উপন্যাস
গল্প
উপন্যাস

অশরীরী বেণুদা – তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

অশরীরী বেণুদা

আমার বাল্যকালটা কেটেছিল খুব অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনাবলির প্রবাহে। সদাপ্রবহমান ইছামতী খুব প্রিয় বন্ধু। তার কিনারে পা ঝুলিয়ে বসে ছোটো ছোটো ঢেউগুলির সাথে চলত অনন্ত বাক্যালাপ। মাইল মাইল ধানবন আর তার সবুজ শীষ নিরন্তর ডাক দিত শত হাত তুলে। নীল আকাশ ছিল চক্ষুবিচরণের অবাধ ক্ষেত্র। লাগামছাড়া ভেসে যেত কখনও সাদা, কখনও কালচে, কখনও তামাটে রঙের মেঘমালা।

দারিদ্র্য আমাদের নিত্যসঙ্গী হলেও তাকে কোনও দিন তেমন তোয়াক্কা করিনি। পাঠ্যপুস্তক ছিল অপ্রতুল, অভাব ছিল খেলার সরঞ্জামেরও। গ্রামদেশে খেলার মাঠ ছিল অনেক, কিন্তু একটা ফুটবল তাও ছিল প্রায় একটা স্বপ্নের বিষয়বস্তু।

ফুটবলে পা দিতে পারত একমাত্র বড়োরা যারা নাইন ফাইটার্স বা নাইন বুলেটস নামে ক্লাবের সদস্য ছিল, হাড্ডাহাড্ডি ফুটবল খেলত নাইনসাইড কমপিটিশনের টিমে। সেই বয়সে পৌঁছোতে তখন আমাদের ঢের ঢের বাকি। সেই বালককালে একটি তিন নম্বর ফুটবলের জন্য আমরা যখন মানত করছি কখনও না-দেখা ঈশ্বরের কাছে, সে সময় পরিত্রাতা হয়ে আমাদের সামনে উদিত হল বেণুদা।

বেণুদার বয়স তখন চোদ্দোরও বেশি, আমাদের চেয়ে চার-পাঁচ বছরের বড়ো। তার বাবা ছিলেন আমাদের গ্রামের সবচেয়ে বড়োলোক, তাদের ছিল মস্ত তিনতলা বাড়ি, আমাদের এলাকায় সবচেয়ে উঁচু সেই বাড়ির চূড়া। গাঁ-দেশে বাড়িটা ছিল সারা তল্লাটের বিস্ময়ের বস্তু, যাতায়াতের পথে সবাই তাকিয়ে দেখত বাড়িটার উচ্চতা, তার অঙ্গের নানবিধ কারুকাজ। বাড়ির সামনে ছিল একখণ্ড সবুজ মাঠ, খুব বড়ো মাঠ তা নয়, তবে আমাদের মতো সাড়ে তিনফুটিদের পক্ষে টায়টায়। বেণুদার বাবা ছেলেকে খুশি করতে কলকাতা থেকে কিনে আনতেন ঘরে বসে যা-যা খেলা যায় সেই সব খেলার যাবতীয় সরঞ্জাম, জমা করতেন বেণুদার ঘরে। সেই বেণুদাই হঠাৎ একদিন তার বগলে সাদা-কালো রঙের ফুটবল বাগিয়ে ধরে আমাদের বলল, এই খেলবি?

সেই অভাবিত দৃশ্যটির দিকে তাকিয়ে আমাদের চোখ তখন দানাদারের চেয়েও বড়ো বড়ো, লাফিয়ে উঠে বলি, নিশ্চয়।

বেণুদা আমাদের চেয়ে চার-পাঁচ বছরের বড়ো হওয়া সত্ত্বেও আমাদের সঙ্গেই খেলত তার একটাই কারণ বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরের দৈর্ঘ্য যেরকমটি হওয়ার কথা ছিল তেমনটি বাড়েনি। সে ছিল উচ্চতায় আমাদের সমান, সাড়ে তিন ফুটের মতো। তার প্রধান কারণ সে ছিল চিররুগ্‌ণ, বিশেষ করে তার পেটটি ছিল বিসদৃশ রকমের বড়ো, হাত-পাগুলো ছিল লিকলিকে। চোখের রং ছিল হলদেটে, মুখের চেহারা ফ্যাকাসে। কেন এরকমটি তার উত্তরে শুনতম তার পেটে পিলে আছে।

তখনও প্লীহা বা কিডনি বিষয়ে আমাদের তেমন জ্ঞান ছিল না, শুধু দেখতাম তার ওই বিশাল পেটটির কারণে সে বেশি ছোটাছুটি করতে পারত না, একটু ছুটলেই হাঁপিয়ে পড়ত, সারাক্ষণ সে যেমন তাদের বাড়ির সিঁড়ির উপর বসে থাকত ফ্যাকাসে ও ম্লান মুখে, তার মা-বাবাও।

তারা খুবই বড়োলোক হওয়া সত্ত্বেও তার এই পিলে রোগটি সারানো যায়নি। আমরা শুনেছি বহু ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছিলেন তার বাবা, কিন্তু বোধ হয় দুরারোগ্য ছিল অসুখটা, কিংবা তখন চিকিৎসাব্যবস্থার এত উন্নতি হয়নি।

হয়তো কেউ উপদেশ দিয়েছিলেন বেণুদাকে একটু ছোটাছুটি করতে, তাই তার বাবা কলকাতা থেকে কিনে এনেছিলেন এই বলটি। সেই বল তার কাছে যত না প্রিয় হয়ে উঠল, তার চেয়েও বেশি হাসি ফোটাল আমাদের মুখে।

ফুটবলটা নিয়ে প্রথমদিকে খুবই উৎসাহ দেখিয়েছিল বেণুদা, কিন্তু তার শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাকে একটুও স্বস্তি দিল না। কালো-সাদা ফুটবলটা বগলে নিয়ে বিকেলে বেরিয়ে আসত ঘর থেকে, এসেই দু-হাতে ধরে একটা হাই মেরে ফুটবলটা ভাসিয়ে দিতে চাইত বলটা, অবশ্য ফুটবলে একবার লাথি মারার পরেই হাঁপাত হাঁই হাঁই করে, একটু পরেই দাঁড়িয়ে পড়ত ক্লান্তিতে।

ক-দিনের মধ্যে আমরা উপলব্ধি করলাম তার সঙ্গে ফুটবল খেলার সমস্যা অনেক। আমরা দুটো টিম করে খেলা শুরু করতাম বটে, কিন্তু আমাদের সঙ্গে দৌড়ে পাল্লা দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না তার, অথচ প্রতি মুহূর্তে তার কাছে বল যাওয়া চাইই। তার কাছে বল গেলে সে পা দিয়ে মারতে চেষ্টা করত, না-পারলে হাত দিয়ে বল ধরবে, কিন্তু হ্যান্ডবল ধরা চলবে না। সেই বল ঘাসের উপর পেতে একটা শট লাগালে তখন আবার শুরু হবে খেলা। কিন্তু বেশিক্ষণ সেই খেলাও চালানো যাবে না যদি দু-তিনটি শটের পর তার কাছে আবার বল না যায়!

তা সত্ত্বেও তাকে প্রতিদিনই খেলায় নিতে হত কেন না সে-ই তো ছিল তিন নম্বর ফুটবলটির মালিক। যখনই তার পায়ে বল যেত, আমরা উৎসাহ দিতাম, বাহ্, মারো, শট মারো, আহ্, বেণুদা, কী জোরেই না মারলে শটটা!

আবার অনেক সময় এমন হত আমরা খেলায় মত্ত হয়ে অনেকক্ষণ তার দিকে বল পাস করতে ভুলে যেতাম, তাতে সে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে বলটা বগলে নিয়ে ঢুকে যেত তাদের বাড়ির মধ্যে। তখন তাদের ঘরে গিয়ে অনেক অনুনয়-বিনয় করে, ‘ঠিক আছে আর হবে না এরকম ইত্যাদি বলে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হত তাকে।

কোনও কোনও দিন এরকম ঘটনা একাধিকবার ঘটলে সে ফুটবলটি নিয়ে সেই যে সেঁধিয়ে যেত ঘরের মধ্যে, আর বেরোত না। আমাদের সকলের মুখে তখন মাছি। সবুজ ঘাসে পা ছড়িয়ে বসে হা-হুতাশ করতাম ও যে-বালকটি বেণুদাকে বল জোগাতে ভুল করেছিল তার উদ্দেশে দোষারোপ করতাম সবাই মিলে।

এভাবেই বেণুদার সঙ্গে কাটত আমাদের প্রতিটি বিকেল। আমরা সেই কিম্ভূত ফুটবল খেলে খেলে যদিও প্রায় বীতশ্রদ্ধ, তবু কিছু করারও ছিল না আমাদের। তবে তার এই চমকপ্রদ খেলায় তার বাবা-মা অতীব মুগ্ধ। তাঁরা বারান্দায় বেরিয়ে মাঝেমধ্যে দেখতেন বেণুদার ছোটাছুটি, হাই মারা, গোল লক্ষ্য করে কিক নেওয়া। তাঁদের সেই মুগ্ধতার প্রকাশও ঘটল মাসখানেক পরে। একদিন বিকেলে সে বেরিয়ে এল আর একটা নতুন ঝকঝকে ফুটবল বগলে নিয়ে, সেটির রং লাল-সাদা। সেই নতুন ফুটবল দেখে আমরা সবাই চমকিত, শুরু হত মহা উৎসাহে খেলা। তারও মাসদুয়েক পরে আবার একটা নতুন বল এল, তার রং আরও চমৎকার, বাদামি-সাদা।

বেণুদা অবশ্য মাঝেমধ্যে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হত ও আরোগ্য না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকত খেলা। কয়েকদিন পরে জীর্ণ চেহারায় তাকে বারান্দায় বসে থাকতে দেখে আমরা অনুনয় করে বলতাম যদি সে পুরোনো হয়ে যাওয়া সাদা-কালো বলটা আমাদের দেয়, তা হলে পাম্প দিয়ে আমরা খেলতে পারতাম, কিন্তু সেই বাতিল হয়ে যাওয়া ফুটবলও সে আমাদের ব্যবহার করতে দিতে রাজি নয়। মাথাটা ঢকঢক করে নাড়িয়ে বলল, না, হবে না।

আসলে আমরা তার বল নিয়ে খেলব আর সে বসে বসে দেখবে তা একেবারেই ইচ্ছে নয় তার।

আমরা কী আর করি, তাকে রোজ একবার করে দেখে আসি সে সুস্থ হল কি না, না-হলে আর কতদিন বাকি সুস্থ হতে।

কয়েকদিন পরে আবার সে খেলতে এল, এবার তার গায়ে নীল রঙের একটা ঝলমলে জার্সি, তার পিছনে লেখা ১১ নম্বর, সেই জার্সি পরে নতুন উদ্যমে শুরু করল খেলা, চেষ্টা করছে বড়ো বড়ো হাই মেরে তার কৃতিত্ব দেখানোর, ছুটতে চাইছে আরও আরও জোরে, কিন্তু পারছে না, এখন আগের চেয়ে আরও বেশি বেশি হাঁপাচ্ছে, চোখের রং আগের চেয়ে আরও হলদে।। একটু থেমে হেসে বলল, ‘দাঁড়া, আজ না পারলেও কাল পারব।’ পরদিন পরে এল একটা নতুন জার্সি পরে, তার পিছনে লেখা ১০ নম্বর, তাতেও তেমন সুবিধে হল না, তার পরদিন পরে এল আর একটা নতুন জার্সি পরে, তাতে লেখা ৯ নম্বর

এরকম জার্সি বদল করতে করতে একসময় তার জার্সির নম্বর হল ১।

আমরা অনুমান করছিলাম তার বাবা তাকে হয়তো অনেক অনেক জার্সি কিনে এনে দিয়েছেন যাতে তার খেলার উদ্যম আরও বেড়ে যায়, কিন্তু ১ নম্বর জার্সি পরার পরের দিন সে আর বেরোল না ঘর থেকে। খেলাও আবার স্থগিত রাখতে হল কেন না শুনলাম আরও বৃদ্ধি পেয়েছে তার পিলে।

অগত্যা তার আরোগ্যের জন্য উপরঅলার কাছে কাতর প্রার্থনা করা ছাড়া আমাদের উপায় ছিল না। ক্রমশ আমরা উপলব্ধি করছিলাম তার অসুস্থতা বৃদ্ধি পাচ্ছে দিনদিন।

আমরা বালকরা তাদের তিনতলা বাড়ির চারপাশে ঘুরঘুর করতাম আর ভাবতাম নিশ্চয় আবার একটা অন্য রঙের আরও জমকালো জার্সি পরে এক্ষুনি বেরিয়ে আসবে বেণুদা।

মাসখানেক পার হয়ে গেল, বেণুদার আরোগ্য হয়নি তখনও। আমরা মন খারাপ করে ঘুরপাক খেতে থাকি কখনও সবুজ মাঠটায়, কখনও বসে থাকি তাদের বাড়ির সিঁড়ির কাছে।

সেবার পুজোর ছুটিতে মাসখানেকের জন্য বাইরে বেড়াতে গিয়েছিলাম ও বাড়িতে ফেরার দিন দুয়েক আগেই পেলাম সেই ভয়ংকর খবর, বেণুদা মারা গেছে। মুহূর্তে বেণুদার মা-বাবার মুখটা ভেসে উঠল চোখের সামনে, তাঁদের কাতর দুটি মুখে কত না যন্ত্রণার ছাপ! বেণুদাকে খুশিতে রাখতে কী প্রাণান্তকর প্রয়াস ছিল তাঁদের, কিন্তু শত চেষ্টাতেও ধরে রাখতে পারলেন না ছেলেকে!

মাদারিপুরে ফিরে এসে শুনলাম তার বাবা কলকাতায় নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা সত্ত্বেও বাঁচাতে পারেননি বেণুদাকে।

শুধু বেণুদাই আমাদের মধ্য থেকে চলে গেল তাই নয়, আমাদের জীবন থেকে বিদায় নিল ফুটবলও। আমাদের প্রত্যেকের কাছেই ঘটনাটা খুবই স্বজন হারানোর, অত্যন্ত বেদনাদায়ক। অসুস্থ বেণুদাকে নিয়ে খেলা করতে কত না চেষ্টা করেছি, প্রত্যেকেই চেষ্টা করতাম যাতে সে আমাদের সঙ্গে সমান তালে খেলে, বারবার বলতাম, ‘হ্যাঁ, বেণুদা, এবার একটা জোরে কিক দাও, গোল হবেই।’ কিন্তু তার শারীরিক অক্ষমতাই তো তাকে–

এবার মাদারিপুরে ফিরে তাদের তিনতলা বাড়িটার দিকে তাকাতেই পারছিলাম না! বেণুদাকে আর দেখতে পাব না, আর আমাদের সঙ্গে খেলতে আসবে না এই ভাবনাটাই মুহ্যমান করে তুলছিল আমাদের সবাইকে।

বড়োলোক বাড়ির ছেলে, তার মৃত্যুতে খুব ঘটা করে শ্রাদ্ধের ব্যবস্থা করলেন তার বাবা। চাটুজ্জেপাড়ার কয়েকশো লোকের নিমন্ত্রণ তো হলই, সেই সঙ্গে তার বাবা ঘোষণা করলেন ওইদিন রাতে যত গরিব লোক তাঁর বাড়িতে আসবে সবাই যত ইচ্ছা খেতে পারবে। অর্থাৎ কিনা কাঙালিভোজন।

আমরা যারা তার খেলার বন্ধু ছিলাম, তাদের আবার সকাল থেকেই খাওয়ার নিমন্ত্রণ। আমার ঠিক ইচ্ছে করছিল না তাদের বাড়িতে যাওয়ার ও খাওয়ার, কিন্তু তার বাবা আমাদের ডেকে বারবার করে বললেন, তোমরা ছিলে তার নিকট-বন্ধু, তোমরা খেলে তার আত্মার শান্তি হবে। আমরাও মনে একটু শান্তি পাব।

বড়োলোক বাড়ির ব্যাপার, এলাহি কাণ্ড। সেই কাণ্ড দেখাটাই আমাদের কাছে এক অভিজ্ঞতা।

নিমন্ত্রণের দুদিন আগে থেকেই ম্যারাপ বাঁধা শুরু হয়েছে, সাজানো হয়েছে সারা বাড়ি। কলকাতা থেকে আগের দিন এসে পৌঁছোল মিষ্টি দই ও তিন-চার রকমের সন্দেশ। সেগুলো দোতলার একটা ঘরে তালা দিয়ে রাখা হল যাতে যে কেউ ঢুকে পড়তে না পারে।

দিনের দিন ভোর থেকে আসা শুরু হল বড়ো বড়ো রুই আর কাৎলা। বড়ো বড়ো উনুন তৈরি করে রান্না শুরু হল মাঝরাত থেকে। ভিয়েনের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল গাঁ-ময়।

বেণুদার মা অবশ্য প্রথম দিন থেকেই শয্যাশায়ী। মাঝেমধ্যে তাঁর কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে, তাতে ভারী হয়ে উঠছে নিমন্ত্রণবাড়ির। আবহাওয়া আমরাও সবাই মন খারাপ করে ঘুরছি। সেই ভিড়বাড়িতে বেণুদাকে নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে, এর মধ্যে শোনা গেল কে নাকি কাল রাতে বেণুদাকে দেখেছে মিষ্টির ঘরের সামনে ঘোরাঘুরি করতে। তার কথা শুনে বেণুদার বাবা লাফিয়ে এসে বললেন, তা তুমি আমাকে তক্ষুনি খবর দাওনি কেন! আমি তাকে আর একবার দেখতাম!

বেণুদার বাবাকে এমন উতলা হতে দেখে যিনি দেখেছিলেন তিনি তৎক্ষণাৎ ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, আমি নিজের চোখে তো দেখিনি! কে যেন বলল আমাকে।

বেণুদাকে দেখা গেছে এই খবরে শয্যায় উঠে বসলেন তার মা, কান্না থামিয়ে বললেন, কই সে, কোথায়!

কিন্তু কে ঠিক দেখেছে তা তখন আর জানা গেল না, তবে ব্যাপারটা কানাকানি শুরু হল কেন না আরও একজন কেউ বলল তারাও শুনেছে বেণুদা নাকি ম্যারাপ বাঁধার ওখানে দাঁড়িয়েছিল কোমরে হাত দিয়ে।

আমরা যারা ছোটো তারা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ি এত সব ঘটনার কথা শুনে।

সেদিন সকালে আরও একটা ঘটনা ঘটল যা সারা বাড়িতে বেশ হইচই ফেলে দিল।

আমার চেয়ে বছর দেড়েকের বড়ো পিলুদি তিনতলার ঘরে সুপুরি কুচোতে গিয়ে ডান হাতের আঙুলটা একটু কেটে ফেলল। রক্তও বেরোল অনেকটা। সুধাকাকিমা তাই দেখে পিলুদিকে বকাবকি করে বললেন, কাটলি তো আঙুলটা! কাজের দিনে–

তার রক্ত বন্ধ হচ্ছে না দেখে তার হাত ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে গেলেন পাশের ঘরে, বললেন, তা হলে আইডিন লাগিয়ে দি, আয়—

আইডিনের নাম শুনে পিলুদি ভয়ে অস্থির। তখন আইডিন ছিল রক্ত বন্ধ করার একমাত্র ওষুধ, কিন্তু কাটার উপর আইডিন লাগালে কী ভীষণ জ্বালা করে তা তারাই জানে যারা কখনও কাটার উপর আইডিন লাগিয়েছে।

পিলুদি কাটা জায়গায়টায় আঙুল দিয়ে চেপে ধরে বারবার কাকুতিমিনতি করতে লাগল, সুধাকাকিমা, আমার এমনিতে সেরে যাবে, তুমি আইডিন দিও না।

কিন্তু সুধাকাকিমা খুব দাপুটে মহিলা, হাতে আইডিনের শিশি নিয়ে তাকে এক ধমক দিয়ে বললেন, দেখি আঙুলটা বাড়িয়ে রাখ।

পিলুদির পাশেই আমি দাঁড়িয়ে। ঝুঁকে পড়ে দেখছি কাটা জায়গায় আইডিন দিলে কীরকম ছটফট করতে থাকবে পিলুদি! খুব কষ্টও হচ্ছে তার যন্ত্রণার কথা ভেবে। আইডিন লাগানোর যন্ত্রণার সঙ্গে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। তার চেয়ে একটা আঙুল কেটে ফেলা বোধহয় অনেক কম যন্ত্রণার!

সুধাককিমা তখন ডান হাতে একখণ্ড তুলো নিয়ে তার উপর আইডিন ফেলছেন ফোঁটা ফোঁটা করে, হঠাৎ কী যে হল, আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পিলুদি সটান উল্টে পড়ল মেঝের উপর। ধপ করে শব্দ হল তার পড়ে যাওয়ার। সঙ্গে সঙ্গে সুধাকাকিমা ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, ওরে কী হল রে তোর?

সুধাকাকিমার তখন আইডিন লাগানো মাথায় উঠেছে, আইডিনের শিশি পাশে সরিয়ে রেখে নিচু হয়ে ডাকছেন, এই পিলু, পিলু, কী হল রে তোর?

আমিও নিচু হয়ে দেখছি পিলুদি একদম অজ্ঞান, দুই চোখের পাতা বোজা, মুখে গোঁ গোঁ শব্দ করছে।

সুধাকাকিমা তখনই ছুটে গিয়ে জলের ঘটি নিয়ে এসে ঝাপটা দিতে শুরু করলেন পিলুদির চোখেমুখে। আর একজন পাখার হাওয়া করতে শুরু করল। বেশ কিছুক্ষণ ঝাপটা দিতেই পিলুদি চোখ মেলে তাকায়, কিন্তু তার তাকানোর মধ্যে যেন কীরকম অস্বাভাবিকতা!

ততক্ষণে সেই খবর পৌঁছে গেছে সারা বাড়িতে। পিলুদিকে ঘিরে তখন বহু মানুষের ভিড়। সবাই উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞাসা করছে, কী হয়েছে রে, পিলু? অজ্ঞান হয়ে গেলি কেন? পিলুদি কী কারণে যেন কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। আরও কিছুক্ষণ জলের ঝাপটা ও পাখার হাওয়া দেওয়ার পর উঠে বসে। তখনও কিছুটা অপ্রকৃতিস্থ তার চোখদুটো। একটু সুস্থ হতে বলল, সুধাকাকিমা যখন তার আঙুলে আইডিন ঢালছিলেন, সেই সময় সামনে দাঁড়িয়ে বেণুদা ঝুঁকে পড়ে দেখছিল সেই দৃশ্যটা। একদম সামনে দাঁড়িয়ে।

বলতে বলতে পিলুদির চোখদুটো কীরকম ভয়কাতর।

বেণুদা! আমরা সবাই স্তম্ভিত।

সুধাকাকিমা তাকে তাড়া দিয়ে বলল, কী যে বলছিস! আমিও তো সেখানে ছিলাম!

—সত্যি বলছি, কাকিমা। প্রথমে খেয়াল হয়নি, ভাবছিলাম বেণুদাদের বাড়ি, বেণুদা তো থাকবেই। কিন্তু যেইমাত্র মনে পড়ল বেণুদা আর বেঁচে নেই, অমনি মাথাটা কেমন ঘুরে গেল!

সুধাকাকিমা বিশ্বাস না করলেও বেণুদার বাবা-মা দুজনেই এসে দাঁড়িয়েছেন সেখানে, তাঁরা হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বললেন, তোকে দেখা দিল, আমাদের কেন একটু দেখা দিচ্ছে না!

আমার বিস্ময় তখন চরমে। চোখ কপালে তুলে ভাবছি, সে সময় আমিও তো পিলুদির পাশেই দাঁড়িয়েছিলাম, আমিও দেখছিলাম সেই আইডিন ঢালার দৃশ্য, আমি তো বেণুদাকে দেখতে পাইনি! ভাবামাত্র আমার শরীরটা কীরকম শিরশির করতে লাগল! তার মানে বেণুদা দাঁড়িয়েছিল আমার ঠিক পাশেই!

সেদিনের অনুষ্ঠান-আয়োজন আরও ভারী হয়ে গেল যেন। আমাদের কারও খাওয়ার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু আমরা বেণুদার বন্ধু বলে ছাড়তে চাইলেন না বেণুদার মা-বাবা কেউই।

খাওয়ার পাট চুকিয়ে আমরা যে যার ঘরে ফিরে এলাম দুপুরের পর। পিলুদিকে একা পেতে আমি একবার জিজ্ঞাসা করলাম, ‘সত্যি তুমি বেণুদাকে দেখেছিলে?’ পিলুদি বললেন, সত্যি বলছি তিন সত্যি।

সেদিন রাতে ছিল কাঙালি ভোজন, যে-মাঠে আমরা ফুটবল খেলতাম সেই মাঠে সারি সারি আসন পেতে খাওয়ানো হবে অগুন্তি মানুষকে। সে নাকি হবে এক এলাহি দৃশ্য! দৃশ্যটা দেখার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল আমার। সন্ধে পার হতেই আমরা বন্ধুরা মিলে হাজির হলাম মাঠটার পাশে।

অবাক হয়ে দেখছিলাম দূর-দূরান্তর থেকে গরিব মানুষের ঢল নেমেছে বেণুদাদের বাড়ি। পিলপিল করে লোক আসছে তো আসছেই। মাঠের সবুজ ঘাসের উপর পাতা লম্বা লম্বা কাপড়ের ফালি। যেই একজন করে আসছে, তার উপর বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে সার সার। হাজারের উপর লোক হয়েছিল খাওয়ার সময়। বাড়ির সামনে সবুজ ঘাসের মাঠটায় চার সারি লোক বসেছিল, এক-একটা সারিতে বহু লোক! সব রকম ব্যঞ্জন দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়েছে তাদের। একটা ব্যাচ শেষ হতেই আবার একটা ব্যাচ। এরকম রাত দুপুর পর্যন্ত সেই খাওয়াদাওয়া।

কিন্তু তার পরের ঘটনাটা আরও আশ্চর্যের। বেণুদার বাবা তিনতলার বারান্দায় বসে দেখছিলেন গরিব মানুষদের খাওয়া। অনেক সময় উপর থেকে নির্দেশ দিচ্ছিলেন যাতে যাচাই করা হয় প্রতিটি ব্যঞ্জন। সেই খাওয়ার মধ্যে হঠাৎ বেণুদার বাবা দেখলেন বেণুদা সেই মাঠে ঘুরে ঘুরে আপ্যায়ন করছে গরিব অতিথিদের।

বেণুদার বাবা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না দৃশ্যটা। সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়লেন সেখান থেকে। তারপর তিনতলা থেকে নীচে নেমেছিলেন এক-একবারে দু-তিনটে করে সিঁড়ি লাফ দিয়ে নেমে। প্রায় বিদ্যুতের মতো সেই নামা। নীচে নেমে ছুটতে ছুটতে সেই জায়গায় পৌঁছে দেখলেন, কই কোথাও তো নেই বেণু! তারপর কত খুঁজলেন সেই মাঠটা যদি কোথাও দেখতে পান বেণুদাকে! না-পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে তাঁর কী আপশোস! বারবার বলছিলেন কেন তিনতলা থেকে তখন লাফ দিয়ে নীচে নামলাম না! তা হলে হয়তো বেণুকে জড়িয়ে ধরতে পারতাম!

বেণুদার বাবার কথাগুলো অবাস্তব মনে হচ্ছিল তখন, পরে মনে হচ্ছিল বাবার প্রাণ তো! ছেলে হারিয়ে তাঁর মাথার ঠিক নেই। হয়তো মুহূর্তের উন্মাদনায় লাফ দিতেন তিনতলা থেকে

একের পর এক ঘটে যাওয়া দৃশ্যগুলির সমস্তটাই মনে হচ্ছে অদ্ভুত, অলৌকিক।

বহুকাল পরেও সেই বিস্ময় রয়ে গেছে আমার ভিতর। সত্যিই কি বেণুদার অশরীরী শরীর ঘোরাফেরা করছিল তাদের বাড়ির নানা পটভূমিতে! না কি এক চিররুগ্‌ণ কিশোরের প্রতি অপরিমেয় স্নেহ ও মমত্ব তাকে ইহলোক থেকে বিদায় দিতে মন চায়নি কারও, তাই তার মুহুর্মুহু আবির্ভাব নানা জনের মানস জগতে!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *