ভগীরথ মিশ্র : নতজানু
এক
তাঁকে একবার দেখলে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া অসম্ভব। আমিও পারিনি। হাজার জনের ভিড়েও তিনি চারপাশের একান্ত মনোযোগ কেড়ে নেবেনই। এমনই তাঁর চেহারার বিশেষত্ব।
আমি তাঁকে প্রথম দেখেছিলুম আমার এক বন্ধু মনোতোষের বাড়িতে। মনোতোষের ছোট্ট ড্রয়িং রুমখানা একেবারে ভরে গিয়েছিল তাঁর উপস্থিতিতে।
খুব যে রূপবান, তা নয়। শরীর থেকে যে গলিত মোমের মতো লাবণ্য ঝরে ঝরে পড়ছে, তাও নয়। বরং সারা শরীর জুড়ে এক ধরনের লুকানো কাঠিন্য। লম্বায় সাড়ে পাঁচ কিংবা সামান্য বেশি। গায়ের রঙ উজ্জ্বল তামাটে। পেটানো শরীর। সব মিলিয়ে চার আনা। বারো আনা ওঁর মুখে। ঈষৎ লম্বাটে তে-কোনা মুখ। প্রশস্ত ললাট, দুপাশ থেকে সাঁড়াশি-আক্রমণ চালিয়ে কেশভূমির দখল নিতে নিতে এগোচ্ছে। বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ নাক, বলিষ্ঠ ধারালো ঠোঁট, ভাঙা গালের ওপরে ঠেলে ওঠা চোয়াল, এবং ঈষৎ উদ্ধত চিবুক জুড়ে একটি ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়ি— পরিপাটি করে ছাঁটা। সব জিনিস সবাইকে মানায় না। আবার কিছু কিছু আছে, এক একজনকে ভীষণ মানিয়ে যায়। ওঁরও তেমনি। চিবুকের ওই ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়িখানি। লম্বাটে তে-কোনা মুখখানিতে যা মানিয়েছে না! ওঁকে দেখামাত্রই আমি নিঃসন্দেহ হয়েছিলাম ফ্রেঞ্চ-কাট ছাড়া আর কোনও কিছুই মানাত না ওই মুখে। এবং তিনি যখন পাইপ ছোঁয়ালেন ঠোঁটে, আমার মনে হল, ওই ঠোঁটে, আর যাই হোক, সিগারেট চুরুট নিতান্তই বেমানান হত। ছেলেমানুষী হলেও, আমি অনেকক্ষণ ধরে ভাবনা, গবেষণা করলুম মনে মনে। এবং অবশেষে, এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলুম যে, চুল কিংবা গোঁফদাড়ি কিংবা পোশাক-আশাক কিংবা ফ্যাশন-ট্যাশনের যে নতুন নতুন ডিজাইন বেরয়, তা প্রতি ক্ষেত্রেই প্রাথমিকভাবে জন্ম নেয় একটি মনোমতো শরীরের কথা ভেবে। পরে, বালখিল্য প্রয়োগে তা বারভোগ্য হয়ে ওঠে। আমার কোনও সন্দেহ নেই, ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়ি চালু হয়েছিল ঠিক এই ধরনের মুখগুলোর জন্য। পরে রামা-শ্যামা-ভীমা তাদের গোল- চৌকানো-চ্যাপ্টা মুখেও তা রাখতে শুরু করে। আমি বুঝতে পারছি, এই জন্যই ইদানীং কোনও কোনও পোশাক বা চুল-দাড়ি কাটবার ধরন-ধারণ কিংবা প্রসাধন-অলঙ্কার এত অসহ্য লাগে মাঝে মাঝে। খারাপ ওগুলো নয়ই, ছিল না, শুধু অপাত্রে পড়ে মান খুইয়ে বসেছে।
প্রথম দিকে তো আমি হাঁ করে দেখছিলুম ওঁকে। কিছুতেই ওঁর দিক থেকে নজর সরাতে পারছিলুম না। ঘিয়ে রঙের প্যান্টের সঙ্গে উজ্জ্বল নস্যিরঙের বুশ শার্ট, সবার ওপরে, ওই তামাটে উজ্জ্বল মুখে মেহেন্দির রঙ লাগানো ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়িটি। ঠোঁটের ডগায় চেপে ধরা জ্বলন্ত পাইপ। উনি মৃদু হাসছেন, কথা বলছেন, একটা কি দুটো। রি-অ্যাক্ট করছেন খুব মৌলিক নিজস্ব ভঙ্গিতে। স্বীকার করতে একটুও লজ্জা নেই, আমি ফ্যাল ফ্যাল করে দেখছি ওঁকে সারাক্ষণ, ওঁর প্রতি শব্দ শুনছি, ওঁর প্রতিটি মুদ্রা ও অভিব্যক্তিতে রোমাঞ্চিত হচ্ছি। কী করেন ভদ্রলোক? আমাদের মতো হেঁজিপেঁজি কেরানি নয় নিশ্চয়ই। অবশ্যই কোনও উঁচু পদে বসে রয়েছেন। সব কিছুতে যেভাবে অ্যাসার্ট করছেন, খুব সিনিয়র এগজিকিউটিভ না হয়ে যান না। এবং সেটাও কোনও জবরদস্ত প্রাইভেট কোম্পানিতে। সরকারি চাকরিতে নিশ্চয় নয়। রাজ্য সরকারে তো নয়ই। এককালে নেশা ছিল। একটা মজার নেশা। গ্রুপ-ফটো পেলেই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা। মুখগুলোকে স্টাডি করে করে সরকারি কর্মচারীদের শনাক্ত করা। অপুষ্টিতে শুঁটকি মাছ। খেতে পেলে আবার, সুষম খাদ্যের অভাবে, মূলত কার্বো হাইড্রেট ও ফ্যাট খেয়ে খেয়ে, গোলগাল, থলথলে। চোখ দুটি মরা কাতলার মতো ঘোলাটে স্থির। গ্রুপ ফটোগ্রাফ থেকে ঠিক বেছে বেছে আলাদা করে নিই মুখগুলোকে। দীর্ঘদিনের সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, সরকারি কর্মচারী ইনি নন। সরকারি কর্মচারীরা অতখানি স্মার্ট আর অ্যাট্রাক্টিভ হয় না। হলেও থাকে না। কিছুদিন বাদেই প্রতিমার গায়ে ধুলো জমতে শুরু করে। তারপর দুটো বাজলেই মুড়ি-বাদাম। গোল-গোল বড় সাইজের মুড়ি। মুড়ি বেশি, বাদাম কম।
এক্সকিউজ মি, আপনি কি আমাকে কখনও দেখেছেন আগে?
ঘন ঘন তাকিয়েছি ওঁর দিকে। এই কারণেই বোধ করি উনি ভেবেছেন, আমি স্মৃতিতে আটকে থাকা কোনও পরিচিত মুখের সঙ্গে ওঁকে মেলাবার চেষ্টা করছি। মৃদু হেসে বললুম, ‘কই, না তো।’ খুব বোকা বোকা শোনাল আমার জবাবখানা। নিজের কানেই বাজল। এমনি সময়ে মনোতোষই বাঁচাল আমায়।
‘আলাপ করিয়ে দিই। পঙ্কজ দত্ত। আমার পিসতুতো ভাই। আর এ হল প্রণবেশ। আমার বন্ধু।
নমস্কার বিনিময়ের পর যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলুম। পঙ্কজ বললেন, ‘সত্যিই তো, আমরা একঘরে পাশাপাশি বসে আছি, আলাপ করিনি কেন এতক্ষণ? আসলে আমরা ব্রিটিশ লিগ্যাসি বইছি। জাহাজ ডুবি থেকে বেঁচে এক নির্জন দ্বীপে উঠেছে দুজন মাত্র ইংরেজ। দুজনেরই জীবন-মরণ সমস্যা। কিন্তু পাশাপাশি থেকেও কেউ কারও সঙ্গে কথা বলতে পারছে না। কারণ, আলাপ করিয়ে দেওয়ার তৃতীয় ব্যক্তিটি অনুপস্থিত। চওড়া হাসি হাসলেন পঙ্কজ। এবং এরপর থেকে আমি ওঁর ভক্ত হয়ে গেলুম। আমাদের ঘন ঘন দেখা হতে থাকল। পঙ্কজের প্রতিটি কথাই আমার আশ্চর্য রকমের নতুন মনে হয়। প্রতিটি উচ্চারণ আশ্চর্য রকমের আধুনিক। যদিও তদ্দিনে আমি জেনে গেছি, পঙ্কজ কোনও নামী কোম্পানির দামি এগজিকিউটিভ নন। একটি মাঝারি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন মাত্র। এবং পদটি যা, বিশ্লেষণ করলে, একজন ভদ্রগোছের শ্রমিক ছাড়া কিছুই নয়।
মনোতোষ বলে, পঙ্কজটা এরকমই। ধোপ দুরস্ত, ফিটফাট। দেখে বোঝার উপায় নেই। এককালে খেলাধুলোয় দুর্ধর্ষ ছিল। ফুটবল ক্রিকেট দুটোতেই তুখোড়। মেয়েরা দেখলেই ওর প্রেমে পড়ে যেত। তখন তো ওর গাল এমন তোবড়ায়নি। চোয়ালও ঠেলে ওঠেনি আকাশের দিকে। পাড়ার ক্লাবের হিরো ছিল ও। সব মিলিয়ে পড়াশুনোটা তেমন হল না। পিসেমশাই মারা গেলেন অকালে। প্রভুসেবা করে নাম কিনেছিলেন যথেষ্ট। তার পুরস্কারটা, পসথুমাস, পঙ্কজ পেল হাতে হাতে। স্কুল ফাইনাল পাস না করেও চাকরি পেল পিসেমশাইয়ের কারখানায়। অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারভাইজার। লেবারদের হাজিরা নেওয়া, কাজকর্মের তদারকি, দরকারে নিজেকেও হাত লাগাতে হয় প্রাোডাকশনে। বিস্মিত আমি আবার পঙ্কজের মুখখানি নিয়ে অধ্যয়ন শুরু করি। এবং কিছুদিনের মধ্যেই, ওই লম্বাটে ধারালো তে-কোনা মুখখানা থেকে চেঁচে চেঁচে ফেলে দিই যাবতীয় আমলা-সুলভ অহং, প্রভুত্ব ইত্যাদি। তার বদলে ওই ঠেলে ওঠা চোয়াল এবং তোবড়ানো গাল-সহ পুরো মুখখানিকে আমার দারুণ লড়াকু মনে হয়। শরীরখানা, যেন লড়াইয়ের আগুনে পুড়ে পুড়ে নিখাদ। চামড়া, ঝলসে গিয়ে অমন তামাটে। পঙ্কজের পুরো মুখখানা, তার ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়ি-সহ, আমার কাছে অন্য ব্যঞ্জনা নিয়ে হাজির হয়। কারণ ততদিনে আমি জেনে গেছি, পঙ্কজ ওদের কারখানার ঝিমিয়ে পড়া শ্রমিক-সংগঠনটিকে প্রায় একক প্রচেষ্টায় অনেকখানি চাঙ্গা করে ফেলেছে। শুনে আমি নড়ে-চড়ে বসি। কশেরুকা টানটান করে শুনতে থাকি ওর বিগত তিন বছরের লড়াইয়ের গল্প। চড়াই-উতরাই, খোয়াইতে ভরা সে পথ। পদে পদে সমস্যা, অনিশ্চয়তা, মালিকপক্ষের ভীরু আক্রমণ আর সহযোদ্ধাদের বিশ্বাসঘাতকতার ঝুঁকি সেখানে। সেটাও ভারি অভিপ্রেত মনে হয়। সমস্যা আর অনিশ্চয়তার ঝুঁকি নেই যেখানে, পঙ্কজকে সেখানে মানায় না।
‘আসলে, ছেলেবেলা থেকে বাবার মালিক-তোষণের এত অভিনব পন্থা স্বচক্ষে দেখেছি যে, এক ধরনের হীনমন্যতায় দগ্ধ হতে হতে বড় হয়েছি আমি।’ পঙ্কজের মুখে ম্রিয়মাণ হাসি, যেন শেষ বিকেলের ম্লান বিষণ্ণ আলো, ‘বাবার চিরকাল নুয়ে পড়া শরীরখানি দেখতে দেখতে নিজের প্রতি ঘেন্নাই শুধু বাড়ছিল তিলতিল। সুযোগ পেয়েই তাই মনের ওই গ্লানিটুকু ঘসে ঘসে তুলে ফেলতে চাইছি। এটাকে এক ধরনের প্রায়শ্চিত্ত বলতে পার। পূর্বপুরুষের পাপের।’
দুই
আজ দিনভর ভারি গুমোট। হাওয়া নেই একতিল। গাছের পাতা নড়ছে না একটুও।
মনোতোষ বলল, ‘জানিস তো, পঙ্কজের খুব বিপদ।’
আমি চমকে উঠি। ‘বিপদ! কী বিপদ?’
‘ওকে বদলি করে দিয়েছে ওদের নাগপুরের কারখানায়। ওই তো মাইনে। নিজের বাড়িতে এক অন্নে সবাই আছে বলে সামলে নিচ্ছে কোনওরকমে।’
‘কে কে আছে পঙ্কজের বাড়িতে?’
‘বউ, দুটো বাচ্চা, বুড়ি মা আর এক বেকার ভাই। মা তো একেবারেই শয্যাশায়ী। হরেক কিসিমের ব্যাধি বাসা বেঁধেছে ওঁর শরীরে। বাচ্চা দুটো পড়াশুনো করছে স্কুলে।’
‘খুবই মুশকিল হল তো।’
‘হ্যাঁ, খুব মুশকিল। সবকিছু তুলে নিয়ে নাগপুর রওনা দেওয়া ওর পক্ষে অসম্ভব। পিসিমা ভিটে ছেড়ে কোথাও যাবেন না। আবার পিসিমাকে ছোট ভাইয়ের জিম্মায় রেখে চলে যাওয়াও সম্ভব নয়। মাঝে মাঝে বাড়াবাড়ি রকমের অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। তখন ডাক্তার-বদ্যি, ওষুধ-পথ্য, সেবা-শুশ্রূষা, রাতজাগা— একেবারে নাজেহাল অবস্থা। তাছাড়া খরচের ব্যাপারটাও রয়েছে। ওই মাইনে দিয়ে দু’জায়গায় দুটো এসটাবলিশমেন্ট করা—। চালাবে কী করে পঙ্কজ?’
শুনতে শুনতে মনে মনে ব্যাকুল হয়ে উঠি, পঙ্কজের জন্য।
বলি, ‘হঠাৎ বদলি করল কেন?’
‘শুধু ওকেই নয়, আরও জনাকয়কে করেছে। তবে মনে হয় ওকে করেছে টাইট দেবার জন্যই। ম্যানেজমেন্টকে স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছিল না তো।’
পঙ্কজ কাল এসেছিল মনোতোষের বাড়িতে। খবর পেয়ে গেলুম। থমথম করছিল ওর মুখ। চোখের কোলে কালি জমেছে। রাতে বোধকরি ঘুম-টুম হচ্ছে না তেমন। চোখে-মুখে শান্ত দেখালেও, বুঝতে পারি, একটা ঝড় চলেছে ওর ভেতরে। মনে হল, খুবই ভেঙে পড়েছে বেচারা।
বললুম, ‘তুমি জানাও ওদের। বদলি রদ করবার জন্য রিপ্রেজেন্টেশন দাও।’
পঙ্কজ ধীর গলায় বলে, ‘দিয়েছিলাম। লাভ হয়নি কিছু।’
‘ইউনিয়নকে বল। তারা ম্যানেজমেন্টকে চাপ দিক। ওদের জন্যই তো এত দুর্ভোগ তোমার।’
‘ইউনিয়ন ডেপুটেশন দিয়েছিল। ও পক্ষ মানেনি।’ একটুক্ষণ চুপ করে থাকে পঙ্কজ। পাইপখানা অকারণে নাড়াচাড়া করতে থাকে, আসলে প্রতিটি ইউনিয়নেই কিছু সুবিধেবাদী লোক থাকে। তারা মুখে যতই তড়পাক, ক্রাইসিসের সময় পিঠটান দেয়। এক্ষেত্রেও তাই ঘটছে। মালিকপক্ষের কিছু চামচে তো আছেই বর্ণচোরা হয়ে। অন্যরাও ভয় পাচ্ছে, পাছে বেশি সোচ্চার হলে, তাদেরও বদলি করে দেয়। সব মিলিয়ে ইউনিয়নের যতখানি জ্বলে ওঠার কথা ছিল, পারেনি।’
কথাগুলো ধীরে ধীরে বলছিল পঙ্কজ। ওর অসহায় অবস্থাখানা বুঝতে পারছিলুম।
মনোতোষ বলল, ‘তাছাড়া, বেশি জ্বলে ওঠার অন্য অসুবিধেও রয়েছে। পঙ্কজ তার নিজের ব্যাপার বলে তেমন করে চাপ দিতেও পারছে না ইউনিয়নকে। বিরোধীরা রটাবে, পঙ্কজ নিজের স্বার্থে ইউনিয়নকে লড়িয়ে দিচ্ছে।’ খুবই ডেলিকেট অবস্থা ওর। বুঝতে পারি আমি। সান্ত্বনা দেবার ভাষাও খুঁজে পাইনে। এমন মানুষকে কী বলে সান্ত্বনা দেব! তেতো মনখানা নিয়ে ফিরে আসি। কীভাবে সাহায্য করতে পারি মানুষটাকে, এই দুঃসময়ে, সেটাই ভাবতে থাকি মনে মনে।
দিন কয়েক বাদে কী অদ্ভুত যোগাযোগ! পঙ্কজের চেয়ে ওটাকে আমারই সৌভাগ্য বলে মনে হয়। আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু, স্কুল ও কলেজের সহপাঠী, বিভূতি সান্যাল ওদের কারখানার অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। আমি হঠাৎই জানতে পারলাম, বলতেই, ওকে চিনল পঙ্কজ।
‘বিভূতি সান্যাল মানুষটি ভাল। অন্যদের মতো অত ইয়ে নয়।’ পঙ্কজ বলে, ‘তবে এইসব প্রাইভেট কনসার্নে প্রায় সবাই অল্পবিস্তর ক্যারিয়ারিস্ট। সান্যালও ম্যানেজমেন্টকে খুব মানিয়ে চলে, তবে এমনিতে লোক খারাপ নয়।’
সটান চলে গেলুম বিভূতির বাড়ি। সব খুলে বললুম ওকে।
বললুম, ‘ম্যানেজমেন্টকে পটাও। এ বদলি রদ করতেই হবে। যেভাবেই হোক।’
দেখলুম, উঁচু পদে থাকলেও বিভূতি এখনও বেশ সাদাসিধে, খোলামেলা। পঙ্কজ বলে, কাজে-কর্মে নাকি খুবই এফিসিয়েন্ট। খুব মেথডিক্যাল আর বেশ ঠান্ডা মাথার মানুষ।
সব শুনে বিভূতি বলল, ‘সমস্যাটা হল, পঙ্কজবাবু গত তিন বছরে ম্যানেজমেন্টকে এত চটিয়েছেন যে, ওঁর ব্যাপারে কেউই সিমপ্যাথি দেখাতে নারাজ।’
ব্যাকুল গলায় বললুম, ‘তবু তুই একটু দ্যাখ ভাই। ওর সংসারটা এক্কেবারে ভেসে যাবে। ওর মা’টা বিনে চিকিৎসায় মারা যাবে।’
খুব চিন্তিত দেখাচ্ছিল বিভূতিকে। বলল, ‘দেখি, কী করা যায়।’
তিন
বিকেলের দিকে বিভূতির ফোন।
‘চলে আয়।’
অফিস-ফেরতা গেলুম ওর বাড়ি।
খুব গম্ভীর লাগছিল বিভূতিকে। মুখ খুলতে একটু সময় নিল। চা বানাতে বলল ভেতরে গিয়ে। চা খেতে খেতে বলল, ‘কথা বলেছি ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে। রাজি হচ্ছিল না কিছুতেই। খুব চেপে ধরতে নিমরাজি হয়েছে।’
‘বলিস কী?’ আমি উচ্ছ্বসিত, ‘রাজি হয়েছে!’ ‘তবে শর্ত আছে। পঙ্কজবাবুকে ওঁর বিগত সমস্ত আচরণের জন্য ম্যানেজমেন্টের কাছে লিখিত ক্ষমা চাইতে হবে। এবং ভবিষ্যতে ইউনিয়নের হয়ে আর কখনই ম্যানেজমেন্টকে বিব্রত করবেন না, এই মর্মে মুচলেকা দিতে হবে।’
শুনতে শুনতে অর্ধেক অসাড় হয়ে গেছি আমি। এ যেন নিজের মৃত্যুদণ্ডে সই করবার সামিল! এটা কোনও শর্ত হল! পঙ্কজের মতো মানুষের পক্ষে এমন শর্ত মানা সম্ভব!
বিভূতি খুব পরিষ্কার কথা বলে।
বলল, ‘কোথাও কোনও অ্যামবিগুইটি না রেখেই বলছি ভাই, এটা করলে তবেই ম্যানেজমেন্ট ওর বদলির অর্ডার রদ করবে, নচেৎ নয়। এ ব্যাপারে কোনও দর কষাকষির অবকাশ নেই।’
অন্ধকার রাস্তা ধরে নির্বাক হাঁটছি আমি। হাঁটছি, আর গভীর ভাবনায় তলিয়ে যাচ্ছি। এ কী অপমানজনক শর্ত! মানুষের সঙ্ঘবদ্ধ হওয়ার অধিকারটুকু কেড়ে নেবে, তার দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে! এ কী জুলুম! সবচেয়ে বড় কথা, পঙ্কজকে এমন প্রস্তাব আমি দেব কী করে? ব্যাপারটা ও কীভাবে নেবে? এমন মানুষকে এমন হীন প্রস্তাব দেওয়া যায়?
লোডশেডিং চলছিল।
মনোতোষের ড্রইংরুমে বসে আমাকে তাজ্জব করে দিয়ে পঙ্কজ জানাল, সে দুটো শর্তেই রাজি। তবে তারও একটা অনুরোধ আছে। ম্যানেজমেন্টকে পুরো ব্যাপারটা গোপন রাখতে হবে ওর সহকর্মীদের কাছে। যাতে সবার কাছে ও ছোট না হয়ে যায়।
টিম টিম করে জ্বলছিল কেরোসিনের টেবিল ল্যাম্প। তার ছায়াখানা নাচছিল পঙ্কজের মুখের ওপর। আমি পঙ্কজকে নিষ্পলক দেখছিলুম। এমন শর্তেও রাজি হয়ে গেল ও! এর চেয়ে, আমার মতে, ওর নাগপুর যাওয়াই শ্রেয় ছিল। যত ক্ষতিই হোক, ওর উচিত ছিল। এর চেয়ে মায়ের পা দুটো জাপটে ধরা ওর পক্ষে অনেক সম্মানের ছিল বলে মনে হল আমার। মা-গো, তুমি চল আমার সঙ্গে। আমায় বাঁচাও। ছোটভাই না হয় থাকত একখানা ঘর নিয়ে। বাকিগুলো ভাড়া দিয়ে দিত। ওই টাকায় চলে যেত ছোট ভাইয়ের খরচ। আর বাচ্চা দুটোর লেখাপড়া? এটা তেমন কোনও ব্যাপারই নয়। অল ইন্ডিয়া সার্ভিসে যারা রয়েছে, তাদের ছেলেমেয়েরা হর-হামেশা এমন অসুবিধের সম্মুখীন হয়।
‘তুমি ঠিক বুঝতে পারছ না।’ খুব ঠান্ডা বিষণ্ণ গলায় বলেছিল পঙ্কজ, ‘তুমি ব্যাপারটাকে ইমোশনালি দেখছ। ভাড়াটে যে বসিয়ে দেব, আর যদি না ওঠে? ছোটভাইটা, কোনওদিন একলা থাকেনি, যদি গোল্লায় যায়? যদি প্রেম করে? ড্রাগ ধরে?’
‘ঘরে তালা ঝুলিয়ে, ছোটভাইকে নিয়ে চলে যাও।’ আমি ওকে যুক্তি দেখাই।
‘বাহ! তার কার্ড রয়েছে লোকাল এক্সচেঞ্জে। এই হল তার চাকরি-বাকরি পাওয়ার বয়স। আমি তাকে নিয়ে চলে যাব? তা ছাড়া, মা কী করে থাকবে?’
‘মা-কে বোঝাও। বোঝালেই তিনি রাজি হবেন।’
‘বললাম না, মা-কে এখন শিফট করা কিছুতেই সম্ভব নয়। এই ভিটেতে বাবার মৃত্যুর পর, মা-কে স্রেফ সাইকোলজিক্যাল কারণে ভিটে ছাড়া করা যাবে না।’
হাল ছেড়ে দিলুম আমি। অনেকগুলো সমস্যার ফাঁস গলায় নিয়ে হাঁসফাঁস করছে পঙ্কজ। আমি আর ওর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাই নে।
বললুম, ‘ঠিক আছে। বলছি বিভূতিকে। মুচলেকা দেবার দিনক্ষণ ঠিক করুক।’
গোপনীয়তা রক্ষার ব্যাপারটা ম্যানেজমেন্ট মেনে নিয়েছে। এ খবরটা আমার কাছে পেয়ে অনেকখানি নিশ্চিন্ত হল পঙ্কজ। মনের ওপর থেকে একটা পাষাণভার নেমে গেছে যেন। অনেকখানি হালকা আর ফুরফুরে লাগছে।
বললুম, ‘কিন্তু আরও একখানা শর্ত দিয়েছে বিভূতি সান্যাল।’
‘আবার শর্ত!’ মনোতোষ হতাশ চোখে তাকায়।
‘পঙ্কজকে ওর দাড়িখানা কামিয়ে ফেলতে হবে।’
‘কেন?’ ঝাঁঝিয়ে উঠল মনোতোষ।
‘তা বলতে পারব না।’ বললুম আমি, ‘ম্যানেজমেন্ট হয়ত চায় না, ওরকম লেবার শ্রেণীর একটা লোকের এমন উদ্ধত, মেহেন্দি মাখানো ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়ি থাকুক।’
চায়ের কাপখানি মাঝপথে থেমে গিয়েছিল পঙ্কজের। চোখের পাতা ক্রমশ ভারী হয়ে আসছিল। আমাদের দিকে এক পলক তাকিয়ে, ফের মুখ নামাল ও।
‘এ কী বেয়াড়া আবদার।’ মনোতোষ চিল্লিয়ে ড্রইং রুম ফাটিয়ে ফেলতে চায়, ‘গোঁফ দাড়ি মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপার। এটা একটা বাজে জুলুম। একদম মানা যায় না।’
আমি নির্বাক অপেক্ষা করি। পঙ্কজই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবার মালিক। আমি কেবল সেই সিদ্ধান্ত বিভূতির কাছে বয়ে নিয়ে যাব।
সোফার ওপর অধোবদনে বসেছিল পঙ্কজ। কথা বলছিল না। মাথার ওপর বনবনিয়ে পাখা ঘুরছিল। তার ছায়া আমাদের তিনজনকেই ছিন্নভিন্ন করছিল অবিরাম। পঙ্কজ ভাবছে। তার বাঁ-হাতখানা অজান্তে উঠে এসেছে চিবুকের কাছাকাছি। আঙুলগুলো আলতো নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে হালকা কফিরঙের দাড়িতে। দুচোখে ঈষৎ ঢুলুনি। ভেতরে অবিরাম রক্তক্ষরণ চলছে তার, বুঝতে পারছিলুম আমি।
সামনের বাড়ির টিনের চালে একটা কাক তারস্বরে ডেকে চলেছে। একটা হুলো বেড়াল নর্দমা পার হচ্ছে সন্তর্পণে…। সন্ধে হয়ে আসছে। মনোতোষের ড্রইং রুমের কম-পাওয়ারের বাল্বখানাকে আরও বিষণ্ণ লাগছে।
অনেকক্ষণ বাদে মুখ তুলল পঙ্কজ। মুখ খুলল আরও খানিক বাদে।
‘আমি রাজি।’
‘ওই যে মডার্ন সেলুন।’ আমি আঙুল তাক করে দেখিয়ে দিলুম, ’রাস্তার উল্টোদিকে।’
দাড়ি-গোঁফ কেটে আসবার পর যেন আমূল বদলে গেল পঙ্কজের মুখখানি। অতি সাধারণ মামুলি সে মুখ। গাল তোবড়ানো, চোয়াল উঁচু, এক ক্লান্ত অপুষ্ট শ্রমিক। মালিকপক্ষের সামনে পঙ্কজের নতজানু হওয়ার বিরুদ্ধে আমার সেই তাপ-উত্তাপ যেন একটু একটু করে উবে যাচ্ছিল।
মনোতোষ তখনও গুমরাচ্ছিল। কোনও মালিক যে এমন অশিষ্ট জুলুম চালাতে পারে, তা যেন ওর কল্পনার অতীত।
‘এই জন্যেই এত লেবার-আনরেস্ট। এরা শ্রমিকদের সত্যি সত্যিই দাস ভাবে।’
ওকে বলিনি, পঙ্কজকেও না, কোনও দিনও বলব না, ওই শর্তটা আদপেই মালিকপক্ষের ছিল না। ওটা ছিল নিতান্তই আমার। আমারই স্বরচিত ওই শর্ত।
কারণ একটাই। ওইরকম একখানা দাড়ি নিয়ে আমি কাউকেই তার মালিকের সামনে নতজানু হতে দিতে পারি নে।
