অরুন্ধতী মুখোপাধ্যায় : সোনালি দিন

অরুন্ধতী মুখোপাধ্যায় : সোনালি দিন

গতকালই অরূপরতন রায় সাংবাদিক সম্মেলন করলেন। আজ আবার সাংবাদিকদের ডাকলেন দেখে সোনালি একটু অবাকই হল। কী এমন ঘটল! অর্থমন্ত্রী তো রোজ রোজ সাংবাদিক সম্মেলন ডাকার মানুষ নন। খবরের কাগজে নাম ওঠানোর জন্য যে-সব মন্ত্রী সুযোগ খোঁজেন, তাঁরা কথায় কথায় প্রেস কনফারেন্স ডাকেন। অক্ষয়বাবুকে নিয়ে তাই সাংবাদিক মহলে একটা রসিকতা চালু আছে। অক্ষয় সরকার, খাদ্যমন্ত্রী। দিল্লিতে মিটিং করে সেখানে একদফা সাংবাদিক সম্মেলন করেন। আবার কলকাতায় এসে সাংবাদিকদের একই কথা শোনানোর জন্য ডাকেন। অক্ষয়বাবু অবশ্য বুঝদার মানুষ। ঠিক বোঝেন কীরকম কথা বললে প্রথম পাতায় আসা যাবে। বোঝেন কবে প্রেস কনফারেন্স করলে রিপোর্টাররা লিখবে, খবরের কাগজ ছাপবে, আর কবে নয়। রিপোর্টারদের সঙ্গে ওঠা বসা করে তিনি তাদের ভাষাও জেনে গেছেন। কাগজে কোন স্টোরি খায়, খায় না— এ-সব রিপোর্টার মহলের ভাষা তিনিও ব্যবহার করে ফেলেন মাঝেমধ্যে। অক্ষয়বাবুর প্রেস রিলিজের ঠেলায় তিতিবিরক্ত রিপোর্টাররা। তখন ঋতেশই অক্ষয়বাবুকে নিয়ে প্রেস কর্নারে রসিকতাটা চালু করেছিল।

— অক্ষয়বাবু এবার থেকে রেশন দোকানে চাল-ডালের সঙ্গে একটা করে প্রেস রিলিজ বিলি করবেন।

অরূপরতন রায় অবশ্য অন্য অনেক মন্ত্রীর থেকেই আলাদা। তেমন গুরুত্বপূর্ণ না হলে প্রেস কনফারেন্স ডাকার লোক নন তিনি। সে-সব নিয়েই সোনালি অন্য কাগজের রিপোর্টারদের সঙ্গে জল্পনা করছিল। যথাসময়ে তাঁর ঘরে ঢুকতে তিনি জানিয়ে দিলেন, ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলের মিটিংয়ে পশ্চিমবঙ্গ যাবে না। আজই দিল্লি থেকে চিঠি এসেছে। কাল মিটিং। এত কম সময়ে পেপার তৈরি করা যাবে না! অন্য অ-কংগ্রেসি, অ-বি জে পি সরকারের সঙ্গেও কথা বলা হয়েছে। তাঁরাও বয়কটে রাজি।

সোনালি সোজাসুজি প্রশ্নটা করে বসল,

— তামিলনাড়ু সরকার এন ডি সি মিটিংয়ে যাবে বলে তাদের কাগজপত্র তৈরি করছে। আজ পি টি আই এ-খবর ক্রিড করেছে। আপনার বয়কটের ডাক কি সব অ-কংগ্রেসি, অ-বি জে পি সরকার মেনে নিচ্ছে না? কয়েক সেকেন্ড চুপ করে অরূপরতন বললেন,

— আমরা তামিলনাড়ুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। আজই চিঠি পেয়েছি। সবার সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা হয়ে ওঠেনি। পাশ থেকে দেবতনু ঝট করে বলে উঠল

— তাহলে অ-কংগ্রেসি, অ-বি জে পি সরকারগুলো সবাই রাজি এ কথা নিশ্চয়ই বলা চলে না।

অরূপরতন রায় মিলিতভাবে বয়কটের প্রশ্ন এড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই এরপর সীমিত রইলেন।

— আমরা কেন্দ্রের খাস গোলাম নই, যা বলবে তাই মেনে নিতে হবে। ওঁরা ইচ্ছে করেই আমাদের সময় দিচ্ছেন না। কারণ, আমরা কাগজপত্র নিয়ে তৈরি হয়ে গেলে ওঁদের অসুবিধে হবে।

রিপোর্টাররা সব বেরিয়ে এল। কিছুক্ষণ বাদেই তাঁর একান্ত সচিব সুদীপ বসু প্রেস কর্নারে এসে সোনালিকে ডাকলেন।

— মন্ত্রী ডাকছেন।

সোনালি একটু অবাক হল। অরূপরতন রায় বেশ বড় দরের মন্ত্রী। তিনি নিজে থেকে ডাকছেন। ব্যাপারটা বেশ বিস্ময়ের। সোনালি মনে মনে খুশিই হল। রাজ্যের অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে যদি অন্য রিপোর্টারদের থেকে একটু বেশি ঘনিষ্ঠতা থাকে, তাহলে এই রোজকার প্রতিযোগিতার বাজারে একটু এগিয়ে থাকা যায়। সোনালি মন্ত্রীর ঘরে ঢুকতে তিনি সোনালি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন— কোথায় পড়েছেন, কী পড়েছেন, কতদিন চাকরি করছেন ইত্যাদি। সুযোগ বুঝে সোনালি বলল,

— আমার যদি কিছু জিজ্ঞেস করার থাকে, তাহলে কিন্তু মাঝে মাঝে আপনাকে বিরক্ত করব।

সেদিন অফিস যাওয়ার পথে সোনালির মনটা খুব ফুরফুরে লাগছিল। বছর তিনেক হল ও একটা কাগজে জয়েন করেছে।

২

উত্তরবঙ্গে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, দিনাজপুরে বন্যায় মৃতের সংখ্যা ১৬। ক্ষতিগ্রস্ত ৬ লক্ষ। কতজন নিখোঁজ তার এখনও হিসেব নেই। ত্রাণ শিবিরে ঠাঁই পেয়েছেন ৭০,০০০। কাগজ থেকে সোনালিকে বন্যা কভার করার জন্য পাঠানো হল। এত চ্যালেঞ্জিং অ্যাসাইনমেন্ট এর আগে আর কখনও সোনালি পায়নি।

মা শুনে বললেন

— সে কী রে টুটুল! তুই যাবি বন্যা কভার করতে? ওখানে আর্মি নেমেছে, এমনি মানুষ যেতে পারছে না। তুই একটা মেয়ে হয়ে যাবি কী করে? তোদের ছেলেরা যেতে পারে না?

মা-র কথা শুনে সোনালির রাগ হল,

— তুমি ছেলে মেয়ে এ-সব কোরো না তো। ওরা পারলে আমি পারব না কেন? রিলিফের নৌকায় উঠে বা ডি এম এ-র টিমে ঢুকে যাব। ছেলেরা বন্যার জলে নেমে সাঁতরে কভার করে নাকি? ও-সব তুমি ভেব না। অফিসের দেওয়া ট্র্যাভেলস্টাইলে দুটো জিনস, কয়েকটা শার্ট, খুচখাচ দরকারি জিনিস, ওষুধপত্র গুছিয়ে নিল। কলকাতা থেকেই হ্যালোজেন নিয়ে গেল। সঙ্গে হাতসম্বল কিছু ড্রাই ফ্রুটস আর বিস্কিট।

ট্রেনে যেতে যেতেই সোনালি ভেবেছিল অন্য রিপোর্টারদের থেকে আলাদা কিছু করতে হবে। যেমন হার্ড নিউজ পাঠানোর তা তো পাঠাবই। কতজন মারা গেল, কত নিরাশ্রয়, প্রশাসনের বক্তব্য, রিলিফের অব্যবস্থা (ভয়াবহ বন্যায় রিলিফ আর কবে সুষ্ঠু হয়েছে!) ইত্যাদি। মানুষের দুঃখকষ্টের বর্ণনা তো থাকবেই। তার মধ্যে নতুন কিছু। প্রথমদিন পৌঁছে তেমন কিছু সন্ধান পায়নি। ভাষা আর ডিটেল বর্ণনা দিয়ে সেদিনের স্টোরি পাঠাল। তাও খবর পাঠাতে পাঠাতে রাত প্রায় সাড়ে ন’টা হয়ে গেল। তারপর ক্যাম্পে ফিরে আসা। ডি এম-এরই ব্যবস্থা করা। সব রিপোর্টারের এক জায়গায় থাকার ব্যবস্থা। সোনালি ফিরে এসে রণজয়ের সঙ্গে ডেথ-টোল মিলিয়ে নিল।

রণজয় মাথায় একটা চাঁটি মেরে বলল,

— রণজয়দা বলবি। তারপর অন্য জবাব। কত বছর প্রফেশনে আছি জানিস?

এই এক বদ অভ্যেস সোনালির। নেহাত চুল পেকে বিশ-বাইশ বছর প্রফেশনে কেউ না থাকলে সোনালির আর তাকে দাদা বলতে ভাল লাগে না। বন্ধুর মতো পাশাপাশি কাজ করে, তাই দাদা বলাটা রপ্ত করতে পারে না। মুখে মজা করে বলল,

— চেহারাটা ফার্স্ট ইয়ারে পড়া ছেলেদের মতো করে রাখলে দাদা বলি কী করে বল।

একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সোনালি। ভেবেছিল একা মেয়ে এসেছে, আর সব ছেলে। কাজে অসুবিধে হবে। ছেলেরা হয় পাত্তা দেবে না, না হলে মেয়ে বলে বাধা দেবে। সে-সব কিছুই হয়নি। ছেলেগুলো বেশ ভাল ভেবে সোনালি সত্যিই একটা মানসিক আরাম পেল। সারাদিন জলে ভেজার পরও শরীরে ক্লান্তি যেন বসতে পেল না। পরদিন ভোর চারটেয় একটা রিলিফ টিম যাবে। পরেরটা ঘণ্টা দেড়-দুই বাদে। সোনালি ঠিক করল প্রথমটাতেই যাবে। অন্যরা বলল,

— সোনালি প্রথম এসেছে, বেশি উৎসাহ। আমরা দ্বিতীয়টায় যাব।

সোনালি কলকাতায় ফোন করেছিল। ওর কভারেজ ভাল হচ্ছে। শুভম জানাল,

— ভালই তো করছিস। তোর মানুষের গল্প স্টোরিটা খুব খেয়েছে। এত মৃত্যুর মধ্যে এক বন্যাক্লিষ্ট পরিবারকে বাঁচিয়েছে এক বন্যার্ত কিশোর।

সেদিনই সন্ধেবেলা কলকাতা থেকে খবর এল, অর্থমন্ত্রী আরও তিন মন্ত্রীকে নিয়ে বন্যা দেখতে আসছেন। মন্ত্রীরা এলেন, ঘুরলেন। জলপাইগুড়ি সার্কিট হাউসে অন্যদের সঙ্গে অরূপরতন রায় সাংবাদিক সম্মেলন করলেন। সোনালিকে দেখে বললেন,

— আপনার কভার করতে কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো?

ডি এম-কে বলে দিলেন, একটা মেয়ে এসেছে ওকে একটু দেখবেন। নিছক ভদ্রতা কিংবা শিভালরি। সোনালির মধ্যে একটা চাপা খুশি খেলে গেল।

সেদিন খবর-টবর পাঠিয়ে সোনালি সার্কিট হাউসে অরূপরতন রায়ের সঙ্গে একা দেখা করতে গেল। উনি তখন ডিনার খেতে বসেছেন। মন্ত্রী নীলেশ সেনও ছিলেন তাঁর সঙ্গে। নীলেশ সেন জলপাইগুড়ির বিধায়ক। সেই সূত্রে মন্ত্রীদের টিমে এসেছেন। অন্য দুই মন্ত্রী সেচবাংলোয় আছেন। অরূপরতন রায় সোনালিকে ডিনার না খাইয়ে ছাড়লেন না। সামান্যই ডাল, ভাত, তরকারি আয়োজন করা গেছে। তাই খেতে খেতে টুকটাক গল্প চলছিল। সোনালি খেয়াল করল ওঁরা দু’জন দু’জনকে তুই-তোকারি করেন। সোনালির দিকে ফিরে অরূপরতন বললেন,

— নীলু আমার ছোটবেলার বন্ধু। আমরা এক স্কুলে পড়তাম। ও পড়াশোনায় খুব ভাল ছিল।

নীলেশ সেন বললেন,

— অরূপ তুই আর আমাকে ওই সার্টিফিকেট দিস না। তুই তো ফার্স্ট হতিস।

— সব সময়ে তো তোকে বিট করতে পারতাম না।

এ-সব গল্পের মধ্যেই অরূপরতন জানালেন, প্রধানমন্ত্রী আসবেন উত্তরবঙ্গে, একটু আগে খবর এসেছে। সোনালি সার্কিট হাউস থেকেই ফোন করে খবরটা দিয়ে দিল। পরদিন ওদের কাগজে এক্সক্লুসিভ।

কলকাতায় ফিরে এসে সোনালি ভেবেছিল সম্পাদক বোধহয় ওর বেশ প্রশংসা করবেন। কিন্তু উনি কিছুই বললেন না। আসলে উনি কখনই কোনও রিপোর্টারকে ভাল বলেন না, পাছে তার মাথা ঘুরে যায়। কিন্তু রিপোর্টিংয়ে অনেকেই সোনালিকে বলল, দুর্দান্ত কভারেজ হয়েছে। ডেস্কের অভিষেকও বলল সবরকম অ্যাঙ্গল থেকে ধরা হয়েছে।

দু-দুটো খবর এক্সক্লুসিভ হয়েছে বলে সোনালি মনে মনে অরূপরতন রায়কে ধন্যবাদ জানাল। এ এমন কৃতজ্ঞতা যা কারও কাছে কোনওদিন প্রকাশ করা যাবে না। ভেবেছিল রাইটার্সে গিয়ে ধন্যবাদ জানাবে একান্তে।

কিন্তু সোনালি কলকাতায় ফিরে যেদিন রাইটার্সে গেল, সেদিন ওঁর সঙ্গে দেখা হল না। শরীর খারাপ হয়েছে বলে উনি অফিসে এসেই বাড়ি ফিরে গেছেন। বাড়ি ফিরে গেছেন? অরূপরতন রায় প্রচণ্ড পরিশ্রমী, দিনে বারো-চোদ্দো ঘণ্টা কাজ করেন। সব ফাইল খুঁটিয়ে পড়েন। অরূপরতন রায়ের কাঁচাপাকা চুল। দারুণ ফিটফাট। নিভাঁজ ধুতি, পাঞ্জাবি আর পা ঢাকা কালো চকচকে জুতোয় নির্ভেজাল বাঙালি। তাঁর জ্যাভেরিয়ান ব্যাক গ্রাউন্ডের সঙ্গে যেন খাপ খায় না। উনি আংটি পরেন না। বদলে দু আঙুলের ফাঁকে সিগারেট। অরূপরতনের এই একটা জিনিস সোনালি পছন্দ করে না। এমনিতে চশমা পরেন না। কিন্তু পড়াশুনো, ফাইল দেখার সময়ে একটা স্লি ক রিডিং গ্লাস ঝুলিয়ে নেন। লোকে বলে এরর-ফাইন্ডিং গ্লাস। কোন ফাইলে কী ত্রুটি আছে, ওঁর চোখ ঠিক সেখানে গিয়ে আটকে যাবে। আর যাঁরা ওঁকে পছন্দ করেন না, তাঁরা বলেন, আসলে উনি জ্যাভেরিয়ান তো, সেন্ট জেভিয়ার্সের ছাত্র। তারপর দিল্লি স্কুল অফ ইকনমিকস, সেখান থেকে লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিকস। তাই নাক উঁচু। আর কাউকে তাঁর লেভেলের বলে মনেই করতে পারেন না। এই সব মন্ত্রীর সঙ্গে সোনালি যখন কথাবার্তা বলে কৃতজ্ঞতায় ভরা সোনালির মনটা হু-হু করে ওঠে। কিন্তু বেচারা সোনালি অরূপরতনের পক্ষে ওঁদের কাছে একটা কথাও উচ্চারণ করে না। পাছে ওঁরা আবার ভেবে বসেন সোনালি অরূপরতন রায়ের লবির লোক।

রাতে অফিস থেকে ফোন করে সোনালি শুনল অরূপরতন রায়কে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালের সুপার ডাঃ দাসের সঙ্গে কথা বলে জানল, ওঁর নিউমোনিয়া হয়েছে। বেশ বাড়াবাড়ি। কিছুদিন ভালই ভোগাবে। কাল সব টেস্ট হবে। খবরটা লিখে দিল।

মনটা কেমন যেন খারাপ হয়ে গেল সোনালির। সপ্তাহ খানেক অরূপরতন রায়ের সঙ্গে ডাঃ দাস দেখাই করতে দিলেন না। সোনালি রোজ খবর নিত। আটদিনের মাথায় দেখা করতে পারল। কিন্তু তখন ধন্যবাদ আর দেওয়া হল না। বড্ড পেশাদারি হয়ে যায়। অরূপরতন রায় বললেন কতদিনে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবেন তার ঠিক নেই। ডাঃ দাসের কাছ থেকে সকালের দিকে ঘণ্টা দুয়েক অফিসারদের সঙ্গে মিটিং-টিটিং করা, ফাইল দেখার অনুমতি পাওয়া গিয়েছে। বই-টই অল্পস্বল্প পড়বেন। সোনালি দেখল অরূপরতন রায়ের পাশে খোলা রয়েছে কুইক ক্রসওয়ার্ডের পাতাটা। সোনালি বলল আমি দিল্লি থেকে কয়েকটা ক্রসওয়ার্ডের বই আনিয়েছি, একটা আপনাকে দেব। আমার কাছে রোয়াল্ড ডালের শর্ট স্টোরিজ আছে। পড়বেন?

অরূপরতন সোনালিকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কী করে জানলেন আমি রোয়াল্ড ডালের ভক্ত?

সোনালি কী বলবে ভেবে পেল না। সত্যিই তো ও জানে না। ও শুধু ভেবেছে সোনালির রোয়াল্ড ডাল যখন এত প্রিয় তখন ওনারও নিশ্চয়ই তা ভাল লাগবে। কিন্তু এ কথা তো সোনালি মুখ ফুটে বলতে পারে না। ওর থেকে প্রায় বিশ বছরের বড় একজন মন্ত্রী। যিনি হলেও হতে পারতেন সোনালির অধ্যাপক।

অরূপরতন রায় যখন পড়াতেন, তখন ওঁর ক্লাসে খুব ভিড় হত। পূর্বা ওঁর দারুণ ফ্যান ছিল। পূর্বা ভাল ছাত্রী ছিল বলে উনিও পূর্বাকে বেশ পছন্দ করতেন। পূর্বা সোনালির অন্তরঙ্গ বন্ধু। ও এখন সাউথ পয়েন্টে পড়াচ্ছে। অরূপরতন পূর্বাকে পছন্দ করতেন শুনে সোনালির বুকটা হঠাৎ চিনচিন করে উঠল। ওর কি একটু হিংসে হল।

বইটা নিয়ে সোনালি অরূপরতনকে দেখতে গেল। উনি ওঁর স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। সোনালির নাম শুনেই ওঁর স্ত্রী বললেন, তোমাকে তুমিই বলছি। তুমি আমার থেকে অনেক ছোট। তোমার কথা ওঁর মুখে শুনেছি। তুমি বন্যা কভার করতে গিয়েছিলে। আবার সেই গোপন কৌটো থেকে কৃতজ্ঞতা বেরিয়ে আসতে চাইল। সোনালি শুধু একটু হাসল। যাওয়ার সময়ে অরূপরতন রায় নিজে থেকে সোনালির দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। সোনালি স্মার্ট। তাই তো সবাই বলে। হাত ধরে সোনালি বলল, গেট ওয়েল, সুন। সোনালির মনটা আনন্দের পাপড়ি হয়ে গেল।

সোনালির নিজেরই অবাক লাগে। সাতাশ বছরে ওর বুকের মধ্যে এমন তোলপাড় কখনও করেনি। সামান্য একটা সৌজন্য বিনিময়। ওর বুকের রক্ত তাতেই যেন ছলাৎ ছলাৎ করে উঠেছিল। উনি শুধু সোনালির থেকে অনেকটা বড় তাই নন, উনি মন্ত্রী, ওঁর একটা পার্টি আছে। আর মন্ত্রী মানেই সারাক্ষণ লাইমলাইটে। যাকে বলে এক্সপোজড টু মিডিয়া। আর সোনালি কিনা সেই কাগজেরই এক রিপোর্টার।

৩

সোনালি নিজের কাজ নিয়ে আগের মতোই মেতে রইল। এরই মধ্যে একটা নামকরা ইংরেজি ম্যাগাজিনে অরূপরতন রায়ের একটা প্রবন্ধ বেরল। ওরা বিজ্ঞাপন দিয়েছিল ম্যাগাজিন প্রকাশের আগেই। যেদিন বেরল, সেদিনই সোনালি সেটা কিনে গোগ্রাসে গিলে ফেলল। ক্রিকেট নিয়ে এক দারুণ অন্যরকম লেখা। কেন কালো ক্রিকেটাররা ওঁর প্রিয়, কেন কালো ক্রিকেটাররা আজ ক্রিকেট দুনিয়া শাসন করছে। এর আগেও ওঁর লেখা পড়েছে সোনালি। যেমন বাংলা তেমন ইংরেজি লেখেন তিনি। তত্ত্বের কচকচি নয় বা শুধু কাঠখোট্টা অর্থনীতি নয়। এত বিষয় নিয়ে তিনি ভাবেন, এমন অ্যাঙ্গেলে ভাবেন যে, সোনালি বারে বারে শুধু মুগ্ধই হয়। রাজনীতি করার পরও উনি বিদেশে সেমিনারে পেপার পড়ার আমন্ত্রণ পান। এবারের লেখাটা পেয়ে সোনালি বারে বারে পড়ল। এই ম্যাগাজিনটা সোনালি কোনওদিন ফেলে দেবে না। — আপনার লেখা বেরবে জানলে অপেক্ষা করি। খুব ভাল লাগে। আপনি বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে কেমন সুন্দর করে চলে যান, আর বিষয়ের সঙ্গে পাল্টে ফেলেন আপনার ভাষাও।

সোনালি ভেবেছিল এই সব বলবে। কিন্তু এত সব কথা বলতেই পারল না। অরূপরতন রায়ের চেম্বারে ঢুকতেই সোনালির গলা যেন কে চেপে ধরে। যা যা বলবে ভেবেছিল তার সে-সব বলা হল না। সবই সত্যি। কিন্তু সব সত্যি কথা তো বলা হয়ে ওঠে না সোনালির। আজও সে-সব বলতে পারল না। বরং বলল,

— আপনার মতো আমি লিখতে পারলে অনেক উন্নতি হত।

বলেই সোনালি নিজের ওপর বিরক্ত হল। ধুৎ, ওর কী যে হয়। সেই ঘুরে ফিরে পেশা-সংক্রান্ত কথা। এবার বলল,

— আপনার লেখার ওই জায়গাটা খুব ভাল: আ গ্রেট লাই ইজ সাইলেন্সড ফর এভার।

অরূপরতন রায় বললেন, লাইনগুলো বার্নার্ড শ’য়ের ।

— জানি সেন্ট জোন। আপনার সব থেকে প্রিয় বুঝি বার্নার্ড শ’।

— টি এস এলিয়ট। অ্যান্ড ইউথ ইজ ক্রুয়েল অ্যান্ড হ্যাজ নো রিসোর্স/অ্যান্ড স্মাইলস অ্যাট সিচুয়েশন ইট ক্যান নট সি।

পারছে না। সোনালি নিজেকে বেঁধে রাখতে পারছে না। উনি টি এস এলিয়টের ঠিক ওই লাইনগুলোই কেন বললেন।

আরও কত লাইন আছে। এলিয়টের মার্ডার ইন দ্য ক্যাথিড্রাল বিখ্যাত। কেন বললেন ইউথ ইজ ক্রুয়েল। তবে কি উনিও…। সোনালি কখনও কি অজান্তে ওঁর মন ছুঁয়ে ফেলেছে। এক অদ্ভুত আনন্দ সোনালিকে ঘিরে ধরল। কী এক সুখের পরশ। সোনালি আর ভাবতে পারে না।

৪

একজন ডেপুটি সেক্রেটারির সঙ্গে দেখা করবে বলে সোনালি ভাষা আকাদেমির অফিসে গিয়েছিল। উনি শিক্ষা দপ্তরের ডেপুটি সেক্রেটারি, ভাষা আকাদেমির কাজটাও দেখেন। ভাষা আকাদেমির চেয়ারম্যান অরূপরতন রায় নিজেই। পার্টি সোর্সেই সোনালি শুনেছিল ভাষা আকাদেমি সম্পর্কে অরূপরতন রায় নিজেই আগ্রহ প্রকাশ করেন। বছর চারেক আগে ক্ষমতায় আসার পর পার্টি ঠিক করে বাংলা ভাষার ওপর আর একটু জোর দিতে হবে। তাই ভাষা আকাদেমি করা হল। প্রথমে ঠিক ছিল শিক্ষামন্ত্রী নীলেশ সেনই চেয়ারম্যান হবেন। তিনি বাংলার শিক্ষকও ছিলেন। কিন্তু ভেবেচিন্তে পার্টি অরূপরতন রায়কে চেয়ারম্যান করে। তিনি অর্থ দপ্তরের কাজের ফাঁকে এ কাজটাও দেখেন। ইংরেজি প্রতিশব্দ তৈরির কাজে তিনিও নাকি দু-একটা নতুন বাংলা শব্দ ঢুকিয়েছেন। শব্দ নিয়ে খেলা করাটা তাঁর নেশা।

ডেপুটি সেক্রেটারি অমিয় সরকারের ঘরে যেতে গেলে চেয়ারম্যানের চেম্বার পেরিয়ে যেতে হয়। সেদিন সোমবার। অরূপরতন রায় ভাষা আকাদেমির অফিসে আসেন শুধু বৃহস্পতিবার। কিন্তু চেয়ারম্যানের চেম্বার পেরিয়ে যাওয়ার সময়ে দেখল নীলেশ সেন অরূপরতনের ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। নীলেশ সেন সোনালিকে দেখতে পাননি। সোনালির মনে স্বাভাবিক প্রশ্নটাই উঠে এল— উনি এখানে কেন? অমিয় সরকারের ঘরে যাওয়ার আগে অরূপরতনের কাছে গেল উত্তরের খোঁজে। পাকা রাজনীতিকের মতো আসল কথায় না গিয়ে উনি আর নীলু কত বন্ধু ছিলেন, নীলুর মা’কে নিয়ে ওঁদের খুনসুটির কথা এই সব বললেন। দুই বন্ধু মিলে হঠাৎ সোমবার সকালে স্মৃতি হাতড়াতে বসেছিলেন! এটা সোনালির বিশ্বাস হল না। বরং আড়চোখে দেখে নিল শিক্ষা দপ্তরের একগোছা ফাইল অরূপরতনের টেবিলে।

অখুশি মন নিয়ে অমিয় সরকারের ঘরে গেল।

— কী ব্যাপার বলুন তো? নীলেশ সেনের সঙ্গে অরূপরতন রায় মিটিং করছিলেন। তারপর আবার রাইটার্স ছেড়ে এখানে?

অমিয় সরকারের সঙ্গে সোনালির যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা। উনি বললেন,

— ছেলেমেয়েদের স্কুলে সেশন শুরু হয়ে যাবে বলে নীলেশ সেন তাড়াহুড়ো করে সরকারি স্কুলের জন্য বই কেনান। সাধারণত যে-সব পদ্ধতি মানা হয় তা উনি মানেননি।

— দুর্নীতির গন্ধ পাচ্ছি যেন।

— না না। নীলেশ সেন সেরকম মানুষ নন। আমি তো ফাইল দেখেছি।

— তাহলে?

— অর্থমন্ত্রী বোধহয় দেখছেন-টেখছেন কীরকম বেনিয়ম হয়েছে। সবটা তো আমাদের কাছে আসে না, বলতে পারব না।

— তবে কিছুই হবে না। প্রবোধ দাসের বিরুদ্ধে তো পার্টি কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। — সে তো ঘোরতর অনিয়ম ছিল। তবুও তাঁর মন্ত্রিত্ব যায়নি। তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধেও তো কোনও তদন্ত হয়নি।

— আমরা সরকারি অফিসার। অতসব খবর রাখতে নেই।

সোনালি এখানে এসেছিল সরকারি উদ্যোগে বাংলা প্রতিশব্দ নিয়ে একটা নতুন ধরনের স্টোরি করবে বলে। কিন্তু নীলেশ সেনের ব্যাপারটা তার মনে এমন খোঁচা দিয়ে গেল যে ওই স্টোরিটার দিকে আর মন দিতে পারল না সোনালি। অথচ নীলেশ সেনের স্টোরিটাও জমল না। একটা ভাল কাজ তাড়াহুড়ো করে করা হয়েছে। এ আর এমন কী খবর।

কিন্তু খোঁচাটা সোনালির মন থেকে সরতে চায় না। ক’দিন ধরে এখানে-ওখানে-সেখানে খোঁজ নিল। শেষ পর্যন্ত অরূপরতন রায়ের ঘনিষ্ঠ এক ছোটখাটো পার্টির নেতার সঙ্গে যোগাযোগ হল। জয়ন্ত ঘোষ একটু অন্য ধরনের মানুষ। পার্টির একনিষ্ঠ কর্মী। কিন্তু পার্টিতে এখন অনেক রকম কাজ কারবার চলে সে-সব পছন্দ করেন না। পার্টিতে আগে যত গোপনীয়তা রক্ষা করা হত এখন আর তা হয় না। সামনে বলেন না, কিন্তু একান্তে জয়ন্ত ঘোষ সেটাকে ‘হিউম্যান ফেস অফ দি পার্টি’ বলেন।

সোনালি ওঁর বাড়ি গিয়ে হাজির। এটা ওটা বলার পর সরাসরি জিজ্ঞেস করল নীলেশ সেনকে নিয়ে পার্টিতে কি কোনও গোলমাল হয়েছে?

— কেন জিজ্ঞেস করছেন?

সোনালি সংক্ষেপে বলল যা দেখেছে, যা জেনেছে। তিনিও সংক্ষেপে বললেন,

— আমি সরকারে কী হচ্ছে তা বলতে পারব না। তবে জানি পার্টির সর্বোচ্চ মহল আর মুখ্যমন্ত্রী একজোট হয়ে নীলেশ সেনকে এবার নির্বাচন থেকে বাদ দিতে চান।

— তার সঙ্গে অরূপরতন রায়ের কী সম্পর্ক?

— সেটা সরকারি ব্যাপার। আমি সত্যিই জানি না, বিশ্বাস করুন।

৫

সাতসকালেই সোনালির বাড়িতে ফোন। অরূপরতন বললেন, সোনালি আপনি আজ একটু ভাষা আকাদেমির অফিসে আসবেন?

— আজ তো শনিবার। ভাষা আকাদেমির অফিসে ছুটি না?

— আমি যাব। আপনি আসুন বেলা তিনটেয়।

— কিন্তু আপনার গলাটা এরকম লাগছে কেন? শরীর খারাপ।

— ও কিছু নয়। আপনি আসুন বলেই ফোন কেটে দিলেন।

তিনটের একটু আগেই পৌঁছে গেল সোনালি। দোতলায় উঠে দেখে সব শুনশান। এই বাড়িটা সোনালির খুব ভাল লাগে। একদম সরকারি বাড়ির মতো দেখতে নয়। কাঠের চওড়া সিঁড়ি, কাঠের মেঝে। পুরনো দিনের বিরাট বাড়ি। সেটাকেই অফিসের চেহারা দেওয়া হয়েছে।

একজন কেয়ারটেকার বেরিয়ে এল। সোনালি জিজ্ঞেস করল, অর্থমন্ত্রী এসেছেন? আসেননি শুনে সোনালি নিচে নেমে এল। গাড়ি বারান্দায় একটুখানি দাঁড়াতেই একটা নীল মারুতি সামনে এসে দাঁড়াল। অরূপরতন রায় নামলেন। সোনালির চোখ কুঁচকে উঠল। সরকারি সাদা অ্যাম্বাসাডরের বদলে নীল মারুতি!

অরূপরতন রায়ের কাঁচাপাকা চুল অবিন্যস্ত। চাপা ব্যথার চোখে সোনালির দিকে তাকালেন। সোনালি বুঝেছে ওঁর মধ্যে ঝড় বইছে।

ভাষা আকাদেমির চেয়ারম্যানের ঘরে ঢুকে পড়লেন তিনি। পেছনে সোনালি। মিনিট খানেকের স্তব্ধতা। উনি কিছু বলতে চান। কিন্তু কীভাবে বলবেন তা নিয়ে নিশ্চয়ই দ্বিধায় আছেন।

সোনালিই প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল,

— আপনার সরকারি গাড়ি কী হল?

— ছেড়ে দিয়েছি।

— মানে?

— আমি পার্টির কাছে আমার রেজিগনেশন লেটার দিয়েছি।

সোনালির চোখ বিস্ফারিত। অরূপরতন সংক্ষেপে বললেন, তাঁর ওপর নীলেশ সেনকে নিয়ে কীভাবে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল। দুর্নীতির কথা তুলে পার্টির ওপর মহল নীলেশ সেনকে বাদ দিতে চায়।

— আর সে কাজটা আমাকে দিয়েই করাতে চায় পার্টি। কারণটা সোজা, আমি অর্থমন্ত্রী, সব ফাইল আমার কাছে আসে।

— আপনি কী দেখলেন?

— আমি নীলুকে জানি। ওর মনটা দামি মেহগনির মতো। তাতে আমি ধুলো লাগাবার কে? এর থেকে বেরনোর রাস্তা আমি পাইনি। পার্টির ওপর মহলের নেতারা আমার থেকে অনেক বেশি শক্তিমান। তা ছাড়া আমার সঙ্গে এ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কথা কাটাকাটি হয়েছে। উনিও আমার দিকে নেই।

অরূপরতনের গলা আবেগে থরথর করে কাঁপছে। সোনালি বুঝল এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।

— মন্ত্রিত্ব থেকে রেজিগনেশন দিয়েছেন শুধু, না পার্টি থেকেও?

— পার্টির কর্মী হিসেবে থাকব।

— তার পর?

— জানি না।

— আপনি জানেন এ খবর বেরলে আপনার কত বড় ক্ষতি হবে।

— জানি।

— আপনাকে পদত্যাগপত্র ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ওঁরা চাপ দেবেন। তার পর পার্টি থেকে বলবে, ওরকম কোনও ঘটনাই ঘটেনি, খবর মিথ্যে।

— আপনি ভাবছেন আপনার খবর ভুল প্রমাণিত হবে! আপনি পেশা ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারেন না? সোনালি আপনি আমাকে একটুও চেনেননি। আমি আপনাকে বিপদে ফেলব না।

— অ্যায়াম স্যরি। কিন্তু তা যদি নাও হয় আমি আবারও বলছি এ খবর বেরলে আপনার চরম ক্ষতি হবে। আপনাদের পার্টিকে আমি চিনি। খবর বেরিয়ে যাওয়ার থেকে বড় অপরাধ আপনাদের পার্টিতে আর নেই।

— আমি সব ভেবেছি। আমি প্রতিনিয়ত ঘা খাচ্ছি।

এক কাপ চাপ খেয়ে সোনালি উঠে পড়ল। ভাষা আকাদেমির অফিসে আসবে সে কথা অফিসের ড্রাইভারকেও জানাতে চায়নি বলে গাড়িটাকে নন্দনে দাঁড় করিয়ে একটা মিনিবাসে চলে এসেছিল। নন্দন থেকে গাড়িটা নেওয়ার সময়ে সোনালির আর মিনিবাসে উঠতে ইচ্ছে করল না। মিনিবাসে উঠলেই তো এক মিনিটে পৌঁছে যাবে। থিয়েটার রোড থেকে নন্দন কতটুকু আর পথ। মাথায় একরাশ ভাবনা। ও একটু ভাবতে চায়। একা। তাই হাঁটতে শুরু করল।

ওর সেই আগের কথা মনে পড়ল। ওর মনের গোপন কৌটোয়, যেখানে কৃতজ্ঞতা ভরা থাকে। সেই কৌটোর ঢাকনা খুলে কৃতজ্ঞতা বার বার বেরিয়ে পড়তে চায়। এই সামান্য এক বছরে ও কতগুলো এক্সক্লুসিভ করেছে। তার ক’টা অরূপরতন রায়ের কাছ থেকে পাওয়া তার হিসেব করছিল। ও যে একজন সিরিয়াস রিপোর্টার বলে ওর সহকর্মী বন্ধুরা কেউ মুখে, কেউ মনে মনে স্বীকার করে, তার কতভাগ অরূপরতনের দেওয়া! সোনালির মাথার মধ্যে বাজতে থাকে অরূপরতনের ওই কথাগুলো— আপনি পেশা ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারেন না! ওঁর গলায় তখন যেন এক নিরীহ, অভিমানী মানুষের স্বর। একটা চাপা মিষ্টি বকুনি যেন।

পরদিন রবিবার। সোনালির ছুটির দিন। ও জানত সকালেই ফোন আসবে। তাই নিজেই ধরেছিল।

— আমি বলছি।

এর আগে অরূপরতন রায় সোনালিকে দু’বার ফোন করেছিলেন। দু’বারই পুরো নাম বলেছিলেন। এবার — ‘আমি বলছি’ — কী সুন্দর স্টাইলটা। কত কী যেন বলা হয়ে যায়, মনে মনে ভাবল সোনালি।

— আমি এখন একটু বেরচ্ছি। আপনি ঘণ্টা দুয়েক বাদে ভাষা আকাদেমির অফিসেই আসুন।

এই প্রথম সোনালি অফিসের কাজে বেরনোর সময় জিনস আর শার্ট ছেড়ে শাড়ি পরল। ওয়ার্ডরোব খুলে ওর সব থেকে পছন্দের সাদা-কালো সিল্কের শাড়িটা বের করল। একটা ছোট মুক্তোর দুল আর সরু মুক্তোর হার। দুই ভ্রূর মাঝে যত্ন করে একটা টিপ বসাল।

— টুটুল কোথায় যাচ্ছিস, আজ তো রবিবার। মা বললেন।

— একটু ঘুরে আসছি। ঘণ্টা দুয়েক পর ফিরে আসব।

ভাষা আকাদেমির অফিসে ওর আসার আগেই অরূপরতন এসে গেছেন। কেয়ারটেকার দরজা খুলে রেখেছিল। সোনালি ঢুকতেই তিনি বললেন,

— আপনাকে চেনাই যাচ্ছে না।

— আমাকে আগেও কি চিনতেন?

— আজ আমাকে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই ডেকে পাঠিয়েছিলেন। ওনার বাড়ি গিয়েছিলাম। আধ ঘণ্টা ধরে উনি আমাকে অনেক কথা বললেন, বোঝালেন। সব মিটে গেছে।

— খবরটা আজ বেরিয়ে গেলে মিটত না, উনিও ডাকতেন না।

— সত্যিই খবরটা আপনি না লিখে ভাল করেছেন।

— অত আবেগ থাকলে রাজনীতি করা যায় না বুঝলেন? রাজনীতি করবেন আর মারপ্যাঁচ, কৌশল করবেন না, তা হয় না। সোনালি একটু জ্ঞান দিল।

— আপনি দেশবিদেশ ছেড়ে রাজনীতিতে এসেছেন। আমি তো জানি রাজনীতি ছাড়তে আপনার কত কষ্ট হত।

— আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ সোনালি।

এই প্রথম অরূপরতন সোনালিকে ‘তুমি’ বললেন। অস্ফুটে সোনালি ‘আমিও’ বলতে চাইল। পারল না। মনে মনে এর আগে সোনালি যে কতবার অরূপরতনের কাছ থেকে ‘তুমি’ শুনেছে! আজ সত্যিই শুনল। বড় খবর লেখার আনন্দের থেকেও আজ সোনালির এটাই বড় পাওনা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *