আশিস ঘোষ : বাস স্টপে দাঁড়িয়ে

আশিস ঘোষ : বাস স্টপে দাঁড়িয়ে

এই বাড়িটা মৃদুলার ঠিক পছন্দ নয়। দেড়খানা ঘরে ইচ্ছেমতো চলাফেরা করা যায় না। জিনিসপত্রে ঠাসা। বাইরের কেউ এলে, থাকা তো দূরের কথা, বসতে দেওয়ারও জায়গা নেই। মেয়েরা বড় হচ্ছে। ওদেরও তো একটু আলাদা জায়গা দরকার।

ফ্ল্যাট বাড়িটা এমনিতে মন্দ নয়। সরকারি আবাসন। ভাড়াও সামান্য। বাড়িওলার ঝামেলা নেই। যে যার ফ্ল্যাটে থাকে। দরজা বন্ধ করে দিলে, কারুর সঙ্গে সম্পর্ক নেই। তুমি খাও, না খাও, যা খুশি কর— কেউ দেখতে আসবে না। দেওয়ালের বাইরের দিকে ছোট একফালি ঝুল বারান্দা। ওখানে বসে আমরা গল্পগুজব করি। রাতে খাওয়ার পর অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাই। অন্যান্য ফ্ল্যাটে কোনওটায় আলো জ্বলে, কোনওটা বা অন্ধকার। চারদিক নির্জন হয়ে যায়।

কিন্তু মৃদুলা এতে খুশি নয়। কিছুতেই এখানে থাকতে চায় না। — দূর, এ আবার একটা বাড়ি নাকি। পায়রার খোপ। ইচ্ছেমতো কিছু একটা কিনে রাখার জায়গা নেই। দম বন্ধ হয়ে আসে।

ওকে বোঝাবার চেষ্টা করি। — জানো, এই শহরে কত লোকের একটু থাকারও জায়গা নেই। আমাদের তবু দেড়খানা ঘর। এর চাইতেও কম জায়গায় লোকে কত কষ্ট করে থাকে—

মুখ বিকৃত করে মৃদুলা বলে, — কষ্ট করে থাকে। কই, একবারও তো বল না, কত লোকে কত ভালভাবে থাকে?

রাগ হলেও, চেষ্টা করে মুখে হাসি আনি। — তা বল না, কী করতে চাও—

আর কিছু না বলে মৃদুলা পাশের ঘরে গিয়ে খুটখাট কীসব করতে থাকে। রাতে খেতে বসে হয়ত বলে, তোমার কোনও চেষ্টা নেই। একটু খুঁজলেও তো পার। অন্য কোথাও আর একটু ভাল ব্যবস্থা করা যায় না?

হয়ত যায়। কিন্তু সাধ্যমতো পাই কোথায়? অনেক চেষ্টা করে এক বন্ধুর দয়ায় এই ছোট ফ্ল্যাটটা পেয়েছি। মৃদুলা আগে দেখেনি। প্রথম দিন এখানে এসেই মুখ গম্ভীর। — শেষ পর্যন্ত এই?

— কেন, বেশ তো নিজেদের মতো থাকা যাবে। পরিবেশও ভাল। কত চেষ্টা করেও লোকে পায় না।

আমাকে থামিয়ে দিয়ে মৃদুলা বলতে থাকে— হ্যাঁ, বলে যাও— কাছেই বাজার— বাস রাস্তা— নিচে কতটা ফাঁকা জায়গা— পুকুর একটা, আরও কত কী— হাত নেড়ে মৃদুলা বলে, — তবু যদি একটু নড়া-চড়ার জায়গা থাকত— কী আর বলি? অগত্যা ওর তাগাদাতে মাঝে মাঝে বাড়ি খুঁজি। একে-ওকে বলি। কিন্তু কোথায় বাড়ি? এটা কলকাতা শহর। ইচ্ছে করলেই এখানে পছন্দমতো বাড়ি পাওয়া যায় না। পেলেও যা ভাড়া বা অগ্রিম, তা আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। ওকে বোঝানোর চেষ্টা করি— একটু ধৈর্য ধর। সুবিধেমতো কোনও ব্যবস্থা হলেই চলে যাব—

মৃদুলা অদ্ভুত চোখে আমাকে দেখে। বিড়বিড় করে বলতে থাকে, — সবই আমার কপাল। বিয়ের আগে কত স্বপ্ন ছিল, নিজের মতো ঘর সাজাব। জায়গাই নেই, তো সাজাব কী?

জানি ওর আসল কষ্টটা কোথায়। কিন্তু নিজের বাড়ি হবে ভাবলেই কি আর বাড়ি হয়ে যায়? মৃদুলা এত বোঝে না, বুঝতে চায় না। মন খারাপ করে। অক্ষম বলে আমার ওপর চটে যায়। ও প্রায়ই একটা সুন্দর বাড়ির কথা বলে। ছোট বাড়িটার চারদিকে বাগান থাকবে। সামনের লনে থাকবে সমান করে ছাঁটা সবুজ ঘাস। লনের একপাশে বড় একটা পাখির খাঁচা। মেয়েরা ছুটোছুটি করে খেলা করবে। বারন্দায় বেতের চেয়ারে বসে আমরা গল্প করব।

এক একদিন ওর যেন কী হয়। বাড়ির কথা বলতে বলতে অন্যমনস্ক হয়ে যায়। বাইরের ঝুল বারান্দায় গিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। সারাদিন খাটাখাটনির পর আমার তখন ঘুম পেয়ে যায়। মেয়েরা তো আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। মৃদুলা একাকী বাইরের বারান্দায় বসে থাকে। পাড়ার রাতজাগা কুকুরগুলোর তখন ডাকাডাকি ছুটোছুটি শুরু হয়ে যায়। মৃদুলা চুপচাপ বসে থাকে।

কাগজে বিজ্ঞাপন দেখি। লাল কালির দাগ দিই। ওকে দেখাই। আমাদের আলোচনা হয়। হিসেব করি। কখনও তর্ক করে বলি— তোমার তো কোনওটাই পছন্দ নয়। রাজভবনে থাকবে? যদি দেখি ও খুব গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে, এখুনি হয়ত আগুন জ্বলে উঠবে, তাড়াতাড়ি জল ছেটানোর চেষ্টা করি। — দেখ, তাড়াহুড়ো না করে, ধীরেসুস্থে কাজ করা ভাল। বাড়ি করলে পছন্দমতো করব— ঠোঁট বেঁকিয়ে মৃদুলা বলে, — তোমার দৌড় বোঝা গেছে—

একদিন আমার এক বন্ধু এল। গড়িয়া বাস স্ট্যান্ডের কাছে নতুন ফ্ল্যাট কিনেছে। চাকরি-বাকরি করে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বাড়ি করার কী ঝামেলা, বন্ধু তাই বলছিল। চা খেতে খেতে বেশ তৃপ্তির হাসি হেসে বলল, — যাই বল, বুড়ো বয়সে নিজের একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই তো হল। আর জায়গা? তোমাদের এই ভাড়া ফ্ল্যাটের চাইতে কম করেও দ্বিগুণ হবে। আজকালকার বাজারে এটাই বা কম কী?

মৃদুলার খুব আগ্রহ। খোঁজখবর নিচ্ছিল। ক’খানা ঘর। উত্তর-দক্ষিণ খোলা কিনা। সামনে পেছনে বারান্দা আছে তো? থাকলে কতটা বড়। ডাইনিং স্পেস কতটা। সব শুনেটুনে মুখ কালো করে বলল— এই পোড়া কপালে আর কিছু হবে না—

— কেন হবে না? আমাদের আবাসন যারা করেছে তারা তো আরও ফ্ল্যাট করছে। কিনবেন?

মৃদুলা আমার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল— ওই যে আপনার বন্ধুকে বলুন—

আমিও চটপট বললাম— বেশ তো, চল না একদিন কথা বলে আসি—

মৃদুলা প্রায় লাফিয়ে উঠল— যাবে? সত্যি যাবে?

— বললাম তো—

কয়েক দিন পর অফিসের এক বন্ধুর কাছে খবর পেয়ে একটা জমি দেখতে গেলাম। সোনারপুর স্টেশনের কাছে। স্টেশন থেকে মিনিট পাঁচেকের হাঁটা পথ। জমি মানে জলা জায়গা ভরাট করা হয়েছে। তিরিশ হাজার টাকা কাঠা। স্টেশনের কাছে নাকি আরও বেশি। দরদাম শুনে, জায়গা দেখে খুব একটা উৎসাহ পেলাম না। মৃদুলাও কেমন চুপসে গেল। কিছুদিন আর জমি বাড়ি নিয়ে কোনও কথাবার্তা হল না। ভাবলাম যাক গে, গরিবের আবার ঘোড়া রোগ কেন? মৃদুলাও বোধহয় ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে। ওসব সাধ-আহ্লা দের কথা আর বলে না। বারান্দায় কয়েকটা ফুলের টব লাগিয়েছে। রোজ ভোরে উঠে জল দেয়। একদিন দেখলাম খাঁচায় কয়েকটা মুনিয়া পাখি কিনে আনল। কিছু বলি না। কী বললে, কী উত্তর দেবে কে জানে? চুপচাপ থাকাই ভাল। টবে জল দিতে দিতে মেয়েদের বলে— কী আর করব বল? আমার এতেই শান্তি—

বড় মেয়েটার আব্দার বেশি। পাখির খাঁচা নাড়তে নাড়তে বলে— মা, দুটো সাদা খরগোশ কিনবে?

আড়চোখে আমার দিকে চেয়ে মৃদুলা হাসতে থাকে।

— খরগোশ? কোথায় রাখবি শুনি?

— কেন, ঘরেই থাকবে, খাটের নিচে শোবে।

আমার দিকে দেখিয়ে মৃদুলা বলে,— তোর বাবাকে বল। শুধু খরগোশ কেন, গোটা কয়েক কুকুরের বাচ্চাও যেন নিয়ে আসে। যত্তো সব—

দম দম করে আমার সামনে দিয়ে হেঁটে যায় মৃদুলা। অফিসের দেরি হয়ে যাবে, তাড়াতাড়ি বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করি। আমাদের যেমন স্বপ্ন বা ইচ্ছে আছে, তা ভুলে যাওয়ার কৌশলও জানা আছে। এটা কাউকেই শিখিয়ে দিতে হয় না। আমিও বাড়ি করার স্বপ্নটা আলমারির লকারে বন্ধ করে রাখলাম। এখন তোফা আছি। খাই দাই। অফিসে যাই। সন্ধের পর বাড়ি ফিরে মেয়েদের একটু পড়াতে বসাই। মৃদুলাও কিছু বলে না। রণাঙ্গনে এখন শান্তি বিরাজমান। কিন্তু ওই যে। স্বপ্ন কখনও শেষ হয়ে যায় না। দূরে সরে গেলেও, আবার বর্ষার মেঘের মতো এসে জমা হয়।

একদিন বাড়ি ফিরে দেখি, কাগজের একটা বিজ্ঞাপন সামনে রেখে, ঝুঁকে পড়ে কী যেন দেখছে মৃদুলা। সারাদিন পর আমি যে বাড়ি ফিরেছি, সেদিকে হুঁশ নেই।

— কী ব্যাপার? অত মনোযোগ দিয়ে কী দেখছ?

বিজ্ঞাপনটা দেখিয়ে মৃদুলা বলল— এটা দেখেছ?

কোনও একটা নতুন আবাসনের ছবি। হয়নি এখনও। হবে। চশমা পরা বোকা বোকা একটা লোক অবাক চোখে পেল্লায় বাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে। নিচে লেখা— ‘সুখের স্বপ্ন’।

হেসে বললাম— ফ্ল্যাট কিনবে?

মৃদুলা সঙ্গে সঙ্গে ফুঁসে উঠল,— কেন, সেটা কী খুব অসম্ভব? তোমার বন্ধু যদি পারে তো, তুমি পারবে না কেন?

খুব উৎসাহে মৃদুলা বোঝাতে শুরু করল— দেখেই ঘাবড়ে যাবে না। প্রথমে বেশ কিছু দিতে হবে। তারপর সহজ কিস্তিতে— দেখ না, আজকাল তো কত রকমের লোন পাওয়া যায়—

মাথা নেড়ে বললাম— কথাটা মন্দ বলনি। চেষ্টা করা যেতে পারে—

আমি রাজি বুঝে, মৃদুলা উৎসাহে উঠে দাঁড়ায়।— খোঁজ নাও না। আমারও কিছু সোনাদানা আছে। দেখি না কী হয়—

পরের রোববার দুজনেই সেই আবাসন অফিসে গেলাম। মোটামুটি বড় মাপের একখানা ঘর। মাঝখানে প্লাইউডের পার্টিশন। বাইরের ঘরে খান দুয়েক সোফা পেতে বসার ব্যবস্থা। ওপরে পাখা ঘুরছে। নিচু টেবিলে কয়েকখানা ম্যাগাজিন। খবরের কাগজ। অ্যাশট্রে। পার্টিশনের ওপাশে অফিস।

ভেতরে কথা হচ্ছে। মৃদুলাকে এদিকে বসিয়ে ভেতরে গেলাম। ঢুকতেই অল্পবয়সী এক ছোকরা চেয়ার ছেড়ে উঠে এল— বলুন, কী করতে পারি?

চারদিক চেয়ে ঘরটা একবার দেখে নিয়ে বললাম,— কিছু জানার ছিল।

হাফ সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ওপাশে বসা টাই, সুট পরা আর একজন বলে উঠল,— সব জানতে পারবেন। তবে আমাদের একটা প্রসিডিওর আছে—

লোকটার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললাম,— বলুন কী করতে হবে?

লোকটা বাঁদিকের আর একটা টেবিল দেখিয়ে বলল, যান— ওদিকে যান—

গেলাম ওদিকে। এই লোকটা একটু বয়স্ক। আমার দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে বলল— বলুন, কী জানতে চান?— বসুন না, এই চেয়ারটায় বসুন— সামনের খালি চেয়ারটা দেখাল।

না বসেই বললাম,— আপনাদের বিজ্ঞাপন দেখলাম। ফ্ল্যাট কিনলে মোট কত দিতে হবে? প্রথমে কত, তার পরের কিস্তিগুলোই বা কত?

উঠে দাঁড়াল লোকটা। পেছনের প্লাইউডের পার্টিশনে মাঝারি মাপের একটা ব্লু-প্রিন্ট সাঁটা। ওদিকে আঙুল দেখিয়ে লোকটা বলল,— এই দেখুন আমাদের আবাসনের প্ল্যান। বড় একটা পুকুর আছে। পুকুর বুজিয়ে বাড়ি তৈরি হবে। তা ছাড়া চিলড্রেন পার্ক, রিক্রিয়েশন সেন্টার, গ্যারেজ— সব ব্যবস্থা থাকবে। কাছেই তো বাইপাস, কোনও অসুবিধেই হবে না। তাছাড়া—

ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম— ওসব পরে শুনব। আগে বলুন, প্রথম কিস্তির টাকা কবের মধ্যে দিতে হবে— ফ্ল্যাটের মোট দাম কত?

একটু থতমত খেয়ে লোকটা আগের লোকটাকে দেখাল— ওর কাছে যান— সব জানতে পারবেন— লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই একটা জাবদা খাতা এগিয়ে দিল—

— নিন, এতে নাম, ঠিকানা লিখে ফেলুন—

লিখলাম। টেবিলে কিছু কাগজপত্তর পুস্তিকা ছড়ানো। ওগুলো দেখিয়ে বলল— এতে সব পাবেন। তবে দুশো টাকা দিয়ে আগে নাম রেজিস্ট্রি করতে হবে—

একটা পুস্তিকা তুলে নিয়ে বললাম,— এখানে দেখলে?

লোকটা অমায়িক হেসে বলল,— তা দেখতে পারেন।

মলাটে বিজ্ঞাপনের ছবিটা ছাপা। আর একবার দেখলাম ভাল করে। পাতা উল্টে প্রথমেই যে দামটা চোখে পড়ল, আগামী চার বছরে আমার সব মাইনে-পত্তর যোগ করেও, তার ধারেকাছে যাবে না। টাকার অঙ্কটা ভাবতে ভাবতে পাতা ওল্টাতে থাকলাম। দেখে আর কী করব? আমি তো আমি, আমার বাপ-ঠাকুর্দাও বোধহয় একসঙ্গে এত টাকা দেখেনি—

লোকটা আমার দিকেই চেয়েছিল। পুস্তিকা ফেরত দিতেই বলল,— বলবেন কিছু?

পেছন ফিরে দেখলাম, অন্য দুজনও আমার দিকে চেয়ে আছে। ওরা কিছু বুঝতে না পারে, তাই যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলায় বললাম— দামটা বড্ড বেশি—

লজ্জা পেয়েছে, এমনভাবে হাসল লোকটা।— কী যে বলেন স্যার— জিনিসপত্তরের দাম যা বাড়ছে— এরপর তো আরও বেশি দিতে হবে—

পুস্তিকা টেবিলে রেখে দিলাম। অস্বস্তি হচ্ছে। বললাম— আজ তো প্রস্তুত হয়ে আসিনি। অন্যদিন আসা যাবে। জায়গাটা একবার দেখতে পারি?

— নিশ্চয়ই— আমাদের এই অফিসের পেছনেই আছে। দেখবেন অনেকটা জলা জায়গা। অবশ্য মাটি ফেলা হচ্ছে। আচ্ছা আসুন এবার—

লোকটা টেবিলে ছড়ানো কাগজ-পত্র গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

নমস্কার করে বাইরে এলাম। মৃদুলা এদিকে চেয়েই বসেছিল। আমাকে দেখেই উঠে দাঁড়াল। দুচোখে অজস্র প্রশ্ন। ইশারায় ওকে বাইরে আসতে বললাম। বাইরে গিয়েই মৃদুলা হাত ধরল। — কথা হল? কী বলল ওরা?

— কী বলবে? কাগজপত্র সব দেখলাম— দরদাম জানলাম।

— কত, দাম কত গো?

ওর গলার স্বরে চাপা উত্তেজনা। হাতটা ছাড়িয়ে নিতে নিতে বললাম— প্রায় তিন লাখ— থমকে দাঁড়ায় মৃদুলা। — অ্যাঁ, বল কি গো?

এবার আমিই ওর হাত ধরলাম— ঘাবড়াচ্ছ কেন? টাকা দিলেই হয়ে যায়। তবে—

— তবে কী?

— অত টাকা কোথায় পাব? ভাবছি—

মৃদুলা গা ঘেঁষে হাঁটতে থাকে। এদিকে বসতি কম। একটু এগোলেই বাইপাস। ছাড়া ছাড়া কিছু বাড়ি। সবই প্রায় কাঁচা। ওদিকের জলা জায়গাটার দিক থেকে ভ্যাপসা গন্ধ আসছে। মাটি ফেলা মেশিনের চাপা শব্দ। চলতে চলতে মৃদুলা বলল— জমিটা কোথায়? এখানে কোথাও?

জলা জায়গাটার দিকে দেখিয়ে বললাম— ওই তো ওখানে। মাটি ফেলা হচ্ছে। — চল, এখন আর দেখে কাজ নেই—

কথা বলতে বলতে আমরা বাস স্টপের দিকে এগোচ্ছি। চড়া রোদ। বেশিক্ষণ হাঁটা যাচ্ছে না। ওপর দিকে চাইলাম। একটা শকুন পাক খেয়ে খেয়ে উড়ছে। উঁচু— আরও উঁচুতে ঘন নীল আকাশে এক টুকরো সাদা মেঘ। মৃদুলাকে বললাম— চল, এবার ফেরা যাক— ও কিছু বলল না। মুখ নিচু করে হাঁটছে। কেমন যেন গম্ভীর। অন্যমনস্ক। কিছু একটা বলার জন্যই বললাম— আচ্ছা, হঠাৎ যদি লটারিতে অনেক টাকা পেয়ে যাই, কেমন হয়?

মৃদুলা আমার দিকে চেয়ে মুচকি হেসে বলল— কথাটা ভাবতে বেশ ভালই লাগে, তাই না?

রাস্তা কাঁপিয়ে কর্পোরেশনের একটা ময়লা ফেলার খালি গাড়ি চলে গেল। প্রায় গা ঘেঁষে।

এক ঝটকায় মৃদুলার হাত ধরে রাস্তার ধারে সরে গেলাম। নিচেই চওড়া কাঁচা ড্রেন। পরিষ্কার টলটলে জলের স্রোত।

আমরা বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইলাম।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *