গজেন্দ্রকুমার মিত্র : ঐশ্বর্যের শক্তি
না, খুব দূরের কোনও জায়গা নয়— অতি সহজ, মানে যাওয়া আসার খুব সুবিধা— বলছি পুরীর কথা।
বহু লোক আসে— প্রতিদিনই। সমুদ্র এখানে দেখার মতো, স্নানের মতো এবং কখনও কখনও ডুবে মরবার মতোও।
খরচ কম, যাতায়াত বলতে এক রাত্রির যাওয়া ও আসা, অজস্র হোটেল, প্রতিদিনই বলতে গেলে একটা হোটেলের নতুন নতুন বিজ্ঞাপন দেখা যায়।
এমনিই এক হোটেলে তিন বন্ধু একদিন এসে নামল।
মাঝারি হোটেল, যারা এসেছে তারাও সেই স্তরের লোক। ভাল আপিসে চাকরি করে, কিন্তু বয়স বেশি নয়, সবই ত্রিশের গণ্ডি পার হওয়ার উজ্জ্বল আশ্বাস আছে, সেই জন্যেই বিয়ে করছে না, সে অবস্থায় এলে মেয়ে আরও ভালই পাবে, মানে উচ্চস্তরের মেলামেশা করা যাবে।
ছেলেগুলি সবাই ভদ্র। এদের সঙ্গে কলেজেরও আলাপ আছে। কলকাতায় দুজন নিজ নিজ বাড়িতে থাকে। এই নবেন্দু ছেলেটিই একটা ভাল মেসে থাকে। তবে সে ঠাঁই নেই বলে নয়— ওর বাবা-মা দুজনই গত হয়েছেন, দাদা আছেন আমেরিকায়, তবে ফিরে আসবে কিনা সন্দেহ। একা অত বড় বাড়িতে থাকবে কী করে? নবেন্দুর দিদি আছেন, তিনি কর্ণাটকে থাকেন। সে জামাইবাবুরও বিস্তর পয়সা, ওখানে তিন চারটে বাড়ি আছে। সব বুঝেই ভাড়া দিয়েছে, বন্দোবস্ত আছে ট্যাক্স ইত্যাদি ওদের দিতে হবে, নবেন্দুর যাতে না ঝামেলা হয়।
এরাই এসে মাসখানেক না হলেও বেশ কিছুদিন থাকবে— এই মনে করেই এসেছে।
এ হোটেলটাও ভাল পাওয়া গেছে। ব্যবহার ভাল। আহারাদিও বরং কিছু বেশি।
একটি লাউঞ্জ মতো আছে, ভাল ভাল বেতের চেয়ার, ফুলের টব ঘেরাও। বসে থেকেও আরাম লাগে।
নবেন্দুদের দিন তিনেক যেতে ওদের খেয়াল হল ব্যাপারটা। একটি প্রৌঢ় ভদ্রলোক আর একটি সুশ্রী যুবতীই বলা চলে— মনে হয় পিতা আর পুত্রী। এরা দুজনেই পাশে বা কাছাকাছি বসে থাকেন— কিন্তু কথা বলে খুব কম। মেয়েটি বসে যেন শুধুই সমুদ্র দেখে। বাবার মুখেও শান্তি বা আনন্দ নেই। মধ্যে মধ্যে বাবা কীসব বলেন? মেয়েটি বোধহয় উত্তরও দেয় না। মনে হয় বাবা চান সমুদ্রের কাছে ঘোরা বা অন্তত কাছে বালির ওপর কোথাও বসে থাকা। ভাবটা মনে হয় মেয়েটা তিতিবিরক্ত হয়ে হঠাৎই বেরিয়ে সেই সমুদ্রের বালির ওপর বসে পড়ে। কিন্তু ওই পর্যন্ত, বাবাকেও বসে থাকতে হয়, কথাবার্তা হয় না বলেই মনে হয়।
ব্যাপারটা নবেন্দুর চোখে পড়ল।
এ আবার কি? বেড়াতে এসে মন গোঁজ করে বসে থাকা!
ঝগড়া-ঝাঁটি? বাবা আর মেয়ে যদি হয় কতদিন বা ঝগড়া থাকবে।
না, নবেন্দুর মনে হল একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে।
পরের দিনই বলতে যাবে— হঠাৎ মনে পড়ে গেল, ওই মেয়েটি যে ওর চেনা!
আর এসব ক্ষেত্রে, দ্বিধা করার লোকও নবেন্দু নয়।
বাকি দুজন কিছু বলার আগে নবেন্দু একেবারে সামনে এসে বললে, ‘আরে, এ কি! আপনি! এখানে এসেছেন তা অমন চুপ করে বসে আছেন কেন? আমাকে চিনতে পারছেন না? আপনি বাংলায় থার্ড হয়েছিলেন, আমি কিন্তু হিস্ট্রির স্টুডেন্ট ছিলুম— কিন্তু দেখা হত প্রায়ই। আপনাদের ওখানেও আড্ডা দিতুম। আপনার সেই বন্ধু— তাকে নিয়ে—। আচ্ছা সেকথা থাক। চলুন চলুন— আজ আপনাকে নিয়ে যাবই।’ বলে বৃদ্ধের দিকে চেয়ে বললে, ‘আপনিও চলুন না, স্নান না করেন একটু দেখবেন বসে।’
এইবার সেই মেয়েটির টনক নড়ল যেন।
একটু বিব্রতও মনে করল।
তারপর সামলে নিয়ে বললে, ‘না, ওসব আমার ভাল লাগে না।’
এবার নবেন্দুও একটু বোধহয় চটে গেল। বললে, ‘হ্যাঁ, আমি জানি কেন আপনার ভাল লাগে না। সবই জানি— বা এখন মনে পড়ছে। ওই যে সলিল! দেখুন, সে পাপ যদি চলে গিয়ে থাকে তো ভালই। চলুন চলুন, আমি সহজে ছাড়ব না। এখানে এসেছেন— ওসব সেই গোঁজ হয়ে বসবেন কেন। আমি তো আপনার বন্ধুই বলতে গেলে, চলুন বন্ধু।’
একটু বিব্রত হয়েই বাবার মুখের দিকে চাইল।
বাবা— পরে শুনেছিল নবেন্দু, প্রদোষ ব্যানার্জি— তিনিও বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ— চল না মা। তুই যেতে চাস না বলেই আমি যেতে পারি না।’
কাছে গিয়ে দাঁড়াতে ভালই লাগল। একটু অন্যমনস্ক হতেই যেন একটা ভাঙা ঢেউ কাপড় ভিজিয়ে দিয়ে গেল।
‘এই তো, বেশ হয়েছে, জল যখন ভিজিয়ে দিয়েছে— আপনি আর দ্বিধা করবেন না। চলুন চলুন, একটু নাবুন—’
‘আমার ভয় করে।’ বলে ফেলল অরুণা।
‘কিছু না, কিছু না। আমরা তিনজন তো, ঘিরে থাকব— আপনি নিশ্চিন্ত হয়ে চান করুন। তারপর প্রদোষবাবুকেও বলল, ‘আসুন না, আমরা তো আছি।’
বোধহয় মনে হল, এরা যদি মেয়েকে একটু সান্ত্বনা দেয় তো বেঁচে যাই, ওদের দলে থাকাই উচিত।
তিনি কোনওমতে হাঁটু পর্যন্ত ভিজিয়ে জল না হোক বালি খেতে লাগলেন।
স্নান করে ফিরতে দেরি হল। বালি তেতেছে, অরুণা একটু ভুরু কোঁচকালো, চটিটা আনা হয়নি, এই বালি তাতিয়ে যাওয়া—
যেন নিমেষে নবেন্দু বললে, ‘চলুন, আমি আপনার আগে আগে যাচ্ছি— আমি দেখুন কেমন বালি কাটিয়ে কাটিয়ে যাচ্ছি, আপনার পা সেখানে পড়বে অত আর তাত লাগবে না।’
এর ওপর কথা চলে না।
যখন হোটেলে এসে পৌঁছল— প্রদোষবাবু আড়ে দেখলেন, মেঘ অন্তত ঈষৎ কেটেছে।
বিকেলে চা ইত্যাদি খাওয়ার পর পাছে টেনে নিয়ে যায় বলে অরুণা আর বেরোতে চাইল না। কিন্তু একটু পরেই তিন বন্ধু একেবারে এ ঘরে দরজার কাছে এসে হাঁক দিল, ‘ওকি, এখনও বেরোননি? চলুন চলুন, একটু বেড়িয়ে আসবেন। ওই দিকটায় যাব, কখনও দেখিনি— গভর্নরের প্রাসাদ পর্যন্ত দেখা আছে, শুনেছি ঝাউবন পেরিয়ে ওদিকে নুলিয়ারা ওখানে থাকে অনেকে— কিন্তু এখন তারা জলে নাবে না, আমরা নিশ্চিন্ত হয়ে যেতে পারব!’
তিনজনে একসঙ্গে এসে ঘিরে দাঁড়ালে বিব্রত হতে হয় বৈকি।
প্রদোষবাবুও যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন, ‘হ্যাঁ মা চল না, এ কদিন কিছু দেখা বা ঘোরাও তো হল না।’
এইবার যেন মেঘ কাটল।
একটু একটু করে যেন অরুণোদয় হচ্ছে।
কথাবার্তা বেশ চালাচ্ছে— অবশ্য একটু একটু করেই।
নবেন্দুও তাড়া দিতে চায় না।
একদিন জোর করেই মন্দিরে নিয়ে গেল। তারপর এখানে যা যা দ্রষ্টব্য— নিয়ে যায় দেখাবার জন্য। প্রদোষবাবুকে সঙ্গে নেয়। আরও যেন একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। তিনিই বেশি উৎসাহ দেন।
এখানে ওদিকে সকলেই যাচ্ছে এক একদিন করে বেরোচ্ছে, কোণারক, ভুবনেশ্বর, যাবার জন্যে। প্রদোষবাবু বললেন, ‘যাবে নাকি— তোমরা?’
‘না, কাকাবাবু ওইভাবে যাব না। ওতে ভাল করে দেখাও হয় না, আর সেই সাতটা থেকে বেরিয়ে রাত দশটায় আসা— ও আপনারা পারবেন না। আমি একটা গাড়ি ঠিক করেছি, আমরা তিনজন— আপনারা— ঠিক হয়ে যাবে। আমরা একটু শান্তিতে থাকতে পারব।’
শতদল যেন পাপড়ি মেলল।
অরুণার কথাবার্তা সাধারণ হয়ে উঠল। হাসিঠাট্টাও করে, যেন এখন কোথাও যাবার থাকলে উৎসাহ দেয় বেশ।
কিন্তু তিনজনের চাকরি বুঝি যাবে এবার। দুই বন্ধু বলে, ‘কিরে, আমাদের চাকরি চলে যাবে যে। বেশি হয়ে যাচ্ছে।’
নবেন্দুরও মনে পড়ে যেন এবার।
‘হ্যাঁ, অন্যায় হয়ে যাচ্ছে বটে। চাকরি থাকবে, তবে একটু দাগ পড়বে। …কী জানিস, মেয়েটা তোরা দেখছিস, সত্যিই সুন্দরী না হলেও, মনে গেঁথে যাবার মতো। ওটা কি জানিস— সেই যে বলে না— হায় মিষ্টি পাকা আম দাঁড়কাকে খায় এ তাই। ওই ছোঁড়াটা— আমাদেরই দেখলেও যেন বিষ হয়ে উঠত, কী করে যে ওর প্রেম হল কে জানে? রোগা, কালো, লম্বা ধনুকের মতো চেহারা। দিনরাত সিগারেট খায়— দুই আঙুলে বিশ্রী দাগ হয়ে গেছে। লেখাপড়া? তিন তিনবার ফেল করল। ওর প্রেমে পড়ল— একটু যেন অ্যাবসার্ড বলে না। কিন্তু আমাদের বিশী স্যার বলতেন প্রায়ই, ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে ছেলেমেয়েগুলো ওই হ্যারিসন রোডের মোড়ের মধ্যে এসে দাঁড়ায় তো দেখি— ভাল মেয়েগুলোকে এই অখাদ্য ছোঁড়ার প্রেমে পড়ে হামেশা দেখি তো। আর ভাল ছেলেগুলোর কপালে নচ্ছার মেয়েগুলো আসে।
এই ঘটনার পর আকর্ষণ তো থেকে যাবেই।
তবে নবেন্দু ওকে যে প্রায় আত্মসাৎ করেছে সেটা বাকি দুই বন্ধু বুঝে নিয়েছে। তাতে ওরা খুব ঈর্ষাও বোধ করে না। বাকি দুজনের ঘরবাড়ি আছে। তাঁরা কে কেমন নেবে তা বলা যায় না— নবেন্দু তো একাই।
নবেন্দু প্রদোষবাবুর কাছ থেকে এবার সব ঘটনাই জেনেছে। ওই ছোঁড়া, মদ খায় তাও জানা হয়ে গেছে। প্রদোষবাবুর একটিমাত্র সন্তান। স্ত্রী মারা গেছেন— এই সবেধন নীলমণি— তাকে উনি কোনওমতেই ওর হাতে মেয়েকে দিতে দেবেন না, ওই নচ্ছারের হাতে। শেষ পর্যন্ত ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে বিদায় দিলেন, বন্দোবস্ত হল কলকাতায় ওই রবীন আর আসবে না, অন্তত দশ বছর আসবে না। সেইরকম লেখাপড়া হয়েছে।
প্রদোষবাবু এবার নবেন্দুকে একেবারে নিজের ছেলের মতো দেখছেন, অরুণাও ক্রমশ যেন উদগ্রীব হয়ে থাকে— কখন নবেন্দু আসবে।
এরপর যা হওয়া উচিত তাই হল।
নবেন্দু একটা ছোট ফ্ল্যাট কিনে নিল, আসবাব ইত্যাদিও। অরুণা বলেছিল, ‘আসবাব আমাদের বাড়িতে যথেষ্ট— কেন অত খরচ করছ?’
‘না, না, কবে কোন দিন খোঁটা দেবে। এ আর কত, তা নিয়ে মাথা ঘামিও না।’
বিবাহও হল, বন্ধুরা কেউ ঈর্ষিত হল, কেউ বা খুশি।
একটি ‘কাজের লোক’কেও প্রদোষবাবু এনে দিলেন। একটা ভাল সংসারের যা কিছু থাকা উচিত তা সব খুঁটিয়ে দিলেন।
এবার প্রদোষবাবু আশা করেছিলেন— একটি সন্তান এ সংসার পূর্ণ করে দেবে। নবেন্দুরও যে সে আশা ছিল না তা নয়। কিন্তু অরুণা তাতে বাদ সাধল। বললে, ‘না বাপু, দু-তিনটা বছর যেতে দাও, এরই মধ্যে ন্যাঞ্জারী হতে রাজি নই।’
আর কিছুদিন পরে এখনকার ভাষায় বলে ‘বোর’ তা কিন্তু হচ্ছে। তবে সংসার পূর্ণ হতে দিল না, নিজেই একটা চাকরি জুটিয়ে নিল— একটা ভাল চাকরি।
‘হ্যাঁ রে, কী দরকার। না না ও করিস না।’
অনেক বাধা দিলেন বাবা।
কিন্তু অরুণা চিরদিনই জেদি, বোধহয় এক সন্তান বলেই— বাবাকে স্বামীকেও বোঝাল, এ কি আর চিরকাল করব! ঠিক সময়ে দেখো সংসারের কোনও অসুবিধে হবে না।’
তবে এখানে একটা সংসার চালানো দরকার।
এমনি ঠিকে লোক— সে কী করবে কে জানে।
প্রদোষবাবুই খুঁজেপেতে একটি মেয়েকে নিয়ে এলেন— জানাশুনো মেদিনীপুরে বাড়ি, ওদের সবাইকেই চেনেন, ষোলো সতেরো বছর বয়স, ঠান্ডা শান্ত মেয়েটা। রঙ ময়লা, তবে মুখ চোখ ভাল। কথা কম বলে, তবে হাসতে পারে। নামটা ‘অন্নপূর্ণা’— প্রদোষবাবু বললেন ওকে বরং ‘খুদু’ বলো।
ঠিক কি করতে হবে সেটা এরা বুঝিয়ে দিলে— আর কোনও অসুবিধে রইল না। রান্নাও কিছুটা জানে, তবে ওকে বোঝালেন প্রদোষবাবু। ধারাটা বুঝলে সেদিকেও কোনও উদ্বেগ রইল না।
সুখে-শান্তিতে জীবন-তরী ভেসে যাবার কথা। তা হল না।
অরুণা ও প্রদোষবাবুর শনি এসে হাজির হল।
দলিল ইত্যাদি যে কাগজপত্র হয়েছিল— তা অরুণা আগে জানত না। পরে জেনেছে।
প্রদোষবাবু ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। পুলিস, মকদ্দমা— এসব করা মানে আরও ইতরতা করা। প্রদোষবাবু এবারেও টাকা দিয়ে সরিয়ে দিতে চাইলেন।
বোঝা উচিত ছিল প্রদোষবাবুর— এ লোক কিছুই মানবে না। শুধু শুধু টাকা খরচ করা।
টাকাটা হস্তগত হল— কিন্তু সেই আরও কদর্য— কুৎসিত ব্যাপার হল। ইতিমধ্যে যে সেই প্রেম— যা লোককে বললে বুঝবে না— ‘এ কেমন প্রেম— যাই আসি’ বলতে বলতে এক সময় সেই প্রেমাস্পদের সঙ্গেই অরুণাও চলে গেল।
হাহাকার করলেন প্রদোষবাবু।
কাঠ হয়ে গেল নবেন্দু। শুধু বললে, ‘আপনি বারবার ঘুষ দিতে গেলেন কেন? সব কিছু টাকায় ভাল হয়ে যায় না।’
কিছুদিনে যেন সামলে নিলেন প্রদোষবাবু। তারপর বললেন, ‘তুমি এমনভাবে থাকবে কেন, তুমি আর একটা বিয়ে করো।’
খুব যেন কঠোর কণ্ঠে নবেন্দু বলল, ‘না, আর বিয়েতে আমার রুচি নেই, তাছাড়া আপনি জানেন না, আমাদের রেজিস্ট্রি করে বিয়ে হয়েছিল। তাকে আপনি পাবেন কোথায়? না, ও অভিনয়ে আর দরকার নেই।’
প্রথমটা বড় শূন্য বোধ হল। বন্ধু আত্মীয় সবাই শুনল— সেইটেই বড় কথা। কোথাও দূরে যেতে পারলে ভাল হত।
কিন্তু এ ‘দাগ’ কি মুছে যাবে!
থাক, সহ্য করাই ভাল। আপনিই এ জ্বালা জুড়িয়ে যাবে।
এতদিন অন্নপূর্ণার দিকে ভাল করে তাকায়নি নবেন্দু।
তবে এটা দেখেছে বৈকি— সেবা করতে পারে— অস্খলিত সেবা। সংসারটা মাথায় করে রেখেছে।
এখন দেখছে।
সেবা বলে শুধু নয়— খুদু যে ওকে দেবতা বলে মনে করে সেটা বুঝল।
কখনও কখনও হঠাৎ ওর দিকে চাইলে দেখে— তার দিকেই চেয়ে আছে।
আরও দেখে, কখন কি দরকার তা যেন সমস্ত আগে থেকেই ঠিক করে রাখে। আরও দেখে একদিন, নবেন্দুর জুতো পর্যন্ত পালিশ করতে শিখেছে।
যেদিন ওদিকে চেয়ে দেখল নবেন্দুর জুতোটাকে গাল দিয়ে চেপে বসে আছে তখন ওকে টেনে পাশে নিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল।
তাতেও বাধা দিল না খুদু। লজ্জা প্রকাশ করল না, একেবারে যেন সম্পূর্ণভাবে নিজেকে বিলিয়ে দিল। বিয়ের কথা তুলল না, কী হবে ভবিষ্যতে তাও বোধহয় ভাবল না।
এতটা যে ভালবাসা, নবেন্দু বোঝেনি, দেখেওনি বোধহয়।
আজ বুঝল, অরুণার প্রেম নিয়েই যথেষ্ট ভেবেছিল— আসল প্রেম বা ভালবাসা এই প্রথম বুঝল।
কাউকে কিছু বলল না। নবেন্দুর ফ্ল্যাট ওপরে— কী হচ্ছে তাতে কৌতূহল থাকলেও সবটা বুঝতে পারেনি। যাওয়া আসা খুদুর ঠিক দাসীর মতোই থাকে। যখন নবেন্দু ডাকে বা টেনে আনে ঠিক সেইভাবেই যেন সমস্তটা মিশিয়ে দেয়, বোধহয় কৃতার্থ ভাবে।
নবেন্দু এই জীবন কাউকে বুঝতে দেয়নি। প্রয়োজনও হয়নি। হঠাৎ কেউ এলে বন্ধুবান্ধব দাসী বলেই জানে, সেইভাবেই দেখে।
আর সমস্তটাই সে দাসী বলেই মনে করে, বোধহয় ভাবে এইটেই তো প্রাপ্য তার। মালিকের সেবা করবে, যদি বলে চলে যাও— ওকে যেতেই হবে।
এইভাবেই চলছিল, সেইভাবেই রেখেছিল। তবে ক্রমশ আর সেভাবে চলতে পারল না।
যত দেখছে ততই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে।
এখন এই চিন্তাই ওর বেশি— সেই রেজিস্ট্রিটা কী করে নাকচ করা যায়। তা নিয়ে বেশি তোলপাড় করার ইচ্ছা নয়। একটু ভেবে চিন্তা করে এক ভাল উকিলকে ধরাই ঠিক করল।
খুদুকে সে গৃহিণীর পদবি দেবেই। যা পেয়েছে তার কিছুমাত্রও যদি ঋণ না শোধ করে তাহলে তাকে নিজেই নিমকহারাম ভাববে। লেখাপড়া করেছে, ভেবেছে— সাধারণভাবে একদিন ফেলে চলে যাবে না।
গোপনে নিজে নিজে অ্যাটর্নি বা উকিল খুঁজতে চেষ্টা করতে থাকে।
কে জানে, মনে হয় সন্তানও আসতে পারে।
যে প্রেমাস্পদকে অরুণা প্রেমিক বলে ভেবেছিল— সেটা টাকা পেয়ে ফেলে চলে যাওয়াতেও চৈতন্য আসেনি।
এবার বুঝল। প্রেম তো নয়ই। সে প্রেমের যোগ্য ধারণাও তার নেই। মানুষও নয়— এমনকী কোনও জন্তুরও যোগ্য নয়।
অবস্থা যখন প্রায় চরমে পৌঁছল তখন আর থাকতে পারল না, বাবার কাছেই চিঠি পাঠাল।
অবস্থা যে এইরকমই হবে তা প্রদোষবাবু জানতেন— শুধু ঠিকানাটা পাননি, এবার আর দ্বিধা করলেন না, আবারও গিয়ে, শেষপর্যন্ত আবারও বেশ কিছু টাকা দিয়ে মেয়েকে নিয়ে আসতে হল।
অরুণা কিছুই করল না। কাউকে কিছুই বলল না। শুধু ঘরে বসে কাঁদতে লাগল।
বাবাকে বলেছিল, ‘কাউকে এখানে আসতে দিও না, আমি আর কাউকে মুখ দেখাতে চাই না। তোমার জন্যেই আমি আছি, এর পরেও তুমি হয়ত আমার জন্যে আকুল হবে তবে আমি সত্যিই বলছি— আমার আর বাঁচবারও ইচ্ছা নেই, মুখ দেখানোরও না। আমি জেনেছি— আমার মতো পশু কেউ নেই। বোধহয় পশুর চেয়েও বড়।
প্রদোষবাবুর এই একটিই সন্তান। তিনি এর মধ্যে অনেক টাকা করেছিলেন ব্যবসায়। স্ত্রীর মৃত্যুর পর এই মেয়ে নিয়েই আছেন। মেয়েই ধ্যানজ্ঞান। সুতরাং আবারও টাকা দিয়ে কিছু করা যায় কিনা সেই চেষ্টা করতে চাইলেন।
সেটা নবেন্দুর জানার কথা নয়। সে যেমন থাকে তেমনিই আছে। খুদু ছাড়া একমুহূর্ত থাকতে চায় না এখন, বিকেলে ছটার মধ্যে এসে যে ঘরে ঢোকে আর কোথাও যায় না। আসবার সময় একেবারে বাজার করে আনে, খুদুর জন্যে খাবার মিষ্টি নিয়ে আসে, এক আধদিন ফুল নিয়ে আসে। তারপর ওই দুটি প্রাণী নিজেদের নিয়ে শুধু থাকে— পৃথিবীর আর কিছুই তাদের মনে পড়ে না।
এর মধ্যেই একদিন বাজার করে এসে যখন কড়া নাড়তে গেল— দেখল খোলাই আছে। বাড়িতে আলো জ্বলেনি— দরজাটা ভেজানো ছিল। বোধহয় হাওয়ায় খুলে গেছে।
পাগলের মতো ডাকতে লাগল নবেন্দু, ‘খুদু খুদু, কোথায় গেলে। অ খুদু!’
অন্ধকার হয়ে আছে— এবার আলো জ্বালল। দেখল ঘটনা।
শোবার ঘরের ওপর একরাশ টাকা পড়ে আছে। কাঁচা টাকা— অনেক, অনেক। তারপরই চিঠিটা দেখতে পেল।
একটা চিঠি আছে, আর কিছু না পেয়ে একটা বড় তালা দিয়ে চাপা দিয়েছে।
খুদুকে পড়া ও লেখার ব্যবস্থা করেছিল— অরুণার সময় থেকেই। ভাল না লিখতে পারলেও চলনসই করে নিয়েছে।
সেই লেখা পড়া যায় এখন, অসুবিধা হয় না।
খুদু লিখেছে, ‘বৌদিদি এখানে এসেছেন, বাপের বাড়িতেই আছেন। তোমার জন্যে খুব কাঁদেন সবসময়। তুমি ওঁকে শান্তি দিও, শান্তি দিতে পারবে। মেসোমশাইও খুব কাঁদেন, তাঁর ওই একটি মেয়ে। আমি স্বীকার পেয়েছি, আমি চলে যাব। তিনি তখনই ত্রিশ হাজার টাকা আমার হাতে দিয়ে— হাত ধরেই বললেন, তুই মা যখন যা বলবি, যখন দরকার হবে আমাকে চিঠি লিখবি, তোর কোনও অসুবিধা হবে না। তা অত টাকা আমি কি করব, তুমিই রেখো। আমাকে অন্যকিছু ভেবো না— দিদিও তোমাকে ভালবাসেন, তুমিও বাসতে। তোমরা ভালভাবে থেকো। তুমি এবার শান্তি পাবে।’
চিঠিটা বুঝতে দেরি হল।
এমন বোঝেনি, কখনও ভাবেওনি।
এ কী হল। কী করলে খুদু, তুমি যে আমার প্রাণ। আর মনে হচ্ছে তোমার পেটে আমার সন্তান যে!
এত কাল পরে এই প্রথম নবেন্দু প্রায় হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল।
না, আজকের রাতও কাটাতে চায় না। সময় নেই, সময় নেই। খুদুকে চাই যে!
মুখে একটুও জল দিল না। উদভ্রান্তের মতো চলল শ্বশুরের কাছেই।
যেন হিংস্র পশুর মতোই এসে দাঁড়াল নবেন্দু।
সেই টাকার তোড়া ভাল করে সাজিয়ে তুলতে পারেনি, একটা বড় রুমালে করে নিয়ে— এসেছে পুঁটুলির মতো।
সেই টাকাগুলো একেবারে শ্বশুরের গায়ের ওপর মুখের ওপর যেন ছুঁড়ে মারল। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
ঈষৎ বিহ্বলতা কাটাতে যাবে— সে সময় দিল না নবেন্দু।
‘আপনি অনেক টাকা করেছেন না? অনেক টাকা। তাই ভেবেছেন পৃথিবীতে টাকায় সব কিছু করা যায়। মেয়ে পশুর ওপর পড়েছিল, তাদের টাকা খাইয়ে বারবার মেয়েকে উদ্ধার করেছেন। বারবার। এখন এই অবোধ মেয়েটাকেও টাকা দিয়ে কিনতে চেয়েছিলেন। ছিঃ। সে লোক সে মেয়ে নয়, তাই ওই টাকা আপনার মুখে ছুঁড়ে দিয়ে গেল। সে অনেক, অনেক বড় আপনাদের মধ্যে। টাকাতে সব হয় না, এবার সেইটে ভাবতে চেষ্টা করুন। আমি চললুম।’
খুব আকুল হয়ে কি বলতে গেলেন প্রদোষবাবু, বাধা দিয়ে বলল নবেন্দু, ‘না আমার আর সময় নেই। এখন আমার ধ্যানজ্ঞান শুধু রইল খুদুকে খুঁজে বার করা। যেমন করে হোক তাকে চাই। আর দাঁড়াতে পারব না।’
বলতে বলতে পাগলের মতোই ছুটে বেরিয়ে গেল।
