শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় : সাপ পোষ মানে না
আমি প্রথমে বলেছিলাম, যাব না। আমি সাধারণ এলেবেলে মানুষ। আপিস করি, বাড়ি যাই। ছুটি-ছাটার দিনে বউকে নিয়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি ভিজিট করি। ওরা চা খাওয়ায়, বিস্কুট-চানাচুর দেয়। ভাজাভুজি, মিষ্টান্ন ছুঁই না আজকাল। ইনটেলেকচুয়ালদের আড্ডায় গেলে মুশকিলে পড়ে যাব। তোমারই অসম্মান হবে।
সত্রাজিৎ ছাড়ে না। বলে, চল চল। ভারি তো সব ইনটেলেকচুয়াল! বাইরে থেকে ওইরকম মনে হয়।
কী বল ভাই, কাগজে ওদের ছবি বেরয়। নিত্য নাম ছাপা হয়। সংবর্ধনা হয়। ওদের কত ফ্যান! বইমেলায় দেখিনি?
টমলিন কোম্পানির সিনিয়র পি আর ও সত্রাজিৎ বলল, আমরাই ওদের ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে রাখি। শুধু ফিল্মস্টার দিয়ে সবরকম প্রাোডাক্ট কভার করা যায় না। লোকে জানতে চায়, প্রতিভাবান ব্যক্তিরা কী বলছে। পুরস্কৃত সাহিত্যিক কোন ব্র্যান্ডের সিগারেট খায়। অর্ধশিক্ষিত লোকের সংখ্যা যে-হারে বাড়ছে। বুঝিস তো।
সেই অর্থে আমিও অর্ধশিক্ষিত। খবরের কাগজ ছাড়া আর কিছু পড়ি না। টিভি দেখি। টিভির প্রোগ্রাম থেকেও অনেক কিছু শিখি। তবে, যাকে বলে গ্রন্থ পাঠ করা, সাহিত্যরস আস্বাদন করা, তত ধৈর্য আমার নেই। বই খুলে বসলেই ঘুম পেয়ে যায়। তার মানে এই নয় যে, যাঁরা কবি, সাহিত্যিক, প্রবন্ধকার— তাঁদের প্রতি আমার অশ্রদ্ধা আছে। বরং উল্টোটাই। তাঁদের প্রতি মনে মনে আমার গভীর সম্ভ্রম। আমি যা পড়ে উঠতে পারি না, তাঁরা কষ্ট করে তাই লিখে চলেছেন, ভাবলে মাথা নুয়ে আসে। তাঁরা জীবনকে খুঁড়ে খুঁড়ে দেখেন, মানুষের মন নিয়ে গবেষণা করেন। কতখানি অন্তর্দৃষ্টি আর একাগ্রতা থাকলে এই সব কাজ করা সম্ভব, আমি অনুমান করতে পারি। আর পারি বলেই বুঝি, আমি নিজে এ সব ব্যাপার থেকে কত দূরে। কত নিচে।
তাই সত্রাজিৎকে বলেছিলাম, তোমার ওই ককটেল পার্টিতে আমায় টেনো না। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে আমি জবাব দিতে পারব না। তখন তোমারই অসম্মান হবে। লোকে বলবে, কোত্থেকে একটা ছাগল ধরে এনেছ। কুম্ভীলক মানে কি, তা জানে না। ম্রিয়মাণ আর মুমূর্ষু বলে একই শোচনীয় অবস্থা!
সত্রাজিৎ বলল, চাল মারিস না। ঘুসি মেরে তোর নাক ফাটিয়ে দেব।
এর কোনও উত্তর হয়! এই কথা শুনে ওর বউ চিনু খিলখিল করে হেসে উঠল। আমি তখন বললাম, আমার ড্রেসও ঠিক সভায় যাওয়ার মতন নয়। তুমি আগে বললে একটু সেজেগুজে আসতাম। ধুতি-পাঞ্জাবি, কাঁধে চাদর, চোখে চশমা তো আছেই— অন্তত বুদ্ধিজীবীর মতন দেখাত আমায়।
ও বলল, এখন কবিরাও বুশ-শার্ট, প্যান্ট পরে। তুই এক কোণে বসে কাবাব, ফিশ-ফিঙ্গার সাঁটিয়ে যাবি। স্কচ প্যাঁদাবি। কেউ গায়ে পড়ে গলাগলি করতে এলে, শুনে যাবি চুপচাপ। মাথা নাড়বি। আর মাঝে মাঝে বলবি ‘আমি বিশ্বাস করি না’, ‘আমি আপনার সঙ্গে একমত নই, মাপ করবেন।’ ব্যস, তাতেই মাতাল পার্টি হড়কে যাবে।
ওর জিদ চেপে গেছে। অগত্যা আমি চিনুকেই জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার বল তো? আমাকে নিয়ে পড়েছে কেন?
চিনুর কথায় ব্যাপারটা পরিষ্কার হল।
মিস্টার আর মিসেস-এর নেমন্তন্ন। চিনু যেতে পারছে না, ওর পা মচকেছে। অথচ বাবুর একজন সঙ্গী চাই। যার মাথা ঠান্ডা। যে ফেরার সময় গাড়ি ড্রাইভ করবে। আপনাকে ও আমার প্রক্সি হিসেবে নির্বাচন করেছে, চিনু বলল। আর খিলখিল করে হাসতে লাগল আবার। আমি সঙ্গে না গেলে সত্রাজিৎ ককটেল পার্টিতে যেতে সাহস পাচ্ছে না। অথচ যাওয়ার খুব ইচ্ছে ওর। এক বিখ্যাত পত্রিকার রজত জয়ন্তী। কলকাতার গণ্যমান্যদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে আসবে না। ঢালাও ব্যবস্থা থাকবে, সুন্দরীরা থাকবে। এ কনসুলেটের চিপ্পুস ককটেল নয়। চিনু হাসতে হাসতে বলল, যান না। আপনার গাড়ি এখানে নিরাপদ। ওকে গেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে আপনি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাবেন। আমি, এখন নয়, নটা নাগাদ ফোন করে আপনার গিন্নিকে জানিয়ে দেব, বাবুর ফিরতে একটু দেরি হতে পারে আজ, তিনি যেন উদ্বিগ্ন না হন।
এইখানে চিনুর সঙ্গে আমার বউয়ের তফাত। বরাবরই ও বরকে মদত দিয়ে গেছে। ওরা দুজনেই জীবন উপভোগ করতে ভালবাসে। হাই সোসাইটিতে ওদের নিবিড় মেলামেশা। তাই তো সত্রাজিৎ চাকরিতে এত উন্নতি করতে পারল। একটার পর একটা চাকরি বদলে বদলে আজ ও টমলিন কোম্পানির সিনিয়র পি আর ও। সুপুরুষ চেহারা, দারুণ বলিয়ে-কইয়ে। ড্রিংক হোলড করতে পারে। সম্প্রতি ওর এক সহকর্মী মোটর দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর থেকে ওই গাড়ি চালানোর ব্যাপারে একটু নার্ভাস, এই যা।
আমরা তো যথাসময়ে— না, যথাসময়ের এক ঘণ্টা পরে আটটা নাগাদ গিয়ে পৌঁছলাম। বড় ব্যাঙ্কোয়েট হল। ততক্ষণে তিনভাগের একভাগ ভর্তি হয়েছে।
ঢোকার মুখেই পত্রিকার স্থানীয় অধিকর্তা তার হেড আপিসের বড়কর্তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে যাচ্ছে, তার আগেই সে-ভদ্রলোক উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠল, হাই জিৎ। তারপর হাত ঝাঁকিয়ে বলল, একা? চিনু কই?
আমি চিনুর প্রক্সি একটু সিঁটিয়ে গেছি, সত্রাজিৎ ভ্রূক্ষেপ না করে লোকটিতে বলল, ওঃ, কতদিন পর দেখা! এডিটর হয়ে তুমি কাগজকে কোথায় তুলে দিয়েছ!
লোকটি, সাফারি স্যুটপরা এক ছোকরা বলা যায়, যে উঠতি সম্পাদক দিলীপ ধুমে, ততক্ষণে আমি বুঝতে পেরে গেছি। একসময় কলকাতায় কাজ করত। এখন কলকাতার সঙ্গে ওর পুরনো বন্ধুত্ব ঝালিয়ে নিতে এসেছে।
ও বলল, ইমেজ। আদর্শ। আমাদের পত্রিকা আগে ছিল করমুক্ত ছবির মতো। ভাল, কিন্তু হল ফাঁকা যায়। আমি সেইটা বদলে দিয়েছি। জানো তো, এখন সব কিছুরই হালকা হাওয়ার দিকে ঝোঁক। জানো তো, এখন আমার সুনামের চেয়ে দুর্নাম বেশি। লোকে কাড়াকাড়ি করে আমার কাগজ কেনে, হাপুশ-হুপুশ শব্দ করে পড়ে ফেলে, তারপর ছিঃ ছিঃ করে। কী ছিল আর কী হয়েছে!
সত্রাজিৎ বেশ গুছিয়ে বলল, তুমি পাঠককে বোরডম থেকে মুক্তি দিয়েছ।
গ্যাসটা খেয়ে গেল দিলীপ ধুমে। আমরা সেই ফাঁকে ব্যাঙ্কোয়েট হলে ঢুকে পড়লাম। সেখানেও শোরগোল পড়ে যায়। হ্যালো জিৎ, হ্যালো জিতু। চিনু কই? চিনু কই? তারপর নতুন অভ্যাগত আসতে না আসতে সেই শোরগোল মিলিয়ে যায়। আমরা দুই বন্ধুতে একটা কোণে গিয়ে দাঁড়াই।
ঠান্ডা মেশিনের আরাম, সিগারেট আর অ্যালকোহলের মৃদু সুঘ্রাণ, তার সঙ্গে আহ্লাদজনিত গুঞ্জরনে পার্টি জমে ওঠে।
ফুটবল মাঠের গ্যালারিতে বসে লোকে যেমন করে খেলোয়াড়দের চিনিয়ে দেয়, সত্রাজিৎ সেইরকমভাবে দূর থেকে আমার সঙ্গে বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিক-সম্পাদক-সাংবাদিকদের পরিচয় করিয়ে দিল। ওদের নামেই চিনতাম।
ওই যে কুমুদ বিশ্বাস, দৈনিক অর্ধসত্যর নিউজ এডিটর। ওই সূর্যকুমার বসু। বেস্ট সেলার। এক নম্বরের ফেরেব্বাজ। ওই দ্যাখ, তিনজন মহিলা ঘিরে রয়েছে যাকে— ওদের কারুর বয়েস পঁয়তাল্লিশের কম নয়, বিউটি পার্লার থেকে খুকি সেজে এসে ন্যাকামি করছে— মুখে সিগারেট, লাইটার দিয়ে সিগারেট ধরিয়ে দিচ্ছে যে, সে হল রূপকমল চৌধুরি। ওকে টিভিতে দেখিস তো। দ্যাখ দ্যাখ, ওই যে ঢকঢক করে গেলাস খালি করে ঠক করে নামিয়ে রাখল— একমাথা পাকা চুল, চিনতে পেরেছিস নিশ্চয়।
আমি বলি, কবি রঞ্জন মুস্তাফি তো?
রাইট। ওর ওই স্বভাব। যা করে, এক নিঃশ্বাসে করে।
একসময় সত্রাজিৎ বলল, মেঘনাদ রায়কে দেখছি না? ও কি এখন বিদেশে? না, তা হলে কাগজে পড়তাম। তৃষ্ণা বসুরায় বিদেশ গেছে আমি জানি, শিকাগোয় তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র্য বিষয়ে সেমিনার হচ্ছে। কিন্তু মেঘনাদ, মেঘনাদ— বলতে বলতে ওর নজর পড়ল আর একজনের ওপর। সে হল প্রতীক নন্দী। বিখ্যাত, কিন্তু জনপ্রিয় নয়। ভেরি পাওয়ারফুল। অফবিট নভেলিস্ট।
সত্রাজিৎ বলল, লেখকদের লেখক। দিলীপ ধুমে ওর চারখানা গল্প ইংরেজি করে ছাপিয়েছে। ও মাল চেনে। মেঘনাদের ইন্টারভিউও ছেপেছে দিলীপ, যাতে ও বলেছিল, কার্ল মার্কস পাঁচশো বছর আগে জন্মালে মানবসমাজ অনেক দুর্গতি থেকে রক্ষা পেত। কী একখানা স্টেটমেন্ট, ভেবে দ্যাখ!’ মেঘনাদ পারে। ওকে ভাবতে হয় না। না হলে একাধারে ডাকসাইটে গ্রন্থকার এবং সাপ্তাহিক কল্পলতার সম্পাদক হতে পারে?
বলতে বলতে প্রতীক নন্দী আমাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। হাতে গেলাস। নিরন্তর দুষ্ট মানুষের প্রতি ঘেন্না পুষে-পুষে ওর মুখ বাঁকা হয়ে গেছে। রোগা চেহারা। ভেতরের দিকে দু-একটা দাঁত ভাঙা হতেও পারে। এক ধরনের লোক থাকে না, সব জায়গায় অন্যায় অনাচার দেখছে, তার প্রতিকার করতে পারে না, না পেরে কেবল কলম ঘষে। তাদের কণ্ঠস্বর আস্তে আস্তে ফ্যাসফেসে হয়ে যায়। রস শুকিয়ে গেলে যা হয় আর কি। প্রতীক নন্দী তাই।
এসেই বলল, টেরাকোটাকে দেখছি না? টেরাকোটা হল মেঘনাদ রায়ের কোডনাম। সত্রাজিৎ জানে। আসলে পোড়ামাটির পুতুল, খেলনাপাতি সাহেবরা দুর্মূল্য শিল্পবস্তু বলে কিনে নিয়ে যায়, এই শ্লেষ আছে ওই নামকরণে। ওদের দুজনের মধ্যে ভীষণ রেষারেষি।
প্রতীক নন্দী এক চোখ বুজে ব্লেডের মতো ধারাল হাসি হাসল।
ওর পাঞ্জাবির পকেটে একটা পাঁইট টের পেয়ে সত্রাজিৎ বলল, এখানে এলাহি ব্যাপার দেখছেন তো। পকেটে ভরে মাল আনার দরকার ছিল? তার ওপর স্বয়ং এডিটর আপনার ফ্যান। চান তো, এখানে শোয়ার ব্যবস্থাও করে দেবে।
আমি লেখকের দিকে তাকিয়ে আছি। ওর বাঁ হাত পাঞ্জবির পকেটে।
সত্রাজিতের কানের কাছে মুখ নামিয়ে ও ফিসফিস করে বলল, মাল না, ওতে সায়ানাইড আছে।
আমি শুনতে পেলাম।
সায়ানাইড?
— হুঁ, হুঁ।
কেন?
টেরাকোটার গেলাসে যাবে। ব্লেডের ফাঁক দিয়ে ও বলল, আজ দেখব, ওর মধ্যে কতখানি সোনা আর কতখানি খাদ। সায়ানাইড ছাড়া এ পরীক্ষা হয় না।
বলতে বলতে সূর্যকুমারের দিকে এগিয়ে গেল প্রতীক নন্দী।
আমি বললাম, আজ একটা কেলো হবে এখানে। চল, আমরা পালাই।
সত্রাজিৎ বলল, ধুর! এরা মুখে অনেক কিছু বলে।
তারপর এক ঢোঁকে গেলাস খালি করে আর একটা তুলে নিল বেয়ারার ট্রে থেকে। ককটেল সসেজ ছিল গরম-গরম, আমরা দুজনে টুথপিক বিঁধিয়ে কয়েকটা তুলে নিলাম।
সত্রাজিৎ বলল, মেঘনাদ আজ আসবে না। এখনও যখন এল না।
আমি বিশ্বাস করি না। আমি তোমার সঙ্গে একমত নই।
আমি মনে মনে বলি, ভয় তুমিও পেয়েছ বন্ধু। এখন প্রার্থনা করছ, ও যেন না আসে। ও যেন প্রাণে বেঁচে যায়।
কিন্তু তা বোধহয় হবার নয়। একটু পরেই দেখি, পাখির মতো ফিনফিনে বউকে সঙ্গে নিয়ে মেঘনাদ রায় হেলতে-দুলতে ঢুকছে। মেয়েদের দল অমনি ছুটে এসে কিচির-মিচির শুরু করে দেয়, এ কী! এত দেরি কেন? আমরা ভাবছি— ও বুঝতে পেরেছি, তোমরা আর কোথাও গিয়েছিলে!
মেঘনাদ ধীরে ধীরে কিন্তু অব্যর্থভাবে হল-এর কেন্দ্রস্থলে গিয়ে দাঁড়ায়।
রঞ্জন মুস্তাফি ততক্ষণে কয়েক গেলাস গিলেছে। ও গিয়ে মেঘনাদকে জড়িয়ে ধরল। একটু কি টলে গেল টেরাকোটা? আমি ভাবি। কার্ল মার্কস যদি আরও পাঁচশো বছর আগে জন্মাতেন, আমি ভাবি। প্রতীক নন্দী গেল কোথায়? ওকে দেখছি না কেন? একসময় সত্রাজিৎও আমার কাছছাড়া হয়ে যায়। ও কি খবরটা দিলীপ ধুমেকে জানাতে গেল?
ব্যাঙ্কোয়েট হলে কোলাহলের শব্দমাত্রা ক্রমে ক্রমে ষাট, সত্তর ছাপিয়ে আশি ডেসিবেলে পৌঁছে গেছে। ঘড়ি দেখলাম, দশটা পঁচিশ। মন্থর মেঘের মতো আড়াই ঘণ্টা সময় কোথা দিয়ে ভেসে চলে গেছে, টের পাইনি।
আমি ভিড়ের মধ্যে ঘুরতে লাগলাম। অনেকেই কোনায়-কোনায় রাখা সোফায় বসে পড়েছে ততক্ষণে। ছোট ছোট দলে আড্ডা দিচ্ছে। কারুর কারুর সঙ্গে আমার ধাক্কাও লাগল। কেন ঘুরছি? কী খুঁজছি, নিজেই মনে করতে পারছি না।
হঠাৎ সাদা ঢাকনা দেওয়া টেবিলের ওপর কতকগুলো খালি, আধাখালি গেলাসের মাঝখানে একটা পাঁইট দেখতে পেলাম। তুলে নিয়ে দেখি তার মধ্যে কিচ্ছু নেই। ছিপি খোলা। ওদিকে বেয়ারার ট্রে থেকে একটার পর একটা সোনালি রঙের গেলাস নিয়েই যাচ্ছে টেরাকোটা। ভ্রূক্ষেপ নেই।
প্রথমে মাথা ঘোরে, তারপর গা গুলোয়। সায়ানাইডের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আমি শুনেছিলাম, তারপর বমি হয়ে গেলে ভাল। না হলে আস্তে আস্তে জ্ঞান হারিয়ে যাবে। অজ্ঞান অবস্থাতেই হার্টের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। আমি ক্রমাগত ভিড়ের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকি। দিলীপ ধুমে গেল কোথায়? ও কি পুলিসে খবর দিতে গেল? আমি দেখতে পাই, প্রতীক নন্দী হাত নেড়ে নেড়ে কুমুদ বিশ্বাসকে বোঝাচ্ছে, ‘সাপ নির্বোধ আর অনুভূতিপ্রবণ। সাপ স্মৃতিশক্তিহীন। সে বেশিদূর দৌড়তে বা তাড়া করতে পারে না। বিপদসঙ্কেত পেলে সে আক্রমণ করে। সাপ পোষ মানে না। প্রতিহিংসাপরায়ণ হবার ক্ষমতা সাপের নেই। এই সব হল বৈজ্ঞানিক সত্য। ভুল মিথ্যা প্রচার করে যারা সাহিত্য করে, তারা ধোঁকাবাজ।’
রূপকমল চৌধুরি বলছে, না, আজ সে গান গাইতে পারবে না। এইভাবে বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেছে, তারপর চোখে পড়ল একটা সোফায় দেহ এলিয়ে মেঘনাদ রায় ঘুমোচ্ছে। তার পাশের সোফায় বসে ওর পাখির মতন ফিনফিনে বউটা আর দুজন মহিলার সঙ্গে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে— আমি না, আমি না… পেলেই কিনব। কেউ মেঘনাদকে দেখছে না।
ছুটে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, মেঘনাদবাবুর কী হয়েছে?
ও বলল, ওইরকম হয়। মাঝে মাঝে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়ে। আর খুব টায়ার্ড। একটু পরেই জেগে উঠবে।
তারপর আবার সঙ্গিনীদের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিল। ও একটা কথার শিশি।
সত্যি, কী পরিশ্রম করতে হয় ব্যস্ত লেখকদের। কী অন্তর্দৃষ্টি আর একাগ্রতা নিয়ে মানুষের মন খুঁড়ে খুঁড়ে কাহিনী বুনতে হয়। নিজেদের ভেতরটা ঝাঁঝরা হয়ে যায় না! ওর বৌটা কিছু বোঝে? লোকে বলে, ও নাকি ভারি অহঙ্কারী। আমি ওর ঘুমন্ত মুখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলাম। কই, অহঙ্কারের কোনও চিহ্ন নেই। আসলে, আমি হয়ত অহঙ্কার না, ওর ঠোঁটের কোণে ফেনা আছে কিনা খুঁজছি— মনে হতেই চোখ সরিয়ে নিই।
আমি বিপন্ন বোধ করলাম। ইচ্ছে হচ্ছিল, দু হাত তুলে চিৎকার করি, ‘লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন, আপনারা কি জানেন, আর কিছুক্ষণের মধ্যে এখানে একটি হত্যাকাণ্ড অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে? এবং সেই খুনিকে আমি চিনি? আপনারা তুরীয় জগৎ থেকে একবার বাস্তবে অবতরণ করবেন দয়া করে, লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন? এর প্রতিবিধান করবেন?’ কিন্তু কে শুনবে?
কপালকুণ্ডলা উপন্যাসে নবকুমারকে তার সঙ্গীরা যখন পরিত্যাগ করে চলে যায়, তখন নদীতীর ত্যাগ করে সে বহুক্ষণ বালুকাস্তূপের চতুঃপার্শ্বে ভ্রমণ করেছিল অন্ধকার রাত্রে। শেষে তাকে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, শীত, সমুদ্রগর্জন ও হিংস্র পশুর ভয় থেকে উদ্ধার করে কাপালিক বলেছিল, মমানুসর। নাকি, মামনুসর। আমাকে অনুসরণ কর।
ঠিক তাই ঘটল আমার বেলাতেও। এতক্ষণ পর হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হল সত্রাজিতের। কনুই দিয়ে পিঠে খোঁচা মেরে বলল, এখানে হাঁ করে কী দেখছিস? চটপট একটা প্লেট নিয়ে আয়। খেয়ে নে। দেখলাম, তার হাতে খাবার ভর্তি প্লেট। কাঁটায় আটকানো মাংসের টুকরো। মামনুসর।
আর অমনি ঘুম ভেঙে সোজা হয়ে উঠে বসল মেঘনাদ রায়। ওর চোখ দুটো টকটকে লাল। পাশে বসা বউকে ডেকে বলল, এই, আমায় খেতে দাও, খিদে পেয়েছে। দেখে তো আমি হতভম্ব।
আমি খেতে খেতে ওর খাওয়াও দেখতে লাগলাম। বেশ স্টেডি। ভাবলাম, আশ্চর্য, হুইস্কির সঙ্গে সায়ানাইড কি হজম করে ফেলল? খাঁটি সোনা নাকি, সম্পাদক-কাম-বিখ্যাত সাহিত্যিক বিদেশ থেকে লিভারে স্টিল জ্যাকেট পরিয়ে এনেছে?
ফেরার পথে আমার হাতে স্টিয়ারিং। বেশ রাত হয়েছে। রাস্তা ফাঁকা। পাশে বসে সত্রাজিৎ কী সব বিড়বিড় করছে, বোঝা যায় না। আমার মাথায় একফোঁটা নেশা নেই। — ব্যাপারটা কী হল, বল তো? আমি জানতে চাই।
— কীসের ব্যাপার?
— ওই যে সায়ানাইড? প্রতীক নন্দী পকেটে করে এনেছিল?
— ব্লাফ! ও শালা একের নম্বরের গুলবাজ।
সত্রাজিৎ জড়িয়ে জড়িয়ে বলল, অবচেতন কাকে বলে জানিস? অবচেতন? ও শালা সবসময় অবচেতনে থাকে। ওকে বিশ বছর ধরে চিনি আমি। ও একটা অসুখ। ওই অসুখ ভাঙিয়ে লেখে শালা। কী যেন একটা ইংরেজি নাম আছে অসুখটার। তুই জানিস?
আমি বলি, স্কিজোফ্রেনিয়া?
উত্তর না দিয়ে ও আবার বিড়বিড় করতে থাকে। করুক গে। ভালয় ভালয় এখন ওকে গেটে ঢুকিয়ে দিতে পারলে আমি বাঁচি।
