রাধাপ্রসাদ ঘোষাল : উৎসব

রাধাপ্রসাদ ঘোষাল : উৎসব

ট্যাংরার চোখে আগুন। সেই আংরাটি ঠিকরে যায় রতনের দিকে, রত্না— শত্রুকে ভালমতো জানতে পারলে তবেই তাকে হাপিস করে দিতে সুবিধে হয়।

রতনের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। সন্দেহে ভরা। মদে জিভ না ভেজালে তার জিভের জড়তা কাটে না। তাই সে নিজেকে সংবরণ করে ঠোঁটের টেপায় শুধু একটা বিড়ি গুঁজে দিল,— তারপর হিন্দুমতে অগ্নিসংযোগের মতো একটি হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস।

কথা বলা হয়ে গেলে স্বল্প নীরবতা পালন করে ট্যাংরা। এটা তার ধাত— চরিত্র। কখনও বুঝে কখনও বা না বুঝেও নীরব হয়ে যায়। যেন পিছনপানে হাঁটতে শুরু করবে এইবার।

ছোট মফসসল শহর। সন্ধ্যায় আদিম রহস্য এসে একটি জিজ্ঞাসা চিহ্নের মতো লাগে তার গায়ে-মাথায়। অল্প ভোল্টেজের নিষ্প্রভ বাল্ব ঝুলছে লাইটপোস্টের নাকে— বেশ কাঁপা কাঁপা আলো হাওয়ায় সেই নাকছাবি হরেক ইঙ্গিত হানে। এই আলো-আঁধারি কেটে শাঁ শাঁ পৌঁছে গেল অখিলের সাইকেল।

শ্লা এসে গেল,— কেতরেবেতরে হাসে ট্যাংরা। সুপ সুপ করে চা খায়।

অল্প কয়েকটি রিকশা দাঁড়িয়ে। চা দোকানের সামনে জটলা। দু-একটি মাতাল। ফড়ে। দালাল। বচসা চলতে থাকে খুচরো কথায়। যে যার সে তার, কারও মাথাব্যথা নেই।

অখিল হাঁফ ছাড়ে, ম্যাটিনি শোতে একটা ট্রিপ মেরে এলাম। শ্লা সিটে ছারপোকা। — মাঝখানে লোডশেডিং। স্ক্রিনে ঢিল পড়ল দু’বার। — বৌদি, চা লাগাও।

আটপৌরে অভাবী বাঙালি বৌদি এখানে চায়ের দোকান পেতেছে। খরিদ্দের বলতে গুণের দেওরেরা। আশ্বিনের বাতাসে মেয়েটির কানের পাশে চুলগুলি ফিসফিস করে। আদা ছেঁচে সে— তোফা চা বানাতে থাকে। আর হাসে।

বৌদির নাম সরস্বতী। গতর ভাল। আরে আমার দুষ্টু সরস্বতী! মুখের দাম লাখ টাকা।

ট্যাংরা বলল, সেনিমাতে গেলি মেয়ে পেলি কোথা?

এতক্ষণে রতন গলাটি একটু ঘড়ঘড় করে, শ্লা ভুলে গেলি নাকি। অখিলের তো বউ আছে।

বউ? অ— এই বলে ট্যাংরা একটি লম্বা পূর্ণচ্ছেদ টানল। তারপর তাকিয়ে রইল কলেজ মাঠের দিকে।

মাঠের দিকে এখন কিছুটা আবছায়া। এইখানে লেক্সপো, এক্সপো হয়। জ্যোতি বসুর জনসভা হয়। নেতাজি জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে অ্যাথলেটিক্স ক্লাবের পরিচালনায় দশ মাইল দৌড় প্রতিযোগিতা হয়। ভরা গ্রীষ্মে ছোটে রোদের তেজ, বর্ষায় হু হু বেড়ে যায় ঘাসের মাথা। কাদা ছিটিয়ে ছেলেছোকরারা ফুটবল খেলে আর রাতের গভীরে এক বুক অস্পষ্টতা ধরে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মাঠ। ট্যাংরার চোখ এখন সেইদিকেই। কিন্তু মনের হয়ত কোনও দিক ঠিকানা নেই। কি ভাবছে সে কে জানে।

হঠাৎ যেন একবুক রক্ত থেকে ভুস করে ভেসে উঠে চোখের সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে মোটর সাইকেলটা। রয়েল এনফিল্ড— ইংলন্ড। ব্যবহার করা সাবানের পিচ্ছিলতা নিয়ে পাকা চেরিফলের রঙ ধরেছে বাইক। ছোট তারক নামে। ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। বুকে লোম। গলায় চেন, সোনা বা ইমিটেশন বোঝার উপায় নেই। লাঙলের ফলার মতো তীক্ষ্ণ উদ্ধত নাক। চায়ের থেকে এই দোকানটির প্রতি তার আসক্তি বেশি। সে ডাক দিল, বৌদি—

সরস্বতী চিনেমাটির প্লেটটি এগিয়ে দিল। মুরগির ঠ্যাং আর ধোঁয়া। তারপর একটু কংগ্রেস আর সি পি এমের আলোচনা। ছোট তারক ইশারায় কাছে ডাকল ট্যাংরাদের। তারপর পাঁইটের ছিপি খুলল। এখনও রাত ৯টা বাজেনি। কিন্তু কে কাকে পরোয়া করে পৃথিবীতে। পুলিস মানেই তো ফুলিশ। বান্ডিল ধরে দাও— চুপ।

তারক চোখ কপালে তুলে বলল, মালটার খবর কি? পাত্তা লাগা—

হঠাৎ বচসার স্রোত যেন কয়েক গজ পিছিয়ে গিয়ে পিছন পানে লাইট ফ্যালে।

নতুন নয়, ছিন্নভিন্ন ইতিহাসগুলি জোড়াতালি লাগিয়ে অন্তত দু-একশো বছরের ইতিহাস আছে এই শহরের। পোড়োবাড়ি, মন্দির, প্রাচীন বটগাছই শুধু নয়— জটিলকুটিল ক্ষমতালোভী মানুষদের গল্প আছে, হিংসা আছে। ভালবাসাবাসির দৃষ্টান্ত আছে। স্বপ্ন, কান্না, প্রার্থনা, থাপ্পড়, জাঁতাকল আর লখিন্দরের যাত্রা এই নিয়েই তো জনপদের জীবন। তার কি কোনও বিরাম আছে। সেই প্রাচীন জীবনরীতি শুধু যা একটু ঝকঝকে হয়েছে।

ট্যাংরা বলল, গুরু খতরনক আদমি আছে।

তারক হিন্দি শুনে প্রথমে থ। তারপর বলল, শতকরা পাঁচজনও ওর সঙ্গে নেই তা জানিস।

জানি—

তবে?

হাই হাই লোকদের সঙ্গে র্যাপো আছে।

কিন্তু ওই শ্লা মার্কেটে থাকলে আর ব্যবসা করে খেতে হবে না চাঁদু।

ওরা গল্প করছিল যে বিষয়ে সেখানেই ওদের চলল লড়াই। এর সঙ্গে কিছুটা অর্থনীতি ও রাজনীতিও বুঝি জড়িয়ে আছে। লোকটার নাম মধুসূদন আঢ্য। থাকে সিপাইবাজারে। মাছের আড়ত আছে, হোলসেল ডিলার। সাদা খদ্দরের কুর্তা-পাজামা পরে মাঝে মাঝে দিল্লি যাতায়াত করে। আর সঙ্গে এই ছোট ভাই তারকের কেমন যেন একটা অবাধ্য খাড়াখাড়ি আছে। —ভারতীয় কমিউনিস্টদের এ এক ধরন। অঙ্ক কষে উদ্ধার করা যাবে না।

সরস্বতী বৌদির হাঁড়িতে তখন রাতের ভাত আছে।

শহরের যে ড্রেনটা সটান কাঁসাই নদীতে গিয়ে গা সেঁদিয়েছে তার পরনে কালো কাপড়। ঘিঞ্জি শহর। বাড়ি, খাটা পায়খানা, নোংরা আবর্জনা বয়ে বয়ে সে ড্রেন চরিত্রটি একেবারে খুইয়ে বসে আছে। একটা নোংরা নদীর মতো তার দুই পারে বসতি। আস্তানা। বেশ্যাপল্লী। ভাটিখানা। অস্বাভাবিক সব কাণ্ড।

তারকের কথার জবাবে প্রস্রাব পেয়ে যায় ট্যাংরার। অবশ চোখে উঠে গিয়ে দাঁড়ায় এই দরজার আড়ালে। এবং ফিরে আসে তাজা হয়ে। একটা আর্দ্রতার সৃষ্টি হয়।

রত্না বলে, ছোকরা বহুৎ ক্যাওড়া—

গল্পের গরু গাছে ছিল মুহূর্তে সে লাফ দিয়ে ডালে এসে দাঁড়ায়। এবং প্রসঙ্গ পাল্টে যায়। তারকের চোখ বিড়ালের মতো জ্বলে উঠে স্থির হয়ে যায়। দূরে ট্রেনলাইন থেকে হাতিয়া এক্সপ্রেসের ডাক ভেসে আসে। আর ঢক ঢক করে খায় অখিল।

অসময় আকাশে মানুষের আশার মতো শীর্ণ একটুখানি চাঁদ ওঠে। তাওয়ায় ভাজা নানা বর্ণের পোস্তবড়ার মতো সেই চাঁদের আলো। দেখলেই মনে হবে কোথায় গিয়ে স্খলন ফিরে এল।

আকাশ কিছুটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে চারদিক। দেখা যায় মাঠে নির্মীয়মাণ দুর্গাপূজার প্যান্ডেলের কাঠামো। বাঁশের ডিজাইনে ম্যারাপ পড়তে শুরু করেছে।

অখিল ঢোক গিলে বলল, তুমি তাকে বিয়ে করবে গুরু? নাকি খালি মস্তি মারবে?

ট্যাংরা তারককে চোখ টিপে কোনও ইঙ্গিত করে। তারক সায় জানায়। এটা আর কেউ বোঝে না, সঙ্গোপনে ঘটে যায়।

লাল চোখে এইবার তাকায় তারক। যেন তার চোখের ডালপালায় রক্তজবা ফুটে আছে দিব্যি। — লক্ষ্য অখিল।

এ অঞ্চলের সবাই জানে ছোট তারকের মনে একটি গোপন দুঃখ লুকিয়ে আছে বহুকাল। তার বাবা খারাপ লোক। মা মারা গিয়েছে শৈশবে— অনেকটা ফিল্মের হিরোদের মতো সে জন্মবঞ্চিত। কিন্তু দুর্দান্ত। অচল পয়সা কিন্তু ভালবাসার কাঙাল। আবার স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে দহরম আছে ভাল। শুধুমাত্র তাসের আড্ডাতেই বহুৎ টাকা লড়িয়ে দিতে পারে।

রক্তহীরের মতো চোখ দেখে অখিল প্রায় নিরুপায় হয়েই একপ্রস্থ হেসে ফেলল। অর্থাৎ সঙ্গী সমান সমান।

— তা অবশ্য। তারকদা তোমার দিল আছে বটে। অনুপের খোঁড়া বোনটার বিয়েতে তুমি যে একবাক্যে দশ হাজার টাকা দিয়েছিলে কে না জানে! এমন কি তুমি এত দাও-থোও অথচ ক্লাবের কোনও পোস্টে থাক না—

এদের ক্লাবের নাম ‘সর্বউন্নয়নীসভা’। তারই পরিচালনায় এই শহরে মাঝে মাঝে টিকিট কেটে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। লতা মুঙ্গেশকর নাইট হয়। পথের ধারে বৃক্ষরোপণ উৎসব হয়। নিরক্ষরতা মোচনের অভিযান চলে। শহরের বহু মান্যগণ্য ব্যক্তি এর পৃষ্ঠপোষক। সদস্য। ট্যাংরা এই কমিটির জেনারেল সেক্রেটারি। বাকি সবাই প্রাথমিক সদস্য। শহরের পাড়ায় পাড়ায় চাঁদা তুলে একটাই মাত্র দুর্গাপূজা হত এখানে। তা চলত এই সর্বউন্নয়নীসভার পরিচালনায়। গেল দু’বছর ধরে আক্রামবাজার আর সুলতানপাড়া এই দুই সাইডে পুজো হচ্ছে। তাতে অবশ্য খুব খুশি নয় এই ক্লাবের মেম্বাররা। সময় পেলে তারা জবাব দেবে এমন একটা প্রতিজ্ঞা তাদের মনে মনে। তাদেরই পুজোর প্যান্ডেল তৈরির কাজ চলেছে ওই কলেজের মাঠে। এখনও মাসখানেক দেরি আছে। তা থাক, প্যান্ডেল হবে জেলার সেরা।

একটু থামে অখিল। যেন বা কিছুটা প্রচ্ছন্নে রেখে দেয়। কিন্তু নিঝুম সন্ধ্যার আচ্ছন্নতাকে মুহূর্তে ছিন্নভিন্ন করে দেয় অন্য এক নীরবতা। দেখা যায় দিব্যি রাস্তা বরাবর দুটিতে গল্প করতে করতে আসছে—।

চকিতে চা দোকানের আটচালা থেকে চারজন বেরিয়ে গিয়ে বোবা রাত্রির মতো দাঁড়িয়ে পড়ে রাস্তার ধারে। অমনি মেয়েটির টসটসে মুখ গোমড়া একটি মরা গাছের মতো স্তব্ধ হয়ে যায়।

পাশের ছেলেটি কী যেন তাকে বলে— কী হল।

মেয়েটি হরিয়াল পাখির মতো চোখে চোখে ভয় খায়।

দুজনের সমস্ত সৌন্দর্য হঠাৎ উবে যায় একদল চোয়াড়ের মুখোমুখি হতে।

কিন্তু কেউ কোনও কথা বলে না। চুপচাপ হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল তারা। তারা দুজন।

এইবার, এই চোয়াড়ে ছেলেছোকরাদের দলটি যেন নিজেদের অস্তিত্ব কাপাস তুলোর মতো ছড়িয়ে দিল ব্রহ্মাণ্ডে।

তারাভরা আকাশে তবু কেন মৌন রাতের লীলা। কেউ কোনও কথা বলল না কিছুক্ষণ। কিন্তু প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের বিনিময় চলতে লাগল। সেয়ানা বয়স— এই বয়সে মানুষের মনে কত না খেয়াল উপস্থিত হয়। তারা নড়েচড়ে দাঁড়ায়। তাকায় পরস্পরের দিকে। ভাবে ভাব লাগায়।

কী যেন এক হঠাৎ নৈঃশব্দ্যে শহরের রাতটা ঘুম থেকে জেগে উঠল অতর্কিতে।

তারক বলল, ছেলেটা থাকে কোথায়?

অনুক্ষণ সতর্ক থাকে ট্যাংরা, গলায় সেই আলাপ। তার আঙুল চলে যায় দক্ষিণ দিকে। গোল দিঘির ধারে। ওই চ্যাটার্জিবাড়িতে—

মেসে?

হ্যাঁ।

আর মেয়েটা?

কোতোয়ালি বাজারের হারাধন দাসের মেয়ে। ওর বাপ সেই যে মিউনিসিপ্যালিটির ভোটে দাঁড়িয়ে হেরেছিল— সিমেন্টের ব্যবসা—

পাকা বিলাতি বেগুনের মতো জ্বলছে বাল্বগুলি লাইট পোস্টের মাথায়। পথেঘাটে কুকুরের ছোটাছুটি— শালাদের ইয়ে এসেছে। অখিল আর রতনের বুক ধকধক করে যুক্তিহীনতায়। ওরা তাকিয়ে দেখে আকাশে উড়তে থাকা পাশাপাশি দুটি ঘুড়ির মতোই সেই ছেলেটি আর মেয়েটি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়। যেন ফুলকপিটি পাতার আড়াল গড়ে লুকিয়ে নিল নিজেকে। (—অন্ধকারের এমনই পক্ষপাত)।

ওরা বুমেরাং ফিরে এল চা দোকানে, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তখন দোকান অনেকটা ফাঁকা হয়ে এসেছে।

বৌদি সরস্বতী একটু ছেনালি হেসে তারকের দিকে তাকাল। বলল, যাই বল ভাই মেয়েটিকে সত্যি দেখতে ভাল। একটা ঢলঢলে ভাব আছে।

আলগা বুকের পলি যেন ছুটে আসতে চায় তোড়ভাঙা টানে, সরস্বতী কোমর দোলায়। ছমকছলি ছন্দে। কপালে সিঁদুর নেই। কোথাও কোলাহল নেই। খুব সরু কোমরের গড়নে মিহি শুধু তার চোখের চাউনি। আর পাবদা মাছের ডুমো পেটিটির মতো পেটটি দেখা যায়।

সরস্বতী দেখতে পায় নর্দমাতে একটা শুয়োর যেন ঘোঁত ঘোঁত করে ঘাঁটছে। সে বলে ওঠে,— হ্যাট। — যা। — পালা—

রতন বলে, ওই মেয়ের পানে অনেকের চোখ গেছে। সাবধানে বাবা—

সরস্বতী একবার চোখ বুলিয়ে নিল সামনে, গলায় কোনও সুর নেই তবু আওয়াজ— তোমরা তো ভাই একেবারে মরা।

কেন, কি হল যে মরা মনে হল। দেখবে নাকি একবার। চল, ঘরে খিল তুলে দেখাই। ট্যাংরার খর জবাব।

আমাদের দেখিয়ে কি লাভ, মেয়েটা সামনে দিয়ে গেলেই সব শিয়ালের মতো হ্যা হ্যা কর। কেন ছেলেটাকে কলার ধরে ধমকানি মারতে মুরোদ নেই।

নেশা করে ঝুম হয়ে বসে আছে ভদ্রলোকের ছেলে ছোট তারক। তার বাবা এই কলেজের একজন প্রফেসর। চাঁদের আলোয় তারকের গায়ের রঙ এখন পাকা বাতাবি লেবুর খোসার মতো পুরু দেখায়। তাকেই খুশি করার মতলবে বৌদি সরস্বতী এমন ছেনালি গায়। অমনি তারক ফের ছিপি খুলে গলায় ঢালল।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে গলা তুলে অখিল বলল, চমকাব বলছ? পুলিস কেস হলে কে মাল্লু জোগাবে?

রতন আঙুল তুলে তারককে দেখিয়ে দেয়, লাগে নোট গৌরী সেন দেবে। আছেই তো—

আ মরণ, মশায় কাটে যে,— নিজের পিঠেই ঠাস করে থাপ্পড় মেরে মশা তাড়ায় সরস্বতী। আর আড় চোখে চোখে দেখে।— পাঁচটা মানুষকে যেন বড়সড় পাঁচটা পাথর বলে মনে হয়।

চুপ ছিল ট্যাংরা। এইবার ছোট তারকের দিকে তাকিয়ে বলল, ঠিক আছে। চিন্তা মৎ কর। হয়ে যাবে। সব ঠিক হো যায়ে গা।

এই বলে একটা হাঁটু প্রায় সরস্বতীর পাছার দিকে গুঁজে দেয়। যেন ঠ্যাঙের তলায়। মাগীটা রাঁঢ়। — কবেই তো বর ছেড়ে পালিয়ে গেছে। ভাগ্যিস গেছে।

হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে যেতে দেখা গেল টিম টিম করে জ্বলছে কুপি। বড় মিঠে আলো তার।

একটু হেসে অখিল বলল, মাখো মাখো, ভাই। — ভাল করে মাখো। আমি যাই রাত হল। বউ আবার খিল খুললে বাঁচি।

এই অস্বাচ্ছন্দ্যের জন্য কিছুটা দায়ী আনন্দ নিজেই। এক ধরনের জেদ তার শরীরের আষ্টেপৃষ্ঠে বোনা। মেসে থাকে। সুস্থ মাথার ছেলে সে নয়। মনিঅর্ডার করে বাড়ি থেকে টাকা এলে সে ফিরিয়ে দেয়। টিকে থাকার একটা জটিল প্রবণতা তাকে একের পর এক টিউশন জোগাড় করে দেয়। তবে তার মনে হয়, এ সংসারে যারা টাকার বাজনা বাজিয়ে জগৎটাকে চালায় তাদের কোনওদিনই জয় হবে না। তাই ছেলেমেয়েকে পড়িয়ে মাসের শেষে কটা টাকা উপায় করতে গিয়ে তাকে মাঝে মাঝেই অপমানিত হতে হয়। এক ধরনের হতাশা তৈরি হয় সাময়িক, কিন্তু কিছুক্ষণ পর তা অসাফল্যের মতো দেহ থেকে ঝরে যায়। তখন মুগ্ধ নীলাকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে আনন্দ।

সকালটি এই শহরে দেখার মতো।

আজ মেসের বাজারটি ভাল হয়েছে। ঢেঁড়স আর আলু কেনা হয়েছে ঢালা। একটা ঘণ্ট হবে। রেশনের পোকায় খাওয়া চাল— নইলে দিয়ে জোগানো যাবে না। বিউলির ডাল হবে পিছলে— মুখে ঢোকানোর সঙ্গে সঙ্গে হড়কে ভেতরে ঢুকে যাবে।

পেস্ট ব্রাশ দাঁতে গুঁজে নিয়ে আনন্দ গিয়ে পায়খানার লাইনে দাঁড়াল। একটাই মাত্র পায়খানা ঘর— বহুকালের পুরনো খাটা পায়খানা। আলো ঢোকে না। দুটি ধ্বস্ত ইট পাতা। — নিচে গুড়ের খালি টিন পাতা। মেসের মোট মেম্বার ১০। লাইনে দাঁড়িয়ে পজিশন পেতে পেতে দাঁত মাজা হয়ে যায়। মগ বালতি কাছেই। মুখ ধোয় আনন্দ। ফের এসে লাইনে দাঁড়ায়।

বহুকালের পুরনো পোড়োবাড়িটি মেরামত করে এই মেস। মালিক যিনি তিনি গত হয়েছেন। তাঁর ছোট পুত্র এখন মেস দেখে। মদ খায়। আর জুয়ার আড্ডায় যায় নিয়মিত।

দেওয়াল ফেটে বটগাছ উঠে যাচ্ছে ঊর্ধ্বে, স্যাঁতসেঁতে ঘর। এই ছবি থেকে মধ্যবিত্ত বাঙালির চেহারাটা পরিষ্কার নিজেকে জাহির করে। দিনে দিনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে আনন্দ। লাইট আছে, ফ্যান নেই। সময় মতো ভাতও সুসেদ্ধ হয় না।

মানুষের জীবন নিয়ে এই যে যত্রতত্র খেলা তার কোনও প্রতিকার খুঁজে পাওয়া যায় না। একটি আটপৌরে ঘরের ছেলে আনন্দ গতরাতের ভেজানো ছোলা গুড় দিয়ে খেয়ে স্টেশন রোডের উদ্দেশে রওনা দেয়। ৮টা থেকে ১০টা এই দু ঘণ্টা পড়াতে হবে। —মেয়েটিকে অঙ্ক শেখানো যে কি কাজ!

সিঁড়ি বেয়ে দোতলা থেকে নিচে নামতে গিয়ে আনন্দের গায়ে এসে লাগল কাঁচা হলুদের মতো এক গুচ্ছ রোদ। এই রোদ মনে করিয়ে দেয় পুজো আসছে। হঠাৎ ভাল লেগে যায়। কোনও গানের কলি সে গুনগুন করে গাইতে গাইতে নিচে নামে। সামনের চায়ের দোকানে চা খেয়ে দেবে হন্টন।

বৌদি চা দাও তো—

সরস্বতীর এখন অন্য চেহারা। সকাল সকাল স্নান সেরে— ভিজে চকচক করছে। দুধ ফুটছে কড়ায়। কেউ টোস্ট খাচ্ছে। কেউ পেপার পড়ছে।

এই যে—

সন্ধেবেলায় এই চা দোকানে ঢোকা দায়। রাজ্যের বাউন্ডুলে এসে ভিড় করে। হাঁফ ছেড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিল আনন্দ। সরস্বতী বলল, দাঁড়িয়ে কেন— বোস—

না, তাড়া আছে—। এমনিতেই দেরি করে ঘুম ভেঙেছে আজ—

কোথায় চললে?

কোথাও আর, পড়াতে। আজ পয়সা নেই বৌদি। পরে নিও, এখন তুমি খাতায় লিখে রাখ।

এই বলে কাপটি নামিয়ে রেখে দ্রুত হাঁটা দেয় আনন্দ। ১০টায় উঠে মেসে ফিরে স্নান করে কলেজ—। তারপর শান্তির সঙ্গে আড্ডা।

দোকানেই বেঞ্চের একধারে বসে ছিল রতন। রোজ সকালে চা খেতে সে এখানেই আসে। চা খেয়ে বিড়িটি কানের কাছে টিপে টিপে তামাকের সড়সড় শুনছিল সে, এই ধরাবে ধরাবে— এমন সময় ছেলেটি এল। ধরানো হল না— ছোকরার রকম দেখতে লাগল। দিব্যি কার্তিক ঠাকুরের মতো দেখতে। চুলে টেরি কাটে। গাঁ থেকে এসে সে আবার ধরেছে জিনসের প্যান্ট। এই ভদ্র ভদ্র চেহারাগুলিকে রতনের ভারি অবিশ্বাস লাগে। সে বিড়িটি ধরিয়ে প্রথমে সুখটান মারে। তারপর বলে, কি বৌদি খুব যে পিরিত।

সরস্বতী এদিক ওদিক তাকিয়ে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে নিষেধনামা দেয়। এখন সকাল— দোকানে সব ভদ্র ভদ্র লোকজনেরা বসে চা খাচ্ছেন আর পেপার পড়ছেন। ঠোঁটে সরস্বতীর হাসি আর কটাক্ষ। অমনি রতনের মাথায় বুদ্ধি এল।

একটু পরে এল বিশু, অমিয়, অখিলকাকা আর ট্যাংরা। ওরা রসিদ বই হাতে পুজোর কালেকশনে বেরিয়ে পড়ল।

ছাত্রীর বাড়িতে এসে আনন্দ জানল ছাত্রী অসুস্থ। জ্বর উঠেছিল কাল রতে। আজ ভাতও খাবে না, পড়বেও না। চটজলদি ফিরে এসে মেসে দেখল স্নানের লাইন প্রায় ফাঁকা হয়ে এসেছে। মাথায় নারকেল তেল আর গায়ে সর্ষের তেল লাগিয়ে চৌবাচ্চার কাছে এসে দাঁড়ায় আনন্দ।

পৈতেটিকে কানের কাছে তুলে দিয়ে প্লাস্টিকের বালতিতে জল ভরে ভরে গায় ঢালল। গামছায় ডলে ডলে মুখ গা মুছল। ঘরে ফিরে গিয়ে রামকৃষ্ণদেবের সামনে ধূপ জ্বালাল। তারপর দ্রুত প্যান্টজামা পরে ঠাকুরের কাছে গিয়ে বলল, ঠাকুর খেতে দাও। এইবার সে খেতে দেখল ওয়েটিং ক্যাম্পাসে কে একটি মেয়ে কোন বোর্ডারের জন্য অপেক্ষা করছে। — বেশ ভাল দেখতে তো। তাকিয়ে তাকিয়ে দু- একবার দেখল আনন্দ।

তারপর ভাত খেয়ে হাত মুখ ধুয়ে ঘরে ঢুকে বালিশের তলা থেকে চারমিনার সিগারেট প্যাকেটটি নিয়ে বুক পকেটে রাখল আনন্দ। এবং ছোট ডায়েরিটি আর কলমটি হাতে নিয়ে কলেজে যাবে বলে বেরিয়ে এল।

কলেজের গেটেই নিমতলা— তার ছায়ায় দাঁড়িয়ে ছিল শান্তি। বাসন্তী রঙের শালোয়ার কামিজ, চুলে শ্যাম্পু দিয়েছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দাঁতে চিবচ্ছে বাবুলগাম— ফোলাচ্ছে জিভের কাছে বেলুনের মতো। চোখে একটি দুষ্টুমিষ্টি আলো। একুশ বছরের মেয়েদের শরীরে সাধারণত এই আলো জ্বলতে দেখা যায়। আর দেখা যায় নিকট গাঁয়ের কোনও সন্ধ্যায় প্রদীপের শিখায়।

চোখ নাচিয়ে হাসে শান্তি, যেন শুভদৃষ্টি হচ্ছে।

ঠোঁটে ঠোঁট টিপে রেখে কেন অপাঙ্গে দৃষ্টি দেয় আনন্দ। কোথায় শিখল কে জানে।

জল খাই চল—

ক্লাস আছে যে—

ছাড় তো ক্লাস— লিমকা খাব চল—

খুব তেষ্টা?

আনন্দ চোখ ফেরাতে পারে না। মনে তার কেবলই একটি প্রশ্ন (—নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ?)

স্ট্র দিয়ে টেনে লিমকার বোতল থেকে দুটো সিপ নিয়ে শান্তি বলল, ক্লাসে যখনও গেলামই না চল সিনেমা যাই। রেখার ছবি। তোমার ভাল লাগবে।

ইজাজত? টিকিট পাবে?

চলই না, লাইনে যারা দাঁড়ায় সেইসব ছেলেদের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে টিকিট কেটে দিতে বললেই কেটে দেবে—

আনডিউ অ্যাডভান্টেজ—

কে নেয় না বল তো—

একটি রিকশায় দুজন চড়ল। এই মফসসলে, যেখানে প্রায় প্রত্যেকেই প্রত্যেককে চেনে সেখানে এটা বাড়াবাড়ি বইকি। কিন্তু বয়েসটার দিকেও তো তাকিয়ে দেখতে হবে। এই সময়ই তো মানুষ সবচেয়ে বেশি ডেসপারেট হয়ে ওঠে। — ওরা কিন্তু বসল খুব সংযত। এদিক ওদিক করল না। শুধু একটি গোপন আড়াল তৈরি করে হাতে হাত রাখল।

শান্তি বলল, এই জানো তো থার্ড ইয়ারের মুকুন্দদা কালকে আমাকে ডেকে বলছিল এস এফ আই থেকে ক্লাস ক্যান্ডিডেট হতে।

কোনও দরকার নেই, পাঁচ ঝামেলায় গিয়ে কি লাভ?

ক্লাস রিপ্রেজেনটেটিভ হলে ক্লাসে একটা গ্ল্যামার থাকে। ম্যানেজ করতে জানলে বেতনটা দিতে হয় না। হাঁদা গঙ্গারাম ছেলেদের পটিয়ে খাওয়া যায়। সিনেমা দেখা যায়।— এই জানো, বেশ কিছুটা উল কিনে সোয়েটার বুনতে শুরু করে দিয়েছি। এবার শীতে তুমি পরবে—

তুমি বুনবে আর আমি পরব? সে কি ইহজনমে হবে?

কেন তুমি আমাকে ঢেঁড়স ভাব নাকি—

একথার জবাবে আনন্দ কোনও শব্দ করল না, শুধু মেয়েলি আঙুলগুলি নিজের মুঠির মধ্যে নিয়ে চটকাতে লাগল। বরং শব্দ করতে লাগল রিকশার চাকা, চেন আর হুইলে দেওয়া মোবিল।

সিনেমা হলের অন্ধকারের গভীরে একের পর এক বর্ণালী দৃশ্যাবলি— অকথিত হাসিগুলি শুধু বেঁকে বেঁকে গড়িয়ে পড়ে। সভ্যতা-অসভ্যতার তর্ক চলে নিচু স্বরে। রাগ ভাঙাতে হাতুড়ির বদলে এক ধরনের রক্তবর্ণের জাঁতি ব্যবহার করতে হয় আনন্দকে। আবার কেটে যায় যদি সেই ভয়ে সতর্ক থাকতে হয়।

তখনই দুপুরের খেলা এই শহরে। লোকজনের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিষয়-আশয়, হিসেব-নিকেশ নিয়ে মেতে আছে। তালাচাবি সারানোর ফেরিওয়ালা বাড়ি বাড়ি হেঁকে যায়। ছাদে টাঙিয়ে রাখা তারে শাড়ি, সায়া, জাঙ্গিয়া শুকোয়। কেউ তৃপ্তি করে ভাত খেয়ে নিদ্রামগ্ন। কেউ ছোটে, শুধুই ছোটে। পথে ক্লান্ত কুকুর পথের ধারে কুঁকড়ে একটি কাজুবাদামের মতো পড়ে থাকে। অফিস চলে অফিস ঘরে। মাঠে কোমল আচ্ছাদিত ঘাসের মাথায় রোদ পড়ে সব নম্রতাকে পুড়িয়ে দেয়।

সিনেমা দেখে ফিরছিল ওরা দুজন। এখন রিকশায় নয়। হাঁটতে হাঁটতে।

শান্তি বলল, তোমাকে না বলেছি স্টেটসম্যান পড়তে। অ্যাপয়েন্টমেন্ট কলমটাও পড়তে হবে, ইংরেজিটাও শেখা হবে।

কেন, আমি ইংরেজি জানি না নাকি?

ওরকম জানাতে আজকাল কিছু হয় না। — কথায় একটু বিরক্তির আভাস দেখা যায় কিন্তু তাকে খাঁটি বিরক্তি বলা যাবে না। বরং ওটাকে একধরনের আত্মীয়তা বলাই শ্রেয়। কলেজ মাঠের কাছাকাছি আসতেই চোখে পড়ে বিবেকানন্দর পাগড়ির মতো গেরুয়া রঙের প্যান্ডেলটা। আনন্দ বলে উঠল, মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনতে হবে—

তুমি পুজোয় এখানে থাকবে না? দেশে যাবে ভেবেছ?

সপ্তমী অষ্টমী এখানে। তোমার সঙ্গে। আর নবমী দশমী দেশে যাব। প্লিজ—। মা কষ্ট পাবে নিলে। — এমনিতেই তো বোনেরা চিঠিতে লেখে—, কি হল অমনি মুখ ভার!

সন্ধ্যা নামছিল গুটি গুটি পায়ে। লাইট জ্বলল। একটা অচিন পাখি শূন্যে ডিগবাজি খেয়ে খেয়ে ঘুরেফিরে কোথায় চলে গেল। চা দোকানের সামনাসামনি চলে এল ওরা।— এখানেই শান্তি একটু জড়োসড়ো হয়ে ওঠে। শোনা যায় চায়ের দোকানের সেই অ্যান্টিসোশ্যালদের আড্ডা থেকে কে একজন ঠোঁটের ভেতর দুই আঙুল ভরে ট্যাঁ ট্যাঁ— ট্যাঁ-আ-আ’ করে আওয়াজ করে।

শান্তি বলল, দেখছ কি অসভ্য—

ওদিকে তাকিও না—

একজন বলে উঠল, শুতে পারলে হত—

আরেকজন—, শ্লা বানচোৎ।

মাইরি, পাছাটা সাংঘাতিক।

এমন সময় রাগে গরগর করে ছুটতে ছুটতে একটা ষাঁড়ের মতো এসে দাঁড়াল ছোট তারকের মোটরবাইক। আড়চোখে দেখল শান্তি।

ট্যাংরা নামে একটা জানোয়ার আছে এদের মধ্যে। সে দৌড়ে এসে দাঁড়াল দুজনের সামনে, এই যে—

শান্তি তাকাল।

আপনাকে নয়। এই আনন্দ—

কিছু বলবে?

দুর্গাপূজার চাঁদাটা—

আজকে তো নেই। পরশু সন্ধ্যায় এস।

মেসের আর সবাইকে বলে দিও।

এ কি জনে জনে দিতে হবে নাকি?

তা হবে না? দশটা পাঁচটা নয়, একটাই মাত্র দুর্গাপূজা হয় বছরে। সবাই মিলে হাতে হাত না মেলালে উৎসব হবে কেমন করে?

আমি কেন, তোমরাই এসে চাঁদার কথাটা বোল—

তুমিও তো আমাদেরই একজন নাকি? বন্ধু ভাবলেই বন্ধু। না ভাবলে—

ওর দেরি হয়ে যাচ্ছে!

আচ্ছা। আচ্ছা। পুজোটা তো এগিয়ে আসছে তাই বলছিলাম আর কি?— এই বলে ট্যাংরা বোবা চোখে শান্তির দিকে তাকিয়ে রইল। চায়ের দোকান থেকে ছুটে ছুটে আসছিল কটু কথার ঝাঁঝ। শান্তি বা আনন্দ কেউ সেদিকে কর্ণপাত না করে কৌশলে ভদ্রভাবে পালিয়ে বাঁচল।

আশ্বিনের আকাশ। মহালয়ার পর সেই আকাশে সাদা দুধের সর উথলে ওঠে। নীলচে সাদায় একটু ভাব নেমে এলে অল্প অল্প করে ঠান্ডা টের পাওয়া যায় হাওয়ায়। তবে উৎসবের আগমনী সঙ্কেত মানুষের ভয়ভীতি একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। এই ছোট মফসসল শহর; এখানে মানুষ জন্মায়, বাঁচে এবং পরিশেষে মরে যায়। মাঝের সময়ে খেলা করে প্রতিযোগিতার সুরে। কিন্তু অস্তমিত শরতের এই আলোয় যেন মানুষের জন্ম রহস্যটিই বারবার ফুটে ফুটে ওঠে। মানুষের উৎসব চলে লোকশিক্ষার জন্য। দিন যত যায় মানুষ শুধুই শিক্ষিত হয়। লজ্জিত হয়। আধুনিক হয়। ঢাকের মাথায় কাঠি পড়ে। সরস্বতী খলখলিয়ে হাসে। বাতাস গান গায়।

এটা বোঝা দায় এ পৃথিবীতে কার সঙ্গে কার কি সম্পর্ক!

লড়াইয়ের সূত্রটাও ঠিক ঠিক আবিষ্কৃত হওয়ার অনেক আগেই লড়াইটা থেমে যায়। আর অনেক সময় লড়াই চোরা স্রোতের মতো এমন ভাবে বইতে থাকে যে দেখে বোঝা যায় না এটা আসলে একটি লড়াই।

মধুসূদন আঢ্য বনাম ছোট তারক— এটা চলতেই থাকে। কিন্তু কোনও সুরাহা হয় না।

তারক হাসল, শ্লা দুনিয়াটাই তাজ্জব— চল,—

ট্যাংরা একটা দেশলাই কাঠি নিয়ে কান চুলকাচ্ছিল,— মতলব?

আজ আড্ডায় গুণধর এসেছে। অনেকদিন বাদে তার আবার আবির্ভাব আড্ডায় অন্য মাত্রা নিয়ে এসেছে। সে বয়ে আনল একটা বড় কলাগাছ।

আরে এ গুণাই—

কি হল—

এত বড় কলাগাছ দিয়ে কি হবে?

কেন, কলাবৌ— কস্তা পাড়ের শাড়ি পরিয়ে ষষ্ঠী বরণ—

এই বৃক্ষকে কাপড় দিতে গেলে ক্লাব ঘরটিকেও বিকরি করতে হয় রে—

অখিল আর গুণধর কথা বলছিল। কলেজ মাঠের প্যান্ডেলটি অনেকটা দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের আদলে। গুণধর পাজামার কষি আলগা করে পয়সা বের করল। তারপর ফেরত দিয়ে বলল, ভাঁড় পাওয়া গেল না—

দোকানে না পেলি তো শালা কুমোর ঘর ছুটলি না কেন?

নিত্য বাসের চলাচল অব্যাহত ছিল। এখান থেকে বাস চলে যায় খTপুর, ঘাটাল, আরামবাগ। কলিকাতা পরিবহণ। পুজোর কেনাকাটার ভিড় লেগেছে শহরে। মেয়েরা সেজেগুজে বুক ফুলিয়ে— আর ছেলেরা সেই ফোলানো বুকের মুখোমুখি। অবিরত হাসি চলছে। কে কি বলছে অন্যজন শুনতে পাচ্ছে না। যে যার নিজেদের নিয়ে মেতে আছে।

সেই ‘চল’ বলে মোটরবাইকে ট্যাংরাকে তুলে নিয়ে ছোট তারক চলে গিয়েছিল সে ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে গেল। হর্ন বাজল।

সপ্তমী অষ্টমী নবমী দশমী চারদিনই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। নাটক, কবিতা, গান— তারও একটা তোড়জোড় চলছে। পরিচালকদের নিত্য ব্যস্ততা।

সরস্বতী বৌদির দিকে তাকিয়ে ট্যাংরা ইঙ্গিত হানতেই মেয়েলি মিষ্টি গলা আবদারে গেয়ে উঠল, খচ্চর—

ছোট তারক ফুট কাটে,— আজ থেকেই নতুন শাড়ি?

প্যান্টের হিপ পকেট থেকে রসিদ বই বের করে রতন এসে ট্যাংরাকে বলল, বসুধা-পল্লীটা এখনও ঠিকমতো কালেকশন হয়নি। ওখানে সি পি এম-এর দাদা রুহিদাস ঘোষ— সে বলে দিয়েছে এ পাড়ায় কেউ চাঁদা দেবে না—

এ ব্যাপারে কেউ আজ আর কোনওরকম মাথা গরম করল না। মুখ ফিরিয়ে তারক বলল, সে দেখা যাবে— রুহিদাসদা তো লোক খারাপ না—

রতন বলল, তোমরা যেও দাদা। গুরুদেব লোক।

সরস্বতীর দিকে তাকিয়ে ছোট তারক মৃদু স্বরে শুধায়— কি, চিকেন ভোগ রাঁধা রেডি তো?

সরস্বতী ঘাড় নাড়ে ষোলো বছরের খুকির মতো।

দোকান ঘরের ভেতরের দিকে যে আবছা খুপরি মতো জায়গা আছে সেখানে গিয়ে বসে যায় তারক, ট্যাংরা, রতন আর অখিল। এদের দেখাদেখি গুণধরও এসে ঢোকে।

তারক বলল, দেখ শ্লা— মাল খাবে খাও, কিন্তু এই পুজোর কদিন বেলেল্লেপনা চলবে না। মনে রেখে খাও। কমিটির পয়সায় মাল-মাংস।

গুণধর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সরস্বতীর চেহারাটা দেখছিল। ওর ভেতর থেকে মনটা আদর করে বলে উঠল,— হারামজাদি। আর মুখে বলল, মাতলামি করি নাকি আমি?

সে তোদের সবাইকে দেখা আছে। মাল কে কত খেতে শিখেছ। পাঁইট খুলতে না খুলতে শ্লাদের নেশা ধরে যায়।

ঢুক ঢুক করে খেলা চলছিল। কাঁচা পেঁয়াজ, আদা কুচি, চিকেন ভাজা, কাঁচা লঙ্কা। এমন সময় ভট ভট করে জেনারেটর প্যান্ডেলের চারদিকে স্পেশাল লাইট ছড়িয়ে দিল। মাইকে রেকর্ড চাপানো হল— কে যেন আবির ছড়িয়ে দিল ভোরের আকাশে—

ট্যাংরা বলল, ভোর আবার কখন হল রে। এই তো সবে সন্ধ্যা—।

ছোট একটা জানলা বরাবর সামনের রাস্তাটি দেখা যায়। দেখা যাচ্ছিল কীভাবে দিনের আলো আস্তে আস্তে রাস্তাপথে নিভে গেল। সন্ধ্যার পরিবেশ, যেন চুপিচুপি ফিসফিসিয়ে কথা বলছে কেউ। দেখা গেল, নাতির হাত ধরে ঘুরতে বেরিয়েছে বুড়ো চৌধুরি। এই বয়সেও লোকটার চেহারা দেখার মতো। প্যাঁক প্যাঁক করে হর্ন টিপতে টিপতে চলে যাচ্ছে,— খালি রিকশা, ভর্তি রিকশা। দোড়াদৌড়ি কামড়াকামড়ি করছে অল্পবয়সী ছেলেছোকরারা। একসঙ্গে দুটি কিংবা তিনটি মেয়ের রেখা রাস্তা ধরে হাঁটছে কখনও। কেউ কারও গায়ে ঢলে পড়ে হাসছে। কেউ একা একা। নিরীহ মানুষদের চালচলন যেমন হয়।

এমন সময় দেখা গেল আনন্দ আর শান্তি হাঁটতে হাঁটতে বাজার থেকে ফিরছে।

অখিলের গলা নেতিয়ে পড়ছে, তবু কথা বলা চাই। সে ফুর্তির চোখে তাকাল জানলা বরাবর। তারপর ছোট তারকের দিকে চেয়ে বলল, গুরু তোমার মালটা—

মেয়েটির কথা ছোট তারক প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। যখন চোখে পড়ে তারপর বড়জোর একদিন জের থাকে। সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ চলে গেল ট্যাংরার দিকে। দক্ষিণহস্ত ট্যাংরা অমনি নড়ে উঠল।

কতই তো করার চেষ্টা করল— এ মেয়ে যে পয়সা বা মোটরবাইকও পছন্দ করে না। ট্যাংরা প্রথমে ভেবেছিল ছেলেটার সঙ্গে প্রথমে বন্ধুত্ব করা যাক, পরে জবাই করতে সুবিধে হবে। কি ছেলে,— শ্লা শেয়ানা পার্টি। হাসে, কথা বলে। ব্যস, ওই পর্যন্তই। এদিকে এইসব ক্ষেত্রগুলিতে ছোট তারক কিছুই বোঝে না, একেবারে ছেলেমানুষের মতো করে। বাপধন, এ কি হাতের মোয়া। যে চাইলেই পাওয়া যায়! হাতে এনে দেওয়া যায়?

যারা বসে বসে মদ গিলছিল সবাই উঠে এসে দাঁড়াল রাস্তায়। চোখ লাল। একেবারে চুর হয়ে আছে। রতন বলল,— অখিল, মাইরি একেবারে কবিতার মতো।

ওরা সবাই পিছু নিল।

ছেলেটি আর মেয়েটি কি বলাবলি করে দুজন দুদিকে হাঁটতে লাগল। মেয়েটি বাড়ি যাবে। আর ছেলেটি মেসে।

ট্যাংরা বলল, তারক— গুরু তুমি মাইরি অখিলকে সঙ্গে নাও। মাগীটার পিছনে পিছনে যাও। আজকে কথা বলতেই হবে। দেখ,— শ্লা একটা মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে এত ন্যাকড়াবাজি। যাও তো গুরু, যদি দেখ— গাড়িতে তুলে নিও—।

ছোট তারক মদের গুণে এখন আপাদমস্তক লাল। ফর্সা রঙ হলে এক দোষ— মদে আর রোদে গায়ের রঙ লাল হয়ে যায়। সে তাকাল ট্যাংরার দিকে, চোখে ছোট জিজ্ঞাসা—

ট্যাংরা বলল, অখিলই এই শালা ছেলেটাকে খেলে। — মারব ধমক। আর চাঁদাটা— শালারা বেশ কজন থাকে। ভাবছে খুব বেঁচে গেছি।

ওরা দুই দলে ভাগ হয়ে গিয়ে যে যার পথে এগতে লাগল। পায়ের তলার মাটি টলোমলো। তার ওপর পড়েছে এলোপাথাড়ি লাইটের আলো। গান ধরল কেউ। কেউ শিস দিচ্ছে খেয়ালে। বড় রাস্তা থেকে গলি। গলি থেকে সিঁড়ি। সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছে আনন্দ নামের ছেলেটি বলে উঠল, কি চাই—?

পকেটের মধ্যে মোড়া একটি নতুন শাড়ি ছিল। লাল পাড়, কস্তা। ওরা সবাই মিলে ছেলেটির গলায় ফাঁস পরাল। দরজাটা বন্ধ করে— মত্ত অবস্থাতেও সতর্ক ওরা। একটা অস্পষ্ট বাঁক আছে ছেলেটির গলার কাছে। মাথার ওপর দিকটা তুলতে দেখা গেল চোখ দুটি,— ঠেলতে ঠেলতে একেবারে বেরিয়ে এসেছে। তাড়াহুড়ো আর অস্থিরতা চলছিল ওদের মধ্যে। গভীর তোলপাড় চলছিল।

অখিল বলল, শালাকে মেরে ফেললি—।

ট্যাংরা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে নিষেধনামা দেয়,— চুপ। শ্লাকে মারব এক পাছায় লাথি।— আয় ধরে বেঁধে এই ফ্যানের হুকে শাড়িটা গলিয়ে টাঙিয়ে দিই।

ধরাধরি করে দীর্ঘ চেহারাটাকে ওরা প্রথমে খাটের ওপর দাঁড় করাল। কিন্তু সে কি দাঁড়াতে চায়, শুধু যে ধসে যাবার প্রবণতা।

ঘাম দিতে লাগল সবার। এবার তারা পালিয়ে বাঁচতে চায়।

রতন বলল, লোকে ভাববে গলায় দড়ি কেন—

অখিল বুদ্ধি জোগায়, দেখতে দেখতে দিন দুই বয়ে যাবে। মেসে তো শ্লা আর কেউ নেই। পূজার ছুটিতে দেশে গেছে।

ট্যাংরা একটু আশ্বস্ত চোখে অখিলের দিকে তাকাল। তারপর দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল কজন।

কি করেছিল আনন্দ?— কিছুই না। মত্ত অবস্থায় ওরা জিজ্ঞেস করে, ‘সব শালাদের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছ, চাঁদা শালা দেবে কোন জামাই।’ আনন্দ কোনও জবাব দেয়নি। ওরা বলেছিল, ‘শ্লা তোকেই সব টাকা দিতে হবে।’ আনন্দ বলেছিল, ‘এই নাও—’ বলে ১০ টাকার নোট বের করেছিল পকেট থেকে। ওরা বলেছিল— ‘১০ টাকা, — এ কি মাগনা নাকি রে বানচোৎ।’ তারও প্রতিবাদ করেনি আনন্দ। বলেছিল ‘তবে কত দিতে হবে?’ জবাবে ওরা বলেছিল— ‘কত আবার। ৭ জনের ৭০০।’ আনন্দ একটু বিরক্ত হয়েছিল, ‘এত টাকা কোথায় পাব।’ ওরা দাঁত খিঁচিয়ে বলেছিল, ‘কোথায় পাবে তা আমরা কি জানি চাঁদু। তোমার ওই মাগীটাকে খাটিয়ে জোগাড় কর।’ এইবার আনন্দ বলে উঠেছিল, ‘মুখ সামলে কথা বলবে’, ‘আমি যদি না বলি’, ‘কি করে ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলতে হয় শিখিয়ে দেব’, ‘তাই নাকি’ এই বলে ওরা আনন্দর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, বিশেষত দস্যুর শক্তিতে ট্যাংরা। ধস্তাধস্তি চলে কিছুক্ষণ তারপর মায়ের জন্য আনন্দর কেনা লাল পাড়ের তাঁতের শাড়িটা দিয়েই ঝুলিয়ে দিয়েছিল ওরা।

পরের দিন সপ্তমীর সকাল। শান্তি এসে দাঁড়িয়ে আছে মণ্ডপের সামনে— আর ঘন ঘন ঘড়ি দেখছে।

মণ্ডপের সামনে ক্লাবের কুশীলবেরা।

তারক, ট্যাংরা, অখিল, রতন, গুণধর— সবাই আজ সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি পরে। মাথা নিচু করে বসে।

ওরা তো আর সত্যি সত্যি খুন করে ফেলতে চায়নি।

রোদের রঙে হলুদ মিশেছিল, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা ফিকে হচ্ছিল। মেয়েটি অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে।

— কিন্তু ওরা কি করবে, এখন ওরা তো অসহায়— ওরা তো জানত না ছেলেটা সত্যি সত্যি মরে যাবে। এবং মেয়েটাকে তুলে এনে অলটিমেট কোনও সর্বনাশ ঘটিয়ে দেওয়ার কোনও অভিপ্রায় বা অভিসন্ধিও ওদের ছিল না। তা থাকলে অনেকদিন আগেই তা পারত। ওরা তো আর পাঁচটা ভদ্র মধ্যবিত্ত পরিবারেরই সন্তান। ওরা কি কখনও প্রকৃতিস্থ অবস্থায় চাইতে পারে— একটা আস্ত লোককে সত্যি সত্যি মেরে ফেলতে। ফুলের মতো তরতাজা একটা সুন্দর যুবককে। বেঁচে থাকলে আজকে যার ওদের সঙ্গে সাদা পাঞ্জাবি পায়জামা পরে উৎসবে যোগ দেওয়ার কথা ছিল।

পঞ্চপ্রদীপে আরতি শুরু হল। ঢাকের তালে তালে পুরোহিতের হাতে প্রদীপ— দেবীর পা থেকে মুখ পর্যন্ত আলোকিত করতে লাগল।

মেয়েটি এখনও দাঁড়িয়ে— সর্বনাশের কথা জানেনি, তবু মুখ উপোসি—। একটু শুকনো।

পুজোর সময় পবিত্র চেহারা বলতে মানুষ যা বোঝে।

ওরা নিচু মুখ উঁচু করে দেবী পূজার আরতি দেখতে গেল। কিন্তু দেখতে পেল ঢাকের শব্দে শব্দে প্রদীপের আলোয় দুলছে দেবী মূর্তির বদলে লাল কস্তা পাড়ে বাঁধা দুটি পা।

এবং তা ক্রমে রক্তে সঞ্চারিত হতে লাগল।

লীলা মজুমদার : সেজদিদিমার স্মৃতি পুরাণ

বাড়ির সকলের মহা ভাবনা! এই নাকি প্রথম সেজদিদিমা আছাড় খেলেন! জন্মাবার পরেই বড় বড় করে চোখ তুলে চেয়ে চেয়ে নাকি আঁতুড় ঘরের কোথাও কোনও খুঁত আছে কিনা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছিলেন। দু-মাসে দিদিমার কোল থেকে নিজেই নেমে পড়ে খুব তাড়াতাড়ি হামা দিয়ে এক মস্ত আরশুলা ধরেই মুখে পুরে দিয়েছিলেন! সঙ্গে সঙ্গে ধর-ধর করে জনা পাঁচেক আধবুড়ি ওঁকে ধরে ফেলে মুখে আঙুল পুরে আরশুলার মরদেহের বাকি অংশগুলো বের করে দিয়েছিলেন। যেটুকু গিলে ফেলেছিলেন তারি ফলে নাকি তাঁর ওইরকম অসাধারণ বুদ্ধি আর অসহিষ্ণু স্বভাব হয়েছিল, এইরকম অনেকেরই ধারণা। অবশ্য ওই হট্টগোলে দেওয়ালে খুব জোরে মাথা ঠুকে গিয়ে খুদে একটা আলু মতো হয়ে গিয়েছিল। তাতেও হতে পারে।

সেকালে এ বাড়িতে মেয়েদের বেশি লেখাপড়া শেখার রেওয়াজ ছিল না। তবে এখন লোকে যাই বলুক, স্কুলে না গেলেও এ বংশের সব মেয়েদের বাংলা লিখতে পড়তে অঙ্ক কষতে বাড়িতেই শেখানো হত। সেজদিদিমা এক কাঠি বাড়া! মাস্টারমশাই যখন ভাইদের অ্যাট ক্যাট করে ইংরিজি শেখানো ধরলেন, মেনিবেড়াল কোলে নিয়ে, দরজার চৌকাঠের ওপর বসে বসে সেজদিদিমা তাঁর মুখখানা দেখে দেখেই মুখে মুখে সব শিখে ফেললেন। তাই শুনে খুশি হয়ে মাস্টারমশাই তাঁকে ভাইদের সঙ্গে বসিয়ে যত্ন করে ইংরিজি, অঙ্ক, ইতিহাস, ভূগোল সব শিখিয়ে দিয়েছিলেন। প্রাইভেটে এনট্রান্স পাস করেছিলেন।

মাস্টারমশাই নিজের ছেলের সঙ্গে এই সাধারণ মেয়ের বিয়ে দিয়ে, কালে কালে তাঁকে প্রাইভেটে ইতিহাসে এম এ পাস করিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি হয়ে দাঁড়ালেন বাড়ির সব ছেলেমেয়েদের কট্টর প্রধানা শিক্ষিকা।

যা একবার চোখে দেখেন, বা কানে শোনেন তা জম্মে ভোলেন না। সে এক ভয়াবহ ব্যাপার। পড়াশুনোর ব্যাপারে কারও আপত্তির কারণ ছিল না, বরং সুবিধাই ছিল। মানচিত্র বা অভিধান খুলতে হত না। তিনিই মানচিত্র তিনিই অভিধান। মুশকিল হল সাংসারিক জীবনের। সামান্যতম ব্যাপারটুকু একবার চোখে দেখলে বা কানে শুনলেই হয়ে গেল। চিরকালের মতো রেকর্ড হয়ে থাকত। অপরাধীর পার পাবার জো ছিল না।

বিশ্বাস কর আর নাই কর, নেতাদের বড় বড় বক্তিমে একটিবার শুনলেই হল। কমা, সেমিকোলন, ভুলভালসুদ্ধ চিরকালের মতো সেজদিদিমার স্মৃতিপটে গাঁথা হয়ে থাকত। এসব নিজেদের চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। তবে ওঁদের ওই দত্তচৌধুরির বংশে ঘটনাগুলো প্রবাদবচনের মতো হয়ে আছে। তাঁর জ্বালায় আত্মীয়স্বজনদের গত পঞ্চাশ বছরের ভুলভালগুলো তাঁদের বংশধরদের অগোচর থাকত না। মাঝে মাঝে তাঁরা আপত্তি করতেন, বলতেন— ‘আমরা নিজেদের বংশধরদের অবজ্ঞার পাত্র হই, এই কি তোমার ইচ্ছে?’

কাষ্ঠ হেসে সেজদিদিমা বলতেন— ‘করবার সময় মনে ছিল না, সব কিছুর ফল ভোগ করতে হয়? ভুল বললে শুধরে দিস। মনে রাখিস ইংরিজিতে একটা প্রবচন আছে— দুটি জিনিস ফিরিয়ে আনা যায় না। ছোঁড়া তীর আর বলা কথা।’

এইভাবে বছরের পর বছর ধরে, তিন পুরুষের সদস্যদের তিনি হাতের মুঠোর মধ্যে পুরে রেখেছিলেন। তাঁর কর্তাটি পর্যন্ত তাঁর কথায় উঠতেন বসতেন। এ বিষয়ে তাঁর প্রাণের বন্ধুর কাছে মাঝে মাঝে আক্ষেপ করতেন। ‘আমার দোর্দণ্ড প্রতাপে কলেজের প্রিন্সিপাল থেকে বেয়ারা পর্যন্ত থরহরি কম্পমান আর নিজের গিন্নির কথায় কিনা ওঠ-বোস করি। ছিঃ!’ বন্ধু বললেন, ‘সব কথা কি আর ওঁর কানে যাওয়া সম্ভব— ওই দেখ কাণ্ড!’

ওই শেষের কথাটুকু বলার কারণ হল যে ওঁর পায়ের কাছে ওঁর পেয়ারের হলদে-কালো মেনি বিড়ালটা শুয়েছিল, সে হঠাৎ উঠে পড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সেজদাদু বললেন, ‘ওই দেখ! নিশ্চয় এইসব কথা লাগাতে গেছে!’ বন্ধু বললেন, ‘আমি বরং উঠি।’

সে যাই হোক। স্বীকার করতেই হবে সেজদিদিমণির অসাধারণ স্মৃতিশক্তির ও কর্তব্যনিষ্ঠার ফলে বাড়ির অবস্থার দিন দিন উন্নতি হতে থাকল এবং তিনি নিজেও ছদ্মনামে একটা বিখ্যাত দৈনিক কাগজের যুগ্ম-সম্পাদিকা হয়ে গত পঞ্চাশ বছরে ঘটা সব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারের ভিতরের কথা ছেপে দিতে লাগলেন। অবশ্য সব নাম পাল্টে। দেখতে দেখতে বাড়ির অবস্থা পাল্টে গেল। ছিল একটা শখের গেরস্থ বাড়ি। এখন হয়ে উঠল একটা সচ্ছল সংসার। তবে সুখ তার মধ্যিখান থেকে কোন সুযোগে সুড়সুড় করে পালিয়ে গেল!

এতই নিঃশব্দে পালিয়েছিল যে গোড়ায় কেউ কিছু টের পায়নি। তারপর একেবারে স্তম্ভিত! এমন সর্বনাশ কেউ কল্পনাও করতে পারেনি! ব্যাপারটা খুলেই বলি। বিশ্বাস কর আর নাই কর, রাতে বাড়িতে কোনও অবিমৃশ্যকারিতায়-ভরা দুঃসাহসিক চোর এসেছিল। হয়ত বা বিদেশি কেউ, যার কাছে সেজদিদিমার খ্যাতি অজ্ঞাত ছিল।

সে যাই হল, হয়ত বাড়ির সবাইকে ধুলোপড়া করে দিয়ে, কিংবা কোনও নিদমন্তর পড়ে বা শিকড়টিকড় পুড়িয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন করে থাকবে। তারপর সেই সুযোগে সেজদিদিমার পুরনো কাগজপত্রের ক্যাশবাক্সটি সরিয়ে, অবিকল সেই রকম আরেকটি ক্যাশবাক্স রেখে, সটকান দিয়েছিল। শেষরাতে ঘুম ভেঙে সেজদিদিমা তার পায়ের গোড়ালি আর দেওয়ালে ছায়া ছাড়া কিছু দেখতে পাননি।

সেই যথেষ্ট! ভয়-ডর বলে তাঁর কিছু ছিল না। উনি যেসব বিষয় লিখতেন, তার কটি নোট-পত্র ছাড়া মূল্যবান কিছু ছিলও না ওই ক্যাশবাক্সে। তাঁর আসল দলিলের ভাণ্ডার তো তাঁর মস্তিষ্কে। ক্যাশবাক্স যে নেবে সে কাঁচকলা পাবে। কিন্তু তার আস্পর্ধা দেখে তাঁর সর্বাঙ্গ রি-রি করে জ্বলে উঠল। তিনি দাদুর লাঠি-গাছি তুলে রে-রে-রে করে তার পাছু নিলেন। সামনের তিন-ধাপ সিঁড়ির কথা মনেই ছিল না। ধপাস করে পড়লেন। মেঝেতে মাথা ঠুকে তিনদিন অজ্ঞান অচৈতন্যি। চোর হাওয়া।

সেই তিনদিন সকলের উদ্বেগ-আতঙ্কের শেষ ছিল না। তবু অনেককাল বাদে বাড়িতে যে এরকম শান্তি বিরাজ করছিল, সেটাও মানতেই হবে। কিন্তু সে শান্তি বড় দুঃখের।

এক-দুই-তিন করে সাতদিন ওইভাবে কাটল। বাড়ি যেন বোবা। সেজদিদিমা একাই বাড়ি মাথায় করে রাখতেন, আর সকলে হয় চুপ করে থাকতেন, নয়ত ফিসফিস করে কথা বলতেন। হয়ত তার কারণ হল তার বেশি কিছু করবার সুযোগই পেতেন না। তাছাড়া তাঁর কোনও ব্যবস্থাপনায় আপত্তি করার কোনও সঙ্গত কারণ পাওয়া যেত না। প্রত্যেকটার ফল লাভজনক হত। সবাই তার যথেষ্ট ভাগ পেতেন। না চাইতেই পেতেন। কিছু বলার সাহস কারও হত না।

তবে একটা প্রাকৃতিক নিয়ম আছে যে আধারে যতখানি ধরে, তার বেশি ঠুসে দেবার চেষ্টা করলে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। তাই সেজদাদু তাঁর প্রাণের বন্ধু, পূর্বোক্ত বদ্যিনাথ সামন্তর বাড়ি রোজ বিকেলে একবার (স্বাস্থ্যের কারণে হাঁটতে যাবার অছিলায়) গিয়ে মনের কথা প্রাণের কথা উজাড় করে দিয়ে আসতেন। শুনে বদ্যিনাথ মহা রেগে যেতেন। বলতেন, ‘তুমি কি একটা মুগুর ভাঁজা, সাঁতারকাটা পুরুষমানুষ, নাকি একটি কিঞ্চিলিকা?’

শুনে আশ্চর্য হয়ে সেজদাদু বললেন, ‘কিঞ্চিলিকা আবার কি?’ পরম পণ্ডিতের বিদ্যের দৌড় দেখে কাষ্ঠ হেসে বদ্যিনাথ সামন্ত বললেন, ‘কিঞ্চিলিকা হল কেঁচো।’ খানিক ভেবে সেজদাদু বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি কিঞ্চিলিকা। তা ছাড়া উপায় নেই।’ রেগেমেগে সামন্ত বললেন, ‘আছে উপায়। সেটাকেই অবলম্বন করতে হবে। অত কথা কারও মনে থাকতে পারে না, মানে সেটা ফিজিকেলি ইমপসিবল। কোথাও নিশ্চয় নোট করা থাকে। ওঁর ডাইরি নেই?’

‘না, তা নেই। তবে একটা মান্ধাতার আমলের ক্যাশবাক্স আছে। খোপ খোপ করা। খরচের রেজকি পয়সাকড়ি, রসিদ ইত্যাদি রাখেন। ওপরের ট্রেটা তুলে তলায় অবিশ্যি গোপন কাগজপত্র থাকতেও পারে। তবে আমায় গিন্নি এত কথা বলেন যে গোপন কিছু থাকা সম্ভব মনে হয় না।’

সামন্ত বললেন, ‘ওই বাক্সটি হাতাতে হবে। তবেই ঠাকরুণ পোষ মানবেন। খুব মূল্যবান বাক্স নাকি?’

‘আরে না, না। তখন কি আর মূল্যবান কিছু কিনবার সামর্থ্য ছিল আমাদের? বিদ্যা নিয়েই ধুয়ে খেতাম। এখনকার সচ্ছলতার সবটুকুই আমার গিন্নির কৃতিত্ব!’

সামন্ত চটে গেলেন, ‘ওই দুর্বলতাটাই তোমার কেঁচোমির কারণ। সে যাক গে। তাহলে ওরকম আরেকটা ক্যাশবাক্স দুষ্প্রাপ্য নয়?’ ‘আরে না, না, বড়বাজারের যে কোনও দোকানে পাওয়া যায়। সেকেন্ডহ্যান্ডের জলের দর। তাছাড়া আমাদেরই টং-এর গুদোমঘরে ওর জোড়াটা আছে চাবিসুদ্ধ।’ ‘ব্যস, আর বলতে হবে না। আমাকে কিছু জিজ্ঞাসাও কর না। তুমি যা। অমনি নিজেই গিন্নির কানে তুলে দেবে। আজ মতলবটা পাকাই, কাল কার্যে পরিণত করা যাবে। তুমি নাক গলিও না।’

এ বিষয় আর কিছু উচ্চবাচ্যও করেননি সেজদাদু। আর দুদিন পরেই তো ওই কাণ্ড। ভয়ে সেজদাদুর হাত-পা হিম! তার ওপর সামন্তর টিকির দেখা নেই! তাঁর বাড়িতে দুঃসংবাদটি দিতে গিয়ে বড় নাতি মনু ফিরে এল। তিনি নাকি নিখোঁজ। বাড়িতে কান্নাকাটি পড়ে গেছে। চারদিকে চররা তাঁকে খুজে বেড়াচ্ছে। পুলিসে খবর দেওয়া হয়েছে। সেজদাদু একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন। গিন্নির ওই অবস্থা। বন্ধু নিখোঁজ। তাঁকে সাহায্য করতে গিয়েই বন্ধুর কি সর্বনাশ হল কে জানে। হই হট্টগোল শুনে সে রাতে ওই পলায়মান ছায়া সেজদাদুও দেখেছিলেন আর সে যে কার ছায়া, সেটুকু বুঝতে তাঁর এক দণ্ডও দেরি হয়নি। সমস্ত সর্বনাশের জন্য তিনি নিজেকে ছাড়া কাউকে দায়ী করতে পারছিলেন না।

এদিকে সেজদিদিমা তেমনি কাঠ হয়ে পড়ে আছেন। পাশে অবিনাশ ডাক্তারবাবু আর বড়কাকি ওষুধ, ব্র্যান্ডি ইত্যাদি নিয়ে দিনরাত ব্যস্ত। আত্মীয় বন্ধুদের সারাদিন আসা যাওয়া। এরই মধ্যে সপ্তম দিনে হঠাৎ চোখ খুলে, অপ্রসন্ন কণ্ঠে সেজদিদিমা বললেন, ‘কোথাকার না কোথাকার কে না কে মতলবি লোক রটাল বন্দুকের গুলিতে গরু শুয়োরের চর্বি দেয়। দাঁত দিয়ে খোলস ছাড়াবার সময় হিন্দু মুসলমান দুজনারই জাত যায়! আর বলা নেই কওয়া নেই অমনি সেপাইরা সব মার-মার কাট-কাট করে ক্ষেপে উঠল! শুরু হয়ে গেল সিপাহি বিদ্রোহ! কোয়ার্টারের জানলা দিয়ে তাই দেখে বেকুব বনে গেলাম।’

শ্রোতারা সব নিঃশ্বাস বন্ধ করে বলল,— ‘তারপর? তারপর?’

সেজদিদিমা বললেন, ‘তারপর আর কী? হিসেবরাখা কেরানিবাবুরা রাতারাতি সপরিবারে বারাকপুর থেকে সটাং কলকাতা! বলে বাঁচলে পরে অন্য কথা। সেই ইস্তক আমরা কলকাত্তাই বনে গেছি।’ এই বলে ফিক করে হেসে সেজদিদিমা আবার চোখ বুজলেন। বাড়ির সকলে তাজ্জব বনে গেল।

সেই হল শুরু। একটু একটু করে সেজদিদিমার পূর্বজন্মের কথা মনে পড়ে আর তার হুবহু বর্ণনা দেন। সাল, তারিখ, অকুস্থল-সহ। মহারানী ভিক্টোরিয়ার প্রতি ভারি ভক্তি দেখা গেল। তিনিই তো সব ভাল ভাল আইনকানুন বেঁধে দিয়ে, খুনেদের ছাড়া আর সবাইকে বেকসুর খালাস দিয়ে সব গোলমাল মিটিয়ে দিলেন। আজ পর্যন্ত তাঁর ওই ভাষণের ভিত্তিতে আইনকানুন চলছে। তার ওপর সামান্যই রদবদল হয়েছে। স্বয়ং যুবরাজ ভারতে এলেন, দিল্লিতে দরবার হল। সে এক দেখবার জিনিস। চোখের সামনে ভাসে। — এই বলেই আবার চোখ বন্ধ।

ডাক্তার বললেন— ‘কোনও চিন্তার কারণ নেই। শরীরে শক্তি ক্রমে ফিরে আসছে। এইরকম একটা বড় আঘাতের পর রোগীরা অনেক সময় কিছুদিন ভুল বকে। তারপর আবার প্রকৃতিস্থ হয়।’

আত্মীয়-বন্ধুরা শুনে ভারি বিরক্ত। ভুল বকা আবার কী? এ তো স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে সেজদিদিমার পূর্বজন্মের কথাও এতদিনে মনে পড়ছে। তা পড়বে না? কি প্রখর স্মৃতিশক্তি, সেটা ভুললে তো চলবে না।

এই আশ্চর্য ব্যাপার চারদিকে রটে যায়। চেনা-অচেনা লোকে শুনতে আসে। বলাবাহুল্য ডাক্তারবাবু দরজায় খিল দিতে বলেছেন। আরও বলেছেন, তেমন বুঝলে ডালকুত্তো এনে সদর দরজায় বেঁধে রাখবেন।

বাড়ির ছেলেমেয়েদের কিন্তু একটা মস্ত উপকার হল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ অর্ধেকের ভারতেতিহাস একেবারে নখাগ্রে এসে গেল।

গিন্নির শারীরিক উন্নতি দেখে সেজদাদু যেমনি খুশি, তাঁর মানসিক বিভ্রান্তির কারণে তেমনি চিন্তিত। হ্যাঁ, মানসিক বিভ্রান্তি ছাড়া আবার কি?

এই সময় দৈবাৎ বিধাতার ইচ্ছায় সমস্ত বিপদ কেটে গেল। ততদিনে দুই সপ্তাহ কেটে গেছে। সেজদিদিমা বালিশে ঠেস দিয়ে উঠে বসেছেন। নার্সকে নিষ্কর্মা বলে ভাগিয়েছেন। ডাক্তারকে বড় বড় কথা বলার জন্য তাড়া দিয়েছেন। ডাক্তারের মা তাঁর সই বলে ডাক্তারও কিছু মনে করেননি, বরং তেড়ে তর্ক করেছেন।

হেনকালে রোগা ফ্যাকাশে একটা বদ্যিনাথ সামন্ত সেজদিদিমার পেয়ারের পুতি বলাইকে ধরে এনে হাজির করলেন। বললেন, ‘বলাই, এবার সকলের সামনে বল কি নিয়ে তোরা এত আমোদ করছিলি।’

এই বলে অবিকল সেজদিদিমার বাক্সের মতো একখানি ক্যাশবাক্স, সেজদাদুর হাতে দিয়ে, হনহন করে চলে গেলেন। সেজদাদু বাক্স খুলে দেখেন ওপরের ট্রে-তে একটা সোনার মাদুলি আর তলার খোপে একটা পুরনো ডাইরি। তার ওপর সবুজ কালি দিয়ে কাঁচা হরফে এবং ভুল বানানে লেখা শ্রীমতী কৃষ্ণপ্রিয়া দাসীর দিনপঞ্জিকা ইতি। খাতাটা সত্যিই একটা ডাইরি বলে মনে হয়। সম্ভবত বহুকাল আগে সেজদিদিমা ঘর গুছোতে গিয়ে ওটিকে খুঁজে পান এবং মুগ্ধ হয়ে পড়েন। পরে পরিবারের মানুষ বাড়লে বাক্সটা যেমন ছিল সেই অবস্থাতেই টং-এ স্থান পেয়েছিল। এবং বাড়ির নাতি-পুতিরাও ওই টংটিতে নিরিবিলি আস্তানা পেয়ে, নিজেদের ঘাঁটি বানিয়েছিল। তারাই সম্ভবত হাবিজাবির সঙ্গে ওই ক্যাশবাক্স ঘেঁটে পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করে পড়ে খুব আমোদ পেয়েছিল। তারপর সেজদিদিমার মুখেও গড়গড়িয়ে ওইসব কথা শুনে, বোধহয় হকচকিয়ে গিয়ে আর কিছু বলেনি।

সামন্তদাদু চুপিসারে টং-এ উঠে ওই ক্যাশবাক্সের হদিশ পান। কিন্তু সরানো আর হয়ে ওঠেনি, স্বয়ং সেজদিদিমার বীরবিক্রমের কারণে। তাঁর পা মচকে, সর্বাঙ্গ ছড়ে গিয়ে, এক বন্ধুর বাড়িতে লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল। সেজদিদিমা আর তাঁর বংশধররা অন্য জাতের প্রাণী। ওরা সব পারে।

এর একটা ভাল ফল হল। সেজদিদিমার মাথার ঘোর কেটে গেল। তিনি প্রকৃতিস্থ হলেন। পাণ্ডুলিপিটার কথা তিনি কখনও ভাবেননি। তখন বয়সও কম ছিল, অভিজ্ঞতাও ছিল না। এখন যেন হাতে চাঁদ পেলেন। লেখার হাত ক্রমে ক্লান্ত হয়ে আসছিল। এবার ধারাবাহিকভাবে, হুবহু যেমন আছে, প্রতি শনিবার তেমনি ছেপে দেবেন। শ্রোতারা লুফে নেবে।

আহ্লাদে গদগদ হয়ে ডেকে বললেন, ‘কোথা গেলি বাবা বলাই, এই মাদুলিটা তোকে দিলাম। মায়ের কাছে রেখে দে।’ আহা, বংশধর বলে কথা। ডাক্তারকে বললেন, ‘খেঁদুবাবা, আজ বড় সুখের দিন। তুমি দুপুরে খেয়ে যাবে।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *