্ক অনুভব করে। সে আতঙ্ক বেড়ে গেল আরও। ইস্কুলের সব ছেলেরাই এখন চায় সন্ধের আগেই যাতে শ্মশানকালীতলার জায়গাটা পেরিয়ে যেতে পারে। হঠাৎ ছুটির পর ইস্কুলের পাশে সাপুড়েরা ঝাঁপি খুলে বসে সাপখেলা দেখালেও সেদিকে ফিরে তাকায় না কেউ। কখনো ড্রিলের ক্লাস ভাঙতে দেরি হয়ে গেলে কেউ আর একলা আসে না। সবাই একসঙ্গে জোট বেঁধে নিশ্বাস বন্ধ করে হনহন করে পার হয়ে যায় অশত্থ গাছের তলা। সন্ধের ঘোরালো আলোয় তখন শ্মশানকালীতলা এক আতঙ্কের পরিবেশ। হঠাৎ কোথাও একটা শকুন ডেকে উঠলে ছেলেদের হাড়ে খটখটি লেগে যায়। এক হাঁটুতে ঠেকে যায় আর এক হাঁটুর মালাইচাকি। সবাই সমস্বরে বলতে থাকে, ‘ভূত আমার পুত, পেত্নি আমার ঝি, রামলক্ষ্মণ সঙ্গে আছে করবি আমায় কী।’ তাতে খানিকটা ভয় কমে যায় অবশ্য।

পাশের বাড়ি ঝুমনো এসে পাকামি করে বলল, জানিস্ হিরেদার রাশি খুব হালকা, ও’জন্যেই ওকে টপাটপ ভূতে পায়।

—তাই নাকি! হাল্কারাশি আবার কীরকম?

—ওই যে, মা বলল, তুলোরাশি।

—তুলো! শঙ্খ বেশ ঘাবড়ে যায়। তার নিজের কী রাশি তা যে জানে না। নিজে সে প্রচণ্ড ভীতু। বিশেষ করে ভূতেই তার সবচেয়ে ভয়। তাহলে তার এই ভূতভীতি কি এই হালকা রাশি হবার জন্যই? তার রাশি কি আরো হালকা? গোলাপিরঙের হাওয়াই মিঠাই যেমন তুলোর চেয়েও হালকা, তেমনি কোন রাশি।

ঝুমনোর দিদি উমনো আবার খানিকটা দিদিগিরি ফলালো তাদের উপর, সন্ধে হয়ে গেলে সঙ্গে একটা লোহা রাখবি। লোহা ছুঁয়ে থাকলে ভূতে আর কিছু করতে পারবে না। সবচেয়ে ভালো হয় সঙ্গে একটা জাঁতি রাখতে পারলে। জাঁতির কাছে ভূত খুব জব্দ।

শঙ্খ বেশ ভাবনায় পড়ে। তাদের বাড়িতে মাত্র একটাই জাঁতি। সে জাঁতিতে করে ঠাকুমা রোজ সুপুরি কুচোয়। পানের মধ্যে কুচানো সুপুরি দিয়ে খিলি করে রাখে। সেই জাঁতি কি ব্যাগের মধ্যে ভরে ইস্কুলে নিয়ে যাওয়া যাবে!

ঠাকুমাকে সে-কথা বলতেই তিনি প্রায় হাঁ-হাঁ করে উঠলেন, এ আবার কোনদিশি কথা! দিনদিন আদিখ্যেতাপনা কি বেড়ে যাচ্ছে তোর? জাঁতি নিয়ে গেলে আমি পান খাব কী করে! জাঁতিই বা কী হবে তোর?

জাঁতি যে কী কাজে লাগবে তা মরে গেলেও ঠাকুমাকে বলতে পারবে না সে। বললেই ঠাকুমা হয়তো গালে হাত দিয়ে বলবে, সে কি রে ধাড়ি ছেলে। তোর এত ভূতের ভয়।

অগত্যা ইস্কুল থেকে ফেরার পথে সে ছুঁয়ে থাকে তার বই-এর ব্যাগের কোণে লোহার বক্‌লেশটা।

.

দুই

শঙ্খর বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী হল পল্টন। তার স্বাস্থ্যটাও গুটধরনের, চেহারাও বেশ লম্বা- চওড়া। ভূতের গল্প শুনে তার হাতের গুলতিটা বাগিয়ে ধরে, আমার সঙ্গে কোনও ভূত যদি চালাকি করতে আসে, তাহলে তার মাথার খুলিটা উড়িয়ে দেব।

পল্টন বরাবর ডাকাবুকো ধরনের। তার কথায় শঙ্খর বুকে একটু সাহস ফিরে আসে। তবু সে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিতে দ্বিধা করে না, কিন্তু ভূতদের তো শুনি চোখে দেখা যায় না। না-দেখতে পেলে তুই গুলতি ছুড়বি কোনদিকে, তার আগেই যদি পিছন থেকে এসে গলা টিপে ধরে!

পল্টন একমুহূর্ত থম্ মেরে যায় কথাটা ভেবে। তারপর বেশ বিজ্ঞের মতো বলল, ভূতেরা কিন্তু বাচ্চা ছেলেদের ধরে না। বেছে বেছে ধরে যত বুড়োধাড়িদের।

পল্টনের বিচারবুদ্ধি দেখে শঙ্খ হাঁ হয়ে যায়। ঠিকই বলেছে পল্টন। রেখাদিই হোক, রাঙাবউদিই হোক, আর জেলেপাড়ার লবঙ্গবউই হোক, সবাইই তো বয়সে বেশ বড়োই। ভূত তো বেছেবেছে তাদেরই ধরছে, আর হিরেদা, সে তো শঙ্খর রনোকাকার চেয়েও ঢের ঢের বড়ো।

শঙ্খকে হাঁ অবস্থায় রেখেই পল্টন আবার বলল, চল্ তো একবার দেখে আসি হিরেদাকে। রগড়টা কী হচ্ছে।

শঙ্খ চোখ বিস্ফারিত করে বলে, তুই যাবি?

—তুইও চল্ না, যশাইকাটি থেকে যজ্ঞেশ্বর ওঝা এসেছে। সে এসেই নাকি কি এক যজ্ঞ শুরু করেছে।

ভিতরে-ভিতরে শঙ্খর কৌতূহলও কম ছিল না। পল্টন সাহস জোগাতেই সেও রাজি হয়ে গেল। দু’জনে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে গেল হিরেদার ভূতে পাওয়ার কাণ্ডভান্ড দেখতে।

কিন্তু হিরেদাদের বাড়ির সামনে মস্ত ভিড়। ছোটোখাটো দালানবাড়ির বারান্দায় অনেক লোক জমা হয়ে উঁকিঝুঁকি মারছে। প্রায় সারাদিনই এরকম লোক জমে আছে বলে হিরেদার বাবা মাঝেমধ্যে বলছেন, আপনারা সবাই এত ভিড় করবেন না। এতে রোগীর কষ্ট হচ্ছে। ভিড় হালকা করুন—

পুবদিকের জানলা আধখোলা আছে দেখতে পেয়ে শঙ্খরা ঘরের ভিতরে নজর করতে পারল। একটা তক্তপোশের উপর শুইয়ে রাখা হয়েছে হিরেদাকে, তার মাথায় হাওয়া করছেন থান-পরা এক মহিলা। এপাশে চেয়ারে বসে আছেন আরও তিন-চারজন ভদ্রলোক। তাঁরা ফিসফিস করে শলাপরামর্শ করছেন। ঘরের এককোণে দাঁড়িয়ে আছেন আরও দু-তিনজন মহিলা, বেশভূষা দেখে বোঝা যাচ্ছে সবাইই বিধবা।

হিরেদার মা সেই কোন ছোটোবেলায় মারা গেছেন। তার বাবা ব্যস্ত থাকেন ঈশ্বরীপুর গঞ্জে নিজের মস্ত স্টেশনারি দোকান নিয়ে। বাড়িতে লোক বলতে এইসব থানপরা জেঠিমা, পিসিমা, ঠাকুমারা। তাদের চোখেমুখে দুশ্চিন্তা আর আতঙ্কের ছাপ। এর আগে আরও দু’বার ভূতের আক্রমণ হওয়ায় ব্যাপারটা তাঁদের গা-সওয়া হয়ে যাবার কথা। কিন্তু এবারে দুশ্চিন্তা বেড়েছে। প্রায় দিনদশেক হয়ে গেল হিরেদার ঘাড়ে বেশ কায়েম করে বসেছে ভূতটা, নড়বার কোনো লক্ষণই নেই।

হিরেদার বাবা দু’চারবার অনুরোধ করার পরও ভিড় কমছে না। সবাই আসছে কিছু না কিছু উপদেশ দিতে। গাঁয়ে প্রায়শ একে-ওকে ভূতে পেয়ে থাকে। ইদানীং তো তেনাদের উপদ্রব আরও বেড়েছে। ফলে সবারই কিছু না কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে এ-ব্যাপারে। কেউ বলছে, সরষে-ঝাড়ান দাও ভালো করে। সরষের কাছেই ভূত জব্দ। কেউ বলছে, নাকের কাছে আগুন-পোড়া ধর, ভূত বাপ-বাপ করে পালাবে। কেউ বলছে, না হে, সরষে দিয়ে আর হবে না। এখন সরষের মধ্যেই ভূত। একজন আবার বলল, বেড়াচাঁপার দশানন ওঝাকে আনালে না কেন, তার হাতে কী একটা ছড়ি থাকে, সেটা ভূতের চোখের সামনে দোলালেই–

আর একজন তৎক্ষণাৎ বলল, আরে বাবা, যজ্ঞেশ্বর ওঝাও কম যায় না। দ্যাখ্ না, এসে ইস্তক কী কাণ্ড করছে।

এর আগের দু’বার এসেছিল একাদশীও ঝা। দু’ দু’বার ভূত তাড়াতে পেরে তার খুব নাম হয়েছিল, কিন্তু এবারে দিনসাতেক ঝাড়ফুক করে ক্ষান্ত দিয়েছে, না হে, এবারে মনে হয় বড়ো কিছুতে ধরেছে।

‘বড়ো কিছু’ বলেই বোধহয় এবারে আরও বড়ো ওঝা এসেছে। এতক্ষণে নজরে পড়ল শঙ্খদের, অন্য এক ঘরে বাঘছাল আসনের উপর স্থির হয়ে বসে আছে ভয়ংকর চেহারার একজন লোক। কপালে লাল সিঁদুরের মস্ত ফোঁটা। রুক্ষ ঝাঁকড়া চুল। চোখদুটো যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে এমন তেজ। পরনে লালরঙের একখণ্ড কাপড়। হাতে একটা অদ্ভুতধরনের বাঁকানো শিকড়, সেটা সে আলতো করে ধরে আছে আগুনের উপর। শিকড় থেকে একটু পরে ধোঁয়া বেরোতে শুরু করে। সে ধোঁয়ায় এক অদ্ভুত গন্ধ। সেই গন্ধ ও-ঘর থেকে ক্রমে হিরেদার ঘরে এসে ঢুকতেই বেশ নড়েচড়ে উঠল সে। যে-মহিলা অনেকক্ষণ ধরে হাওয়া করছিলেন, হঠাৎ তাঁর হাত থেকে পাখাটা কেড়ে নিয়ে হিরেদা বলল, যা তো। সর্ এখান থেকে। আমি এখন বিশ্রাম নেব।

হিরেদার কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠল শঙ্খরা। হিরেদার গলা মোটেই ওরকম নয়, একটু মেয়েলি ধরনের। যাত্রায় অভিনয়ের সময় স্বর আরও সরু করে কথা বলে। হঠাৎ এমন ভারী আর গম্ভীর পুরুষালি গলা শুনে আশ্চর্য হবারই কথা।

মহিলা খানিকটা আতঙ্কিত হয়ে তক্তপোশ থেকে নেমে সরে দাঁড়ালেন। আর তাতেই হিরেদার মুখখানা এবার স্পষ্ট দেখা গেল। বোধহয় একটু আগেই স্নান করানো হয়েছে তাকে। ভিজে লম্বাচুল দু’পাশে পাতা করে আঁচড়ানো। কপালে একটা সিঁদুরের ফোঁটাও। তাতে তাকে একজন বিয়েঅলা মেয়েদের মতো লাগছে। শুধু পরনে সেই চিরকালের আঁজি-আজি শার্ট, আর সরু নরুণপাড় সাদা ধুতি।

এতক্ষণ চোখ বুজে ছিল বলে বোঝা যায়নি। এখন চোখ মেলতেই দেখা গেল, হিরেদার চোখ দুটো বেশ লাল, রক্তজবার মতো রং। সে চোখে ক্রোধ, ভর্ৎসনা ফুটে বেরোচ্ছে তীব্রভাবে, মুখের হাবভাবও হঠাৎ বেশ ভয়ংকর হয়ে উঠল।

এর মধ্যে যজ্ঞেশ্বর-ওঝা ওঘর থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলিপাকানো শিকড়টা এ-ঘরে নিয়ে হাজির হতেই ধড়মড় করে উঠল হিরেদা, কর্কশ কণ্ঠে বলল, কে তুই?

যজ্ঞেশ্বর-ওঝা প্রচণ্ডভাবে ধমক দিয়ে বলে উঠল, এ্যাই, বেশি ভ্যানতাড়া করবিনি। মেরে পিঠের চাম্ খুলে নেব কিন্তু।

হিরেদা তার দিকে লাল চোখ করে তাকাল। সে চোখে ধকধক করছে প্রবল রাগ।

তার চাউনির রকম দেখে শঙ্খর গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। সে পল্টনের পিঠে চিমটি কেটে বলল, চল্ রে পল্টন। বাড়ি যাই।

পল্টন তাকে একটুও পাত্তা না দিয়ে বলল, আর একটু দাঁড়া না। ওঝাটা নিশ্চয় কিছু একটা রগড় করবে এরপর।

ওঝার হাতের শিকড়ের ধোঁয়া ততক্ষণে কুণ্ডলি পাকিয়ে ঘিরে ফেলছে হিরেদাকে। তাতে ছটফট করে উঠল হিরেদা, খবরদার বলছি, আমাকে তাড়ানোর চেষ্টা করিসনে। ভালো হবে না কিন্তু

যজ্ঞেশ্বর ওঝা হঠাৎ হা হা করে হেসে উঠল ভয়ংকরভাবে, হুঁ, তাহলে ঠিক ধরেছি। তবে আমাকে তুই কিছু করতে পারবি নে। বাড়ি থেকে বেরোবার সময় বাড়ি বেঁধে তবে বেরিয়েছি।

হিরেদার চোখ তখন জবাফুলের মতো টকটকে লাল, এমন কঠিনভাবে তাকাচ্ছে যজ্ঞেশ্বর- ওঝার দিকে যেন তাকে এইমুহূর্ত ভস্ম করে ফেলবে। কিন্তু ওঝা তাকে একটুও রেয়াত করছে না। বরং একটু পরেই হিরেদাকে বশ করে ফেলল। হিরেদা কাঁপতে কাঁপতে ঝপ্ করে শুয়ে পড়ল বিছানায়। মুখে একটা গোঁ গোঁ আওয়াজ।

যজ্ঞেশ্বর-ওঝা মুখে একটা শব্দ করে বলল, হুম্, এ যে সে ভূত নয়, খোদ ব্ৰহ্মদৈত্য।

ঘরের সবাই আর্তনাদ করে উঠল, ব্রহ্মদৈত্য!

—হুম্, ওঝার স্বরও কর্কশ শোনাল, খুব জ্বালাবে কিন্তু ব্ৰহ্মদৈত্যটা। একবার কাউকে ধরলে সহজে ছাড়তে চায় না। দেখবেন, দিনদিন হিরে দুর্বল হয়ে পড়বে। আস্তে আস্তে আধারকে কাবু করে ফেলে তার শরীরে এরা পাকাপাকি কায়েম হয়ে বসতে চায়।

.

তিন

এ তাহলে সেই শ্মশানকালীতলার ব্রহ্মদৈত্যটাই। বিশাল অশত্থ গাছের কোন মগডালে নাকি বসে থাকে। তাকে চোখে দেখেছে এমন লোকের সংখ্যা হাতে গোনা যায়, কিন্তু তার অস্তিত্ব অনুভব করেছে ঈশ্বরীপুরের অনেক লোকেই। গভীররাতে বাড়ি ফেরার সময় অনেকে দেখেছে, অশ্বত্থগাছের আর সব ঝুরিগুলো থেমে আছে, শুধু একটি মোটা ঝুরি সমানে দুলছে, আর দুলছে তো দুলছেই, একেবারে পথের উপর জুড়ে দোল খাচ্ছে। ভয়ে পথচারী কেউ আর এগোতে পারে না। কেউ ভয় পেয়ে দৌড় মারে, ঘুরপথ দিয়ে অবশেষে পৌঁছোতে পারে বাড়ি। সবাই জানে, ওটা ঝুরি নয়, নিশ্চিত ব্রহ্মদৈত্যের পা। ব্রহ্মদৈত্যটা নাকি অমনই, হঠাৎ-হঠাৎ রাতের বেলা অশ্বত্থগাছের কোন মগডালে বসে তার একখানা পা অমন বেমক্কাভাবে ঝুলিয়ে রেখে দোলায়। বহু পথচারী নাকি অশ্বত্থগাছের তলা দিয়ে নির্বিঘ্নে যেতে যেতে হঠাৎ তার পায়ে ঠুল খেয়ে মূর্ছা গেছে। জ্ঞান ফিরতে দ্যাখে, সকাল হয়ে গেছে, সব ঝুরি ঠিকঠাক আছে, শুধু যে-ঝুরিটায় ঠুল খেয়েছিল সেটাই নেই।

আবার কেউ-কেউ দেখেছে, কাকভোরে অশ্বত্থগাছের তলা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে একজন ফরসা মানুষ। পরনে সাদা ধবধবে ধুতি, ধুতির একটা দিক গায়ে জড়ানো। গলায় লম্বা পৈতে, হাতে একটা কমণ্ডলু, পায়ে খড়ম। লম্বা-লম্বা পা ফেলে হেঁটে যাবার সময় শব্দ হচ্ছে খটখট্ করে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ যেন মিলিয়ে গেল অশ্বত্থ গাছের আড়ালে।

অনেকে আবার তাকে দেখেনি, কিন্তু খড়মের গম্ভীর শব্দ শুনতে পেয়েছে। এক অদৃশ্য খড়ম যেন হেঁটে যাচ্ছে রাস্তার একদিক থেকে অন্যদিকে।

এহেন ব্রহ্মদৈত্য হঠাৎ হিরেদার উপর ভর করায় ভারী সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল ঈশ্বরীপুরের সমস্ত মানুষ। ভূতে পাওয়া তবু খানিকটা অভ্যেস হয়ে গেছে সবার, কিন্তু ব্রহ্মদৈত্যয় পাওয়া!

যা-যা বলে গিয়েছিল যজ্ঞেশ্বর ওঝা, সব প্রায় ঠিক-ঠিক খেটে যেতে লাগল। হিরেদার সেই মেয়েলি ধরনের সুন্দর চেহারা আস্তে আস্তে বিবর্ণ হয়ে উঠছে। চোখের কোণে কালো ছোপ, মুখেও একটা ফ্যাকাশে ভাব। রোগা হয়ে যাচ্ছে খুব দ্রুত। আর চোখদুটো ক্রমশ আরো লাল। বাড়ির লোকজনও অস্থির হয়ে উঠতে লাগল বেশ।

হিরেদাকে ব্রহ্মদৈত্যয় পেতে সবচেয়ে মুশকিল হল কড়িদার। তারা দুজন সবসময় একসঙ্গে ঘোরে বলে লোকে তাদের মানিকজোড় বলে ডাকে। কোমর অদ্ভুত ভঙ্গিতে দুলিয়ে, মেয়েলি ধরনে পা ফেলে, হাতে হাত ধরে পাশাপাশি এমনভাবে হাঁটে যেন দুই অন্তরঙ্গ সখীই। হাঁটতে হাঁটতে কড়িদা হঠাৎ ফিসফিস করে হয়তো কিছু একটা হিরেদাকে বলে। অমনি হিরেদা তার আঙুলগুলো বিচিত্রভাবে ঘুরিয়ে বলে, এই যাহ্, তুই না যে কি একটা

কড়িদা চোখে ভঙ্গি করে বলে, হ্যাঁ রে, সত্যি।

হিরেদা হাসি-হাসি মুখ করে বলে, যাহ্, তুই না ভীষণ অসভ্য।

কড়িদার অন্যহাতে ধরা থাকে তার ধুতির কোঁচা, সেটা প্রায়শ সে বুকের উপর আড়াআড়ি রেখে কাঁধের ওপাশে ঝুলিয়ে দ্যায়, অনেকটা মেয়েদের আঁচলের ভঙ্গিতে। সেই আঁচল বুকের উপর ঠিকঠাক বিন্যস্ত করতে করতে কড়িদা বলে, আর তুই কি কম অসভ্য নাকি? তোকে না দেখে যে আমি একবিন্দুও থাকতে পারি নে।

হিরেদা তেমনই আঙুল নেড়ে উদাসীন ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, আমিও রে—

এভাবে দু’জনে গায়ে গা লেপ্টে সারাদিন কথা বলে যায়। তাদের মধ্যে এত কী কথা থাকতে পারে তা কেউ ভেবে পায় না। কিন্তু এই মানিকজোড় যে ঈশ্বরীপুরের অন্যতম কৌতূহলের বস্তু তা সবাই মেনে নিয়েছে।

একবার যাত্রার মঞ্চে হিরে-কড়ি দু’জনেই অভিনয় করেছিল দুই সখীর ভূমিকায়। তারপরও একমাস তারা গায়ে-গা লেপ্টে সখীর সংলাপ বলে কাটিয়েছিল।

এহেন মানিকজোড়ের একজন সারাক্ষণ নিজের ঘরে তক্তপোশের বিছানায় বন্দি হয়ে থাকাতে ভারী একা হয়ে গেল কড়িদা। দু-একবার হিরেদার কাছে গিয়ে বলতে গিয়েছিল, ‘এই হিরে, তুই এর’ম শুয়ে থাকলে আমার ভালো লাগে নাকি? চল না, নদীর ঘাটলা থেকে একটু ঘুরে আসি।’ কিন্তু প্রতিবারই হিরেদা কর্কশ পুরুষালি কণ্ঠে তাকে এমন ধমক দিয়েছে যে, কড়িদা পালিয়ে আসার পথ পায় না। তারপর থেকে সে ঈশ্বরীপুরের পথে-পথে একলা ঘুরে বেড়ায়। কখনও রথতলায়, কখনও ইছামতীর ঘাট্লায়, কখনো শ্মশানকালীতলায় গিয়ে বসে থাকে অন্যমনস্ক উদাসীনভঙ্গিতে। কেউ তার সঙ্গে কথা বলতে গেলে সে তার নরম হাত তুলে বিড়াল তাড়াবার ঢঙে বলে ওঠে, এই যাহ্, এখন বিরক্ত করিস নে। আমার খুব মন খারাপ —

.

চার

হিরেদাকে নিয়ে তখন তুমুল চলছে সারা ঈশ্বরীপুরেই। মাসদু’য়েক হতে চলল, অনেক চেষ্টাচরিত্তির করেও সে ব্রহ্মদৈত্য নামানো গেল না হিরেদার ঘাড় থেকে। বরং দিনদিন আরও কায়েম হয়ে বসেছে তার শরীরে। রোগা, শীর্ণ হয়ে গেছে হিরেদা, সরু-সরু হাত-পা, চোখ কোটরাগত। অথচ গলার স্বর দিনদিন রুক্ষ, কর্কশ হয়ে উঠছে আরও। সারাদিন চোখ লাল করে শুয়ে থাকে বিছানায়, কারোকেই কাছে ঘেঁষতে দেয় না। কেউ এলে তাকে প্রচণ্ড ধমক দিয়ে বলে, যা, যা বলছি, নইলে–

ভয়ে সবাই পালিয়ে আসে। কেমন যেন বদলে গেছে হিরেদা। তার সেই মেয়েলিভঙ্গিও আর অবশিষ্ট নেই। চাউনির নরম ভাব মিলিয়ে গিয়ে এখন সেখানে একটা ভয়ংকর দৃষ্টি।

যজ্ঞেশ্বর-ওঝা অনেক কসরত করে রোগীর রোগনির্ণয় করেছে বটে, কিন্তু ওষুধ বার করতে পারল না। অনেক ঝাড়ফুঁক, শিকড়-বাকড়, মন্ত্র-তন্ত্র সব দিব্যি হজম করে ব্রহ্মদৈত্য যেমন-কে- তেমন রয়ে গেল হিরেদার শরীরে। বাধ্য হয়ে হিরেদার বাবা আরও দূর-দূর থেকে ওঝা ডেকে আনতে লাগলেন। এক-এক ওঝার এক-একরকম চেহারা। তাদের বিধানও অন্যরকম। তাদের বিচিত্র কাণ্ডকারখানা দেখতে দিনে-দিনে আরো লোক ভেঙে পড়তে লাগল হিরেদাদের বাড়িতে। প্রতিদিনই যেন তাদের বাড়ি একটা মেলা। তারাগুনে গাঁয়ে ইছামতীর তীরে যেরকম বারুণির মেলা হয়ে থাকে এ যেন ঠিক তেমনি। শঙ্খরাও বারতিনেক ঘুরে এসেছে হিরেদার রকমসকম দেখতে। একদিন দেখতে পেল, হিরেদা আসনপিঁড়ি করে বিছানার উপর বসে ভারি গম্ভীর গলায় সংস্কৃত শ্লোক উচ্চারণ করে চলেছে একমনে। তার দু’চোখ বাইরের দিকে নিবদ্ধ। চোখের ভিতর থেকে যেন আগুন ফুটে বেরোচ্ছে। কেউ বলল, হিরে বোধহয় মহাভারতের শ্লোক আওড়াচ্ছে, কেউ বলল, না হে, এ নিশ্চয় বেদ কিংবা উপনিষদ। কেউ বলল, এ হল সেই ব্রহ্মদৈত্য। পূজার মন্ত্র আওড়াচ্ছে। কেউ আবার মাথা নাড়ল, উঁহু, আমার মনে হচ্ছে, সাবিত্রী-সত্যবান পালায় সাবিত্রীর গলায় কয়েকটা শ্লোক ঢোকানো হয়েছিল না, এ মনে হচ্ছে সেই শ্লোকগুলোই—

ব্রহ্মদৈত্য নিয়ে এমন যখন টানাপোড়েন চলছে, হঠাৎ একদিন এক জটাধারী ওঝা কোত্থেকে এসে ঝাড়ফুঁক করে, মন্ত্র আউড়ে ঘোষণা করল, এ তো ব্রহ্মদৈত্য নয়, জিন্।

সবাই চমকে উঠল, জিন্! জিন্ আবার কী জিনিষ! জিনে তো কক্ষনো পায়নি কাকেও

এরকম নানান্ বিভ্রান্তির মধ্যে ওঝাদের কারিকুরি সমানে চলেছে। তাদের মন্ত্রতন্ত্রও অঝোরে বর্ষিত হচ্ছে হিরেদার উপর। সারাক্ষণ বাড়িতে একটার পর একটা যজ্ঞ চলছে। গাঁয়ের গণেশবাবু একদিন সব কাশুভাণ্ড দেখে বললেন, রোজ এত মন্তর পড়া হচ্ছে যে, লিখে ফেললে একখানা মহাকাব্য হয়ে যেত—

.

পাঁচ

যাই হোক, এত মন্তরের চোটেই হোক, অথবা ঝাড়ফুঁকের বৈচিত্র্যের জন্যই হোক, কিংবা ব্রহ্মদৈত্য না জিন এ নিয়ে ওঝাদের ভিতর কোঁদল নিয়ে হোক, একদিন অপদেবতাটি কীভাবে যেন হিরেদার ঘাড় থেকে টুক করে পালালেন। মাসতিনেকের মাথায় একদিন শঙ্খরা শুনতে পেল, হিরেদা আস্তে আস্তে ভালো হয়ে উঠছে। তবে আগের মতো তার সেই মেয়েলিধরন নেই। সারা মুখে বেশ বড়ো হয়ে গেছে দাড়ি। প্রায় সন্ন্যাসী-সন্ন্যাসী চেহারা। সারাক্ষণ থম্ মেরে বসে থাকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে। আর বারবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলছে, আহ, বড়ো একা লাগে।

খবর শুনে কড়িদা ছুটতে ছুটতে গেল হিরেদার কাছে, এই হিরে, হিরে, তুই নাকি ভালো হয়ে গেছিস?

হিরেদা কিন্তু আগের মতো নরম চোখে তাকাল না, বরং গম্ভীরস্বরে বলল, তুই এখন যা। আমাকে বিরক্ত করিস নে।

শুনে কড়িদা ভীষণ অবাক হয়ে গেল। তার মুখে আর কথা সরল না। এ যেন সেই আগের হিরে নয়, অন্য কেউ।

হিরের রকম-সকম দেখে কেউ-কেউ বলল, হিরেটা তাহলে এবার সত্যি-সত্যি পাগল হয়ে গেছে। এখন ওর মাথার চিকিৎসা করা দরকার।

অবশ্য পাগল হয়ে যাওয়াটা তার পক্ষে কিছু বিচিত্র নয়। পরপর তিনদফায় তার উপর ভর করেছে বিভিন্ন অপদেবতা। তাদের আক্রমণ তো আছেই, উপরন্তু ওঝাদের অত্যাচারও কম হয়নি। এক-একজন ভূত তাড়াবার নাম করে বেত দিয়ে এমন মার মেরেছে-

আর একজন কে বলল, হিরে যখন ভালো হয়ে গেছে, তখন ওর বিয়ে দিয়ে দাও। আইবুড়ো ছেলে অমন পথে পথে ঘুরলে আবারও ভূতে ধরবে ওকে।

হিরেদার বিয়ের কথা শুনে অনেকেই হাসাহাসি করল, হিরে নিজেই তো একটা মেয়েছেলে। বিয়ে দিতে হলে একটা সেরকম পুরুষমানুষের খোঁজ করো হে—

আবার কে বলল, না হে। হিরে এখন বদলে গিয়েছে। দেখো, বিয়ে দিলে একেবারে পুরোপুরি —

এতসব শুনেটুনে হিরেদার বাড়িতে বেশ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল সবাই। পিসিমা, ঠাকুমা, জেঠিমারা একযোগে সায় দিলেন বিয়ের প্রস্তাবে, হুঁ, বিয়েই দিয়ে দাও তা হলে।

অগত্যা হিরেদার বাবা অনেক চেষ্টাচরিত্র করে পাত্রী জোগাড় করে ফেললেন। দূরবর্তী গাঁয়ের এক গরিব ঘরের মেয়ে। মেয়েটা বেশ সুন্দরীও। কয়েকদিনের মধ্যে বেশ ধুমধাম করে হিরেদার বিয়ে হয়ে যাওয়াতে বেশ সোরগোল পড়ে গেল ঈশ্বরীপুরে। সুন্দরী বউ পেয়ে হিরেদাও বদলে গেল আশ্চর্যভাবে। তার সেই মেয়েছেলের মতো চালচলন আর রইল না। পাগলাটে ভাবটাও কেটে গেল আস্তে-আস্তে। একমুখ শৌখিন দাড়ি মুখে হিরেদা যখন বউ নিয়ে রাস্তায় হেঁটে যায়, তখন অনেকেই হেসে ফেলার বদলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। এমনকী, কড়িদার সঙ্গেও তার কোন ভাব-ভালোবাসা রইল না।

ব্যাপারস্যাপার দেখে কড়িদা একেবারে স্তম্ভিত। সে এখন সম্পূর্ণ একা। উদাসীনভাবে পথে পথে ঘুরে বেড়ায় নিঃসঙ্গ হয়ে। দু’চোখে শূন্যতা, মুখে একটা কালচে-ছোপ। কখনও ইছামতীর ঘালায় বসে কী যেন বিড়বিড় করে বকে। কখনো শ্মশানকালীতলায় বসে থাকে গভীর রাত পর্যন্ত।

এমনই একদিন অশ্বত্থগাছের গুড়িতে ঠেস দিয়ে বসে থাকতে-থাকতে হঠাৎ হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল সে। কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমি এখন একা-একা কী করব! ব্রহ্মদৈত্যটা আমাকেও কেন পায় না, এ্যাঁ? ব্রহ্মদৈত্যটা আমার ঘাড়ে ভর করলে তো—

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *