অমর মিত্র : নির্বাসিতা

অমর মিত্র : নির্বাসিতা

ধর্মদাস বলল, রত্নার বিয়ে ঠিক করে ফেললাম।

সক্কালবেলায় একটি ডাহা মিথ্যে। কতবার যে ঠিক হল রত্নার বিয়ে। সরলভাবে মিথ্যে বলতে ধর্মদাসের সমকক্ষ কেউ নেই। ধর্মদাস রায় অরুণাভর প্রতিবেশী। এমন প্রতিবেশী ভাগ্যে জোটে। পরিবারের কর্তা যেমন, আর সকলেও তার অনুসারী। এমনকী ধর্মদাসের নয় বছরের ছেলেটিও ক্রমশ হয়ে উঠছে তার বাবার মতো। ব্যতিক্রম ছিল ওর বউ। এখন নাকি পালে মিশে গেছে। দেখে আর ধরার উপায় নেই যে হলুদপুখরিয়া থেকে ঘর করতে এসেছে বেলগাছিয়ার সবচেয়ে পুরনো এই ফ্ল্যাট বাড়িতে। আগের বছর লেকটাউন হাইস্কুল থেকে ছেলেটাকে ছাড়িয়ে এনে এখানকার সাবেকী ভূতনাথ ইনস্টিটিউশনে যখন ভর্তি করল, অরুণাভর বউ অলকা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, অত ভাল স্কুল থেকে ছাড়িয়ে আনলে কেন?

— ভূতনাথ ওর চেয়েও ভাল। ধর্মদাসের বউ-এর সাফ জবাব।

— কিন্তু লেকটাউনের রেজাল্ট দ্যাখো।

ভূতনাথের রেজাল্টই বা খারাপ কিসের, আগেরবার মাধ্যমিকে কুড়িটা স্টার, একজন ফরটিসিক্সথ হয়েছিল।

অলকা বুঝেছিল তর্ক করা বৃথা। সে তো ভালই জানে ভূতনাথের অবস্থা এখন কী। মেরে কেটে গোটা পাঁচেক সেকেন্ড ডিভিশন। আর সব থার্ড…অগুনতি ফেল। আর পাঁচটা প্রাইভেট স্কুলের হাল যেমন হয়েছে আর কি। তাছাড়া অরুণাভ নিজে তো স্কুল টিচার। কোন স্কুলের হাল কেমন তা তার চেয়ে বেশি কে জানবে। ধর্মদাসের বউ যুক্তি তথ্য বুঝবে না, ধরা পড়ার উপক্রম হলেই ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ কথা বন্ধ। মুখোমুখি ফ্ল্যাট, তবু এরকম হয়েই থাকে। অরুণাভ অলকাকে থামিয়েছিল, কী দরকার এসব খোঁজে, ফেল করেছে হয়ত, বলতে পারছে না, তুমি খুঁচিয়ে ঘা করছ শুধু শুধু।

ধর্মদাস বলল, পিয়ালি টাউনের ছেলে, এখন এম পি-তে সেটলড। খুব ভাল ফ্যামিলি পেয়েছি।

পিয়ালি টাউন! অরুণাভর মাথা বোঁ বোঁ করে ওঠে। সে তো ভাবছিল দর্জিপাড়ার কথা। সেখানে অবশ্য বিয়ে হওয়া কঠিন। কিন্তু পিয়ালি টাউন কোথায়? কত আশ্চর্য জায়গার খোঁজই না রাখে ধর্মদাস। আর তার তিরিশোর্ধ্ব বোনের জন্য পাত্রও আসে ওইসব জায়গা থেকে। একবার সম্বন্ধ হল ইন্দ্রবিল-এ। পুরুলিয়ায় নাকি জায়গাটা। একবার বাদামপাহাড় থেকে দেখতে এল লোকজন। এই তো পুজোর আগে এল ন’পাহাড়ি নামে এক জায়গা থেকে। নিজেই তো বউ এনেছে হলুদপুখরিয়া গিয়ে। ধর্মদাসের বউ বলে পুখরিয়া। ধর্মদাস বলে পুকুরিয়া। এইসব জায়গাগুলোর নাম যেন স্বপ্নের ভিতরে শোনা। ন’পাহাড়ির নাম তো অরুণাভ শোনেইনি এর আগে। যেমন এই পিয়ালি টাউন! পারে বটে ধর্মদাস। খোঁজও রাখে। কলকাতায় যেন বিবাহযোগ্য পাত্রের অভাব।

ধর্মদাস বলল, অবাক করলে, পিয়ালি টাউনের নাম জান না, এই তো বারুইপুরে।

— পিয়ালি যেন কোন নদীর নাম! খুব আবছা গলায় বলল অরুণাভ।

— নদী! না না নদী মদি নেই, বারুইপুর স্টেশনে নেমে অটোয় ওঠো, মিনিট পনেরো বাদে পৌঁছে যাবে পিয়ালি টাউনে, ওরা খাস মল্লিকের জমিদার ছিল, এখন এম পি-তে হোটেল বিজনেস, খাস মল্লিকের চৌধুরিদের নাম শোননি?

অরুণাভ জানে কথার অনেকটাই মিথ্যে। তবু শুনতে বেশ লাগে। বিচিত্র সব তথ্য এনে হাজির করে ধর্মদাস তার কথার ভিতরে। তাতে মিথ্যেটা ক্রমশ মনোগ্রাহী হয়ে ওঠে। সে জিজ্ঞেস করে খাস মল্লিক মানে, পিয়ালি টাউনে মল্লিক, চৌধুরি, বুঝতে পারছি না ব্যাপারটা।

হা হা করে হাসে ধর্মদাস। এই বিদ্যে নিয়ে তুমি মাস্টারি কর, খাস মল্লিক হল একটা জায়গা, পিয়ালি টাউন যেমন, তবে দুটো জায়গা কাছাকাছি, সেখানকার জমিদারি কিনেছিল চৌধুরিরা, তাদেরই এক শরিক থাকে এম পি-তে।

অরুণাভ অবাক হয় আবার। কত কিছু জানে ধর্মদাস। জমিদারির খোঁজও রাখে। পঁয়ত্রিশ বছর আগে তা বিলুপ্ত হয়ে গেলেও। সে কী করে জানবে কে কোথাকার জমিদার ছিল। দেশভাগের পর থেকে তারা তো উত্তর কলকাতার প্রান্তে টালা পার্কের ধারে এই রঙহীন অনুজ্জ্বল ময়লা দরজা জানালার ফ্ল্যাটবাড়িতে বন্দী। ধর্মদাসরাও তাই, তবু সে খোঁজ রাখে। পঁয়ত্রিশ বছর আগে কে কোথাকার কত অংশের জমিদার ছিল তা বিয়াল্লিশ বছরের ধর্মদাস অক্লেশে বলে দিতে পারে। কোর্টে মুহুরিগিরি করে ধর্মদাস, লোক চরিয়ে জীবন ধারণ করে, তার পক্ষে কত কিছু জানাই না সম্ভব। বাদামপাহাড়, ইন্দ্রবিল, ন’পাহাড়ি, পিয়ালি টাউন।

অরুণাভ জিজ্ঞেস করে, পিয়ালি টাউন নাম কেন?

বিরক্ত হয় ধর্মদাস। হচ্ছে রত্নার বিয়ের কথা, তুমি জিজ্ঞেস করছ ভূগোলের কোশ্চেন। আচ্ছা আমার নাম ধম্মদাস হল কেন আর ওই মাঠের নাম টালা হল কেন, খোঁজ রাখো।

অরুণাভ হাসে, না, না এমনি মনে হল তাই, এ তো খুব ভাল খবর?

ধর্মদাস বলে, এবারে কেস সেটলড।

অরুণাভ কিছু বলে না। ধর্মদাসের কথায় ‘কেস সেটলড’ বহুবার শুনে পরিষ্কার বুঝতে পারে, না হলে বিশ্বাস নেই। বাদামপাহাড়, ইন্দ্রবিল, ন’পাহাড়ির মতো এ পাত্রকেও রত্নার না-পছন্দ হতে পারে। ক’দিন বাদে ধর্মদাসই তা বলবে। অথচ দিন দিন মেয়েটার বয়স বেড়ে যাচ্ছে। ও তো অরুণাভর বোন ঝুমুরের বয়সী। তার বিয়ে হয়েছে এগারো বছর আগে। এত বয়সের কোন মানুষ বিনা কাজে ঘরে বসে থাকতে পারে না। রত্নাও পারে না। সঙ্গী আছে। পুরুষ। বয়স্ক।

অলকা বলে, কী যে হবে মেয়েটার, আচ্ছা ও নাকি বি এ পাস, চাকরি বাকরি না পাক, টিউশানি করতে পারে তো!

বি এ পাস! হ্যাঁ ধর্মদাস বলে। রত্নাও বলে। কিন্তু অরুণাভ জানে কথাটা ডাহা মিথ্যে। হায়ার সেকেন্ডারিতে কম্পার্টমেন্টাল। ও তো ঝুমুরের সঙ্গে পড়ত। ঝুমুর তো শুনে অবাক, দাদা ও তো কম্পার্টমেন্টাল পরীক্ষাই দেয়নি, বি এ পাস করল কবে, কোন কলেজ থেকে?

কে যাচাই করতে যাবে। যাচাই করতে গেলে কথা বন্ধ। দরজা বন্ধ সশব্দে। কিন্তু বি এ পাস হোক বা না হোক, একটি মেয়ের বিয়ে তো তাতে আটকানোর কথা নয়। বিয়ে না হওয়ার কোনও কারণ ছিল না। স্বাস্থ্যবতী, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা, গৃহকর্মনিপুণা, এমন একটি যুবতী কোন ভারতবাসীর যোগ্য হবে না একথা বলবে কে? কত মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, কোলে বাচ্চা নিয়ে ছ’মাস অন্তর বাপের বাড়ি আসছে। এ ফ্ল্যাটবাড়ির মেয়েটি তেমন হবে না কেন? খারাপ লাগে অরুণাভর। চোখের সামনে একটি মেয়ে অবিবাহিতা থেকে ক্রমশ বুড়ি হয়ে যাবে, একথা ভাবতেই কেমন লাগে। ঝুমুরের মেয়ে তো আট বছরের, ক্লাস টু-তে পড়ছে।

ধর্মদাস বলল, ফেব্রুয়ারির বারো তারিখে দিন ঠিক হল।

— সে কী, এত তাড়াতাড়ি! অরুণাভ প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে ভাবল তাড়াতাড়িই বা কী। রত্নার তো বছর পঁয়ত্রিশ হয়ে গেল। কিন্তু কবে পাত্র দেখা হল, কবে ঠিক হল বিয়ের কিছুই যে জানতে পারেনি সে মুখোমুখি ফ্ল্যাটের বাসিন্দা হয়েও। ধরতে পারল ব্যাপারটা। গত দেড় মাস কথা বন্ধ আছে। এর ভিতরেই বোধহয় সব হয়ে গেছে। বিয়ের খবর দিয়েই মৌনতা ভাঙল ধর্মদাস।

ধর্মদাস বলল, শুভস্য শীঘ্রম, রত্নারও পছন্দ হয়েছে পাত্র, বড় হোটেল ব্যবসা ওদের উজ্জয়িনীতে, অবস্থাপন্ন, বাদামপাহাড়, ইন্দ্রবিল, ন’পাহাড়ির ছেলের চেয়ে ভাল…

বলে যাচ্ছিল ধর্মদাস। সব কথা কানে যাচ্ছিল না অরুণাভর। সে ভাবছিল বাদামপাহাড় থেকে পিয়ালি টাউন হয়ে উজ্জয়িনী। ক্ষমতা আছে বটে ধর্মদাসের। অরুণাভ নিজে বিয়ে করেছে বেলঘরিয়ায়, ঝুমুরের বিয়ে দিয়েছে বর্ধমানে। তার অতদূর প্রসারিত হওয়ার ক্ষমতা নেই। ঈর্ষা হল যেন ধর্মদাসের দিকে তাকিয়ে। উজ্জয়িনী তো তার কাছে স্বপ্ন মাত্র। মহাকবির দেশ, মেঘদূতের দেশ। গল্পগাথার দেশ, ইতিহাসের সোনার বিন্দু…বিন্ধ্যাচল, মালওয়ার মালভূমি…। এমন নগরে বোনের বিয়ে ঠিক করেছে ধর্মদাস। বিশ্বাসই হয় না সেই প্রাচীন পৃথিবীতে বাস করতে যাবে তাদের ফ্ল্যাটবাড়ির মেয়ে।

অরুণাভ জিজ্ঞেস করে, উজ্জয়িনীই তো প্রাচীন অবন্তিকা ছিল, তাই না?

ধর্মদাস হা হা করে হাসে, তুমি মাস্টারি ছাড়া আর কিছুই কি জান না অরুণাভ, রত্নার বিয়ে হচ্ছে সেইটাই খবর, হ্যাঁ দিতে হচ্ছে অনেক, ছোট বোন আমার।

কথাটা অরুণাভকে শুনিয়ে দিল ধর্মদাস। অরুণাভ আগে তো স্কুলের মাইনেই পেত না ঠিকমতো। সেই অনিশ্চিত সময়ে ঝুমুরের বিয়ে দিতে হয়েছিল তাকে। এগারো বছর আগের কথা। নূপুর রেজিস্ট্রি করেছিল শুধু শাড়িতে গিয়ে উঠেছিল স্বামীর ঘরে। ঝুমুরের বিয়ে সম্বন্ধ করে। নূপুরের খবরে ধর্মদাস গলাবাজি করেছিল খুব, আমার বোন হলে মেরেই ফেলতাম, তোমরা বামুন, কায়েতের ঘরে গিয়ে উঠল। ছিঃ ছিঃ ছিঃ, ফ্ল্যাটবাড়ির মান থাকল না আর। ঝুমুরের সময়ে বিয়ের দিন সকালে টাকার টান। বাজেটে আসল কয়েকটি খরচ বাদ চলে গিয়েছিল ভ্রান্তিবশত। তখন ধর্মদাসই এসে দাঁড়িয়েছে পাশে, চল টাকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। কৃতজ্ঞ অরুণাভকে ধর্মদাস নিয়ে গেছে এক কাবুল দেশীয় লোকের কাছে। অবাক ব্যাপার! এখনও যে কলকাতা শহরে কাবুলিওয়ালা টাকা ধার দিয়ে বেড়ায় এ খবর ধর্মদাস ছাড়া জানবে কে? কাবুলির খবরটা বাড়িতে চেপে গিয়েছিল অরুণাভ। কিন্তু পরের মাসে ধর্মদাসই তাকে নিয়ে এসেছে দরজায়। কী অপমান! টাকা দিতে দু’দিন দেরি হয়েছিল মাত্র। বাবা তখন বেঁচে। মুখখানি অন্ধকার করে ছিলেন সারাদিন। একটি কথাও জিজ্ঞেস করেননি।

পরে অরুণাভ জিজ্ঞেস করেছিল লোকটাকে বাড়ি নিয়ে এলে কেন ধর্মদাস?

— বাহ, চিনিয়ে দিলাম, আমাকে বিশ্বাস করেই তো টাকা দিয়েছিল, কী হয়েছে তাতে?

কী হয়েছে তা অরুণাভ বোঝাবে কীভাবে। ঘটনাটা এখনও বুকে বেঁধে।

ধর্মদাস বলল, বাড়ি আছ তো?

হ্যাঁ, রোববারে আর বেরোতে ইচ্ছে করে না।

নেমন্তন্ন করতে যাব, কাল কার্ড পেলাম ছাপা। তোমাদের থেকেই আরম্ভ করি কাজটা।

তাহলে কথা সত্যি! তাদের ফ্ল্যাটবাড়িতে বিয়ে লাগছে। হ্যাঁ, তাই ধর্মদাস বলছে, একটু দাঁড়িয়ো পাশে, রত্না তো তোমার বোনেরই মতো…

হাঁটল ধর্মদাস কথাটা জনে জনে বলতে।

দুই

— কোথায় হচ্ছে বিয়ে, দর্জিপাড়ায়? অলকার প্রথম জিজ্ঞাসা বিয়ের খবরে।

— না, না উজ্জয়িনীতে। অরুণাভ বাজার রাখতে রাখতে বলল।

— সত্যি, নাকি দর্জিপাড়ায়? অলকা আবার জিজ্ঞেস করেছে।

— বলল তো পিয়ালি টাউন না কোথাকার জমিদার, উজ্জয়িনী থাকে। অরুণাভ সোফায় বসতে বসতে জবাব দেয়।

অলকার সন্দেহ যেন যায় না। পিয়ালি টাউন, উজ্জয়িনী, ঠিক মিথ্যে বলেছে, ধর্মদাসদা। দুটো কথা বললে তার একটা মিথ্যে হবেই, দর্জিপাড়ার মৃণাল আচায্যির খবর তো ওরা জানে, এ নিয়ে গোলমালও হয়েছে বাড়িতে দু-একদিন।

অরুণাভর চেয়ে ফ্ল্যাটবাড়ির খবর বেশি রাখার কথা অলকার। সে সারাদিন এই ফ্ল্যাটবাড়ির বাসিন্দাদের নিয়েই থাকে। তবু অলকার সন্দেহটা অরুণাভর ভাল লাগে না যেন, অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে হঠাৎই, ওসব কথা এখন তুলছ কেন, বিয়ে হচ্ছে, কোন কথা কার কানে যাবে এখন, অনর্থ বাধবে।

অলকা বিড়বিড় করতে করতে সরে যায়, লোকটা যে ম্যারেড, কী করছে ধর্মদাসদা কে জানে, ওরা তো খুব জড়িয়ে গেছে।

অলকা রান্নাঘরে। অলকার সন্দেহটা অরুণাভর ভিতরেও যেন প্রবেশ করতে আরম্ভ করল। হতেও তো পারে সেই লোকটার সঙ্গে। ধর্মদাস চাপা দেওয়ার জন্য বলছে পিয়ালি টাউন, উজ্জয়িনী। ধর্মদাস জানে মৃণাল আচায্যির খবর তাদের অজানা। অজানা তো নয়ই, বরং বেশি জানা অলকার, অরুণাভর। দর্জিপাড়ায় যে অলকার দিদি থাকে। সেই তো খবরটা দিয়েছিল লোকটা ম্যারেড, কিন্তু ওর বউ পাগল। অনেক চেষ্টা করেছিল, চিকিৎসার ত্রুটি রাখেনি, শেষে মানসিক হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছে। একটা বাচ্চা। অরুণাভ দেখেছে লোকটাকে। হাতিবাগানের থিয়েটার হল থেকে রত্নার হাত ধরে বেরিয়ে আসছে। মাথাভরা টাক, কেমন যেন হা-হুতাশে ভরা মুখ। ওর যে দর্জিপাড়ায় বাড়ি সে খবরের সূত্রও তো অলকার দিদি। এ বাড়িতে এসে হঠাৎ তাদের ফ্ল্যাটে রত্নাকে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল। রত্না চলে যেতে দিদি খোঁজ নিয়েছিল মেয়েটা কে? তারপর সব কথা।

অলকা চা নিয়ে এলে অরুণাভ বলল, অত মিথ্যে হবে কি, দর্জিপাড়া আর উজ্জয়িনী কি এক হল, খামোকা ওসব বলতে যাবে কেন?

অলকা চিন্তিত, কী জানি, তবে ধর্মদা সব জেনে গিয়েছিল।

সতর্ক করল অরুণাভ তার বউকে, ওসব কথা এখন তুলো না।

— না, না আমি ভাবছি বিয়ে হয়ে গেলে লোকটার কী হবে?

— কিন্তু লোকটারও তো বিয়ে করার ক্ষমতা নেই…। অরুণাভর গলায় রাগ।

এত কথার ভিতরে অরুণাভর মা এসে দাঁড়িয়েছেন। বিয়ের খবরে বললেন, এই তো রাজি হলি, তবে ওই বাদামপাহাড় ইন্দ্রবিলে রাজি হলি না কেন?

অরুণাভ চট করে বলেছে, তুমি কি জান রত্না রাজি হয়নি, সব তো ধর্মদাসের কথা।

মা বললেন, আমি তো মেয়ের কথা বলছি না। বলছি ধর্মদাসের কথা, বয়সকালের মেয়ে, বিয়েয় রাজি না হয়ে পারে, পঁয়ত্রিশ বছরে কী অত বাছাবাছি করে কেউ?

