নজরুল ইসলাম : জাঁতাকল
নরেন এসে বলল, ‘রাধাদা তুমি নাকি বিয়ে করছ?’ এমনভাবে বলল যে এর থেকে মজার খবর আর হয় না! নরেনের মজা গায়ে না মেখে রাধা সোজা হয়ে দাঁড়াল। বিষচোখ নাচিয়ে প্রতি প্রশ্ন করল, ‘কেন, আমি কি বিয়ে করতে পারি নে?’
‘পারবে না কেন? এতদিন করনি তো, তাই বলছি। তার ওপর তুমি আবার রাধা!’ নরেন দাঁত বের করে হাসতে লাগল।
রাধার হাড়-পিত্তি জ্বলে গেল। ভগবান তো তাকে মেরেই রেখেছে; বাবা-মাও ছাড়েনি। এমন নাম রেখেছে যে মেয়ে মেয়ে মনে হয়। ছেলেবেলায় একবার অনুযোগ করেছিল। বাবা ব্যাখ্যা করে বলল, ‘তোর নাম তো রাধা নয়— রাধানাথ।’ সেটা তো সেও জানে। কিন্তু বন্ধুরা কি মানে? তারা বলে, ‘তুই তো রাধা রে। কৃষ্ণের প্রেমিকা। তোর আবার বিয়ে কি?’ সব সময় হাসাহাসি করে। যেন সে একটা জলজ্যান্ত অসঙ্গতি!
অসঙ্গতি তো বটেই! তার বয়স এখন আটত্রিশ। তার পূর্বপুরুষেরা এই বয়সে সংসার ত্যাগ করার কথা ভাবত। তার এখনও বিয়েই হল না!
না হোক, সে কারও হাসির খোরাক হবে না। নরেনের হাসিকে সে পাত্তা দিল না। ঝাঁপে ঠেকা লাগিয়ে টুলের ওপর বসল। প্লাস্টিকের প্যাকেট থেকে সিলগুলি বের করে টেবিলের ড্রয়ারে রাখতে লাগল।
নরেন বুঝল সুবিধা হবে না। সে চলে গেল। টুলের ওপর বসে রাধার অনেক কথা মনে পড়তে লাগল।
পড়াশোনায় সে কোনওদিনই ভাল ছিল না। পরপর তিনবার পরীক্ষা দিয়েও স্কুল ফাইনাল পাস করতে পারেনি। দাদা ততদিনে বি এ পাস করে ফেলেছে। বাবা কলকাতার রায় অ্যান্ড রায় কোম্পানিতে কাজ করতেন। রিটায়ারমেন্টের সময় বলে-কয়ে দাদাকে ওখানে ঢুকিয়ে দিলেন। দাদার বিয়ের সম্বন্ধ আসতে লাগল।
মা বলল, ‘রাধারও দিয়ে দাও; সংসারী হোক।’
বাবা ফুঁসে উঠল, ‘বললেই হল! নিজে তো বাবার হোটেলে খাচ্ছে। বৌকে খাওয়াবে কে?’
‘কে আবার খাওয়াবে? ও-ই খাওয়াবে।’
‘কী করে?’
‘কাজ করে।’
‘ও কী কাজ করবে?’
মা বড় মুখ করে বলেছিল, ‘ব্যবসা করবে।’
ব্যবসাই সে করছে। কিন্তু মাও কি ভাবতে পেরেছিল, এরকম ছ্যাঁচড়া ব্যবসা করতে সে বাধ্য হবে? অবশ্য বাবা রিটায়ারমেন্টের সময় পাওয়া টাকা দিয়ে মোড়ের মাথায় তাকে একটা মণিহারি দোকান করে দিয়েছিল। সে দোকান রাধা বেশিদিন চালাতে পারল না। বছর খানেকের মধ্যে ফেল মেরে দিল।
মা মনের দুঃখ মনে নিয়েই ইহলোক ত্যাগ করল।
তখন বাড়িতে রাধার একমাত্র ভরসা বৌদি। বৌদি তার সমবয়সীই। কিন্তু তাকে মায়ের মতোই স্নেহ করত।
ছোট ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সে চাকরি পেল। বাড়িতে ঘন ঘন সম্বন্ধ আসছে। বৌদি বলল, ‘মেজরও হোক।’ বাবা পাত্রী খুঁজতে লাগল। কিন্তু তার মতো ছন্নছাড়া, বেকার ছেলের সঙ্গে কেউ মেয়ের বিয়ে দিতে চাইবে কেন? পছন্দ মতো মেয়ে পাওয়া গেল না। বিয়েও হল না।
একদিন ঘটনাক্রমে রাধা বন্ধুদের সঙ্গে ছোট ভাইয়ের কথাবার্তা শুনে ফেলল। এক বন্ধু ভাইকে বলছে, ‘মেজদার বিয়ে হবে তারপর? তা হলেই হয়েছে! ভেবেছিস, তোর ওই দামড়া দাদার মেয়ে জুটবে? ততদিনে মেয়েটা হা-পিত্যেশ করে বসে থাকবে?’
ভাই কী বলল সে শুনতে পেল না। তবে কদিন পরেই জানতে পারল, ভাই রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করেছে।
রাধার মনে ধিক্কার লাগল। সেদিনই সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। এসে উঠল মহাদেবদার কাছে। মহাদেবদা তখন এই চালা ঘরে ক্লিয়ারিং এজেন্ট।
মহানগরের সীমানায় এই জাঁতাকল চেকপোস্ট। তালিকাভুক্ত কোনও মাল নিয়ে মহানগরে ঢুকতে হলেই চুঙ্গি কর দিতে হয়। ক্লিয়ারিং এজেন্টরা সেই কর জমা দিতে সাহায্য করে। এক পারসেন্ট কমিশন পায়। রাধা মহাদেবদার চালা ঘরে বসে থাকে। বোঝাই লরি এলেই ছুটে যায়। ড্রাইভারকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে মহাদেবদার কাছে নিয়ে আসতে পারলেই পাঁচটা টাকা পায়।
ড্রাইভারের সঙ্গে কথা হয়ে গেলে মহাদেবদা বিল-চালানগুলো এগিয়ে দেয়। রাধা ফর্ম ফোর পূরণ করে শিফট ইনস্পেক্টরের কাছে জমা দেয়। অ্যালটমেন্ট হলে অ্যাসেসমেন্টের জন্য নির্দিষ্ট কাউন্টারে দাঁড়ায়। অ্যাসেসমেন্ট হয়ে গেলে মহাদেবদার কাছ থেকে টাকা নিয়ে ক্যাশ কাউন্টারে জমা দেয়। ফর্ম ফাইভে রসিদ নিয়ে আসে। ফর্ম ফাইভের নম্বর দিয়ে ড্রাইভারকে রসিদ লিখে দেয়। মালের মালিকের কাছে টাকা আনতে যায়। টাকা আদায় হলেও মহাদেবদা পাঁচ-দশ টাকা দেয়। রাধার কোনওরকমে চলে যায়।
দশ বছর এভাবেই চলছিল। গত বছর মহাদেবদা চেকপোস্টের পাশে একটা জমি কিনে দোতলা বাড়ি করেছে। ওপরের তলায় ফ্যামিলি নিয়ে থাকে। নিচে বিরাট অফিস। চালা ঘরটা রাধাকে ছেড়ে দিয়েছে। রাধা এখন নিজেই ক্লিয়ারিং এজেন্ট। গণেশ তার অ্যাসিস্টেন্ট। দশ বছরে চেকপোস্টের ঘাঁত-ঘোত সে ভালই রপ্ত করেছে। কারবার খারাপ চলে না। গণেশকে দিয়ে-থুয়েও মাসে দু-আড়াই হাজার টাকা থাকে।
রোজগার বাড়তেই সে বাড়িতে ফিরে গেছে। বৌদি কয়েকবারই লোক পাঠিয়েছিল। সে যায়নি। গত মাসে দাদা এসে ধরে নিয়ে গেছে। দাদাই পাশের গ্রামের দত্তদের বড় মেয়ে, রমার সঙ্গে তার বিয়ের সম্বন্ধ করেছে। রবিবার সে বৌদির সঙ্গে দেখতে গিয়েছিল। রমার মুখখানা বেশ মিষ্টি। রাধা মুখখানা মনে করার চেষ্টা করছিল।
একটা বোঝাই লরি এসে থামল। গণেশ এখনও এসে পৌঁছয়নি। রাধা টুল থেকে উঠে এগিয়ে গেল। ততক্ষণে আরও অনেকে এসে গেছে। সকলেরই লক্ষ্য লরির ড্রাইভার।
ফুটবল মাঠে একটা বল নিয়ে বাইশ জন প্লেয়ার কাড়াকাড়ি করে। আর এন্ট্রিট্যাক্স চেকপোস্টে এক ড্রাইভারকে ধরে বত্রিশ জন ক্লিয়ারিং এজেন্ট টানাটানি করে। ফলে ড্রাইভারদের পোয়া বারো।
হাতের বিল-চালানগুলো রাধাকে দিয়ে ড্রাইভার বলল ‘বাবু বলিয়েছেন, এক হাজার রুপেয়ার বেশি দিতে পারবেন না।’
‘এক লরি কাপড় আছে। এক হাজারে কী করে হবে? তা হলে তো ভাগাতে হবে।’
‘ভাগাতে হয়, হাঁকাতে হয়, সেটা আপনার বেপার। এখন বলুন, আপনি পারবেন না, না আওর কারও কাছে যেতে হবে?’
‘আর কারও কাছে গিয়ে লাভ হবে? দেখলেন তো, এক হাজার শুনেই সব কেটে পড়ল!’
ড্রাইভার কোনও উত্তর দিল না।
বিল-চালানগুলো নিয়ে রাধা টুলের ওপর বসল। ওপাশ থেকে বলাই এসে হাতের ইশারা করে ডাকল।
‘এক মিনিট বসুন’, বলে রাধা টুলের থেকে উঠে বলাইয়ের কাছে এগিয়ে গেল।
বলাই বলল, ‘একুশ তারিখ আশীর্বাদ করতে যাওয়ার দিন ঠিক হয়েছে। তা কী দিয়ে আশীর্বাদ করবি?’
‘দাদার সঙ্গে কথা বল।’
‘দাদা তো তোকে জিজ্ঞেস করতে বলল।’
রাধা মুশকিলে পড়ল। তার কাছে যা টাকা-পয়সা ছিল বিয়ের খরচের জন্য দাদার হাতে তুলে দিয়েছে। তারপরেও দাদা তাকে জিজ্ঞেস করতে বলছে!
‘ঠিক আছে, আমি কাল তোকে বলব!’
বলাই চলে গেল। রাধা ভাবল, আজ যা পাবে তাই দিয়ে একটা সোনার আংটি গড়াবে।
একটুক্ষণ ভেবে সে মনস্থির করে ফেলল। গণেশকে চালায় বসতে বলে সে কাগজপত্রগুলো নিয়ে বাড়িতে গেল। টিনের বাক্সটা খুলে চেকপোস্টের জাল সিল বের করল। বিছানার তলা থেকে একটা ফর্ম ফাইভও। ট্যাক্স জমা দেওয়ার প্রমাণস্বরূপ জাল রসিদ তৈরি করল। জাল রসিদ নিয়ে চালা ঘরে এল। ড্রাইভার তখনও বসে ছিল। তাকে রসিদের একটা কপি দিয়ে বলল, ‘এখন নয়, সন্ধ্যাবেলায়, শিফট চেঞ্জের সময় ভাগবেন।’
প্যাট্রলম্যানের হাতে কিছু দিয়ে রাখতে হবে। মান্থলিটাও মিটিয়ে দিতে হবে। বা পকেটে একটা দশ টাকার নোট এবং ডান পকেটে একটা খামে করে একটা একশো টাকার নোট নিয়ে সে এক পা দু পা করে হাঁটতে লাগল।
শিফট চেঞ্জ হতে এখনও অনেক দেরি। তবে পরের শিফটের ইনস্পেক্টর-ইন-চার্জ, সলিল সেন, চলে এসেছে। ইশারা করতেই সে পিছনের দিকে এগিয়ে গেল। টাকার খামটা হাতে দিতেই তার মুখে সন্তোষের হাসি ফুটে উঠল।
রাধা সে হাসিতে যোগ দিতে পারল না। অতগুলো টাকা দিতে হওয়ার জন্য মনটা খচখচ করছিল। প্রতি মাসেই দিতে হয়। যতগুলো ক্লিয়ারিং এজেন্ট আছে সকলকেই একশো-দুশো থেকে আরম্ভ করে পাঁচ হাজার-সাত হাজার পর্যন্ত মান্থলি দিতে হয়। কারও কারও আবার লরির ওপর বন্দোবস্ত। লরি পিছু পাঁচ-দশ থেকে আড়াইশো-তিনশো পর্যন্ত দিতে হয়। তারপর পুজো স্পেশাল। তাকে এবার পাঁচশো টাকা দিতে হয়েছে।
প্রথমে সে দিতে চায়নি। বলেছিল, ‘অত দিতে পারব না। একশো টাকা দেব।’ সঙ্গে সঙ্গে একটা লরির ফিজিক্যাল ভেরিফিকেশনের অর্ডার। লেবার ডাক, আনলোড কর। একশো টাকা কমিশনের জন্য দুশো টাকা লেবার চার্জ দাও। লরিটা একদিন আটকে থাকল। পাঁচশো টাকা ড্যামারেজ দাও। ঢাকের দায়ে মনসা বিকানোর থেকেও খারাপ অবস্থা। তাতেও যদি রেহাই হত। সে এতদিন যত লরি ক্লিয়ার কলেছে, সব মালিককে নোটিস দিয়ে ডাকা হতে লাগল। পরের দিন পড়ি-মরি করে সে পাঁচশো টাকা দিয়ে দিল। প্রথমে না দিতে চাওয়ার জন্য হাতজোড় করে ক্ষমাও চাইতে হল।
এরপরেও আছে খুচরো আব্দার। আজ এ বাবুর বিয়ের নিমন্ত্রণ; একটা শাড়ি কিনে দাও। কাল সে বাবুর ছেলের উপনয়ন; একটা ঘড়ি কিনে দাও। পরশু ও বাবু মিষ্টি খেয়েছেন; দোকানের বিলটা মেটাও। তরশু কে বাবু স্টেশনে যাবেন; একটা লিফট দিয়ে দাও।
মহাদেবদার একটা গাড়ি তো সব সময় বাবুদের সেবায় নিয়োজিত। পরিবর্তে তার ঢালাও কারবার। দিল্লি-বোম্বাই-সুরাট-আমেদাবাদ— সব জায়গার বিল-চালান এখানে জাল হচ্ছে। তা জমা দিলে লরি পার হয়ে যাচ্ছে। কেউ লেজ তুলে দেখছে না। রাধা সামনের দিকে তাকাল। মহাদেবদার গাড়িটা দেখতে পেল না। হয়ত রাস্তা ক্লিয়ার আছে কিনা দেখতে গেছে। প্যাট্রলম্যানের হাতে দশটা টাকা ধরিয়ে দিয়ে সে চালায় ফিরে এল।
টুলের ওপর বসতেই তার ভাবী বধূর কথা মনে পড়ে গেল। আচ্ছা, রমা তার এসব কাজ পছন্দ করবে তো? প্রথম সুযোগেই তার সঙ্গে কথা বলে নিতে হবে। আপাতত আশীর্বাদের আংটিটার অর্ডার দিয়ে দিতে হয়।
রাধা উঠতে যাচ্ছিল। ড্রাইভার এসে খবর দিল, ‘গেট মে গাড়ি পাকাড় লিয়া।’
রাধা ড্রাইভারের মুখের দিকে তাকাল। ড্রাইভার বলল, ‘ম্যায় নে বোলা, লাইসিন ভি হ্যায়, পারমিট ভি হ্যায়, চুঙ্গিকা বিলটিভি হ্যায়। ফির ভি পাকাড় লিয়া।’ রাধা বুঝতে পারল না। সে মান্থলি মিটিয়ে দিয়েছে। প্যাট্রলম্যানের পাওনাও চুকিয়ে দিয়েছে। তারপরেও গাড়ি ধরল কেন? ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করল, ‘কৌন?’
‘ও তো নেহি মালুম। বোলতা হ্যায়, এজেন্টকো বুলাও।’
রাধা গণেশকে পাঠাল। গণেশ ফিরে এসে জানাল, ‘ই টি ও, স্বপন ব্যানার্জি ধরেছে।’
রাধার মেজাজটা খিচড়ে গেল। এই ই টি ওটা এক নম্বরের ছোটলোক। চামার। ঢেমনার একশেষ। লজ্জা তো দূরের কথা, মান-সম্মান বোধও নেই। তখন রাধা সবে মহাদেবদার কাছে ঢুকেছে। ট্যাক্স জমা দেওয়ার জন্য কাউন্টারের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। স্বপন ব্যানার্জি এক শালওয়ালার কাছে শাল দেখছিল। প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে বলল, ‘শালটা পছন্দ। কিন্তু বাড়ি থেকে টাকা আনতে ভুলে গেছি। আপনাদের কারও কাছে আছে। কাল দিয়ে দেব।’
‘আমার কাছে আছে; নিন।’
শালের দাম তিনশো পঁচিশ টাকা রাধা গুনে দিয়েছিল।
চালায় ফিরতেই মহাদেবদা ঠাস করে এক চড় কষিয়েছিল।
‘ওকে তুই টাকা দিতে গেলি কেন?’
‘কাল দিয়ে দেবে তো…!’
‘কাল দিয়ে দেবে! ওই বেটা টাকা ফেরত দেবে? কক্ষনও দেবে না। বরং চাইতে গেলে হিতে বিপরীত হবে। লরির ফিজিক্যাল হবে।’
মহাদেবদার আশঙ্কাই সত্য হয়েছে। স্বপন ব্যানার্জি আজও সে টাকা ফেরত দেয়নি। মাঝে ট্রান্সফার হয়েছিল। আবার ফিরে এসেছে। স্বপন ব্যানার্জি যখন ধরেছে তখন টাকা না নিয়ে ছাড়বে না।
রাধা সলিল সেনের কাছে গেল। সলিল সেন তাকে স্বপন ব্যানার্জির কাছে নিয়ে গেল। স্বপন ব্যানার্জি বলল, ‘আপনার একশো টাকা একজেমশান গাড়ি পাস করার রেট। ও রেটে ট্যাক্সেবল গাড়ি পাস হয় না। ফুল ট্রাক টেরিকটন আছে। দশ টনের কম নয়। এম আই বি রেট লাগালেই বিশ হাজার টাকা ট্যাক্স হবে। আসল বিল ধরলে ত্রিশ হাজারের কম নয়। এমনি এমনি পাস হয়ে যাবে?’
‘কি করতে হবে বলুন স্যার।’
‘অন্তত দু হাজার টাকা লাগবে।’
‘অত টাকা কোথায় পাব স্যার?’
‘পাবেন না, দিতে হবে না। লেবার ডাকুন, মাল আনলোড করুন। কম করে ত্রিশ হাজার টাকা ট্যাক্স হবে। টেন টাইমস পেনাল্টি তিন লাখ টাকা। তিন লাখ ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে মাল নিয়ে যাবেন। আর ফর্ম ফাইভের ফোর্জারি তো আছেই। তার জন্য যা করার পুলিসই করবে।’
স্বপন ব্যানার্জি ডাঁটের মাথায় ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রাধার মনে হল, অজগর যেমন হরিণ শিশুকে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে পিষতে থাকে এরা তেমনি তাকে পাকে পাকে জড়িয়ে ফেলেছে। না মরা পর্যন্ত এদের হাত থেকে মুক্তি নেই। বিয়ের মধ্যে থানা-পুলিস হলে আরও কেলেঙ্কারি। সে সলিল সেনের কাছে হাতজোড় করল, ‘আপনি ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করুন, লরিটা পাস করানোর জন্য আমি মাত্র হাজার টাকা পাব। টাকা আনতে যাওয়ার রাহা খরচ আছে, গণশার খরচ আছে, আমিও পেটের জন্যই ধান্দা করছি। দু হাজার টাকা কোথা থেকে দেব বলুন?’
সলিল সেনের মনটা একটু নরম হল। সে রাধাকে নিজের ঘরে বসিয়ে স্বপন ব্যানার্জির কাছে গেল। ফিরে এসে বলল, ‘সাহেব তো হাজারের নিচে কিছুতেই নামবেন না। অনেক বলে কয়ে পাঁচশো-তে রাজি করিয়েছি। আর কথা বাড়াবেন না কিন্তু!’
রাধা চলে আসছিল। সলিল সেন পিছন থেকে ডাকল। রাধা ঘুরে দাঁড়াতে বলল, ‘এখনই ছাড়বেন না কিন্তু! রাস্তা ক্লিয়ার আছে জেনে, তবে যাবে।’
রাধা সম্মতি জানিয়ে চলে এল। গণেশের হাত দিয়ে টাকাটা পাঠিয়ে দিয়ে বাড়ি চলে গেল।
সকাল বেলায় গণেশ এসে খবর দিল, নরেনরা স্বপন ব্যানার্জিকে ঘেরাও করেছে। জাল কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও সে কেন লরিটা ছেড়ে দিল, তারা জানতে চাইছে।
আবার কী অশান্তি হয়, কে জানে? হোক। তারপরেও যদি দু-নম্বরি কাজ বন্ধ হয়, সে খুশিই হবে। শান্তিতে কাজ করবে। তারা কয়েকজন মিলে কয়েকবারই চেষ্টা করেছিল, দু-নম্বরি করবে না; কাউকে করতে দেবে না। যে মালের যত ট্যাক্স হবে, তাই জমা দেবে। আর কমিশন নেবে।
কিন্তু মাত্র দু-চার দিন। তারপর আবার যে কার সেই। এজেন্টদের মধ্যে প্রতিযোগিতা এত বেশি যে তলে তলে সবাই ট্রান্সপোর্টারদের সন্তুষ্ট করে চলতে চায়। ট্রান্সপোর্টাররা যে সব থেকে কম পয়সায় গাড়ি পার করতে পারে তার কাছে যায়। এজেন্টরা স্টাফদের সঙ্গে আলাদা আলাদা আঁতাত করে নেয়। যে দু-নম্বরি করে না তার রুটি-রুজি বন্ধ হওয়ার জোগাড় হয়। সেই জন্য এসব ব্যাপারে রাধার আর আগ্রহ নেই। তবে এবারকার ঝামেলাটা হচ্ছে তার পাস করা লরি নিয়েই। কাজেই কী হয়, তাকে খবর রাখতেই হচ্ছে।
যা হল তা মোটেই সুখকর নয়। স্বপন ব্যানার্জি লগ বুকে এন্ট্রি করল, ড্রাইভারের কাছে জাল রসিদ ছিল। সে লরিটা আটক করেছিল। ড্রাইভার লরি নিয়ে পালিয়ে গেছে।
ই টি ও-ইন চার্জ তপন সরকার মালিককে নোটিস করল। এন্ট্রির একটা কপি থানায় বড়বাবুর কাছে পাঠিয়ে দিল।
বিয়ের মধ্যে আবার সেই থানা-পুলিস! রাধা ছুটল পঞ্চাননদার কাছে। পঞ্চাননদা পঞ্চায়েতের মেম্বার, রুলিং পার্টির লিডার। সব শুনে ভলল, ‘ও বড়বাবুটার খাঁই খুব বেশি রে। হাজারের নিচে কথা বলে না। তবে ল্যাংড়া আমে খুব আসক্তি। আমি আভাস দিয়ে রাখব। যদি এক ঝুড়ি নিয়ে যেতে পারিস, তাহলে হয়েও যেতে পারে।’
স্থানীয় বাজারে ভাল আম পাওয়া যায় না। রাধা ফ্রুট মার্কেটে গেল। গণেশের মাথায় ঝুড়িটা চাপিয়ে বড়বাবুর বাসায় হাজির হল। প্রথম সুযোগেই পঞ্চাননদার নামটাও শুনিয়ে দিল।
আমের ঝুড়িটা একবার দেখে নিয়ে বড়বাবু বলল, ‘হ্যাঁ উনি হাজার খানেকের মধ্যে মিটিয়ে দিতে বলছিলেন। কিন্তু ফোর্জারি কেস, বোঝেনই তো, অনেকের মুখ বন্ধ করতে হবে। ওতে হবে না। তবে আপনি পঞ্চাননবাবুর লোক! দেড় হাজার দেবেন!’
বড়বাবু এমনভাবে কথাগুলো বলল যে সেটাই চূড়ান্ত। রাধা কিছু বলতেই পারল না।
চেকপোস্টে ফিরে দেখল, ট্রান্সপোর্টের মালিক তার চালায় বসে আছে। টুলের ওপর বসতেই সে নোটিসটা এগিয়ে ধরল, ‘এখন কি হবে?’
রাধার বলতে ইচ্ছে করছিল, এক হাজার টাকায় গাড়ি পাস করালে যা হয় তাই হবে! কিন্তু বলতে পারল না। বলল, ‘ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’
রাধা সলিল সেনকে নিয়ে তপন সরকারের কাছে গেল। তপন সরকার বলল, ‘লিখিত দিলে আমি আর কি বলব বলুন? আমাকে তো অ্যাকশন নিতেই হবে।’
‘তা তো বুঝছি স্যার। কিন্তু একটা ব্যবস্থা না করলে…।’
একটু আড়ালে এসে সলিলবাবু বুঝিয়ে দিল, ‘উত্তরটা জমা দেওয়ার আগে সাহেবের হাতে শ’খানেক টাকা দিয়ে দেবেন।’
রাধা হ্যাঁ-না, কিছুই বলতে পারল না। মনে হল, সে যেন ভাগাড়ে পড়ে থাকা একটা মরা মোষ। আর এরা সব এক-একটা শকুন। এক খাবলা মাংস থাকা পর্যন্ত ছাড়বে না। হাড়ের মধ্যে থেকে মজ্জাও টেনে ছিঁড়ে খাবে।
সে চালায় ফিরে এল। ব্যাক ডেটে একটা রসিদ লিখে মালিকের হাতে দিল ‘এটা জমা দিয়ে দিন। তারপর যা হয় আমি বুঝব।’
মালিক চলে গেল।
রাধা আশীর্বাদের আংটির অর্ডার দিতে গেল।
আশীর্বাদের আর মাত্র তিন দিন বাকি। আংটিটা বুক পকেটে পুরে রাধা বাড়ির বারান্দায় বসে ছিল। বারবার হাত দিয়ে দেখছিল। ভবিষ্যৎ দাম্পত্য জীবনের অনেক ছবি তার মানসপটে ভেসে উঠেছিল।
গোপাল এসে বলল, ‘রাধাদা, পালাও! ওপরে কারা পিটিশান করেছিল। কলকাতা থেকে পুলিস এসে গণশাকে ধরেছে। তোমাকেও খুঁজছে।’
রাধা মুহূর্ত বিলম্ব না করে সরে পড়ল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাড়িতে পুলিস এল। তাকে না পেয়ে তার দুটো খাতা নিয়ে চলে গেল। ভাগ্যিস জাল সিলগুলো সে সরিয়ে রেখেছিল!
রাধা আবার গিয়ে ধরল পঞ্চাননদাকে। পঞ্চাননদা কয়েকবার ফোন করে বলল, ‘নারে! কেসটা নাকি মন্ত্রীর কান পর্যন্ত উঠেছে। ওরা কেউ কিছু করতে পারছে না।’
‘তা হলে?’
‘কদিন গা ঢাকা দিয়ে থাক। ঠিক হয়ে যাবে।’
কিন্তু পরশু দিনই যে আশীর্বাদ। আর মাস খানেকের মধ্যেই বিয়ে। সে কথা পঞ্চাননদাকে বলতে পারল না। রাস্তার হোটেলে ভাত খেয়ে ভাবতে লাগল, কী করা যায়! বাড়িতে থাকা ঠিক হবে না। বলাইয়ের বাড়িতে যাওয়া যেত। কিন্তু বলাই টের পেলে পাত্রীপক্ষ জেনে যেতে পারে! সে মালিকের বাড়িতে গেল। গল্প-গুজবের পর তার সঙ্গেই শুয়ে পড়ল।
সকাল বেলায় বাড়িতে আসতে দাদা মুখ ফিরিয়ে নিল। ছোট ভাইও কথা বলল না। রাধা ভয়ে ভয়ে বৌদির কাছে গিয়ে বসল!
বৌদি বলল, ‘রাতে পুলিস এসেছিল। সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজল। ঘরের সব জিনিস তছনছ করে দিল। আর বাড়িসুদ্ধ লোককে কি জেরা, ‘বাড়িতে নাই কেন? কোথায় গেছে? কোন আত্মীয় বাড়ি? তাদের ঠিকানা কি? কবে আসবে? অফিসে পাঠিয়ে দেবেন। আরও কত কী! বুড়ো মানুষটাকেও রেহাই দিল না।’
এবার দাদা ফেটে পড়ল, ‘তোমার জন্য বাড়ির বেইজ্জতি হল। বংশের মুখে কালি পড়ল। তুমি কোথায় কী করে বেড়াবে; আর রাত দুপুরে পুলিস এসে বাড়িসুদ্ধ লোককে হয়রান করবে, তা চলবে না। তুমি ভিনো হয়ে যাও।’
রাধা মাথা নিচু করল।
ভাই ইঞ্জিনিয়ার। দাদাও কোম্পানিতে কাজ করে। আর সে এন্ট্রিট্যাক্স চেকপোস্টে একটা ক্লিয়ারিং এজেন্ট। এমনিতেই বাড়িতে তার সমাদর নেই। তার ওপর রাত দুপুরে পুলিস এলে তো ভিন্ন হতে বলবেই। সে ভিন্নই হয়ে যাবে। শুধু বিয়েটা পর্যন্ত অপেক্ষা।
মাথা নিচু করে দাদার বকুনিটা হজম করে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
মোড়ের মাথায় বলাইয়ের সঙ্গে দেখা। সে বলল, ‘মেয়েপক্ষ আশীর্বাদের জন্য আরও কয়েকটা দিন সময় চাচ্ছে।’
রাধা বুঝতে পারল, ওরা আর তার সঙ্গে রমার বিয়ে দিতে চাইছে না। এতক্ষণ যার জন্য সে সবকিছু সহ্য করতে পারছিল, সে মুহূর্তে তার সামনে থেকে সরে গেল। তার মনে হল, এ জীবনে কোনও নারীর মধুর কোমল স্পর্শ আর কোনওদিনও পড়বে না।
পুলিস তাকে ধরে নিয়ে যাবে। প্রথমে হাজতে। তারপর জেল। জেল থেকে ছাড়া পেলেও তাকে বেঁচে থাকতে হবে দাগি অপরাধী হিসেবে। আত্মীয়স্বজনরা এড়িয়ে চলবে। প্রতিবেশীরা ঘৃণা করবে। বন্ধুবান্ধবরা করবে করুণা। সে নিজেও কি নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে? কী লাভ এভাবে বেঁচে থেকে? সে মনস্থির করে ফেলল।
সারাদিন পথে পথে ঘুরে বেড়াল। সন্ধেবেলায় একবার প্রাইমারি স্কুলটার কাছে গেল। সেই ছেলেবেলায় বই হাতে পড়তে আসত। জীবনটা তখন কত সুন্দর ছিল। সে জীবন আর কোনওদিন ফিরে পাবে না!
সে বাড়ি ফিরতে লাগল। ফেরার পথে হাই স্কুলটা চোখে পড়ল। এই স্কুলটাও যদি সে পাস করতে পারত! মোড়ের মাথায় এসে থমকে থামল। মণিহারি দোকানটা চালাতে পারলেও আজ তার এ অবস্থা হত না।
রাত হয়ে গিয়েছিল। সে এসে নিজের বিছানাটায় শেষবারের মতো শুয়ে পড়ল। বিছানাটা পরম আদরে তাকে গ্রহণ করল।
খেতে দেওয়ার জন্য এক শিশি ফলিডল বিষ আনা হয়েছিল। বিষের শিশিটা পাশের তাকে ছিল। সে তাক থেকে বিষের শিশিটা পেড়ে নিল। ছিপি খুলে খানিকটা গলায় ঢেলে দিল। বুকের মধ্যেটা জ্বালা করে উঠল। একবার রমার মুখটা মনে পড়ল। তারপর দম বন্ধ হয়ে এল। বিছানার ওপর ছটফট করতে করতে সব অন্ধকার হয়ে গেল। একটা বিরাট পাথর যেন সব কিছু চাপা দিয়ে দিল।
জ্ঞান ফিরতে দেখল, সে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে। কপালে হাত দিয়ে শিয়রে গণেশ বসে আছে।
গণেশ তাকে অনেক খবর দিল। পুলিস তাকে জামিনে ছেড়ে দিয়েছে। রাতে দেখা করতে এসে দেখে, রাধা গোঙাচ্ছে। তার মুখ দিয়ে ফেপড়া উঠছে। গণেশ আতঙ্কে চেঁচিয়ে ওঠে। লোকজন জড়ো হয়ে যায়। মহাদেবদার গাড়ি করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। ডাক্তাররা আশা দিতে পারেনি। তিনদিন পরে আজ জ্ঞান ফিরেছে।
খবর পেয়ে পুলিস গার্ড পোস্ট করে দিয়েছে।
তারা নাকি ইতিমধ্যেই ট্রান্সপোর্টের মালিকের কাছ থেকে দুটো রসিদই সিজ করেছে। খাতার লেখার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছে, রসিদ দুটোর হাতের লেখা তারই। অর্থাৎ জালিয়াতি সে-ই করছে। সুস্থ হয়ে উঠলেই তাকে আদালতে হাজির করা হবে। হবেই তো! সে যে সত্যি অপরাধী!
কিন্তু স্বপন ব্যানার্জি, সলিল সেন, তপন সরকার— ওরা? আর থানার বড়বাবু চণ্ডী ঘোষ? ওরাও তো অপরাধী! তার থেকে অনেক বেশি করে অপরাধী। পুলিস কি ওদের কাউকে ধরেছে? ধরেনি। ধরবেও না।
যারা মাসে মাসে মোটা টাকা মাইনে নেওয়ার পরেও ঘুষ খায়, পুলিস তাদের স্পর্শ করবে না। আর তার মতো যারা পেটের দায়ে তাদেরকে ঘুষ দিতে বাধ্য হয় তাদেরকে ধরে হাজতে পুরবে।
নিশ্চয় ওরাও ভাগ পায়! না হলে এরকম করে কেন? এর কী কোনও প্রতিকার নাই?
ক্ষোভে রাধা পাশ ফিরে শোয়। অল্পক্ষণের মধ্যে সে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
বৌদি এসে বলে, ‘রাধা দেখ তো কে এসেছে!’
রাধা চোখ মেলে চায়। দেখে, বৌদির পাশে একটা লালপাড় সাদা শাড়ি পরে রমা দাঁড়িয়ে আছে! সে তাকাতে রমা মুখ নিচু করে নেয়।
গণেশ ডাকে, ‘রাধাদা, ঘুমিয়ে পড়লে?’ আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে যায়। রাধা চোখ টেনে খোলে। দেখে, বৌদি বা রমা কেউ নেই। সে ফ্যালফ্যাল করে গণেশের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। মুখের ওপাশে চেকপোস্টের চালাটা ফুটে ওঠে।
