কমলকুমার : মজুমদার বাবু
এই বাড়িটা ইউরোপের কোনও বড় শহরে হলে মানাত; এরূপ তেরিকাটা বাড়ি কলকাতায় খুবই কম! থামের মাথায় তো বটেই, এছাড়া জানলার ওপরে দরজার মাথায় সব জায়গায় তেরিকাটা নকশা করা। বাড়ির মালিক মনে হয় সিঁড়িতেই বাস করতেন, শৌখিন লতানো সিঁড়ি। অথচ ভারতীয় সুবিধা-অসুবিধা বুঝেই বাড়িটা তৈরি হয়েছে। বাহিরে থেকে মনে হয় পাকা বিদেশীয়। বিরাট ঘরে ঝড়ের কড়া ঝুলছে, ছবির হুক রয়েছে, মর্মর মূর্তির দান রয়েছে, মেজে থেকে খুলে নেওয়া পাথরে চৌকো চৌকো দাগ রয়েছে। আর কিছু নেই, শুধু মাঝে মাঝে বহু পুরাতন পায়রারা ঠাকুর দালানে খেলে খেলে বেড়ায়…।
নিচে এমন একটি জায়গা নেই, যেখানে ভাড়াটে বসেনি। ঠেলাগাড়ি আসে, মাল নিয়ে যায়, দোতলায় অনেক জাতীয় ভাড়াটে, ছেঁড়া শাড়ি, গামছা, ল্যাঙট শুকোতে দেখা যাবে, আর সারি সারি লোটা মাজার ধুম! ছাদে পর্যন্ত ভাড়াটে; হাভাতে মুটে মজুররা এখানে শোয় (মাথাপিছু মাসে দু’আনা দেয়)। তারা রাত দশটায় আসে। এই বাড়িখানি এক মারোয়াড়িবাবু কিছুকাল হয় খরিদ করেছেন।
একদা এই বাড়ির মালিক ছিলেন বাবু দুনিয়াচাঁদ দত্ত। ছাদের পর ছাদ, এবং অন্দরমহলের ছাদের ওপরে যে কোঠা আছে, সেখানে আজও তিনি বসবাস করেন। মারোয়াড়িবাবু দুনিয়াচাঁদবাবুর বন্ধু, তাঁকে শেষ জীবনটা এখানেই থাকতে অনুমতি দিয়েছেন বা অনুরোধ করেছেন। বাবু অভিমানী লোক, শ্বশুরালয়ে অথবা অন্যান্য আত্মীয়বন্ধুর নিমন্ত্রণেও কলকাতায় বা কাশী যাননি; এখানেই আছেন।
বাবুর বংশের কেউ নেই, সমস্ত সম্পত্তি যে কীভাবে গেল, তা বাবু দুনিয়াচাঁদ দত্ত বলতে পারেন না, কারণ বড় বড় চোখ থাকা সত্ত্বেও, আধবোজা চোখে জগৎটাকে দেখেছেন। অনেক টাকা ফুর্তির জন্য খরচা করলেও নিজে বলতে গেলে ফুর্তি করেছেন অল্প। কারণ চরস আর মদ বাবু প্রচুর খেয়েছেন। এখন আর কিছু নেই, থাকার মধ্যে অগণন মোসাহেবের মধ্যে রাখোহরি চাটুজ্যে। মেয়ে-নেকড়া রাখো। আজও বাবুর সঙ্গে এই ছাদে বাস করে।
বাবু দুনিয়াচাঁদের তখন বয়স অল্প, প্রায়ই সেলে (নিলাম-এ) যেতেন। বিলাতি নিলাম কোম্পানির সাহেব জাপানি গেঞ্জি পরা রাখোহরিকে এনে তাঁর সামনে হাজির করলে! রাখোহরির হাতখানি কি অদ্ভুত ছিল, নখগুলো তাঁর শোলার মাথার মতো, বাবুকে আভূমি কুর্নিশ করে দাঁড়িয়ে উঠে চোখ ফেরাতে পারল না। রাখো ইতালীয় মার্বেলের তৈরি অনেক দেবী মূর্তি দেখেছে, মনে হল মুখখানি যেন ঠিক সেইরকম! বাবুর পেছনে দণ্ডায়মান জনা দশেক লোক ছিল, তারা সকলেই কোঁচা ছড়ি মুঠো করে যেন কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে; সকলেই বাবুর কী একটা দরকার হবে এখনি, সেই আশায় উদগ্রীব, এমনকী কোম্পানির বড়সাহেব, যাকে রাখোর মতো আর পাঁচজন সদা কড়া মেজাজে দেখে, সেই সাহেবই কী অসম্ভব বিনীত! রাখোর মনে হয়েছিল, সে যেন কী এক গুরু অপরাধ করে ফেলেছে, সে কেমন যেন দুমড়ে যেতে লাগল।
সাহেব বললেন, মহাশয়, এই সেই লোক, সমস্ত কাজই জানে, ঝাড়ের কলম জোড়া থেকে, মেহগনি, রোজউড পালিশ করতে, পালিশের কাজ, বিশেষত আপনার জিনিসগুলো প্রত্যেকটাই তো বিলাতি, এই পারবে…
তাহলে মিঃ বেটস, একেই আমার সঙ্গে দিন, আমার সঙ্গে দেখে আসুক… এখনি চলুক…।
রাখোহরি দেখলে, যে লোকগুলো পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল, তারা অনড় হয়ে রইল, শুধু একজন মাত্র তাড়াতাড়ি এসে বাবুকে বিনীতভাবে সাহায্য করবার জন্য এগিয়ে এসে দাঁড়াল। বাবু আস্তে আস্তে উঠলেন, সাহেব পাশে এসে দাঁড়ালেন। ছোট জনতা পা মেপে মেপে চলতে শুরু করল। বাবু এগিয়ে যাওয়ার দরুন কেউ এই অবসরে গলাটা খেলিয়ে নিল, কেউ গলাটা অনুচ্চ অল্পস্বরে পরিষ্কার করল। রাখোহরি এরূপ নড়াচড়া দেখে নিজের ময়লা হাতটার দিকে চেয়ে দেখলে, নিজের নোংরা কাপড়ের দিকে চোখ পড়ল। তার নিজের দারিদ্র্যের জন্য নিজেকে অপরাধী করার থেকে, বেশি হয়েছিল সৃষ্টিছাড়া আতঙ্ক। কেন যে সে মনে মনে ভীত হতে থাকল! সে যে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে, তা সে জানলেও, কী যে করা উচিত তা ঠিক করতে পারেনি; অল্পক্ষণ পরে পায়ের যাতে না কোনও শব্দ হয়, এমনভাবে টিপে টিপে সে এগিয়ে গেল। লম্বা পঞ্চাশটা সিঁড়ি নেমে গেছে, নিচে দরোয়ান দাঁড়িয়ে, সিঁড়ি বেয়ে ওঁরা গেলেন। সিঁড়ির প্রায় শেষ ধাপে বাবু এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গ এবং সাহেব। রাখোহরি হঠাৎ ভুল করে কয়েক ধাপ শব্দ করে নামতেই, আবার সব মুখগুলো তাঁর দিকে ফিরে তাকাল; বাবু দুনিয়াচাঁদ তাকাননি। রাখোহরি যেন অসুস্থ হয়ে পড়েছিল!
নিচে থেকে সাহেবের গলা এল… ‘র্যাংককো জলডি…’
সাহেব তো বলে খালাস। কিন্তু রাখোহরির সে জোর কোথায়! তবু সে কোনওমতে জোর করে নেমে এল।
প্রকাণ্ড গাড়ি-বারান্দা। সাদা দুটি ঘোড়া জোতা আছে, একটি সাদা গাড়ি এসে দাঁড়াল— সোনার গিল্টি করা অনেকটা কারসের মতো (লুই পঞ্চদশ); মনে হয় যেন একটা বাদ্যযন্ত্র — বাবু দুনিয়াচাঁদ উঠলেন। কে আর একজন উঠতে যাচ্ছিলেন হঠাৎ তিনি বললেন, ‘সেই লোকটা…’
যে উঠতে যাচ্ছিল সে বললে, ‘ওই যে…’
‘ওকে এখানে আসতে বল…’
গাড়ির ভেতরে আর এক জগৎ; শৌখিন জিনিসের সঙ্গে রাখো পরিচিত হলেও, মালিকের ব্যবহারে শৌখিন জিনিসগুলির আর এক রূপ; বেনারসীর মতো কাপড়ে ঢাকা আসনে রাখো যেন বস্তুর মতো হয়ে গেল। তার পাশেই যে লোকটি বসে, সে অতি চতুরভাবে নিজেকে তফাতে রেখেছিল, বোধহয় ঘৃণায়। রাখো মিস্ত্রি, ফলে গরিব।
বাবু রাখোর পাশের লোকটিকে বললেন, ‘এই বেচা শালা লাথি খাবি…’।
‘আজ্ঞে তা খাব’… বলেই সে তৎপর হয়ে হাত রাখার জায়গাটা খুলে নকশা করা বোতল ও ছোট গেলাস বার করে একটু মদ ঢেলে বাবুকে দিল।
বাবু নিঃশ্বাসে সেটুকু পান করে বললেন, ‘মাইরি বেশ পালিশ করতে পারবি তো, না আমার বদনাম করবি… পচা শালি বড় খুঁতখুঁতে।’
রাখোহরি বোঝেনি একথা তার উদ্দেশ্যে বলা, প্রথমত এইরূপ গাড়িতে বসবার সুযোগেই সে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল, সে যেন তন্দ্রায় ছিল। সে কোনও উত্তর দিচ্ছে না দেখে, বেচারাম মোসাহেব তাকে একটা কনুইয়ের গুঁতো দিয়েই কনুইটা ঝেড়ে ফেললে।
‘আজ্ঞে’…
‘পারবি তো, মেয়েছেলেটা বড় খুঁতখুঁতে… কি বল বেচা… তোর কি মনে হয় লবঙ্গ খুব…’
‘আজ্ঞে একশোবার, তাছাড়া আপনি আমায় ডালকুত্তা দিয়ে খাওয়ান। চাই কি বাবা আদমের আমলের পুরনো মাগুর মাছওয়ালা চৌবাচ্চায় আমায় ডুবিয়ে রাখুন, তবু হ্যাঁ, ওই যা বললুম… তবু বলব… আপনি যা খুশি করুন…’
‘এইবার জুতো খাবি বেচা, বামুনের ছেলে বলে আমি কিছু বলি না বেচারাম…’
‘আজ্ঞে… ওই পদি কিত্তুনীর মেয়ে লবঙ্গ না এত করে আপনার জন্য, আপনি তো এতটুকু এদিক-ওদিক… এই তো সেদিন বলছিল, আমায়… সাতজন্ম পুণ্যি করলে এমন মানুষ পাওয়া যায় গো… ক্যাশ ভাঙা কাপ্তেনে বাজার গরম বাবু কটা…’ বলে বকের মতোই গলাটাকে দুয়েকবার সামনে পিছনে করলে।
‘হঠাৎ তোর সঙ্গে এত কথা…’
কথার আওয়াজ নয়, শুধু বলবার রীতি বুঝেই বেচারাম ঘর্মাক্ত হয়ে, একটি ঢোক গিলে বললে, ‘আজ্ঞে, আপনি আমাকে… আজ্ঞে ওকে থিয়েটার যাবার জন্য…’ কথা বেচারাম আর শেষ করতেই পারল না। সত্যকথা বলার সাহস সে কোথায় পাবে, তাকে বাবুতে মেরেছে।
‘মহম্মদ জান…
গাড়ি থামল। বাবু বললেন, ‘বেরো হারামজাদা — জুতিয়ে তোর চামড়া তুলে নেব। আবার মিছে কথা, বেরো, ডুবে ডুবে জল খাও!’
গাড়ির দরজা ইতিমধ্যেই খোলা হয়েছিল। বেচারাম আস্তে আস্তে নেমে বললে, ‘বাবু আমার কি হবে! আমি যে… আমার যে নরকেও স্থান হবে না বাবু… আমি মিথ্যে কথা বললুম… আমি বাবু জাতে বামুন নই চাঁড়াল।’
‘চাঁড়াল তোর বাপ। আচ্ছা তুই ওদের গাড়িতে আয়… চলো…’ গাড়ি চলতে শুরু করল। বাবু বললেন, ‘শালা গাড়োল বজ্জাত… হ্যাঁরে তোর নাম কি…’
‘আজ্ঞে রাখোহরি’ রাখোর আর একটু বলার ইচ্ছে ছিল, সে কথা হচ্ছে এই যে, ‘বাবু আপনি আমায় নামিয়ে দিন’ কিন্তু সে বলতে পারল না।
‘দে একটু মদ দে… শালা…আমায় চেনে না… নে নে শালা তুই আগে নে। তোরা জাতে কি…’
‘আজ্ঞে বামুন…’
‘হেঃ তুই ঠিক জানিস তো… তোকে বেটা এমন জাম্ভূমানের মতো দেখতে কেন… নে খা প্রসাদ করে দে… তুই বামুন বললি না… তুই লেখাপড়া জানিস—’
‘আজ্ঞে না হুজুর…’
একথা কানে যাবার আগেই বাবু গান ধরলেন ‘আমার নাম ফকির বালা তোমার’ খানিক গান করেই বললেন, ‘তুই এ গানটা জানিস!’
রাখো তো অবাক, এ সকল অশ্লীল গান, কারখানায় অথবা দিশির দোকানে কিংবা অগাধ রাতে হুক্কাসুন্দরীদের বাড়ি ছাড়া আর কোথাও গাওয়া যায় কিনা সে জানত না। বিশেষত, এমন এক ইংরেজি শিক্ষিত সুন্দর চেহারার বাবুর মুখ থেকে শুনতে পাবে, তা আশাই করেনি। এই গানে সে আবার এতক্ষণ বাদে এক মুহূর্তের জন্য রাখোহরি চাটুজ্যে হয়ে দেখা দিলে।
বাবু তাকে বললেন, ‘কি রে খা… না…’ গলায় একটা মেয়েলি সুর…
রাখোহরি গেলাসটা নিয়ে যে কী করা উচিত, তা ভেবেই পেলে না, হয়ত এইটুকু তাঁর বুদ্ধি হয়েছিল যে, যদি খাই তাহলে এখুনি অপরাধ হবে, যদি না খাই তাহলেও হবে… হঠাৎ সে বলে ফেলল, ‘বাবু আপনার সামনে আমায় খেতে বলবেন না, হুজুর… পাপ হবে…’
বাবু এই কথায় আবেগে ছেলেমানুষ হয়ে গেলেন, বললেন, ‘মাইরি আয় তোকে জড়িয়ে ধরি…’ বলে টাল সামলাতে না পেরে প্রায় ঝুঁকে পড়ছিলেন।
রাখো এক হাতে তাঁকে সামলে, বললে, ‘বাবু দেখলেন তো আমি যদি খেতাম আপনাকে কে দেখত?’
‘মাইরি, তুই আমার পাশে বস, তুই মাইরি যদি মেয়েছেলে হতিস, তো তোকে ভাঙিয়ে এনে বাঁদা রাখতুম… মাইরি, এই মহম্মদজান কোঠি…।’ বলে পাশে বসা রাখোহরির না কামানো গালে হাত বুলাতে লাগলেন। রাখো লজ্জায় হিম আড়ষ্ট।
লবঙ্গর বাড়ি যাওয়া হল না।
গাড়ি যখন থামে, স্থির। গাড়ির মোসাহেবেরা এসে দাঁড়াল। চাকর, আমলা, গোমস্তা সকলে সসম্ভ্রমে দাঁড়িয়ে। এমত সময় বাবু বললেন, ‘রাখো তোকে আর পালিশ করতে হবে না, তুই তদারক করবি… তুই চানটান কর। কি মাছ ভালবাসিস বল… চ চ বাড়ির মধ্যে চ…’
ম্যানেজার, বুড়ো চাকর সকলেই ইতস্তত করছিল। বাবুর সামনে কারুর কথা বলার সাহস হল না। বাবু অন্দর মহলে ঢুকেই বললেন, ‘ওগো এই রাখোহরি বামুনের ছেলে…’
রাখোর মনে হল কাচকড়া চালসীর (বিস্কুট) পুতুলের মতো (নিলাম ঘরে চেলফজীকে চালসী বলে, সাদা হলেই বিস্কুট বলে থাকে) অল্পবয়সী বৌমানুষ তাকে প্রণাম করতে যাচ্ছিল।
‘থাক থাক মা জননী থাক মা…’
বিকেলবেলা রাখোহরিকে আর চেনা গেল না। তার চেহারাটা ফিরে গেল। শুধু বাবু বললেন, ‘তোর নখগুলো… এমন কেন’…।
‘আজ্ঞে পালিশের কাজ করে।’
‘ও আর উঠবে না…’
‘আজ্ঞে… দেরি হবে…’
‘তবে নখগুলো তুলে ফেল… আমার সঙ্গে বেড়াবি। অমন ছোটলোকের মতো হাত…
রাখোহরি অবাক হয়ে বাবুর মুখের দিকে চেয়ে থাকে। দুনিয়াচাঁদবাবু রাখোর ভাব দেখে বিরক্ত হয়ে উঠলেন— ‘কি রে রাখো কথা বলছিস না যে বড়?’
রাখোহরি ভেবে পায় না যে, সে কি বলবে। কারণ এমন কথা যে মানুষ বলতে পারে, তা রাখোহরি চাটুজ্যে চোদ্দপুরুষে শুনেছে বলে মনে হল না। তাই সে বাবুর দিকে এক নজরে চেয়ে রইল।
‘শালা… উত্তর দিচ্ছিস না কেন…? তোর বরাত ভাল যে তুই আমার নেকনজরে পড়েছিস, বুঝলি! কেবল নোখগুলো তোর তুলে ফেলতে হবে… সেসব আমার ব্যাপার, তোর কিছু ভাবনা নেই। ডাক্তার বল, হেকিম বল, কবিরাজ বল, সব আমার ব্যবস্থা আছে। দেখ, তোকে লবঙ্গশালিদের কাছে আর যেতে দেব না … তুই কেবল আমারই বাঁধা হয়ে থাকবি বুঝেছিস? রাখো তুই কিছু বল না মাইরি…।
এরপর বাবুর টলায়মান দেহটি ক্রমশ রাখোর দিকে এগিয়ে আসে।
রাখোহরি একবার চারিদিকে চেয়ে দেখলে। তাঁর মনে হল কারা যেন দূরে দাঁড়িয়ে আছে, তবুও সে ভাবলে যে বাবুর নাগাল থেকে তাকে পালাতেই হবে। কিন্তু আর তা হল না— বাবু তখন তাকে ধরে ফেলেছে।
গলায় সুধা ঢেলে বাবু বললেন— ‘কিরে তোর কি আমায় মনে ধরেনি, আমার দিকে অমন করে চেয়ে আছিস কেন রে? তুই আমার কাছে বরাবর থাকবি, তোকে তো আমি মাসে মাসে মাসোহারা দেব, কেমন, হল তো… ব্যস। তবে, কিন্তু যদি অন্দরমহলে ঢুকতে চেষ্টা করিস, তাহলে শালা চাবকে পিঠের চামড়া তুলে নেব খবরদার… হারামজাদা, সাবধান…।’
রাখোহরি বাবুর কথা শুনে শিউরে উঠল। সে যেন খাঁচার দরজা খুলে পালাবার মতো আপ্রাণ চেষ্টা করে বাবুর হাত ছাড়িয়ে কোনওরকমে আত্মরক্ষা করল। তারপরেই রাখোহরি দুনিয়াচাঁদ দত্তের দু’পা জড়িয়ে ধরে বলে উঠল— ‘বাবু আমায় ছেড়ে দিন… ছেড়ে দিন…।’
দুনিয়াচাঁদের মত্ত অবস্থায় যেন ধর্মজ্ঞান ফিরে এল। তিনি রাগে ফেটে পড়লেন— ‘হারামজাদা… বজ্জাতের ধাড়ি, আবার আমার পায়ে ধরা হচ্ছে, বামুন হয়ে আমার পায়ে হাত… শালা আমার নরকের ব্যবস্থা। পিঠের ছাল খুলে নেব!! আমাকে চেন না শালা…। এই কে আছিস’…
বাবু সজোরে একটা লাথি মেরে রাখোহরির ছোটখাটো দেহটা দূরে ছুঁড়ে দিলেন। পায়ে পায়ে এতক্ষণে মোসাহেবের দলটি অনেকটাই কাছাকাছি এগিয়ে এসেছিল। এবার তারা কোঁচার খুঁট ধরে সবাই একসঙ্গে ঘরে ঢুকে পড়ল। এই সুযোগে বেচারাম আগেভাগে ঢুকে এসে বললে— ‘আজ্ঞে হুজুর হুকুম করুন।’
‘শালা… বদমাশ… চাটুজ্যে বামুন হয়ে কিনা আমার পায়ে ধরা… আমার পায়ে ধরা? আমার সর্বনাশ করলে। আজ শালার চামড়া তুলে নেব… ডাক ইসমাইলকে।’
যদিও বেচারাম এই সূত্রে পুরনো পিরীতটা ঝালাতেই চাইছিল, তবে এতটা সে আশা করেনি। সে যদিও তার ব্রাহ্মণত্ব অনেক আগেই বিসর্জন দিয়েছে, তবুও সে একটু থমকে গেল।
‘দেখ বেচা… শালা কেমন মরামাছের মতো চেয়ে আছে। এই হারামজাদা বেচা তুই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলি কেন?’
বাবুর গলার আওয়াজ শুনে বেচা ‘আজ্ঞে হুজুর’ বলে গেলাসে মদ ঢেলে বাবুর হাতে দিল। তারপর সে উধাও হয়ে গেল।
এতক্ষণে বাবুর লাথির চোট হজম করে রাখোহরি তাঁর মুখের দিকে চেয়ে ছিল… অবাক হয়েই সে দেখছিল বাবু দুনিয়াচাঁদের সুন্দর ইতালীয় দেবী মূর্তি সদৃশ মুখখানা। কিন্তু এখন সে দেখতে পেল সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে কী কুটিল, নির্মম পাশবিক জঘন্যতা! এরপরই রাখোহরি চাটুজ্যের চোখে ভেসে উঠল— তাঁর নিজের দেশ… ঘর… আর কতগুলি বুভুক্ষু অসহায় মুখ…। ফুঁসে উঠেছিল রাখোহরির ভেতরটা… দুনিয়াচাঁদ দত্তের সুন্দর মুখখানা যেন আঁচড়ে খিমচে ক্ষতবিক্ষত করে দিতে তাঁর ভয়ানক ইচ্ছে হচ্ছিল।
‘কিরে… শালা… পেসাদ খাবি নাকি?’ জড়ানো গলায় কথা বলতে বলতে বাবু তাঁর হাতের মদের গেলাসটা ছুঁড়ে দিলেন, সোজা রাখোহরির মুখের দিকে। মুহূর্তের মধ্যে রাখোহরি সরিয়ে নিল তার মুখখানা, গেলাসটা এসে তৎক্ষণাৎ পড়ল তার কোলের ওপর। রাখোহরি চাটুজ্যের কি যে ঘটে গেল! সে যেন কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলল। হঠাৎ সে কাঁপা হাতে গ্লাসটা তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিলে বাবু দুনিয়াচাঁদের দিকে। ঘরের ভেতরে মনে হয় বাজ পড়ল, মোসাহেবের দল হই হই করে উঠল। কিন্তু রাখোর কাঁপা হাতে ছোঁড়া গেলাসটা বেশি দূর আর এগোতে পারল না, ঘরের মাঝখানে পাতা পারসিয়ান কার্পেটের ওপর পড়ে সেই শৌখিন সুন্দর বিলাতি কাটগ্লাসের পাতটি টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ল।
সকলেই তটস্থ! কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার! বাবু দুনিয়াচাঁদ এখন সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন, রাগে তাঁর সর্ব শরীর কাঁপছে, লাল দু চোখ উত্তেজনায় জ্বলে উঠছে। ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে সেই সুন্দর মুখের পাশবিক ভঙ্গি। হঠাৎ সে সময়ে কে একজন এসে দাঁড়াল দরজায়।
রাখোহরি চাটুজ্যে তখনও জ্ঞান হারাননি… মরা মানুষের মতো চোখে দেখতে পেল গ্রিক ভাস্কর্যের মতোই বলিষ্ঠ নিখুঁত এক নিকষ কালো মর্মরমূর্তি, দু চোখে ক্রূর দৃষ্টি। লোকটা কুর্নিশ করে দাঁড়িয়ে রইল বাবুর আদেশের অপেক্ষায়।
ক্ষেপা গলায় গর্জন করে উঠলেন বাবু— ‘শালাকো চাবুক লাগাও।’
‘যো হুকুম মালিক।’
বাতাসে ভর দিয়ে যেন লোকটা ঘরে ঢুকে এল। দুখানা বিরাট হাত বাড়িয়ে রাখোহরির নাতিদীর্ঘ দেহটা সে তুলে নিয়ে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেল। একবার মাত্র রাখোহরির হাত ছাড়ানোর দুর্বল প্রচেষ্টা। তারপর একটা কাতর কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
এখন নীলাভ সন্ধ্যা। কালো মেঘের ছোট ছোট ঢেউয়ে কেয়ারি করা জংলা অন্ধকার। আকাশ এখানে স্থির।
বহুদিন কেটে গেছে। দুনিয়াচাঁদবাবুর জীবনেও ঘটে গেছে বিরাট পরিবর্তন। বাবুর বহু গল্পই আজ ফুরিয়ে গেছে— অর্থ-সম্পদও নটে গাছটি মুড়ানোর মতোই নিঃশেষ। দুনিয়াচাঁদবাবুর সুখের দিনের সঙ্গীরা আজ উধাও। মোসাহেবের দল এখন বাবু সেজেছে। তবু বাবু অভিমানী, তাই ধনী আত্মীয়দের আশ্রয়ে যাননি। মাড়োয়ারি বন্ধুর অনুগ্রহে বা অনুরোধে তিনি নিজের বাড়ির ছাদের ঘরে বাস করেন। সঙ্গে রাখোহরি, সে বাবুর সঙ্গে একই ছাদের ঘরে থাকে।
ভোল বদলেছে রাখোহরি চাটুজ্যের অনেক দিন— হাবাগোবা মেয়েলি ধরনের চালচলন এখন তাঁর। পুরনো মোসাহেবের দল মাঝে মাঝে আসে, তবে তাঁর দুঃখের দিনের সঙ্গী হিসাবে নয়, সুখের পায়রা হয়েই আসে, বাবুর আড়ালে রাখোকে তারা ডাকে ‘ঠাকুরঝি’ বলেই। রাখো তাঁর পাতাকাটা চুলে ন্যাকাবোকা মুখখানায় একপাল হাসি নিয়ে গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তাদের দিকে চেয়ে। এরপর তারা রাখোকে নিয়ে রগড়ে মেতে ওঠে।
তেরিকাটা নকশা করা ইউরোপীয় আভিজাত্যের এই বাড়িটি এখনও আছে। তবে নেই শুধু অভিজাত রুচির বশংবদ দুনিয়াচাঁদবাবুর ব্যয়বহুল শৌখিন পরিপাটি সংসার, আর নেই তাঁর সাবেকি চালের দহরম মহরম। বিরাট ঠাকুর দালান আজও আছে সেখানে পায়রার দল খেলে বেড়ায়। প্রকাণ্ড হলঘরে আজ আর কিছুই নেই, সেখানে ঝাড়ের শূন্য আংটায় সকাল-সন্ধ্যায় পাখিরা দোল খেয়ে যায়। কেয়ারি করা লতানো সিঁড়ির ধাপে ধাপে পানের পিকের দাগে— ছোপ ধরা হাল আমলের মরচে পড়া ছাপ।
কানাঘুষোয় শোনা যায় সবই নাকি বাবু দুনিয়াচাঁদের পাপ!
