আজকালের গল্প – সম্পাদক : অশোক দাশগুপ্ত
Aajkaaler Galpo – Edited by Asoke Dasgupta
তৃতীয় সংস্করণ : বইমেলা, জানুয়ারি ২০১৫, মাঘ ১৪২১
প্রচ্ছদ – দেবব্রত ঘোষ
.
তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকা
গল্প পড়ার প্রবণতা ক্রমশ কমছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলাম আমরা আজকালের গল্পের প্রথম প্রকাশের সময়৷ আমরা এও ব্যক্ত করেছিলাম যে, এই আশঙ্কা ভ্রান্ত হলে আমরা যার পরনাই আহ্লাহিত হব৷
আজকালের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৭ সালে৷ তৃতীয় সংস্করণও প্রকাশিত হতে চলেছে যাবতীয় উদ্বেগের অবসান ঘটিয়ে৷ অর্থাৎ রাখাল নয় গোপালদের প্রধান্যই দেখা যাচ্ছে৷ সাহিত্যে গল্পের আসন চিরকাল উজ্জ্বল থাকবে বলেই বিশ্বাস৷ এই সংস্করণে আমরা যুক্ত করলাম আরও দুটি গল্প৷ আশাকরি ভাল লাগবে পাঠকদের৷
প্রকাশক
.
নতুন সংস্করণের ভূমিকা
‘আজকালের গল্প’র পরিবর্ধিত ও শোভন সংস্করণ প্রকাশিত হল৷ চাহিদার জন্য এর আগে এই সঙ্কলনের দ্বিতীয় মুদ্রণ প্রকাশ করতে হয়েছে৷ অথচ প্রথম প্রকাশের সময় আমরা সাহিত্যের পাঠক সম্পর্কে সন্দেহ ও অভিমান ব্যক্ত করেছিলাম৷ আমাদের সন্দেহ ভুল প্রমাণিত হলে তা সব চাইতে বেশি আনন্দের কারণ হবে আমাদেরই৷ প্রমথ চৌধুরির বক্তব্যের সমর্থনে আমরা বলেছিলাম— পাঠক দুই শ্রেণীর৷ এক, যা পায় তাই পড়ে৷ দ্বিতীয় দল কিছুই পড়ে না৷ বলা হয়নি এর মধ্যবর্তী তৃতীয় একটি দলের কথা৷ যাঁরা সাধারণত আড়ালে থাকতেই ভালবাসেন, কিন্তু তাঁদের গ্রহণ ও বর্জনের ক্ষমতা সমান৷ আসলে সৃজনধর্মী সাহিত্য টিকে থাকে, টিকে আছে এঁদের জন্যই৷ ঠিকই সাহিত্যের জনপ্রিয়তা উপলক্ষ করে উৎসবের আয়োজনের সময় হয়নি৷ তবে বিশেষ করে ছোটগল্প (বইপাড়ার ভাষায় কাটা গল্প)-র বিরুদ্ধে ক্রমাগত প্রচারের মুখে নতুন সংস্করণ প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা সংক্রান্ত তথ্য, স্বভাবতই কিছুটা আশাবাদী করে তুলতে পারে৷ শুধু ছোটগল্প নয় সামগ্রিকভাবে সৃজনধর্মী শিল্পের প্রতি এক শ্রেণীর মানুষের ভালবাসা ও আস্থার ইঙ্গিতও পাওয়া যায় হয়ত৷ প্রমথবাবুর গোপালরা যা পারে তাই পড়ে যাবে আর রাখালরা কিছুই পড়বে না৷ এদের চরিত্রের পরিবর্তন ঘটবে না৷ যে পরিবেশ ও পরিস্থিতির মধ্যে আমাদের বসবাস, তাতে হতোদ্যম হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে সত্যি, কিন্তু মনের গভীরে আমরা আকাঙ্খা ও আশা পোষণ করতে পারি— তৃতীয় শ্রেণীর ‘সচেতন ও সংবেদনশীল’ পাঠকেরা আর নেহাত সংখ্যালঘু হয়ে থাকবে না৷
সুব্রত সেনগুপ্ত
.
পাঠকের সঙ্গে কথা
ইদানীং ছাপা হরফের সঙ্গে মানুষের দেখাসাক্ষাৎ বড়ই কম হচ্ছে৷ কিন্তু সাজানো হরফের ওপর ভর করেই সাহিত্যের প্রকাশ৷ লেখকের যতটা প্রাণ খুলে দেখানোর তাগিদ, অধিকাংশ পাঠকের খোলা-প্রাণ প্রত্যক্ষ করার আগ্রহ হয়ত ততটা নয়৷ অন্যদিকে পৃথিবীর ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠা, পরিবেশের ক্রমশ দূষিত এবং আরও দূষিত হয়ে পড়া এবং মানুষের আবিষ্কার— প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের দিনে দিনে মানুষেরই প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ও মানুষীর ব্যস্ততা বাড়ছে৷ অবকাশ কমছে৷ পড়া পরিশ্রমের কাজ৷ ফলে অনেক মনরোচক দৃশ্য শ্রাব্য মাধ্যম৷ যেটুকু উদ্বৃত্ত সময় পাওয়া যাচ্ছে তাতে গা ঢেলে দিতে ইচ্ছে করে৷ অনিয়মিত দর্শনে এবং দীর্ঘ অদর্শনে পুরনো প্রেমিকার মুখের মতো সাহিত্য ক্রমশ আড়ালে চলে যাচ্ছে৷ সমস্যার শেষ এখানেই নয়৷ একদা প্রমথ চৌধুরিমশাই বলেছিলেন, পাঠক দুরকম৷ এক, বর্ণপরিচয়ের গোপালের মতো৷ দুই, রাখালের মতো৷ গোপালরা যা পায় তাই পড়ে৷ রাখালরা কিছুই পড়ে না৷ রাখালের সংখ্যা এখন বেড়ে যাচ্ছে৷ সমস্যা অল্প সংখ্যক গোপালদের নিয়েও৷ … সাহিত্যের এই দশা শুধু এদেশে নয়, অন্যান্য দেশেও৷ কিন্তু অন্যত্র শিল্পী এবং বাণিজ্য-সফল পুস্তক লেখকদের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা আছে৷ শুধু বেস্ট সেলারের পাঠকরা সেই সব বই কেনার ও পড়ার সময় জানেন এ সমস্ত লেখক শুধুই বেস্ট সেলার, এরা শিল্পী নন৷ শতকরা হিসাবে যত কম হোক সৃজনধর্মী লেখার পাঠকগোষ্ঠী আলাদা৷ তাঁদের জানা আছে একজন শিল্পী ও বাণিজ্যিক গ্রন্থ প্রণেতার জাত এক নয়৷ কিন্তু আমাদের দেশে অন্তত আমাদের ভাষায় লেখকদের মধ্যে জাত ভেদ নেই বললেই চলে৷ এখানে সব একাকার৷ পাঠকের অসচেতনতা, উদাসীনতা ও আলস্যে নিছক পদ্যকার এবং কবি একই আসন পান৷ একজন গদ্যশিল্পী এবং বাজারের মুখাপেক্ষী কাহিনী-কেচ্ছা বলিয়ে এখানে তুল্যমূল্য৷ রাজনৈতিক দল উপদলের মতো আরও অনেক গোষ্ঠীর ভিড়৷ আছে মেকি আধুনিক বৃহন্নলারা৷ আছে তারাও যারা সাহিত্যকে হাতিয়ার করে তুলতে চায়, সেই সব পেশিসঞ্চালনকারীরা৷ ফলে সাহিত্যের পক্ষে এখন সময়টা ভাল নয়৷ তবু বাংলাভাষায় ধারাবাহিকভাবে ভাল গল্প লেখা হয়েছে৷ পাঠকের সময় কম৷ সেজন্য আমরা সেই ভালর মধ্যে কিছু উত্তম গল্প বেছে নিয়েছি৷ ছোটগল্প নামের মধ্যেই ছোট— বা সংক্ষিপ্ততার কথা আছে৷ লুকিয়ে আছে আরও কিছু কথা৷ পাঠকের সংক্ষিপ্ত সময়ে সংক্ষিপ্ত আকারের কিন্তু তীব্র গল্প নিশ্চয় আদরণীয় হবে৷ এ সংকলনের গল্পগুলি আমরা আজকাল প্রকাশন গোষ্ঠীর রবিবাসরীয় আজকাল, শারদীয় আজকাল এবং শারদীয় খেলার বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন গল্প থেকে বেছেছি৷ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে একই লেখকের একাধিক লেখা প্রকাশিত হয়েছে৷ তার মধ্যে সেরা লেখাটি আমরা তুলে নিতে চেষ্টা করেছি৷ স্থানাভাবে যাঁদের সংকলনে নেওয়া যায়নি তাঁদের সবাইকে অপাঙক্তেয় ভাবার কোনও কারণ নেই৷ ভবিষ্যতে, সুযোগ মতো আমরা তাঁদেরও সঙ্গে নিতে পারার গৌরব হয়ত লাভ করতে পারব৷ তবে নরেন্দ্রনাথ মিত্র এবং জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর মতো প্রতিনিধিস্থানীয় লেখকদের সংকলনের অন্তর্ভুক্ত করতে না পারার দুঃখ গোপন করার কোনও মানে হয় না৷ নেওয়া সম্ভব হয়নি তার কারণ এঁদের মধ্যে প্রথম জনের মৃত্যু হয়েছে আজকাল পত্রিকা প্রকাশিত হওয়ার আগেই, অন্যজনের সামান্য পরে৷ ফলে এঁদের লেখা উল্লেখিত পত্র বা পত্রিকায় প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি৷
সুব্রত সেনগুপ্ত




Leave a Reply