— না, না, ধর্মদা তো চেষ্টা করছিল খুব। অলকা বলতে চেষ্টা করল।

মা মাথা নাড়লেন, চেষ্টা করছিল বোধহয় বিনি পয়সায় পার করানোর। এবার বোধহয় তোমার দিদি যে লোকটার কথা বলেছিল তাকে ধরেছে।

অলকা অরুণাভ পরস্পরের দিকে তাকায়। মা জানে সব। মায়ের সঙ্গে রত্নার কথা হয় বেশি। মায়ের কাছে রত্না বোধহয় মৃণাল আচার্যর কথা বললেও বলে থাকতে পারে।

অলকার আগে মা ওদের ফ্ল্যাটের খবর জেনে ফেলে রত্নার মারফত। কারণটা অনুমান করতে পারে অরুণাভ। অলকা রত্নার চেয়ে বয়সে ছোট, বিবাহিতা। অলকার ওপর গোপন ঈর্ষা থাকতেই পারে মেয়েটার। ধর্মদাসের বউ-এর সঙ্গেও তো ওর বনে না।

মা বিড়বিড় করতে করতে ও ঘরে চলে গেলেন। অলকা তখন আবার তার সন্দেহটা প্রকাশ করল, মা বলছেন পর্যন্ত দর্জিপাড়ার লোকটার কথা।

অরুণাভ কথা বলল না। নিমন্ত্রণ পত্র পেলেই ধরা যাবে আসল ঘটনাটা কী। বলা তো যায় না। ধর্মদাসের পক্ষে কোনও কিছু করাই অসম্ভব নয়। যে হলুদপুকুর, বাদামপাহাড়, ইন্দ্রবিল, ন’পাহাড়ির খোঁজ রাখে, তার পক্ষে দর্জিপাড়ার লোকের পরিচয় বদলানো কঠিন নয়। অন্তত মুখে। কে জানে, ওই মৃণাল আচার্যর বাড়ি পিয়ালি টাউনে কিনা। ওরাই খাস মল্লিকের চৌধুরি কিনা, ওদের কেউ উজ্জয়িনী থাকে কিনা। তবে চৌধুরির মতো আচার্যও তো পাওয়া উপাধি। ভাবতে গিয়ে বিব্রত হয়ে পড়ল অরুণাভ। ওরা কি ‘আচার্য চৌধুরি’? বসুচৌধুরি, রায়চৌধুরি, পালচৌধুরির মতো আচার্য চৌধুরিও তো উপাধি পদবি হতে পারে। দর্জিপাড়ার লোকটা হয়ত ‘চৌধুরি’ ছেঁটে দিয়ে ‘আচার্য’ লেখে। ধর্মদাস আবার তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে চৌধুরির মহিমা।

অলকা জিজ্ঞেস করল, কিন্তু তুমি কি ওই সময় থাকবে?

— তাই তো! সম্বিত ফেরে যেন অরুণাভর। তার তো শিক্ষক সমিতির বার্ষিক সম্মেলন আছে বহরমপুরে ওই তারিখ থেকে। সে কলকাতার প্রতিনিধি স্থানীয় সদস্য। না গেলেই নয়। ষাট-পঁয়ষট্টি বছর নিয়ে এখন তর্কবিতর্ক তুঙ্গে। এবারের সম্মেলনটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশীর বিয়ে বলে তা বাদ দিতে তো পারবে না। অরুণাভ ভাবল বেঁচে যাচ্ছে সে। ধর্মদাসের ব্যাপারে না জড়ানোই ভাল। মা থাকবে, অলকা থাকবে, সে না থাকলে ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না। থাকলে দায়িত্ব এসে পড়বেই ঘাড়ে। মুখোমুখি ফ্ল্যাট, এ বাড়িতে বিয়ে। অরুণাভ উঠে গিয়ে জানালায় দাঁড়ায়। তিনতলা এই বাড়িটিতে পাশাপাশি দুটি করে ছটি ফ্ল্যাট। তারা একদম মাথায়। বাড়িটির বয়স কম নয়। মা তাকে কোলে করে পঁয়ত্রিশ বছর আগে এখানে এসে উঠেছিলেন বাবার সঙ্গে। তখন ধর্মদাসরা এসে গেছে। তারা কেন, এই ফ্ল্যাটবাড়ির পুরনো বাসিন্দারা কেউ নড়েনি আর। শুধু একতলার দুটি ফ্ল্যাটে দুবার ভাড়াটে বদল হয়েছে। তাও তো অনেক দিন হল। বাড়িটি সকলের যেন নিজের মতো। প্রতিবেশীরা এখানে বড় গা ঘেঁষাঘেঁষি করে আছে। খুব কাছাকাছি। এক ফ্ল্যাট অন্য ফ্ল্যাটের কাছে গোপন রাখতে পারে না অনেক কিছুই। দরজা খুললেই যে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বাসিন্দাদের অন্দরমহল পর্যন্ত দেখা যায়।

অরুণাভ দেখছিল মাঠ। টালা পার্ক এখন খণ্ড খণ্ড, তবুও সামনে এখনও বিস্তৃত সবুজ। অনেকটা আকাশ। অরুণাভ নিঝুম হয়ে পড়ে বাইরে তাকিয়ে। ফ্ল্যাট বাড়িটা ঠিক যেন আগের মতো নেই। লোকজনও কমে গেছে। মেয়েগুলি তো কেউ নেই। ঝুমুর, নূপুর, দোতলার নীলা, বেলা, করবী, একতলার শিউলি, সুজাতা— সবার শেষে যাচ্ছে রত্না। ধর্মদাসের ছোটভাই রামদাস চলে গেছে এ বাড়ি ছেড়ে। ছেলেটা জুটমিলে চাকরি করে। ধর্মদাস তাকে থাকতে দেয়নি এ বাড়িতে। একতলার নীলাঞ্জন খুব ভাল ফুটবলার, ফ্ল্যাট পেয়েছে কাঁকুড়গাছিতে। এ বাড়িটা ক্রমশ নিঃসঙ্গ হয়ে যাচ্ছে। ক্রমশ অন্ধকার।

তিন

ক’দিন বাদে অরুণাভর সঙ্গে ধর্মদাসের আবার কথা হল বাজারে। মুখোমুখি ফ্ল্যাট হলেও বাড়ির বাইরেই কথা হয় বেশি।

ধর্মদাস বলল, ক্যাটারার ঠিক করেছি, ষাট টাকা প্লেট।

হাঁ হয়ে গেছে অরুণাভ, ষাট টাকা!

—হ্যাঁ, তাও মিষ্টি ছাড়া, মিষ্টি ধরলে পঁয়ষট্টি থেকে সাতষট্টি পড়ে যাবে।

অরুণাভ বুঝল মিথ্যে বলতে আরম্ভ করেছে তার প্রতিবেশী। বড়লোকী দেখাচ্ছে। এত দাম হওয়ার তো কথা নয়।

— পাঁচশো লোক হয়ে যাবে।

— করছো কী, এত লোক আজকের দিনে কেউ বলে?

ধর্মদাস নিঃশব্দে হাসতে লাগল। তারপর এগোতে এগোতে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়েছে, হ্যাঁ অরুণাভ, তুমি যেন কী বলছিলে সেদিন, কী জিজ্ঞেস করছিলে।

অরুণাভ শঙ্কিত হয়ে ওঠে। তাদের সন্দেহের কথা কানে গেছে নাকি ওর। তাই বা কী করে হবে। আর সন্দেহ তো মিটেই গেছে, পাত্রের নাম মৃণাল নয়। পাত্র উজ্জয়িনী নিবাসী। দর্জিপাড়ার সঙ্গে কোনও সম্পর্কই থাকতে পারে না।

জবাবটা ধর্মদাসই দিল, পিয়ালি টাউনের নাম পিয়ালি নদী, তুমি ঠিকই বলেছিলে, ওখানে একটা নদী ছিল পিয়ালি নামে, এখন অবশ্য মাঠ, হ্যাঁ নামের কারণ থাকে বটে।

অরুণাভর মুখে হাসি ফোটে, খোঁজ নিয়েছিলে?

কেন নিতে পারি না, জিজ্ঞেস করলাম পাত্রের কাকাকে, বলল ওই নদীর নামেই তো টাউন, তবে নদী মদি সব তো শুকিয়ে যাচ্ছে, তাই নাকি। ওর কাকা তোমার মতো বিদ্বান বটে।

অরুণাভ বলল, হ্যাঁ, কাগজে পড়ো না।

— কাগজ পড়ার আর সময় পাই কই, হ্যাঁ উজ্জয়িনীতেও একটা নদী আছে।

— শিপ্রা, জানি, তুমি খুব ভাল জায়গায় বিয়ে দিচ্ছো রত্নার।

হে হে করে হাসতে থাকে ধর্মদাস, তাহলে বলো বাদামপাহাড়, ইন্দ্রবিলের চেয়ে ভাল হল কিনা। দূরও অনেক, টু নাইট জার্নি।

— চলে যাও, ঘুরে এস বিয়ের পর। অরুণাভ বলল।

— পরে দেখা যাবে। আগে আমি গোয়ায় যাব। অনেক দিনের ইচ্ছে যাওয়ার, ও জায়গাটায় নাকি সাহেব-মেমরা সব জামাকাপড় খুলে রোদ পোহায়।

অরুণাভ মাথা নাড়ে। এ নিয়ে তার কোনওরকম জানা তথ্য প্রকাশ করতে গেলেই বিপদ হয়ে যাবে। ধর্মদাস ছাড়বে না। সে গোয়ায় যাবে যাবে করছে বহুদিন। যার যেথা মজে মন। অরুণাভ ভাবছিল পিয়ালি নদী মরে গেছে। পিয়ালির চৌধুরিরা উজ্জয়িনীতে। সেখানে শিপ্রা এখনও বহমান। নদী মরে গেলে মানুষের খুব বিপদ হয়। সেই বিপদে পড়েই কি চৌধুরিরা অতদূর উজ্জয়িনীর অন্ধকারে পা বাড়িয়েছিল। এখন কী বিবাহ সূত্রে আবার ফিরতে চাইছে গঙ্গাতীরে।

চার

কেমন বিয়ে হল?

অলকা গম্ভীর, তুমি ছিলে না ভালই হয়েছে।

— কেন হল কী? ফ্ল্যাটবাড়িতে পা দেওয়ার সময়ই অরুণাভ কেমন থমথমে ভাব দেখেছে। তিন তলায় উঠে ধর্মদাসের ফ্ল্যাটে তালা দেখে কেমন যেন লেগেছে তার। বাড়িতে ওই হাওয়া ঢুকে পড়েছে বোধহয়।

অলকা বলল, ধরে করে একটা পুরুষ মানুষ গছিয়ে দিয়ে বাড়ি থেকে বিদায় করল, শুধু মিথ্যে কথা।

— কেন উজ্জয়িনী থেকে বর আসেনি?

— তা কেন আসবে না। অলকা ফোঁস করে ওঠে।

অরুণাভর গলা শুনে মা চলে এসেছেন এ ঘরে। অলকাকে থামতে বললেন, বাদ দাও না, ওসব কথা তুলছ কেন?

— হল কী? অরুণাভ জিজ্ঞেস করল আবার।

বলল অলকা। একটু চাপা গলায় গোপন খবর দিতে লাগল যেন। তার মনে হয়েছে বরের কঠিন অসুখ আছে। সুস্থ নয়। বয়স বছর পঁয়তাল্লিশ হবে। বয়সে মানিয়ে গেছে, কিন্তু লোকটার চোখমুখ কী রকম যেন, পুরনো অসুখের কালোছায়া।

— তুমি কী করে বুঝলে? অরুণাভ কেমন বিহ্বল হয়ে পড়েছে খবরটায়। বিস্বাদে মন ভরে গেল। ফ্ল্যাট বাড়িটা কেমন যেন নির্জন পুরীর মতো হয়ে গেছে। সব ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ। ধর্মদাসের ফ্ল্যাটে তালা। অথচ বিয়ে গেছে তো পাঁচ দিন আগে। এখনও বাঁশ নামাচ্ছে ডেকরেটরের লোক ছাদ থেকে। উৎসব হঠাৎ যেন ভেঙে গেছে।

অরুণাভর মা বললেন, আমি তো বলে দিলাম স্বামীকে ডাক্তার দেখাতে ভাল করে।

— সত্যিই অসুখ! অরুণাভ যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।

অলকা মাথা দোলায়, হ্যাঁ, বিয়ের রাত্রে হঠাৎ ঘামতে আরম্ভ করল, অথচ সেদিন তো ঠান্ডা ছিল ভাল, ঘেমে যেন চান করে যেতে লাগল, ফুল স্পিডে পাখা চালিয়ে আমি বরকে এনে বসিয়েছি এ ঘরে, জামা গায়ে রাখতে পারে না, শেষে না পেরে ডাক্তার ডাকতে হল, এমন দেখিনি কোনওদিন।

— ওরা কোথায়?

— মেয়ে জামাইকে উজ্জয়িনীর ট্রেনে তুলে দিয়ে ওরা বোম্বে গেল, গোয়া যাবে। অষ্টমঙ্গলা হল না, শোনা যাচ্ছে বরপক্ষই নাকি টাকা দিয়েছে, ও ছেলের বিয়ে হচ্ছিল না অসুস্থ বলে, রত্না তো আগে ছেলে দেখেনি।

অরুণাভর মন খারাপ হয়ে গেল। জানালায় দাঁড়িয়েছে সে। মা আর অলকার কথার অংশ অংশ কানে আসছে। মা স্মৃতির ভিতরে ডুবে যাচ্ছেন ক্রমশ। এই ফ্ল্যাটে আসা, ওই মেয়েটাকে জন্মাতে দেখা, ওর বাবা মা দিদি…. মা ফিসফিস করছেন, ভাল হয়ে যাবে, ঠিক ভাল হয়ে… বিয়ের পর অনেক সময় পুরনো অসুখ সেরে যায়। শরীরের একটা ধর্ম আছে তো! মা চোখে আঁচল দিয়েছেন। মা কাঁদছেন। মায়ের মন খুব নরম। এ বাড়ির পুরনো মানুষ তিনি একমাত্র বেঁচে আছেন। সবাই তাঁর সন্তানের মতো। মা রত্না, ঝুমুর, নূপুর, করবী, শিউলির কথা বলছেন… বলতে… বলতে দুপুর গড়িয়ে সন্ধে। বসন্ত এর মধ্যে ঢুকে পড়েছিল এই সিমেন্টবন্দী শহরে, টালা পার্কের কৃষ্ণচূড়ার মাথায়। তা মিশে গেল রৌদ্রময়তায়। কলকাতায় গ্রীষ্ম অতি দীর্ঘ, যায় যায় করেও যায় না। মা দুপুরে হাই তুলতে তুলতে বলেন, বৌমা মেয়েটার কোনও খোঁজ এল?

— কী করে জানব মা, ওরা তো এখন কথা বলে না।

হ্যাঁ তাই হয়েছে। তুচ্ছ জিজ্ঞাসায় ধর্মদাসের বউ সশব্দে দরজা বন্ধ করে মুখেও কুলুপ এঁটেছে। অলকা জিজ্ঞাসা করেছিল কাকে, জামাই-এর শরীর কেমন আছে বউদি?

সেই থেকে দরজা বন্ধ। দরজা খুললও বেশ কিছুদিন বাদে। প্রতিবেশী যখন, কতদিন বিনা আলাপে থাকতে পারে। যে জবাব চেয়েছিল অলকা ধর্মদাসের বউ-এর কাছে, তা পেল দেড় মাস বাদে, খুব ভাল আছে জামাইমেয়ে, তবে এখন ওখানে খুব গরম।

অরুণাভ শুনে বলল, হতে পারে মালওয়া মালভূমি অঞ্চল, তবে নগরটা তো নদীর ধারে।

অলকা চোখ উজ্জ্বল করে বলল, হ্যাঁ, শিপ্রানদী, তার তীরে তীরে নাকি শুধু মন্দির, সব দেবদেবী নাকি জাগ্রত, বহুকালের পুরনো।

— তুমি এসব জানলে কী করে?

— কেন রত্নার চিঠি তো পড়লাম, ও প্রতি সোমবার মহাকাল মন্দিরে যায়।

— মহাকাল মন্দির! মহাকাল এখনও আছে? অরুণাভ আচ্ছন্নের মতো জিজ্ঞেস করে।

— তুমি চেনো? অলকা অবাক হয়ে গেছে অরুণাভর কথায়।

অরুণাভ বাইরে অন্ধকার শূন্যতায় তাকিয়ে। ধোঁয়াধুলোয় আচ্ছন্ন আকাশে গ্রহনক্ষত্র এই শহরে স্পষ্ট নয়। উজ্জয়িনীর আকাশ নিশ্চয়ই ঝকঝকে, গ্রহনক্ষত্ররা চোখের জলের মতো মুক্তোবিন্দু। মেঘদূতেই তো রয়েছে মহাকালের কথা। মেঘ দাঁড়িয়েছে তার মাথায়, কবি উজ্জয়িনী নগরের রূপ বর্ণনা করছেন। মহাকাল— উজ্জয়িনীকে চেনে অরুণাভ। এ যেন তার পূর্বজন্মের স্মৃতি। অরুণাভ ফিসফিসিয়ে বলছিল সব অলকাকে, অলকা মাথা নাড়ছিল, সে তো জানে না, মেঘদূত পড়েনি।

অরুণাভ বলল, এবার উজ্জয়িনী যেতে হয়।

— তুমি তো শুধু বলেই খালাস, অলকা বালিকার মতো ঠোঁট ফুলায়, পিয়ালি টাউনেই তো নিয়ে গেলে না।

অরুণাভ হাসে, সেখানে তো নদী নেই।

অলকা বলে, রত্না লিখেছে শিপ্রার ঘাটে ঘাটে মন্দির। কাঁসর ঘণ্টা, ধূপের গন্ধ, নগর জুড়ে যেন উৎসব সব সময়…

এখনও! অলকা ফিসফিসিয়ে বলে, চিঠিটা আনো দেখি ওদের ঘর থেকে।

এইভাবে দূর উজ্জয়িনীর সঙ্গে মনে মনে জুড়ে যায় এই ফ্ল্যাটবাড়িটি, এই শহর। দিন যায়, মাস যায়। বর্ষায় আবার কথা ওঠে রত্নার। অলকা অরুণাভকে বলল, শ্রাবণে মহাকাল মন্দিরে খুব ভিড়, কত দেশ থেকে লোক যায়, রত্না লিখেছে জামাই ভাল আছে, সে ভাল আছে, প্রতি সোমবারে সে মহাকালে যায়, পুজো দেয়, মহাকালে সে মানত করেছে স্বামীর জন্য, কী যে ভাল মেয়েটা, এখানে ধরা যেত না, ও নাকি সকলের জন্য পুজো দিয়ে বেড়াচ্ছে মন্দিরে মন্দিরে, প্রার্থনা করছে সকলের জন্য।

— তার মানে? অরুণাভর ভিতরে যেন আশ্চর্য আনন্দ জেগে ওঠে।

— তাই তো লিখেছে, এই দ্যাখো না। অলকা চিঠিটা বাড়িয়ে দিল।

দুপাতা চিঠি। গোটা গোটা অক্ষরে। অরুণাভ পড়তে শুরু করল। পড়তে পড়তে তার বুকের ভিতরে যেন বর্ষণ শুরু হল। ভিজে যেতে লাগল এই কঠিন নগরের বুক। সব লিখেছে খুঁটিনাটি, শিপ্রার তীরে মঙ্গলনাথের মন্দির, সেখানে মানত করেছে, গণেশজির কাছে মানত করেছে, দুর্গামন্দিরে মানত করেছে, মহাকাল তো সবার মাথায় আছেন। শিপ্রানদী বর্ষায় ফুলে উঠেছে, সব দেবদেবীর চরণ ধুইয়ে নদী বহে যাচ্ছে অনন্ত উল্লাসে। সে নদীর কাছেও মানত করেছে, স্বামী যেন সুস্থ থাকে, দূর কলকাতার স্বজনপরিজন, ফ্ল্যাটবাড়ির মানুষগুলি যেন সুখে থাকে, নীরোগ থাকে। অতদূরে বসে এ ছাড়া সে আর কিই-বা করতে পারে, সকলের মঙ্গল কামনা ছাড়া।

পরের খবর এল নভেম্বরে। জানুয়ারিতে তারিখ। বাচ্চা হবে রত্নার। ও আসছে কলকাতায়। প্রথম সন্তান বাপের বাড়ি মানে ফ্ল্যাটবাড়িতেই হোক, এ তার ইচ্ছে। সন্তান কলকাতায় ভূমিষ্ঠ হোক স্বামী মত দিয়েছে। সে মানুষ ভাল আছে। আসুক রত্না। এসেও গেল। ফ্ল্যাটবাড়ির মেয়ে ফিরে এল পূর্ণগর্ভা স্বাস্থ্যোজ্জ্বল হয়ে। সব খবর দেয় অলকা।

অলকা বলল, জানুয়ারিতেই আসবে নিরঞ্জন, রত্নার স্বামী।

অরুণাভ বলল, ও এলেই কথা বলে নিতে হবে উজ্জয়িনী ভ্রমণের, তবে বর্ষায় যাব, অন্য সময় নয়।

শীত এল কলকাতায়। ডিসেম্বরে শীত পাথর হয়ে থাকল ক’দিন। তারপর তা কমতে শুরু করলেই অলকা ছুটেছে নার্সিংহোমে, রত্না ভর্তি হল। দুদিন বাদে সকালে এসে ধর্মদাস সোল্লাসে খবর দিল, রত্নার মেয়ে হয়েছে কাল রাত্তিরে, ওহে অরুণাভ শুনছ।

মা বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, জামাই এল না?

— আসবে, এখন তো ওখানে ট্যুরিস্ট সিজন, ব্যবসায়ে খুব চাপ, টেলিগ্রাম করে দিয়েছি, এসে নিয়ে যাবে।

এসে নিয়ে যাবে। নিয়ে যাবে। নিয়ে …। ফেব্রুয়ারির প্রথমে সন্তান কোলে রত্নাকে দেখল অরুণাভ। রত্না বলল, ওর বাবা আসত, তবে এখন লিখেছে একেবারে নিয়ে যাওয়ার সময় আসবে, সামনের মাসে।

পুরনো বাড়িটি থরথর করছে উল্লাসে সুখে। অরুণাভ বলল, আলাপ হয়নি, এবার এমন আলাপ করব যে…

মুখ টিপে হাসতে লাগল রত্না, তারপর হঠাৎ হাসি থামিয়ে বলল, সত্যি ওখানকার দেবদেবী খুব জাগ্রত, মঙ্গলনাথে ওর বাবা মানত করেছিল যেন মেয়ে হয়, মেয়ে হলে মঙ্গলনাথের কপালে সোনার চাঁদ দেবে বলেছিল। সত্যিই তাই হল, আপনার কী ইচ্ছে অরুদা?

অরুণাভ বলল, আমার জন্য, আমাদের জন্য তো তুমিই দিচ্ছো পুজো, আবার ফালতু খরচ করতে যাব কেন?

রত্না মাথা নামায়, হ্যাঁ দিই, প্রতি সপ্তা’য় তো যাই মহাকালে, আমার খুব মন খারাপ লাগে এক এক সময়, তখন আমি কী করব?

অরুণাভ চুপ করে যায়, রত্নাকে যেন এই শহরে আর মানায় না।

পাঁচ

চলে গেছে রত্না। কবে, না আজ দুপুরে। মার্চের প্রথম। এর ভিতরেই বাতাস আগুন। আগে কলকাতা এমন ছিল না।

— কেন, হঠাৎ চলে গেল যে? অরুণাভ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছে।

অলকা চাপা গলায় বলল, প্লেনে ইন্দোর, ওখান থেকে বাসে উজ্জয়িনী যাবে, এতক্ষণে বোধহয় পৌঁছে গেল, পিয়ালি টাউন থেকে ওর খুড়তুতো দেওর এসেছিল নিয়ে যেতে।

— কিন্তু কেন সেটা বলবে তো। অসহিষ্ণু হয়ে পড়ে অরুণাভ।

— বলছি, একটু আস্তে, ধর্মদাসরা আবার দরজা দিয়েছে, রত্নার স্বামী নিরঞ্জন খুব অসুস্থ।

— ধর্মদাস যায়নি?

— না, খবর তো এসেছে কাল রাতে, এ নিয়ে কান্নাকাটি করেছে মেয়েটা খুব, কিন্তু ধর্মদাসের নাকি যাওয়ার উপায় নেই।

— একা গেল?

অলকা চুপ করে থাকে। ঘরের বাতাস হঠাৎ খুব ভারী, বাইরের অন্ধকার কালিমালিপ্ত, তীব্র ঘন। মা এসে দাঁড়িয়েছেন এ ঘরে, ধরাগলায় বলছেন, মেয়েটাকে ঘাড় থেকে নামাতেই তো অতদূরে ওইরকম একটা রোগীর সঙ্গে বিয়ে দিয়েছে, যাবে কেন, গেলে যদি খরচ হয়, কী যে হল অতদূরে?

অরুণাভ বলল, ভাল হয়ে যাবে ঠিক।

— হ্যাঁ অত মন্দিরে পুজো দেয় যখন। বলতে বলতে অলকা মাথা নামিয়েছে, না, না কিছুই হবে না, আসলে আমার মনে হয় ওর স্বামী আসতে পারবে না, তাই এই বলে নিয়ে গেল তার বউকে, এ সময় তো সত্যিই প্রচুর ট্যুরিস্ট যায় ওদিকে।

মা ধরাগলায় বললেন, যাওয়ার সময়ে বলে গেল মাসিমা আমার খুব বিপদ!

এরপর আর কোনও খবর নেই। শহর পুড়ে গেল পশ্চিমি হাওয়া রোদে, তবু কোনও খবর নেই। ধর্মদাসেরাও হঠাৎ কেমন গুটিয়ে গেছে। জিজ্ঞেস করলে, হাঁ হুঁ করে উত্তর দেয়, বলে, অত দূরের খবর কি রোজ রোজ রাখা যায়, তুমি তোমার বোনের খবর রাখ, কী দিয়ে ভাত খেয়েছে কাল?

ধর্মদাসের কুযুক্তির কাছে অরুণাভ হেরে যায়। নিজেকে সংবরণও করে। কথা বাড়িয়ে লাভ কী, শুধু শুধু ধর্মদাস রাগবে। রত্না তো তার কেউ নয়। কেউ নয় বটে তার, কিন্তু ফ্ল্যাটবাড়ির তো!

খবর নেই। চিঠিও না। কিন্তু খবর এল একদিন। কলকাতায় তখন বর্ষা নেমেছে। তাপিত শহর ভিজছে মেঘের নিচে দাঁড়িয়ে। অলকা গিয়েছিল দিদির বাড়ি দর্জিপাড়ায়। দুপুরেই ফিরে এসেছে হাঁপাতে হাঁপাতে। ক্ষোভে বেদনায় মুখখানি কালো। ফ্ল্যাটে ঢুকেই সশব্দে দরজা দিয়েছে, তার পর আছড়ে পড়েছে বিছানায়, ওগো খবর শুনেছ!

ছুটির দিন। অরুণাভ জানালার ধারে চেয়ার টেনে খবরের কাগজ মুখে নিয়ে বসেছিল। বাইরের আকাশ এখন ছাই ছাই, বাতাস উঠেছে এলোমেলো। অলকার কণ্ঠস্বরে হতচকিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, আশঙ্কিত হয়ে জিজ্ঞেস করেছে, কী খবর, তুমি এর মধ্যে ফিরে এলে যে।

পুত্রবধূর কণ্ঠস্বরে অরুণাভর মা-ও চলে এসেছেন এ ঘরে, কী হল বউমা?

অলকা ফুঁপিয়ে উঠেছে, ওর সব ঘুচে গেছে।

— কার কথা বলছ? আশঙ্কায় বুক কেঁপে গেছে অরুণাভর।

অলকা বন্ধ দরজার দিকে আঙুল তুলেছে, ওই রত্নার, রত্নার সব ঘুচে গেছে, সাধ, আহ্লাদ, কী পাষণ্ড ওরা কথাটা চেপে হাসিমুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে, উজ্জয়িনী যায়নি পর্যন্ত, খবরও নেয়নি। অরুণাভর মা কপাল চাপড়ালেন, তুমি এ কী খবর আনলে বউমা, কে বলল?

দর্জিপাড়ার মৃণাল আচায্যি, রত্নার স্বামী মারা গেছে, মৃত্যু সংবাদ নিয়েই এসেছিল ওর পিয়ালি টাউনের দেওর, ধর্মদা, ওর বউ জানত, রত্নাকে জানায়নি, নিয়ে গেল উজ্জয়িনী স্বামী অসুস্থ বলে। আহা রে একা একা পাঠাতে বুক কাঁপল না ওদের, ছোট বোনটা বিধবা হল…

মৃণাল আচায্যি অলকাকে ধরেছিল আজ তার দিদির বাড়িতে। রত্না তাকে চিঠি লিখে জানিয়েছে খবরটা যেন কেউ না জানে। আর কেউ না। ওর দাদা বউদি, ফ্ল্যাটবাড়ির প্রতিবেশীরা যেন খবর না পায়। জানলে ওরা কষ্ট পাবে।

ধর্মদাস জানে না? অরুণাভ জিজ্ঞেস করে।

— বলছি তো জানে, সব জানে। পিয়ালি টাউনে গিয়েছিল মৃণাল আচায্যি রত্নার চিঠি পাওয়ার পর, সব শুনে এসেছে, কিন্তু রত্না জানে যে ধর্মদাসরা জানে না, মৃণালকে বার বার লিখেছে তার খবর কেউ যেন না শোনে।

অরুণাভ ফিসফিস করল, বলল, কেন তাহলে?

অলকা বেদনায় ভেঙে পড়ে, বলবে না ভেবেছিল, কিন্তু না বলে পারছিল না। আমাকে দিয়েও প্রমিস করিয়েছে আমি কাউকে বলব না, মৃণাল আচায্যি যে রত্নাকে খুব ভালবাসে, কথা বলতে বলতে তার চোখে জল চলে এল গো…।

অরুণাভ থরথর করে কাঁপল অলকার কথায়। মায়ের মুখ থমথমে, মেঘভারী। অলকাও হঠাৎ স্থির, ক্রমশ ধাতস্থ হচ্ছে, কথাগুলি আস্তে আস্তে কেটে কেটে বলছে। মেয়ে লিখেছে সবাই যেন জানে সে সুখে আছে, ভাল আছে। দাদা বউদিরা তো দেখেশুনে সুপাত্রর হাতে সমর্পণ করেছিল তাকে, ভাগ্যে সব সুখ সয় না।

রত্না আরও লিখেছে কলকাতায় আর ফিরবে না। ফ্ল্যাটবাড়ির মানুষগুলির সামনে বৈধব্য নিয়ে সে দাঁড়াতে পারবে না। কলকাতার মানুষকে সে কষ্ট দিতে পারবে না। সন্তানকোলে সে একনও পুজো দিয়ে যাচ্ছে মহাকালে মঙ্গলনাথের মন্দিরে, শিপ্রার কূ লে কূ লে মন্দিরে, মসজিদে, গির্জায়। সে খুঁজছে আরও প্রার্থনার জায়গা, আরও আরও। মসজিদ খুঁজে পেয়েছে, গির্জা পেয়েছে, আরও পেয়ে যাবে জগতে কত না প্রার্থনার জায়গা, গাছগাছালি, নদী, পাহাড়, জমি। তার প্রতিবেশীরা যেন ভাল থাকে, তার স্বজন পরিজনেরা যেন ভাল থাকে, তার সন্তান যেন ভাল থাকে…

দমকা ভিজে বাতাস অরুণাভর বুকে ঝাপটা মারে। সে মাথা তোলে। পশ্চিমে চিৎপুর রেল ইয়ার্ড পেরিয়ে গঙ্গার ওপার থেকে আসছে মেঘ পুঞ্জে পুঞ্জে, দলে দলে। উজ্জয়িনী, প্রাচীন অবন্তিকায় তার আর যাওয়া হবে না। এ জীবনে আর কখনও না। বৈধব্য সে সহ্য করতে পারবে না। বিধবা নগরনন্দিনীকে সে দেখতে পারবে না ওখানে গিয়ে। সে দেখল মেঘ এসে দাঁড়িয়েছে জানালার ওপারে। বাতাস আবার ঝাপটা মারে। বিছানার চাদর উড়ল, খসে পড়ল ক্যালেন্ডার। মেঘ যেন পুবদেশীয় এই নগর চিনে চিনে এখানে এসে থামল। মেঘ দেখছে নগরের জীর্ণ ফ্ল্যাটবাড়িটিকে, যেখানে মানুষ গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বাঁচে, কেউ কাউকে ভুলতে পারে না কখনও। বৃষ্টি নামল অঝোরে। বৃষ্টির শব্দে শব্দে নগরময় উচ্চারিত হচ্ছে মেঘের খবর, কী খবর?

অরুণাভ কান পাতে। বৃষ্টির অক্ষরে অক্ষরে উজ্জয়িনীর খবর, সে ভাল আছে… খুব ভাল আছে, বিন্ধ্যাচলের মেঘ তার খবর নিয়ে এসেছে এত দূর। অরুণাভ দু’হাতে চেপে ধরেছে জানালার গরাদ। কানে আসছে আকুল কণ্ঠস্বর, বৃষ্টি বৃষ্টিতে তা ছড়িয়ে যাচ্ছে নগরের আনাচে-কানাচে… মেঘ হে মেঘ, তুমি পুব দেশে গিয়ে হুগলি নদীর কূলে একটি নগর দেখতে পাবে, সেই নগরে খুঁজে খুঁজে পেয়ে যাবে আমার স্বজন-পরিজন প্রতিবেশীরা আছে যে জীর্ণ অট্টালিকায়, তা। অট্টালিকাটি দেখলেই চিনবে, বহুকাল তার গায়ে রঙ পড়েনি, বহুদিন তার বাসিন্দাদের বুকে আনন্দ জাগেনি, এক নিঝুম থমথমে পুরী যেন-বা— মেঘ, তুমি বোলো আমি সুখে আছি, তুমি আকুল ধারায় ভাসিয়ে দিয়ো ওই নগর, ওই নগর বড় তাপিত, শুষ্ক, মানুষ বড় কষ্টে আছে সেখানে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *