এক
ঝাঁ-ঝাঁ দুপুর, বাড়ির সবাই খাওয়া-দাওয়া সেরে কেউ বা বিছানায়, কেউ বা মেঝেয় মাদুর পেতে টানটান হয়ে ঘুমোচ্ছে। এরকম একলা-সময়ে খিড়কি-দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল সন্টু। বাড়ির পিছনে বিশাল বাগান। আম, জাম, কাঁঠাল থেকে শুরু করে বঁইচি, ফলসা, করমচা পর্যন্ত সবরকম ফলের গাছে ভর্তি ওদের এগারো বিঘের বাগানটা, তার মধ্যে শানবাঁধানো বিরাট পুকুর, চারপাশে সার দিয়ে নারকেল আর তালগাছের গায়ে গা লাগিয়ে বিশাল একটা রেন-ট্রি, তার গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে জম্পেশ করে বসল।
তার হাতে একখানা ভূতের গল্পের বই। ভূতের গল্প ওর খুব ফেভারিট, সাধারণত রাত্তির ছাড়া ও ভূতের গল্প পড়ে না। যে-গল্পের যেরকম পরিবেশ, সেটাই ওর পছন্দ। এখন ভরদুপুরে তাদের বাগানের এই গা-ছমছমে পরিবেশেও ভূতের গল্প বেশ জমে উঠবে। এমনিতে ভূতকে খুব একটা কেয়ার করে না সে, বরং পোড়োবাড়ি দেখলেই রাতের অন্ধকারে উঁকিঝুঁকি দেবার লোভ ওকে মাঝে-মাঝে পেয়ে বসে, কিন্তু হয়ে ওঠেনি কখনও। বিল্টুদা এ-ব্যাপারে ওর জুড়ি, তার সঙ্গে রাতে তিনতলার ছাদে উঠে গাছগাছড়ার দিকে তাকিয়ে থেকেছে, হঠাৎ যদি কোনো ভূতবাবাজির রকমসকম ওদের নজরে পড়ে, কিন্তু কিছুতেই কিছু ঘটেনি।
গল্পটা পড়া শুরু করতেই পুকুরপাড় থেকে ঝিরঝিরে ঠান্ডা হাওয়া ভেসে এল একঝলক, শরীরটা জুড়িয়ে এল সন্টুর। গল্পটা পাড়াগাঁর। ভূত তো পাড়াগাঁয়েই বেশি থাকে, শ্যাওড়াগাছের ডালে, কিংবা চাঁপাগাছের পাতায়, কিংবা জোড়া অশত্থগাছের মগডালে বসে ওদের যত কাণ্ডকারখানা। কিন্তু এ গল্পটায় একটা অন্যরকম ভূতের কথা পড়ে চমকে উঠল সে। গোরু মরে গেলেও যে ভূত হয় তা কখনও শোনেনি। অবশ্য সব গোরুই যে ভূত হয় তা নয়। যে-সব গোরু অপঘাতে মরে তারাই পরে গো-ভাগা বা গো-ভূত হয়ে যায়।
তো, এরকম একটা গো-ভাগার পাল্লায় পড়ল পাড়াগাঁর একটা লোক। যাচ্ছিল মেঠোপথ বেয়ে হনহন করে, দুপাশে ধানের খেত, মাঝখান দিয়ে বড়ো বড়ো ঘাস মাড়িয়ে যেতে যেতে হঠাৎ একটা ইঁদুর দেখতে পেয়ে থমকে দাঁড়াল। ইঁদুরটার গলায় একটা ঘণ্টা বাঁধা, শব্দ হচ্ছে ঝুনঝুন। শুধু তাই নয়, তার চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। লোকটা বুঝতে পারল, এটা নিশ্চয় গো-ভাগা। আর বুঝতে পেরেই তার বুকের ভেতর রেলগাড়ি চলতে থাকল। গো-ভাগারা তো মাঠে-ঘাটেই ঘুরে বেড়োয় ইঁদুরের রূপ ধরে, আর এই ইঁদুর যদি কোনোরকমে একবার কোনো পথিকের দু-পায়ের ফাঁক দিয়ে গলে যেতে পারে, তাহলে মুখের রক্ত উঠে সে পথিকের মৃত্যু অনিবার্য।
লোকটা অসহায় হয়ে চারপাশে চাইল। ইঁদুরটা সামনে দিয়ে এলে তবু দু-পা জোড় করে তাকে ঠেকানো যেতে পারে। ইঁদুরটা কিন্তু সামনে দিয়ে এল না, ঝুনঝুন শব্দ করে পাশের ধানখেতে ঢুকে গেল। তখন লোকটা জোর কদমে হাঁটা শুরু করল, কিন্তু তাতেও রেহাই নেই, আবার ইঁদুরটার ঝুনঝুন শব্দ শোনা যায়। কাছেপিঠে কোথাও আছে, হয়তো বা অদৃশ্য হয়ে। একবার দু’পায়ের ফাঁক দিয়ে গললে-
ভয়ে লোকটা দৌড় শুরু করে, মেঠোপথ ভেঙে দৌড়োতে-দৌড়োতে যখন সে হাঁপিয়ে পড়েছে, ঠিক সে সময় পিছনে আবার ঝুনঝুন শব্দ। পিছন ফিরে দেখে, ইঁদুরটা বেশ বড়োসড়ো মনে হচ্ছে এবার, আর তার চোখদুটো যেন একটা গোরুর চোখের মতো জ্বলছে। বুঝতে পারল গো-ভাগাটা তার পিছু নিয়েছে, তা হলে আজ আর নিস্তার নেই। ভয়ে এবার সে ইঁদুরটাকে সামনে রাখার জন্য ঘুরে দাঁড়ায়, ইঁদুরটা ততবার ঘুরে তার পিছনে। ক্রমে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে লোকটা ক্রমাগত বনবন করে চারপাশে ঘুরতে থাকল, আর তার মাঝখানে একবার ফুড়ুত করে ইঁদুরটা তার পায়ের ফাঁক দিয়ে গলে চলে গেল। ভয়ে, ক্লান্তিতে, পরিশ্রমে লোকটা মুখ থুবড়ে পড়ল ধানখেতের মধ্যে।
এই পর্যন্ত পড়েই সন্টু একবার চারদিকে তাকাল। এতরকম ভূতের গল্প সে পড়েছে, কিন্তু গো-ভাগার নাম কখনও শোনেনি। পা-দুটো সামনের দিকে ছড়ানো ছিল তার, গা ছমছম করে উঠতেই পা-দুটো গুটিয়ে বসল। পথেঘাটে চলতে কত ইঁদুর তো তার চোখে পড়ে, এর মধ্যে কোন্টা যে গো-ভূত সে কী করে জানবে। তাদের বাগানেই কি কম ইঁদুর আছে! এই তো সেদিন চাটুজ্জেদের বাগানে একটা গোরু বাজ পড়ে সন্ধেবেলা মরে গেল। সেটাও নিশ্চয় গো-ভাগা হয়ে গেছে। বিল্টুদা এখনও এ-ব্যাপারটা জানে না। আজ বিকেলেই জানাতে হবে।
আবার পড়তে শুরু করল সন্টু। লোকটা শুধু মরেই গেল না, গো-ভাগা মানুষ মারলে সে-সব লোকরা একঠেঙে ভূত হয়ে যায়। লোকটা একঠেঙে ভূত হয়ে লম্বা তালগাছে বসে থাকে তার এক ঠ্যাঙ ঝুলিয়ে, তার নীচে দিয়ে যত লোক যায় তাদের লাথি মারে, মুখ থুবড়ে ফেলে দেয় আর হি-হি করে হাসে।
বাপ রে! সন্টুর গা-টা আবার ছমছম করে ওঠে। এ-সব ভূতের নাম আর ব্যাপার-স্যাপার সে জন্মেও শোনেনি। সে আবার বসে আছে একটা তালগাছের গুঁড়ির কাছেই। বিল্টুদা পাশে থাকলে তার সাহস বেশি থাকে, আপাতত সে খুব নিরাপদ বোধ করল না। বইটা এখনও অনেক বাকি, ফেলে রেখে উঠতেই ইচ্ছে করছে না, এদিকে ঝিরঝিরে ঠান্ডা হাওয়ায় বেশ ঘুম-ঘুমও পাচ্ছে। এখন, এই ঝাঁ-ঝাঁ দুপুরে ঠান্ডা শানের মেঝেয় মাদুর বিছিয়ে ঘুমোনোই ভাল। ভাবতে-ভাবতে হঠাৎ সে চমকে উঠল একটা ঝুনঝুন শব্দ শুনে। সর্বনাশ! গো-ভাগা নাকি! আর ঠিক তার পর মুহূর্তে তার মাথায় কে যেন পিছন থেকে ধাক্কা মারল। মাথাটা ঝিমঝিম করে চোখ অন্ধকার হয়ে এল তার, এ বোধহয় একঠেঙে ভূতের লাথি।
পিছনদিকে কোনোক্রমে ফিরে দেখল, একঠেঙে ভূত নয়, ধাক্কা মারছে বিল্টুদা।
চোখদুটো গোল-গোল করে বিল্টুদা বলছে, “কী রে, খুব যে জমিয়ে গল্পের বই পড়ছিস? এদিকে কড়াইমণ্ডির জঙ্গলে বুনো আম পেকে উঠেছে, তার খবর রাখিস? একদম সিঁদুর-রঙ, চ’ চ’, পেড়ে আনি।”
দুই
বিল্টু হল সন্টুর মাসতুতো ভাই। তবে ‘চোরে চোরে’ নয়, ওদের সবাই বলে ‘জোড়ে জোড়ে মাসতুতো ভাই’ কিংবা মানিকজোড়। দুজনে ভীষণ ভাব। বিল্টুদা তো ভীষণ সাহসী আর বেপরোয়া। ওর সঙ্গে মিশে সন্টুও এখন ‘ডোন্ট কেয়ার’ হয়ে গেছে। চোর, পুলিশ, ডাকাত, খুনি, ভূত-পেনি কোনো কিছুতেই সে আর ভয় পায় না। অথচ তার মাত্তর এগারো বছর বয়স, আর বিল্টুদার চোদ্দো। মাঝে মাঝে ঠিক দুক্কুরবেলা দু’জনে পাড়ি দেয় গাঁয়ের দক্ষিণদিকে, জলাবিল পেরিয়ে কড়াইমণ্ডির জঙ্গলে।
কড়াইমণ্ডির জঙ্গল এক অজানা রূপকথার দেশ। কতরকম আর রং-বেরঙের গাছগাছালি, লতাপাতা, ফলমূল পেকে বুঁদ হয়ে থাকে ডালে ডালে, গন্ধ ছড়ায়। কোথাও বুনোফুলের ঝাঁক ঘিরে মৌমাছি গুনগুন করে। আকাশছোঁয়া সেসব গাছের মধ্যে দাঁড়িয়ে তাদের বিস্ময় আর কাটে না। ভরদুপুরেও তেমন রোদ্দুর পৌঁছোতে পারে না জঙ্গলের ভিতর, তাই একটা আলো-আঁধারি ভাব। ডাঁশা কুল, বৈঁচি, কামরাঙা তো আছেই, তাছাড়া আমলকীর দু-তিনটে গাছ ওদের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ।
পাক্কা আধঘণ্টা পরে বিল পেরিয়ে ওরা ঢুকে পড়ল কড়াইমণ্ডির অসাড় জঙ্গলে। শীতের দুপুর বলে রোদের তাপ অনেকটা কম, এরকম দুপুরে টইটই করে ঘুরে বেড়োতে ভালোই লাগে।
চলতে চলতে বিল্টুদা পকেট থেকে একমুঠো খোসা ছাড়ানো বাদাম সন্টুর হাতে দিল “নে, চিবো।”
খোসা ছাড়িয়ে নুন আর শুকনো লঙ্কা দিয়ে তেল-চুবচুবে ভাজা বাদাম গালে ফেলতেই সন্টু জিভে স্বর্গসুখ অনুভব করল। এজন্যই বিল্টুদাকে তার এত ভাল লাগে।
কড়াইমণ্ডির জঙ্গল বেশ বড়োই। কত বড়ো তা সন্টুর ধারণা নেই। জঙ্গলের গভীরে কখনও যায়নি। আজ হঠাৎ সাহস করে দুজনে অনেক ভিতরে ঢুকে গেল। জঙ্গল ক্রমশ এত ঘন আর গভীর হয়ে গেছে যে, সূর্যের আলো ভিতরে প্রায় আসে না বললেই চলে। এই ভরদুপুরেও আলো-আঁধারি ভাব, কোথাও প্রায় ঘুরঘুট্টি। একটা লাল-হলদে পাখি ক্রমাগত এ-ডাল ও ডাল করে ওদের অনেকটা ভিতরে নিয়ে গেল। বিল্টুদা যতবার গুলতি তাক করে, ততবারই পাখিটা টুক করে অন্য ডালে উড়ে বসে।
এভাবে ডালপালা লতাপাতা সরিয়ে কিছুটা যাবার পর একটা ছোটো খাল পড়ল। তরতরে জল, কুলকুল করে বয়ে চলেছে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে। সবুজ ডাল দুপাশে ঝুঁকে পড়েছে জলের মধ্যে। দুজনেই খুব আশ্চর্য হল। এখানে কোনো খাল আছে বলে জানত না ওরা, খালের পাড় দিয়ে সরু রাস্তা বনের ভিতর মিলিয়ে গেছে। হাঁটতে হাঁটতে ওরা দুজনেই সংবিৎ হারিয়ে ফেলেছিল, খেয়াল হতে বুঝল, শীতের বেলা, জঙ্গলের ওপাশে সূর্যদেব প্রায় ডুবু-ডুবু, চারপাশে ক্রমে ঘন হয়ে আসছে অন্ধকার। সন্টু বলে উঠল, “চলো বিল্টুদা, এবার বাড়ির দিকে ফেরা যাক। সন্ধে হয়ে আসছে।”
কিন্তু ফিরতে চাইলেই কি ফেরা যায়। এলোমেলোভাবে চলতে চলতে তারা যে কতদূর সেঁধিয়ে এসেছে বনের ভিতর, তা দুজনের কেউই অনুমান করতে পারল না। পিছন ফিরে দেখে, লতাপাতা কাণ্ডের আড়ালে কেবল জঙ্গল আর জঙ্গল। ঝোপঝাড় ঠেলে অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও কোথাও বনের সেই সরু পথ দেখতে পেল না, বরং একটু পরে ঘুরেফিরে সেই খালের পাড়ে এসে পৌঁছোল। সন্টু ভয় পেয়ে বলে উঠল, “কী হবে বিল্টুদা।”
বিল্টুদা জবাব না-দিয়ে দূরে আঙুল দিয়ে কী একটা দেখাল। তার আঙুল অনুসরণ করে সন্টু দেখল, জঙ্গলের ভিতর একটা বিশাল বাড়ি। পুরোনো জমিদারবাড়ির মতো চেহারা, তিনতলা তো বটেই, চারতলাও হতে পারে। প্রায় দু-তিন বিঘে জায়গা নিয়ে বাড়িটার এলাকা, চারপাশে উঁচু পাঁচিল। কড়াইমণ্ডির জঙ্গলের সব ইতিহাস তারা জানে না। এই জঙ্গল থেকে একদিন বৈঁচিফল এনেছিল বলে সন্টুর মা খুব বকাবকি করে বলেছিলেন, “তোদের সাহস তো বলিহারি, অমন জঙ্গলে কি ঢুকতে আছে? চোর-ডাকাত, সাপ-খোপ, ভূত-প্রেত কতকিছু থাকতে পারে। রাত্তিরে নাকি জঙ্গলের ভিতর আলো জ্বলে।” তো, এসব কথা ওরা ভয় দেখানো কথা বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। এমন একটা পোড়োবাড়িতে যে ডাকাতদের আস্তানা থাকতে পারে তা এখন আর ওরা অস্বীকার করতে পারল না।
কিন্তু ডাকাত নয়, একটু পরে যা দেখল, তাতে মুহূর্তে দুজনের বুকের রক্ত হিম হয়ে এল। দেখে, দুটো কালো মুখ-ঢাকা আলখাল্লা পরা মূর্তি বড়ো বাড়িটার দিক থেকে লম্বা-লম্বা ঠ্যাঙ্ বাড়িয়ে ওদের দিকে আসছে। মূর্তি না বলে ছায়ামূর্তি বলাই ভালো। বিল্টুদা চট করে সন্টুর হাত ধরে হড়হড় করে টেনে একটা বড়ো গাছের আড়ালে নিয়ে গেল। ছায়ামূর্তিদুটো তাদের গায়ের আলখাল্লাদুটো খুলে একটা পাকুড় গাছের গোড়ায় রাখল। স্রেফ দুটো কংকাল। আলখাল্লা খুলে রেখে কংকালদুটো মুহূর্তে মিলিয়ে গেল জলের মধ্যে।
দৃশ্যটা দেখে দুজনের বুকের মধ্যেই ঢিব ঢিব শব্দ হচ্ছিল। এই মুহূর্তে এখান থেকে পালানো দরকার, কিন্তু কীভাবে পালাবে বুঝতে পারার আগেই কানে এল আবার হাড়-ঠকঠক শব্দ। এবার লুকোতে গেলে নির্ঘাত ধরা পড়ে যাবে, কারণ আরো একটা ছায়ামূর্তি ওদের গাছটার দিকে এগিয়ে আসছে। সঙ্গে সঙ্গে একটা বুদ্ধি বার করল বিন্টুদা। পাকুড়গাছের গোড়া থেকে মুখ-ঢাকা আলখাল্লাদুটো তুলে নিজে একটা পরে ফেলল, অন্যটা পরিয়ে দিল সন্টুকে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ছায়ামূর্তিটা ওদের কাছে এসে দাঁড়াল।
তিন
ছায়ামূর্তিটা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে হঠাৎ বললে, “তোরা কেঁ রে, তোঁদের তো ঐ পাড়ায় কখনো দেখিনি।”
সন্টুর বুকের ভিতরে এমন রেলগাড়ি চলতে শুরু করল যে, ওর মনে হল এক্ষুনি অজ্ঞান হয়ে যাবে। আলখাল্লার ভিতরে গলগল করে ঘামছে সে। চোখের কাছে একটা জাল-লাগান বলে তার ভিতর দিয়ে ছায়ামূর্তিটাকে দেখতে পাচ্ছে ওরা। এতদিন ভূতপেনি নিয়ে এতসব গল্প পড়ার অভিজ্ঞতা আর ডোন্ট-কেয়ার ভাব কোথায় মিলিয়ে গেল লহমায়। সন্টু আর কিছু ভাবার আগেই বিল্টুদা হঠাৎ আলখাল্লার ভেতর দিয়ে বলে উঠল, “আমরা আঁগে গাঁয়ে থাকতাম, ওখানে ভাঁল লাগছে না তাই জঙ্গলে চলে এলাম তোমাদের সঙ্গে থাকব বলে।”
হি-হি করে হেসে উঠল ছায়ামূর্তি, হাড়গুলো ঠকঠক করে উঠল অন্ধকারে। আলখাল্লার ভিতর থেকে তার হাসিটা এমন কলকল করে ক্রমাগত বেরোতে থাকল যে, পিলে চমকে ওঠা কাকে বলে টের পেল সন্টু। “তা বেশ করেছিস, চল আগে আমাদের আস্তানায় নিয়ে যাই।”
ছায়ামূর্তির হাসি শুনে সন্টু বুঝতে পারল ওরা ধরা পড়ে গেছে। এরপর ওদের অবস্থা যে কী হবে তা মানসচক্ষে স্পষ্ট দেখতে পেল। ছায়ামূর্তি আগে-আগে চলতে শুরু করতেই বিল্টুদা সন্টুকে ইশারা করল অনুসরণ করতে। সর্বনাশ! ওই পোড়োবাড়িটার দিকেই যে যাচ্ছে ওরা।
খুব লম্বা-লম্বা পা ফেলছে ছায়ামূর্তিটা, মাঝে মাঝে পা যেন মাটি না ছুঁয়েই চলে যাচ্ছে। আর সমস্ত শরীরটা হাওয়ায় হালকা হয়ে ভাসছে হি-হি করে। ভূতদের থাকার মতো প্রকৃষ্ট জায়গাই বটে। তিনতলা বাড়ি হলেও দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে বিশাল। আগে রাজবাড়ি কিংবা সম্ভ্রান্ত জমিদারবাড়ি ছিল বলে মনে হয়।
ছায়ামূর্তির পিছু-পিছু বড়ো-বড়ো সিঁড়ি ভেঙে বারান্দায় উঠে এসে দেখল এখানে-ওখানে আরো অনেক ছায়ামূর্তি ঘুরছে-ফিরছে। একজন বারান্দার কোণে হেলান দিয়ে রয়েছে থামের সঙ্গে। দুজন নাকিসুরে গুজ গুজ করছে সিঁড়ির ধারে দাঁড়িয়ে। একজন বারান্দার কুলুঙ্গিতে গুটিসুটি মেরে বসে আছে পায়ের সঙ্গে মাথা ঠেকিয়ে, অন্য একজন ছেঁড়াখোঁড়া সোফাটায় শরীর রেখে পা দুটো তুলে ধরেছে দেওয়ালের উপর। প্রত্যেকেরই শরীর কালো আলখাল্লায় ঢাকা।
যে-ছায়ামূর্তির পিছু-পিছু ওরা আসছিল সেটা হঠাৎ সাঁত করে দেওয়ালের ভিতর দিয়ে মিলিয়ে গেল ঘরের মধ্যে। ব্যাপার বুঝে ফাঁপরে পড়ল ওরা, ভূতের মতো দেয়াল ভেদ করে তো ওরা আর ভিতরে যেতে পারবে না। বিল্টুদা পট্ করে বুদ্ধি খাটিয়ে পাশের ভাঙা দরজার মধ্য দিয়ে ঘরে ঢুকে গেল সন্টুকে নিয়ে। ছায়ামূর্তিটা ততক্ষণে সে-ঘর পেরিয়ে বোধহয় অনেকটা চলে গিয়েছিল, সন্টুদের না-দেখতে পেয়ে আবার সাঁত করে ফিরে এল ঘরে। বলল, “কী ব্যাপার, তোরা এঁত দেরি করছিস কেঁন? চল্, রানির দরবারে নিয়ে ঠাঁই তোঁদের।”
রানির দরবারে যেতে হবে কেন! শুনেই ওদের বুকটা ছাঁত করে উঠল। ছায়ামূর্তিটার কী মতলব বোঝা যাচ্ছে না। এ-দরজা ও দরজা, বারান্দার পর বারান্দা পেরিয়ে যেতে লাগল ওরা। পাশ দিয়ে সাঁ সাঁ করে আরো অনেক ছায়ামূর্তি চলে যাচ্ছে, একবার একটা হাওয়া এসে হঠাৎ দুজনকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে চলে গেল, বোধহয় এ-ভূতটা অদৃশ্য। আলখাল্লার ভিতর দিয়ে বিল্টুদা আর সন্টু চোখাচোখি করল এক লহমা।
খানিকক্ষণ পরে ওরা এসে পৌঁছোল একটা বিশাল হলঘরের মধ্যে। এ-ঘরটার ঘুলঘুলি দিয়ে একটা জ্যোৎস্না-জ্যোৎস্না আলো আসছে, তাই রাত হলেও ঘরের ছবিটা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে সন্টুরা। একদিকে ভাঙা চেয়ার-টেবিল পাতা, চেয়ারে বসে আছে নীল ঢাকা এক ছায়ামূর্তি। লাল রঙের পালক আঁটা রয়েছে আলখাল্লার গায়ে, তাতে ছায়ামূর্তিটাকে বেশ জমকালো দেখাচ্ছিল। তার সামনে ঘরের মেঝেয় বসে আছে আরো তিরিশ-চল্লিশটা ছায়ামূর্তি। সবাই নাকিসুরে কিচমিচ করে কী-সব জিজ্ঞাসা করছে চেয়ারে বসা ছায়ামূর্তিটাকে, আর সে একইরকমভাবে নাকি গলায় তার উত্তর দিচ্ছে, হাত-পা নেড়ে বোঝাচ্ছে তাদের।
যে-ছায়ামূর্তিটা সন্টুদের এখানে নিয়ে এসেছে, সে সোজা চেয়ারে বসা ছায়ামূর্তির কাছে গিয়ে নিজের একটা পা কপালে ছুইয়ে বলল, “রানী মিং মিং, এই পোঁ-ভূতদুটো জঙ্গলে ঘুরঘুর করছিল, আপনার রাজত্বে থাকতে চায়, তাই নিয়ে এলাম। এই, তোরা রাঁণীকে ঝিল্লা কর।” বলে নিজের পা-টা তুলে মাথায় ঠেকিয়ে দেখিয়ে দিলো কী করে ঝিল্লা করতে হয়। ঝিল্লা মানে বোধহয় অভিবাদন।
তাহলে এই হল রানি, তাই অত লাল পালকের ছড়াছড়ি তার আলখাল্লায়। হুঁ-পু-র মতো ওরা দুজনে ভয়ে ভয়ে ঝিল্লা করল।
রানি মিং-মিং বলল, “তা বেশ বেশ। কি নাম তোঁদের?”
সন্টুর বুকটা হিম হয়ে গেল। কী উত্তর দেবে এখন! নাম না-বলতে পারলে এরা ব্যাপারটা নির্ঘাত বুঝে যাবে, আর অমনি ঘাড় মটকে রক্ত চুষে খেয়ে নেবে। ভয়ে নীল হয়ে সে বিল্টুদার দিকে তাকাল, আর তক্ষুণি বিল্টুদা হাতদুটো ক্যাঙারুগোছের করে কুঁই কুঁই শব্দ করল গলায়। দেখাদেখি সন্টু একই ভঙ্গিতে “উঁ-উঁ” শব্দ করে দেখাল।
রানি কী বুঝল কে জানে। দেয়ালে অনেকগুলো চক্কর-বক্কর দাগ কাটা ছিল, হাত লম্বা করে তার পাশে আরো দুটো দাগ কেটে বলল, “যাঁ, বোঁস এখেনে।” সন্টু বুঝতে পারল, চক্কর-বক্কর দাগগুলো ভূতদের নাম, ওই তালিকায় তাদের নাম যুক্ত হল।
ওরা বসতেই শুরু হল রানি মিং মিং-এর বিচারসভা।
চার
ভূতদেরও যে রানিটানি থাকে, তা সন্টুদের জানা ছিল না। রানি মিং মিং ভূতদের নিয়ে দিব্যি রাজত্ব চালাচ্ছে। ভূতের রাজত্ব’ কথাটা মনে আসতেই সন্টু প্রায় খিকখিক করে হেসে ফেলেছিল, কিন্তু হেসে ফেললেই যে অবধারিত মৃত্যু তা মনে পড়তেই সামলে নিল নিজেকে। ইতিমধ্যে বিল্টুদা তার গায়ে কনুইয়ের খোঁচা দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, এখন বেশ কিছুক্ষণ তাদের এরকম ভূত সেজে থাকতে হবে।
একটু বাদে রানি মিং-মিং-এর বিচারসভা শুরু হল। সন্টু আর বিল্টুদা আড়ষ্ট হয়ে বসে রইল অন্যান্য ভূতদের মাঝখানে। রানি মিং মিং-এর হাতে এখন একটা লাল-নীল বল, সেটা হঠাৎ উপরে ছুড়ে দিতেই ছাদে লেগে টং করে একটা শব্দ হল। সন্টু দেখল ছাদের ওই জায়গাটায় একটা ঘণ্টা বাঁধা আছে। শব্দ হতেই কালো আলখাল্লা পরা একটা ভূত দাঁড়িয়ে উঠে নাকিসুরে জানাল, কালাদিঘির পাড়ের বিশাল তালগাছটায় সে আজ প্রায় দশ বছর হল আছে, কিন্তু সরকার-বাড়ির বুড়ো চাকরটা মরে ভূত হয়ে এসে দাবি করছে, এ তালগাছ তার মনিবের, তাই এর ওপরে সে-ই থাকবে। এই অন্যায়ের বিচার চাই।
রানি তৎক্ষণাৎ তার পাশে দাঁড়ানো একজন সেপাইগোছের ভূতকে বলল, “এক্ষুণি চাকর-ভূতটাকে বিচারসভায় নিয়ে এসো।”
আর একজন জানাল, বেঁচে থাকতে বুড়ি-বউ তার সঙ্গে রাতদিন ঝগড়া করত, মরে গিয়ে বুড়ির হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল, কিন্তু মাসখানেক আগে বুড়ি মরে গিয়ে তাকে আবার ধাওয়া করেছে। যে-আমগাছে সে থাকত, তক্কে তক্কে বুড়ি হাজির হয়েছে সেখানে, আর ফের গাল পাড়ছে আগের মতো। রানি কিছু বলার আগেই বুড়ো ভূতটার পাশ থেকে উঠল ছোটোখাটো চেহারার একটা ছায়ামূর্তি। খ্যানখেনে গলায় চিৎকার করে বলতে লাগল, “কক্ষনো না। বুড়ো নিজেই অকর্মার ঢেঁকি, কুটোগাছটা নাড়বে না, কুঁড়ের বাদশা।”
বুড়ো ভূত কী একটা বলে ফেলেছে, অমনি তার বুড়ি পেতনি “তবে রে বুড়ো” বলে ধাওয়া করতেই বুড়ো সাঁ করে পালিয়ে গেল বিচারসভা থেকে, পিছন পিছন বুড়িও ছুটল তার আলখাল্লা সামলাতে সামলাতে।
সন্টু ব্যাপার-স্যাপার দেখে আবার হেসে উঠতে যাচ্ছিল, বিল্টুদার কনুইয়ের খোঁচা খেয়ে চুপ করে গেল। আর একজন ঢ্যাঙা চেহারার ভূত নাকি গলায় বলতে শুরু করল।
ঠিক এমনি সময় দুটো কংকাল তাদের হাড় ঠক-ঠক করতে-করতে হলঘরে ঢুকে পড়ে কুঁই-কুঁই করতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে বোঝা গেল তারা আলখাল্লা দুটো পাকুড়গাছের নীচে খুলে রেখেছিল। খালের জলে একটু গা ডুবিয়ে নেবার পরে উপরে এসে আর তাদের আলখাল্লা দুটো খুঁজে পাচ্ছে না। নিশ্চয় কেউ চুরি করেছে। এদিকে বেজায় শীত ধরে গেছে তাদের।
সন্টুর বুকের ভিতরটা হিম হয়ে গেল, সে আর বিল্টুদাই তো ওদের পোশাক দুটো চুরি করে পরেছে। আর তাই তো এইসব ভূতদের মধ্যে দিব্যি গা ঢাকা দিয়ে বসে আছে তখন থেকে এখন যদি খোঁজাখুঁজি শুরু হয়, তাহলে নির্ঘাত ধরা পড়ে যাবে ওরা। সন্টুর বুকের স্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
রানি কাঁসরঘণ্টা বাজাবার মতো শব্দ করে খ্যানখ্যানে গলায় বকাবকি করল অনেকক্ষণ, তারপর সেপাইগোছের একজনকে বলল, আরো দুটো পোশাক হাফেজখানা থেকে ওদের দিয়ে দিতে।
যে ছায়ামূর্তিটা বিল্টুদা আর সন্টুকে বনের ভিতর থেকে ধরে এনে এই ভূতের রাজ্যে নিয়ে এসেছে, তার নাম হুঁ-পু। রানি কিছুক্ষণ পরেই সভা ভেঙে দিতে হুঁ-পু বলল, “উঁ-উঁ আর কুঁই-কুঁই, চল্ এবার খেতে যেতে হবে।”
সন্টু বিল্টুদার দিকে তাকাল একবার। অনেকক্ষণ থেকে খিদেয় পেট চুঁই-ছুঁই করছে, এবার কিছু পেটে পড়বে জেনে নিশ্চিন্ত হল।
হুঁ-পু একটা গোলপানা ঘরে নিয়ে গেল ওদের। ঘরটা অন্ধকার, পোড়া গন্ধ চারদিকে, ফাটাফুটা মেঝে। একে-একে ছায়ামূর্তিগুলো ঘরের ভিতর ঢুকে গোল হয়ে বসে পড়ল। সন্টু আর বিল্টুদাকে নিয়ে হুঁ-পু তার মধ্যে ভিড়ে গেল খাওয়ার জন্যে। নাকি সুরের কিচমিচ শব্দে কান ঝালাপালা হবার যোগাড়, তার মধ্যে ফুরফুরে চেহারার এক ছায়ামূর্তি ঘুরে ঘুরে প্রত্যেকের সামনে একটা করে পাত্র রেখে গেল। তার মধ্যে খাবার রাখা। খাবারের চেহারা দেখে সন্টুর কান্না পেয়ে গেল। বিটকেল গন্ধওলা এগুলো কী খাবার। গন্ধে তো বমি এসে যাচ্ছে।
পাত্রের ভিতরে দুটো করে বড়ো সাইজের ব্যাং। ছায়ামূর্তিগুলো সেই ব্যাং মহানন্দে চিবোচ্ছে কিন্তু সন্টুরা সেগুলো না পারছে খেতে, না পারছে ফেলে রাখতে। হঠাৎ বিল্টুদা চট্ করে বুদ্ধি খাটিয়ে ব্যাংদুটো চুপিচুপি তার আলখাল্লার পকেটে চালান করে দিয়ে মুখ নাড়তে লাগল। দেখাদেখি সন্টুও তাই করল।
কিন্তু এতেও রেহাই নেই। এরপর সেই ছায়ামূর্তি এসে আর একটা করে পাত্র রেখে গেল প্রত্যেকের সামনে। তাতে রয়েছে বড়ো বড়ো মরা গিরগিটি আর শকুনের ডিম। বিল্টুদার মতো সন্টুর আলখাল্লার পকেটও ভারী হয়ে উঠল। সবার খাওয়া শেষ হতে হুঁ-পুর সঙ্গে ওরা বাইরে বেরিয়ে এল। পর পর কয়েকটা অন্ধকার ঘর পেরিয়ে হুঁ-পু ওদের বাইরে নিয়ে এল। এসে বুক ভরে পরিষ্কার বাতাস নিয়ে শুদ্ধ হল যেন শরীরটা।
হুঁ-পু এবার বলল, “চল, এবার তোদের একটা পেট-ঘুলঘুল করা দৃশ্য দেখাই।”
