প্রলয় সেন : পরিবেশদূষণ ও তার প্রতিকার
ড্রইং রুমে হাত পা ছড়িয়ে সোফায় হেলান দিয়ে পড়ে আছি। বাড়িতে আমি একা। হরি গেছে রেশন তুলতে। রেখা ইস্কুলে। ঝিমলিকে নিয়ে আসতে।
অফিসের কাজে সিন্ধ্রি-ধানবাদ গিয়েছিলাম। দিন চারেকের মতো জোর ব্যস্ততার শেষে আজই কলকাতা ফিরছি। ভোরের এক্সপ্রেস ট্রেনে। সাড়ে চার ঘণ্টার জার্নি। তারপর হাওড়া পৌঁছে সোজা ডালহৌসির হেড অফিসে। রিপোর্ট ইত্যাদি জমা দিয়ে বাড়িতে পৌঁছতে বেলা আড়াইটে। অবেলায় স্নানাহার। শরীর আর বইছে না। ক্লান্তিতে দু’চোখের পাতা ভারী। তবু ঘুমুতে পারছি না। রাস্তার ঠিক উল্টোদিকে চায়ের দোকানের লাগোয়া লালবাড়ির খোলা রোয়াকে বখাটে ছেলে-ছোকরাদের জটলা। থেকে থেকে বিকট চিৎকারে কানের পর্দা ফেটে যাবার উপক্রম।
এ পাড়ায় এসেছি তা বছরখানেক হয়ে গেছে। রাস্তার গা ঘেঁষে দোতলায় আট স্কোয়্যার ফুটের ফ্ল্যাট। স্টেশনের পশ্চিমদিকে বলে, কিছুটা সস্তায় পেয়েছি। স্কোয়্যার ফুট সাড়ে পাঁচশো টাকা। বাসরাস্তা থেকে খানিকটা দূরে হলেও রেলস্টেশন বাজার দোকানপাট সব হাতের কাছে। রেখা দেখেশুনে সামনের দিকের এই ফ্ল্যাটটা পছন্দ করেছিল। দক্ষিণ-পুব খোলা। আলোবাতাসের অভাব নেই। সব মিলিয়ে আদর্শ ফ্ল্যাট। তবু ওর অঙ্কে ছোট একটা ভুল থেকে গিয়েছিল। তার জন্য অবশ্য রেখাকে পুরোপুরি দোষ দেওয়া যায় না। ও-ই বা চট করে বুঝবে কেমন করে। পুরনো পাড়া বলে এদিকে একটা গ্রাম্য ভাব রয়ে গেছে। অন্যের ব্যাপারে ভীষণ কৌতূহল এখানকার মানুষজনের। গায়ে পড়ে আলাপ জমানোর চেষ্টা। নির্লিপ্ত থাকার উপায় নেই। যেচে ভাব জমাবে। তার ওপর বেকার ছেলের সংখ্যা বেশি হওয়ায় নিশ্চিন্ত থাকা যায় না। সকাল দুপুর সন্ধে সময় অসময় নেই কলিং বেল টিপবে। বারো মাসে তেরো পার্বণের হিড়িক। হাতে চাঁদার বিল। নয়ত অমুক বাড়ির দুঃস্থ মেয়ের বিয়ে, ক্লাবের বার্ষিক আবৃত্তি সঙ্গীত প্রতিযোগিতা, পাড়ায় মিনি জলসা— এমনি হরেক কিসিমের ছুতো করে হানা দেবে। এ নিয়ে প্রতিবাদ-তর্ক বৃথা। এ পাড়ার দস্তুরই এটা। ওদের মনপসন্দ না হলে সরাসরি মুখ খারাপ করবে। কিংবা রাস্তায় নামলে ঠারে-ঠোরে হজম করতে হবে অশ্রাব্য গালিগালাজ। ট্যুরের চাকরি আমার। মাসের মধ্যে পনেরো দিনই বাইরে বাইরে ঘুরতে হয়। ঘরে রেখা আর ঝিমলি। তায় ঝিমলি পনেরোয় পা দিয়েছে। দেখতেও রীতিমতো ভাল, ডাগর ডোগর। ফলে যতটা সম্ভব সমঝে চলার চেষ্টা করি।
এ জাতীয় উপদ্রব সামাল দেওয়া গেলেও রাস্তার ওধারের রোয়াকে গজল্লা। তাকে থামাব কী করে। ছোকরাগুলো অহেতুক চেঁচিয়ে কথা বলে, মুখ খিস্তি করে, হিন্দি গানের কদর্য কলি আওড়ায়। পথচারীদের রেয়াত করে না। সুযোগ পেলেই নানা কুৎসিত মন্তব্য করে। রাস্তা দিয়ে রেখা-ঝিমলিকেও চলতে হয়। আমি সবসময় বাড়ি থাকি না। এ কথা নিশ্চয়ই অজানা নয় ওদের। সুতরাং ওদেরও কি ছেড়ে কথা কয়, মোটেই না। কিন্তু কিছু বলার উপায় নেই। কেউ প্রতিবাদ করে না। আর আমি তো এ পাড়ার নতুন বাসিন্দা। তাই না-দেখা না-শোনার ভান করে চলাফেরা করি।
ঝিমলিকে নিয়ে রেখার ফিরতে বেলা পাঁচটা গড়িয়ে যায়। ততক্ষণে ব্যালকনি থেকে রোদ ওপরের দিকে উঠে গেছে। ঝিমলির ইস্কুল ছুটি হয় চারটেয়। বাস রাস্তার ওধারের ইস্কুল থেকে আমাদের ফ্ল্যাট, হাঁটাপথে বড় জোর মিনিট দশেকের মতো সময় লাগে। দরজা খুলে শুধোই, ‘এত দেরি হল যে!’
রেখার হাতে একটা বিগ-শপার। সেটা ভর্তি স্টেশনারি জিনিসপত্র। আমূল হোলমিল্কের কৌটো সাবান পেস্ট মাখনের প্যাকেট পাউডার ক্রিম থেকে ফিনাইল— কী নেই।
‘দেরি হবে না তো কী।’— বিগ-শপারটা মেঝেয় নামিয়ে রেখে শাড়ির আঁচল দিয়ে গলা ঘাড় কপাল মুছতে মুছতে খরখরে গলায় বলে রেখা, ‘এসব মাস-কাবারি মাল কে আনবে শুনি।’
আমি ওকে শান্ত করার জন্য হালকা গলায় বলি, ‘কেন হরিকে দিয়ে আনালেই তো পার।’ হরি ভোর ভোর ট্রেন ধরে চম্পাহাটি না পিয়ালি কোত্থেকে যেন আসে। থাকে সন্ধে সাতটা অবধি। এমনিতে খুবই বিশ্বস্ত। বেদম খাটতেও পারে। কিন্তু বুদ্ধিতে খাটো।
আমার কথা শেষ হতে না হতেই ফের রাস্তার ওধারের চায়ের দোকানের লাগোয়া রোয়াক থেকে একটা উৎকট সমবেত উল্লাস ফণা তোলে। রেখার মুখে বিরক্তির ছায়া নামে। সঙ্গে সঙ্গে ও ব্যালকনির দিকে ছুটে গিয়ে কাচের পেল্লায় শার্শিজোড়া সশব্দে বন্ধ করে দেয়। তারপর ফিরে এসে বলে, ‘এসব কাজ কি চাকরবাকর দিয়ে করানো যায়। তায় হরির যা বুদ্ধিভাষ্যি। তুমি বুঝবে কোত্থেকে। দিব্যি গায়ে ফুঁ দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ—’
রেখার অনুযোগটা মিথ্যে নয়। আমার কাজ শুধু মাসের শুরুতে মাইনের টাকাটা ওর হাতে তুলে দেওয়া। ঘরে বাইরের যাবতীয় হ্যাপা বলতে গেলে ওকে সামলাতে হয়। তবু আজ ওর কণ্ঠস্বর কেমন যেন বেসুরো ঠেকল। একটা চাপা ক্রোধে ওর দু’চোখের সাদা জমি আরক্তিম। এতটা রেগে যেতে ওকে কদাচিৎ দেখেছি।
আমি রা কাড়ি না। কথার পিঠে কথা চাপালে অনর্থ বাড়বে বই কমবে না। বিশেষ করে এ ব্যাপারে যখন আমি কম জোরি। আমি ঝিমলির দিকে অর্থপূর্ণ তাকাই। এরকম পরিস্থিতিতে ঝিমলি চোরা হেসে রেখার রাগের ওজন কতখানি তা বুঝিয়ে দেয় আমাকে।
ঝিমলির কঠিন মুখে হাসি ফোটে না। বুঝতে অসুবিধে হয় না, কেস গড়বড়ে।
রেখা হনহন করে ড্রইং রুম থেকে কিচেনের দিকে চলে যায়। আমি একটা সিগারেট ধরাই। ঝিমলি পড়ার টেবিলের দিকে এগোয়। ব্যাগ খুলে বইখাতা যথাস্থানে রাখে। ওর পরনে সাদা ধপধপে স্কুল ইউনিফর্ম। কোমরে চওড়া সবুজ রঙের কাপড়ের বেল্ট। পায়ে কালো জুতো ফুল মোজা। মাথায় মস্ত এক ফিতের ফুল। ঝিমলি ক্লাস টেনে পড়ে। ওর মায়াকাড়া মুখের দিকে চোখ পড়তে মুহূর্তে আমার সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। আমি আদুরে গলায় ডাকি, ‘ঝিম, এদিকে আয় মা—’
ঝিমলি আমার একমাত্র সন্তান। আমার মেয়ে। আমার বন্ধু। আমার মাও বটে। বাড়িতে যতক্ষণ থাকি বেশিরভাগ সময় ওর সঙ্গে নানান খুনসুটিতে কেটে যায় আমার।
ঝিমলি এগিয়ে আসে। আমার গা-ঘেঁষে চুপ করে সোফায় বসে পড়ে। আমি অভ্যাসমতো ওর দিকে মাথাটা এলিয়ে দিই। ও আমার চুলের ভেতর আঙুল চালায়। ওর শরীরের বয়ঃসন্ধির সদ্য ফুটে ওঠা চাপা গন্ধটা আমাকে আবিষ্ট করে।
‘পড়াশুনো কেমন হচ্ছে?’ শুধোই।
ঝিম ঝুম ঝুমঝুমি ঝিমলি— আমি ওকে নানা নামে ডাকি।
‘মোটামুটি। — সংক্ষিপ্ত উত্তর ঝিমলির।
‘মাস্টারমশাইরা ঠিকমতো আসছেন তো?’
‘হ্যাঁ’। — দায়সারা জবাব ঝিমলির।
বুঝতে পারি, ইস্কুলে টানা ছ’ঘণ্টা ক্লাস করার পর এসব কথা ভাল লাগছে না ওর। সঙ্গে সঙ্গে প্রসঙ্গটা ঘুরিয়ে দিতে চাই। শুধোই, ‘তারপর বল, তোর স্কুলের বন্ধুদের খবর কী? মণিদীপা, সুদেষ্ণা, পারমিতা— সবাই কেমন আছে?’
অন্যদিন হলে বন্ধুদের কথা তুললেই ও প্রগলভ হয়ে ওঠে। কে কেমন আছে সাতকাহন সবিস্তারে বলতে শুরু করে। কিন্তু আজ ও উষ্ণ হয়ে ওঠে না। তাপহীন গলায় বলে, ‘কেমন আবার, ভালই আছে।’
ইচ্ছে করলে দু-চারটে উল্টোপাল্টা বেয়াড়া প্রশ্ন করে আমি ওকে তাতিয়ে তুলতে পারি। ও রেগে গেলে মজা পাই আমি। ভীষণ অন্যরকম, সপ্রাণ লাগে ওকে। কিন্তু আজকে আর সে পথে গেলাম না। একেই রেখা উগ্রচণ্ডা হয়ে আছে। তার ওপর ওকে খেপিয়ে তুললে সুন্দর বিকেলটাই মাটি হয়ে যাবে। তাই ওকে বাগে আনবার জন্য বলি, ‘এবার জন্মদিনে তুই কী নিবি বল। টাইটান ঘড়ি না ট্রেজার আইল্যান্ডের দামি ফ্রক।’
ঝিমলি উত্তর করে না। নিঃশব্দে চুলে আঙুল চালাতে থাকে।
‘এর মধ্যে একদিন নিউমার্কেট গিয়েছিলাম। দুর্দান্ত সব জাপানি ডল দেখে এসেছি। তার একটা নিবি?’
‘না’,— নড়ে উঠে বলে ঝিমলি, ‘এখন আর আমার ডল ফল ভাল্লাগে না।’
‘তাহলে ভাবছি, এবার তোকে একটা ভাল কলম দেব। সেফার্স কিংবা মন্টব্ল্যাঙ্ক, যেটা চাস তুই—’
‘পেন! পেন দিয়ে আমি কী করব। এখন আর কালিতে লিখি না আমি। তাছাড়া এই তো সেদিন কুট্টিমামা একটা জাপানি পাইলট দিয়ে গেল।’
বরফ গলছে দেখে উৎসাহ বোধ করি। বলি, ‘ঠিক আছে। এবার তোকে না হয় হাওয়াইয়ান গিটার কিনে দেব। যা টাকা লাগে লাগুক। কুছ পরোয়া নেই।’
ঝিমলির বন্ধু শিঞ্জিনী গিটার বাজায়। একবার টিভিতে বাজাবার চান্সও পেয়েছে। তাই দেখে ঝিমলিরও গিটার শেখার শখ। বাদ সেধেছে রেখা। বলেছে: গিটার ফিটার চলবে না। সামনের বছরের শুরুতেই স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা। একে পড়াশুনোয় মন নেই তাতে আবার ধুনোর ধোঁয়া—।
ঝিমলি কিছু বলার আগেই কিচেন থেকে রেখার তীক্ষ্ণ গলায় আওয়াজ ভেসে আসে ‘কইরে ঝিমলি, আসবি না! কতক্ষণ খাবার নিয়ে বসে থাকব।’
কথোপকথন ভেস্তে যায়। ঝিমলি উঠে বাথরুমের দিকে চলে যায়। ফের একটা সিগারেট ধরাই। বুকটা শুকিয়ে খসখসে হয়ে আছে। ব্যালকনির জোড়াশার্শিতে তখন ছোকরাদের চিৎকার আঁচড় কেটে চলেছে।
একসময়ে কফির কাপ হাতে রেখা ড্রইংরুমে ঢোকে। সামনের ছোট টেবিলে কাপটা রাখতে রাখতে বলে, ‘যতসব ছোটলোক ইতরের বাস এখানে—’
আমি কাপটা তুলে নিই, ‘কেন, আজ আবার কী হয়েছে?’
রেখা ফুঁসে ওঠে, ‘হবে আবার কী। এখানে কোনও ভদ্রলোক থাকে! কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলি, ‘হেঁয়ালি রাখো। কী হয়েছে বলবে তো।’ আমার ধৈর্যে চিড় ধরে।
‘ওই যে লালবাড়ির রোয়াকে ছেলেগুলো বসে থাকে সব জানোয়ারের বাচ্চা—’
‘ওরা তোমার আবার কী করল।’ সশব্দে খানিকটা কফি গলায় চালান করে দিয়ে বলি।
‘আমার কী করবে। আমি কি কচি খুকি।’ — রেখা ঝাঁঝিয়ে ওঠে।
‘তা হলে—’ কফির কাপ শূন্য করি।
‘ঝিমলিকে একলা পেলেই বিশ্রী ইঙ্গিত করে, শিস দেয়।’ — বলে রেখা। এতক্ষণে বিষয়টা মগজে ঢোকে, কেন আজ এতটা তিরিক্ষে হয়ে আছে রেখা। আমি হেসে বলি, ‘দূর, তোমার যত আজে বাজে কথা। ঝিমলি বাচ্চা মেয়ে। ওকে বলতে যাবে কেন?’
রেখা এবার নিজ মূর্তি ধারণ করে। গলা সপ্তমে চড়ায়, ‘যে জেগে ঘুমোয়, তাকে আর কি বলব। তুমি ভাব তোমার মেয়ে এখনও কচি খুকিটি আছে, তাই না?’
ভেতরে ভেতরে নিভে যাই। রেখার অনুমান বা দুশ্চিন্তা যে একেবারে অমূলক নয় এ কথা অস্বীকার করি কী করে। মুখটা বিস্বাদ লাগছে। রেখাকে নিরস্ত করার জন্য কপট ধমকের সুরে বলি, ‘যাও, বাজে বোকো না। ক’দিন বাদে এলাম। কোথায় একটু শান্তিতে—’
‘আমি বাজে বকছি? ঠিক আছে, ঝিমলিকে ডাকছি। ও-ই বলুক।’ —রেখা আরও তেরিয়া হয়ে ওঠে।
বিব্রত বোধ করি। গলার স্বর নামাই। যাতে ঝিমলি শুনতে না পায়, ‘ওকে ডাকছ কেন। কী হয়েছে তুমিই বলো না।’
‘কী আবার হবে। ছোঁড়াদের এতবড় আস্পর্ধা। আমি সঙ্গে আছি। আমার সামনেই কি না ঝিমলিকে—’
‘থাক থাক, আর বলতে হবে না। বুঝেছি—’ বলেই উঠে দাঁড়াই। ওয়ার্ডরোব খুলে একটা শার্ট বের করে গায়ে গলাই।
‘একী তুমি কোথায় চললে?’ —চেরা গলায় রেখা প্রশ্ন করে।
ভারি গলায় উত্তর করি, ‘যাই একবার। আজ একটা হেস্তনেস্ত করে তবে ছাড়ব।’
‘ কী বলবে তুমি?’— পথরোধ করে দাঁড়ায় রেখা।
‘দেখি কী বলি।’—শার্টের বোতাম আটকাই।
‘বাহাদুরি দেখাতে হবে না। ওরা ডেঞ্জারাস।’—রেখার গলায় ভয় চলকে ওঠে।
‘পথ ছাড়ো’। ভয় যে আমিও পাচ্ছি না তা নয়। তবু বলি।
‘না, তুমি যাবে না তার চেয়ে বরং অন্য কোথাও বাড়ি দ্যাখো। এ ফ্ল্যাট বিক্রি করে চলে যাব আমরা।’
‘কোথায় যাবে।’ — আমি স্মিত হেসে উঠি, ‘সব জায়গাতেই তো লোফার ছেলের দল আছে?’ — রেখাকে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে আমি ওকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে পড়ি।
নিচে নেমে সামনের দিকে তাকাতে দেখি রাস্তার ওধারের লালবাড়ির রোয়াকে ছেলে ছোকরাদের জটলা। ধরাচূড়া আজকাল যেমন হয়ে থাকে। ব্যাগী প্যান্ট। স্ট্রাইপ গেঞ্জি বা চক্করবক্কর ছিটের শার্ট। একমাথা চুল। লম্বা জুলপি। হিংস্র চোখ মুখ। বয়স আঠারো থেকে বাইশের মধ্যে। সবক’টি মুখই আমার পরিচিত। আসা যাওয়ার পথে অষ্টপ্রহর দেখি ওদের। হল্লাগুল্লায় ব্যস্ত।
চড়া মেজাজ নিয়ে রাস্তা পার হই। কিন্তু ওদের কাছাকাছি পৌঁছে হঠাৎই চুপসে যাই। আমাকে এগিয়ে আসতে দেখে কিছু একটা আঁচ করে ওরা। সেই মতো নড়ে চড়ে টানটান দাঁড়িয়ে পড়ে।
এক ছোকরা সিগারেট ফুঁকছিল। আমাকে দেখে সজোরে একটা টান মেরে সিগারেটটা পাশের ছেলেটার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে ‘নে শালা ন্যাপলা, ধর—।’
তাই দেখে আমি ওদের একটু তফাতে থাকতে দাঁড়িয়ে পড়ি। তারপর হাত নেড়ে ইশারায় ছোকরাকে ডাকি। এই ছেলেটার সঙ্গে পথ-চলতি কয়েকবার বাক্যালাপ হয়েছিল। ফ্ল্যাটেও মাঝে মাঝে হানা দেয় চাঁদা নিতে। গলায় জড়ানো নীল সিল্কের রুমালটা পাকাতে পাকাতে ছোকরা এগিয়ে আসে আমার দিকে। বলে ‘কিছু বলবেন?’
‘হ্যাঁ একবার তুমি যদি আমার ফ্ল্যাটে আসো—’।
গলার স্বর যথাসম্ভব স্বাভাবিক করে নিতে চেষ্টা করি।
ছোকরা কিছু বলার আগেই ওর পেছন থেকে আরেকজন বিকৃত গলায় চেঁচিয়ে ওঠে, ‘মাইরি, শালার কপাল ফেটেছে। লটকে পড় শিবু।’
‘এখনই?’ ভ্রূক্ষেপগীন শিবু জিজ্ঞেস করে আমাকে।
‘হ্যাঁ, যদি একবার। বেশি সময় নেবো না।’ — ঘৃণায় আমার সারা শরীর রি রি করে ওঠে।
‘এখানেই বলুন না। এরা সবাই আমার বুজম ফ্রেন্ড।’— হাতের চেটো দিয়ে চুলের কেয়ারি ঠিক করে নিয়ে শিবু বলে।
‘হ্যাঁ হ্যাঁ বলেই ফেলুন।’— পেছনের সমবেত কণ্ঠস্বর শিবুর প্রস্তাবে সায় জানায়।
আমি নিরুপায়। খানিকটা হতভম্বও। এই সব ইতর ছেলেদের সঙ্গে কথা বলতে প্রবৃত্তি হচ্ছিল না আমার। তবু বলতে হয়, ‘দ্যাখো, তোমরা সবাই জানো। আর তোমাদের ভরসাতেই তো এপাড়ায় এসেছি।’ আমার কথাগুলো ক্রমাগত জড়িয়ে যায়। আমি তোৎলাতে থাকি।
ন্যাপলা নিঃশেষে সিগারেটটা রাস্তায় ছুঁড়ে দিয়ে বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বলে, ‘বটে বটে—’
আমি ওকে আমল দিই না। শিবুর চোখে চোখ রেখে বলি, ‘আমার ট্যুরের চাকরি। প্রায়ই বাইরে যেতে হয়। বাড়িতে আমার ওয়াইফ আর মেয়ে একলা—’
‘ওয়াইফ আর মেয়ে! তাহলে একলা হল কি করে?’ — একজন ফুট কাটে।
ন্যাপলা এবার আমার দিকে এগিয়ে আসে। ফ্যাসফেসে গলায় বলে, ‘ওয়াইফ বুঝি বাড়িতে গিয়ে আপনার কানে কিছু লাগিয়েছে!’
আমি অবাক হবার ভান করি। ‘আমার ওয়াইফ! না তো—’
শিবুর পেছন থেকে আরেক ছোকরা বুক চিতিয়ে এগিয়ে আসে, ‘আপনার ওয়াইফকে একটু সমঝে চলতে বলবেন মশাই। এই তো কিছুক্ষণ আগে আমাদের খামোকা যা-তা বলে চলে গেল।’
বোঝা গেল রেখার সঙ্গে ওদের কথা কাটাকাটি হয়েছে। আমি প্রশ্ন করি, ‘কি বলেছে?’
ন্যাপলা বিশ্রীভাবে হাত নেড়ে উত্তর করে, ‘সে অনেক কিছু। আমাদের কী কোনও প্রেস্টিজ নেই!’
ফের একটা বিকট সমর্থনধ্বনি জেগে ওঠে।
শিবু ঘুরে দাঁড়িয়ে মাস্তানের ভঙ্গিতে দু’হাত তুলে বলে, ‘আহ, হচ্ছে কি? চুপ করবি তোরা!’— তারপর আমার দিকে ফিরে বলে, ‘তুচ্ছ কারণে আপনার ওয়াইফ মাথা গরম করেছিলেন। এরা তো সব ছেলেছোকরা তাই তেতে গেছে। যাই হোক আপনি চলে যান। আমি ওদের ম্যানেজ করছি।’
ম্যানেজ! এইসব বখাটে অসভ্য ছেলেদের! কেন? কি দোষ আমার কিংবা রেখার? ভদ্রভাবে কলকাতায় কি আর বাস করা যাবে না? আমি অপমানে, ক্ষোভে কাঁপতে শুরু করি।
ফিরে আসার সময় মুখ তুলে তাকাতে দেখি, রেখা আর ঝিমলি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে।
রাতে সাড়ে ন’টা অবধি ড্রইংরুমে গুম মেরে বসেছিলাম। মাঝে, ওধারে শোবার ঘরে রেখার চাপা গর্জন শুনতে পেয়েছিলাম। রেখা নাগাড়ে বলেই যাচ্ছিল: এতেও শিক্ষা হল না তোর মুখপুড়ি! তোর বাবাকে ইতরগুলো কীভাবে অপমান করল স্বচক্ষে তো দেখলি।
‘আঃ মা, ছাড়ো বলছি, লাগছে।’ — ঝিমলির কাতরোক্তি শোনা গেল।
‘এর চেয়ে তোর মরে যাওয়া ভাল’— রেখা বলেই যাচ্ছিল।
‘আমি কি দোষ করেছি মা। আমাকে তুমি এসব বলছ কেন?’ ঝিমলির কণ্ঠস্বর ঝাপসা লাগছিল।
খাবার পাট চুকতে শোবার ঘরে ঢুকি। ঘরে নীল ডুম আলোটা জ্বলছে। লম্বালম্বি দুটো খাট। শিয়রের দিকে রাখা স্টিলের আলমারিটা খাটদুটোর মাঝখানে ব্যবধান সৃষ্টি করেছে। বড় খাটে রেখা ঝিমলি শোয়। ছোটটায় আমি। আমি খুব সন্তর্পণে এগিয়ে গিয়ে টিউব আলোটা জ্বালি। হালকা নীল আলো অসহ্য লাগছিল। ঝিমলি বড় খাটে উপুড় হয়ে পড়েছিল। টিউব আলো জ্বালতে জ্বালতে নড়ে চড়ে ওঠে। বুঝি, মুখ গুঁজে পড়ে থাকলেও ঝিমলি ঘুমোয়নি।
রেখা ডাইনিং রুমে। পাশের ফ্ল্যাটের টিভিতে বাংলা খবর সবে শেষ হয়েছে। রেখা এঁটো বাসন ডাঁই করে রাখতে ব্যস্ত। এরপর যাবে পাশের ঘরে। ওটা ফাঁকাই থাকে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধে। মুখে হালকা করে নাইট ক্রিম ডলবে। তারপর কিচেন, ডাইনিং রুম, ড্রইংরুমের সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না দেখে এ ঘরে আসতে আরও কম করে আধঘণ্টার মতো সময় লাগবে। অন্যদিন এই সময়টুকু ঝিমলি আমার খাটে এসে আমার গা ঘেঁষে আধশোয়া হয়ে রাজ্যের কথা বলে।
একটা সিগারেট ধরাই। তারপর নিজের খাটে এসে বসি। উত্তেজনা অবসাদে শরীর-মন বিধ্বস্ত। তবু অপেক্ষা করি। যদি ঝিমলি ও খাট থেকে উঠে আমার কাছে চলে আসে।
কিন্তু তেমন কোনও গতিক না দেখে আদরকাড়া গলায় নরম করে ডাকি ‘ঝিমলি’—
সাড়া মেলে না। ঝিমলি তেমনই বিছানায় মুখগুঁজে পড়ে থাকে।
ফের ডাকি, ‘ঝিম মা আমার—’
ঝিমলি ফের নড়েচড়ে ওঠে, ‘কি বলছ।’
‘এদিকে আয় একবার’— গলার স্বর কেঁপে যায়।
ঝিমলি দুহাতে ভর রেখে উঠে বসে। তারপর হঠাৎ চেরা-চেরা গলায় বলে ওঠে, ‘ওরা আমাকে নিয়ে মজা করল, ধমকাল, অপমান করল— আর তুমি ওদের কিছু না বলে চুপচাপ চলে এলে বাপি।’
‘কি বলব বল। ওদের তো জানিস। বলে লাভ হত কিছু!’ বোঝাতে চেষ্টা করি ঝিমলিকে।
এবার ঝিমলি টানটান হয়ে বসে। ক্রুদ্ধ আক্রোশে ওর শরীর ফুলে ওঠে। বলে, ‘ওরা যা-ই হোক, তাই বলে যা মুখে আসবে তা-ই মাথা নিচু করে সহ্য করতে হবে! অন্যায় ওরা করবে, আর ভয়ে পালিয়ে আসব আমরা—’
ক্রমশ ঝিমলির সুন্দর চোখের দৃষ্টি আগুনের মতো ঝলসে উঠতে থাকে। উত্তরে আমার কিছু বলা উচিত। কিন্তু বলার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।
না, সময় আমার বড় আদরের মেয়ে আমার ঝুম ঝুমঝুমি ঝিমলির শরীরটাকে হঠাৎ টালমাটাল করে তুলেছে বলে নয়, ওর ভরন্ত বুক, মুখে ব্রণর বুটি, ধারালো চিবুক, পিঠ ছাপিয়ে নামা চুলের ঢল, সুগোল শুভ্র দুখানি পা, গম্ভীর কণ্ঠস্বরের জন্যেও নয়; ও যে কীভাবে এবং কখন চারদিকের দূষিত আবহাওয়ায় ইতর লোভীদের সঙ্গে যুঝবার মতো শক্তি অর্জন করে ফেলেছে আমি জানি না। হঠাৎ সেই সত্য আবিষ্কার করায় আমি অবাক বিস্ময়ে শুধুই ওকে দেখতে থাকি। □
