তিন
বসন্ত দিগারের হাঁকডাক শুনে কোত্থেকে ফুঁড়ে বেরোল একটি কুড়ি-বাইশ বছরের ছেলে। গায়ের রং কালো, পরনে বড়ো ঘেরের আধময়লা পাজামার ওপর আকাশি রঙের হাফ-হাতা শার্ট। সায়নদের দেখেই বলল, ভিতরে অনেক কিছু দেখার আছে। গাইড ছাড়া আপনারা কিছু জানতে পারবেন না। আমাকে গাইড হিসেবে নিতে পারেন। দোতলা-একতলা মিলিয়ে বত্রিশটা ঘর। একঘণ্টার মধ্যে সব ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেব। আমার রেট পঞ্চাশ টাকা।
—কী নাম তোমার?
—আমার নাম ঘনশ্যাম, সবাই ঘনু বলে ডাকে। কিন্তু আমি ঘনশ্যাম বললেই বেশি খুশি হই।
গার্গী তাকায় সায়নের দিকে, বলল, সব রাজবাড়ির নানা ইতিহাস থাকে। পঞ্চাশ টাকার বিনিময়ে সেই ইতিহাসটা জেনে নেওয়া যাক।
—ঠিক আছে, ঘনশ্যাম, চলো তুমি ঘুরিয়ে দেখাবে।
শেষবেলায় দুজন দর্শনার্থী পেয়ে ঘনশ্যামের মুখে খুশির ঝিলিক।
—চলুন ওপরে।
ঘনশ্যামের পিছু পিছু সায়ন আর গার্গী উঠে এল দোতলায়। নিতান্তই গাঁয়ের গাইড, বেকার ছেলে ঘরে বসে না থেকে টুকটাক কথা বলে যদি কিছু উপার্জন করা যায়। সেই টুকটাক কথার মধ্যে ঘনশ্যাম তাদের নিয়ে গেল একেবারে বাঁদিকের একটি ঘরের সামনে। বলল, প্রায় দুশো বছর আগে এই রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সৌমেন্দ্রনারায়ণ সিংহরায়। দশ হাজার একরেরও বেশি জমির মালিক ছিলেন সেসময়, ছিল বেশ কিছু বেনামী জমিও। তাঁর অনেক পুত্রকন্যা ছিল। ওপরের ষোলোটি ঘর তাঁর পুত্রকন্যাদের ব্যবহারের জন্য। চার পুত্র, চার কন্যা। পুত্রদের ভাগে দু-কামরার ঘর, কন্যাদের ভাগে এক কামরার।
বলে একটু থামল ঘনশ্যাম, তারপর আবার বলে চলে, যখন তাঁর কন্যাদের বিয়ে হয়ে যেত, তাদের ঘর কিন্তু তাদের নামেই বরাদ্দ থাকত বরাবর।
সায়ন ধারাবিবরণী শুনছে, আর মাঝেমধ্যে লক্ষ করছে গার্গীর প্রতিক্রিয়া।
—তবে সৌমেন্দ্রনারায়ণ খুব শৌখিন ও কর্মতৎপর ছিলেন, বাড়িটি তৈরি করেছিলেন তাঁর জমিদারির প্রায় মাঝখানের একটা প্লটে যাতে জমিদারি দেখভাল করতে সুবিধে হয়। রানি ও ছেলেমেয়েদের যার যেরকম ইচ্ছে সেইভাবেই তৈরি করেছিলেন ঘরগুলি। ঘরগুলো একই মাপের, কিন্তু প্রত্যেকটির ভিতরকার গঠন সম্পূর্ণ আলাদা।
গার্গী অবাক হয়ে বলল, তাই নাকি?
— হ্যাঁ, ম্যাডাম। তবে ওপরের ঘরগুলোর চেয়ে নীচের ঘর অনেক বেশি সাজানো-গোছানো। সেই ঘরগুলো তৈরি হয়েছিল রানিমার ইচ্ছানুসারে। নীচে গেলে দেখবেন রানিমাও শৌখিন ছিলেন কতখানি।
গার্গী বলল, হ্যাঁ, বাড়ির আকার আর গঠন দেখেই বুঝতে পারছি।
—আর এই যে দেখছেন মোরাম পথ, এই রাস্তাটা তো ছিলই না। সৌমেন্দ্রবাবু নিজের লেবার লাগিয়ে এই এক কিলোমিটার রাস্তা তৈরি করেছিলেন তখন। তবে প্রথমে ছিল মাটির পথ, পরে রাস্তা চওড়া করা হয়। আর পরে মোরাম ঢালা হয়। কেন জানেন, স্যার?
— কেন?
—রাজাবাবু তখন একটা গাড়ি কিনবেন ঠিক করেছিলেন, কিন্তু বড়ো রাস্তা থেকে গাড়ি আসবে কী করে!
— ঠিক তো!
—পিচরাস্তা তার অনেক পরে। একসময় জমিদারি প্রথার বিলোপ ঘটল, সংখ্যায় কমতে শুরু করল তাঁর উত্তরাধিকারীরা। কেউ এখানে থাকলেন, কেউ চলে গেলেন কলকাতায় বা ভারতের অন্য শহরে, কেউ বা বিদেশে।
সায়ন জানতে চায়, এখন কারা থাকেন এ-বাড়িতে।
—স্যার, বর্তমান উত্তরাধিকারী বলতে তিন ভাই আর এক বোন। বড়ো ভাই রণদীপ আর
ছোটো ভাই রণবীর কলকাতায় ফ্ল্যাট কিনে থাকেন। রণদীপবাবুর একটা বড়ো স্টুডিও আছে। ফটো তোলা, ভিডিও রেকর্ডিং-এর ব্যবসা। তিনি বহুকাল হল এখানে আর আসেন না। তাঁর ভাগের সম্পত্তি সব বিক্রিবাটা করে দিয়ে গেছেন। ছোটোভাই রণবীরবাবু গান-বাজনা নিয়ে থাকেন। তিনিই গত একবছর ধরে আসছেন এখানে। কী সব আলোচনা করেন ব্রনবাবুর সঙ্গে। আর দুই বোনের মধ্যে আছেন একজন। সেই ছোটো বোন থাকে জামশেদপুরে। শুধু মেজো ভাই রণিতবাবু, মানে ব্রনবাবু তাঁর বউ-ছেলে নিয়ে থাকেন রাজবাড়ির উত্তরদিকের ওই দোতলা বাড়িতে।
—রণিত সিংহরায়?
— হ্যাঁ, কিন্তু এখানে সবাই ওঁকে ব্রণবাবু বলে ডাকে।
—ব্রণবাবু? বেশ নাম তো? হঠাৎ এরকম নাম?
ঘনশ্যাম হেসে বলল, সবাই তাই জিজ্ঞাসা করে। আসলে রণিতবাবুকে সবাই রুনুবাবু বলে ডাকত। অল্পবয়সে খুব ব্রণ হত ওঁর মুখে। সেই দাগ এখনও রয়ে গেছে মুখে। রুনুবাবু হয়ে গেল ব্রনবাবু।
—ও। ব্রনবাবুর জন্য রাজবাড়িতে কোনো ঘর নেই?
— ছিল, কিন্তু উনি ওই ছোটো বাড়িটাতে থাকতেই পছন্দ করেন। রাজবাড়ির ওপরের পুরোটাই এখন ট্যুরিস্টদের জন্য রাখা। রণিতবাবু কোনও চাকরি করেন না। এই ফাঁকা ঘরগুলোই ট্যুরিস্টদের ভাড়া দিয়ে যা রোজগার হয়, তাতেই সংসার চালান তিনি। তা ছাড়া কিছু জমিজমাও আছে ওঁর নামে।
ঘনশ্যাম বলছে, আর টানা লম্বা বারান্দা দিয়ে হেঁটে চলেছে দক্ষিণ থেকে উত্তরের দিকে। সব ঘরগুলোই তালা দেওয়া।
সায়ন কৌতূহলী হয়, তাঁরা কোথায়?,
—স্যার, তাঁদের কাল ওপরের একটা ঘর দেওয়া হয়েছিল। এই একেবারে উত্তরের ঘরটা। কাল রাতে এখানে ছিলেন, কিন্তু আজ সকালে উঠে বললেন, নীচের ঘরে থাকবেন।
— নীচের ঘরে?
— হ্যাঁ, বললেন, রাজবাড়ির আসল আকর্ষণ তো নীচেই। আমাদের ওখানেই একটা ঘর দিন। আজ রাতটা ওখানেই থাকব।
—তারপর? ওঁরা ঘর পেয়েছেন?
—ব্রনবাবু নীচের ঘর দিতেই চাইছিলেন না। বললেন, নীচের ঘর কাউকে ভাড়া দেওয়া হয় না। ওটা প্রাইভেট।
— তারপর?
—শেষে ওঁরা বললেন, ভাড়া বেশি দিলেও দেবেন না?’ অনেক জারিজুরি করার পর ব্রনবাবু রাজি হলেন ভাড়া দিতে। তবে পাঁচ হাজার টাকা নিলেন।
—পাঁচ হাজার? সায়ন আবার চোখাচোখি করল গার্গীর সঙ্গে। বলল, ওপরটা তো দেখা হয়ে গেছে। এবার আমরা নীচে যাই। নীচের ঘরগুলোই যখন বেশি ভালো।
ঘনশ্যাম হেসে বলল, হ্যাঁ চলুন। ওপরের অংশ ছেলেমেয়েদের থাকার ঘর, আর নীচের অংশ শুধু রাজাবাবুর সংসার।
ঘনশ্যামের সঙ্গে ওরা দুজন নেমে এল নীচের ঘরগুলোয়।
