শৈবাল মিত্র : হরধনু কাহিনীর পুনর্লিখন
রামমোহন শিক্ষায়তন পরিদর্শনে এসে ইনস্পেক্টর জগৎ ঘোষ ক্লাস ফোরের ছাত্র সুবোধকে প্রশ্ন করল, হরধনু কে ভেঙেছিল? প্রশ্ন শুনে জগতের মুখের দিকে সুবোধ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। জগতের একপাশে স্কুলের হেডমাস্টার নিশিকান্ত সান্যাল, অন্যপাশে ক্লাস টিচার রমেশ ভারতী।
গরম কাল। ক্লাস রুমে ফ্যান ঘুরলেও মোটাসোটা শরীর জগৎ গলগল করে ঘামছে। রুমালে মুখ মুছে কণ্ঠস্বর মোলায়েম করে জগৎ আবার বলল, বল, কে ভেঙেছিল বল?
সুবোধের মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে। ছলছল করছে দু-চোখ। থমথমে গম্ভীর মুখ করে নিশিকান্ত দেখছে সুবোধকে। হাত কচলাচ্ছে রমেশ ভারতী।
বল। ভয় কি, বল।
জগতের সস্নেহ কথাতে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল সুবোধ। কান্না জড়ানো গলায় সে বলতে থাকল, আমি ভাঙিনি স্যার। সত্যি বলছি, আমি ভাঙিনি।
রুদ্ধকণ্ঠ সুবোধ ফোঁসফোঁস করতে থাকল। জবাব শুনে জগৎ অবাক হয়ে হেডমাস্টারের দিকে তাকাতে ক্লাস টিচার রমেশ ভারতী করুণ গলায় জগৎকে বলল, স্যার যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে বলি, সুবোধ অতি ভাল ছেলে। হরধনু ভাঙার মতো কাজ সে করতে পারে না।
একজন শিক্ষকের কাছ থেকে এমন কথা জগৎ আশা করেনি। বাল্মীকির রামায়ণ থেকে সাধারণ একটা প্রশ্ন সে করেছিল। প্রশ্নটার জবাব সবাই জানে। মিথিলাধিপতি জনকের কন্যা সীতাকে বিয়ের যোগ্যতা অর্জন করতে রামচন্দ্র হরধনু ভেঙেছিলেন। রামমোহন শিক্ষায়তনের মতো নামী স্কুলের ক্লাস ফোরের একজন ছাত্রের এত সহজ একটা প্রশ্নের উত্তর না পারার কথা নয়। ফি বছর রামমোহন শিক্ষায়তনের ষাট-সত্তরজন ছাত্র প্রাইমারি পরীক্ষা পাস করে। পাঁচ, সাতজন বৃত্তি পায়। গত তিন বছর ধরে রামমোহন শিক্ষায়তন পরিদর্শন করছে জগৎ। ঘুরে ঘুরে স্কুল দেখে খুশি হয়েছে। বাংলা, অঙ্ক, বিজ্ঞানের দু-চারটে সরল প্রশ্ন বিভিন্ন ক্লাসে করে চটপট জবাব পেয়ে স্কুল সম্পর্কে ভাল ধারণাই হয়েছিল। এক ধাক্কায় সেই ধারণা আজ ভেঙে যেতে জগৎ অস্বস্তি বোধ করল। রমেশ ভারতীর কথা শুনে সে ভয়ও পেয়েছে। তার মুখ দেখে চাপা গলায় হেডমাস্টার বলল, রমেশ কিছু ভুল বলেনি। ভাঙচুর করা যাদের কাজ, আমাদের এলাকায় তারা নেই।
অতঃপর জগতের আর কিছু বলার থাকে না। হেডমাস্টারের ঘরে ফিরে ঢকঢক করে এক গ্লাস জল খেয়ে তখনই জগৎ স্কুল ছেড়ে চম্পট দিল। একটা প্রশ্ন করে স্কুলের ছাত্র, শিক্ষকদের জ্ঞানের বহর টের পেয়ে দ্বিতীয় প্রশ্ন করার সাহস তার ছিল না। গাড়িতে ওঠার আগে পর্যন্ত জগতের কানের কাছে মুখ এনে নিশিকান্ত, রমেশ ক্রমাগত ঘ্যানঘ্যান করে যা বলে গেল, তা হল, সুবোধ খুব ভাল ছেলে। সে নির্দোষ। হরধনু ভাঙেনি।
অফিসে ফিরে আরও দু-গ্লাস জল খেল জগৎ। তার মাথা ঝিমঝিম করছিল। অন্যদিনের চেয়ে সে বেশি ঘামছিল। আধ ঘণ্টা বাদে একটু সুস্থ হয়ে রামমোহন শিক্ষায়তনে লেখাপড়ার শোচনীয় অধোগতি সম্পর্কে একটা কড়া নোট লিখে সে জেলা অধিকর্তাকে পাঠিয়ে দিল। নোটের শেষে খুব সতর্কতার সঙ্গে ব্যক্তিগত কিছু মন্তব্য লিখল। মন্তব্যের মূল কথাগুলো হল, গত পনেরো বৎসর যাবৎ গণমুখী শিক্ষানীতির প্রবর্তন এবং শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যয়বরাদ্দ বৃদ্ধির ফলে নানা উন্নতি দৃষ্টিগোচর হইলেও অন্তরালে কিছু গোলমাল দেখা দিয়েছে। সামান্য একটি প্রশ্নের জবাব দিতে গুরু, শিষ্য উভয়েই ভুল করিতেছে। এই দুর্গতি রোধ করিতে জরুরি ভিত্তিতে এখনই কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করা দরকার।
জেলা শিক্ষা অধিকর্তাকে চিঠিটা পাঠিয়ে সামান্য স্বস্তি বোধ করলেও জগতের মনের অশান্তি কাটল না। নানা প্রশ্ন তাকে খোঁচাতে লাগল। ক্লাস ফোরের ছাত্র সুবোধের সমবয়সী কয়েকজন ছেলেকে ধরে প্রশ্নটা করার বাসনা জাগল। ছেলেগুলোকে কীভাবে, কোথা থেকে পাওয়া যায়, ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল আত্মীয়, বন্ধু প্রতিবেশীদের ন-দশ বছরের কিছু ছেলেমেয়ের মুখ। এইসব ছেলেমেয়ের কাছে হরধনু ভঙ্গকারীর নাম জানতে চাইলে বেশির ভাগ নিশ্চয় সঠিক জবাব দেবে। যারা পারবে না, তাদের লজ্জিত অভিভাবকরা সন্তানদের আবার রামায়ণ, মহাভারত পড়াতে বসবে।
রামমোহন শিক্ষায়তনের ঘটনা, শিক্ষাব্যবস্থার সাম্প্রতিক হালচাল সম্পর্কে গবেষণায় জগৎকে প্রেরণা দিল। পরবর্তী সাত দিনে পরিচিত, অর্ধপরিচিত প্রায় পঁচিশজন ন-দশ বছরের ছেলের সঙ্গে সে দেখা করল। শিশুদের জন্যে পকেট বোঝাই করে লজেন্স, চকোলেট, কিছু ডটপেন, কালি আর পেন্সিলের লেখা যুগপৎ, এবং এককভাবে মোছার জন্যে দু-ধরনের সাতটা ইরেজার নিল। প্রতিটি উত্তরদাতাকে চকোলেট, লজেন্স এবং শুধু নির্ভুল উত্তরদাতাকে চকোলেট লজেন্সের সঙ্গে একটা করে ডটপেন এবং রাবার দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু পঁচিশজন শিশুর সঙ্গে সাত দিন ধরে কথা বলে যে অভিজ্ঞতা তার হল, তা মোটেই সুখের নয়। সুখের যে নয়, তার প্রমাণ হল, চকোলেট, লজেন্স শেষ হয়ে গেলেও সবগুলো ডটপেন, রাবার পকেটে পড়ে থাকল। মাঝখান থেকে নতুন ফ্যাচাং বাধল। জগতের সমবয়সী আত্মীয় বন্ধুদের ধারণা হল, জগতের মাথাটা বেতাল হয়েছে। আড়ালে আবডালে দু-একজন বলেও ফেলল কথাটা। জগতের হরধনু সংক্রান্ত প্রশ্নটা নিয়ে আলোচনা করতে করতে পাড়ার বাচ্চাদের একজন হঠাৎ বিকেলে জানলা দিয়ে জগৎকে ধনুখুড়ো বলে ডেকে লুকিয়ে পড়ল। দু-চার দিনের মধ্যে শিশুমহলে ধনুখুড়ো নামটা জানাজানি হয়ে গেল। বালকেরা বাড়ির জানলা বারান্দা থেকে জগৎকে ধনুখুড়ো বলে ডেকেই গা-ঢাকা দিত। প্রথম কয়েক দিন ডাকটা শুনে জগৎ খেয়াল করেনি। কিন্তু হরধনু প্রসঙ্গটা মাথায় থাকার জন্যে ধনু, এবং খুড়ো যুক্ত ধনুর গভীর অর্থদ্যোতনা অনুভব করে এক হপ্তা পর থেকেই সে চমকে উঠতে লাগল। কী ঘটছে তলিয়ে না বুঝলেও খাবারে তার রুচি কমে গেল। ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে থাকল। প্রতিবেশী এক ব্যাঙ্ক অফিসার রাস্তায় একদিন জগৎকে ধরে বেকসুর ধমক দিয়ে রুক্ষ গলায় বললে, আমার ছেলেকে আর কখনও আজেবাজে প্রশ্ন করবেন না। আপনার প্রশ্ন শুনে ভয়ে তার জ্বর এসে গেছে। হাই টেম্পারেচার।
জগৎ তার প্রশ্নের নিরীহত্ব ব্যাঙ্ক অফিসারকে বোঝাতে গিয়ে ব্যর্থ হল। কাজের অজুহাতে ব্যাঙ্ক অফিসার এক মুহূর্ত দাঁড়াল না।
পাড়ায় যখন জগৎকে ঘিরে ঝঞ্ঝাট ঝামেলা চলছে, তখন তার অফিসের অবস্থাও শান্ত নয়। ঘটনাবলি নতুন বাঁক নিয়েছে। এক দুপুরে প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের এক অফিসার জগতের অফিসে এসে বলল, আপনার গোলমেলে নোট পড়ে শিক্ষা অধিকর্তা ক্ষুব্ধ। জল আরও ঘোলা হবার আগে নোটটা প্রত্যাহার করে নিন। অফিসারের কথা শুনে জগৎ হতভম্ব হয়ে গেল। কী বলা যায়, সে যখন ভাবছে, অফিসার বলল, গত পনেরো বছরে সরকারি শিক্ষানীতি রাজ্যকে যখন এগিয়ে দিয়েছে, সে তুলনায় কোথায় সামান্য কী ভাঙচুর হল, মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ সব তুচ্ছ বিষয়ে আপনার মতো দক্ষ, অভিজ্ঞ অফিসার কেন মাথা ঘামাবে?
এক মুহূর্ত থেমে অফিসার আবার বলল, ইনস্পেক্টরের চাকরি করলেই যে স্কুল পরিদর্শনে যেতে হবে এমন কোনও কথা নেই। কাজ দেখাবার জন্যে কেন এত কুটকুটুনি আপনার? অফিসে আসুন, চেয়ারে বসুন, বাড়ি যান, মাসের শেষে মাইনে নিন। ব্যস, চুকে গেল ল্যাঠা।
জগৎ বোবা। পাথরের মতো বসে আছে। নোটটা দু-একদিনের মধ্যে প্রত্যাহারের কথা তাকে আর একবার স্মরণ করিয়ে অফিসার চলে গেল। দু-গ্লাস জল খেল জগৎ। ঘামে ভিজে সপসপে রুমালে কপাল মুছতে মুছতে জগৎ ঠিক করল, রামমোহন শিক্ষায়তন সংক্রান্ত নোটটা প্রত্যাহার করবে না। ফলে ঘটনা আরও জট পাকাল। আত্মীয় পরিচিত মহলে তার পাগল হয়ে যাওয়ার খবর দ্রুত রটে গেল। পাড়ার আনাচে-কানাচে থেকে ন-দশ বছরের শিশুদের সঙ্গে তাদের দাদারাও তাকে ধনুখুড়ো বলে ডাকতে শুরু করল। কয়েকজন এত দুঃসাহসী হয়ে উঠল যে ধনুখুড়ো বলে ডেকে পালাবার দরকার বোধ করল না। ফিচেল হাসিমুখ নিয়ে জগতের নাকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকল। তেড়ে গিয়ে দু-চার চড় থাপ্পড় কষাবার ইচ্ছে অনেক কষ্টে সংযত করল সে।
পনেরো দিনেও নোটটা প্রত্যাহৃত না হতে জগতের কাছে জেলা শিক্ষা দপ্তর থেকে পিওন বুকে একটা চিঠি এল। সাদা কাগজে টাইপ করা চিঠির বক্তব্য হল, হরধনু ভাঙার বিষয়টি খুব গোলমেলে। কলকাতায় প্রাথমিক শিক্ষামন্ত্রীর জ্ঞাতার্থে পাঠানো হল। অতঃপর এই বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
জল যে গড়াচ্ছে, নানা ঘটনায় টের পেয়ে জগৎ দস্তুরমতো আতঙ্কিত হল। সে টের পাচ্ছিল, পরিচিত লোকজন, স্ত্রী ছেলেমেয়েও তাকে এড়াতে চাইছে, সহকর্মীরা পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে, আড্ডা, আলোচনায় তাকে দেখলে চুপ মেরে যাচ্ছে সবাই। অন্তরঙ্গ সহকর্মী বিজন বক্সি একদিন মুখের ওপর বলে দিল, তুমি যা করেছ, ঠিক নয়।
বিজনের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকল জগৎ। ব্যঙ্গমাখা গলায় বিজন বলল, হাঁ করে থাকলে মুখে মাছি ঢুকে যাবে।
কথাটা বলে জগতের হাঁ মুখ, তার চিবুক ধরে নিজের হাতে বন্ধ করে দিল।
রামমোহন স্কুল পরিদর্শনের এক মাস পরে কলকাতার শিক্ষা মন্ত্রক থেকে জগৎ একটা চিঠি পেল। জেলা শিক্ষা দপ্তর ঘুরে চিঠিটা এল তার হাতে। চিঠি পড়ে জগৎ জানল হরধনু সংক্রান্ত বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্যে শিক্ষা মন্ত্রক বিভাগীয় কমিশন নিযুক্ত করেছে। কমিশনকে তদন্তে সাহায্য করার জন্যে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রক।
চিঠির ওপরে বড় বড় করে লেখা জরুরি এবং গোপনীয় শব্দ দুটির দিকে তাকিয়ে জগতের হাত-পা ঠান্ডা, আড়ষ্ট হয়ে গেল। অফিস ঘরের জানলা দিয়ে সে বাইরে তাকাল। ঠা-ঠা রোদে পুড়ে যাচ্ছে নীল আকাশ। জানলার বাইরে ঘাসের ওপর পরিত্রাহি ঝগড়া করছে দুটো শালিক।
পরের একটা মাস জগৎ খুব ভয়ে ভয়ে কাটাল। তার শরীরের ওজন কমে গেল। প্রতি মুহূর্তে তদন্ত কমিশনের প্রতীক্ষা করতে করতে পোশাক, চালচলন অবিন্যস্ত, শিথিল হল। বর্ষার শুরুতে শিক্ষা মন্ত্রক জানাল, তদন্ত কমিশনের বিচার বিবেচনা পর্যবেক্ষণ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভাঙা হরধনুর যথাযোগ্য মূল্য দিতে সরকার রাজি।
জেলা শিক্ষা দপ্তর ঘুরে জগতের কাছে সরকারি হুকুমনামাটি পৌঁছল। প্যাঁচালো ইংরেজিতে লেখা হুকুম পড়ে প্রথমে মাথামুন্ডু কিছুই সে বুঝতে পারল না। আরও দু-তিনবার পড়া শেষ করে কিছুটা বোধগম্য হতে তার মনে প্রশ্ন জাগল, ভাঙা হরধনুর জন্যে ক্ষতিপূরণের টাকা কে নেবে? প্রশ্নটার সদুত্তর না মিললেও একটা বাজে ঝামেলা থেকে রেহাই পাওয়ার সম্ভাবনায় জগৎ খুশি হল।
গল্পের সমাপ্তি এখানেই হবার কথা। চালু গল্পটি এ রকম জায়গাতেই শেষ হয়েছে। কিন্তু সব গল্পের সমাপ্তিই সাময়িক। চিরতরে, চরম সমাপ্তি কোনও গল্পে ঘটে না। নদীর মতো প্রবহমান গল্প যুগোপযোগী পরিণাম খোঁজে। মার্কস, এঙ্গেলস-এর গল্প লেনিন, স্তালিন, মাও জে দং-এ শেষ হয় না। গল্পের রঙ্গমঞ্চে এসে দাঁড়ায় ক্রুশ্চভ, ব্রেজনেভ, দেং জিয়াও পিং, গর্বাচভ, ইয়েলৎসিন। গল্প তবু থামে না। জর্জ ওয়াশিংটন, আব্রাহাম লিঙ্কন, রুজভেল্ট, আইসেনহাওয়ার হয়ে গল্প গড়িয়ে যায়। কেনেডি, রেগন, বুশ, কোথায় গল্পের উপসংহার?
হরধনু কাহিনীও ত্রেতাযুগ থেকে সাম্প্রতিকে এসে নতুন মোড় নিয়েছে। ভাঙা হরধনুর জন্যে ক্ষতিপূরণের টাকা সরকার মঞ্জুর করতে, টাকাটা কে পাবে ভেবে মনে খটকা লাগলেও জগৎ খুশি হয়েছিল। তার ধারণা হয়েছিল, হরধনু ভঙ্গ নিয়ে যারা জল ঘোলা করতে চাইছে, নগদ টাকা পেলে তারা চুপ করে যাবে। হিমঘরে জমা পড়বে হরধনু ফাইল। পরিচিতরা আর তাকে পাগল ভাববে না। পাড়ার বাচ্চারা ধনুখুড়ো বলে পেছন থেকে আওয়াজ দেবে না।
কিন্তু সে যা আশা করছিল, বাস্তবে সেরকম ঘটল না। হরধনু সংক্রান্ত গোপন তথ্য কীভাবে যেন ফাঁস হয়ে গেল। বিধানসভার অধিবেশনে বিরোধী পক্ষের নেতা মুলতুবি প্রস্তাব তুলল। লিখিত প্রস্তাব সভায় পেশ করার আগে দীর্ঘ জ্বালাময়ী ভাষণে বিরোধী নেতা বলল, বোফর্স কেলেঙ্কারির চেয়ে একটা সাংঘাতিক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ে সরকার এখন সব কিছু ধামাচাপা দিতে চায়। সেটা সম্ভব হবে না। বিষয়টির সঙ্গে শুধু রাজ্য নয়, গোটা দেশের স্বার্থ জড়িয়ে আছে। বেআইনিভাবে কোটি কোটি ডলারের লেনদেন চলেছে। খুব সাবধানে, সতর্কতার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আমাদের এগোতে হবে। ইস্যুটি নিয়ে দুই বৃহৎ শক্তিও ল্যাজে খেলছে। ঘটনার ওপর নজর রাখছে। জনসাধারণ বিষয়টি পরিষ্কার জানলে সোবিয়েত প্রজাতন্ত্র টুকরো টুকরো হয়ে যেতে পারে। বোমাবর্ষণ হতে পারে ওয়াশিংটনে।
বিরোধী নেতার বক্তৃতা শেষ হতে জবাবি ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী বললেন, দুষ্কৃতীদের আটক করার জন্য পুলিসকে বলা হয়েছে। মাননীয় সদস্যরা চাইলে হরধনুর ক্ষতিপূরণের টাকা আরও বাড়িয়ে দিতে সরকার রাজি। মুখ্যমন্ত্রীর সমর্থনে সরকার পক্ষ যখন টেবিল চাপড়াচ্ছে, অসন্তুষ্ট বিরোধীরা সভা ছেড়ে চলে গেল। আধঘণ্টা বাদে সভা আবার বসতে বিরোধী পক্ষের প্রস্তাবিত বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি সরকার মেনে নিল। রহস্য রোমাঞ্চ গল্পের মতো করে হরধনু কাহিনী প্রায় সব সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। একটা ইংরেজি, একটা বাংলা সংবাদপত্রে মুখ্যমন্ত্রী এবং বিরোধী নেতার সমর্থনে লেখা সম্পাদকীয়তে দুজনকেই প্রশংসায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অফিসের চেয়ারে বসে সংবাদপত্র পড়ে জগতের গা ছমছম করছিল। সে টের পাচ্ছিল, এক মস্ত ঝামেলা হাতির পায়ের মতো মাথার ঠিক ওপরে স্থির হয়ে আছে। সেই পা যে কোনও মুহূর্তে থেঁতলে দিতে পারে। বিচারবিভাগীয় তদন্ত শুরু হলে সে রেহাই পাবে না। পাশের টেবিলের সহকর্মী বিজন অফিসে না আসায় ঘরটা ফাঁকা। বোকামি করে সাপের মাথায় পা দিয়ে অনুতাপে ভারি হয়ে আছে জগতের মন। কীভাবে বোকামি, ভুল শুধরে নেওয়া যায় সে ভাবছে। শিক্ষা মন্ত্রক থেকে ফাইলটা গায়েব করা সম্ভব নয়। যা করা যায়, তা হল মূল রামায়ণের হরধনু ভাঙার কাহিনী পড়ে সবাইকে শোনাতে পারে। হরধনু কী, কে ভেঙেছিল, এ সব তথ্য জানা থাকলে বিষয়টি নিয়ে অহেতুক ভুল বোঝাবুঝি হবে না। ঝামেলামুক্ত হবার আর একটা উপায় আছে। উপায়টা কঠিন, শ্রম এবং সময় সাপেক্ষ। তবু জগৎ চেষ্টা করবে। সেই সন্ধেতে অফিস থেকে বাড়ি ফিরে রামমোহন শিক্ষায়তনে যাবার বাস ধরল জগৎ। বাড়ি থেকে স্কুল আঠারো কিলোমিটার দূর। রাত প্রায় ন’টায় সে যখন স্কুলের সামনে এসে দাঁড়াল, ঘন অন্ধকারে গ্রাম ডুবে আছে। চারপাশ স্তব্ধ। মুঠো মুঠো জোনাকি উড়ছে। কোথাও মানুষজন নেই। একজন গ্রামবাসীকে ধরে হেডমাস্টারের বাড়িতে জগৎ পৌঁছল। তাকে দেখে হেডমাস্টার নিশিকান্ত সান্যাল চমকে গেলেও মুখে বলল, আসুন, কী সৌভাগ্য আমার।
ভেতরে ঢুকব না।
সে কি হয়? আপনি অতিথি। অতিথি নারায়ণ।
জরুরি একটা কথা বলে আমি চলে যাব।
কী কথা?
হরধনু বলে কিছু নেই। সেটা ভাঙার চেষ্টাও কেউ করেনি।
হাসিমুখে নিশিকান্ত বলল, আমি জানতাম, ভুল স্বীকার করতে হবে আপনাকে। তাতে কিছু যায় আসে না। মানুষই ভুল করে।
ফোরের ক্লাস টিচার রমেশ ভারতী আর সেই ছেলেটি, কী যেন নাম, হ্যাঁ, সুবোধ, তাদের কাছেও একবার যেতে হবে। আপনি নিয়ে চলুন।
কাল সকালে আমি জানিয়ে দেব।
আজই আমি যেতে চাই।
হ্যারিকেন হাতে জগতের সঙ্গী হল হেডমাস্টার।
আরও মাসখানেক পরে বিচারবিভাগীয় তদন্ত যখন শেষ পর্যায়ে, দেখা গেল, চেনা অচেনা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জগৎ প্রশ্ন করছে, হরধনু ভাঙার বিষয়ে আমি কি আপনাকে কিছু বলেছিলাম? যদি বলে থাকি, তা হলে মাফ করবেন। হরধনু বলে কিছু নেই। সবটা কাল্পনিক।
তার কথা শুনে কেউ গম্ভীর হচ্ছে, কেউ হাসছে, দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে কেউ।
বিচারবিভাগীয় তদন্তের বিষয় নিয়ে জগতের এই মশকরায় বিরক্ত হয়ে তাকে হাজতে পোরার কথা পুলিস যখন ভাবছে, তখন পাড়ার মধ্যে মজা করার মতো সত্যিকারের একটা পাগল পেয়ে জগতের প্রতিবেশীরা হল খুশি।
