মহাশ্বেতা দেবী : কুসুমা

মহাশ্বেতা দেবী : কুসুমা

খামের ওপরে প্রেরকের নাম ছিল, বিমল ওরাওঁ, সাং কুসুমা, ডাক- বিশপাহাড়ি VIA মইষানী, থানা- মানবাজার, জেলা- পুরুলিয়া। চিঠিটা আসতে বেশ দেরি হয়, কেন না বিমল লিখেছিল ‘মাধব দস্তিদার স্ট্রিট’, হবে ‘মাধব পোদ্দার স্ট্রিট’। কলকাতা-৯ সঠিক লেখা ছিল। তারপর ওর নামের নিচে ‘সাংবাদিক— অগ্রগতি’ লেখা ছিল। ‘অগ্রগতি’ কাগজের সাংবাদিক হিসেবেই ও প্রথমবার মানবাজার-টু অঞ্চলে গিয়েছিল। শুধু সাংবাদিক নয়, চিত্র-সাংবাদিক। ‘গ্রুপ’ ক্লাবের প্রদর্শনীতে ওর ফটোগুলি খুব প্রশংসা পায়। কলকাতার পথের দৃশ্য ওর ছবিতে একটা নতুন ডাইমেনশন পেয়ে যায়। তারপর শুরু করে ফটো-জার্নালিজম। এখন ও তিনটি কাগজে লেখে সচিত্র-সংবাদ (দুটি বাংলা, একটি ইংরেজি)। তবে ‘অগ্রগতি’-ই ওকে প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছিল, এবং দার্জিলিং থেকে সুন্দরবন সচিত্র-সংবাদে ওকে প্রভূত সস্নেহ মদত দেয়। ‘অগ্রগতি’কে ও বলে আমার প্রথম ভালবাসা। বউ এ নিয়ে অজস্র খুনসুটি করে। করতেই পারে। প্রেম পুরনো, বিয়ে টাটকা। দুজনে দুজনের মধ্যে খুব নিমজ্জিত এখনও।

— তোমার কুসুমার চিঠি এসেছে।

— দেখি।

এ সময়ে ‘কুসুমা’ নামটি ওর মনে অস্বস্তি জাগায়। মোটামুটি ঠিক হয়ে গেছে, মুর্শিদাবাদে এক মরা নদীর সোঁতা থেকে যে বৃহৎ পাথুরে গণেশ মূর্তি মিলেছে, যা গ্রামবাসীরা পুজো করতে শুরু করেছে, তার পাদপীঠে ‘রাজা কর্ণদেব’ লেখাটি বিষয়ে ও সহৃদয় সচিত্র-সংবাদ লিখবে। এই গণেশের চার হাতে অস্ত্র, গজচক্ষু অতি নির্মম এবং দেবতার যোদ্ধা মূর্তি। প্রত্নতত্ত্ব কিছুদূর পড়েছিল। অতএব ওই যোগ্যতম হবে।

দেখেছিল, ও দেখেছিল কাগজে সংক্ষিপ্ত সংবাদ। গ্রামের খবর বড় কাগজ তেমন বিশদ দেয় না। গ্রামের জীবনমরণ সংবাদ বড় কাগজে বড় খবরের নিচে স্যান্ডুইচ হয়ে যায়। কাগজে সংক্ষেপে লিখেছিল, ‘মইষানী গ্রামের সমাজসেবী অর্জন মহান্তিকে হত্যার পর সমাজবিরোধী দুষ্কৃতী খেলন সিং সর্দার ও আগন কিসকু পুলিসের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘর্ষে নিহত। অঞ্চলটি বিক্ষুব্ধ। আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষার্থে মইষানীতে মইষানীতে অস্থায়ী পুলিস চৌকি বসেছে।’ এ সব খবর পুরুলিয়াতে বসে দেবদত্ত মাস্টারই দেয় বলে ওর বিশ্বাস। ক’টা বড় কাগজ আর জেলা শহরে শহরে নিজস্ব প্রতিনিধি রাখে? দেবদত্ত মাস্টার স্থানীয় সংবাদ দেয় একটি কাগজে। মাস্টারি করে, চাষবাস ও সারের ব্যবসা আছে। মানবাজার-টু অঞ্চলে ও যায় না। খবরাখবর আনার জন্যে থানায় থানায় ওর যোগাযোগ আছে। দেবদত্তের খবরে নিহত লোকেরা সাধারণত ‘উগ্রপন্থী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী বা সমাজবিরোধী বা দুষ্কৃতী’ হয়ে থাকে। এভাবে খবর দিলে স্থানীয় অঞ্চলে নিজের নিরাপত্তা থাকে।

ও খবরটা দেখেই বুঝেছিল, কুসুমা আবার কলকাতার কাছে আসবে। ওর দরজা দিয়ে ঢুকে পড়বে, সেটা ও চাইছিল না। কিন্তু চাওয়া-পাওয়া তো মেলে না আজকাল। এখন একটা উত্তম-সুচিত্রায় আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। ‘চাওয়া-পাওয়া’ ছবিটি, সুযোগ পেলেই ও বউকে দেখিয়ে আনবে। ওর বউ মাত্র আটষট্টি সালে জন্মেছে। ও বড় হতে হতে বাংলা ছবির উজ্জ্বল দিনগুলি অস্ত গেছে। বউয়ের জন্যে ওর কষ্ট হয়, মমতা হয়। ভাবা যায়, সাতাত্তরে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এল যখন, ও বেচারা ক্লাস থ্রি-তে পড়ছে? শালপাতার ঠোঙায় শিঙাড়া বেচতেও দেখেনি।

চিঠিটা হাতে নিয়ে ও বউকে বলে, কুসুমা গ্রাম থেকে লোক আসবে। ওদেরকে যত্ন করো, জানলে? আমাকে ওরা খুব যত্ন করেছিল।

— ক’দিন থাকবে?

— দু-একদিন তো থাকতেই পারে।

— কলকাতা বেড়াতে আসছে?

— না…বেড়াতে নয়…

— তোমার কাছে? সেই তুমি ওদের কথা লিখেছিলে, তাই না? আবার যেতে বলবে।

— তাই মনে হয়। দেখা যাক।

— বড় বাসন বলতে নেই। ভাতের হাঁড়িটা…

— মাসিমার কাছে চেয়ে নাও।

— শোবে কোথায়?

— এখানেই। বেতের সোফা ঠেলে ঠুলে…

না। সব কিছু বড্ডদু’জনার মাপে এ বাড়িতে। একটি শোবার ঘর, একফালি বসার ঘর, এতটুকু বাথরুম। কিন্তু চারশো টাকায় এ বাড়ি তো এখন পাওয়া যাবে না। ও দশ বছর আগে ঢুকে পড়েছিল বলে বেঁচে গেছে। তখন বয়স ছিল একুশ, এখন একত্রিশ।

কুসুমা কলকাতা থেকে অনেক, অনেক দূরে।

প্রথমবার ও কুসুমা গিয়েছিল শীর্ণকায়া ক্ষীণস্রোতা চাকা ও কুমারী নদী সঙ্গমে টুসু পরব দেখতে। পুরুলিয়া শহরে ও কলেজের বন্ধু, শহরে ওষুধ দোকানি সুদীপ্তর বাড়িতে মাংস-ভাত খাচ্ছিল। ক্যাসেটে টুসু ও ভাদু শুনছিল। সায়েন্স সেন্টারে টুসু-ক্যাসেট দেখছিল। সুদীপ্ত বলল, পুরুলিয়া দেখতে চাও তো মানবাজার-টু যাও। ঠাকুরদাস রাজোয়াড় মইষানী যাবে, ওর সঙ্গে যাও।

— খুব সুন্দর?

— স্বচক্ষে দেখ।

ঠাকুরদাস রাজোয়াড় বলেছিল, মানবাজার-টু জিলার ম্যাপে নাই। আর কুসুমা, দাড়কা, বরাকাটা, মানবাজার-টু’র ম্যাপে নাই। সদরে কেউ আমাদের আমল দেয় না। আমরা তো নাই-মানুষ।

ওর মনে হয়েছিল এটা কথার কথা। কিন্তু মানবাজার পেরোবার পর ওর সন্দেহ থাকেনি যে, এ জায়গা ভূগোলের বাইরে। পথ বলতে প্রান্তর, হাওয়ার নাম তীব্র শীত, ছোট ছোট পাহাড়, ডুংরি, কিছু গাছ। সবটাই ধু-ধু। দোকান, বাজার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, শ্যালো-সেবিত খেত, গ্রাম, কিছুই চোখে পড়ে না।

ঠাকুরদাস রাজোয়াড় ওকে কুসুমা নিয়ে যায়। ওরাংদের গ্রাম বটে। ওরাং পাড়াটাই বড়। ঠাকুরদাসের বাবা রক্তপত্র কুসুম গাছের বন দেখেছে। তখন এখানে লাক্ষা চাষ হত। কুসুম গাছ থেকে প্রাপ্ত লাক্ষা খুব উঁচুমানের। পলাশ গাছের লাক্ষা সে তুলনায় নিরেস। ঠাকুরদাস যখন কিশোর বালক, তখনি ‘জমিদারি চলে যাবে’ জেনে জমিদার ও রাজারা বন-কে-বন কেটে গাছ ও জমি বেচে দেয়। এ কুসুমা এখন কঙ্কাল হয়ে গেছে। মাটির হাড় বেরিয়ে গেছে। দেখুন কেন? মইষানী মায়ের মাহাত্ম্যও আর নেই। পঞ্চায়েত করল বটে গরমেন, মইষানী মা-ও পঞ্চায়েতের হাতে জব্দ।

রাজোয়াড় বলে। মহিষ বলি যদি বন্ধ, তবে মইষানী মা-র পেট ভরে কীসে?

রাজোয়াড়ের গায়ে টেরিকটের দীর্ঘ না-কাচা দুর্গন্ধ পাঞ্জাবি, পায়ে টাটার মুচির তৈরি মোশিনদার জুতো, হাতের ঘড়ি দেখে ওর মনে যদি-বা সন্দেহ উঁকি দিয়ে থাকে, রাজোয়াড় তা ধরে ফেলে। তিন পুরুষে এক ব্যবসা। জঙ্গল ডাকো, গাছ কাটো। এখন জঙ্গল নেই, ধানের ব্যবসায় আছে ও। কিন্তু কাগজের লোক এসেছেন যখন, তখন দেখে যান, লিখুন।

কুসুমা মানবাজারে নাই, মানবাজার পুরুলিয়ায় নাই, পুরুলিয়া রাজ্যে নাই, তবে আমরা নাই-মানুষ বটে?

চাকা ও কুমারী নদীর সঙ্গমে টুসু ভাসান ছিল আশ্চর্য রমণীয়। নিচু পাহাড়, শীর্ণ নদী, মাঝে মাঝে গাছ। এ জায়গা যে কোনও অরণ্যভূম হতে পারত। রাজোয়াড় ওর আসার উদ্দেশ্য বিবৃতি করে। বলে, শহর হতে মানুষ এলেই মন্দ হয় না। মন্দ হলে সুদীপ্তবাবু পাঠাত না। লে বিমল! কি করবি কর। দেখে নিন। এটা হয় বিমল ওরাং, এটা ওর বোন সুনীতি! ইনি উত্তম সিং সর্দার, ভূমিজ বটেন। তা কাকা! খেলনটার সংবাদ পেলে কি বা?

শীর্ণ দেহে, মাথায় পগ বাঁধা উত্তম মাথা নেড়েছিল।

— আর সে ঘরে থাকে? যায় আসে, আসে যায়।

বিমল ওরাংয়ের চুল কটাশে, মুখ সলজ্জ হাসি মাখা। রাজোয়াড় বলেছিল, ইস্কুল একটা চালাচ্ছে, তা সরকার মজুরি দেয় না। ওর ঘরেই থাকবেন আজ্ঞা। বিমল রে! আমি চাল, গুড়, আলু দিয়ে যাব। বাবুকে খাওয়াস।

বিমল ওকে অবাক করে বলেছিল, চাষজমিতে ইটভাটা আপনি লিখেছিলেন, আমি পড়েছি। সে বীরভূমে, নয়?

মানবাজার-টু অঞ্চলে দুটি প্রাচীন জলধারার সঙ্গমে, তীব্র ও হা হা বাতাস ও টুসু বিদায়ের সঙ্গীত শুনতে শুনতে ‘আমি পড়েছি’ কথাটি ওর মনের দরজায় ঘা দেয়। নিমেষে ওদের মধ্যে তখনকার মতো গভীর কামারাদোরি স্থাপিত হয়। সুনীতি, বিমলের বোন বলেছিল, ফটো তুলুন।

সুনীতির হাসি মুখ, বিমলের মতোই কটাশে চুল। পরে ও দেখে, কুসুমার মানুষজন, বিশেষ করে তিপ্পান্ন ঘর ওরাংদের চুল পিংলা। বিমল বলেছিল, ইটভাটায় কাজ, চুল জ্বলে যায়। — তারপর মাচায় রক্ষিত টিনের বাক্স থেকে তাড়াবন্দী কাগজ বের করে কুণ্ঠিত গলায় বলেছিল, ‘সব আমাদের। ভূমিজদের, রাজোয়াড়দের, তিন ঘর মাহাতোদের জমি, জানেন? সবই আপার কাস্ট লোকরা, নিয়ে নিয়েছে। আইন করেছে সরকার, কিছু তো হয় না।

‘মূল দাতা, মূল গ্রহীতা, দাখিল কোবালা, দাগ নং, পূর্বাধিকার বশে, রায়তী’, এমন সব অচেনা শব্দে হারিয়ে যায় ও। সবিনয় অস্বস্তিতে বলেছিল, ‘জমির ব্যাপার আমি কিছু বুঝি না। সুদীপ্তকে জিজ্ঞেস করব,— তারপর জানাব। কলকাতায় এলে বরং…’

জমি তো পুরুলিয়ার।

— দেখব জিজ্ঞেস করে।

বিমল ঈষৎ হেসে বলেছিল, হবার নয়, জানলেন?

ও বুঝিয়েছিল, আইনের পথেই যেতে হয়। প্রশাসনকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে হয়। সমাজ ও শাসন ব্যবস্থা অতীব পচা, ঘুণ ধরা। তবু সিস্টেমকে ব্যবহার করা ছাড়া কি উপায় আছে? এ সব নিয়ে তো কোনও আন্দোলন নেই…

বিমল তৃষিত আগ্রহে ওর কথাগুলি শুনেছিল। নিঃশ্বাস ফেলে বলেছিল, লেখাপড়া সামান্য আমার আছে, বুদ্ধি দেওয়ার লোক নেই। তেমন হলে রাজোয়াড়ের কাছে যাই। ওই বা কী করবে।

পঞ্চায়েত সদস্য বটে, তবে বিরোধী রাজনীতি করত, কেউ বিশ্বাস করে না।

— কুসুমার কথা মনে থাকবে আমার।

বিমল ওর দিকে চেয়ে অসীম মমতায় বলেছিল, আপনারা গ্রাম দেখেন না, দেখলে কষ্ট পান। কুসুমার কথা কেউ শোনে না। কুসুমা যেন মানবাজারে নয়। মানবাজার-টু যেন পুরুলিয়ায় নয়। পুরুলিয়া যে এই রাজ্যে, তাও তো সরকার ভুলে আছে। নইলে গ্রামের পর গ্রাম। একটা কুয়া দেয় না!

সুনীতি বলেছিল, এবার তোরা খা দাদা। আমার ঘুম লেগেছে। রাত কত হল দেখিস না?

পরদিন ও চলে আসে। সুনীতি বলেছিল, মাঘ মাসে আসবেন, পিঠা খাওয়াব। মুড়ির চাকা!

— আসব।

কিন্তু সামনে থাকলে বড় বেদনার মতো প্রাণে বাজে কুসুমা। কলকাতা চলে এলে সব অলীক হয়ে যায়। পথ নেই, জল নেই, পাহাড় ডুংরি, দুটি প্রাচীন জলধারার সঙ্গম, টুসু ভাসান, একদা কুসুম গাছের বন ছিল, এখন শ্মশান যেন, অবাস্তব মনে হয়। পশ্চিমবঙ্গ নয় ওটা। নাই-মানুষদের দেশ।

কলকাতা, আরও আরও অ্যাসাইনমেন্ট। এর মধ্যে বন্ধুর বোনকে বিয়ে করে ফেলল। প্রেম আগে, বিয়ে পরে। আর ওর বউ যখন গানের দলের সঙ্গে রেডিওতে গাইছে, চির নূতনেরে দিল ডাক, সে সময়েই বিমলের চিঠি আসে, একবার দেখে না লিখলে কিছু হবার নয়।

আজ মনে পড়ে, সে চিঠিতে বিমল ‘মাধব দস্তিদার স্ট্রিট’ লিখেছিল। এবার ভুল করল কেন কি ভাবে? সম্ভবত মন অস্থির ছিল। বিমলের হাতের লেখা খুব সুন্দর। ‘বাংলায় কপি লিখুন’ বই থেকে ও সযত্নে মকশ করে করে হাতের লেখা উন্নত করেছিল।

বউয়ের গান শুনে, বউকে বাপের বাড়ি রেখে ও পুরুলিয়া চলে আসে। ঝাড়গ্রাম-ঝিলিমিলি-রামায়ণ-মিনিবাস-বিশপাহাড়ি ঘুরে তবে কুসুমা। প্রখর তপন তাপে খুবই কষ্ট হয়। পুড়তে পুড়তে আসা। সিনেমায় দেখা অদ্ভুত যোগাযোগের মতো বিশপাহাড়িতে আবার ঠাকুরদাস রাজোয়াড়ের সঙ্গে দেখা হয়। ঠাকুরদাস ওকে মুদির বাড়ি নিয়ে যায়। আমার কুটুম্ব বটে! সেখানে ইঁদারার জলে স্নান করে, গুড়ের শরবত খায়। তারপর ডাল ও পোস্তবড়া দিয়ে মুড়ি। ঠাকুরদাসই ওকে বিশপাহাড়িতে আটকে রাখে। খরাপোড়া অঞ্চলে রাতে চলাফেরা করা নিরাপদ নয়, কে ডাং মেরে সাইকেল, ঝোলা নিয়ে নেবে।

বিশপাহাড়ির নাকি ব্যবসায়িক গুরুত্ব আছে। বিশ বা ততোধিক নাতিউচ্চ পাহাড়ে অত্যুৎকৃষ্ট পাথর মেলে। সেগুলি লিজ নিয়ে যশপাল কোম্পানি (রাঁচি-কেন্দ্রিক) পাথর কাটায়, লরিতে নিয়ে যায়। এ জন্য পথ যোগাযোগও আছে। বাইরের লোক আসে যায়। ডাং মেরে লুটতরাজ খুব বেড়েছে।

রাজোয়াড় বলে, ফাঁড়ি নেই, থানা নেই। চোর-ডাকাতের চাষ খুব। হবে না কেন? মানবাজার-টু তো জেলার ম্যাপে নেই। আর জেলাটা রাজ্যের ম্যাপে ঢুকাতেই পারল না কেউ। শুনছি, এ বছর কত কোটি টাকা জেলায় এসেছে, জল দেবে। কে দেবে?

ওর কুটুম্ব মুদি বলে, ঘুম যান। এ সময়ে কথা থেকে আগুন লাগে বেশি। মইষানী মা গো! বলে ও ঘুমিয়ে পড়ে।

গতবার এক কুসুমা দেখেছিল, সেও উৎসবের শেষ প্রহরে। এবার যে কুসুমায় প্রত্যুষে ঢোকে ও, তার গা থেকে সবুজের সব চিহ্ন নিঃশেষ। পাহাড়ডুংরির চেহারা আদিম। গাছগুলি নিষ্পত্র কঙ্কাল। রাজোয়াড় বলে, খরা বছর বছর। এমন খরা…

ছোট ছোট খেতে কিছু ধানগাছ খড় হয়ে আছে। বিমল ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। বলে, চলেন, ওঠান ছবি। — বিমলের ঘরেই বসে অর্গানাইজিং স্কুল। ঘরের ফাটা-চটা-দেওয়ালে পরিবার পরিকল্পনার পোস্টার সাঁটা, ছবি তুলুন। প্রাথমিক অননুমোদিত বিদ্যালয় (১৯৭৪) ছবি তুলুন। ওই দেখুন, চাকা আর কুমারীর মিলন ওটা। মেয়েরা বালি কেটে জল নিচ্ছে। আর দেখুন মেয়ে পুরুষ সব জল নিয়ে আসছে। ফটো উঠান। আসুন। টিলায় উঠুন।

টিলায় উঠে ও মরীচিকা দেখেছিল। শেষ বৈশাখের সূর্য জ্বলতে জ্বলতে পুব আকাশে উঠছে। প্রান্তরের ওপারে এক কাকচক্ষু দিঘি। শ্যালো-সেবিত সবুজ ধানখেত। এক ইউক্যালিপটাস বাগান। ফাঁকে ফাঁকে কাঁচা পাকা ঘর। মন্দিরের চূড়া। আরও দূরে পশ্চিমে ইটভাটা, গ্রাম থেকে দূরে।

— ফটো উঠান। ওই বাগান পর্জন্যবাবুর। ওটা মইষানী। ওই দিঘি তার নিজের। ওতে ভূমিজ-ওরাং সাত জাতের দু’পয়সা থেকে সওয়া চার আনা অংশ আছে। উনি মানে না। দিঘির জল… ধরতে দেয় না। শেষ প্রহরে মেয়েমানুষ জল আনে। আর রাতে যেয়ে চোরের মতো স্নান করে।

— ওই জলে…

— খাই। রাঁধি। বালির বুকেও এ বছর… নামুন।

নেমো ওরা চাকা ও কুমারীর ‘মেলন’ থেকে কিছু দূরে শুকনো কাঁসি ঘাসের ঝোপ দেখেছিল। একটি ফলক। বিধানসভার সদস্য ১৯৮৪ সালে সেতু নির্মাণ সূচনা করলেন।

— ফটো উঠান। গরমে শুকনা, বর্ষায় ঢলকা বান, এপার-ওপার করা যায় না। লিখে দেবেন এই সেতু এগারো লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়ে গেছে।

— কোথায় সেতু?

— হাতই পড়েনি।

তারপর সনিঃশ্বাসে বলে, বিশপাহাড়িতে আরেকটা প্রাইমারি করে দিল। কুসুমার স্কুলটা অনুমোদন করল না।

রাজোয়াড় বলল, পর্জন্যবাবুর খেলা!

— পর্জন্যবাবু কি এম এল এ?

বিমল শুকনো গলায় বলে, এমেলে, এম পি, মানবাজার টু-তে ঢুকে না। ক্ষমতাও রাখে না। মন্ত্রীও ঢুকে না, কোনও ক্ষমতাও রাখে না। পর্জন্যবাবু প্রাইমারি পাস করে নাই, স্কুলের কথা শুনে না। সে পঞ্চায়েত প্রধান ছিল, বর্তমান অঞ্চল প্রধান শশধরবাবু ওরই জ্ঞাতি। সে শিখণ্ডী। ছড়ি পর্জন্যবাবুর হাতে।

— চলুন… সব লিখে নিই।

— আর কী লিখবেন?

রাজোয়াড় বলে। পর্জন্যবাবু পনেরো বছরে চারবার দল বদল করল। এখানকার মানুষ বলে প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী দূরে থাক। আমাদের রাজাবাদশা পর্জন্যবাবু। ঠিকই বলে।খুন-জখম— পরের জমি দখল— পঞ্চায়েতের টাকা লুট, কী করে না সে? থানা যার বশে, তার ক্ষমতা….

ও নোট নিচ্ছিল। ছবি তুলছিল। তারপর গ্রামের পাঁচজনকে ডেকে সব শুনবে, কেউ আসছিল না। বিমল বলল, সন্ধ্যার পর আসবে।

সন্ধের পর আরও পাঁচ-সাত জনই এল। সকলে উত্তম সিং সর্দারের দিকে বারবার চাইছিল। বিমলই কথা বলল।

— কুয়া নাই, খাবার জল মিলে না।

জমি তো সকলেরই গিয়েছে। যাও বা কিছু আছে, চাষের জন্য বাঁধ (পুকুর) দিত, কুয়া দিত…

— মইষানী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডাক্তার থাকে না। বিশপাহাড়িতে যেতে হয়, তা ডাক্তার আছে তো ওষুধ নাই। এই খরার পর বর্ষা নামলে খালখন্দের জল খাবে আর পেটের রোগ।

রোগা, অসহায়, বিপন্ন মানুষগুলি। সুনীতি এক সময়ে একটি কলসি ও ঘটি রেখে যায়। উত্তম সিং সর্দার এখন বলে, কুসুমাকে কিছু দিতে দিবে না পর্জন্যবাবু।

ভীষণ কোনও দুঃসংবাদ দিচ্ছে, এমন গলায় বৃদ্ধ হলদেটে চোখ দুটি ওর চোখে রেখে উত্তম বলে। নাই-নাই-নাই আর চাই-চাই-চাই, এত অধজ্জ হঞে হামার বেটা খেলনটো বিশপাহাড়ির আগন কিসকুর সাথকে যেঞে সবুজ ঝান্ডাটা উঠাইন দিল, তা আর কিছু দেয় গরমেন? একান্ন ঘর ওরাং, সাত ঘর ভূমিজ, তিন ঘর রাজোয়াড়। তিন ঘর মাহাতো, চার ঘর মাহালি, আটষট্টি ঘর হামরা, পজ্জন্যবাবুর চক্ষে হরা ঝান্ডা হঞে আছি। ভুট উনদের দিই। তবুও…

বিমল বলল, খেলন তো গ্রামে আসে না। সে যখন ঝাড়খণ্ড করে নাই, তখন ক’টা কুয়া দিল? পঞ্চায়েত হতে কাকে কাজ দেয়?

— আরেলিজিপিতে কাজ দেয় না?

— না। ওর ইটভাটা। ওর খেত, সেখানে খাটি।

— আপনিও?

বিমল নিরানন্দ হেসেছিল।

— স্কুল করতে যেয়ে আমি ওর বিষচক্ষে আছি। কাজ দিলে করি। নইলে বিশপাহাড়ি যাই।

— পর্জন্যবাবু… কাল যাব একবার।

— এখন ডরায়। খেলন ওর ইউক্যালিপটাস বাগান কেটে দেবে। আগনরা তো বন্দোয়ানে যেয়ে ‘জঙ্গল বাঁচাও’ কমিটি করেছে। এসবই ওর কথা।

রাজোয়াড় বলল, লিখে কিছু হবে?

ও বলতে পারেনি, ‘কলম তরবারির চেয়ে ক্ষমতা ধরে’। বুঝেছিল, পঞ্চায়েত গ্রামে গ্রামে ক্ষমতা ও অর্থের ফোর্টনকস তৈরি করে ফেলছে। তবু, তার হাতিয়ার তো ক্যামেরা ও কলম। তাছাড়া, প্রশাসনিক প্রতিকার চাওয়া ছাড়া কী উপায় আছে?

— চেষ্টা তো করতে হবে।

রাতে সুনীতির বেড়ে দেওয়া ভাত ও খেসারি চচ্চড়ি খেতে ওর মাথা কাটা যাচ্ছিল। বিমল বলল, ভাববেন না। আমিও কাজ করি, বিশপাহাড়িতে ডাকঘরের সামনে বসি। আজকাল লোনের ফর্ম ভর্তি করার কাজ পাই। সুনীতিও রোজগার করে।

— ইটভাটায়?

— হ্যাঁ, ওরা বহেলা। মাটি বয়।

— বাড়িতে আপনারা দু’জন?

— আপাতত তাই। সুনীতির বিয়ে হয়ে গেলে…. চটপট খেয়ে নিন। কেরোসিনের লন্ঠন বেশিক্ষণ জ্বালানো… তেল পোড়ানো… আমরা কোথায় আছি তাই ভাবি! স্নান করবেন?

— কোথায়?

— চুরি করে, ওই বাঁধে।

রাতে ক্ষেত্রপাল ওরাংকে ডেকে নিয়ে তাকে ঝোলা পাহারায় রেখে গামছা পরে স্নান করার স্মৃতি এখনও সজীব। চিত সাঁতার দিতে আকাশ যেন নেমে এসেছিল তারা ছেটানো চাদর উড়িয়ে। আর বাড়ি ফিরতে সুনীতি ওকে অবাক করে দিয়েছিল খোঁপায় একটি সাদা পদ্ম দেখিয়ে।

— পদ্মফুল?

— ভাটা হতে আসতে চানটা করে নিলাম, পদ্ম তুলে আনলাম তখনই।

— এখন তো পদ্ম ফোটে না?

বিমল বলেছিল, এখানে ফোটে। গরম কালে এমন ছোট ছোট পদ্ম ফোটে। গেঁড় থেকে হয়ত। একটা গেঁড় কোনও মতে বাঁধে পড়ল তো বাঁধ যতদিন, পদ্ম ততদিন।

সকালে পর্জন্যবাবুর বাড়ি, সে আরেক অভিজ্ঞতা। ঘরে দোরে বর্বর ঐশ্বর্যের সব নিদর্শনই ছিল। দেওয়ালে লেনিন মার্কসের সঙ্গে তারকেশ্বরের শিব ও দিল্লির পার্লামেন্ট ভবনের ছবি। টেবিলে টেলিভিশনের খোল। পাশের ঘরে নানা মাপের বস্তা, সব মাল বোঝাই। কিন্তু দরজাটি কাঠখোদাই। নানা নকশা উৎকীর্ণ, অতি সুন্দর।

বিমল আর ঠাকুরদাসকে পর্জন্যবাবু বলে, কলকাতার রিপোটার, রাখলে কোথা, খাওয়ালে কী! তোমরা আমার কত বেইজ্জত করবে তাই ভাবি। বসুন। তোমরাও…. বোস।

ও কুসুমার কথা বলতে শুরু করতে পর্জন্যবাবু ওকে চমকে দিয়ে গর্জে ওঠে, ব্রিজ করার আমি কংরেস করতাম, বলতে পারব না। আর ওসব কথা আমি জানি… এখানে আমি ছাড়া কেউ কাজের গতি বোঝে না।

— আর এল ই জি পি-র কাজ এরা পায় না কেন?

— ওই যে ভামভেকুড় অর্জনটা অঞ্চল প্রধান হয়েছে। তাও কুসুমাকে ভুলিনি আমি। এবারে কুয়ো একটা কেন, দুটো দেব। আর চাকা নদীর জোড়বাঁধটা…..

বিমল বলে, সার! আপনি তো সেদিনও ছিলেন…

— আমি তো পাবলিকের কাজ করি। দাড়কা, বরাকাটা, কুসুমবনি, পেঁড়ারা, এসব গ্রামকে দিয়ে থুয়ে… আর বিমল! ইস্কুল ইস্কুল করে মেতে রইলে, চৌকিদারি কাজ তোমাকে দিতে চাইনি? তুমি বললে, বোন একলা থাকবে। সব্বনাশটি করল খেলন! ও হো হো হো! আমার কাছে ধান বাড়ি নিয়ে তোর বাপ খায়। আর তুই!

— উত্তমের জমিটা যে থাকল না।

— সে উত্তম আদালতে যাক।

ও তাড়াতাড়ি বলে, মইষানী তো বড় গ্রাম।

— হ্যাঁ, হ্যাঁ, পাহাড় ক’টা লিজ নিতে পারলে মইষানী টাউন হয়ে যাবে। ভেরি ব্যাকওয়াড যাকে বলে।

— মন্দিরটাও সুন্দর।

— পাঁচ সাত হাজার বছরের মন্দির! মা মইষানী বুনো মোষ চেপে ঘুরত। সাক্ষাৎ দুর্গা। এখানে যে যা চায়… আগে মহিষ বলি হত, এখন অষ্টমীতে পঞ্চাশটা পাঁঠা পড়ে। আমরা সেবাইত বটি। আমাদের যা, সবই ওঁয়ার। নিন। চা খান। বিমল নে, খাও হে রাজোয়াড়। রাজোয়াড় কি কম ভেকুড়? একসঙ্গে কংরেস করেছি। আমি এলাম তাও দু’বছর পড়ে থাকল, তা বাদে ওর দাদা কাটা পড়তে তবে…

— আপনার দরজাটার একটা ছবি নেব। বাড়িটাও পুরনো, ছবি নিলে আপত্তি আছে?

এতাবধি সব ঠিক ছিল। কিন্তু হঠাৎ বাটিকছাপ লুঙ্গি গুটিয়ে বেরিয়ে আসে বান্টি মহান্তি, পিতৃদত্ত নাম যার উৎসব। লাল চোখ কড়কে বলে। ফটো লিবেল নাই। বর্জুয়া কাগজে ফটো দিব না। — বাপকে বলে বর্জুয়া পাট্টি করতে এখনও পীরিত ছাড় নাই। বর্জুয়া কাগজের রিপোট আমরা মানি না। কুসুমা! ঝাড়খণ্ড হয়েছে, হঞে যাক।

রাজোয়াড় বলে, একা খেলন!

— উ শালোই সভেরে টানব্যেক।

বিমল বলে, চলুন।

— মন্দিরটার একটা ছবি তুলি।

— তুলুন। পর্জন্যবাবুর সম্পত্তির হিসেব আমি দিয়ে দিব।

— সব যে লিখব ভাই, আপনাদের কোনও…..

— এটাই সময়। খরা দেখতে মন্ত্রী আসছে।

ফেরার সময় সুনীতি বলেছিল, আবার আসবেন। বউদিকে আনবেন। ভুলবেন না।

বিমল বলেছিল, বিয়ে হলে ক্ষেত্রপাল আর সুনীতিকে বড় ঘরটা লিখে দেব। বাড়িতে লোক বাড়বে।

— আপনি বিয়ে করবেন না?

— হয় তো করব।

ফেরে ও মানবাজার হয়ে। কলকাতায় ফিরে ‘মানব সৃষ্ট খরা’ বলে কুসুমা-সহ কয়েকটি গ্রামের রিপোর্ট খুব মর্মগ্রাহী ভাষায় লেখে। দুই কিস্তিতে লেখা বেরয়। শেষে লেখে কুসুমা মানবাজারের ম্যাপে, মানবাজার-টু পুরুলিয়ার ম্যাপে, এবং পুরুলিয়া পশ্চিমবঙ্গের ম্যাপে না এলে অঞ্চলটি থেকে মধ্য যুগ কাটবে না। জলের ব্যাপারটার ওপর খুব জোর দেয় এবং ফলাফল জানার জন্যে ব্যস্ত থাকে।

বিমল সানন্দে লেখে, লেখাটি জেরক্স করে আমরা সদরে ডেপুটেশন দেই। অবশেষে কুসুমাতে একটি কুয়া ও একটি বাঁধ হচ্ছে। শুনছি জোড় বাঁধের কাজও শুরু হবে। বলা দরকার এই জোড় বাঁধ হলে চারপাশে বহু গরিব চাষী উপকার পাবে। ১৯৭৩ সালে এই জোড় বাঁধ প্রকল্প মঞ্জুর হয় এবং কাজ শুরু হয়। কিন্তু কাজের প্রথম অবস্থাতেই তৎকালীন এমেলে, যাঁর চেষ্টায় কাজ শুরু হয় তিনি হৃদরোগে মারা যান। কাজটি পরিত্যক্ত ছিল। কাগজে বের হয়েছে বলে কিছু উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।

ও বিমলের চিঠি বার্তা সম্পাদককে দেখায়। বার্তা সম্পাদক বলেন, রাজনীতিতে জড়িয়ে পোড়ো না যেন।

ও তো জানত না। পর্জন্য মহান্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তির হিসেব, পর্জন্যর ঘন ঘন ঝান্ডা বদল। এসব লিখে ও কুসুমাকে খুব বিপন্ন করেছে। ওর মনে হয়েছিল, সরকারি প্রশাসনের সঙ্গে ওই নাই-মানুষের দেশের দূরত্ব ঘুচছে না বলেই উত্তমের ছেলেটি সবুজ ঝান্ডা তুলে নিয়ে আগন কিসকুর কাছে চলে গেল। নাই-নাই-নাই আর চাই-চাই-চাই, কিছুই যখন শুনতে রাজি নয় কেউ, তখন আগনরা মরিয়া হয়ে উঠতেই পারে।

এরপর কুসুমা গ্রাম ওর মন থেকে দূরে চলে যায়, হারিয়ে যায় না। ও বউকে বলেছিল, যাক, কুসুমা মানবাজার-টু-র ম্যাপে উঠল। এখন মানবাজার পুরুলিয়ার ম্যাপে আসুক, পুরুলিয়া পশ্চিমবঙ্গের ম্যাপে উঠুক, সবই তো দরকার। একজন ফ্রি-লানস ফটো-সাংবাদিক আর কতটুকু ক্ষমতা ধরে!

ওর রিপোর্টের অন্যান্য প্রতিক্রিয়াও হয়। মহিষমর্দিনী না মইষানী, এই নিয়ে একজন উদাত্ত প্রবন্ধ লেখেন। ‘সামার ভ্যারাইটি লোটাস’ নিয়ে চিঠি বেরোয়। বিমল পোস্টকার্ডে লেখে, মইষানী দেখতে মাঝে মাঝে লোক আসছে। সম্ভবত কাছে একটি মৃগদাব হবে।

তারপর সংবাদপত্রে খেলন ও আগনের…

কাগজের কাটিংটি ও আবার পড়ে। একা বিমল আসছে, না নিহত খেলন ও আগনকেও নিয়ে আসছে? বাঁকুড়ার ঘোড়া, পুরুলিয়ার ছৌ মুখোশ, বেলেতোড়ের মনসাঘট, ইত্যাদিতে ঠাসা ওর ঘরে কতজনের জায়গা হবে? উত্তম সিং সর্দাররা বৈশাখী পদ্মের সামিয়ানা করে একবার ভূমিজ বিদ্রোহী নেতা গঙ্গানারায়ণ সিং-কে স্মরণ করেছিল। খেলন ভীষণ ক্রোধে বলেছিল, সব জুলাইন দিতে হবে। মাঙলে কেও ভিখ দিবে না হে। আর কিসকুরা তো আদিম অরণ্য বাঁচাতে হবে বলে জঙ্গলের পেটে ঢুকে যায়। আদিম অরণ্য বাঁচানো সরকারি নীতি কিন্তু অরণ্যের অধিকার যে চেয়েছে সেই বড় চিহ্নিত হয়ে যায়। জমিভূমি-জল-পথ-স্কুল-চিকিৎসা ব্যবস্থা— পঞ্চায়েতের নিরপেক্ষ সুবিচার। কিছু পায় না বলেই কি নাই-মানুষেরা ‘আছি-মানুষ’ প্রমাণ করার জন্য মরিয়া হয়?

বিমল ও রাজোয়াড় যখন ঢোকে ওর ঘরে, বোঝা যায় ওরা কোন সংবাদের শব বয়ে এনেছে। বিমল জ্বলে গেছে আগাগোড়া। সলাজ মিতভাষিতা, মৃদুকথা, সবই দাহ করে এসেছে ও। জ্বলাপোড়া, গম্ভীর, সন্ধিগ্ধ বিমল, চুল ও চোখ যেন জ্বলছে। রাজোয়াড় ওর দিকে একবার চায়, মাথা নাড়ে, স্বগত বলে, মইষানী মা গো! — তারপর বলে, জল খাব একটু।

ওর বউ জগে জল ও একটি গেলাস রেখে যায়।

— আমার বউ।

— নমস্কার বউমা।

— নমস্কার। আপনারা বসুন। জিরোন। তারপর স্নান করবেন। রান্না আমার হয়েই গেছে।

বিমল যেন ঈষৎ বিস্ময়ে সব দেখতে থাকে। দেখতে দেখতে বলে,

— নিজের কোঠা?

— না, ভাড়া বাড়ি।

— ভাড়া কত?

— চারশো টাকা।

রাজোয়াড় বলে, হতে পারে। পয়সা তো কলকাতায়।

— চল চল স্নান করবে। আমার আজ বেরনো নেই। খেয়েদেয়ে কথা বলা যাবে।

— আর কথা! মইষানী মা গো!

বিমল হঠাৎ যেন জেগে ওঠে ও বলে, হ্যাঁ রাজোয়াড়। ঝটপট না হলে ট্রেন ধরা যাবে না।

— আজকেই ফিরবে বিমল?

— আজই।

স্নান করে ওরা, শোবার ঘরের মেঝেতেই খেতে বসে। ওরা আসছে বলে ও কাটা মাছ এনেছিল। দুর্মূল্য পটল। বিমল খুব অন্যমনে খায়। ও বোঝে, বিমল বারবার খুব দূরে চলে যাচ্ছে, ফিরে আসছে। আবার চলে যাচ্ছে। কুসুমায় কি হয়েছিল? বউ বলে, আর একটু ভাত দিই?… বিমল জবাব দেয় না। রাজোয়াড় পাঁচ জাতের সঙ্গে ওঠে বসে। কলকাতায় এসেছে মিছিল- মিটিংয়ে। সে বলে, খুব খেলাম বউমা। এমন মাছ আমরা খাই না।

খেয়ে উঠে ওরা বাইরের ঘরে বসে।

— সুনীতি কেমন আছে?

— উয়ার ফটো লিব একটা।

বিমল সাধু বাংলা বলছে না এখন।

— ছি ছি। ছবিগুলো পাঠানোই হয়নি… দিচ্ছি। কি হয়েছিল বল তো? সব বলো।

— আপনি কাগজে লিখলেন…

— হ্যাঁ। কাজও তো হয়েছে কিছু জানালে।

— আকামটো বেশি হঞে গেল।

— কি রকম?

— সুনীতিটোরে… আগে মরাইন দিল… তা বাদে…

— কে? কে?

ও সাদা হয়ে যায়। ওর ঘর এখন ধুলো গুঁড়া, মাটি ফাটা কুসুমা হয়ে যায়।

— আপনার দোষ কি! কুসুমা তো দেশের মধ্যে নাই।

বিমল এখন সামনে চেয়ে থেকে সংবাদ পড়ে যায়।

কাগজে লেখা বেরোতে পর্জন্যবাবুর রাগ বেড়ে যায়। পঞ্চায়েতে নামে অর্জনবাবু, কাজে পর্জন্য। ওর সম্পত্তির হিসেব দেখেই ওর ক্রোধ। রহস্যজনকভাবে কুয়ার কাজ বন্ধ হয়ে যায়। খেলন খুব ক্ষেপে যায়। কিন্তু বিমল ওদের আইনের পথে চলতে বলে। পঞ্চায়েত থেকে ব্লক, ব্লক থেকে মহকুমা হাকিম। কিন্তু কুসুমার লোকরা খুব বিক্ষোভ দেখায়। ক্ষেত্রপাল বলে, পুরুলিয়ার জন্য এত কোটি টাকা। কুসুমায় কুয়া, বাঁধ হয় না?

বিমল বলে, কুসুমা তো নাই উয়াদের হিসাবে।

রাজোয়াড় বলে। গ্রামটা, নাই-গ্রাম। মানুষ, নাই-মানুষ।

আসা-যাওয়া চলছিল। চলছিল। এর মধ্যে অর্জনবাবু, যিনি নামে প্রধান ও কাজে ভাটা দেখে, তিনি ঘন ঘন সাইকেল চেপে কুসুমা আসছিল, মেয়েদের পান-সুপারি বিলাচ্ছিল। পান পরাগ… মাথায় দেবার তেল… বলছিল ভাটার কাজ যখন বন্ধ হবে বর্ষায় মেয়েরা কাপড় পাবে, পুরুষরা ধুতি।

এখন ওর মনে ‘অর্জন মহান্তিকে হত্যার’ পর শব্দগুলি লাফালাফি করতে থাকে।

— তিনিই তো খুন হয়েছেন?

সুনীতিকে বলেছিল, ইটভাটা বন্ধ হলে তোর কী? তোকে, ভুবনীকে, অষ্টমীকে, কয়েকজনকে পঞ্চায়েত থেকে কাজ দেব। আর সুনীতিরা ভয় পাচ্ছিল। এভাবে অর্জনবাবু কখনও কথা বলেনি আগে। মেয়ে খুঁজতে সে অন্যত্র যেত, কিন্তু এখন প্রধান পদটি তার অন্তরায়। কিছুদিন আগে কুসুমা ও মইষানীর মাঝামাঝি ওরাং পাড়ার কাছে এক শুকনো ডোবায় তার দা-কাটা মৃতদেহ, সাইকেল, পকেটে টাকা-খুচরো-বিড়ি-লাইটার-টর্চ পাওয়া যায়।

— তারপর?

— পর্জন্যবাবু বলল, ইয়ার শোধটো লিব।

— খেলনদের তো মেরেছে পুলিস…

— তুমি শুন, আমি বলি।

কুসুমা কাহিনীতে আগের সঙ্গে পরে মেলে না। অর্জনবাবু হত্যা কালে যদিও খেলন গ্রামে ছিল না। এ সময়ে সেই হয়ে যায় ‘হত্যা করে পলাতক প্রধান আসামি’। বারিচাঁচারি গ্রামে মিটিং করছিল খেলন ও আগন। অর্জনবাবু কান্ত ওরাংয়ের বউকে দিনের শেষে চেপে ধরে। ভুবনী আর্ত চেঁচায়। তবু হত্যার কারণ হয় ‘ইটভাটায় হপ্তা সংক্রান্ত গোলযোগ’। অর্জনবাবু খুন হওয়ার চতুর্থ দিনে অপঘাত মৃত্যু কারণে শ্রাদ্ধ হয়। পঞ্চম দিনে পর্জন্যবাবু, বান্টি ও দলবল, তিনটে বন্দুক নিয়ে একান্ন ঘর ওরাংকে গ্রামছাড়া করে।

মানবাজার থানা বিমলদের ডায়েরি নেয় না। কুন-অ দিন ল্যিল নাই, আমরা নাই-মানুষ বটি। চারদিন বাদে বিমলরা পর্জন্যবাবুর কাছে অনেক দরবার করে। পর্জন্যবাবু বলে, ফিরবে যদি, ঘর পিছু গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগি জরিমানা লিবে মইষানী মা! মায়ের সেবাইতকে মরাইন দিলি। বম্ভ পাতকী হলি। অর্জনের দেহাধার শুদ্ধ ছিল, উয়ার পরে মায়ের ভর উঠত।… বিমলরা দেখছিল প্রশাসনিক পথ বড় ঘোরাল। সিস্টেমকে ব্যবহার করা খুব কঠিন। ওরা ক্ষমতাসীন বড় দলের ভোটার। তবে হয়ত তেমন কিছু হবে না, এই মনে করে ওরা ফিরে আসে। এ ক’দিন যেসব গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিল সেখানেই গরু-ছাগল রেখে আসে।

এটাকে পর্জন্যবাবু অসীম ঔদ্ধত্য মনে করে। সে সন্ধ্যাতেই দিঘিতে স্নান করে উঠে আসার কালে পর্জন্যবাবু, বান্টি ও আট-দশ জন সুনীতি, ভুবনী ও অষ্টমীকে তুলে নিয়ে যায় ইটভাটার পিছনে। এটা প্রমাণ করার পথ নেই। থানায় লেখা আছে ওরা সেদিন পুরুলিয়া শহরে ছিল। বিমলরা অবশ্য রাত ন’টা নাগাদই সমবেত হয়ে দৌড়য়। ভাটার পিছনে লাগাতার ধর্ষিত অষ্টমী ও ভুবনীকে পাওয়া যায়, সুনীতিকে নয়। ঘটনাক্রমে সে রাতেই খেলন, আগনকে নিয়ে গ্রামে আসে। তারাও দৌড়য়। খেলন চেঁচায় একান্ন ঘর কি মরে গিছে? উ পরধান কি গরমেন হইন গিছে?

— সুনীতি?

— দিঘিতে ঝাঁপ দিয়েছিল পায়ে কাপড় বেঁধে।

— তারপর?

সুনীতির শবদেহ নিয়ে ওরা আগে পর্জন্যবাবুর কাছে যায়। তারা তখন থানাতে। তারপর থানা। খেলন ও আগন লিড দিয়েছিল। পর্জন্যবাবুর মাথায় লাঠি মেরেছিল। তাকে বাঁচাতে যেয়ে মেজবাবু চোট খায়। নিমেষে ব্যাপারটি ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্তৃক দুঃসাহসিক থানা আক্রমণ’ হয়ে যায় এবং বড়বাবু খেলন ও আগনকে গুলি করে।

কলকাতার এই ছোট ঘরে কুসুমা… দিঘি… সুনীতির শব… ইটভাটা… থানা

— এত সব হয়ে গেছে…

— আখুন, বাবু?

— এ তো ভয়ানক ব্যাপার। না লিখলে… কিন্তু লিখলে আবার কিছু… দেখ! সে লোক কি বাঁচতে দেবে কাউকে? গ্রামে এভাবে কায়েমি স্বার্থের খুঁটি… এত দূরে…

বিমল ঈষৎ হাসে।

— বাঁচি তো গিছে কিছু? ওই গরু-ছাগল-হাঁস? মইষানী মার জরিমানা দিল সুনীতি, খেলন, আগন! আর কিছু হারাবার ভয় করি না বাবু! (‘বাবু’ সম্বোধনও এই প্রথম) উয়াদের মরাইন দিল। একান্ন ঘর ভুট দেয়, তা আসামি করাইন দিল। এই লাও, অষ্টমী, ভুবনী জবানবন্দী দিচ্ছে, টিপা দিছে… আমাদের জবানবন্দী টিপা দিঞে সহি দিঞে, এই লাও। যদি ভাব লিখব কি না, তবে সিবার বা লিখলে কেনে?

বিমল নিঃশ্বাস ফেলে।

— ভয় নাই, সাহস নাই, মন যা বলে তাই করি। সুনীতিটো… ক্ষেতা বলে শোধ লিয়ে করব। খেলন আর আগনরে লিতে… বাপ রে! কত মানুষ ডিপটিশান দিছি, হাকিম জানে। সবাই ববা। মইষানী পূজা নয় বয়কট দিলাম। কিন্তু বিচারটো হবেইক নাই? পর্জন্যবাবুর উপর দেশে কেউ লাই রে?

— হ্যাঁ…

এখন রাইটার্সে জানানো… তারা কিছু করে কি না… তারা জানালেও থানা নড়ে কি না…

বিমল দাঁত পিষে বলে, সরকার বলে দিক আমরা নাই-দেশে না আছি-দেশে! নাই-মানুষ, না আছি-মানুষ! আমাদের তরে নাই-সরকার, না আছে-সরকার! কুসুমা কি নাই? তুমি দেখনাই? কাগজে লিখনাই? খেলনদের নাম কাগজে উঠে নাই? আইনের পথে কুসুমা চলে কি করবে বাবু? আইন তো ও বিবশ, পরাস্ত।

— হ্যাঁ বিমল… চেষ্টা করব…

এখন বিমল এ ঘরে ফিরে আসে।

— গা তুল হে রাজোয়াড়! তারা জানে মোরা সদরে গিছি। না ফিরলে কুসুমা একা পড়ে। আগন… খেলন… জাহানটো দিঞে গেল, আমরা কুন ধর্মে কলকাতায় থাকি?

সুনীতির ছবিটি নিয়ে বিমল চলে যায়, রাজোয়াড়।

ঘরে ও, কিছু কাগজপত্র, এবং কুসুমা।

ও বুঝতে পারে, কর্তব্য আছে, কর্তব্য থাকে, করতে হয়। মস্ত বড় কাজ, ও বড় সামান্য মানুষ।

একলা, একলা, একলা কি?

ঘরে কেন আদিম অরণ্য গন্ধ, যা নাকে ধরা পড়ে না। ঘরের বাতাসের শূন্যস্থান কারা ভরে ফেলছে?

ও বোঝে, কুসুমা ওর বিবেকে থাকতে এসেছে, যেতে আসেনি।

এটা অরণ্যপর্ব!

ও কাগজগুলো গোছাতে থাকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *