ভূতের সঙ্গে রাত্রিকালে
জানো মা, স্কুল থেকে আমাদের শান্তিনিকেতন নিয়ে যাবে?
— শান্তিনিকেতন?
—হ্যাঁ, তিন দিনের জন্য।
—তিন দিন! বিষয়টা অনসূয়ার কাছে কীরকম কীরকম লাগে, জিজ্ঞাসা করল, সবাইকে তিনদিনের জন্য শান্তিনিকেতন নিয়ে যাবে!
—না, সবাইকে নয়, কথাটা একটু ঘুরিয়ে বুবুন বলল, যারা যারা যেতে চায়।
—তাই বল্, ক-জন আর যাবে?
—আমি কিন্তু নাম দিয়ে এসেছি। আরও অনেকেই দিয়েছে।
—অনেকে দিয়েছে মানে? ক-জন নাম দিয়েছে?
—তা কুড়ি-বাইশজন। শুধু সেভেন আর এইটের স্টুডেন্টরা।
—একটা স্কুলে চার-পাঁচ হাজার স্টুডেন্ট, তার মধ্যে মাত্র কুড়ি-বাইশ জন যাবে, তার মানে কেউই যাবে না! তোকেও যেতে হবে না! এই বয়সের ছেলেরা দল বেঁধে বাইরে গিয়ে কী না কী কাণ্ড ঘটাবে তার কিছু ঠিক আছে!
বুবুন কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে থাকে মায়ের দিকে, তারপর বলল, তুমি না বললেও বাবা নিশ্চয় না বলবে না! বাবা আসুক অফিস থেকে, আমি শিওর রাজি করিয়ে নেব। একটা ভলভো বাস হায়ার করা হচ্ছে. দু-জন আন্টি নিয়ে যাবে আমাদের। ওখানে কত প্রোগ্রাম! গোটা শান্তিনিকেতনের বাড়িগুলো দেখাবে, ট্রাইবালদের গ্রামের কালচারাল প্রোগ্রাম দেখাবে, কটেজ ইন্ডাস্ট্রি দেখাবে।
অনসূয়া তখনও জোর দিয়ে বলছে, মাত্র দুজন আন্টির ভরসায় এতগুলো ছেলে যাবে! এই বয়সের ছেলে সব! তোকে তো সব বাড়িগুলো দেখিয়ে এনেছি সেবার!
—কিন্তু ট্রাইবালদের নাচগান কি দেখিয়েছ?
—এতগুলো ছেলেকে নিয়ে ট্যাল করতে পারবে টিচাররা?
—শুধু কি ছেলেরা যাবে! মেয়েরাও তো যাচ্ছে।
—মেয়েরাও যাচ্ছে! অনসূয়ার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়। বলল, ছাড়ছে ওদের বাবা-মা?
—হ্যাঁ, এর মধ্যে সাত-আটজন মেয়ে নাম দিয়েছে! আরও দেবে বলেছে!
অনসূয়া গুম হয়ে থাকে। মাত্র তেরো বছর বয়স বুবুনের, আজকাল নিজের ব্যাপারে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে শিখেছে, মায়ের কথা শোনারও প্রয়োজন মনে করে না।
বুবুনের বাবা ফিরল রাত ন-টা নাগাদ, তাকে দেখেই বুবুন ঠিক সেই কথাগুলোই বলল যা সে এর আগে বলেছে মায়ের কাছে। তার বাবা এ সব বিষয়ে একটু উদার, তবু বলল, তোর মা কী বলছে!
—মা তো শোনামাত্র নাকচ করে দিয়েছে যাওয়ার প্রোগ্রাম! আমি কিন্তু যাবই। মা ঠিক বুঝতে পারছে না ওখানে গেলে কতটা আনন্দ হবে!
রজতাভ বলল, তা তো হবেই। ঠিক আছে, তোর মাকে আমি বুঝিয়ে বলছি। অনেক ছেলেমেয়ে যদি একসঙ্গে যায়, তুইও যাবি।
অনসূয়া একেবারে তেলে-লঙ্কায় জ্বলে ওঠে, বলল, তুমি তো ওকে সাপোর্ট করবেই। কিন্তু এই বয়সের ছেলেমেয়েরা এখনও নিজের ভালোমন্দ বুঝতে শেখেনি, বাইরে কী না কী ঘটিয়ে ফেলবে কে বলতে পারে! মাঝেমধ্যে খবরের কাগজে কত সব খবর বেরোয়। হয়তো পুকুরে দল বেঁধে স্নান করতে নামল, সবাই সাঁতার জানে তা তো নয়, কী যে অঘটন ঘটিয়ে ফেলবে কে জানে! তাও যদি প্রিন্সিপাল নিজে যেতেন তা হলে কথা ছিল! ঠিক আছে, আমি প্রিন্সিপালের সঙ্গে কথা বলব।
—কক্ষনো বলবে না! দাঁড়াও আমি দাদানের সঙ্গে কথা বলছি।
বুবুন ঘাড় ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে নীচে এল, দাদান বসেছিল কমপিউটারে, তাঁকে বলল, দাদান, স্কুল থেকে আমাদের শান্তিনিকেতন নিয়ে যাচ্ছে. মা বলছে যেতে দেবে না! তুমি তোমার মেয়েকে একটু বোঝাও তো।
দাদান বিষয়টা অনুধাবন করে বললেন, বন্ধুদের সঙ্গে এক্সকারশনে গেলে অবশ্য ভালো এক্সপোজার হয়।
—ভালো মানে, খুব ভালো! ওখানে ট্রাইবালদের এলাকায় নিয়ে যাবে, ওদের নাচগান দেখাবে। একটা কটেজ ইন্ডাস্ট্রিতে নিয়ে যাবে, তাদের কাজকর্ম দেখাবে–
দিদান বোধ হয় ছিলেন রান্নাঘরে, ছুটে এসে বললেন, শান্তিনিকেতন যাবি মানে!
—মানে আবার কী!
বিষয়টা শুনে দিদানও মুহূর্তে নাকচ করে দিলেন, বললেন, এত বড়ো স্কুল, তার মধ্যে মাত্র এই ক-জন! তার মানে প্রায় কেউই যাবে না! তা ছাড়া শান্তিনেকেতন তো তোর ঘোরা! তুই তো বাবা-মায়ের সঙ্গে এই তো ছ-মাস আগে ঘুরে এলি শান্তিনিকেতন!
—বাবা-মায়ের সঙ্গে যাওয়া, আর ক্লাসের বন্ধুদের সঙ্গে যাওয়া এক হল! কী যে বলো না! কী যে হইহই করব তিনদিন! এত আনন্দ কি আর বাড়ির লোকদের সঙ্গে হয়!
দিনদুয়েক ধস্তাধস্তির পর মা যদিও বা রাজি হল, দিদান তখনও লড়াই দিচ্ছেন, তুই এখনও ছোটো, এখন কি এভাবে ছেড়ে দেওয়া যায়! সকালে গিয়ে সন্ধেয় ফিরবি তা হলে তবু বলা যেত! তিন তি–ন দিন! সঙ্গে মোবাইল থাকবে?
—না, মোবাইল নট অ্যালাওড। শুধু আন্টিদের কাছে মোবাইল থাকবে। যার দরকার হবে আন্টিদের সঙ্গে কথা বলে নেবে।
—সে কি মোবাইল থাকবে না! কী করে জানব তোরা কোথায় আছিস? কেমন আছিস! সবার সঙ্গে তর্কবিতর্ক করে, পর্যাপ্ত লড়াই দিয়ে শেষপর্যন্ত যাওয়াই সাব্যস্ত হল বুবুনের। মা বলল, দেখিস, ফিরে আসার পর যেন কোনও আন্টি কোনও কমপ্লেন না করতে পারে!
—তুমি দেখে নিও। বাইরে বেরোলে কীরকম গুডবয় থাকি তা তো জানোই, বলে মাকে আশ্বস্ত করে বুবুন।
বুবুন তখন হাওয়ায় ভাসছে। কিটব্যাগে গুছিয়ে নিল জামা-প্যান্টের সেট। তিনটে গেঞ্জি। একজোড়া চটি। ব্রাশ আর পেস্ট। সঙ্গে নিয়ে নিল গান শোনার সরঞ্জাম
হাওয়ায় ভাসবে বা না-ই কেন! সঙ্গে যাচ্ছে তারই দুই বেস্ট ফ্রেন্ড ঋষভ আর অর্ক। তা ছাড়া আরও কয়েকজন যাচ্ছে যাদের সঙ্গে তার ‘তার’এ মেলে। সৌরভ, কুনাল, প্রতিম…..। তা ছাড়া যাচ্ছে প্রার্থনা, জয়িতা, বর্ণিনী..। ওরাও তাদের ভালো বন্ধু।
ভলভো বাসটা খুবই আরামপ্রদ। বেশ জোরেই ছোটে। তাদের সঙ্গে যাচ্ছেন একজন আঙ্কেল, তাঁর উপর দায়িত্ব খাওয়ানোর। তিনি রাস্তায় কিছু ব্রেকফাস্ট দিলেন। বাড়িতে খাওয়া নিয়ে বুবুনের খুব খুঁতখুঁতানি, কিন্তু বাইরে বেরিয়ে খাওয়াটা এখন কোনও ব্যাপারই নয়। এখন শুধু বন্ধুদের সঙ্গে গল্প আর গল্প।
মাত্র পৌনে চার ঘন্টায় ভলভো তাদের পৌঁছে দিল শান্তিনিকেতন। বড়ো একটা গেস্ট হাউস ঠিক করা হয়েছে তাদের বাইশজনের থাকার জন্য। না, বাইশজন তো আসেনি, একজন কম। একজন শেষ মুহূর্তে যাওয়া বাতিল করেছে। দোতলার একদিকে দুটো বড়ো বড়ো ডরমিটরি তাদের দশজন ছাত্রের জন্য, আর অন্য দিকেও দুটো বড়ো ডরমিটরি, সেখানে থাকবে ছাত্রীরা। সারাদিন একসঙ্গে হইচই করা, খাওয়া, ঘোরা, শুধু রাতের ঘুমের জন্য আলাদা হয়ে যাবে চারটে ঘরের বোর্ডাররা।
সে তো মাত্র কয়েক ঘণ্টার ঘুম।
বুবুন তার রুমমেট হিসেবে পেয়ে গেল প্রতিম, অর্ক, ঋষভকে। আর একজন এল প্রান্তিক। প্রান্তিক ঠিক ওদের নিকট-বন্ধু নয়, সে একটু কম কথা বলে, লাজুক ধরনের, তবু বাইরে এসে তো সবার সঙ্গে আরও বেশি চেনাজানা হয়। কম-বন্ধু হয়ে যাবে নিকট-বন্ধু।
পাশাপাশি পাঁচটা বিছানা, প্রত্যেকের বিছানার পাশে একটা করে ছোটো টেবিল। তাতে নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখা যায়।
ঘরের ভিতর যখন সবার সিট দখল হয়ে গেল, পাশাপাশি সিট নিল বুবুন, অর্ক, ঋষভ, কুনাল। পঞ্চমজন প্রান্তিককে ওরা একেবারে কোণের দিকের জানালার ধারে ঠেলে দিল যাতে তাদের চার বন্ধুর সিট পড়ে পাশাপাশি। অনেক রাত পর্যন্ত হইহুল্লোড় চলবে, সেখানে একজন লাজুক ছেলে থাকলে তো একটু অসুবিধে হবেই।
কিন্তু প্রান্তিক এই ব্যবস্থায় ঠিক খুশি হল না, হঠাৎ বলল, এই ঋষভ, আমাকে একটু মাঝখানের দিকে দিবি?
ঋষভ একটু অবাক হল, কেন, জানালার ধারের সিটটাই তো সবচেয়ে ভালো। মাঝরাতে ফুরফুর করে হাওয়া আসবে। ঘুম হবে দারুণ!
—না, মানে….., প্রান্তিক ইতস্তত করে, তোরা কেউ শো না এখানে। তোদেরও ভালো ঘুম হবে।
বুবুন বলল, আরে, আমরা কেউ রাতে ঘুমোব না! আমরা চারজন সারা রাত জেগে জেগে গল্প করব বলেই না তোকে ধারের দিকে দিয়েছি! তুই ভালো ছেলে, একধারে থাকাই তো ভালো!
—না, মানে, আমার আবার একটু ভূতের ভয় আছে।
—ভূতের ভয়! বুবুন হেসে ওঠে, ভূত বলে আবার কিছু আছে নাকি!
—না মানে, জানালার ধারে শুলে যদি — তখনও প্যানপ্যান করতেই থাকে প্রান্তিক।
—যদি রাতের বেলা ভূত হাত বাড়িয়ে তোর সুন্দর করে পাতানো চুলগুলো ঘেঁটে দেয়, তাই ভয় পাচ্ছিস! বুবুন হাসতে হাসতে বলে।
অর্ক আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে বলল, ভূতেরা তো পাতানো চুল ঘেঁটেই ক্ষান্ত দেয় না! ওরা তো গলা টিপে ধরে, তাই না প্রান্তিক প্রান্তিকের গলার স্বর একেবারে রুদ্ধ হয়ে যায়, বলল, আমাকে বরং ওপাশের ধারটা দে না! ওদিকের জানলাটা তো বন্ধ আছে দেখছি।
—তা হলে তাই আয়।
তৎক্ষণাৎ প্রান্তিক তার কিটব্যাগ নিয়ে চলে যায় ওপাশে, ওখানে ছিল বুবুন, সে চলে এল খোলা জানালার ধারে। বুবন তার জিনিসপত্র আবার গুছিয়ে ঠিক করে রাখতে রাখতে বলে, ভূতে যদি গলা টিপে ধরে তবে আমার গলাই টিপুক, কী বল, প্রান্তিক?
প্রান্তিক কিছু না-বলে চুপ করে নিজের জিনিস তার পাশের টেবিলে গোছাতে থাকে।
তাকে নিজের মতো থাকতে দিয়ে বুবুনরা ব্যস্ত হয়ে পড়ল নিজেদের মধ্যে গল্পগুজবে। ওদিকে আন্টিরা তাড়া দিয়ে গেল সবাইকে যাতে তারা স্নান করে প্রস্তুত হয়ে নেয় লাঞ্চের জন্য। লাঞ্চ খেয়ে তারা বেরিয়ে পড়ল তাদের প্রোগ্রামে। দুই আন্টিই খুব সিরিয়াস, তাঁরা আগে থেকে যোগাযোগ করে এসেছেন এখানকার সবার সঙ্গে যাতে সব কটা প্রোগ্রামই সম্পন্ন হয় সুষ্ঠুভাবে।
সত্যিই তো তারা কখনও এভাবে আদিবাসীদের পাড়ায় যায়নি, তাদের নাচগান দেখেনি বা শোনেনি। অর্কদের বাড়িটা আবার গানের বাড়ি, তার মা-মাসিরা খুব ভালো গান জানে, সে নিজেও মায়ের কাছে একটু-একটু গান শেখে, বলল, দাঁড়া, এদের গানটা টেপ করে নি। একদম অন্য রকমের সুর, তাই না! মাকে বলব আমাকে গানটা তুলে দিতে।
সারা দিন খুব হইহুল্লোড় করে রাতে হোটেলে ফিরে অর্ক ফিসফিস করে বলল, বুঝলি, আজ আর কাল রাতে প্রান্তিককে নিয়ে একটু মজা করব। যখন জানা গেছে ও ভূতের ভয় পায়!
রাতের খাওয়ার পর যখন আন্টিরা বললেন তাদের যার যার ঘরে চলে যেতে। অর্ক হঠাৎ গলা নামিয়ে বলল ঋষভ আর বুবুনকে, বলার সময় বারবার তার চোখ ছুঁয়ে যাচ্ছিল প্রান্তিকের দিকে। প্রান্তিক খেয়াল করছিল দৃশ্যটা। অর্কর কথা শুনে বুবুন হেসে ওঠায় হঠাৎ প্রান্তিক বলল, তোরা কি আমাকে নিয়ে কিছু বলছিস!
অর্ক বলল, না, ও কিছু না!
তবুও ঋষভ ফিকফিক করে হাসছে দেখে প্রান্তিক বলল, বল না কী বলছিস?
অর্ক বলল, যেখানে বাঘের ভয় সেখানি নাকি সন্ধে হয়! তোর ভূতের ভয়, আর এই ঘরেই কি না একটা লোক সুইসাইড করেছিল!
—সুইসাইড! প্রান্তিক লাফিয়ে ওঠে, কোথায় করেছিল!
—কী জানি কোথায়! কিন্তু এ নিয়ে বেশি ভাবিস নে! আমরা সারা রাত জেগে থাকব। যদি ভূত আসেও, আমরা তার সঙ্গে গল্প করে ভুলিয়ে রাখব যাতে তোর দিকে না যেতে পারে, বুঝলি?
প্রান্তিক বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে থাকে বুবুনদের দিকে।
বুবুন বলল, যদি ভূত আসে, সত্যি একটা মজা হবে কিন্তু। আমার মা ছোটোবেলা থেকে শিখিয়েছে ভূত বলে কিছু নেই। যদি এখানে এসে সত্যিই ভূতের দেখা পাই, তা হলে বাড়ি ফিরে একটা ভালো প্রাইজ পাওয়া যাবে নিশ্চিত।
—প্রাইজ! প্রান্তিক বুঝতে চেষ্টা করে বুবুনের কথা।
—হ্যাঁ, মা আমাকে বরাবর বলেছে যদি আমি কখনও ভূত দেখতে পাই, তা হলে মা একটা বড়ো প্রাইজ দেবে আমাকে। আমি যেরকম প্রাইজ চাইব, সেরকম। যাক, এতদিনে সেই প্রাইজটা পাওয়া যাবে!
ভূতের গল্প করতে করতে রাত হয়ে আসে। ইতিমধ্যে তাদের কথার আওয়াজ পেয়েই বোধ হয় আন্টিরা একবার ঢুঁ দিয়ে গেলেন তাদের ঘরের দিকে, কিন্তু তারা তো সবাই বিছানায় যে-যার বিছানায়। আন্টির চটির শব্দ শুনতে পেয়েই চোখ বুজিয়ে ফেলল, যেন কী ঘুমই না ঘুমোচ্ছে!
তা সত্যি সত্যি ওরা ঘুমিয়ে পড়ল অতঃপর।
ভোরে ঘুম ভাঙতে দেখল প্রান্তিক তার বিছানা গুছিয়ে উঠে পড়ছে। তার সঙ্গে মজা করতে অর্ক জিজ্ঞাসা করল, কী রে, প্রান্তিক কাল রাতে ভূত কি এসেছিল!
প্রান্তিক মাথা নাড়ে, না বোধ হয়।
—বোধ হয়! কুনাল হাসল, আমরা সারা রাত জেগে পাহারা দিয়েছি না! ভূত এলে আমরাই তার গলা টিপে ধরব! আমাদের সঙ্গে ইয়ার্কি!
সেদিনও সারাদিন তাদের কেটে গেল বাইরের নানা প্রোগ্রামে। বেশ কাটছে মজায়। গেস্ট হাউসে খাওয়াদাওয়াও হচ্ছে দেদার। সেদিন সন্ধের পর গেস্ট হাউসে ফিরে অর্ক ভুরুতে ইঙ্গিত করে বলল, এই আজ রাতে কিন্তু প্রান্তিককে একটু ভয় দেখাব!
ঋষভ আর কুনাল বলল, ঠিক ঠিক।
কিন্তু বুবুন বলল, না রে, বেচারি এমনিতেই ভূতের ভয়ে আধখানা হয়ে আছে, তার উপর সত্যিই যদি ভয় দেখাস–
অর্ক মুচকি হাসল শুধু, কিছু বলল না।
সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত গল্পগুজব করে যখন ঘুমোনোর উদ্যোগ করছে, অর্ক হঠাৎ বলল, কী রে প্রান্তিক, তা হলে মানছিস তো ভূত বলে কিছু নেই!
প্রান্তিক একটু উষ্মা প্রকাশ করে বলল, তোরা রাত হলেই কেন ভূতের কথা তুলিস বল্ তো!
–বা রে, যার যখন সময় তখন তার কথাই তো বলা উচিত। ভূতগুলো সব দিনের বেলা ঘুমোয়, আর রাতের বেলা জাগে। তাদের কথা তো রাতেই বলতে হবে, নইলে তারা শুনতে পাবে কী করে!
প্রান্তিক কথা না বলে ঘুমোনোর চেষ্টা করতে থাকে। গোটা ঘর অন্ধকার, কিন্তু একটু পরেই হঠাৎ কীরকম খুটখাট ধুপধাপ শব্দ শুরু হয় ঘরের মধ্যে। বুবুন দেখল সাদা মতো একটা অবয়ব ঘরের মধ্যে নড়াচড়া করছে, ঘোরাফেরা করছে ধুপধাপ শব্দ করে।
ঋষভ ফিসফিস করে বলল, বুবুন, কী যেন একটা ঘুরছে ঘরের মধ্যে!
বুবুন বলল, চুপ কর, ঋষভ, আমার মনে হচ্ছে অশরীরী কিছু একটা ঢুকেছে ঘরের মধ্যে।
তাদের কথোপকথন তখন শুনতে পেয়েছে প্রান্তিক। সে নিশ্চয় চোখ খুলে দেখতে পেয়েছে সেই সাদা অবয়বটা। হঠাৎ বিছানায় উঠে বসে মুখে ‘আঁ–আ–’ করে বলল, বুবুন, ভূ—ত।
বুবুন বলল, কোথায় ভূত?
—ও–ও–ও–ই তো, প্রান্তিক তখন তোতলাতে শুরু করেছে।
সাদা অবয়বটা তখন ধুপধাপ করে ঘুরছে ঘরের ভিতর। আর প্রান্তিকের মুখ থেকে তখন শুধু গোঁ-গোঁ শব্দ বেরোচ্ছে।
বুবুন দুম করে উঠে দেওয়ালে আঙুল টিপে লাইটটা জ্বালতেই সবাই দেখল খবরের কাগজে মোড়া একটা শরীর ঘুরছেফিরছে ঘরের মধ্যে। বুবুন চেঁচায়, এই অর্ক, তোর মুখ থেকে খোল কাগজটা।
অর্ক হাসতে হাসতে খবরের কাগজ সরায়, আর তাই দেখে প্রান্তিক একদম বোকা বনে তাকিয়ে থাকে ফ্যালফ্যাল করে।
বুবুন অর্ককে বকতে শুরু করে, অর্ক, কী রে তুই! জানিস প্রান্তিক ভূতে ভয় পায়, আর তুই—
প্রান্তিক তখনও হাঁপাচ্ছে কোণের বিছানায় উঠে বসে। ঋষভ মজা করে বলল, প্রান্তিক, কাল সারা রাত আমরা জেগে পাহারা দিয়েছিলাম যাতে ভূত না আসে, আর আজ যেই ঘুমোতে চেষ্টা করছি, অমনি ভূতটা—
প্রান্তিক এবার কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, আমি খুব ভূতের ভয় পাই বলে তোরা আমার সঙ্গে- পরদিন তাদের ফেরার পালা। বাসের সিটে বসে বুবুন একসময় অর্ককে বলল, তুই ভয় দেখিয়েছিস প্রান্তিককে, এখন প্রান্তিক যদি আন্টিকে সব বলে দেয় কী হবে!
অর্ক বলল, কী আর হবে! বাইরে বেরিয়ে এমন দু-চারটে মজা তো করতেই পারি!
বুবুন বলল, না রে, আন্টি যদি আমার মাকে কমপ্লেন করে, মা আর কোথাও আমাকে যেতে দেবে না একা!
বলেই বলল, দাঁড়া, একটু ড্যামেজ কন্ট্রোল করে আসি। নইলে যদি আন্টিকে কমপ্লেন করে!
প্রান্তিক বসেছে একেবারে শেষদিকের সিটে একা একা। তার পাশে গিয়ে বসল বুবুন, বলল, তুই কি সত্যি সত্যি ভয় পেয়েছিস, প্রান্তিক?
প্রান্তিক প্রথমে চুপ করে রইল, তারপর আস্তে আস্তে বলল, সত্যিই প্রথমে ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু আলো জ্বললে যখন দেখলাম ওটা অর্ক, তখন ভুল ভাঙল আমার।
তারপর একটু থেমে বলল, ভালোই হয়েছে রে। আমার ভূতের ভয়টা এখন আর নেই। আমি বুঝতে পারলাম সবটাই বেশ মজার। ভূতকে নিয়ে তোরা যখন মজা করতে পারছিস, আমিই বা পারব না কেন!
