আফসার আমেদ : হাসিনার পুরুষ

আফসার আমেদ : হাসিনার পুরুষ

হাসিনা সারাক্ষণ খুশি থাকতে চায়। তৃপ্তি হোটেল থেকে মাছের ঝোল ভাত খেয়ে বেরতে গিয়ে গান গেয়েছে। মালিক সামন্তদা তার মুখের হাসি দেখেছে, গান শুনেছে। হাসিনার খুশির বিনিময়ে গা দুলিয়েছে সামন্তদা। হাসিনা কাছে এসে, আঁচল থেকে দশ টাকার নোট বের করে বাড়িয়ে দেয়। ‘চার টাকা কাটো। মাছের সাইজ ছোট ছিল।’ হাসিনা সামন্তর চোখাচোখি হাসে।

সামন্ত পাঁচ টাকার বেশি ফেরত দেয় না।

সামন্তর চোখাচোখি যে হাসল, এতে অন্য কিছু নেই। হাসিখুশিতে থাকা ছাড়া অন্য কিছু নেই। হাসিনা এইভাবেই খুশি থাকে। কতজনের সঙ্গে তার হেসে কথা হয়। তার স্বামী নেই। তিন বছর হল মারা গেছে। এই হাসাহাসির ঘটনায় মনে হতে পারে হাসিনা তাদের সঙ্গে ঢলাঢলি করছে। প্রেম চাইছে। তাদের ভালবাসাবাসি গড়ে উঠল! ভালবাসা হয় না। প্রেম হয় না। হাসিখুশি দিয়ে শেষ হয়ে যায়, বাকি থাকে হাসাহাসিই। ‘রেডিওটা চালাও না সামন্তদা, এখুন গেঞ্জির নাটকটা হবে।’ এই হাসাহাসি নিয়েই সে থাকে। মনে ভাবে, এই হাসির খুশি নিয়েই কি সে শুধু থাকতে চেয়েছে? স্বামী, ঘরসংসার আর কিছু চায়নি? তা নয়। সে কথা আলাদা। সে ভাবনা আলাদা। সে সাধ আলাদা। তাকে বহুর সঙ্গে হাসাহাসির ঘটনায় মিশিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। সে থাকে গোপনে, অন্য মনে। সে পুরুষ তো একজনই হয়। বহুর সঙ্গে হাসাহাসি দিয়ে তাকে চিহ্নিত করা যায় না। সেই পুরুষ সঙ্গে থাকার খুশির জীবনের কথা যে ভাবে না তা নয়। ভাবে। মনের তল থেকে সে সাধ জেগে ওঠে হঠাৎ কখনও। সহসা। বাদল দিনে রোদ্দুরের মতো। সহসা ঝড় অথবা বৃষ্টির মতো। স্নিগ্ধ রাতে মরা জ্যোৎস্নায় ঘুম ভেঙে সহসা মনে পড়ার মতো সে সব কথা। সে সব সাধ।

এতখানি কি হাসিখুশির স্বভাব রচনা করতে পারত হাসিনা, আগে? আগে ছিল ঘরে, সংসারে। যেদিন থেকে চালের ব্যবসা করছে, সেদিন থেকে এতটা উচ্চকিত হয়ে উঠেছে। নিজের পরিশ্রমের ভেতর তার এই লুকিয়ে-থাকা স্বভাব কুসুমের মতো ফুটে উঠেছে। তবে যে সে স্নিগ্ধ-বিকশিত, তা নয়। সাধ জাগে, নিজস্ব পুরুষকে কাছে পাবার। খুব ঘনঘোর বর্ষার দিনে মনের সাধের কথা মনে আসে, অথবা রৌদ্রস্নাত কষ্টকাতরতার ভেতর। এই সাধের মনকে সারাক্ষণ সে খুঁজে পায় না। হারিয়ে যায়। হারিয়ে যায়, নানা মুখের ভিড়ে, হাসিখুশিতে থাকার ভেতর। অথচ এই হাসিখুশির ভেতরেই তার সাধ খুঁজে পাবে, এমন কথাটা কখনও নির্জনে মনে আসে তার।

ঝমঝম রোদের ভেতর পানের গুমটির সামনে দাঁড়ায় হাসিনা। ‘এই আকরাম, গেঞ্জির নাটক বেরিয়ে গেল, চালা! যাচ্চলে, হাঁ করে থাকে দ্যাখো।’

আকরাম মনোযোগ দেয়। হেসে ওঠে তার মুখ। ‘পান খাবি তো?’

‘পান দে, আর রেডিও চালা।’

আকরাম পান সাজে আর রেডিও চালিয়ে দেয়। রেডিও বাজে। গেঞ্জি কোম্পানির বিজ্ঞাপনের নাটক হয়। তার ফাঁকে কথা হয় আকরামের সঙ্গে। রেডিওর নাটকও চলে, কথাও হয়। কোনও কিছুকে সরিয়ে রেখে একটাকে নিভৃত করার জীবন তাদের নয়। কথা বললে নাটক না হারিয়ে যায়, নাটক হলে কথা না হারায়। এবং দুটির মিশ্রণেই সম্পর্কের মুহূর্ত। তাদের কথার মধ্যে রেডিওর মেয়ের কণ্ঠস্বর, রেডিওর পুরুষের কণ্ঠস্বর, যা খুব সুন্দর, মিশিয়ে নেয় তারা। তারা যে কথা বলে, তাদেরই কথা, রেডিওর কথা নয়, নাটকের চরিত্রের প্রেম-অপ্রেমের কথা নয়। তাদের পাশাপাশি রেডিওর নাটকের চরিত্রের প্রেম-অপ্রেম হেঁটে চলে।

হাসিনা বলে ‘আমে স্বাদ নেই এখুন। তবুও আম খেতে শখ যায়, বল। পানি হলে আম মিষ্টি হবে। বিকেল থিকে ঝড় চালায়, কিন্তু পানি হচ্ছেনি।’

‘জষ্টিমাস পড়লে পানি হবে দেখবি।’ আকরাম পানটা বাড়িয়ে দেয়। হাসিনা পান মুখে পুরে বলল, ‘চুন কম দিয়েচিস। — জয় বাংলাদেশে নাকি ঝড়ে গাদা গাদা লোক মরে গেছে, বেবির বাপ!’

‘রেডিওতে তো শুনছি রোজ।’

‘বেদের মেয়ে জোসনা বইয়ে যে মেয়েটা পার্ট করেছে, সে মাগি নাকি মরে গেছে, কথাটা সত্যি?’

‘মেরে ফেলেছে।’

‘হায় আল্লা! মেছেদায় পাঁচ সপ্তা খেলছে। — আমির খানের পার্টের বই এলে বলিস তো বেবির বাপ! বেশ ভাল পার্ট করে বুইলি। লম্বু ফুটে গেছে। — বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে’… আঁচলের গিঁট খুলে দুটো দশ পয়সা ভিজে শ্বেতপাথরের ওপর রাখে হাসিনা।

আকরাম খপ করে আঁচলটা ধরে ফেলে ডান হাতে, হাসিনার। ‘দে, আরও কুড়ি পয়সা। শিব জর্দা দিয়েছি।’

হাসিনা আঁচলের পয়সা চেপে টানাটুনি করে বলে আকরামও টানে। হাসিনা হেসে গড়িয়ে পড়ে।

‘অত পয়সা লাভ করে কী করবি?’

‘মোর বউছেলে রইছে না? — একটা দশ দিলি যে, দুটা দশ দে।’ আঁচল ছেড়ে দেয় আকরাম।

পান দোকানের আয়নায় ফুটে ওঠে হাসিনার মুখ। সে আয়নার সামনে এতক্ষণ ছিল, অথচ আয়নায় ফুটে ওঠা দেখতে চায়নি বলে, তখন আয়নায় তার মুখ প্রতিবিম্বিত হয়নি। এখন দেখতে চেয়েছে বলে আয়নায় তার মুখ আয়ত হয়ে ধরা পড়েছে। এবং নিজের হাসিমুখ নিজে দেখে। নিজেকে আয়নায় খুঁজে পাওয়ার আলাদা একটা সৌন্দর্যবোধ আছে। একান্ত হয়ে ওঠার সৌন্দর্য। অথচ সে ভাল শাড়ি জামা পরে নেই। হেলিয়ে দুলিয়ে নিজেকে দেখে। আয়নার বুকে একরাশ খুশি ভরে দেয়। আয়নায় দেখতে পায় স্টেশনে টিকিটঘরের সামনে সুবলকে। ‘এই সুবল।’ পেছন ফিরে চিৎকার করে ওঠে হাসিনা। আয়নার বুক থেকে তার হাসিমুখ খুলে নেয় হাসিনা। আঁচলটা ডান হাত দিয়ে ধরে ডান কোমরে গুঁজে নেয়। ‘আম খাওয়াবি?’

দূর থেকে সুবলের সঙ্গে চোখাচোখি হাসিনার। ‘সুবল!’ চিৎকারে হাসিনার মুখের ওপর এক পৌরুষ কুঁদে ওঠে। টিপ টিপ ঘাম ছেয়ে যায়। সে সুবলকেই এতক্ষণ খুঁজছিল। চালের বস্তা সে সুবলের মাথায় তুলে দেয়, তার মাথায় সুবল তুলে দেয়। দুজনে দুজনকে এমন প্রতিদিন খোঁজে তারা। ডাউনের লোকাল এসে চলে গেলেও খোঁজে, আপের লোকাল এসে চলে গেলেও খোঁজে। আপের লোকাল লেট করলেও খোঁজে, ডাউনের লোকাল লেট করলেও খোঁজে। ট্রেনের জন্যে যাত্রীদের অপেক্ষা থাকে। লেট করলে অধীরতা বাড়ে, কিন্তু প্রতীক্ষায় থাকতে হয়। সুবলের জন্যে তাকেও প্রতীক্ষায় থাকতে হয়, সুবলকেও তার জন্যে প্রতীক্ষায় থাকতে হয়। তার নানা জনের সঙ্গে কথায় কথায় হাসিখুশি থাকলেও অপেক্ষা থাকে। অপেক্ষা থাকলেও হাসিখুশি থাকে। একে অপরের মাথায় বস্তা তুলে দেওয়ার স্বচ্ছন্দ বোঝাপড়া তারা খুঁজে পায়।

সুবলের কাছে গিয়ে, সুবলের গামছা ধরে টানল, ‘আম খাওয়াবি?’

সুবল তার চালের বস্তার ওপর বসে ছিল। গায়ে বোতাম-খোলা এক নীল শার্ট, পরনে লুঙ্গি। লুঙ্গি দু-পাট করে কোমরের কাছে গিঁট দিয়ে বাঁধা। ‘আম ভাল নয়।’

‘খাওয়াবি নি বল।’

‘আজ লোকালে লিচু উঠলে খাওয়াব।’

‘বাজারে লিচু এসে গেছে, লোকালে পেলে তো।’

‘পান খাচ্ছিস?’

‘আকরামের পান।’

‘আকরাম খাওয়াল।’

‘উ বোঁচামুখো খাওয়াবে? পয়সা ফেলে খেনু। একটু গাল থিকে ব্যার করে দুবো, খাবি নাকি?’

‘মারব নাথি।’

সুবল বস্তায় আধশোয়া অবস্থায় কাছে দাঁড়ানো হাসিনার একটা হাত টেনে ধরে তার দিকে নোয়ায়।

‘কী করছিস কি সুবল, পড়ে যাব যে। ভাল লাগে না বাবু।’ মুখে বিরক্তি এনে সুবলের সামনে বসে পড়ে হাসিনা। কোমর থেকে গামছা টেনে মুখ মোছে।

সুবল তার হাত ছেড়ে দিয়েছে। হাসিনা জানে, সুবল তার একান্ত পুরুষ নয়। একান্ত প্রেমিক নয়। সুবলের হাতে হামলে পড়ে হাসিনা। ‘তোর কি ঘামাচি হয়েচেরে সুবল। এ মা আঁড়কেলের গতর।’ সুবলের ঘামাচি মারতে বসে। সুবল আরাম পায় তাতে। ‘কুন পার্টির কাছ থিকে আজ চাল নিলিরে সুবল? সেই গেঁড়ি বউয়ের কাছ থিকে লিয়েচিস?’

‘গেঁড়ি বউয়ের চাল নেই।’ ঘামাচি মারার আরাম খাচ্ছে সুবল, প্রায় চোখ বুজে।

সুবলের হাত ছেড়ে দেয় হাসিনা। ‘কি গরম পাচ্ছে।’ হাই তোলে ‘ঘুম পায়।’

আর বস্তা দুয়েক চাল ইস্টিশানের পার্টির কাছে সংগ্রহ করে, বস্তার মুখ সেলাই করে, লোকাল ধরবে সেই ছটার। তারপর মাল বইতে হবে। লাইনে ঝাঁপিয়ে তুলে নামিয়ে, তুলে নামিয়ে সেই চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে নিয়ে যেতে হবে। সুবলের মালে সাহায্য করবে সে, তাকে সুবল সাহায্য করবে। এমন পঞ্চাশ-ষাটজন মেয়ে-পুরুষ চালের ব্যবসা করে তাদের মধ্যেও এক একটা দল তৈরি হয়। একক-বিচ্ছিন্ন হয়ে মাল তোলা-নামা করা মুশকিল। একজন মাল আনতে গেলে মাল আগলাবার জন্য আর একজনকে থাকতে হয়। সারা দুপুর বিকেল সন্ধে জুড়ে স্টেশনে তাদের আয়োজন চলে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে তারা থাকে। দ্বৈতে, সঙ্ঘে। সকলে সকলের চেনা। সকলে সকলের জীবনেতিহাস জানে। কার ক’টা মেয়ে, কার ক’টা ছেলে। কার বাপের ঘরের সংসারের লোকজন কে কী করে। কার স্বামী নরম না কড়া। কারও স্বামী থেকেও না থাকার মতো। কার স্বামীর অসুখ। কার শাশুড়ি জ্বালায়। এ লাইনে মেয়েরাই বেশি। দু-চারজন পুরুষ। মেয়েরা নানা কারণে নিজেদের ভেতর চুলোচুলি করে। ঝগড়া বিবাদ বিসম্বাদ হয়েই থাকে।

হাসিনার চোখে ঘুম এসে ছেয়ে যায়।

সুবল চালের বস্তার ওপর জেগে থেকে পড়ে পড়ে কাঠবেড়ালির মতো কুটুস কুটুস নড়ে-চড়ে। এদিকে কাত হয়, ওদিকে কাত হয়। গামছা পুঁটলি করে মাথায় দেয়। লুঙ্গির ভেতর হাত ঢুকিয়ে হাফপ্যান্টের পকেট থেকে একতাড়া নোট বের করে এনে ফের পকেটে চালান করে দেয়।

হাসিনা বসে বসে ঘুমোয়। বাঁ-দিকে মাথাটা ঢুলে পড়ছে। আবার তোলে। আবার ঢলে। রৌদ্রদগ্ধ চারপাশ। চালা গুমটি দোকানপসারি, রিকশা, রিকশাভ্যান, সাইকেল, অটো, বাস, ট্যাক্সি। কত মানুষ যায়, কত মানুষ আসে। কাকেরা ক্লান্তিহীন ওড়াউড়ি করে। এ চালা থেকে ও চালায় যায়। ‘কা-কা’ করেই চলে। মাঝে মাঝে রিকশার প্যাঁক প্যাঁক ওঠে। হাসিনা ঘুমোচ্ছে। এই শব্দের ভেতরই। হাসিনা যে ঘুমোয় ঘুমের ভেতর সে সচেতনতা আছে। কারণ মাথাটা বাঁদিকে খানিকটা নেমে এলেই তাকে তুলে নিতে হয়। গামছা বিছিয়ে সহজে ঘুমিয়ে পড়তে পারে। সেভাবে ঘুমোতে চায় না বলে এভাবে ঘুমোয়। খাওয়ার পর চোখে মেঘের ছায়া নেমে আসার মতো হালকা ঘুম বড় ঝরঝরে করে। মাথা হালকা হয়। শরীরের পেশি স্নায়ু এক সজলতায় ভরে ওঠে।

ঘুম ভাঙিয়ে সুবলের পাছায় চাপড় মেরে উঠল হাসিনা।

সুবল চমকে ওঠে।

‘তুই থাক, আমি কুসুমকে খুঁজি। দশটা টাকা পাব। আজ ন-দিন হল। না চাইলে দেবে না।’ উঠে দাঁড়িয়ে, প্রতীক্ষার শ্রমসঙ্গীকে মুহূর্তে ছাড়ে হাসিনা। এতক্ষণ তারই কাছে থাকার অচ্ছেদ্য যতিহীনতার চিকন যতিতে প্রকাশমান হাসিনা। শ্রমসঙ্গে থাকার যে প্রতীক্ষা তার, তাতে তার বিরহ নেই যেন। ছেড়ে চলে গেলেও জৈবনিকতার চেয়েও বুঝি বহু গাঢ় এই শ্রমসম্পর্কের সঙ্গ, ফিরে পাবে, এই নিশ্চয়তার সম্পর্ক-বন্ধন তাদের আছে। সুবল একদিন না এলে তার চলে না। সে একদিন না এলে সুবলের চলে না। অথচ সুবল তার একান্ত জীবনের কেউ নয়। প্রেমিক নয়, নিজস্ব পুরুষ নয়। রাতে ছোট চালার দোর খুললে হাট হয়ে যায় আকাশের গ্রহ নক্ষত্র ছায়াপথ। সেই আকাশের পিঠে পিঠ দিয়ে দাঁড়ায় না এই পুরুষ। তার গৃহের পুরুষ নয়। তার পুরুষের গৃহ নেই। সুবলের জন্যে তার বিরহ হয় না, পুরুষের জন্যে তার বিরহ হয়। তাহলে কি সুবল পুরুষ নয়? অন্যের পুরুষ। তার মনের কাছে পুরুষ হয়ে নিবেদন করেনি কখনও সুবল। সুবল তার ঘরের দোরে গ্রহ নক্ষত্র ছায়াপথের পিঠে পিঠ দিয়ে দাঁড়াতে চায়নি।

লাফিয়ে হাসিনার কোমরের গামছা ধরে ফেলে সুবল। ‘এই যাবি না।’

‘আ ছাড় লাগছে। ছিঁড়ে যাবে। কেন যাব না কেন?’

‘আমার ঘামাচি মেরে দে।’

‘ঘামাচি মারার টেইম নেই। যা, ভাগ দিকি।’ সুবলের বুকে ঠেলা মেরে গামছা ছিনিয়ে নেয়।

কুসুমকে পেল না। ফতিমা, রত্না আর কাশ্মীরা আছে। বালিচক স্টেশন বেশ বড়। কে কোথায় আছে, খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কেউ হয়ত মাল এখনও কিনছে। অথবা বস্তা সেলাই করছে। হয়ত-বা চা-দোকানে রুটি দিয়ে ঘুগনি খাচ্ছে।

‘এই কাশ্মীরা, কুসুমকে দেখলি? উটকপালিটা গেল কোথা?’

কাশ্মীরা পা ছড়িয়ে হাসে, ‘কেন টাকা নিয়েছে? সে আর পাবি?’

‘পাব না! চুল ছিঁড়ে আদায় করব।’

রত্নাবউ বলে, ‘আজ তো মাল অনেক তুলেছিস, হাসিনা।’

‘কই, বেশি নয়, পাঁচ ব্যাগ। তিরিশ কিলো করে। আর একটার জন্যে অপিক্ষা করছি। না পেলে ইস্টিশানের মাল নিয়ে পালাব। ছটার লোকালের অপিক্ষা না করে পাঁচটা পঁচিশ ধরে চলে যাব। বাগনানে নেবে গোলাঅলার ঘরে পোমছে ঘর যেতে পারলে বাঁচি!’

ফতিমা বলে, ‘কেন লো, ঘর যাবার জন্যে এত ছটফটানি?’

হাসিনা ফুঁসে উঠল, ‘ঘরে ভাতার নেই বলে কি তাড়াতাড়ি যেতে নেই? দুটো মেয়ে আছে, কতখান তাদের কাছে যাই, তবে বাঁচি। তোদের ভাতার আছে, তোরা ভাতার-সুহাগী।’

‘কেন একটা বে কর না।’ কাশ্মীরা মিটিমিটি হাসে।

হাসিনা একটা খিস্তি করে। সকলে হো হো করে হাসে।

হাসিনার গা জ্বলে যায়। অন্তর জ্বলে যায়।

ফতিমা— ‘তুই কিন্তু বিয়ে করতে পারিস।’

কাশ্মীরা আন্তরিক হতে চায় ‘উ বে করবার মন করলে এখনই বে হয়ে যায়।’

তাদের সামনে থপ করে বসে পড়ে হাসিনা। সত্যি সে বিয়ে করবে, এই মনের কথা কাউকে জানতে দেয়নি। সেজন্যে সকলে ধরে নেয়, সে বিয়ের মন করেনি। বিয়ে করবার মন আঁচলে বেঁধে তো ঘোরেনি। সে কথা গোপন মনে থাকে। লুকিয়ে থাকে। সারাদিনের পরিশ্রমের ভেতর লুকিয়ে থাকে, হারিয়ে থাকে। তাকে সহসা খুঁজে পাওয়া যায়, একা ঘরের ভেতর। ঘরের একটু কুপির আলোর রঙের ভেতর মন খুঁজে পায়। ওরা যে মনটা খুঁজে পায় না, তার যে বিয়ে করার মন নেই, এই প্রত্যাখ্যান বড় কষ্ট দেয় হাসিনাকে। তিন বছর হল লোকটা মরেছে। তিন বছর স্বামীসোহাগের সংসার নেই তার। তার বিয়ে করার মন নেই, লোকের প্রচারের গতিতে সে সমর্পিত হয়ে যায়। এই প্রচারের বিরুদ্ধে সে কতখানি যেতে পারে। যারা যারা তাকে বিয়ে করতে পারে, তারাই তো এই প্রচারকের একজন হয়ে উঠছে। বড় ব্যথা। বড় লজ্জা। মুখ ফুটে বলাও যায় না।

সেই লোকটা। বউ মারা যাওয়া রিকশাওয়ালাটার কথা তার মনে পড়ে যায় এখনই। খুব সাধ হয়েছিল সালাম তাকে বিয়ে করুক। আজ দশ-বারো দিন, সে লোকটা কোথায়, তার হদিশ নেই। তার রিকশায় প্রতিদিন চড়ত। কোথায় গেল সালাম? সালাম কি মনে করত আর রিকশাওয়ালা, আর ভ্যান-রিকশাওয়ালা, ফলওয়ালা, গুমটিওয়ালা, চালপার্টি, সকলের সঙ্গে যেমন হাসিখুশিতে কথা বলে, তারও সঙ্গে একই হাসিখুশির সম্পর্ক চেয়েছিল হাসিনা? হাসিনার বিয়ে করবার মন নেই, এটা যদি ধরে নিয়ে থাকে, তাহলে সালামের হাসিনাকে বিয়ে করার ইচ্ছে বা প্রেম জাগলেও বলতে পারবে না। সালামকে দশ-বারো দিন না দেখার কথা সহসা মনে পড়ে যাওয়ায় বড় বেদনা হয় হাসিনার। ওদের সঙ্গে হাসি মশকরা করতে করতেই বেদনা দাঁতে পেষে। মকদুম এসে আঁচল ধরে ইয়ার্কি করে টানলে, হাসিনা ‘ঘুরে ঘুরে নাচ’ ভঙ্গিতে একপাক নাচলে একপাক শাড়ি খুলে গেলেও, পাকে পাকে বেদনা জড়িয়ে থাকে। তার হাসির ভেতর মিশে থাকে বেদনা, তার চটুলতার ভেতর, তার কৌতুকে, গুনগুন দু-কলি গান গাওয়ার ভেতর। সালাম দশ-বারো দিন নেই, এই বেদনা সহসা এসে তাকে পাকে পাকে জড়িয়েছে। মকদুমের হাত থেকে জামরুল নিয়ে যখন সে দাঁতে কামড়ায়, তখন সে তার অন্তরে কামড় বসায়। সালামের ঘর সংসার ছিল না। দুটো কাঁসার থালা আর একটা স্টিলের জামবাটি, আর একটা ভাঙা রেডিও একটা পুঁটুলিতে করে তার কাছে রাখতে দিয়েছে। সংসার পাতলে সেগুলো নিয়ে যাবে। এত নির্দয়? সেগুলো তো নিয়ে চলে যেতে পারে! দশ-বারো দিন রেখে কোথায় চলে গেল, সালামের পুঁটুলির জিনিসপত্র হাসিনাকে কুরে কুরে খায়। অন্তর ছ্যাঁদা করে ঘুণপোকার মতো। সালাম চলে যাওয়ার বেদনা হাসিনাকে সহসা এসে জড়িয়েছে। সালামের না থাকার বেদনা হাসিনাকে সহসা এসে জড়িয়েছে। মানুষের মন নেই। পুঁটুলিতে মন রাখে মানুষ? না। পুঁটুলির মধ্যে কয়েকটা জিনিসপত্র। সেগুলো আগলে রাখার কী দরকার? তাতে মনের স্পর্শ নেই। যদি কোনওদিন সালাম ফিরে আসে, তাকে ওগুলো ফিরিয়ে দেবে। ওগুলো পাথরের মতো বুকে লাগে।

হাসিনার মন বলল, বাগনানে নেমে আজ আম কিনব। আম খাওয়ার আজ খুব শখ পেয়েছে। একটা গোটা আম, ছাল ছাড়িয়ে খাবে, আঁটি চুষে চুষে খাবে। টক যদি হয়, নুন মাখিয়ে খাবে। মিষ্টি যদি হয়, ছালসুদ্ধ খেয়ে নেবে। বৃষ্টি যদি রাতে হয়, দরজা খুলে বেরিয়ে বৃষ্টিতে ভিজবে। গায়ের ঘামাচি মরবে। দেহ শীতল হবে। মনে মনে কতকগুলো সাধ ও সঙ্কল্প তৈরি করে ফেলে সে।

স্টেশনে মাল নিয়ে এসে, সুবলকে খুঁজে না পাওয়ার অপেক্ষায় তাকে থাকতে হয়। সুবলের প্রতি অধীরতা এখন এই মুহূর্তে নেই। বরং সুবল অবহেলায় থাকে। যতক্ষণ না আসে, ততক্ষণ অপেক্ষা অধীরতা। এসে গেলে মিটে যায়। শ্রমসঙ্গের পরিপূরক নির্ভরতার প্রশ্ন। জীবিকার প্রশ্ন। জীবনের প্রশ্ন অন্যখানে। সুবল তার নিভৃত জীবনের বুঝি কেউ নয়।

হাসিনা গাড়ির ওপর। প্ল্যাটফর্মে সুবল। সুবল বস্তা তুলে ধরে হাসিনার দিকে, হাসিনা বস্তা টেনে তোলে। সুবলের একটা ভারী বস্তা সুবল তুলতে পারছে না। হাসিনা খেঁকিয়ে ওঠে, ‘তোল না, তোল, গায়ে কি খ্যামতা নেই বোঁচামুখো?’ নিজেই গায়ের জোর লাগিয়ে সেটা তোলে। হাসিনার হাতে চুড়ি নেই যে বস্তার ঘষটানিতে চুড়ি ভাঙবে। তার স্বামী মারা গেছে, তার হাতে তাই চুড়ি নেই। চুড়ি পরার কী শখ ছিল! নিত্য নতুন চুড়ি পরত। চুড়ি না ভাঙলে নতুন চুড়ি পরা যেত না। তখন নিজের থেকে ভেঙে ফেলত। হাতদিয়ে চেপে যে ভাঙত, তা নয়। ভরা জলের কলসি কাঁখে তোলার সময় চুড়িতে ঝনকা মারত। অথবা কলসির কানায় চুড়িভরা হাতের চাপ রাখত। তাতে কখনও ভাঙত, কখনও ভাঙত না। নতুন পরা চুড়ি এভাবে আচম্বিতে ভেঙে গেলে আপশোস হত। ভীষণ। বাটনা বাটায় ভেঙে যেত।

শেষ মালটা তুলে দিতে দিতে গাড়ি ছেড়ে দেয়। সুবল গামছায় গা ঝেড়ে ছুটছে ট্রেনের সঙ্গে সঙ্গে। হাসিনা বাঁ-হাতে দরজার হ্যান্ডেল ধরে সুবলকে দেখছে। সুবলের প্রতিদিনের খেলা। প্রতিদিনের এই দৌড়, আর ট্রেনে ওঠার মৃত্যু-মৃত্যু খেলা দেখে আসছে হাসিনা। হাসিনা এই মুহূর্তে একটু শঙ্কিত হয়ে পড়ে। আজও হয়েছে। বুক ঢিপ ঢিপ করে ওঠে। যদি গাড়িতে উঠতে গিয়ে পা পিছলে গাড়ির চাকায় পড়ে যায় সুবল? তার চোখের সামনে? এমন মৃত্যু-মৃত্যু খেলে কেন সুবল? না খেলে উপায়ও থাকে না। লাফ দিয়ে উঠে পড়ে সুবল হাসিনার একেবারে গায়ের পাশে।

সুবলের ছিপছিপে শরীর। পাতলা গোঁফ। বাবরি চুল। নীল শার্টটা ঘামে ভিজে গেছে। সুবল ওঠার পর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। তাকে টেনে ভেতরে আনে হাসিনা। ‘ভেতরে আয়, ভয় করে।’

‘ভয় কীসের?’

পুরুষের এই মৃত্যু-মৃত্যু খেলা পছন্দ করে না হাসিনা। নিজে বস্তার ওপর বসে, সুবলকে বস্তার ওপর পাশে বসায়।

এই ট্রেন থেকে পড়েই চাকার তলায় চলে যায় কাসেম। দু-টুকরো হয়ে যায়। তাকে আর চেনা যায়নি। কাসেম তার স্বামী ছিল। তিন বছর আগের ঘটনা। সুবলের মতোই এরকম করে চলন্ত গাড়িতে উঠত। সুবলের থেকে বেশি ফর্সা ছিল। সুবলের মতো অতখানি রোগা ছিল না। সুন্দর নাক ছিল। কাসেমই চাল আনত। হাসিনা সংসারে থাকত। রাতে ফিরত কাসেম, গভীর রাতে, ডেকে ডেকে হাসিনাকে ঘুন থেকে তুলত। ঘুম ছিল হাসিনার পাহাড়ের মতো। সুবল বিড়ি ধরিয়েছে। ‘গাড়ির চা খাবি?’

হাসিনা বলল, ‘না’।

সে ঘুম আর ঘুমোতে পারে না হাসিনা। দিনে দিনে কাসেমকে না-দেখতে পাওয়ায় কাসেমের মুখ ভুলে যাচ্ছে হাসিনা। এ-এক জ্বালা, স্বামীর মুখ ভুলে যাওয়ায় এক নির্মম কৌতুকে মাঝে মাঝে হেসে ফেলে হাসিনা। সব হাসি যে আনন্দের হয় না, এ থেকে জেনেছে হাসিনা। কাসেমের জন্য অনেক কেঁদেছে, অনেক কষ্ট পেয়েছে। আর কাঁদে না, আর কষ্ট পায় না।

আচম্বিতে তার মনে বড় বেদনা হয়, জয় বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় ও সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসে পাঁচ লক্ষেরও বেশি লোকের মৃত্যুর কথা মনে পড়ে যাওয়ায়। একসঙ্গে এত মানুষের মৃত্যু বড় ভয়ঙ্কর। মানুষের মৃত্যু বড় কঠিন জিনিস। বুকের ভেতরটা আঁকপাঁক করে ওঠে। এত মানুষ একসঙ্গে? অসুখ-বিসুখ নেই, এমনিতেই মরে গেল। বড় বেদনা আসে হাসিনার। সে অশিক্ষিতা রমণী, তার অত জ্ঞান নেই। কিন্তু অত মানুষের মৃত্যু নিয়ে তার বেদনা কম নয়। কতদূর জয়বাংলা, বাংলাদেশ, সে জানে না। ওদেশ থেকে কেউ আসে, ওদেশে কেউ যায়, তাদের দেখেছে। নিশ্চয় উড়ে উড়ে পাখি ওদেশে যায়, পাখি ওদেশ থেকে এদেশে আসে। অন্ধকারের নদীর জলও ওদেশ থেকে এদেশে আসে। ওদেশে যায় এদেশ থেকে। চেনা মানুষ যখন যায় আসে, অচেনা মানুষ এলে, চেনা হয়ে ওঠে, তখন মনে হয় দেশটায় মানুষেরই বসবাস। কত মানুষ মরে গেল। আহা! কত মানুষ কত কষ্ট পেয়ে মরেছে! এই মুহূর্তে চা খেতে ইচ্ছে করে না তার। গাড়ির পরিচিত চাওয়ালা হেঁকে হেঁকে চলে যায়। মুখে হাওয়ার ঝাপট নিয়ে শূন্যপানে তাকিয়ে ভাবে হাসিনা। ভেবে ভেবে যেন ছোট নুড়ি পাকিয়ে যায়।

সেই যে মনে পড়ে গেছে সহসা, সালাম দশ-বারো দিন কোথায় গেছে, ফেরেনি, এই মনে পড়াটাকে আঁচলে যেন বেঁধে রেখেছে হাসিনা। হারিয়ে ফেলছে না। শূন্যপানে তাকিয়ে আনমনা স্নিগ্ধ হয়ে সুবলের হাঁটুতে তার বাঁ-হাতটা হালকাভাবে রাখে হাসিনা। স্পর্শ দিয়ে যেন সুবলকে ভালবাসে। সালাম অন্য কোনও জেলায়, অন্য কোনও ইস্টিশান শহরে বোধহয় রিকশা টানছে। গাড়িটা সঙ্গে নিয়েই গেছে সে। তার হাসিনার জীবন নিয়ে কোনও সাধ ছিল না, তাই অন্য কোনও জেলায়, অন্য কোনও ইস্টিশান শহরে অন্য মানুষদের মধ্যে রিকশা টানে। তার কাছে কিছু গচ্ছিত না রেখেই যেতে পারত সালাম। রাতে, পুঁটুলিতে হাত পড়ে গিয়ে, সালামকে মনে পড়লে, পুঁটুলির জিনিসপত্তর পাথরের মতো বুকে চেপে বসে। গহিন রাতে। নিভৃত জীবনে। কেন যে সালাম তার কাছে জিনিসপত্তরগুলো রাখতে গেল! রাখল যদি, কেনই যে কোথায়, চলে গেল! চলে গেল রেখে গেল না কিছু যদি! রাখল, চলে গেল না যদি! রেখে, কোথায় চলে গেল! তাহলে এত মনে পড়ত না সালামকে।

হাসিনা সুবলকে ঠেলা মেরে ঝেঝিয়ে ওঠে, ‘কী অত খাচ্ছিস বল তো?’

‘কেন তুই খাবি? পান পরাগ।’

‘একটা গোটা প্যাকেট বসে বসে একা খাচ্ছিস নাকি?’

‘কালকের কেনা।’

‘কালকেও দিলি না একটুও।’

সুবল হাসে।

হাসিনা রেগে যায়। দাঁত কিড়মিড় খায়। ‘মুয়ে ঝাঁটার বাড়ি দিই, দাঁত কেলিয়ে বোঁচামুখো হাসছে!’

সুবল প্যাকেট নাড়িয়ে হাসিনার করতলে একটু পান পরাগ দেয়।

‘এই বেশি করে দে।’ চোখ পাকায় হাসিনা।

আরও একটু দেয় সুবল।

‘আরও একটু দে।’

‘আর কত দোব!’

‘য়ু, প্যাকেট ফুরিয়ে ফেলে ঢঙ হচ্ছে।’ পান পরাগ আর একটু নিয়ে, সুবলের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকল। যেন তার কত মনের কথা সুবলের মুখের ওপর নিয়ে খেলা করছে। সুবলের দিকে তাকিয়েই থাকে। তাকানো তার ফুরোয় না। তার ভালও লাগে তাকিয়ে থাকতে। তার ভাল লাগাটা সুবলের কাছ থেকে চাহনির ভেতর দিয়ে নিয়ে নিতে পারে।

সুবল নিজে তাকিয়ে অস্বস্তি পায়, ‘কি, কিছু বলবি?’

‘না।’ হাসিনা কিছু বলে না। কিছু বলতে পারে না। সুবলের ভরা সংসার। কিন্তু সুবল তেমন তাকে টানে না। যেমন রকম টানে সালাম, তেমন কেউ নয়। সুবল কি বুঝতে পারে, সে সালামের প্রতি কাতর হয়ে তার দিকে এমন তাকাচ্ছে? সুবল জানে না, সুবল বুঝতে পারে না। সুবলের দিকে তাকিয়ে সালামের প্রতি আকুল হয়। সালাম কেন দিয়ে গেল পাথর!

সুবল হাসিনার বাঁ-হাতটা তার ডান হাতের ভেতর নিয়ে চাপ দেয়। হাসিনার ভাল লাগে। সে সুবলকেই দেখে, কিন্তু সালামের প্রতি তার প্রেম। মন কেমন করে। দুলতে দুলতে ট্রেন চলছে। হৃদয় দুলতে থাকে। হাওয়া যেন শরীরে ঝড় নামায়। শরীর কাঁপে। মন নিভৃত কাঁপুনিতে মরে থাকে।

‘কুথাও ঘুরে আসবি সুবল?’

‘বেড়াতে?’

‘এমনি বেড়াতে।’

‘কোথায়?’

‘আমি কি অত নাম জানি?’

সকালে কোথাও বেড়াতে যাবে, সন্ধ্যায় ফিরে আসবে, তার মেয়ে দুটোর কাছে, এমন হয় না? দশ বছরের বোনটা তার সংসারে থাকে। তার ভরসায় কোথাও বেশিক্ষণ থাকা যায় না। মাঝে মাঝে মাথা ঘোরে। কি দুর্বল লাগে তার।

সুবল হাসিনার করতলে কুটুস করে চিমটি কেটে নেয়। ‘ওই তো লিচু উঠেছে।’ ঝটিতি সুবলের কোমরে লুঙ্গির কশি চেপে ধরে হাসিনা। ‘কেন, খাওয়া।’

‘তুই খাওয়াবি বলেছিস তো।’

‘আমি খাওয়াব, হ্যারে বোঁচামুখো!’ কোমরের কশি ছেড়ে সুবলের গলার গামছাটা ছিনিয়ে নেয় হাসিনা।

সুবল চুল ধরে হাসিনাকে নিজের দিকে টানে। সুবলের বুকের কাছে মাথাটা কাত হয়ে পড়ে হাসিনার। হাসিনা হাসিখুশিতে, হিহি করে হাসছে। সুবল তার চুল ধরে টানছে বলে, সুবলের বুকে তার শরীর নুয়ে পড়ছে। এলিয়ে পড়ছে। ‘এই সুবল, ভাল হবে না কিন্তু!’ হাসিনার চোখদুটিতে প্রসন্ন হাসি খেলে বেড়াচ্ছে। চমৎকার হাওয়ার মতো খুশিতে থাকা বয়ে বেড়াচ্ছে। ভিজে ঠোঁটে দাঁত কামড়ে ধরলে সেটার প্রকাশ পায়।। ছদ্ম রাগ দেখিয়ে পরমুহূর্তে হেসে ফেললে সেটা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। খোঁপার চুল এলিয়ে যায়। চোখ বুজে আসতে চায়। সুবলের বুকের ওপর চিৎ হয়ে মাথা রেখে, সুবলের মুখ ঊর্ধ্বপানে তাকিয়ে দেখতে চায়। সুবলকে দেখতে চায়। সে জানে, সুবল সালাম নয়। সালামও সুবল নয়। কাসেমও সালাম হতে পারেনি।

রাত অনেক হল। গোলায় মাল দিয়ে এটা ওটা কেনাকাটা করা ও চা-পানি খেতে খেতে রাত সাড়ে দশটা বেজে যায়। প্রতিদিনই এইরকম।

রিকশার লাইনে ঘোরে ফেরে হাসিনা। কুদ্দুস ভাবে যে তার রিকশায় হাসিনা যাবে, সে রিকশা টেনে বের করে। তাকে না করে দেয় হাসিনা। রজবও টেনে বার করে রিকশা। তাকেও না করে দেয় হাসিনা।

হানিফ বলল, ‘কি রে যাবিনি?’

‘যাব, সেই বেদোর জাতটাকে দেখেচিস?’

‘কে বলবি তো?’

‘সালাম।’

‘কেন, তোর কিছু লিয়ে গেছে বুঝি? কী লিয়েছে?’

‘কিছু একটা লিয়েছে। তোকে বলব কেন?’

‘না বলিস তো বয়েই গেল। তবু আদায় করতে পারি কিনা দেখতাম।’ হানিফ পাশ ফেরে, ‘হ্যারে কুদ্দুস, সালামকে দেখতে পাইনি, গেছে কুথা?’

কুদ্দুস বলল, ‘উ শালা বে করবে বলে হুগলি গেছে। খানাকুল।’

‘এদিকে আর মেয়ে পেল না, হুগলি ছুটতে হল?’ হানিফ হাসিনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার রিকশায় যাবি মনে করিস তো বল, পিছুনে হাওয়া, শনশন নিয়ে চলে যাব। যাবি তো চল। কিরে হাসিনা, যাবি?’

‘যাব বৈকি, দু-দশ মিনিট আগে-পরে যাওয়া নিয়ে তো কথা! কিন্তু মানুষটার লিট খবর লিচ্ছি। মানুষটার বিয়ে হল কি বিয়ে হল না, ফিরল কি ফিরল না— এসব কথা!’

হানিফ কুদ্দুসের দিকে পাশ ফেরে। ‘সত্যি সালাম বিয়ে করতে খানাকুল গেছে?’

কুদ্দুস পেছন ফেরে। ‘এই নারানদা, সালাম বে করতে গেচ্ছে বলছিলে না?’

নারান হাঁকে ‘সে তো আট দশ দিন হল বে করতে চলে গেছে।’

‘ফিরেছে।’ আরও দূর থেকে কে যেন বলল।

নারান পেছনে মুখ ফেরায় ‘কখনো ফিরল?’

‘সকাল দশটায় দেখেচি।’

‘কেমন বে হল, কিছু জানলি?’

‘তা জানিনি। তবে সেই রিকশাটাই চালাচ্ছিল।’

‘এদ্দিন গেছল যখন বিয়ে করেই ফিরেছে।’

‘হ্যারে স্ট্যান্ডে এসেছিল জাকির?’

‘না, সে স্ট্যান্ডে আসেনি।’ পাড়ার ভাড়া খেটেছে বোধহয়। কাল আসবে।’

হানিফ হাঁকে, ‘এই জাকির, তোর সনে তো দোস্তি ছিল, বউ দেখে আয় না। বাঁধে ছোটবুনের ঘরে তুলেছে দ্যাখ। নিজের তো ঘর নেই। ফর্সা বউ কিনা অন্তত দেখে আয়।’ হানিফ হাসিনার দিকে তাকায় ‘ওই তো খবর পেলি। যাবি মনে করিস?’

হানিফের রিকশায় উঠে বসে হাসিনা। ‘ওই বেদোর কথা বাদ দে।’

‘তুইই তো শুনতে চাইলি।’

‘শুনতে চাইনু বলে তার আমি কেউ হয়ে গেনু নাকি? তার রিকশায় যেতাম বলে জানতে চাওয়া।’ তিনটে বড় বড় আম কিনেছে হাসিনা। একটা একা চুষে চুষে খাবে। ব্যাগে আরও বাজার আছে। ব্যাগ ভরে আছে। রিকশায়, পায়ের তলায় রেখে, ব্যাগের ডান্ডি ধরে একটু ওপরের দিকে তুলে ধরে ব্যাগটা।

এই ভঙ্গির ভেতর থেকে, কুদ্দুস লাফিয়ে পড়ার উৎসাহ পায়। হাসিনার ব্যাগের ওপর হামলায়। ‘কী এত কিনেছিস হাসিনা— পাকা আম দেখছি যে।’

‘এই একটা আম লিয়েচ তো, কেটে ফেলব।’

একটা আম নিয়ে শূন্যে লোফে কুদ্দুস। ‘আরও তো আম আছে।’

‘না। হায় করে দ্যাখো কাঁচারিপাড়ার লোক!’

কুদ্দুস আম হাতে নিয়ে কোমর দুলিয়ে নাচে।

হি হি করে হেসে গড়িয়ে পড়ে হাসিনা। ‘বেদো, করে দ্যাখো।’ রিকশা থেকে হাসিনা নেমে কুদ্দুসের লুঙ্গি ধরে টেনে কাছে আনে। রিকশায় উঠে বসে লুঙ্গির কশি ধরে থাকে কুদ্দুসের। হাসিখুশি হাসিনা উছলে ওঠে। কুদ্দুস ওই অবস্থাতেই নাচে।

কুদ্দুস গান গায় ‘বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে…’

সহসা কুদ্দুসের গানের সঙ্গে হাসিনা গলা মেলায় ‘বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে…’

কুদ্দুস নাচে। হাসিনা নাচতে পারে না। কিন্তু এই ঘটনায়, গানে তার মন নাচে। চোখ নাচে। তার খুশি নাচে চোখে, মনে দেহে। এই ঘটনাকে এড়াতে পারে না, এই গানকে এড়াতে পারে না। দূরের ইলেকট্রিকের আলো চুঁইয়ে পড়েছে। চারপাশে রিকশা ও রিকশাওয়ালার জটলা। নন্দ সটান হাসিনার পাশের সিটে উঠে পড়েছে। নন্দর গায়ে ঢলে ঢলে পড়ে হাসিনা। কনুইয়ের গোঁতা মারে। নাচের একটা আদল পায় তাতে। সুরের সঙ্গে সুর মেশায়, কথার সঙ্গে কথা মেশায়।

ট্রেন ভিড়তে, মুহূর্তে ঘটনাটা থমকে গেল। যে যার রিকশায় চলে গেল। অবস্থাটা এক মুহূর্তে বদলে যায়।

কুদ্দুস আমটা বাড়িয়ে দেয়।

হানিফ রিকশা আগায়।

রিকশা চলছে। কিছুটা হাওয়া পায় হাসিনা। ‘হানিফদা, তোর সন্ধানে তিনশো পুরনো টালি থাকলে বলিস তো। ঘর ছাইব। খড় আর রাখবনি। বিষ্টিবাদলের দিন এসচে।’

‘আচ্ছা দেখব।’

‘পরশু যে খুন হল, খুনিকে ধরতে পেরেছে, হানিফদা?’

‘ধরেচে শুননু।’

‘মানুষের কি মন দ্যাখ, মানুষ মানুষকে খুন করে? এই যে জয় বাংলাদেশে ঝড়ে পাঁচ লাখ লোক মরে গেল— বল হানিফদা, এমন করে লোক মরতে আছে!’

হাসিনার মন ভাল নেই। ব্যথায় যে কঁকিয়ে উঠছে, তা নয়। একটু উদাস হলে একটু একটু ব্যথা লাগবে। সালাম বিয়ে করেছে, এই শোকে সে মরে যাচ্ছে না। মন উতলা হয়ে উঠবে, রাতের বেলা, নিভৃত-একায়। সালামের পুঁটুলিটার কথা মনে পড়লে। পুঁটুলিটা হাতে ঠেকলে। আবজাল সুবল কুদ্দুস হানিফদের এমন মনে পড়ে না। তারা কোনও কিছু তাকে রাখতে দেয়নি। সালাম রাখতে দিয়েছে বলে, সালামের জন্যে মন কেমন করে। পুঁটুলিটার একটা অবয়ব আছে, হাতে ঠেকে গিয়ে মনে পড়ায়, চোখে পড়ে গিয়ে মনে পড়ায়। যখন চোখে পড়ে, স্পর্শে ধরা পড়ে, তখন সে ঘরে থাকে, নিভৃত একার ভেতর। তখনই সালামকে তার বেদনার সঙ্গে মনে পড়ে, আর সারাদিন ভুলে থাকে। হারিয়ে থাকে। গভীর রাতে পুঁটুলি ধরে সালামকে খুঁজে পায় হাসিনা। তখন বেশি মন উতলা হয়, মন কেমন করে। এখন তেমন মন কেমন করে না হাসিনার। সালাম বিয়ে করেছে, সে তার বিয়ে করেছে।

হাসিনা বলল, ‘দেয়ালে আঁকছে শুধু। শুধু কেস্তে হাতুড়ি আর হাত। — মিটিন হচ্ছে শুধু। বুঝলে হানিফদা, মিটিন একদিন শুনব। বেশ কাছাকাছি কুথাও হয়, শুনব। — হানিফদা, আমার দুটো কেন ভোট বলত? বাপের ঘরে একটা, এখেনে একটা। দুটো ভোট কেন বল না?

রিকশা চলে শনশন। তারায় ভরা আকাশ। অসংখ্য তারা। আকাশটা নীল দেখায় তারার আলোয়। নরম বাতাস বইছে। কখনও দমকা হয়ে আসে। কখনও হালকা হয়ে আসে। মিহি অথবা ভারী বাতাস। রিকশার কিট কিট শব্দ। প্যাডেলের ঘটাস ঘটাস শব্দ। হানিফের শরীর নুইছে, উঠছে। দু’পাশে মাঠ, গাছপালা, গ্রাম, ঘরবাড়ি। ছবির মতো হয় কখনও হাসিনার চোখে। নীরব হয়ে উঠলে তার এমন মনে হয়। তখন তার এসব দেখতে ইচ্ছা করে। পেছন থেকে হানিফকে দেখে। হানিফের পিঠে খোঁচা মারে। ‘জোরে চালাতে পারিস না!’ হেসে গড়িয়ে পড়ে হাসিনা। হানিফের পিঠে খোঁচা মারছে বলে, হেসে গড়িয়ে পড়ছে বলে, হানিফের সঙ্গে হাসিনার কোনও গোপন সম্পর্ক নেই। একটু হাসিখুশিতে থাকতে চাইছে সে। এমন করে সে খুশি থাকে। হাসে। যার সঙ্গে সম্পর্ক পাতাতে চেয়েছিল, সে এখন বিয়ে করেছে।

হানিফ তাকে নামিয়ে দেয়।

রাস্তার ধারেই হাসিনার ঘর। সরকারি জমিতে ঘর বানিয়েছে। কাছে দূরে এমন ঘর আরও কয়েকটা। হানিফ টাকা পেয়ে চলে যায়। কেমন শ্লথ হাঁটে হাসিনা। নিজের শরীরই নিজের ভার লাগে। টেনে নিয়ে যেতে হয় যেন।

বাঁশের দরজাটা হাট করে খুলে ফেলে হাসিনা। কুপির ছোট আলোয় ছোট ঘরটা ভরে আছে। মেয়ে দুটোকে নিয়ে বোন ঘুমোচ্ছে। সকালে রান্না করে যায়। ভাত এলিয়ে যায়। সে ভাতই জল ঢেলে প্রতিদিন তাকে খেতে হয়। শিশুদের দেখে। নিঃশব্দে হাঁটাচলা করে ঘরের ভেতর।

একা একা খায়। খেতে পারে না। রোচে না। কোনও রকমে দুটি ভাত খায়। মনে পড়ে যায় আমের কথা। উবু হয়ে ব্যাগ থেকে আম বের করে এনে খায়। মিষ্টি আম। ছোলাসুদ্ধ খায়। একটু একটু করে খায়। জিভে স্বাদ নিয়ে নিয়ে খায়। আঁটি চুষে চুষে খায়। তার আজ আম খাবার সাধ হয়েছিল, খাবে না কেন? গোটা আম একা বসে বসে তাই খাচ্ছে। সিজিনের প্রথম আম। গন্ধেই প্রাণ ভরে যায়। তাও আবার ভাল জাতের আম। হিমসাগর। একটু কামড়ায়। জিভের সাধ পরিতৃপ্ত করে। জিভ ও তালুর সঙ্ঘর্ষণে আমের টুকরো অংশটা নরম থেকে নরমতর হয়ে ওঠে। তার সঙ্গে লালা মেশে। অপূর্ব এক স্বাদ। সারা শরীরের মধ্যে এক স্বাদ মিশে যায়। শরীরের সমস্ত কোষে কোষে, রক্তে, ধমনীতে আমের স্বাদ ভরে উঠছে। প্রথমে আমের ছোল দাঁতে ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে চিবিয়ে খেয়ে নিয়েছে। পরে একটু একটু কামড়ে খাচ্ছে। যতক্ষণ সে খায়, আমের স্বাদের পরিতৃপ্ততায় থাকে। তার রসনার শরীর আমের স্বাদের কাছ থেকে একটু কণাও বঞ্চনা খুঁজে পায় না। আঁটির গায়ের চারপাশ খাওয়া হয়ে গেলে এবার হাসিনা আঁটিটা মুখে পুরে চোষে। চুষে চুষে আঁটিটা খেয়ে চলে। আঁটির গায়ে একটুও আমের স্বাদ অবশিষ্ট রাখতে চায় না। অপূর্ব স্বাদের ভেতর গোটা আমটাকে এভাবে খেতে থাকে হাসিনা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *