সন্তোষকুমার ঘোষ : চক্ষুলজ্জা
এই তো আমরা এসে পড়েছি। আমাদের বাড়ির মোড়ে। এই রিকশা, রোখকে।
আর একটু চলুক, চলুক না! কয় কদমই বা! ঠিক বাড়িটার সামনে নামলেই হবে।
না বাপু, নামি। চাপা রিকশা, তোমার পাশে ঘেঁষাঘেঁষি, চাপাচাপি—
ভাল লাগে না?
তা লাগে। গায়ে কেমন কাঁটা। আবার একটু একটু লজ্জাও করে।
অদ্ভুত তো। লজ্জা কী। পরপুরুষ পরস্ত্রী নই, আমরা তো স্বামীস্ত্রী।
কিন্তু লোকে দেখবে যে। ওদের চোখের সামনে— ছিঃ।
তোমার সব তাতেই বাড়াবাড়ি।
লাজলজ্জা ভাল নয়?
এতটা নয়। সব জায়গাতে নয়।
কী জানি। ওটা আমাদের ভূষণ, তাই তো জেনেছি।
বাড়াবাড়ির কথা বলছি।
একটু থাক, একটু থাক না। নইলে মানুষে আর কুকুর-বেড়ালে আর তফাত রইল কী?
বলতে বলতে রিকশা থামল। দরজার সামনেই, ঠিক। কথা কাটাকাটি করতে করতে লীলার খেয়াল ছিল না, চমকে চেয়ে দেখে, আর এই তো তাদের এক কামরার ফ্ল্যাটওয়ালা বসতবাড়ি।
ঠিক ঠিক ধরলে অবিশ্যি দেড় কি পৌনে দুই। কিন্তু ফালতু আসবাব আর জিনিসপত্তরে (বিয়েতে যা পেয়েছিল) আর রান্নার চিলতে জায়গা বের করতে বাড়তি তেকোনা ঘরটা ঠাসা ভর্তি। কলঘর অবিশ্যি একতলারই আর দু’ঘর ভাড়াটের সঙ্গে এজমালি।
ঘরে ঢুকেই কমলেন্দু তক্তপোশটায় টান টান হল। বাইরের জামাকাপড় বদলাবারও তর সয়নি। একটা চার্মস ঝাঁকিয়ে বের করে বলল, বাব্বা:! এতক্ষণে একটু আয়েশ-আরাম, খিলখোলা।
খিলখোলা কথাটা শুনেই লীলা দরজার ছিটকিনি এঁটে দিল তাড়াতাড়ি। আরাম তারও লাগছে। তার চেয়েও বেশি। ঘুমঘুম আমেজ।
সারা বিকেল সোজা চক্কর তো নয়। এই রোদ তো এই বৃষ্টি। সিনেমায় হাউস ফুল। তো চলো থিয়েটারে। আরেব্বাস, এ যে আর এক কাঠি। লম্বা লাইন, সাপের লেজ।
কমলেন্দু বলল, এখানে দাঁড়াব না। আমার পকেটে আজ অনেক টাকা। কড়কড়ে নোট, ক্যাশ। নীলু রেডিই রেখেছিল। এক ছুটে নিয়ে এলাম না? আমার হাতঘড়িটা ছুঁয়েও দেখল না, পরেও দেখল না, সরবেড়িয়ার চাষজমির ডিড-টা। সব ভল্টে তুলে ভল্ট থেকেই টাকা বের করে গুনে দিল, তাড়াতাড়ি, যেই বললাম তোমাকে গাছতলায় দাঁড় করিয়ে রেখে এসেছি।
খুব বিশ্বাস তো!
হ্যাঁ। এসব কাজে আসল ব্যাপার হল ট্রাস্ট, যদিও ওর সবচেয়ে তেজি বিজনেসই হল তেজারতি!
আর কেউ দেখেনি?
ছিলই না অন্য কেউ। আমরা পুরনো বন্ধু তো। একসঙ্গে পড়েছি। আমার সম্মান নীলু রাখবে না? তাছাড়া ও নিজেও খুব সাবধানী।
যাই বলো, খুব সাহস ওর। না হলে এত টাকা নিজের বাড়িতে—
আরে রেখেছিল বলেই তো পেয়ে গেলাম। নইলে কাল রবিবার, ব্যাঙ্ক বন্ধ, এত নগদ কোথায় পেতাম? ক্যাশ ডাউন করতে হবে কালই। অবিশ্যি নীলুকে আগে থেকে বলা কওয়া ছিল, ভাগ্যিস!
তবে চলো, বেশি ঘুরে কাজ নেই। তাড়াতাড়ি ফিরি।
একটু ফাঁকা জায়গায় এসে কমলেন্দু বলেছে, ফিরবই তো আলবৎ। ফিরতে হবেই। তাই বলে থিয়েটার না, সিনেমা না, এক্ষুনি? তোমাকে সঙ্গে পাব, কিন্তু এত টাকা কোনওদিন কি সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে পারব? একটু ঘুরি-টুরি! এই দ্যাখো, এটা শীতকালের কই মাছের মতো মোটাসোটা।
চামড়ার থলিটা বের করে কমলেন্দু মজা করে লুফতে লাগল। লীলার চোখ ছানাবড়া। লোকটা কী! বরাবরই এইরকম বেপরোয়া।
তারপর হাঁটতে হাঁটতে সেই হলঘরটা। কমলেন্দু থামল। বলল, দাঁড়াও। অন্য ছবি দেখা যখন হলই না, তখন এই ছবিটা দেখি। মাথার ওপর একটা বিশাল পোস্টার। লীলা ভেবেছিল, তার স্বামী বুঝি সেই ছবির কথাই বলছে।
কিন্তু না তো, তাকে হাত ধরে টানতে টানতে কোথায় নিয়ে এল কমলেন্দু, এখানে কী।
কমলেন্দু বলল, এগজিবিশন। ছবির। এসো, একটু দেখা যাক।
সেই হলঘরের ঘোরার কথা ভাবলে এখনও, এই বাসায় ফিরেও কেমন অদ্ভুত লাগছে লীলার। মাথা এখনও ঝিম ঝিম। এসব কি ছবি? তেকোনা, চৌকো, খোঁচা খোঁচা লাইনে আঁকা। রঙ কোনওখানে চড়চড়ে, কোনওখানে গমগমে, কোনওটা ছাই ছাই। দু’একটার এখানে ধড়, তো ওখানে মুন্ডু গড়াচ্ছে।
একটা ছবির সামনে এসে কমলেন্দু থ মেরে যেই দাঁড়িয়ে গেল, তখন লজ্জায় নিজেরই মাথা কাটা যাচ্ছে লীলার। একটা মেয়ে। একটা হাত তোলা, একটা ঠ্যাং কেমন বেঁকা, কিন্তু একদম উদোম।
এই, চলো, চলো।
আঃ, দাঁড়াও না, আর একটু দেখি।
রাগে কান লাল, লীলা সরে গেল। যতটা পারে ততটা। আসলে সে ফুঁসছিল।
আশ মিটেছে? কমলেন্দু ফিরে আসতে সে উথলে-ওঠা কেটলির ঢাকনির মতো রাগী-ভেজা গলায় বলে উঠল।
বাইরে অবিশ্যি তখন ঝিরঝিরে বাতাস। তাছাড়া কমলেন্দু তাকে কুলপি কিনে দিয়েছে বলে লীলা একটু ঠান্ডাও।
মালাই চুষতে চুষতে বলল, আচ্ছা ওই মেয়েটা কি সত্যিকার, না মন থেকে আঁকা।
মন থেকে হতে পারে, আবার সত্যিও। এমন কত আছে।
ওভাবে দাঁড়ায় কী করে?
ওরা মডেল যে! এটাই ওদের রুজিরোজগার।
তাই বলে ওই রাস্তায়! কী বিচ্ছিরি!
কমলেন্দু নিজেও যদি আর একটু তৈরি হত, তবে বলতে পারত যে, ভাতকাপড়, মাথার ওপরে ছাদ আর একটুখানি সুখের জন্যে কী পুরুষ, কী মেয়েদের যা কিছু করতে হয় লীলা, সবই বিচ্ছিরি!
এখনও মনে আছে। হলঘর থেকে যখন বেরিয়ে আসছে, তখন আশপাশের দু-চারজনের ফিসফিস আলাপ লীলার কানে তরল সীসে ঢেলেছে। শুনতে পেয়েছে ‘এরা উটকো মাল। এগজিবিশনে ছবি দেখার পার্টি না।’
কুলপির পর লীলা যখন এক ফুচকাওয়ালার সামনে দাঁড়াতে যাবে, কমলেন্দু তখন ওর হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিচ্ছে। এসো, এসো। এখানে না।
এখানে যদি না, তবে কোথায়?
খাবার দোকানে। আজ আমরা বাইরে খাব। বাসায় রান্নাটান্নার ঝামেলা আজকে নয়। একে টাকা হাতে এসেছে, তাতে শনিবার। এই বারটায় অনেকেই বাইরে খায়।
শুনে লীলার চোখ উপছে খুশি গড়িয়ে পড়েছে। চোখ— ওইরকমই। ছোট। আর খুশির স্বভাব বরাবর একই, কথায় কথায় উছলে ওঠা খুকি যেন।
রাত্তিরে বাড়িতে রান্না নেই শুনে মনও কি হাত আর পা দুটোকে নেচে উঠতে ইশারা করে! তবে শরীরে আর একটুও ভার নেই, এটা ঠিক। পাখি পাখি, পালক পালক— হালকা।
পারলে শমিতাকে এক্ষুনি উড়ে উড়ে গিয়ে খবরটা বলে। মাসতুতো বোন, ওর বর অরিন্দম কিছুদিন হল দিল্লি থেকে বদলি হয়ে এসেছে। প্রায়ই ওরা ঘুরে ঘুরে বাইরে খায়। পার্ক স্ট্রিট, থিয়েটার রোড, গড়চা থেকে মেরেডিথ স্ট্রিট। কত নাম, কত ডিশ। এত শোনাও একরকম ধার। যদি খানিকটা শুনিয়ে দিতে পারে এবার লীলাও, তবে খানিকটা শোধ সেই ধার।
কত গেল?
বিয়াল্লিশ।
ওরে বাবা, বলেই লীলা জিভ কেটেছে। এসব জায়গায় এই রকমই, সে জানে। মাসতুতো বোনের বর অরিন্দম আবার খাবারের সঙ্গে বিয়ারও নেয়। ওদের কমসে কম শ’খানেক টাকা হাওয়া হয়ে যায়। লীলাদেরও বা আজ এমন কম কী। বিয়াল্লিশ আবার টিপস (এখানে দিতে হয় কমলেন্দু জানে) তারপর ঘোরাঘুরি, পান, ট্রাম, রিকশা ধরে— তা এ-ও প্রায় শ’খানেকের কাছাকাছি বৈকি!
হোক, কীই বা যায় আসে। পকেটে নোট যখন আজ বিস্তর, কড়কড়ে। শহরতলির জমিটুকু, ঘড়ি, আর কী সব বাঁধা দিয়ে জোগাড় হয়েছে।
খামোখা নয়। এই টাকায় আড়াই কাঠার একটা ফ্ল্যাট (কমলেন্দু বলে অ্যাপার্টমেন্ট) হাতের মুঠোয় এসে যাবে। আসলে সঠিক বলতে গেলে পায়ের তলায়। কারা যেন বিপাকে পড়ে জলের দরে বেচে দিচ্ছে। দালালের যোগসাজশে খবরটা এনেছে কমলেন্দুই। থোক টাকা কমলেন্দুর অফিসের প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে ধার। কিছুটা কো-অপ। বাকিটা ব্ল্যাক।
সেই টাকাই কমলেন্দু গুনছে মাথা নিচু করে পাছে একটা ফসকায়, ভুলচুক হয়, তাই আঙুল ডুবিয়ে নিয়ে ভিজে স্পঞ্জে। স্পঞ্জটাও অফিসের। কমলেন্দু কখন ঢোলা পাতলুনের পকেটে পুরে এনেছে।
ফ্ল্যাট, থুড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, হে ভগবান, যত তাড়াতাড়ি হাতে এসে যায়। তাহলে লীলা তার মাসতুতো বোন শমিতার ক্লাসে একলাফে উঠতে পারে। সরাসরি। দেড় কামরা থেকে আড়াইটেওয়ালায়। লম্বাচওড়া মিলিয়ে কত স্কোয়্যার ফুট?
কমলেন্দু না হয় জামাকাপড় ছাড়েনি, কিন্তু লীলার তো বদলানো চাই-ই চাই। নইলে গা ঘিন ঘিন। শাড়ি বদলানোও সোজা নাকি। একটা মোটে ঘর যেখানে? আড়াই কামরার আস্তানা হলে সমস্যা থাকবে না। আর কমলেন্দুর এখন না হয় মাথা নিচু, নোট গুনে গুনে থোক থোক সাজিয়ে রাখছে। একবার যদি মাথা তুলে চায়? আড়চোখে তাকায়? পুরুষের ছলচাতুরি, বিশ্বাস কী? করে যে, সেই মেয়ে বোকা।
এই। একবার ওদিকে তাকাও তো। ঘুরে বোসো। দেওয়ালের দিকে মুখ করে। ভাল ছেলে হয়ে।
কেন?
বারে, আমি শাড়ি বদলাব না?
বদলাও না। কে মানা করছে।
আর তুমি প্যাঁট প্যাঁট করে গিলবে, ওই এগজিবিশনের ছবি যেভাবে গিলেছ, তেমনই? কত রঙ্গই জানো।
কেন, তোমার চেহারা কেমন, তা কি আমি জানি না?
সে তো অন্ধকারে। বাতি নিভলে।
পুট করে বেডসুইচটা কতদিন জ্বেলে দিইনি? দেখিনি।
সে তুমি নেহাত অসভ্য বলে। যাও, এবার চোখ বোজো, ঘাড় ফেরাও। আমার ঠিক এই তিন মিনিট।
শাড়ির একটা আঁচলের কোণ উঁচু করে দাঁতে চেপে লীলা যখন খালি শাড়ি নয়, ব্লাউজ শায়াও বদলে নিচ্ছে, তখন সে ঘরটার এক কোণে মুখ ফিরিয়ে। এখানটায় আলো অল্প, লজ্জাহরণ মধুসূদন। তবু আলোতেই টের পেল, নতুন ব্লাউজটার বোতাম নেই, বগলটাও ফ্যাঁসফ্যাঁসে। ব্রা-টাও, মাগোঃ ঘামে ঘিন ঘিন।
সব বদলাতে হবে। তবে কি আর কুলোবে তিন মিনিটে? তিনের বদলে পাঁচ কি ছয় যখন বয়ে গেল, তখনই—
লীলার খটকা লাগল ঠিক তখনই। একটা ছায়া যেন জানলায়। ফট করে সরে গেল। তক্ষুনি চেঁচিয়ে উঠল লীলা, এই। তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি। গোনাগাঁথা আজকের মতো থাক না!
হয়ে এসেছে। আর একটুখানি।
একটা হুইসল ঠিক তখনই। জানলার শিক কামড়াচ্ছে কয়েকটা হাত, এই রে, পাল্লা দুটো আলগা, এবার?
আবছা মনে পড়ে, মেঝের ওপর কয়েক জোড়া পায়ের দুপদাপ। তার ব্লাউজ ধরে হ্যাঁচকা টান। ফট করে ছিঁড়ে গেল শায়ার দড়ি। শাড়িটা ফালাফালা। আর কমলেন্দুর বুকফাটা চিৎকার, শুকনো কুয়োর তলা থেকে যেমন আওয়াজ উঠে আসে। আর? গোঁ গোঁ। পরে? সব শীতল, হিম, চুপ। চোখ দুটো ঠিকরে বাইরে আসছে, নীল কি কষ্টিকালো কমলেন্দুর শ্বাসনালি।
আর মনে নেই।
একবার কি ফের বৃষ্টি হয়, খানিকক্ষণের জন্যে লীলা ফিরে পায় সম্বিত? নিজের দিকে তাকানো যায় না, কমলেন্দুর খাট থেকে গড়িয়ে পড়া শরীরটার দিকেও না। আর কি অবাক ব্যাপার, নোটগুলিও যে নেই; তাও ওই আধো ঘোরেও লীলার চোখ এড়ায় না।
ওই নোটগুলোই কি লোকগুলোর লক্ষ্য ছিল— গন্ধে গন্ধে পিছু নিয়ে এসেছিল? নাকি লীলা নিজে— তার শরীর? শাড়িটা এখন কুটিকুটি, ক’গাছি সুতোর চেয়ে খুব বেশি কিছু বাঁচেনি, পেটিকোটটার বাহারী লেসটার কারুকার্য সব মাটি, বুকের বোঁটার ওপর দিয়ে নখের লম্বা দাগ। না, নাভির দিকে নিচু হয়ে চেয়ে লীলার বিশ্বাস হল, এর চেয়ে বড় রকমের কোনও ক্ষতি তার হয়নি। হয়ত হয়ত কেন, নিশ্চয়ই— বাধা দিতে গিয়েছে, এসব ছেঁড়াছেঁড়ি তারই ছাপ। ধস্তাধস্তির। আর কিছু হলে গায়ে কি পাথর চাপা পড়ার মতো ব্যথা হত না?
ঠান্ডা মাথায়, আশ্চর্য, লীলা এসবই ভাবতে পারছে। চোখ স্থির, তাই কমলেন্দুর নিথর শরীরটাও একদৃষ্টে দেখছে। ঠোঁটের কোণে ফেনা, বুকে চাপ চাপ রক্ত, কিন্তু চোখ? যেন আরও বিশাল হয়ে কোটর থেকে ছিটকে নিষ্ঠুর গোলার মতো ভেঙে চুরে ফেলেছে লীলাকে। ভাঙছে, না ফাটছে?
হাতোর মুঠো শক্ত, কিন্তু স্নায়ু শিথিল। আবার ফিট।
গুনগুন গলা শুনে জ্ঞান ফিরে আসে।
পুরুষের স্বর: বুঝলেন অফিসার, বোধহয় দোতলায় আমাদেরই খবর দিতে আসছিল। পারেনি, ঢলে পড়ে থাকবে। গোলমাল শুনে আমরাই নেমে আসি, ওকে দেখতে পাই। পড়ে আছে ঠিক এইভাবে চৌকাঠে। তখনই খবর দিই আপনাদের।
থানায় আমরা একটুও দেরি করিনি। জিপটার সেলফটা ঠিক করতে যা কয়েক মিনিট, তারপরই ঝড়ের বেগে— যাক। কিছু ছোঁবেন না, যেমন আছে তেমনি থাক। আমাদের ফটোগ্রাফার কাল সকালে এসে—। তাছাড়া ফিংগারপ্রিন্ট।
আমার খালি একটা খটকা স্যার। খবর দিতে ওপরে যদি আসছিল, তবে এই অবস্থাতে?
জামাকাপড়ের কিছু প্রায় বাকি নেই, দেখতেই তো পাচ্ছেন, তাকানো যায় না।
দোতলার সেই লোকটা বলছে যে রোজ আড়চোখে এ ঘরের ফাঁকে চোরা চোখে তাকাতে তাকাতে অফিস না কোন চুলোয় যেত।
হয়ত বদলানোর সময় পায়নি। কিংবা এতই গরিব যে স্পেয়ার শাড়িটাড়ি হয়ত ছিল না ওর, তাও সম্ভব।
ভারি গলায় আরও কী বলতে যাচ্ছিল রাশভারি অফিসার, দোতলার লোকটিই বাধা দিয়ে বলল, ছিল। ওরা বড়লোক না হোক, খুব গরিবও নয়। রকমারি রঙের কাপড়ে অন্তত দেখেছি, দু-চার রকমের।
নার্ভাস কোলাপস ইন দ্যাট কেস। ওরকম সময়ে কি হুঁশ থাকে? আপনিও তো বেশ!
গটগট করে বিদায় নিলেন থানা অফিসার। ঝিম ঝিম জ্ঞান ফিরে এসেছে, লীলার মনের আধখানায় যেমন কান্না, বাকি আধখানায় অদ্ভুত একটা হাসিও পাচ্ছে। কিচ্ছু জানে না এইসব জ্ঞানবাগীশ লোকেরা। কিচ্ছু না।
হুঁশ ছিল না? অফিসারকে ডেকে বলবে নাকি যে আরে, হুঁশ ছিল বলেই তো। আলো-জ্বলা ঘরে কমলেন্দুর চোখের সামনে কবে সে কাপড় ছেড়েছে, ছাড়তে পেরেছে। কমলেন্দুর চোখদুটো যখন ছিটকে বেরিয়ে এসে বিঁধছে, বিরাট হচ্ছে ক্রমে, গোলগাল আরও বড়, তখন তো অসম্ভব আরও। যদি মেনেও নেওয়া যায়, ওই মণি কাটা মাছের মতো মরা, তবু— তবু লীলার নিজের চোখ আর লাজুক পলক আর ভরা শরীর, সব যে জ্যান্ত! এতকালের অভ্যেস ছাড়া, সেও একরকমের মরা। সহমরণে যেতে শীত-শীত করল বলেই তো কাপড় ছাড়া গেল না। বড় কটকটে আলো। লীলার চোখে ছবির সেই উদোম মেয়েটা, এগজিবিশনের সব ক’টা দেওয়াল দুলছিল।
