শেখর বসু : নিজের বিপদে বুদ্ধিমানরাও
গত তিন মাসের মধ্যে তিনজন মানুষ তাদের বিচিত্র সমস্যা নিয়ে হাজির হয়েছিল শিশিরের কাছে। এই তিনজনের সঙ্গেই শিশিরের পরিচয় সামান্য, এত অল্প পরিচয়ে কেউ কারও গোপন কথা বলতে চায় না; কিন্তু তারা অকপটে বলেছিল। বলার একটাই উদ্দেশ্য— সমস্যা সমাধানের রাস্তা বলে দিন। তিনটে তিন ধরনের সমস্যা, আর এসব সমাধানের কোনও রাস্তাই শিশিরের জানা ছিল না। সেই কথাটাই সে সবিনয়ে তিনজনকেই জানিয়েছিল।
তাই শুনে তিনজনেই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে যা বলেছিল তা অনেকটা এইরকম: ‘আপনি বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ ব্যক্তি, আমাদের মতো সমস্যার মধ্যে আপনি পড়লে কি করতেন? আপনার কাছে আমরা অন্য কোনও ধরনের সাহায্যের জন্যে আসিনি, শুধু পরামর্শ। বিশ্বাস করুন আমাদের মাথার ঠিক নেই।’
উত্তরে শিশির গোড়ার দিকে একটু তর্কের মধ্যে ঢুকতে চেয়েছিল। বলেছিল— ‘দেখুন, আমাকে হঠাৎ বুদ্ধিমান ধরে নিলেন কেন? তেমন কোনও বুদ্ধির পরিচয় আজ পর্যন্ত দিতে পারিনি। অত্যন্ত সাধারণ মানুষ আমি, খাইদাই, চাকরিবাকরি করি, ব্যস।’
কিন্তু এসব কথায় পরামর্শ-প্রার্থীদের ফেরানো যায়নি, সুতরাং মুখ খুলতে হয়েছিল শিশিরকে। একটু থেমে ও বলেছিল: ‘কথায় আছে নিজেদের বিপদে অতিবড় বুদ্ধিমানরাও বোকা বনে যায়। কথাটা বোধহয় একেবারে মিথ্যে নয়। সত্যিই তো, বড় রকমের বিপদের মধ্যে পড়লে ক’জনেরই বা মাথার ঠিক থাকে। আমি আপনাদের একটা কথাই শুধু বলতে পারি— মন শক্ত রাখুন, ভেঙে পড়বেন না, আর তাড়াহুড়ো করে কোনও সিদ্ধান্ত নেবেন না। সময়, স্রেফ সময়ই অনেক সময় নিজে থেকে বহু জটিল সমস্যার সমাধান করে দেয়।’
এই ক’টা কথা বলেই থামতে পারেনি শিশির, এই লাইনে আরও বিস্তর কথা বলেছে। মধ্যিখানে চা এসেছে বারদুয়েক, বেশ কয়েকটা সিগারেট পুড়েছে। শেষকালে পরামর্শ-প্রার্থীরা কালো মুখ আলো করে বলেছে: ‘আপনার কাছে এসে সত্যিই মনে বেশ জোর পেলাম। যা বললেন সেই ভাবেই চলব।’
শিশিরের বউয়ের নাম শীলা, শিশির মাঝে মধ্যে ঠাট্টা করে বউকে বলে— ‘দেখ, আমাকে এত হেলাফেলা কোরো না, বিপদে পড়লে কত লোক আমার কাছে পরামর্শ নেওয়ার জন্যে ছুটে আসে। সেই যে বত্রিশ সিংহাসনের গল্প আছে না, আমার মনে হয় আমি বোধহয় মাঝেমধ্যে ওইরকম, কোনও সিংহাসনের ওপর বসে থাকি। না হলে এত বুদ্ধি কোত্থেকে আসবে বলো? এমনও হতে পারে আমিই হয়ত সে-যুগের বিক্রমাদিত্য ছিলাম। না-না, হেসো না।’
শীলা মুখের হাসিটাকে আরও ছড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘বিক্রমাদিত্য না হয়ে মধুসূদনদাদাও হতে পারো। বিপদে পড়লে তো লোকে একসময় মধুসূদনদাদাকে স্মরণ করত।’
একচোট হেসে নিয়ে জবাব দেয় শিশির, ‘মধুসূদনদাদা বিপদ থেকে উদ্ধার করে দেয় সরাসরি, কিন্তু বিক্রমাদিত্য ঝামেলা মেটাবার জন্যে বুদ্ধি খাটায়। আমি বিক্রমাদিত্য।’
এই বিক্রমাদিত্যর বসার ঘরে পরের রবিবার নিরঞ্জন সেন নামে একজন আর্কিটেক্ট এসে হাজির হলেন। ভদ্রলোকের সঙ্গে শিশিরের সামান্য পরিচয়, এই পরিচয়ে হঠাৎ একেবারে বাড়িতে এসে হাজির হওয়া; শিশিরের অবাক ভাবটা দূর করার জন্যে মিস্টার সেন একটু হেসে বললেন, ‘আপনার বাড়ির কাছেই একটা সাইটে কাজে এসেছিলাম, সামান্য সময়ের কাজ, তা কাজ মিটে গেলে ভাবলাম আপনার একবার খোঁজ করি। ঠিকানাটা খেয়াল ছিল না, শুধু মনে ছিল আইসক্রিম ফ্যাকট্রির পাশেই আপনার বাড়ি। আপনি তো মশাই স্বনামখ্যাত ব্যক্তি, একজনকে জিজ্ঞেস করতেই বাড়ি দেখিয়ে দিল।’
লাজুক মুখে উত্তর দিল শিশির, ‘কিছু স্বনামখ্যাত ব্যক্তিট্যক্তি নই। দু-পুরুষের বাসিন্দা, ছেলেবেলা থেকে এখানেই বড় হয়েছি, পাড়ার কিছু কিছু লোক তাই চেনে। যাক, আপনি এসেছেন খুব ভাল লাগছে।’
পাঁচ-সাতটা এলোমেলো কথা বলার পরেই মিস্টার সেনের কপালে কয়েকটা ভাঁজ পড়ল। তিনি গলার স্বর একটু খাদে নামিয়ে বললেন, ‘বড্ড বিপদে পড়েছি শিশিরবাবু, কী করব কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।’
কথাটা শুনে শিশির সামান্য একটু চমকে উঠল। কী ব্যাপার! বিপদে পড়ে আবার একজন তার কাছে এসেছে! অন্য তিনজন বিপদে-পড়া মানুষের সঙ্গে মিস্টার সেনের বিরাট তফাত। ভদ্রলোক সুশিক্ষিত, সুপ্রিতিষ্ঠিত; মেলামেশার পরিধিও বেশ বড়। তিনি আর সবাইকে ছেড়ে তাঁর বিপদের কথা সামান্য একজন পরিচিতকে জানাতে এসেছেন কেন?
কথাটা বলার পরে মিস্টার সেন নিচের দিকে চোখ নামিয়েছিলেন, নিচে সেন্টার টেবিলের ওপর ছিল ওঁর বিদেশি সিগারেটের প্যাকেট। প্যাকেট থেকে সিগারেট বার করে ধরাতে গিয়েও ধরালেন না। কপালের ভাঁজগুলো আগের মতোই কপালে। নিজের মনে কথা বলার ভঙ্গিতে বললেন, ‘সত্যি প্রবলেমটা বেশ ঘোরালো হয়ে উঠেছে, কীভাবে যে সলভ করব কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।’
খসখসে গলায় জিজ্ঞেস করল শিশির, ‘কেন, কী হয়েছে?’
হাতের সিগারেটটা ধরিয়ে নিয়ে মিস্টার সেন বললেন, ‘সমস্যা পিংকাকে নিয়ে, পিংকা আমার মেয়ে।’
শিশিরের চোখেমুখে উদ্বেগের ছাপ, কিন্তু সমস্যাটা ও কিছুতেই আন্দাজ করতে পারল না।
কেশে গলা পরিষ্কার করে নিলেন মিস্টার সেন। ‘আপনার মনে আছে বোধহয় আমি বার্মিংহামে আট বছর ছিলাম।’
বছরের হিসেবটা মনে ছিল না শিশিরের, কিন্তু দ্রুত সায় দিল, ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ।’
জানলার দিকে তাকিয়ে মিস্টার সেন বললেন, ‘যখন ওখানে গিয়েছিলাম তখন পিংকার বয়স ছিল দুই, তার মানে যখন দশ বছর বয়েস তখন আমি বার্মিংহাম ছাড়ি। দেশে ফিরেছি বছর পাঁচেক, কিন্তু এখনও ও এখানকার সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করতে পারছে না। ইদানীং ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার জন্যে ঝুলোঝুলি করছে ভীষণ। নিজের থেকে কিছু করেসপন্ডেন্সও করেছে।’
‘ওখানে গিয়ে কি পড়াশোনা করতে চায়?’
‘সেই রকমই তো বলছে।’
শিশির একটু হেসে বলল, ‘ভালই তো, তা এর মধ্যে সমস্যা কোথায়?’
হাতের আধখানা সিগারেট অ্যাশট্রের মধ্যে গুঁজে দিয়ে অস্থির গলায় মিস্টার সেন বললেন, ‘ব্যাপারটা স্বাভাবিক হলে আমি নিশ্চয়ই এত দুশ্চিন্তা করতাম না। আসলে মেয়েটি দিনকে দিন কেমন যেন অবসটিনেট হয়ে উঠছে, কিছু বললেই ঝাঁঝিয়ে ওঠে। নিজে থেকে কারও সঙ্গে কোনও কথাই বলতে চায় না। বাড়িতে যতক্ষণ থাকে নিজের ঘরে বসে পপ মিউজিক শোনে, বিলিতি ম্যাগাজিন পড়ে। ওর কাছে এ দেশের সবই খারাপ, এখানে নাকি কোনও মানুষ থাকতে পারে না।’
‘ওর বন্ধুটন্ধু নেই?’
‘না, তেমন বন্ধুত্ব ওর কারও সঙ্গেই হয়নি।’
‘অবসর সময় কাটায় কী করে?’
‘ওই তো বললাম ম্যাগাজিন পড়ে আর গান শুনে।’
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পরে শিশির একটু সমব্যথীর গলায় বলল, ‘সত্যিই সমস্যা। আর আজকাল কলকাতার যা হাল হয়েছে, বিদেশে অদ্দিন একটানা থাকার পরে এখানে এসে মন বসানো বেশ কঠিন।’
সামান্য উত্তেজিত হয়ে মিস্টার সেন বললেন, ‘কেন কঠিন হবে? আমরা পারছি না। আমরাও তো ওর সঙ্গে বিদেশে ছিলাম।’
শিশির মৃদু হেসে দু’পাশে মাথা সামান্য ঝাঁকিয়ে বলল, ‘আপনাদের থাকা আর ওর থাকা তো এক নয়। বিদেশেই ওর জ্ঞান হয়েছে। ছোটবেলায় হয়ত ভেবেছে ওটাই ওদের দেশ। সে ক্ষেত্রে অ্যাডজাস্টমেন্ট আসতে একটু দেরি তো হতেই পারে।’
হতাশ মানুষের সব লক্ষণ ফুটে উঠল মিস্টার সেনের চোখেমুখে। ‘আর কত দেরি হবে! পাঁচটা বছর তো কম সময় নয়। এখন আমার অন্য দুশ্চিন্তা হচ্ছে, ম্যালঅ্যাডজাস্টমেন্ট থেকে শেষে মানসিক অসুখবিসুখ না হয়ে যায়। আমার চাইতে ঢের বেশি ভেঙে পড়েছে ওর মা। একমাত্র সন্তান হলে যা হয়।’
সত্যিই বিরাট সমস্যা, কিন্তু এ সমস্যা সমাধানের কোনও রাস্তা শিশিরের জানা নেই।
কিছুক্ষণ থমথমে মুখে থাকার পরে মিস্টার সেন বললেন, ‘কী করা যায় বলুন তো শিশিরবাবু, আমি তো সমস্যা সমাধানের কোনও রাস্তাই দেখতে পাচ্ছি না।’
ঠিক এই ধরনের একটা প্রশ্নের মুখে পড়ার আশঙ্কায় ভেতরে-ভেতরে একটু সিঁটিয়ে ছিল শিশির। কী বলবে ও? এর উত্তর তো ওর একেবারেই জানা নেই। অস্থিরতার ছাপ বেশ প্রকট হয়ে উঠেছিল সেনের চোখেমুখে। উনি রীতিমতো ভেঙে-পড়া গলায় বললেন, ‘এ ব্যাপারে আমার মাথা একেবারেই কাজ করছে না, সেইভাবেই চলব।’
প্রশ্নটার মধ্যে কেমন যেন একটা ধাক্কা ছিল, সেই ধাক্কায় শিশির আগের তিনজন পরামর্শপ্রার্থীকে যা-যা বলেছিল সেই কথাগুলোই বলে গেল কেমন যেন মুখস্থ পড়া বলার ভঙ্গিতে। বলল, ‘কথায় আছে নিজেদের বিপদে অতিবড় বুদ্ধিমানরাও বোকা বনে যায়। কথাটা বোধহয় একেবারে মিথ্যে নয়। সত্যিই তো বড় রকমের বিপদের মধ্যে পড়লে ক’জনেরই বা মাথার ঠিক থাকে। আমি একটা কথাই শুধু বলতে পারি— মন শক্ত রাখুন, ভেঙে পড়বেন না, আর তাড়াহুড়ো করে কোনও সিদ্ধান্ত নেবেন না। সময়, স্রেফ সময়ই অনেক সময় নিজে থেকে বহু জটিল সমস্যার সমাধান করে দেয়।’
কথাগুলো বলার সঙ্গে সঙ্গে নিরঞ্জন সেনের চোখের তারায় যেন মৃদু একটা আলোর ঝিলিক খেলে গেল। ওই আলো বক্তাকে উৎসাহ দেওয়ার মতো। শিশির কথা শুরু করল আবার। এ কথাগুলোও ও আগের তিনজনকে বলেছে। একটাও নিজের কথা নয়, নানা জ্ঞানীগুণীরা এই কথাগুলোই নানা সময়ে নানা দেশে বলেছে। মূল কথা হল ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা। উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনও মানে হয় না। কারণ বিপদ আসে সেই দিক থেকে যেদিকের কথা আমরা কখনই ভাবিনি। ভয় থেকে তৈরি হয় দুশ্চিন্তা, আর দুশ্চিন্তা শরীর নষ্ট করে। সুতরাং…।
বেশ কিছুক্ষণ ধরে ‘কিন্তু’, ‘অথচ’, ‘সুতরাং’ ইত্যাদি মিলিয়ে শিশির যা বলল, তাতে, নিরঞ্জন সেনের চোখমুখ থেকে হতাশার ভাব কেটে গেল অনেকখানি। ওঠার সময় তিনি কৃতজ্ঞ হওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, ‘আপনার কাছে এসে সত্যিই মনে বেশ জোর পেলাম। যা বললেন, সেই ভাবেই চলব।’
অবাক কাণ্ড, পরের রোববারের সকালে শিশিরের বাড়িতে যে এলো তার সঙ্গেও মস্ত একটা সমস্যা ছিল। ছুটির সকালে পুরনো কোনও বন্ধু বাড়িতে এলে সবারই ভাল লাগে, অমিতকে দেখে শিশিরও খুব খুশি হয়েছিল। অমিত কলেজ-আমলের বন্ধু, ওর সঙ্গে সুখের দিনের বহু স্মৃতি জড়িয়ে আছে; কিন্তু স্মৃতিচারণে অমিত খুব একটা সায় দিচ্ছিল না। তারপর অন্য কথার মধ্যে আচমকা বলে ফেলল, ‘বিরাট একটা সমস্যার মধ্যে পড়ে গিয়েছি, কী করব বুঝতে পারছি না।’
কথাটা শুনেই চমকে উঠল শিশির। পাঁচজনে কী ভাবতে শুরু করেছে ওকে! পরের মুশকিল আসান করা কি ওর কাজ? শিশির একটু তীক্ষ্ণ চোখে বন্ধুর দিকে তাকাল। ওই চোখে চোখ রাখতে পারল না পুরনো বন্ধু। নিচের দিকে চোখ নামিয়ে কয়েক মুহূর্ত পরে বলল, ‘সমস্যাটা বেশ বেয়াড়া ধরনের, সবাইকে বলা যায় না। তুই কদ্দিনের বন্ধু, তোর কাছে কিছু লুকোছাপা করার প্রশ্নই ওঠে না। তুই পুরোটা শোন, তারপর একটা বুদ্ধি দে। আমি আর ভাবতে পারছি না।’
অল্প কিছুদিনের মধ্যে চার-চারজনের গোপন কথা শোনার পরে গোপন কথার ওপর শিশিরের আগ্রহ কিছুটা কমে গিয়েছিল। ও সামান্য ঠান্ডা গলায় বলল, ‘কী? কী হয়েছে?’
অমিত অপ্রস্তুত মুখে শুকনো হাসি হেসে বলল, ‘সমস্যা, মানে যাকে বলে বুড়ো বয়সের ভীমরতি।’
কথাটার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারল না শিশির, কিন্তু ও কোনও প্রশ্ন না করে জিজ্ঞাসু চোখে বন্ধুর দিকে তাকাল।
অমিত তক্ষুনি-তক্ষুনি আবার কথা শুরু করতে পারল না। ঘরের তিন দেওয়ালে থমথমে মুখে কয়েকবার চোখ ঘোরাবার পরে বলল, ‘তুই তো জানিস আমি একটু দেরিতে বিয়ে করেছি। তা, তাও তো প্রায় পাঁচ বছর হয়ে গেল। বিবাহিত জীবন মোটামুটি খারাপ কাটছিল না, তবে—।’
এই পর্যন্ত বলার পরে হঠাৎই ওর মুখের চামড়ার নিচে রক্তের চাপ বেড়ে উঠল। ফর্সা মুখ লালচে হয়ে গেল দেখতে দেখতে। শিশির হাসতে হাসতে বলল, ‘কী, আবার প্রেমে পড়েছিস নাকি?’
ঢোক গিলে অমিত বলল, ‘ঠিক তাই।’
‘অ্যাঁ! বলিস কী!’
অমিতের চোখমুখ এবার বেশ গম্ভীর। খসখসে গলায় বলল, ‘ব্যাপারটা এখন আর হাসাহাসি করার স্টেজে নেই।’
‘তবে কি কান্নাকাটি করার?’
কথাটার উত্তরে অমিতের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। ও সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি মিনুকে ডিভোর্স করার কথা ভাবছি, তবে…।’
এই ‘তবে’-তেই ওর সমস্যা।
সেই সমস্যার কথাই দশ রকম ভাবে বলল ও। একদিকে স্ত্রী মিনু, আর একদিকে প্রেমিকা শমিতা। দুজনের একজনকে এক কথায় মেনে নেওয়ার মতো মনের জোর ওর নেই। শমিতার আকর্ষণ ওর পক্ষে কাটানো অসম্ভব, আবার বউকে বরাবরের জন্যে ছেড়ে দিতেও পারছে না। দোটানায় বুকের ভেতরটা ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে শুধু। উপায় থাকলে অমিত বোধহয় ওর রক্তাক্ত হৃদয়টা চোখের সামনে তুলে এনে দেখাত।
ঠাট্টা-ইয়ার্কি থেকে সরে এসে বিষয়টাকে জটিল এক সমস্যা বলে মেনে নিতে শিশিরের বেশ সময় লেগেছিল। সত্যি, প্রেমে আর ফাঁদে পড়ার ওপর কারও হাত থাকে না। একবার পড়ে গেলে অবস্থা দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে সেই প্রেমের পথে যদি পিছুটান থাকে।
অমিত একেবারে বিধ্বস্ত মানুষের গলায় বলল, ‘কী করব কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না, তুই একটা পরামর্শ দে।’
কথাটার মধ্যে নিশ্চয়ই একটা ধাক্কা ছিল, সেই ধাক্কাতেই আরও চারজনকে বলা কথাগুলো বেরিয়ে এল শিশিরের মুখ থেকে। ‘কথায় আছে নিজেদের বিপদে অতিবড় বুদ্ধিমানরাও বোকা বনে যায়। কথাটা বোধহয় একেবারে মিথ্যে নয়। সত্যিই তো, বড় রকমের বিপদের মধ্যে পড়লে কজনেরই বা মাথার ঠিক থাকে। আমি একটা কথাই শুধু বলতে পারি— মন শক্ত রাখ, ভেঙে পড়িস না, আর তাড়াহুড়ো করে কোনও সিদ্ধান্ত নিস না। সময়, স্রেফ সময়ই অনেক সময় নিজে থেকে বহু জটিল সমস্যার সমাধান করে দেয়…।’
কথাগুলো বলার জন্যে একটুও ভাবতে হচ্ছিল না শিশিরকে। একটার পরে একটা কথা কী অনায়াসে বেরিয়ে আসছিল মুখ থেকে। কথাগুলোর আড়ালে আলো ছিল নিশ্চয়ই, সেই আলো ঠিকরে পড়েছিল অমিতের চোখেমুখে। হতাশ, বিধ্বস্ত মানুষটা চাঙ্গা হচ্ছিল ধীরে ধীরে।
চোখের সামনে এই পরিবর্তন দেখে রীতিমতো উৎসাহিত হয়ে উঠেছিল শিশির। ওর আত্মবিশ্বাসের মাত্রা বাড়ছিল লাফিয়ে লাফিয়ে। দেশ-বিদেশের জ্ঞানীগুণী মানুষেরা বোধহয় কথা বলছিল ওর গলা দিয়ে। খুব সরল, সাদাসিধে উপদেশ। এ সব কথা অমিতও জানে নিশ্চয়ই। কিন্তু উপদেশ নিছক জানা আর তার গূঢ় তাৎপর্য গভীরভাবে উপলব্ধি করার মধ্যে তফাত অনেকখানি। শিশির পরিষ্কার বুঝতে পারছিল, ওর পুরনো বন্ধু এই কথাগুলো থেকে মনের জোর সংগ্রহ করছে।
শিশির বলল, ‘প্রত্যেকটি মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, নিজেকে ঠিকঠাক বুঝে ওঠা। না বোঝা থেকেই যত গোলমাল। কোনটা চাই আর কোনটা চাই না— এটাই আমাদের কাছে পরিষ্কার হয় না। অপরিষ্কার চিন্তা থেকেই সংশয় আর দ্বিধা জন্মায়। সংশয় আর দ্বিধার মধ্যে থাকলে কখনই সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। ইংরেজিতে একটা কথা আছে— কোনও সমস্যাকে তুমি যদি ঠিক গুছিয়ে বলতে পারো তাহলেই সেই সমস্যার অর্ধেক সমাধান হয়ে যায়। তুই কোনদিকে যাবি— অর্থাৎ মিনুর কাছে না শমিতার কাছে— এটা ঠিক করতে পারছিস না, তার কারণ গোটা সমস্যাটা তোর কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। সমস্যার পুরো চেহারা না দেখলে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। অকারণ তাড়াহুড়ো করার কী দরকার, আস্ত জীবনটাই তো পড়ে আছে। সবচেয়ে ভাল— তুই আরও কিছুকাল অপেক্ষা কর। বললাম না সময়, স্রেফ সময়ই নিজে থেকে বহু সমস্যার সমাধান করে দেয়।’
উৎসুক শ্রোতার কাছে ভাল-ভাল কথা বলতে গিয়ে শিশিরের বেশ মেজাজ এসে গিয়েছিল। ও একনাগাড়ে আরও কিছুক্ষণ মহাপুরুষের বাণী শোনাবার পরে সিগারেট ধরাল বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে।
অমিতের চোখমুখ থেকে হতাশার ছাপটা প্রায় ধুয়েমুছে গেছে, ও অ্যাশট্রেটা শিশিরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘তাহলে তুই কি আমাকে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে বলছিস?’
‘নিশ্চয়ই।’ প্রায় প্রতিটি অক্ষরের ওপর আলাদা ভাবে জোর দিয়ে শব্দটা উচ্চারণ করল শিশির।
মাঝখানে দু-দফা চা, গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত বেশ কয়েকটা সিগারেট, আর অনর্গল লাগসই কথাবার্তা। এ সবের মধ্যে বেশ কিছুটা বেলা গড়িয়ে যাওয়ার পরে উঠে পড়ল অমিত। ওর প্রথম দিককার সেই ভেঙে-পড়া চেহারার সঙ্গে এখনকার চেহারার ধরতে গেলে কোনও মিলই নেই। যাওয়ার সময় কৃতজ্ঞতার ছাপ চোখেমুখে ফুটিয়ে তুলে অমিত বলল, ‘তোর কাছে এসে সত্যি মনে বেশ জোর পেলাম। আজ তাহলে চলি, পরে আবার আসব একদিন।’
পুরনো বন্ধুকে সদর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে ফিরে এল শিশির। শীলা হাসতে হাসতে বলল, ‘তোমার বন্ধুও কি ঝামেলায় পড়ে পরামর্শ চাইতে এসেছিল?’
দুটো হাত মাথার ওপর তুলে আড়মোড়া ভেঙে জবাব দিল শিশির, ‘ঠিক তাই।’
‘পারলে ঝামেলা মেটাতে?’
‘আলবাত। কোনও সমস্যাই আমার কাছে সমস্যা নয়। আচ্ছা আমার মাথার পেছন দিকটা দেখ তো।’
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল শীলা, ‘মাথার পেছনে! কী?’
‘সোনার থালার মতো কোনও জ্যোতিটোতি দেখা যাচ্ছে, ছবির মহাপুরুষদের মাথার পেছনে যেমন থাকেটাকে।’
উত্তরে ঠোঁট বেঁকিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে গেল শীলা। পেছন-পেছন এল শিশির, তারপর ছোটখাটো একটা বিস্ময় গলায় ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা কী ব্যাপার বলো তো! বিপদে পড়ে সবাই আমার কাছে পরামর্শ চাইতে আসে কেন?’
‘তার কারণ সবাই জানে লোকটা আধা-বেকার, বকবক করার সময় আছে প্রচুর।’
বউয়ের কথায় গলা ছেড়ে হেসে উঠল শিশির।
রোববারের দুপুরের খাবারের দু-একটা ভালমন্দ আইটেম থাকে। শীলা সেগুলোই স্টিলের বাটিতে গুছিয়ে তুলতে-তুলতে জিজ্ঞেস করল, ‘তা তোমার বন্ধুর সমস্যাটা কী?’
সমস্যার কথা বলতে গিয়েই থমকে গেল শিশির। এই একটা ব্যাপারে মেয়েরা অসম্ভব সাম্প্রদায়িক— ছি-ছি বিয়ে করা বউকে ফেলে আর একটা মেয়েকে… কাল্পনিক সংলাপের প্রথম লাইনটা মাথায় খেলে যেতেই চেপে মুখ বন্ধ করে ফেলল শিশির।
শীলা স্টিলের বাটির ধারে লেগে-যাওয়া ঝোলটা আঙুলে মুছে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘কী সমস্যা?’
সতর্ক শিশির খুব সাবধানে বলল, ‘অফিসের ঝামেলা। রাইভাল ইউনিয়ন নাক গলিয়ে ওর প্রাোমোশনটা আটকে দিয়েছে।’
ইউনিয়ন, পার্টি-পলিটিক্স ইত্যাদির দিকে মেয়েরা ধরতে গেলে একেবারেই ঘেঁষতে চায় না। শীলা আর কোনও প্রশ্ন তুলল না, সেই সুযোগে রান্নাঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে এল শিশির।
আকাশে বোধহয় মেঘ করেছে, আবছা আলো ছড়িয়ে পড়েছে একফালি বারান্দায়। বারান্দায় তিনটে ফুলের টব। মৃদু হাওয়ায় গাছের ফুল-পাতা নড়ছিল। ওদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সমস্যাজর্জর মানুষগুলোর চাইতে নিজেকে বেশ আলাদা বলে মনে হল শিশিরের। মোটামুটিভাবে ওর তো বেশ সুখী, নিশ্চিন্ত জীবন। শীলাকে সুগৃহিণী বলা যেতে পারে। একমাত্র ছেলে বাধ্য, লেখাপড়ায় খারাপ নয়। স্কুল পেরিয়ে সবে কলেজে ঢুকেছে। আর কয়েকটা বছর এভাবে চলে গেলে আর একটু ভালভাবে থাকা যাবে নিশ্চয়ই। এতক্ষণ আউড়ে যাওয়া মহাপুরুষদের বাণীগুলোও মনে পড়ছিল ওর। ওগুলো শুনতে বা বলতে খারাপ লাগে না, কিন্তু সত্যিই কি ওতে কোনও কাজ হয়?
ছ’টা নির্ঝঞ্ঝাট দিন কেটে যাওয়ার পরে আবার একটা রোববারের চমৎকার সকাল এসে হাজির হল। চা খেয়ে বাজারে গেল শিশির, কিন্তু বাজার থেকে ফিরতেই শীলা বলল, ‘তোমার পাজামাটা বেশ নোংরা হয়ে গেছে, ওটা পাল্টে ফেল তো।’
‘কেন, এখন পাল্টাতে যাব কেন?’
‘একটু বাদেই তো তোমার মক্কেলরা আসতে শুরু করবে, পরামর্শ দিতে হবে না?’
শীলার কথায় গলা ফাটিয়ে হেসে উঠল শিশির। তার পর বলল, ’ঠিকই তো, আজ আবার কে কী সমস্যা নিয়ে হাজির হবে কে জানে! ভাল কাজ হয়েছে আমার।’
শিশির পাজামা আর পাল্টাল না, তবে পাঞ্জাবিটা হাতের কাছে রেখে দিল। অচেনা কেউ এলে গলিয়ে নিলেই চলবে। শীলাও এক ফাঁকে বসার ঘরের সোফার ঢাকনাটাকনাগুলো ঠিকঠাক করে রাখল, কিন্তু এ রোববারের সকালে কেউ এল না বাড়িতে। এল পরের রোববার। ভদ্রলোককে দেখে বেশ অবাক হয়ে গেল শিশির। পাশের পাড়ায় থাকেন, বাজারে কিংবা পথেঘাটে মুখোমুখি দেখা হয়ে গেলে ‘কী ভাল তো’— এই পর্যন্ত সম্পর্ক। ভদ্রলোক একটু আমতা-আমতা করে বললেন, ‘ভেবেছিলাম বাজারেই আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে, তা— আপনি কি আজ একটু তাড়াতাড়ি গিয়েছিলেন?’
বাজার যাওয়ার সময় ঘড়ি দেখেনি শিশির, আগে-পরের হিসেবটাও ওর কাছে পরিষ্কার নয়, কিন্তু এ নিয়ে মাথা না ঘামাবার জন্যেই বলল, ‘হ্যাঁ, আজ একটু তাড়াতাড়ি গিয়েছিলাম, আসুন—।’
বসার ঘরে সোফায় বসবার মুখে ভদ্রলোক বললেন, ‘একটা ব্যাপারে আপনার কাছে—’
থামিয়ে দিয়ে শিশির বলল, ‘বসুন, বসুন, আমি আসছি।’ পাশের ঘরে গিয়ে গায়ে পাঞ্জাবি চাপিয়ে নিল শিশির, তারপর রান্নাঘরে এসে চাপা গলায় শীলাকে বলল, ‘দু কাপ চা, মক্কেল এসেছে।’
‘আবার পরামর্শ?’
‘তা ছাড়া আবার কী?’
‘কে?’
‘নামটা ঠিক মনে করতে পারছি না। এদিকেই থাকে, বাজারে-টাজারে দেখা হয়।’
শীলা নকল বিরক্তি চোখেমুখে ফুটিয়ে বলল, ‘ভাল কাজ হয়েছে, তুমি দেবে পরামর্শ আর আমাকে বানাতে হবে চা।’
ঝলমলে মুখে জবাব দিল শিশির, ‘দাঁড়াও-দাঁড়াও, এবার থেকে ফিজ নেব। বিনি পয়সায় এত সমস্যা সমাধান করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
বসার ঘরে ও ফিরে আসতেই ভদ্রলোক বললেন, ‘আপনার ছেলেকে দেখছি না তো। গেছে কোথাও?’
‘হ্যাঁ, রোববার সকালে ও একটা ট্যুইশান নিতে যায়।’
‘কোথায়?’
‘পার্ক সার্কাস।’
‘পার্ক সার্কাস!’ ভদ্রলোক যেন সামান্য একটু আঁতকে উঠলেন। পার্ক সার্কাস শুনে কাউকে কখনও এরকম চোখমুখের ভঙ্গি করতে দেখেনি শিশির।
ভদ্রলোক এবার বেয়াড়া একটা প্রশ্ন করে বসলেন, ‘পার্ক সার্কাস, মানে ও ওখানে ঠিক ঠিক পড়তে যায় কি না খোঁজ নিয়ে দেখেছেন কখনও?’
প্রশ্নটা শুনে শিশিরের কপালে ভাঁজ পড়ল কয়েকটা। একটু বিরক্ত মুখেই ও জিজ্ঞেস করল, ‘হঠাৎ এ রকম কথা বলছেন কেন?’
ভদ্রলোক এবার কেমন যেন নিশ্চিত মুখে বললেন, ‘সেই জন্যেই তো আপনার কাছে আসা। আসলে এটা তো আপনার একার প্রবলেম নয়, আমাদের সবারই—। যা দিনকাল পড়েছে, এই বয়সের ছেলেমেয়েরা এখন বাবা-মা’র মস্ত এক হেডএক।’
এই ধরনের কথাবার্তা যে কোনও বাবাকেই ঘাবড়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। শিশির শুকনো মুখে জিজ্ঞেস করল, ‘কী করেছে ও?’
ভদ্রলোক ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে যা বললেন তা রীতিমতো সাংঘাতিক। শিশিরের ছেলে প্রসেনজিৎকে বেকবাগানের কাছে এক ড্রাগের আস্তানায় দেখেছেন। যার সঙ্গে দেখেছেন সে লোকটা একটা কুখ্যাত ড্রাগ পেডলার। অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের ওষুধের নেশা ধরানোই ওর কাজ। নেশা ধরো, নেশার জন্যে ওষুধ কেন। ইশ! কী ভয়ঙ্কর চক্রান্ত! বাচ্চা-বাচ্চা ছেলেমেয়েদের এরা একেবারে শেষ করে দিচ্ছে। এই নেশা ধরার অর্থ হল, দু-তিন বছরে পঙ্গু কিংবা পাগল হয়ে যাওয়া। মারাও যাচ্ছে কতজন।
ভয়ঙ্কর ছবিটা শিশিরের চোখের সামনে ফুটিয়ে তুলে ভদ্রলোক বললেন, ‘অফিসের কাজে পার্ক সার্কাসের দিকে প্রায়ই যেতে হয় আমাকে। তা সেদিন যেতে যেতে বেকবাগানের এক ড্রাগের ঠেকে আপনার ছেলেকে দেখে আমি চমকে উঠেছিলাম। প্রথমে তো বিশ্বাসই করতে পারিনি, তার পর একটু আড়াল থেকে লক্ষ্য করে দেখলাম— হ্যাঁ, আপনার ছেলেই। যার সঙ্গে কথা বলছিল তাকেও আমি চিনি, হারামজাদা নেশার ওষুধ বেচে। তখনই ঠিক করলাম যত তাড়াতাড়ি পারি ব্যাপারটা আপনাকে জানাতে হবে। সর্বনেশে নেশা! মদ খাওয়া তো এর কাছে ছেলেমানুষ। অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা মজা করার জন্যে নেশাটা ধরে, তার পর অ্যাডিক্ট হয়ে যায়। আমার এক বন্ধুর ছেলে তো ড্রাগ-ভিকটিম, এখন নার্সিংহোমে আছে। শেষ পর্যন্ত কী হবে কে জানে। আপনি প্রতিবেশী, এ ব্যাপারটা আপনাকে জানানো কর্তব্য মনে করে—।’
ভদ্রলোকের কথা শুনতে শুনতে শিশিরের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। ও বিশ্বাসই করতে পারছিল না, ষোলো বছরের নির্দোষ চোখমুখের ছেলেটা এইরকম একটা কাণ্ড ঘটিয়ে বসে আছে।
শিশিরের চোখমুখের অবস্থা দেখে ভদ্রলোক সমবেদনা জানাবার গলায় বললেন, ‘আপনি অত ঘাবড়ে যাবেন না। ও হয়ত এখনও নেশার প্রথম স্টেজে আছে, অ্যাডিক্ট হয়নি। আচ্ছা, বাড়িতে ওর খাওয়াদাওয়ার পরিমাণ কি খুব কমে গেছে?’
প্রশ্নটার উত্তর দিতে শিশিরের বেশ সময় লাগল। ও থেমে থেমে বলল, ‘কই, সেরকম তো কিছু দেখিনি।’
‘স্বাস্থ্য আগের চেয়ে খারাপ, গায়ের রঙ আগের চেয়ে কালো হয়ে গেছে কি?’
‘না তো।’
‘পাঁচটা অজুহাতে বাড়তি টাকাপয়সা চাওয়া— আচ্ছা, বাড়ি থেকে ইদানীং কি আপনাদের টাকাপয়সা চুরিটুরি যাচ্ছে?’
ভদ্রলোকের কথায় শিশিরের ভেতর থেকে হঠাৎই সনাতন এক বাঙালি বাবা জেগে উঠল। ও খসখসে কিন্তু একটু উঁচু গলায় বলল, ‘না, একেবারেই না। প্রসেনজিৎ কখনই বাড়তি পয়সাকড়ি চায় না। বরং হাত খরচার পয়সা বেঁচে গেলে ও ওর মাকে ফেরত দিয়ে যায় অনেক সময়।’
শিশিরের কথাগুলো ভদ্রলোক একেবারেই গুরুত্ব না দিয়ে বললেন, ‘মুশকিল হচ্ছে কি— নেশা একবার ধরে গেলে স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি তো আর কাজ করে না। কত ভাল ভাল ছেলে—।’
ওঠার আগে ভদ্রলোক শিশিরকে নেশাখোরের লক্ষণগুলো বুঝিয়ে দিলেন। বুঝিয়ে দিলেন, কীভাবে বুঝতে হবে ছেলে ওষুধের নেশা ধরেছে কি না। আর একটা ব্যাপার— এই নিয়ে ছেলেকে ধমকধামক দেওয়া বা কড়া শাসন করা একেবারেই ঠিক নয়। ওষুধের নেশার ক্ষতিকারক দিকগুলো সম্পর্কে ওকে ভাল করে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ফিরিয়ে আনতে হবে আস্তে আস্তে।
ভদ্রলোক একজন সমব্যথীর মতো শিশিরকে এই সম্পর্কে আরও অনেক কিছু বলে গিয়েছিলেন, কিন্তু সব কথা ওর কানে যায়নি। প্রচণ্ড উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তায় ওর মাথাটা কেমন যেন অবশ হয়ে গিয়েছিল।
চা খেয়ে ভদ্রলোক বিদায় নিলেন এক সময়। শিশির বসার ঘরে বসেই থাকল পাথরের মতো। একটু বাদে শীলা ঢুকল ঘরে। শিশিরের কালো হয়ে যাওয়া মুখটা ও খুঁটিয়ে দেখেনি, বেশ সহজ গলায় বলল, ‘আরে, এ ভদ্রলোককে তো আমিও দেখেছি। কী জন্যে এসেছিলেন তোমার কাছে? সমস্যা?’
কথার কোনও উত্তর দিতে পারল না শিশির। ফিরে আবার একই প্রশ্ন করতে গিয়ে শিশিরের থমথমে মুখটা চোখে পড়ল শীলার। ‘কী, কী হয়েছে তোমার? কোনও খারাপ খবর?’
খবরটা যে ভাল নয় বুঝতে পেরেছিল শীলা, কিন্তু কত খারাপ সেটা ও কল্পনাও করতে পারেনি। থেমে থেমে, সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত মানুষের ভঙ্গিতে শিশির ছেলের ওষুধের নেশা ধরার কাহিনীটা শোনাল। শুনতে শুনতে শীলার মুখ রক্তহীন হয়ে গিয়েছিল, ও ধপ করে বসে পড়ল পাশের ডিভানের ওপর।
একটু আগে পর্যন্ত যে সংসারের প্রতিটি আসবাবপত্রের ওপরেও সুখের গাঢ় ছাপ ছিল, এখন তার রঙ ফিকে হয়ে গেছে একদম। উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তায় বোবা হয়ে গিয়েছিল স্বামী-স্ত্রী। ওষুধের নেশার ভয়ঙ্কর পরিণামের কথা এর আগেও ওদের কানে এসেছে কয়েকবার, কিন্তু সেটা যে এইরকম বিপজ্জনকভাবে ওদের বাড়িতে এসেও হাজির হবে কে জানত!
উদ্বেগ-উত্তেজনা মাত্রা ছাড়িয়ে উঠলে মূল কারণটাকেই বোধহয় অবিশ্বাস করার একটা প্রবণতা জেগে ওঠে। সম্ভবত সেই মনোভাব থেকেই শীলা এক সময় বলে উঠল, ‘বাদ দাও তো ওই লোকটার কথা, কিছু কিছু লোক আছে যাদের সব কিছু বাড়িয়ে বলা স্বভাব। কাকে না কাকে দেখেছে আর দোষ দিচ্ছে প্রসেনজিতের। ও কখনও এ সব করতে পারে না, বাড়ি ফিরলেই আমি জিজ্ঞেস করব।’
হাঁ-হাঁ করে উঠল শিশির। ‘এ সব নিয়ে তুমি ওকে একটা কথাও জিজ্ঞেস করবে না। কী বলতে কী বলে ফেলবে, তার উত্তরে ও হয়ত…। আসলে এই বয়সের ছেলেরা ভীষণ সেন্টিমেন্টাল হয়। হয়ত শখ করে একদিন খেয়েছে, কিন্তু ধমক-ধামক দিলে জেদ চেপে যেতে পারে ওর। তার ফল আরও খারাপ হবে।’
সামান্য একটা প্রশ্নের আড়ালে এত জটিলতার ছায়া দেখতে পেয়ে ঘাবড়ে গেল শীলা। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পরে ভয়ার্ত গলায় বলল, ‘তা হলে ওকে কে জিজ্ঞেস করবে? তুমি?’
‘ননা আমিও না। আচ্ছা ওর বন্ধু পিনাকীকে দিয়ে খোঁজ নিলে কেমন হয়? তবে ও-ও যদি আবার একই দলের মধ্যে থেকে থাকে!’
কাকে দিয়ে কীভাবে খোঁজখবর নেওয়া যায়, পার্ক সার্কাসের ট্যুইশানটা ছাড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে কিনা— এ সব নিয়ে দু’জনের মধ্যে বিস্তর আলোচনা চলল, কিন্তু কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারল না ওরা। তবে একটা বিষয় ঠিক হল, বাড়ির মধ্যে ছেলের প্রতিটি ব্যাপারে আলাদা করে নজর রাখবে শীলা। ওর জামা-প্যান্টের পকেট, পড়ার টেবিলের ড্রয়ার-ট্রয়ারগুলোও দেখতে হবে ভাল করে। অবশ্য এমনভাবে, যাতে ও কোনও রকম সন্দেহ না করে।
বাইরে ঝলমলে আলো, কিন্তু ঘরের মধ্যে গাঢ় অন্ধকার কেমন যেন চেপে বসতে লাগল একটু একটু করে। দুপুরে খাওয়ার সামান্য আগে বাড়ি ফিরল প্রসেনজিৎ। ফিরতেই দু’জোড়া সন্ধানী চোখ ওর মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খুঁটিয়ে দেখে নিল, কিন্তু কই কোত্থাও তো কোনও রকম অস্বাভাবিকতার চিহ্ন নেই। ষোলো বছরের কিশোরের ঝকঝকে সতেজ চেহারা, নাকের নিচে গোঁফের মৃদু আভাস। বাবা মায়ের চোখের দৃষ্টি যে গোয়েন্দার মতো হয়ে উঠেছে টের পেল না ছেলে। হাতের বই টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে সহজ গলায় বলল, ‘মা খেতে দাও, খিদে পেয়ে গেছে।’
বাইরের চোখে সব কিছুই আগের মতো, নাকি ভেতরে ভেতরে মস্ত এক পরিবর্তন ঘটে গেছে! বাইরের এই পরিবর্তনের সঠিক চেহারাটা ধরতে না পেরে ভেতরে ভেতরে শীলা আর শিশির মাত্রাতিরিক্ত উদ্বিগ্ন আর অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছিল।
দু’দিন প্রচণ্ড ছটফট করে কাটাবার পরে শিশির অফিস থেকে সরাসরি বাড়ি ফিরল না সেদিন। উল্টো দিকের বাস ধরে অধ্যাপক করুণাময় গুপ্তর বাড়ি গিয়ে হাজির হল। অধ্যাপকটি পণ্ডিত এবং সজ্জন। শিশিরকে দেখে অধ্যাপক বেশ খুশি হয়ে বললেন, ‘আসুন-আসুন, বহুদিন পরে দেখা হল। খবর-টবর ভাল তো?’
শিশির বিব্রত মুখে জবাব দিল, ‘অনেক দিন ধরেই আপনার কাছে আসব-আসব করছি, কিন্তু আসা আর হয়ে উঠছিল না; তা আজ অফিস থেকে বেরিয়ে ভাবলাম আপনার কাছে একবার—।’
‘খুব ভাল করেছেন’, প্রসন্ন হাসিতে ঝলমল করে উঠল অধ্যাপকের মুখ। হাসিটা বজায় রেখেই তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার খবর-টবর সব ভাল তো?’
‘না, ভাল আর কই! আপনার কাছ থেকে কিছু পরামর্শ নেওয়ার জন্যে এসেছি!’
উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন অধ্যাপক। ‘পরামর্শ? কেন কী হয়েছে।’
শিশির তখন ছেলের ওষুধের নেশা করার ব্যাপারে যা যা শুনেছে সব জানিয়ে বলল, ‘এই তো অবস্থা, এখন কী করি বলুন তো? সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের মাথার ঠিক নেই।’
উত্তরে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর অধ্যাপক যা বললেন তা শুনে ভীষণভাবে চমকে উঠল শিশির। বললেন, ‘কথায় আছে নিজেদের বিপদে অতিবড় বুদ্ধিমানরাও বোকা বনে যায়। কথাটা বোধহয় একেবারে মিথ্যে নয়। সত্যিই তো, বড় রকমের বিপদের মধ্যে পড়লে ক’জনেরই বা মাথার ঠিক থাকে। আমি আপনাকে একটা কথাই শুধু বলতে পারি— মন শক্ত রাখুন, ভেঙে পড়বেন না, আর তাড়াহুড়ো করে কোনও সিদ্ধান্ত নেবেন না। সময়, স্রেফ সময়ই অনেক সময় নিজে থেকে বহু জটিল সমস্যার সমাধান করে দেয়।’
হুবহু এই কথাগুলো বলেই শিশির সমস্যাজর্জর কয়েকজন মানুষকে সান্ত্বনা দিয়েছিল, এখন ওকেই আবার সেই কথাগুলো শুনতে হচ্ছে আর একজনের মুখ থেকে! এটা কী করে সম্ভব?
কিন্তু এই প্রশ্নের মধ্যে আটকে থাকতে পারল না শিশির, চেনা কথাগুলোর মধ্যে কী যেন একটা গভীর অর্থ আছে। সেটা বোঝার জন্যে ব্যগ্র হয়ে উঠল ও।
অধ্যাপক দেশ-বিদেশের জ্ঞানীগুণীদের প্রাসঙ্গিক কথাবার্তা শোনাচ্ছিলেন ওকে। ঠিক এগুলোই শিশিরও শুনিয়েছে কয়েকজনকে, কিন্তু কী আশ্চর্য, তখন তো ও এমন উদ্বুদ্ধ হয়নি! হাপুরুষের বাণী ওর সমস্ত উদ্বেগ-উত্তেজনাকে কী চমৎকারভাবে শান্ত করে দিচ্ছিল। মনের মধ্যে পুরনো সেই জোর একটু-একটু করে ফিরে আসছিল আবার।
অধ্যাপকের কথা শেষ হলে শিশির কৃতজ্ঞ মুখে বলল, ‘আপনার কথাগুলো শুনে সত্যি মনে বেশ জোর পেলাম। ঠিক আছে আজ তাহলে চলি। আপনার অনেকটা সময় বোধহয়—।’
‘ননা একেবারেই না, বরং অনেকদিন পরে আপনার সঙ্গে গল্প করে বেশ ভাল লাগল। সময় পেলে চলে আসবেন আবার।’
অধ্যাপকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি ফিরে এল শিশির। ফিরতেই শীলা জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার, আজ তোমার এত দেরি হল কেন?’
জুতোর ফিতে খুলতে খুলতে উত্তর দিল শিশির, ‘একটু কাজ ছিল।’
কী কাজ তার কোনও খবর না নিয়ে ঝলমলে গলায় শীলা বলল, ‘এই শোনো, এ-ঘরে এসো।’
শীলার কথা বলার ধরনে একটু অবাক হল শিশির, কিন্তু পাল্টা প্রশ্ন না করে ওর পেছন-পেছন শোবার ঘরে গিয়ে হাজির হল। শীলা এদিক-ওদিক একটু সন্ধানী চোখে দেখে নিয়ে বলল, ‘জানো, আজ না ওকে আমি সব কিছু খোলাখুলি জিজ্ঞেস করেছি।’
‘কাকে?’
‘কাকে আবার, তোমার ছেলেকে। ও না সব কিছু স্বীকার করেছে। বলেছে একদিন মোটে খেয়েছে, তবে বিচ্ছিরি নেশা। আমি যত ওকে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করি ও তত হাসে। হাসতে হাসতে বলেছে, তোমরা এ নিয়ে শুধু-শুধু দুশ্চিন্তা কোরো না তো। ড্রাগের নেশা যে কত খারাপ তোমাদের চেয়ে আমি ঢের বেশি জানি। আমাদের বন্ধুদের মধ্যেই তো দু’জন এই নেশা ধরে হাসপাতাল থেকে ঘুরে এসেছে। আমাকে নিয়ে একদম ভাববে না তো। সত্যি, ও কথাগুলো এমনভাবে বলল না, আমার বুক থেকে পাথর নেমে গেছে।’
অধ্যাপক করুণাময়ের কথা শুনতে শুনতে একটু আগেই শিশিরের বুকের পাথরটা হালকা হয়ে গিয়েছিল, শীলার কথায় এবার সেটা অবলীলায় হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে জানলা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।
শিশির শোবার ঘরের একমাত্র চেয়ারটায় হেলান দিয়ে বসে একজন নিশ্চিন্ত মানুষের ভঙ্গিতে বলল, ‘আমি জানতাম।’
‘কী জানতে?’
‘জানতাম সব ঠিক হয়ে যাবে। অকারণ দুশ্চিন্তা করার কোনও মানে হয় না।’ ওদিকের ঘর থেকে ছেলের পড়ার গুনগুন শব্দ ভেসে আসছিল এ ঘরে। হালকা হাওয়ায় ওই শব্দটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে গোটা পরিবেশকে কী চমৎকার শান্ত আর স্নিগ্ধ করে তুলেছিল।
আরাম করে একটা সিগারেট ধরিয়ে মৃদু অথচ স্পষ্ট গলায় শিশির বলল, ‘কথায় আছে নিজেদের বিপদে অতিবড় বুদ্ধিমানরাও বোকা বনে যায়। কথাটা বোধহয় একেবারে মিথ্যে নয়। সত্যিই তো, বড় রকমের বিপদের মধ্যে পড়লে ক’জনেরই বা মাথার ঠিক থাকে। একটা কথাই শুধু বলতে পারি— মন শক্ত রাখো, ভেঙে পড়বে না, আর তাড়াহুড়ো করে কোনও সিদ্ধান্ত নেবে না। সময়, স্রেফ সময়ই অনেক সময় নিজে থেকে বহু জটিল সমস্যার সমাধান করে দেয়…।’
সামনের খাটের একপ্রান্তে বসে কথাগুলো শীলা একমনে শুনছিল। শুনতে শুনতে বারবার ওর মনে হচ্ছিল, ওগুলো বোধহয় শিশির নয়, আর কেউ বলছে। কেন এমন মনে হচ্ছে বুঝতে পারল না শীলা। তবে এটা পরিষ্কার টের পাচ্ছিল, কথাগুলো শুনতে শুনতে ওর মনের জোর বেড়ে উঠেছে রীতিমতো।
