অশোক দাশগুপ্ত : নমস্কার কলকাতা
ভদ্রতা ও বিনয়ের অভিনয়ের কোনও কম্পিটিশন হলে রহিম আলি মোল্লা একই সঙ্গে ফার্স্ট, সেকেন্ড এবং থার্ড হতেন। অষ্টআশির ১৭ জুন তিনি যতই ‘হেঁ হেঁ, এ আর এমন কী’ করতে থাকেন কলকাতার পৌনে এক ডজন ফর্সা কালো মোটা রোগা রাগী ঠান্ডা স্পোর্টস রিপোর্টার এক সুরে বলতে থাকেন, ‘দাদা, স্টোরিটা দিন দাদা…।’ একজন ‘দাদা দিন, দাদা দিন’ বলতে বলতেই চোখ টিপে যাচ্ছিলেন অবশ্য। তাঁর মনের আশা, চোখের প্রার্থনা: এখন কিস্যু না বলাই ভাল, মাঝরাতে আপনার সঙ্গে আলাদা কথা বলে এক্সক্লুসিভ মারব। রহিম আলি মোল্লা চোখ টেপাটেপি বিলক্ষণ পছন্দ করেন, কিন্তু অষ্টআশির ওই ১৭ জুন তাঁর ওসব লক্ষ্য করার মতো মনের অবস্থা ছিল না। তাঁর দোকানে একসঙ্গে এত রিপোর্টার এই প্রথম। সুস্বাদু চায়ের শরবত খাওয়াতে খাওয়াতে তিনি টেবিলে ছোট ছোট টোকায় তবলা বাজাতে থাকলেন। জানলে, গানই গাইতেন। ময়দানে বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল। সব সময় হাঁটুর বয়সী রিপোর্টারকেও ‘দাদা’ ডেকে এসেছেন। কিন্তু ওই আশ্চর্য ১৭ জুনে, সব রিপোর্টার তাঁকেই দাদা বলছেন। এগারো নম্বর অনুরোধে সাড়া দিয়ে মোল্লা কোমল গান্ধারে বাজলেন, ‘হেঁ, হেঁ হেঁ, হেঁ হেঁ হেঁ, প্লাতিনির জন্য আমরা দেড় বছর ধরেই ট্রাই করছিলাম। আমার কিছু ফরেন কন্টাক্ট আছে। মোট একুশ জন একশো তিনবার মিট করেছেন প্লাতিনিকে। কয়েকটা প্রবলেম ছিল। খুব জলেও ফুটবল হয় কিনা, কীরকম স্ট্যান্ডার্ড, প্রফেশনাল ফুটবল চালু কিনা, কী পরিমাণ মারধর হয়, রেফারিদের পকেটে রেড কার্ড থাকে কিনা, পাবলিক কতটা চেঁচায়, টেন্টে আলাদা রিটায়ারিং রুম আছে কিনা— প্লাতিনির হাফ ডজন পারসোনাল অফিসিয়ালের প্রশ্নের আর শেষ নেই। এরকম তিনটে মিটিংয়ে আমি নিজে ছিলাম। সব এক্সপিরিয়েন্স ফেল করে গেল। এতকাল যত নেগোসিয়েশন করেছি, তার লাইন এইরকম: ষাট হাজারে রাজি হয়ে যাও ভাই। ভ্যাট, দেড় লাখ! মাথা গরম করে না দাদা, সত্তর। ঠিক আছে যান, এক লাখ চল্লিশ। ভা-ই, আমাকে বাঁচাও, আশি। এইরকম চলতে চলতে নব্বই থেকে এক দশের মধ্যে রফা। কিন্তু কী প্রবলেম ভাবুন, প্রথম বাইশটা মিটিংয়ে প্লাতিনির এজেন্টরা টাকার কথাই তোলেনি। শুধু উল্টোপাল্টা কোয়েশ্চেন। ছোটবেলায় পরীক্ষা দেবার সময়ও এত ঝঞ্ঝাটে পড়িনি, জানেন। মনে হল, টাকাটা বোধহয় কোনও ফ্যাক্টর নয়। কিন্তু দাদা, হেঁ হেঁ হেঁ, অ্যামাউন্ট নিয়ে কটা মিটিং করতে হল জানেন? এইটিওয়ান! কতয় রফা হল, বলা যাবে না। মোটামুটি একটা আন্দাজ দিতে পারি। জামশিদের অ্যামাউন্ট ইন্টু নাইন্টি টু প্লাস মইদুলের পেমেন্ট ইন্টু হানড্রেড অ্যান্ড ফর্টি ফাইভ। ফরেন এক্সচেঞ্জের ব্যাপার, এই কথাগুলো না লিখলেই ভাল হয়, দাদারা। লিগের সাতটা ম্যাচ হয়ে গেছে। দু’পয়েন্ট গেছে। যাক গে। এবার সবাইকে হারাব। বি গ্রুপে ফেলে দিয়েছিল, এবার থোঁতা মুখ ভোঁতা করে দেব সদ্যুৎ দত্তর। আরও খারাপ খারাপ কথা মনে আসছে। কিন্তু মুখে আনতে পারছি না। আপনারা তো জানেনই, আমি এসব পারি না। আপনারা খুব রিকোয়েস্ট করলে অবশ্য পারতে পারি। হেঁ হেঁ।
ফর্সা কালো মোটা রোগা রাগী ঠান্ডা রিপোর্টাররা ততক্ষণে উঠে পড়েছেন, তখনই অফিসে পৌঁছে কপি নামাতে হবে। হঠাৎ একজনের মাথা খুলে গেল: দাদা আসল কথাটাই তো এখনও বলেননি, কবে আসছেন প্লাতিনি। তখন উঠল হাসি ভসভসিয়ে সোডার মতো পেট থেকে। এরকম অসভ্যের মতো খোলা হাসি রহিম আলি মোল্লা সারা জীবনে হাসেননি। মোল্লার হাসির রিনিঝিনির মধ্যেই খুলে গেল পেছনের একটি দরজা: প্লাতিনি! ১৭ জুন, ১৯৮৮, রাত নটা সাতচল্লিশ মিনিট একুশ সেকেন্ডে পাঁকে ফুটল পদ্মফুল। মোল্লা হাসি ফার্স্ট গিয়ারে নামিয়ে বললেন, ‘দাদারা, আজ কোনও কথা নয়, শুধু দেখে যান। মিশেল ভাই খুব টায়ার্ড, আজ ছেড়ে দিন।’ চোখ টেপা ওস্তাদসহ সব রিপোর্টার একসঙ্গে হাঁ হাঁ: ‘দাদা, আধ ঘণ্টা টাইম দিন, ফোটোগ্রাফার ডাকি। ছবিটা মিস হলে আমরা বড় জোর চাকরি লুজ করব, কিন্তু পাবলিক কী জিনিস লুজ করবে ভেবে দেখুন। দাদা…।’ আধ মিনিট পাম্পঅধ্যুষিত ঘরে শুধু একটাই আওয়াজ: দাদা, দাদা, দাদা। প্রথম দিনেই অন্তত একটি বাংলা শব্দ শিখে গেলেন মিশেল প্লাতিনি।
দুই
২১ জুন, ১৯৮৮। ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের লনের ঘাসও দুলছিল, যদিও এক ফোঁটা হাওয়া ছিল না। বিকাশ গড়গড়ি পা নাচাচ্ছিলেন আনন্দে, আর তাতেই অনিচ্ছুক ঘাস দুলছিল দুঃখে। ফাইভ ফিফটি ফাইভের প্যাকেট দেখিয়ে দেখিয়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে সিগারেট খেতে খেতে হঠাৎ-কর্মকর্তা চোখ-টেপা রিপোর্টারকে বলছিলেন, ডিলটা কীভাবে কমপ্লিট হল। চোখ-টেপার মুখে হাসি নেই। এত বড় স্কুপ, কিন্তু মোট সাড়ে ছ’টা, সব ব্যাটা ঠিক খবর পেয়ে যাবে। বিকাশ গড়গড়িদের হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও খবরটা হয়ত শেষ পর্যন্ত এক্সক্লুসিভ থাকবে না। গড়গড়িয়ে বলে চললেন হঠাৎ-কর্মকর্তা: ‘আপনার কোনও চিন্তা নেই। কেউ খবর পাবে না। এই তো, চারটে নাগাদ আমার গাড়িটা নিয়ে মৌলালির কাছে জ্যামে আটকে পড়েছিলাম, একসঙ্গে দু-দুটো বাজে কাগজের রিপোর্টারের সঙ্গে দেখা। আমার গাড়ির জানলায় মুখ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, কী বিকাশদা, আর কোনও সাহেব এল নাকি? আপনি একটু হাসুন চোখ-টেপা বাবু। সেই লাস্ট ইয়ার থেকে আপনার মুখে হাসি ফোটানোর জন্য লড়ে যাচ্ছি, কিন্তু আপনি হাসছেন না। ধ্যার মশাই, আপনাদের খিদেই মেটে না। এই তো, আবার রেগে যাচ্ছেন, কিছু মনে করবেন না, সেই ছোটবেলা থেকে লুজ টকের অভ্যাস। যদি জানতাম, বড় হলে রিপোর্টারদের সঙ্গে কথা বলতে হবে, প্র্যাকটিস করতাম। একবার হয়েছিল কি, এইটি ফোরে, কিশোরকুমারকে প্রায় ফিট করে এনেছি, হঠাৎ মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল…।’ ফসকানো কথাটা শেষ করার আগেই কলকাতার সবচেয়ে কালো আর সবচেয়ে রোগা— এই দুই বিচ্ছিরি রিপোর্টার ইস্টবেঙ্গল লনে ঢুকে পড়ল। বিকাশ গড়গড়ি প্রথমে ভুঁড়িতে, তারপর চুলের সিঙ্গারায় হাত বুলোতে বুলোতে বললেন, ‘সত্যি বলছি, কোনও খবর নেই, মাইরি বলছি, মারাদোনা আসেনি, আসছে না। মা…।’
চোখ-টেপা রিপোর্টার মিনিটে পঁয়ষট্টি স্পিডে চোখ টিপেই যাচ্ছিলেন, কিন্তু ততক্ষণে অন্ধকার নেমে এসেছে, বিকাশ গড়গড়ি দেখতে পাননি। মানুষ খুবই বুদ্ধিমান প্রাণী। মানে, মানুষের বুদ্ধির কোয়ালিটি খুব ভাল। যার একটু আছে, তারও কাজ চলে যায়। বিকাশ গড়গড়ি যে বিকাশ গড়গড়ি, তিনিও বুঝে ফেললেন, হঠাৎ মারাদোনার নাম বলাটা ভুল হয়ে গেছে। চোখ-টেপাবাবু অন্ধকারে বসেই চুল, গোঁফ ইত্যাদি ছিঁড়তে লাগলেন। বিকাশ গড়গড়ি খবরটা যাতে কিছুতেই লিক না হয়, তার ব্যবস্থা করতে ছুটলেন। কালো আর রোগা দুই রিপোর্টার ঝাঁপিয়ে পড়ল রহস্য উদ্ধারে। কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ ও আকাশ সানন্দে লক্ষ্য করলেন, রাত দশটার মধ্যেই মারাদোনাকে খুঁজে বার করল কলকাতার সবচেয়ে কালো আর সবচেয়ে রোগা দুই রিপোর্টার।
মারাদোনা বড় ইন্টারভিউ দিলেন না প্রথম দিন। কিন্তু দু’এক কথায় জানিয়েও দিলেন: কলকাতায় ভাল খেলা তাঁর কাছে একটা চ্যালেঞ্জ। ব্রেহমে, হোয়ের্স্টার বা টেরি বুচারকে টপকানো সম্ভব প্রতিভা থাকলে, কিন্তু কলকাতার ক্রাউড আর অফিসিয়াল— এই দুটো পাহাড় টপকে ভাল খেলে যাওয়া নিশ্চিত নয়, প্রতিভা থাকলেও। মারাদোনার জন্য পার্ক স্ট্রিটে ফাইভ রুম ফ্ল্যাট ঠিক করা হয়েছে। সব ব্যবস্থাই আধুনিক। তবে ফ্ল্যাটের বাইরে যে একুশ জন প্রবল স্বেচ্ছাসেবক শোভা পাচ্ছিলেন, আচরণে উচ্চারণে তাঁরা নিতান্তই মধ্যযুগীয়। মারাদোনা জানতে চান, এঁদের সরানোর জন্য পুলিসে খবর দেওয়া হচ্ছে কিনা। মারাদোনাকে অত্যাশ্চর্য বাংরেজিতে শ্রীযুক্ত গড়গড়ি জানান, সে কি, তাঁকে সেভ করার জন্যই তো ওই একুশ জনকে ‘ফিট’ করা হয়েছে। কলকাতায় প্রথম দিনেই মারাদোনা একটি শব্দের নতুন মানে পেয়ে গেলেন— ফিট!
তিন
রিপোর্টাররা দূরের কথা, ময়দানের বাস্তুঘুঘুরা বা প্রাচীন মহান গাছটিও টের পায়নি যে, উনিশশো অষ্টআশির জুন মাসটা কলকাতার ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ৩০ জুন মোহনবাগান টেন্টের গায়ে টুনি বাল্ব জ্বালিয়ে আর গোটা মাঠে হ্যালোজেন ছড়িয়ে যে প্রেস কনফারেন্স হল, রিপোর্টারদের তাতে বিশেষ অবাক হবার প্রশ্ন ছিল না। মহমেডানে প্লাতিনি আর ইস্টবেঙ্গলে মারাদোনা আসার পরও মোহনবাগানেও কোনও বিদেশি রুই বা কাৎলা আসবেন কিনা তা নিয়ে অবশ্য কিছু সন্দেহ ছিল। কলকাতায় পৌঁছনোর দু’দিনের মধ্যেই শহরের সব কটা কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় মারাদোনা ময়দানেরই একটি ছবি দেখে আঁতকে ওঠেন। মোহনবাগান টেন্টে আগুন জ্বলছে, আগুন সামনের রাস্তায় কিছু গাড়িতেও। ঝানু ফোটোগ্রাফাররা বলাবলি করছিলেন, অনেকদিন পর কিছু দারুণ ছবি তুলে আনন্দ পাওয়া গেল। সেই যেবার লতিফের চোখ তুলে নেওয়ার চেষ্টা হল, সেবারও গাড়ি পুড়েছিল, কিন্তু তখন মারুতি ছিল না। এবার ফ্রেমে দুটো মারুতিও থাকায়, ছবি খুলে গেছে। টেন্টে আগুন ধরানোর আগে মোহনবাগান সমর্থকদের অগ্রগামী অংশ অবশ্য কর্মকর্তাদের কাছে একটি ডেপুটেশন দিয়েছিলেন। ক্লাবের প্রধান কর্মকর্তা বীরেন দে তাঁদের বলেন, ‘আপনারা মোহনবাগান সমর্থক, আপনাদের এরকম উত্তেজিত হওয়া সাজে না। আমাদের ট্র্যাডিশন…।’
— ‘দুশশশ ট্র্যাডিশনের বাচ্চা। ওসব ডায়ালগ মেলা শুনেছি। পেলে কবে আসবে?’
— ‘পেলে? অ, আপনারা ফরেন কোচ চাইছেন!’
— ‘ইয়ার্কি মারছেন? পেলে বলতে আমরা ভাল পেলেয়ারের কথা বলছি। কাকে আনছেন? কবে?’
— ‘জানেন, মোহনবাগান একবার শিল্ড ফাইনালে একটা গোটা ফরেন টিমকে খেলানোর চান্স পেয়েছিল, খেলালে চ্যাম্পিয়ন হওয়া কেউ আটকাতে পারত না, মোহনবাগানের জার্সি পরে শিল্ড ফাইনালে ডেনিস কম্পটন খেলতেন, কিন্তু ক্লাব খেলায়নি। আমরা ফরেন ফুটবলার খেলাই না। আমাদের ট্র্যা…’
— ‘মেলা ট্র্যা ট্র্যা করবেন না। শেষে একটা ট্র্যাজেডি হয়ে যাবে। আপনার, আপনার সব চামচের মুখের জিওগ্রাফি পাল্টে যাবে।’
— ‘কিন্তু মোহনবাগান ফরেন ফুট…’
— ‘থামুন মশাই! গণেশ থাপা যে নেপাল থেকে এসেছিল, ও ইন্ডিয়ার লোক নাকি?’
— ‘নেপাল কি ফরেন হল নাকি? (সুগন্ধি রুমাল নাকে ঠেকাতে ঠেকাতে) তাহলে এটা চাদর। এটা মোহনবাগান ক্লাব। আমাদের একটা ট্র্যা—।’ বীরেন দে-র কথা শেষ হয়নি। মোহনবাগান জনতার অগ্রগামী অংশ টেন্টে পেট্রল ছেটাতে শুরু করে। টেন্ট পুড়ে ছারখার। কত গাড়িতে আগুন। দৌড়তে গিয়ে কত দামি ধুতি ছিঁড়ে ফালাফালা। কতজনের মাথা ফাটা, হাতে পায়ে চোট। আর একবার প্রমাণিত হল বীরেন দে-র টাইমিং। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে তিনি আশ্চর্য মসৃণতায় ছিটকে বেরন, ওই যে ‘ট্র্যা’-টুকু বলতে পেরেছিলেন লনে দাঁড়িয়ে, যেরকম দ্রুত গাড়ির দিকে গেলেন যে মনে হল, সিটে বসেই বাকিটুকু উচ্চারণ করেছিলেন হয়ত: ‘ডিশন!’ সাদা মারুতি বেঙ্গল ক্লাবের গেটে দাঁড়াল। কলকাতার সবচেয়ে স্মার্ট ড্রাইভারের পিঠ চাপড়ে বীরেন দে লিফটের দিকে এগোলেন। টেন্টটা গেল। কত টাকা নষ্ট হল? সেন্টিনারির মুখে এতকালের একটা ট্র্যাডিশন কি ভাঙা হবে? বীরেন দে দুটি সিদ্ধান্ত সেই মুহূর্তেই নিয়ে ফেললেন। এক, যা ভাবার পরদিন ভাববেন। এবং দুই, ভুলেও কখনও মোহনবাগান টেন্টে আর ‘ট্র্যাডিশন’ শব্দটা উচ্চারণ করবেন না।
সাতদিনের মধ্যেই ময়দানে আবার দিব্যি দাঁড়িয়ে গেল মোহনবাগান টেন্ট। মাঝ থেকে রঙে আরও জেল্লা এল। বীরেন দে বললেন, খুব ভাল করে হোক, সেন্টিনারির কাজ শুরু হয়ে গেল ধরে নাও। নতুন রঙের ওপর টুনি বাল্বের ঝিকিমিকি, সকালে নাকি কিঞ্চিৎ পুজোটুজো হয়েছে, মাইকে বিসমিল্লার সানাই।
প্রেস কনফারেন্স শুরু করলেন বীরেন দে: আজ মোহনবাগান ক্লাবের পক্ষ থেকে দুটো অ্যানাউন্সমেন্ট আছে। প্রথমটাই বেশি ইম্পর্টান্ট । ফরেন ফ্লেয়ার আনা হবে না— এই কনভেনশন, ট্র্যা… (আলতো জিভ কেটে সামলে নিলেন) থেকে মোহনবাগান ক্লাব সরে আসার ডিসিশন নিয়েছে, শুধু এই বছরের জন্য। সামনের বছর সেন্টিনারি ইয়ার, আমরা আবার ট্র্যা… (আবার সামলে নিলেন) কনভেনশনে ফিরে যাব। সেকেন্ড অ্যানাউন্সমেন্টটা সামান্য: এবার মোহনবাগানে খেলবেন জিকো। দশ মিনিটের মধ্যেই ও এখানে পৌঁছে যাবে। খুব ভাল ছেলে। সুব্রতর মতো মুখে মুখে তর্ক করে না। সুরজিতের মতো কাগজে লেখে না। আপনারা ওর ইন্টারভিউ নেবার জন্য আধঘণ্টা সময় পাবেন। কিন্তু একটা কথা, ক্লাবের ইন্টারনাল ব্যাপার নিয়ে কোনও কোয়েশ্চেন করবেন না। ওর কন্ট্র্যাক্টেও একথা লেখা আছে।
চা বিস্কুট ফুরোবার আগেই, সাড়ে আট মিনিটের মাথাতেই জিকো পৌঁছে গেলেন। মোহনবাগান জনতার অগ্রগামী অংশের চিৎকারে আকাশ নড়ে উঠল: ‘গুরু! গুরু! গুরু!’ কলকাতায় প্রথম দিনেই জিকো একটি বাংলা শব্দ শিখে গেলেন— গুরু!
চার
কলকাতা ময়দানে প্রথম ম্যাচে প্লাতিনি কিন্তু হ্যাটট্রিক করেননি। দুটো গোল পেয়েছেন, পরপর নয়, মাঝে একটি জামশিদ, এবং দুটোর মধ্যে একটা পেনাল্টি থেকে। বয়স বেড়েছে একটু, টিমের অন্য ফুটবলারদের চিনে তাদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাঁকে রীতিমতো লড়তে হল। শেষদিকে অবশ্য মনে হয়েছে, খুব অল্প দিনের মধ্যেই তিনি এই স্লো মোশন ফুটবলও রপ্ত করে ফেলবেন। এ একেবারে অন্যরকম ফুটবল। এই বয়সে এত দূর বিদেশে ফুটবল খেলে এমন নতুন মজা পাওয়া যাবে, প্লাতিনি ভাবতেই পারেননি। একবার বাঁ-দিক দিয়ে বড্ডই তাড়াতাড়ি উঠে গিয়েছিলেন, ব্যাকসেন্টারটা করার জন্য প্রায় আধ মিনিট অপেক্ষা করতে হল। মুশকিল হল একটাই, গোটা বি এন আর টিমটা ততক্ষণে বক্সে দাঁড়িয়ে গেল। কুড়ি মিনিট পর্যন্ত গোল হয়নি। মহমেডানের একজন ফরোয়ার্ড যেভাবে ফলস চিৎপটাং হয়ে কাতরাতে লাগলেন এবং বুঝেও না বুঝে রেফারি পেনাল্টি দিলেন, চমৎকৃত হতেই হল প্লাতিনিকে। মনে মনে যা ভাবলেন তার সরল বাংলা এই: যতদিন বাঁচি, ততদিন শিখি!
খেলা শুরুর আগেই ইস্টার্ন রেলের গোলকিপার চ্যালেঞ্জ করলেন মারাদোনাকে: ‘হ্যাটট্রিক করতে পারবেন না!’ বাংলাটা বুঝতে না পারার জন্যই সম্ভবত, মারাদোনা ঘাবড়ালেন না এবং একটা হ্যাটট্রিক করে ফেললেন। একজন ইংরেজ, দুজন নাইজেরিয়ান, তিনজন ইরানি, চারজন ভারতীয়র সঙ্গে এক টিমে সেট হতে দশ মিনিট সময় লাগেনি দিয়েগো মারাদোনার। আর পাবলিক? দেড় টানে দুজনকে টপকাতে টপকাতে মারাদোনা ভাবলেন ‘ফুঃ! নাপোলির সাপোর্টারদের কাছে এই পাবলিক!’
ইস্টবেঙ্গল পাঁচ গোলে জিতল। আনন্দে তিনজন আহত হলেন। বিকাশ গড়গড়ি তার অ্যাসিস্ট্যান্টের কাছে খবর নিলেন, ‘নেতাজি ইনডোরের ডেটটা ঠিক করে এসেছিস তো, আশাজি আর্টিস্ট, মারাদোনা চিফ গেস্ট। ব্ল্যাকেও টিকিট পাবে না পাবলিক!’ গোলকিপার ভাস্কর গাঙ্গুলির সামান্য লেগেছে। একজন ক্লাবকর্মী বরফ দিচ্ছিলেন। এক কর্মকর্তা জিজ্ঞেস করে গেলেন: ‘জাপানের গোলকিপারটাকে আনাতে হবে নাকি?’
প্রথম ম্যাচ শেষ হবার আধ ঘণ্টার মধ্যেই মারাদোনা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, আর হ্যাটট্রিক করবেন না। গোলগুলো করতে যে তাঁর খুব পরিশ্রম হয়েছে তা নয়। গোল করতে যে তাঁর খুব খারাপ লাগে— ব্যাপারটা তা-ও নয়। তাঁর সিদ্ধান্তের কারণ ভালবাসা। ভালবেসে, হ্যাটট্রিক করার জন্য মারাদোনার পিঠ চাপড়ে দেন ইস্টবেঙ্গলের চুরানব্বইজন প্রবল কর্মকর্তা। দুনিয়া জুড়ে মারকুটে ডিফেন্ডারদের কাছে বিস্তর মার খেয়েছেন তিনি, কিন্তু এই প্রথম পিঠে ব্যথা হল।
বীরেন দে নাকে রুমাল তুলতেই ভুলে গেলেন। জর্জ টেলিগ্রাফ ম্যাচে যদি পঞ্চান্ন মিনিট আটকে থাকতে হয়, তাহলে জিকোকে এনে কী লাভ? টেন্ট তো আবার পুড়বে। উঠে দাঁড়ালেন। টাইমিং। গাড়ির দিকে যেতে হবে। পা বাড়াতেই শুনতে পেলেন আওয়াজ: ‘মার জিকোকে। বুড়োটা এল কেন? ওদিকে মারাদোনা হ্যাটট্রিক করছে, আর বাবু এখানে একে ওকে পাস বাড়াচ্ছে। পাস ধুয়ে জল খাব?’ তারপর আর বেশি কথা নয়। শুধু আওয়াজ: মার, মার। ঢিল শুরু হল। জিকোর মাথা টার্গেট। ফিরে এলেন বীরেন দে। টাইমিংয়ে খুঁত ছিল না। কিন্তু, তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, জীবনে এই একবার হলেও পাবলিককে ফেস করা দরকার। এটা মোহনবাগান ক্লাব। এবং জিকো গেস্ট। অদ্ভুত তেজি সুরে গ্যালারির ‘অগ্রগামী অংশ’র দিকে তাকিয়ে বললেন: ‘ফুটবল খেলাটা শুধু জেতা-হারার জন্য নয়। জিকোর মতো ফুটবলার একদিন গোল করতে পারল না, এটাও ফুটবলেরই মজা। মোহনবাগান আগে হেরেছে, পরেও হারবে। পয়েন্ট নষ্ট তো বছর বছরই করতে হয়। কিন্তু জিকোর মাথা ফাটলে এই ক্লাবটার আর কিছু থাকবে না। আপনারা আমাকে মারুন, জিকোকে নয়।’
মোহনবাগান জনতার ‘অগ্রগামী অংশ’ এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির জন্য তৈরি ছিল না। বাইরে সাদা মারুতিতে অধীর কলকাতার সবচেয়ে স্মার্ট ড্রাইভার। কিন্তু আসল ঘটনা ঘটছিল মাঠের মধ্যেই। ঢিল, চায়ের ভাঁড় হাতেই গ্যালারি দেখল, জিকো জর্জের পেনাল্টি বক্সে ঢুকে পড়েছেন। মাঝমাঠের একটু ডান দিক থেকে কোনাকুনি ছুটতে শুরু করেছিলেন, পাস ধুয়ে জল না খেয়েই নিজেই বক্সের মধ্যে দু-গজ ঢুকেই বাঁ পা উঠল জিকোর, নেমেও এল। সেই পা আলতো টোকায় বল সরিয়ে দিল। ডান পায়ের শটে গোল। বীরেন দে, সারাজীবন যিনি নিজের আবেগকে ঢেকে রেখেছেন ঠাট্টা আর তাচ্ছিল্যের নকশি কাঁথায়, নাকে নয়, চোখে রুমাল তুললেন। চোখে জল! ঝাপসা চোখেই দেখলেন, পঁয়ত্রিশ গজ দূর থেকে ফ্রিকিক নিয়ে দ্বিতীয় গোল করে গেলেন জিকো। ‘গুরু’! গুরু! গুরু!’ আওয়াজটা জিকোর চেনা।
পাঁচ
‘কত বলল, পার ম্যাচ রিপোর্ট পাঁচশো ডলার? উম… পাঁচশো ইন্টু সাড়ে বারো, ছ হাজার দুশো পঞ্চাশ টাকা। ডান।’ জিকোর নাম থলিতে পোরার আনন্দে পাইপে একটু বেশি তামাকই ঠেসে দিলেন এডিটর সাহেব। স্পোর্টসে ছিলেন, এখন গোটা কাগজেরই ভিলেন। মাত্র দশ বছরে প্রমাণ করে দিয়েছেন, মালমশলা কিছু না থাকলেও ওপরে ওঠা যায়। মিথ্যা প্রমাণিত করেছেন স্বামী বিবেকানন্দর বিখ্যাত উক্তি: চালাকি দ্বারা কোনও মহৎ কার্য হয় না। সম্প্রতি মহৎ কাজ করার ক্ষেত্রে বাধা তাঁর শরীর। গত তিন বছরে তাঁর মেধা যত কমেছে, মেদ বেড়েছে ততই। তবে, টেবিল অতি উপকারী বস্তু। টেবিলের নিচে অস্বস্তিকর মধ্যপ্রদেশ, ওপরে আবক্ষ ব্যক্তিত্ব। বিলিতি তামাকে বিলিতি লাইটার ছোঁয়াতে গিয়ে হঠাৎই ভুরু কুঁচকে গেল আবক্ষ ব্যক্তিত্বর: ‘কিন্তু মারাদোনার কী হল? প্লাতিনিকে তো হাতছাড়া করেছ, এবার মারাদোনাকেও…। নাঃ, তোমরা কাগজটাকে তুলে ছাড়বে। না খেয়ে মরবে। হাঁ করে বসে আছ কেন, জবাব দিয়ে ধন্য কর!’ হাঁ করে বসে নয়, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল স্পোর্টস এডিটর। অলস এডিটরের ফাঁক ঢাকতে খেটে খেটে আটাশ বছরেই পাকিয়ে ফেলেছে অর্ধেক চুল। তবে, চুল পাকলে বুদ্ধিও পাকে। স্পোর্টস এডিটর এমন মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকল, যেন তাঁর নূ্যনতম কর্তব্য ছিল মারাদোনাকে এডিটর সাহেবের ঘরে এনে বসিয়ে দেওয়া। বলল, ‘পার ম্যাচ হাজার ডলার।’ পাইপ আর লাইটার নিঃশব্দে টেবিলে ফিরে এল। ‘সাড়ে বারো হাজার টাকা! অন্তত চারটে ম্যাচ রিপোর্ট, পঞ্চাশ হাজার। করা যেত, বুঝলে, কিন্তু এই জুলাই মাসেই দশটা রাবার বোট কিনতে হবে। না হলে বর্ষার সময় কেউ অফিসে আসবে না, ইউনিয়ন জানিয়ে দিয়েছে। এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউতে কত নেবে? স্পোর্টস এডিটর মাথা সাড়ে বারো ডিগ্রি তুলে: ‘ওই একই। দরদস্তুর করলে রেট বাড়িয়ে দেবে বলেছে। হাজার ডলারেই দুটো কাগজ রাজি আছে। আমরা কোনওরকমে ঠেকিয়ে রেখেছি।’ ডলারের ধাক্কায় কিঞ্চিৎ ম্রিয়মাণ এডিটর পাইপ ধরালেন। ধোঁয়ায় চাপা দীর্ঘশ্বাস মিশিয়ে বললেন, ‘বোসো।’ কিন্তু স্পোর্টস এডিটর তখন এডিটরকে বসাতে চায়। বলল, ‘মারাদোনা বলেছে, ওকে নিতে হলে অন্তত আটটা ম্যাচ রিপোর্ট করাতে হবে। আট হাজার ডলার। এক লাখ টাকা।’ আবক্ষ ব্যক্তিত্বর মুখে অত্যাশ্চর্য হাসি ছড়িয়ে গেল। এই সব মুহূর্তে পাইপে দাঁত চেপে তাঁর বলতে ইচ্ছা হয়, ‘ও কে, ডান। যাও।’ চাপা রাগ ওই অত্যাশ্চর্য হাসির পিতৃদেব। প্রচণ্ড মনের জোরে ওই হাসি মুখ থেকে মুছে মিনিট খানেক একটা ফালতু কাগজে চোখ ডোবালেন। স্পোর্টস এডিটর এসব জানে। চাপা রাগে একটু ছ্যাঁকা: ‘তাহলে রাজি হয়ে যাব?’ চোখ উঠে এল, মুখ কঠিন হল, রাগে কাঁপতে কাঁপতে ঠান্ডা গলায় বললেন এডিটর: ‘ইয়েস!’
একথা মনে করলে ভুল হবে যে জিকো-প্লাতিনি-মারাদোনারা শুধু লেখালেখি এবং তাই নিয়ে দরাদরিতেই ব্যস্ত ছিলেন। প্লাতিনি পাঁচ ম্যাচে এগারো, মারাদোনা চার ম্যাচে দশ এবং জিকো পাঁচ ম্যাচে আটটি গোল করা ছাড়াও অন্তত তিন গুণ গোল বানিয়েছেন। গ্যালারিতে দর্শক ফিরিয়ে এনেছেন। খেলার কাগজের বিক্রি সাড়ে তিন গুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। ছোটরা যা শুধু শুনেছে, আবার দেখতে পেল পাড়ায় পাড়ায়। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল-মহমেডান নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি, মিছিল, পটকা। কেমন ফাঁকা-ফাঁকা লাগত অফিস-ফেরত বাবুদের, বাসে-ট্রামে ফিরে এল সেই দমবন্ধ ঘনিষ্ঠতা। অযাচিত চড়চাপড়। কিন্তু ময়দান জমে উঠেও মারপিটমুক্ত, রেফারিদের টেন্টে হামলা নেই, কেন না তিনটে বড় দলই সব ম্যাচ জিতে চলেছে। ছোট টিমের দু-চারজন অবশ্য আহত হয়েছে। মারাদোনা, প্লাতিনি আর জিকোকে কড়া ট্যাকলের চেষ্টা করার অপরাধে উদ্যোগী সমর্থকরা নিজেরাই এই জুনিয়রদের পেটানোর দায়িত্ব নিয়েছেন।
খবরের কাগজের লোকেরা সমস্যায়। যার তার নামে যাবতীয় বিশেষণ খরচ করে ফেলায়, জিকো-মারাদোনা-প্লাতিনির জন্য নতুন কিছু করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। পুলিসের বিরুদ্ধে প্লাতিনি হ্যাটট্রিক করতেই এক পত্রিকায় বিশাল সচিত্র হেডিং: ‘তিনি প্লাতিনি’। অন্য কাগজে অন্য একদিন: ‘দোলা দেন মারাদোনা।’ টেক্কা দিয়ে তৃতীয় কাগজ: ‘সারা মাঠে ইকো, জিকো জিকো জিকো!’ বিভিন্ন পত্রিকায় বিশেষজ্ঞরা লিখে এবং মুখে জানালেন, এই তিনজনের খেলা তাঁদের মোটামুটি পছন্দ হয়েছে। বিশেষজ্ঞ সূত্রেই জানা গেল, প্লাতিনিকে দ্বিতীয় হাবিব, জিকোকে দ্বিতীয় প্রসূন এবং মারাদোনাকে দ্বিতীয় গৌতম বলা যায়। সত্তর দশকের এক হাফ ডিফেন্ডার বললেন, ‘দশ বছর আগে পেলে মারাদোনাকে নড়তে দিতাম না। এখনও, একমাস প্রদীপদার ট্রেনিং পেলে, প্রমাণ করে দেব…।’
গোল করায় প্লাতিনি সামান্য এগিয়ে থাকলেও, ফিতে কাটায় অনেক এগিয়ে মারাদোনা। বিশ্বস্ত সূত্রের খবর, আসন্ন শরতে মারাদোনাকে অন্তত সাড়ে তিনশো পুজো প্যান্ডেলে হাজির করার দায়িত্ব নিয়েছেন ইস্টবেঙ্গলের কর্মকর্তারা। প্রথম ম্যাচের পর মারাদোনা আর হ্যাটট্রিক করেননি। পিঠের ব্যথাও সেরে এসেছে।
ছয়
কৃষ্ণপক্ষ শুরু হল রাজস্থান ম্যাচে। গোটা মহমেডান টিম ঝাঁপিয়ে পড়েও, ভাঙতে পারল না চার ঝাঁঝালো ডিফেন্ডারের দেওয়াল। প্লাতিনির প্রতিভা, গ্যালারির ইট, রেফারির টানাটুনি— কোনও কিছুই টলাতে পারল না দেওয়ালকে। পোড়-খাওয়া শ্যামল ঘোষকে ঘিরে ক্রমশই দুর্ভেদ্য হয়ে উঠল তিন তরুণ। লড়াই সংক্রামক, শেষ পর্যন্ত গোটা রাজস্থান টিমটাই হয়ে দাঁড়াল চাইনিজ ওয়াল। সাতষট্টি মিনিটে পেনাল্টি বক্সের সাত গজ বাইরে যে ফ্রিকিক পেল মহমেডান, তাতে রেফারির অবদান কতটুকু তা নিয়ে ভাবার কিছু নেই। ভাবালেন প্লাতিনি। এত নিচু এবং জোরালো শটেও যে এমন স্যুইং ধরানো যায়, তা শুধু রাজস্থান গোলকিপার কেন, কলকাতারই অভিজ্ঞতার বাইরে ছিল। অধিকাংশ রোমাঞ্চকর শটের মতো এটিও ফিরে এল পোস্টে ধাক্কা খেয়ে এবং ফিরে আসা বল থেকে রাজস্থান যে গোল পেল না এজন্য দায়ী তাদের দুর্ভাগ্য এবং মইদুল ইসলামের অ্যান্টিসিপেশন। ডান দিক বেয়ে ছুটছিল রাজস্থানের লঙ্কা উইঙ্গার, মহমেডানের লেফট ব্যাককে অনেকটাই পেছনে ফেলে। মহমেডান গোলকিপার তনুময়ের ভরসা লঙ্কা উইঙ্গার একটা জঘন্য সেন্টার করবেই। লম্বা স্ট্রাইকার নেই রাজস্থান টিমে। ভয়ের তেমন কিছু নেই। কিন্তু, একসঙ্গে একই চিন্তা মাথায় এল দুজনের। লঙ্কা উইঙ্গার ভেবে দেখল, ব্যাকসেন্টার নিখুঁত হবেই এমন গ্যারান্টি যখন নেই, দৌড়টা গোলের দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে দেখা যাক। এরকম হতে চলেছে, ভেবেছিল আর একজন: মইদুল। তেমন স্পিড ছিল না কখনই, এখন তো আরও কম, কিন্তু ঠিক জায়গায় পৌঁছতে খুব জোরে ছুটতে হয় না মইদুলদের। লঙ্কা উইঙ্গার, বলতে গেলে ওর পায়ে বল জমা দিয়ে ফিরে গেল। সামান্য আগে বাঁ পায়ে শট নিলে হতেও পারত গোল। একটুই দেরি। তাতেই অভিজ্ঞতার জয়।
কিন্তু এসব সূক্ষ্ম ব্যাপারে তখন মহমেডান জনতার মন ছিল না। মুষলধারে শুরু হল ইষ্টকবৃষ্টি, ছেঁড়া জুতো, ভাঙা ভাঁড়, ফিরে এল আদি ও অকৃত্রিম কলকাতা ময়দান। গালাগালির মানে বুঝলেন না প্লাতিনি, কিন্তু মাথায় দু’টুকরো ইটের মানে বুঝলেন। যন্ত্রণা প্রকাশ না করার শিক্ষণ তাঁর রক্তে। অস্ফুটেও কিছু বললেন না তিনি। দেখলেন, সামনে মাথা ফাটছে জামশিদের, ফালাফালা হচ্ছে এক কর্মকর্তার টি-শার্ট। এই গন্ডগোলের মধ্যেই এক স্বাস্থ্যবান তরুণ এসে প্লাতিনির হাত ধরে বলল, ‘আপনার কোনও ভয় নেই, তাড়াতাড়ি টেন্টে ঢুকুন দাদা।’ শব্দটা কলকাতায় প্রথম দিনই জেনেছিলেন মিশেল প্লাতিনি।
মরশুমের প্রথম বড় ম্যাচে মোহনবাগানকে হারাল ইস্টবেঙ্গল। জিকোর দেওয়ালচেরা পাস থেকে শুরুতেই মোহনবাগানকে এগিয়ে দিয়েছিল শিশির ঘোষ। কারা যেন বলেছিল, শিশির বড় ম্যাচের প্লেয়ার নয়? হাত মুঠো করে লাফিয়ে উঠল শিশির, জড়িয়ে ধরলেন জিকো। ফোটোগ্রাফাররা নিশ্চিন্ত হলেন: পেজ ওয়ানের ছবি হয়ে গেছে। কলকাতার অভিজ্ঞ ফোটোগ্রাফারবাহিনীকে কিছুক্ষণের মধ্যেই এই সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হল যে গোলখুশি শিশিরের ছবিটি পরদিন কাগজের শেষ পৃষ্ঠায় মাঝারি মাপে জায়গা পেলেও পেতে পারে। গল্পের ব্যালান্স রাখতে মারাদোনার পাস থেকে ইস্টবেঙ্গল অন্য নক্ষত্ররা গোল করলেই ভাল হত, কিন্তু দুটো গোলই মারাদোনা নিজে করলেন। কৃশানুর পাস থেকে প্রথম, প্রায় মাঝমাঠ থেকে বল টেনে দ্বিতীয় গোল। এই ম্যাচটা কোনওদিনই দেখেন না বীরেন দে। চুয়াল্লিশ মিনিটে ইস্টবেঙ্গলের দ্বিতীয় গোল হয়ে যেতেই তাঁর গাড়ি আউট্রাম ঘাট হয়ে বেঙ্গল ক্লাবের দিকে চাকা বাড়াল। জিকো আহত, যথেষ্টই। হাতে বড় ব্যান্ডেজ। কেটেছে কপালও। ব্রাজিলের ফ্ল্যামেঙ্গো যা পারেনি, শেষ পর্যন্ত সেই উপহার দিল কলকাতার মোহনবাগান।
গল্পের ব্যালান্স চূর্ণ করে এই খবরটাও এখানে দেওয়া দরকার যে মারাদোনা কোনও ম্যাচেই কিন্তু ব্যর্থ হননি। তিনি শুধু ইস্টবেঙ্গল-মহমেডান ম্যাচ খেলতে পারবেন না বলেছিলেন। মহমেডানকে হারাতে পারলেই লিগ চ্যাম্পিয়নশিপের দিকে অনেকটা এগিয়ে যাবে ইস্টবেঙ্গল, অথচ ম্যাচের দুদিন আগে মারাদোনা জানিয়ে দিলেন, বাঁ পায়ের গোড়ালির যা অবস্থা এক সপ্তাহের মধ্যে কোনও ম্যাচ খেলা সম্ভব নয়। সেদিন রাতে ইস্টবেঙ্গল কর্মকর্তারা নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। কখনও ভাষা না বোঝার ভান করে, কখনও বাঁ গোড়ালিতে ডান হাতের তর্জনী রেখে মারাদোনা ফিরিয়ে দিলেন। পরদিন বিকেলেই ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের লন থেকে ছড়িয়ে পড়ল ঘূর্ণি গুজব: মারাদোনাকে ম্যানেজ করেছে মহমেডান! ডলারের অঙ্কটা মুখে মুখে বাড়তে বাড়তে রাত ন’টা নাগাদ এক লাখে দাঁড়াল। পৌনে দশটা নাগাদ ফ্ল্যাটের দরজা খুলে মারাদোনা দেখলেন, অন্তত একশো মানুষ, যদি তাদের মানুষ বলতেই হয়। চোখ বুজে এল যন্ত্রণায়, মাঠের বাইরে রক্ত ঝরল দুনিয়ার একনম্বর ফুটবলারের। একটিই আঘাত, সবচেয়ে উৎসাহী ক্লাব-স্বেচ্ছাসেবকটিকে সামলে নিলেন অন্যরা। এতটা কেউ ভেবে আসেননি। না, খুব বেশি চোট লাগেনি মারাদোনার। কয়েক ফোঁটাই রক্ত। এগারো ম্যাচে পঁচিশ গোলের বিনিময়ে পাঁচ ফোঁটা রক্ত। এমন কী আর।
সাত
রক্তের দাগ মুছে গেল দিন দশেকের মধ্যেই। এর মধ্যে খবরের কাগজে ছাপা হল জিকো, মারাদোনা আর প্লাতিনির কলম, কিন্তু কেউই ক্ষোভ প্রকাশ করলেন না। তিনজনই আবার মাঠে ফিরলেন, গোলে ফিরলেন। লিগ পেল ইস্টবেঙ্গল, শিল্ড মহমেডান, ডুরান্ড তুলে আনল মোহনবাগান। বহুকাল পর রোভার্সের সিজন টিকিট আগেই সব বিক্রি হয়ে গেছে, মরশুমে তিন নক্ষত্রর শেষ লড়াই কুপারেজেই।
রোভার্স শুরু হওয়ার মুখেই খবর এল, শারজায় এশিয়ান ক্লাব ফুটবল ইলেভেন খেলবে ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবল ইলেভেনের সঙ্গে। স্ট্যানলি ম্যাথুজ বেনিফিট ম্যাচ। উদ্যোক্তা শেখ আবদুর রহমান বুখাতির। ক্রিকেট ছেড়ে এভাবে ফুটবলে ঝোঁকা ভুল, এ কথা বোঝাতে শারজায় ছুটে গিয়েছিলেন টাইগার পতৌদি আর আসিফ ইকবাল। বুখাতির বুঝতে রাজি হননি। এশিয়ান টিমে চান্স পেয়েছেন কলকাতার তিনজন ফুটবলার। আরও কয়েকজনের চান্স পাওয়া উচিত ছিল, এই মর্মে কলকাতার কাগজগুলোয় জ্বালাময়ী লেখা ছাপা হলেও, শেষ পর্যন্ত আর কাউকে ডাকা হল না। কলকাতার দুজন স্টার ঘোষণা করল, এই অপমানের পর, তারা ভবিষ্যতে কোনওদিনই এশিয়ান টিমের হয়ে খেলবে না।
তিন ক্লাবই এক ব্যবস্থায় রাজি হল। টিমের অন্যরা বম্বে চলে যাবে। জিকো-প্লাতিনি-মারাদোনা শারজা থেকে উড়ে আসবেন বম্বে।
২৭ নভেম্বর, ১৯৮৮। শারজা রওনা হওয়ার আগে সাহার এয়ারপোর্টে তিন সুপারস্টার। বম্বের জার্নালিস্ট ফোটোগ্রাফারে লাউঞ্জ ভর্তি। সব কাগজই রোভার্সের আগে সাপ্লিমেন্ট করবে। আসর গরম করবে। ছবি চাই। তিনজনেরই ইন্টারভিউ চাই। ছবি তোলা হল অনেক। কিন্তু সাংবাদিকদের কাছে বক্তব্য রাখলেন তিনজনের হয়ে একজনই, মিশেল প্লাতিনি: ‘আপনাদের হতাশ করছি বলে দুঃখিত। আমরা আর ফিরছি না। এই দেশ, কলকাতা শহর আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। আমরা তেমন কিছু হয়ত দিতে পারিনি। সামান্য মানুষ আমরা, বড়জোর চেষ্টাই তো করতে পারি। কলকাতার দর্শকদের কাছে আমাদের শুভেচ্ছা পৌঁছে দেবেন। ধন্যবাদ।’
কলকাতার সব কাগজের অফিসে খবর পৌঁছে গেল রাত পৌনে দশটার মধ্যে। টেলিফোনে ধরা হল তিন ক্লাবের নানা মাপের তিন কর্মকর্তাকে।
রহিম আলি মোল্লা: (টেলিফোনেই তাঁর চোখের জল দেখা গেল) কী খবর দিলেন দাদা। মরে যাব দাদা। ফুল পেমেন্ট করে দিয়েছি দাদা।
বিকাশ গড়গড়ি: (টেলিফোনেই পাকানো ঘুসি দেখা গেল) মারব। কেস করব। মারাদোনার চেয়ে বেটার প্লেয়ার আনব।
বীরেন দে: (টেলিফোনেই নাকে রুমাল তুলতে দেখা গেল) চলে গেল? বাঁচা গেল! তিনটের মধ্যে আমাদেরটাই বাজে ছিল!
এবং, স্পোর্টস এডিটরকে পাইপ খিঁচিয়ে কলকাতার সবচেয়ে উঠতি আর ফালতু কাগজের এডিটর: ‘সারা দিন তো সব গড়ের মাঠে ঘাস কাটো, এই স্কুপটা তুলতে পারলে না?’
আট
এ গপ্পো উদ্ভট, শুধুমাত্র তিন ফুটবল দেবতার পাতালে প্রবেশ ও প্রস্থানের জন্যেই নয়, অষ্টআশির ২৭ নভেম্বর রাতে তিন কর্মকর্তাকেই টেলিফোনে পেয়ে যাওয়া, এই কলকাতায় এর চেয়ে উদ্ভট আর কীই বা হতে পারে। বলা বাহুল্য, অধিকাংশ চরিত্রই কাল্পনিক। বাস্তবের সঙ্গে সম্পর্কহীন। তবু যদি আপনাদের মনে হয়, প্রায় সব চরিত্রই যেন খুব চেনা চেনা লাগছে জানব, আমার পরিশ্রম সার্থক।
