বরেন গঙ্গোপাধ্যায় : গুপ্তধন
রেল ইয়ার্ডের পাশে ইন্দির ওকে টানতে টানতে নিয়ে এল। জায়গাটা এমনিতেই নির্জন, তা এখন তো সন্ধ্যা উতরে গেছে। এখন কেউ ভুলেও এদিকে পা দেয় না।
কুতকুতে চোখে চারপাশ একবার তাকিয়ে দেখে নিল টিটো। একদিকে টিনের বেড়া, অন্যদিকে কয়েক থাক ভাঙা রাবিশের স্তূপ, কিছু বনতুলসী আর বুনো কচুর ঝোপ। বিকেলের দিকে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। পায়ের নিচে তাই কাদা কাদা ঠেকছে। তাছাড়া পেট-গুলোনো কেমন একটা গন্ধ ভেসে আসছে মাঝে মাঝে। কিন্তু ও সব তখন বড় কথা নয়, কাদা বা গন্ধ টিটো গ্রাহ্য করে না। ওর সারা গা জুড়ে তখন কেমন একটা ভিন্ন ধরনের চাপা উত্তেজনা গড়াতে শুরু করেছে। বুকের ভেতর যেন দক্ষযজ্ঞ চলছে। একটু কান পেতে থাকলেই যেন শোনা যেতে পারে ঢিবঢিব করছে বুকটা। কিন্তু ইন্দিরের সে দিকে কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। সাঁড়াশির মতো কেবল ওর হাতের কবজিটাকে ধরে রেখেছে ইন্দির। আর টানতে টানতে ওকে আরও অন্ধকারের ভিতর সেঁধিয়ে নিয়ে চলেছে।
আরও খানিকটা এগোতেই টিটো ফিস ফিস করে বলল, কেউ দেখে ফেললে কিন্তু চোর ছ্যাঁচড় ভাববে রে ইন্দির, সেটা কি ভাল হবে?
ইন্দির তখনও ওর হাত ছাড়েনি। বিচ্ছুটাকে ওর বিশ্বাস নেই, হাত আলগা পেলেই ছুটে পালাতে পারে। সাহস দেবার জন্য বলল, এদিকে কেউ এলে তো দেখবে। আর একটু ওপাশে চল টিটো, জিনিসটা একবার একটু দেখেই তোকে ছেড়ে দেব।
টিটোর ডান হাতে রয়েছে একটা কাগজের মোড়ক। কি রয়েছে তাতে কে জানে। তবে যাই থাক, টাকা-পয়সা যে নয়, তাতে সন্দেহ নেই। টাকা-পয়সা কেউ অমনভাবে কাগজে জড়িয়ে নিয়ে যায় না। তাহলে কি থাকতে পারে, সোনা-গয়না? ধুস, সোনাই যদি হবে তাহলে অমনভাবে কেউ ওটাকে সিটের পাশে ফেলে রেখে নেমে যায় না। টাকা-পয়সা বা সোনা-গয়না নাই থাক, কিছু একটা যে আছেই তাতে সন্দেহ নেই। টিটো খুব সতর্কভাবে ওটাকে আগলে রেখেছে।
ইন্দিরেরও নজর সেই মোড়কটারই দিকে। নইলে কোথায় ওর লিলুয়ায় নামার কথা, ও নেমে পড়ল টিটোর পেছন পেছন।
ঘটনাটা ঘটেছে খানিকক্ষণ আগে। দুজনেই ওরা ডানকুনি লোকালে বাড়ি ফিরছিল। দুজনেরই লিলুয়ায় নামার কথা, কিন্তু মাঝপথে একটা মজার ঘটনা ঘটল। ওদের কামরাটা ছিল ফাঁকা ফাঁকা। স্টেশনে ঢুকবার মুখে গাড়িটা একটু দাঁড়াতেই, দুজন লোক তড়িঘড়ি ট্রেন থেকে নেমে চোখের নিমেষে কোথায় মিলিয়ে গেল। নামতেই পারে, কত লোকই তো ওরকম নেমে যায়। কিন্তু টিটোর চোখে পড়ল একটা কাগজের মোড়ক। লোক দুটোই হয়ত ভুলে ওটা ফেলে গেল। কি ভুলো মন রে বাবা! টিটো এগিয়ে এসে সুট করে মোড়কটা তুলে ধরল। কিন্তু খুলতে সাহস হল না। এদিক ওদিক তাকাল, তারপর কামরা পাল্টাবার জন্য গেটের কাছে আসতেই ইন্দির এসে খপ করে ওর হাত ধরল, কি রে?
টিটো বলল, কিছু না।
ইন্দিরের যা স্বভাব, হইচই বাধিয়ে দিতে পারে। টিটো ফিসফিস করে বলল, চেঁচাস না। ভাল হবে না।
– ঠিক আছে, চল নামি তাহলে।
টিটো বুঝল ও ধরা পড়ে গেছে। এ সময় চেঁচামেচি করলে বলাই, বিষ্টুরাও ছুটে আসতে পারে। আর তাহলে সবাই মিলে দেখতে চাইবে জিনিসটা। যদি কিছু দামি মাল থাকে, চোর ঠাওরাতেই পারে ওকেই। কেউ বিশ্বাস করবে না, মালটা ওর কুড়িয়ে পাওয়া। ফলে ইন্দিরের কথায় ও নেমে পড়ল গাড়ি থেকে।
নেমে পড়তেই ইন্দির ওর কবজি ধরল, আয় এদিকে আয়।
কোথায়?
আয় না। আমি একটা মেয়ে বই তো নই। আমাকে অত ভয় পাওয়ার কি আছে, এ্যাঁ?
ভয় ঠিক নয়। টিটো এই তেরো-চোদ্দো বছরের খেঁকুড়ে মেয়েটাকে কোনও দিনই বিশ্বাস করে না। ভুলিয়ে ভালিয়ে ও জিনিসটাকে যে হাতাবার তাল কষছে তাতে সন্দেহ নেই। তবু টিটো এক মুহূর্ত কি ভাবল, তারপর রাজি হয়ে গেল। মনে মনে ঠিক করে নিল, তেমন অবস্থা বুঝলে ও ধানখেতের মধ্যে দিয়েই দৌড় লাগাবে। ইন্দির তো দূরের কথা, অনেক বড়রাই ওর সঙ্গে দৌড়ে পারে না।
ইন্দিরের সঙ্গে গায় গায় সেঁটে ও এগিয়ে চলল। কিন্তু ততক্ষণে বেশ অন্ধকার নেমে এসেছে। রেল ইয়ার্ডের পাশটায় আরও অন্ধকার। সামনেই একটা আদ্যিকালের তেঁতুল গাছ। সন্ধ্যা হলেই এসব গাছে হাজার হাজার পাখি এসে ভিড় জমায়। পাখিগুলো এখন ডালে পাতায় কোথায় কোথায় লুকিয়ে পড়েছে, কে জানে!
টিটো গাছটার দিকে বেশিক্ষণ তাকাল না। তবু ভাল ইন্দির এখন ওর পাশে আছে। নইলে একা একা ও এই ভুতুড়ে গাছটার দিকে এগোতেই পারত না। অনেক সময় মানুষের আত্মাও যে ওইরকম পাখির বেশ ধরে গাছের ডালে বসে থাকে না, কে বলতে পারে। কোনটা আসল পাখি আর কোনটা প্রেতাত্মা, টিটোর পক্ষে তা বিচার করা সম্ভব নয়।
আরও খানিকটা এগিয়ে একেবারে তেঁতুল গাছের গোড়ায় এসে ইন্দির বলল, বোস এখানে! এই অন্ধকারে এদিকে কেউ আসবে না! একটু শান্ত হয়ে এবার বোস তো!
টিটোর কেমন ভয় ভয় লাগছিল। উপায় না দেখে ও ইন্দিরের গা ঘেঁষে বসে পড়ল। হাঁটুতে হাঁটু ছুঁইয়ে রাখল ও। মাথা ঘোরাতেই ইন্দিরের গায়ের গন্ধটা ও টের পেল। ঘেঁটু ফুলের মতো ভেজা ভেজা কেমন যেন একটা গন্ধ আছে ওর গায়ে। গন্ধটা ওর স্নায়ুর ভেতর ঢুকে কেমন যেন গেঁথে যেতে লাগল।
ইন্দির বলল, দে এবার। জিনিসটা দেখি।
টিটো এরকমই একটা ভয় পাচ্ছিল। গা ঝাড়া দিয়ে উঠল, ওটা আমার।
আমার তো কি হয়েছে। দেখলে ক্ষয়ে যাবে নাকি! দে না!
টিটো এবার একটু সরে বসার চেষ্টা করে। কিন্তু গাছটার দিকে চোখ পড়তেই আবার চমকে ওঠে। এদিককার ডালটা কি আগে থেকেই এত ঝোলানো ছিল। নাকি টিটো একটু সরার চেষ্টা করতেই ওটা অমন ঝুলে পড়ল। ও বলেই ফেলল, আমার ভয় করছে।
ইন্দির ওর দিকে তাকিয়েই ছিল, বলল, তুই চুরি করেছিস না ডাকাতি করেছিস যে ভয় করবে।
— ও কথা না। টিটো আঙুল তুলে তেঁতুল গাছের ঝোলানো ডালটার দিকে ইঙ্গিত করল।
কি আছে গাছে? কেমন কৌতুকে তাকায় ইন্দির।
টিটো ঠিক বুঝিয়ে উঠতে পারল না, এই রাত্রিবেলায় ওখানে কি থাকতে পারে। আবার ও খানিকটা সরে ইন্দিরের গায় গায় সেঁটে বসল।
আর সেই সুযোগে ইন্দির ওকে বুকের কাছাকাছি টেনে নিল।
ইন্দিরের গাটা কেমন কুকুরের পেটের মতো গরম। এক চাপ নরম মাংসও যেন চেপে বসেছে ওর গায়ে। টিটোর সারা গায়ে কেমন ঝিমঝিম করা ভাল লাগার একটা স্রোত বইতে শুরু করল। বোবা হয়ে গেল ও।
ইন্দির ওর ঘাড়ের ওপর একটা হাত তুলে রাখল, তুই না একটা ক্যাবলা। পুরুষ মানুষের অত ভয় থাকতে নেই।
টিটো কথা বলল না। কথা বলার মতো অবস্থা ছিল না ওর।
আমি যদি তোর মতো ছেলে হয়ে জন্মাতাম, এত দিনে দেখতিস কত কিছু করে ফেলতাম। ইন্দির ওর গালে আলতো করে একটা টোকা মারল।
ঘোড়ার ডিম করতিস। ছোট্ট করে উত্তর দিল টিটো।
অবশ্য তুই এখনও পুরোপুরি ছেলে হয়ে জন্মাসনি। তুই এখনও শিশু, মায়ের দুধ খাস।
ভ্যাট। এক ঝটকায় ইন্দিরের হাতটাকে কাঁধের ওপর থেকে সরিয়ে দিল টিটো।
ইন্দির আবার হাতটা তুলে আনল ওর কাঁধে, খাস না বুঝি? কত বয়স তোর শুনি? আমি যতদূর জানি, তোর এখনও দশ হয়নি।
টিটো দাঁতে দাঁত চেপে বলল, এখানে হাত দিয়ে দেখ না, গোঁফ উঠছে আমার। দশ বছরে কারও গোঁফ ওঠে না।
দেখি! অন্ধকারে ইন্দির হাত তুলে এনে ওর ঠোঁটের ওপর বুলিয়ে নিল, আই বাপ, মেয়েদের মতো ঠোঁট রে তোর। কি নরম।
বাজে কথা। তোর ঠোঁট বুঝি ছেলেদের মতো।
হাত বুলিয়ে দেখ না। দেখলেই বুঝতে পারবি।
আমার দরকার নেই। টিটো আবার গাছটার দিকে তাকাল। গাছের অন্ধকারটা ক্রমশ যেন ফেঁপে ফেঁপে বড় হয়ে উঠছে। অথচ ইন্দিরটার কোনও নজরই নেই সেদিকে। একটা কিছু হয়ে গেলে তখন বুঝবে।
ইন্দির বলল, ঠিক আছে, অনেকক্ষণ তো হল, এবার খুলে দেখা। কি পেয়েছিস দেখি। টিটো আবার শক্ত করে মোড়কটাকে ধরে বুকের মধ্যে লুকোল।
— কি হল, দেখা না। কথা দিচ্ছি আমি ছোঁব না। দেখা।
টিটো বলল, ঠিক আছে, তুই যদি না ধরিস তাহলে আমি দেখাতে পারি।
— বললাম তো ধরব না।
টিটো এবার আড়চোখে একবার ইন্দিরের চোখের ভাষা বোঝবার চেষ্টা করল। কিন্তু অন্ধকারে ছাই কিছু বোঝা যায় না। তার বদলে ওর চিবুকের কাছে হঠাৎ একটু ইন্দিরের গরম নিঃশ্বাসের হলকা লাগল।
— ঠিক আছে, তুই একটু সরে বোস, আমি দেখাচ্ছি।
একটু ঢিল হয়ে সরে বসল ইন্দির।
টিটো কাগজের মোড়কটা কোলের ওপর রেখে ধীরে ধীরে গুপ্তধন আবিষ্কার করতে বসে গেল।
— হায় হায়, এ কি রে! কেমন যেন মিইয়ে পড়ল টিটো। কয়েক ফেত্যা কাগজের ভাঁজ খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ল পাকে পাকে সুতলি জড়ানো দুটো বোমা। এতক্ষণ ও দুটোকেই গুপ্তধন মনে করে বুকের ভেতর আঁকড়ে রেখেছিল ও। কি বোকা!
ইন্দির টিটোর অবস্থা দেখে হি হি করে হেসে উঠল, খুব হয়েছে, বেশ হয়েছে। আরও ওটা আমার আমার কর।
— আমি কি করে বুঝব, লোক দুটো বোমা ফেলে যাবে ট্রেনে।
— তুই একটা অপয়া। আমি ভাবছিলাম মণিমুক্তো মোহর কত কিছু থাকবে।
— তোর জন্যই তো এমন হল। তুই যদি অমন করে আমার পিছু না লাগতিস তাহলে এমন হত না।
— ঘোড়ার ডিম হত তাহলে। দাঁড়া ও দুটোকে আবার জড়িয়ে রাখি। কপাল ভাল, এতক্ষণ ও দুটো নিয়ে ঘুরছিস, ফেটে যায়নি। ফেটে গেলে কি কেলেঙ্কারি হত বল তো!
ইন্দির ভয়ে বোমা দুটোকে আবার কাগজের মোড়কে জড়িয়ে একপাশে সরিয়ে রাখল।
— মিছিমিছি আমরা গাড়ি থেকে নেমে এই এখানে এলাম। টিটোর গলায় আক্ষেপ।
— এখানে এসে ভালই হয়েছে। বোকার মতো কোথায় গিয়ে তুই ওটাকে খুলতিস, আর অমনি পুলিস এসে খপ করে তোকে ধরত। তুই তো এখনও পুলিসের গুঁতো খাসনি কোনওদিন। খেলে বুঝতিস।
— তুই খেয়েছিস বুঝি?
— আমি বড় হয়ে গেছি না। মেয়েদের গায়ে পুলিস কখনও হাত দেয় না। তাছাড়া এবার থেকে আমি ফ্রকের বদলে শাড়ি পরতে শুরু করব।
টিটো একটুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বলল, মেয়ে হয়ে জন্মেছিস বলে তোর অনেক সুবিধে।
— সুবিধে কেন? কৌতুকে ড্যাব ড্যাব করে তাকায় ইন্দির।
— কেন কি আবার। নারানবাবু তোকে মাঝে মাঝেই পয়সা দেয়। আমি দেখিনি বুঝি।
— সে তো আমি ওর গা-হাত-পা টিপে দিই বলে, দোকান থেকে চা-সিগারেট এনে দিই, জল তুলে দিই, তাই।
— তুই মেয়ে বলেই তোকে দিয়ে ও ওসব করায়। আমি কাছে গেলে কেমন খ্যাঁক খ্যাঁক করে ওঠে দেখিস না। এমন ভাব দেখায় যেন ভিক্ষুক তাড়াচ্ছে।
ইন্দিরা হেসে উঠল, তুই বড্ড ছেলেমানুষ। এই জন্যই তো বলছিলাম, তুই মায়ের দুধ খাস।
আবার খানিকটা বিরক্ত হয় টিটো। সত্যি কথা বললে তো তোর গায়ে লাগবেই।
— সত্যি কথা আবার কি, নারানবাবু আমাকে এমনি এমনি পয়সা দেয় না, রীতিমতো খাটিয়ে পয়সা দেয়।
টিটোর ঠোঁটের ডগায় অনেক খারাপ কথা এসে যাচ্ছিল, চেপে গেল। অনেক সময় অনেক সত্যি কথা বলা যায় না। তাছাড়া ইন্দিরাকে এ সময় খারাপও লাগছিল না। ভগবান যেন ওকে ছানা-মাখন দিয়ে গড়েছে। তাছাড়া ওর শরীরের গন্ধটার মধ্যেও কেমন যেন একটা আকর্ষণ রয়েছে।
আবার একটু গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসেছে ওরা। টিটোর কাঁধের ওপর আবার একটা হাত তুলে দিয়েছে ইন্দির। টিটোর বুকের ভেতর আবার যেন দুম দুম করে শব্দ হতে শুরু করেছে। কেমন আড়ষ্ট হয়ে সামনের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে ও।
ইন্দির ওর হাতখানা এবার নিজের কোলের ওপরেই টেনে নিল, ঠিক হয়ে বোস না টিটো। তুই না ভয়ানক ভীতু, ভয়েই মরে গেলি। অথচ এই সাহস নিয়ে তুই রেলে রেলে ঘুরে বেড়াস কী করে, বুঝি না।
টিটো অস্বীকার করতে পারে না ও ভীতু। চুপ করেই থাকে ও।
—তাছাড়া তোর গায়ে একদম জোর নেই, এই তো তোর শুকনো শুকনো হাত।
টিটো একটু বিব্রতভাবে হাসবার চেষ্টা করে। তারপর বলে, তোর চেয়ে বেশি জোর। ইচ্ছে করলে আমি কালুদার মতো ঘুসি মেরে নারকেল ফাটাতে পারি।
— ছাই পারিস। যাদের হাত-পা অত ঠান্ডা তারা কিচ্ছু পারে না।
— তোরও তো ঠান্ডা। টিটোর গলার স্বর ফ্যাস ফ্যাস করে উঠল।
আর ঠিক এই সময়ই ওরা দুজনে চমকে উঠল। কে একটা লোক যেন এদিকেই এগিয়ে আসছে। হাতে একটা টর্চ। ইন্দির ফিসফিস করে বলল, চুপ।
টিটো ঘাড় উঁচু করে দেখার চেষ্টা করল, সত্যি সত্যি একটা ছায়া মূর্তি। মূর্তিটা কি তেঁতুল গাছের দিকটাতেই এগিয়ে আসছে নাকি! কি জানি বাবা, কি মতলব রয়েছে মাথায়।
— কে রে বাবা! এদিকে এই অন্ধকারের দিকে কি চায় ও। ইন্দিরও ঠিক বুঝতে পারছে না, কে হতে পারে লোকটা। হঠাৎ যদি ওদের দেখে ফেলে এখানে নির্ঘাত চোর চোর করে চেঁচিয়ে উঠবে।
স্টেশনের দিকটা এখন নিঝুম হয়ে থাকার কথা। এ সব স্টেশনে ট্রেন এলেই যা একটু লোকজন দেখা যায়। অনায়াসে ওরা স্টেশনে গিয়ে বসেও গল্প করে কাটাতে পারত। পরের লোকাল আসতে রাত ন-টা।
ইন্দির ফিসফিস করে ওর কানের কাছে মুখ এনে বলল, কথা বলিস না টিটো। লোকটা বোধহয় চৌকিদার। শেডের পিছন দিকটা দেখতে এসেছে।
টিটো কথা বলবে কি, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। ইন্দিরই এখন ওর ভরসা। মেয়েটা আর যাই হোক, বেশ সাহস আছে। ফলে ইন্দিরের গায় গায় একদম ও সেঁটে যাচ্ছিল। যেন ইন্দিরকে ও সামনে রেখে পাঁচিলের মতো পিছনে লুকোবার চেষ্টা করছিল।
ছায়ামূর্তির হাতের টর্চটা একবার তেঁতুল গাছের গা ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল। আলোটা আর একটু নিচের দিকে নামলেই ওরা ধরা পড়ে যেত।
কিন্তু ইন্দিরের যেন ভয়ডর বলতে কিছুই নেই। এই অবস্থাতেই ও ফিসফিস করে কী যেন বলতে চাইছে।
— কি? কি বলছিস?
— এখানে বসাটা ঠিক হচ্ছে না। চট করে ওই রাবিশগুলোর পিছনে চল। এই।
টিটো একটু ঝাঁকি খেল। তুই আগে যা।
— ঠিক আছে। আয়, আমার পিছনে আয়। শব্দ করিস না যেন।
ইন্দির হামাগুড়ি দিয়ে খানিকটা এগিয়ে সুট করে রাবিশের স্তূপের পিছনে এসেই মাথা নিচু করে বসে পড়ল।
টিটোও অনুসরণ করল ওকে। যত রাজ্যের খোয়া ভাঙা আর পাথরের ঢেলার মধ্যে গড়িয়ে পড়ল টিটো।
ইন্দির আবার ওর গায় গায় সেঁটে গেল। তারপর একটু একটু করে মাথা তুলে দেখতে লাগল লোকটা কি করে।
বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ। হঠাৎ ইন্দির ফিসফিস করে বলল, আর একটু জোরে চেপে ধর না আমাকে, বেশ লাগছে।
অন্য সময় হলে টিটো ওর নাকের ওপর একটা ঘুসি চালিয়ে দিত, কিন্তু এখন ইন্দির ছাড়া ওর উপায় নেই।
টর্চ ঘোরাতে ঘোরাতে লোকটা ততক্ষণে প্রায় তেঁতুল গাছটার কাছাকাছি এগিয়ে এসেছে। একটু থমকে দাঁড়িয়েছে। কি জানি বাবা কাগজের মোড়কটা ওর চোখে পড়ে গেছে কিনা।
ইন্দির ওর গালটাকে টিটোর গালের সঙ্গে চেপে রেখেছে। ভীষণ বিড়ি খায় ইন্দির। ওর মুখ থেকে বিড়ির গন্ধ ভেসে আসছে। তা হোক, এখন আর বিড়ির গন্ধ নিয়ে ভাবলে চলবে না ওর।
ছায়ামূর্তিটা কিন্তু এবার শেডের দিকটা দেখে নিয়ে আবার ফিরে যেতে শুরু করেছে। চৌকিদার যে সন্দেহ নেই। চৌকিদার না হলে অমনি করে ফালতু ফালতু আসে কেউ।
— যাক বাবা বাঁচা গেল। ইন্দির আরও কিছুক্ষণ পর বলল।
টিটোও যেন ততক্ষণে আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। তবু নিঃসন্দেহ হওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করল, চলে গেছে? ইন্দিরের দিকে তাকিয়ে থাকল ও।
— হ্যাঁ গো মশাই, গেছে। ভয়ে একেবার কেঁচো হয়ে গেছিস তুই।
টিটো একটু সহজ হবার জন্য হাসল, ভয় না। আসলে লোকটা আমাদের দেখে ফেললে ঝামেলা হত।
— ছাই করত আমাদের। আমরা তো আর চোর নই। যারা চুরি করে তাদের ধরুক না ও। এই টিটো আর একটু চেপে ধর না আমাকে।
— ধুত! টিটো মুহূর্তের মধ্যেই ওর হাত দুটো ইন্দিরের গা থেকে সরিয়ে আনল। চল, উঠি এবার।
— উঠে কোথায় যাবি? পরের লোকাল আসবে রাত ন-টায়। এখনও ঢের দেরি।
— চল না প্ল্যাটফর্মে যাই। লোকটা আবার যদি দেখতে আসে?
— ছাই আসবে। তুই না একটা নাম্বার ওয়ান ক্যাবলা।
— ক্যাবলা তো ক্যাবলা। টিটো ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে।
ইন্দির বলল, তুই একলা যাস তো, আমি চেঁচিয়ে চৌকিদারকে জানিয়ে দেব।
চৌকিদারের কথায় আবার একটু থমকে দাঁড়ায় ও। এদিক-ওদিক তাকায়। ইন্দিরও ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। দাঁড়িয়ে একপলক ও টিটোকে দেখে নিয়ে হি হি করে হেসে উঠল।
— হাসছিস যে? প্রশ্ন করে টিটো।
— তোর অবস্থা দেখে।
— কেন, কি করেছি আমি? তুই না এমন করছিস, যেন—
— ঠিক আছে বাবা, ঠিক আছে। আর হাসব না। এই আমার দিকে একটু তাকা দেখি।
টিটো ওর চোখের দিকে তাকাল, কি হয়েছে? দেখল, অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে ইন্দিরের চোখ।
ইন্দির ওর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কাঁধের ওপর হাত দুটো বিছিয়ে দিল, দাঁড়া, একটা মজা করব।
— কি মজা। বুকের ভেতর আবার ঢিব ঢিব শব্দ শুরু হয় টিটোর।
— আমার দিকে তাকিয়ে থাক না।
— তাকিয়েই তো আছি। টিটো মন্ত্রমুগ্ধের মতো ইন্দিরের দিকে তাকিয়ে থাকল। ছায়া ছায়া অথচ নিটোল মোমের মতো ইন্দিরের মুখখানা যেন এগিয়ে আসছে। ইন্দির যেন সম্মোহন করে ফেলছে ওকে। টিটো চোখ ফেরাতে পারল না। জাদুকরীর মতো ইন্দির যেন এখন চোখের খেলা দেখাতে শুরু করেছে।
এক ঝলক উষ্ণ নিঃশ্বাস ওর কপাল ছুঁয়ে গেল। টিটো ভয়ে চোখ বুজে ফেলল। ঝাঁঝাল একটা গন্ধ যেন ক্রমশ ওকে ঘিরে ফেলছে। বিড়ি-খাওয়া কটু একজোড়া ঠোঁটের স্পর্শ পেল ও। আর সঙ্গে সঙ্গে যেন বুকের ভেতর দুম দুম করে বোমা ফাটাতে শুরু করল। অনাস্বাদিত একটা জগতে ধীরে ধীরে পৌঁছে যেতে শুরু করল টিটো।
অনেকক্ষণ ওইভাবে কেটে গেল ওদের। লালায় আর রক্তে ঠোঁটটা জ্বালা করে উঠতেই টিটো একটু শব্দ করে ককিয়ে উঠল।
আর সঙ্গে সঙ্গে ওকে ছেড়ে সরে দাঁড়াল ইন্দির, কি হল?
সমস্ত শরীরটা তখনও থরথর করে কাঁপছে। কথা বলতে পারল না টিটো। জামাটা উল্টে নিয়ে ঠোঁট মুছতে শুরু করল।
ইন্দির বলল, ধুত! ফালতু। মায়ের দুধ খা-গে যা।
টিটো কথা বলল না।
ইন্দির বলল, চল রে ক্যাবলা। প্ল্যাটফর্মেই যাই চল। আয়। টিটোর হাত দুটো আবার সাঁড়াশির মতো চেপে ধরল ও।
রাবিশের স্তূপ থেকে তেঁতুল গাছটার কাছে আসতেই টিটোর চোখে পড়ল কাগজের মোড়কটা।
ইন্দির বলল, কি দেখছিস? ভয় নেই রে ক্যাবলা, ফাটবে না, আয়।
— ফাটবে না কেন? ফ্যালফ্যাল করে তাকায় টিটো।
ইন্দির হাসে, সব বোমাই কি ফাটে নাকি! তোর মতো ভেজা যে, আয়।
ওরা প্ল্যাটফর্মের দিকে হাঁটতে লাগল।
