লীলা মজুমদার : সেজদিদিমার স্মৃতি পুরস্কার
বাড়ির সকলের মহা ভাবনা! এই নাকি প্রথম সেজদিদিমা আছাড় খেলেন! জন্মাবার পরেই বড় বড় করে চোখ তুলে চেয়ে চেয়ে নাকি আঁতুড় ঘরের কোথাও কোনও খুঁত আছে কিনা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছিলেন। দু-মাসে দিদিমার কোল থেকে নিজেই নেমে পড়ে খুব তাড়াতাড়ি হামা দিয়ে এক মস্ত আরশুলা ধরেই মুখে পুরে দিয়েছিলেন! সঙ্গে সঙ্গে ধর-ধর করে জনা পাঁচেক আধবুড়ি ওঁকে ধরে ফেলে মুখে আঙুল পুরে আরশুলার মরদেহের বাকি অংশগুলো বের করে দিয়েছিলেন। যেটুকু গিলে ফেলেছিলেন তারি ফলে নাকি তাঁর ওইরকম অসাধারণ বুদ্ধি আর অসহিষ্ণু স্বভাব হয়েছিল, এইরকম অনেকেরই ধারণা। অবশ্য ওই হট্টগোলে দেওয়ালে খুব জোরে মাথা ঠুকে গিয়ে খুদে একটা আলু মতো হয়ে গিয়েছিল। তাতেও হতে পারে।
সেকালে এ বাড়িতে মেয়েদের বেশি লেখাপড়া শেখার রেওয়াজ ছিল না। তবে এখন লোকে যাই বলুক, স্কুলে না গেলেও এ বংশের সব মেয়েদের বাংলা লিখতে পড়তে অঙ্ক কষতে বাড়িতেই শেখানো হত। সেজদিদিমা এক কাঠি বাড়া! মাস্টারমশাই যখন ভাইদের অ্যাট ক্যাট করে ইংরিজি শেখানো ধরলেন, মেনিবেড়াল কোলে নিয়ে, দরজার চৌকাঠের ওপর বসে বসে সেজদিদিমা তাঁর মুখখানা দেখে দেখেই মুখে মুখে সব শিখে ফেললেন। তাই শুনে খুশি হয়ে মাস্টারমশাই তাঁকে ভাইদের সঙ্গে বসিয়ে যত্ন করে ইংরিজি, অঙ্ক, ইতিহাস, ভূগোল সব শিখিয়ে দিয়েছিলেন। প্রাইভেটে এনট্রান্স পাস করেছিলেন।
মাস্টারমশাই নিজের ছেলের সঙ্গে এই সাধারণ মেয়ের বিয়ে দিয়ে, কালে কালে তাঁকে প্রাইভেটে ইতিহাসে এম এ পাস করিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি হয়ে দাঁড়ালেন বাড়ির সব ছেলেমেয়েদের কট্টর প্রধানা শিক্ষিকা।
যা একবার চোখে দেখেন, বা কানে শোনেন তা জম্মে ভোলেন না। সে এক ভয়াবহ ব্যাপার। পড়াশুনোর ব্যাপারে কারও আপত্তির কারণ ছিল না, বরং সুবিধাই ছিল। মানচিত্র বা অভিধান খুলতে হত না। তিনিই মানচিত্র তিনিই অভিধান। মুশকিল হল সাংসারিক জীবনের। সামান্যতম ব্যাপারটুকু একবার চোখে দেখলে বা কানে শুনলেই হয়ে গেল। চিরকালের মতো রেকর্ড হয়ে থাকত। অপরাধীর পার পাবার জো ছিল না।
বিশ্বাস কর আর নাই কর, নেতাদের বড় বড় বক্তিমে একটিবার শুনলেই হল। কমা, সেমিকোলন, ভুলভালসুদ্ধ চিরকালের মতো সেজদিদিমার স্মৃতিপটে গাঁথা হয়ে থাকত। এসব নিজেদের চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। তবে ওঁদের ওই দত্তচৌধুরির বংশে ঘটনাগুলো প্রবাদবচনের মতো হয়ে আছে। তাঁর জ্বালায় আত্মীয়স্বজনদের গত পঞ্চাশ বছরের ভুলভালগুলো তাঁদের বংশধরদের অগোচর থাকত না। মাঝে মাঝে তাঁরা আপত্তি করতেন, বলতেন— ‘আমরা নিজেদের বংশধরদের অবজ্ঞার পাত্র হই, এই কি তোমার ইচ্ছে?’
কাষ্ঠ হেসে সেজদিদিমা বলতেন— ‘করবার সময় মনে ছিল না, সব কিছুর ফল ভোগ করতে হয়? ভুল বললে শুধরে দিস। মনে রাখিস ইংরিজিতে একটা প্রবচন আছে— দুটি জিনিস ফিরিয়ে আনা যায় না। ছোঁড়া তীর আর বলা কথা।’
এইভাবে বছরের পর বছর ধরে, তিন পুরুষের সদস্যদের তিনি হাতের মুঠোর মধ্যে পুরে রেখেছিলেন। তাঁর কর্তাটি পর্যন্ত তাঁর কথায় উঠতেন বসতেন। এ বিষয়ে তাঁর প্রাণের বন্ধুর কাছে মাঝে মাঝে আক্ষেপ করতেন। ‘আমার দোর্দণ্ড প্রতাপে কলেজের প্রিন্সিপাল থেকে বেয়ারা পর্যন্ত থরহরি কম্পমান আর নিজের গিন্নির কথায় কিনা ওঠ-বোস করি। ছিঃ!’ বন্ধু বললেন, ‘সব কথা কি আর ওঁর কানে যাওয়া সম্ভব— ওই দেখ কাণ্ড!’
ওই শেষের কথাটুকু বলার কারণ হল যে ওঁর পায়ের কাছে ওঁর পেয়ারের হলদে-কালো মেনি বিড়ালটা শুয়েছিল, সে হঠাৎ উঠে পড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সেজদাদু বললেন, ‘ওই দেখ! নিশ্চয় এইসব কথা লাগাতে গেছে!’ বন্ধু বললেন, ‘আমি বরং উঠি।’
সে যাই হোক। স্বীকার করতেই হবে সেজদিদিমণির অসাধারণ স্মৃতিশক্তির ও কর্তব্যনিষ্ঠার ফলে বাড়ির অবস্থার দিন দিন উন্নতি হতে থাকল এবং তিনি নিজেও ছদ্মনামে একটা বিখ্যাত দৈনিক কাগজের যুগ্ম-সম্পাদিকা হয়ে গত পঞ্চাশ বছরে ঘটা সব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারের ভিতরের কথা ছেপে দিতে লাগলেন। অবশ্য সব নাম পাল্টে। দেখতে দেখতে বাড়ির অবস্থা পাল্টে গেল। ছিল একটা শখের গেরস্থ বাড়ি। এখন হয়ে উঠল একটা সচ্ছল সংসার। তবে সুখ তার মধ্যিখান থেকে কোন সুযোগে সুড়সুড় করে পালিয়ে গেল!
এতই নিঃশব্দে পালিয়েছিল যে গোড়ায় কেউ কিছু টের পায়নি। তারপর একেবারে স্তম্ভিত! এমন সর্বনাশ কেউ কল্পনাও করতে পারেনি! ব্যাপারটা খুলেই বলি। বিশ্বাস কর আর নাই কর, রাতে বাড়িতে কোনও অবিমৃশ্যকারিতায়-ভরা দুঃসাহসিক চোর এসেছিল। হয়ত বা বিদেশি কেউ, যার কাছে সেজদিদিমার খ্যাতি অজ্ঞাত ছিল।
সে যাই হল, হয়ত বাড়ির সবাইকে ধুলোপড়া করে দিয়ে, কিংবা কোনও নিদমন্তর পড়ে বা শিকড়টিকড় পুড়িয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন করে থাকবে। তারপর সেই সুযোগে সেজদিদিমার পুরনো কাগজপত্রের ক্যাশবাক্সটি সরিয়ে, অবিকল সেই রকম আরেকটি ক্যাশবাক্স রেখে, সটকান দিয়েছিল। শেষরাতে ঘুম ভেঙে সেজদিদিমা তার পায়ের গোড়ালি আর দেওয়ালে ছায়া ছাড়া কিছু দেখতে পাননি।
সেই যথেষ্ট! ভয়-ডর বলে তাঁর কিছু ছিল না। উনি যেসব বিষয় লিখতেন, তার কটি নোট-পত্র ছাড়া মূল্যবান কিছু ছিলও না ওই ক্যাশবাক্সে। তাঁর আসল দলিলের ভাণ্ডার তো তাঁর মস্তিষ্কে। ক্যাশবাক্স যে নেবে সে কাঁচকলা পাবে। কিন্তু তার আস্পর্ধা দেখে তাঁর সর্বাঙ্গ রি-রি করে জ্বলে উঠল। তিনি দাদুর লাঠি-গাছি তুলে রে-রে-রে করে তার পাছু নিলেন। সামনের তিন-ধাপ সিঁড়ির কথা মনেই ছিল না। ধপাস করে পড়লেন। মেঝেতে মাথা ঠুকে তিনদিন অজ্ঞান অচৈতন্যি। চোর হাওয়া।
সেই তিনদিন সকলের উদ্বেগ-আতঙ্কের শেষ ছিল না। তবু অনেককাল বাদে বাড়িতে যে এরকম শান্তি বিরাজ করছিল, সেটাও মানতেই হবে। কিন্তু সে শান্তি বড় দুঃখের।
এক-দুই-তিন করে সাতদিন ওইভাবে কাটল। বাড়ি যেন বোবা। সেজদিদিমা একাই বাড়ি মাথায় করে রাখতেন, আর সকলে হয় চুপ করে থাকতেন, নয়ত ফিসফিস করে কথা বলতেন। হয়ত তার কারণ হল তার বেশি কিছু করবার সুযোগই পেতেন না। তাছাড়া তাঁর কোনও ব্যবস্থাপনায় আপত্তি করার কোনও সঙ্গত কারণ পাওয়া যেত না। প্রত্যেকটার ফল লাভজনক হত। সবাই তার যথেষ্ট ভাগ পেতেন। না চাইতেই পেতেন। কিছু বলার সাহস কারও হত না।
তবে একটা প্রাকৃতিক নিয়ম আছে যে আধারে যতখানি ধরে, তার বেশি ঠুসে দেবার চেষ্টা করলে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। তাই সেজদাদু তাঁর প্রাণের বন্ধু, পূর্বোক্ত বদ্যিনাথ সামন্তর বাড়ি রোজ বিকেলে একবার (স্বাস্থ্যের কারণে হাঁটতে যাবার অছিলায়) গিয়ে মনের কথা প্রাণের কথা উজাড় করে দিয়ে আসতেন। শুনে বদ্যিনাথ মহা রেগে যেতেন। বলতেন, ‘তুমি কি একটা মুগুর ভাঁজা, সাঁতারকাটা পুরুষমানুষ, নাকি একটি কিঞ্চিলিকা?’
শুনে আশ্চর্য হয়ে সেজদাদু বললেন, ‘কিঞ্চিলিকা আবার কি?’ পরম পণ্ডিতের বিদ্যের দৌড় দেখে কাষ্ঠ হেসে বদ্যিনাথ সামন্ত বললেন, ‘কিঞ্চিলিকা হল কেঁচো।’ খানিক ভেবে সেজদাদু বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি কিঞ্চিলিকা। তা ছাড়া উপায় নেই।’ রেগেমেগে সামন্ত বললেন, ‘আছে উপায়। সেটাকেই অবলম্বন করতে হবে। অত কথা কারও মনে থাকতে পারে না, মানে সেটা ফিজিকেলি ইমপসিবল। কোথাও নিশ্চয় নোট করা থাকে। ওঁর ডাইরি নেই?’
‘না, তা নেই। তবে একটা মান্ধাতার আমলের ক্যাশবাক্স আছে। খোপ খোপ করা। খরচের রেজকি পয়সাকড়ি, রসিদ ইত্যাদি রাখেন। ওপরের ট্রেটা তুলে তলায় অবিশ্যি গোপন কাগজপত্র থাকতেও পারে। তবে আমায় গিন্নি এত কথা বলেন যে গোপন কিছু থাকা সম্ভব মনে হয় না।’
সামন্ত বললেন, ‘ওই বাক্সটি হাতাতে হবে। তবেই ঠাকরুণ পোষ মানবেন। খুব মূল্যবান বাক্স নাকি?’
‘আরে না, না। তখন কি আর মূল্যবান কিছু কিনবার সামর্থ্য ছিল আমাদের? বিদ্যা নিয়েই ধুয়ে খেতাম। এখনকার সচ্ছলতার সবটুকুই আমার গিন্নির কৃতিত্ব!’
সামন্ত চটে গেলেন, ‘ওই দুর্বলতাটাই তোমার কেঁচোমির কারণ। সে যাক গে। তাহলে ওরকম আরেকটা ক্যাশবাক্স দুষ্প্রাপ্য নয়?’ ‘আরে না, না, বড়বাজারের যে কোনও দোকানে পাওয়া যায়। সেকেন্ডহ্যান্ডের জলের দর। তাছাড়া আমাদেরই টং-এর গুদোমঘরে ওর জোড়াটা আছে চাবিসুদ্ধ।’ ‘ব্যস, আর বলতে হবে না। আমাকে কিছু জিজ্ঞাসাও কর না। তুমি যা। অমনি নিজেই গিন্নির কানে তুলে দেবে। আজ মতলবটা পাকাই, কাল কার্যে পরিণত করা যাবে। তুমি নাক গলিও না।’
এ বিষয় আর কিছু উচ্চবাচ্যও করেননি সেজদাদু। আর দুদিন পরেই তো ওই কাণ্ড। ভয়ে সেজদাদুর হাত-পা হিম! তার ওপর সামন্তর টিকির দেখা নেই! তাঁর বাড়িতে দুঃসংবাদটি দিতে গিয়ে বড় নাতি মনু ফিরে এল। তিনি নাকি নিখোঁজ। বাড়িতে কান্নাকাটি পড়ে গেছে। চারদিকে চররা তাঁকে খুজে বেড়াচ্ছে। পুলিসে খবর দেওয়া হয়েছে। সেজদাদু একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন। গিন্নির ওই অবস্থা। বন্ধু নিখোঁজ। তাঁকে সাহায্য করতে গিয়েই বন্ধুর কি সর্বনাশ হল কে জানে। হই হট্টগোল শুনে সে রাতে ওই পলায়মান ছায়া সেজদাদুও দেখেছিলেন আর সে যে কার ছায়া, সেটুকু বুঝতে তাঁর এক দণ্ডও দেরি হয়নি। সমস্ত সর্বনাশের জন্য তিনি নিজেকে ছাড়া কাউকে দায়ী করতে পারছিলেন না।
এদিকে সেজদিদিমা তেমনি কাঠ হয়ে পড়ে আছেন। পাশে অবিনাশ ডাক্তারবাবু আর বড়কাকি ওষুধ, ব্র্যান্ডি ইত্যাদি নিয়ে দিনরাত ব্যস্ত। আত্মীয় বন্ধুদের সারাদিন আসা যাওয়া। এরই মধ্যে সপ্তম দিনে হঠাৎ চোখ খুলে, অপ্রসন্ন কণ্ঠে সেজদিদিমা বললেন, ‘কোথাকার না কোথাকার কে না কে মতলবি লোক রটাল বন্দুকের গুলিতে গরু শুয়োরের চর্বি দেয়। দাঁত দিয়ে খোলস ছাড়াবার সময় হিন্দু মুসলমান দুজনারই জাত যায়! আর বলা নেই কওয়া নেই অমনি সেপাইরা সব মার-মার কাট-কাট করে ক্ষেপে উঠল! শুরু হয়ে গেল সিপাহি বিদ্রোহ! কোয়ার্টারের জানলা দিয়ে তাই দেখে বেকুব বনে গেলাম।’
শ্রোতারা সব নিঃশ্বাস বন্ধ করে বলল,— ‘তারপর? তারপর?’
সেজদিদিমা বললেন, ‘তারপর আর কী? হিসেবরাখা কেরানিবাবুরা রাতারাতি সপরিবারে বারাকপুর থেকে সটাং কলকাতা! বলে বাঁচলে পরে অন্য কথা। সেই ইস্তক আমরা কলকাত্তাই বনে গেছি।’ এই বলে ফিক করে হেসে সেজদিদিমা আবার চোখ বুজলেন। বাড়ির সকলে তাজ্জব বনে গেল।
সেই হল শুরু। একটু একটু করে সেজদিদিমার পূর্বজন্মের কথা মনে পড়ে আর তার হুবহু বর্ণনা দেন। সাল, তারিখ, অকুস্থল-সহ। মহারানী ভিক্টোরিয়ার প্রতি ভারি ভক্তি দেখা গেল। তিনিই তো সব ভাল ভাল আইনকানুন বেঁধে দিয়ে, খুনেদের ছাড়া আর সবাইকে বেকসুর খালাস দিয়ে সব গোলমাল মিটিয়ে দিলেন। আজ পর্যন্ত তাঁর ওই ভাষণের ভিত্তিতে আইনকানুন চলছে। তার ওপর সামান্যই রদবদল হয়েছে। স্বয়ং যুবরাজ ভারতে এলেন, দিল্লিতে দরবার হল। সে এক দেখবার জিনিস। চোখের সামনে ভাসে। — এই বলেই আবার চোখ বন্ধ।
ডাক্তার বললেন— ‘কোনও চিন্তার কারণ নেই। শরীরে শক্তি ক্রমে ফিরে আসছে। এইরকম একটা বড় আঘাতের পর রোগীরা অনেক সময় কিছুদিন ভুল বকে। তারপর আবার প্রকৃতিস্থ হয়।’
আত্মীয়-বন্ধুরা শুনে ভারি বিরক্ত। ভুল বকা আবার কী? এ তো স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে সেজদিদিমার পূর্বজন্মের কথাও এতদিনে মনে পড়ছে। তা পড়বে না? কি প্রখর স্মৃতিশক্তি, সেটা ভুললে তো চলবে না।
এই আশ্চর্য ব্যাপার চারদিকে রটে যায়। চেনা-অচেনা লোকে শুনতে আসে। বলাবাহুল্য ডাক্তারবাবু দরজায় খিল দিতে বলেছেন। আরও বলেছেন, তেমন বুঝলে ডালকুত্তো এনে সদর দরজায় বেঁধে রাখবেন।
বাড়ির ছেলেমেয়েদের কিন্তু একটা মস্ত উপকার হল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ অর্ধেকের ভারতেতিহাস একেবারে নখাগ্রে এসে গেল।
গিন্নির শারীরিক উন্নতি দেখে সেজদাদু যেমনি খুশি, তাঁর মানসিক বিভ্রান্তির কারণে তেমনি চিন্তিত। হ্যাঁ, মানসিক বিভ্রান্তি ছাড়া আবার কি?
এই সময় দৈবাৎ বিধাতার ইচ্ছায় সমস্ত বিপদ কেটে গেল। ততদিনে দুই সপ্তাহ কেটে গেছে। সেজদিদিমা বালিশে ঠেস দিয়ে উঠে বসেছেন। নার্সকে নিষ্কর্মা বলে ভাগিয়েছেন। ডাক্তারকে বড় বড় কথা বলার জন্য তাড়া দিয়েছেন। ডাক্তারের মা তাঁর সই বলে ডাক্তারও কিছু মনে করেননি, বরং তেড়ে তর্ক করেছেন।
হেনকালে রোগা ফ্যাকাশে একটা বদ্যিনাথ সামন্ত সেজদিদিমার পেয়ারের পুতি বলাইকে ধরে এনে হাজির করলেন। বললেন, ‘বলাই, এবার সকলের সামনে বল কি নিয়ে তোরা এত আমোদ করছিলি।’
এই বলে অবিকল সেজদিদিমার বাক্সের মতো একখানি ক্যাশবাক্স, সেজদাদুর হাতে দিয়ে, হনহন করে চলে গেলেন। সেজদাদু বাক্স খুলে দেখেন ওপরের ট্রে-তে একটা সোনার মাদুলি আর তলার খোপে একটা পুরনো ডাইরি। তার ওপর সবুজ কালি দিয়ে কাঁচা হরফে এবং ভুল বানানে লেখা শ্রীমতী কৃষ্ণপ্রিয়া দাসীর দিনপঞ্জিকা ইতি। খাতাটা সত্যিই একটা ডাইরি বলে মনে হয়। সম্ভবত বহুকাল আগে সেজদিদিমা ঘর গুছোতে গিয়ে ওটিকে খুঁজে পান এবং মুগ্ধ হয়ে পড়েন। পরে পরিবারের মানুষ বাড়লে বাক্সটা যেমন ছিল সেই অবস্থাতেই টং-এ স্থান পেয়েছিল। এবং বাড়ির নাতি-পুতিরাও ওই টংটিতে নিরিবিলি আস্তানা পেয়ে, নিজেদের ঘাঁটি বানিয়েছিল। তারাই সম্ভবত হাবিজাবির সঙ্গে ওই ক্যাশবাক্স ঘেঁটে পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করে পড়ে খুব আমোদ পেয়েছিল। তারপর সেজদিদিমার মুখেও গড়গড়িয়ে ওইসব কথা শুনে, বোধহয় হকচকিয়ে গিয়ে আর কিছু বলেনি।
সামন্তদাদু চুপিসারে টং-এ উঠে ওই ক্যাশবাক্সের হদিশ পান। কিন্তু সরানো আর হয়ে ওঠেনি, স্বয়ং সেজদিদিমার বীরবিক্রমের কারণে। তাঁর পা মচকে, সর্বাঙ্গ ছড়ে গিয়ে, এক বন্ধুর বাড়িতে লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল। সেজদিদিমা আর তাঁর বংশধররা অন্য জাতের প্রাণী। ওরা সব পারে।
এর একটা ভাল ফল হল। সেজদিদিমার মাথার ঘোর কেটে গেল। তিনি প্রকৃতিস্থ হলেন। পাণ্ডুলিপিটার কথা তিনি কখনও ভাবেননি। তখন বয়সও কম ছিল, অভিজ্ঞতাও ছিল না। এখন যেন হাতে চাঁদ পেলেন। লেখার হাত ক্রমে ক্লান্ত হয়ে আসছিল। এবার ধারাবাহিকভাবে, হুবহু যেমন আছে, প্রতি শনিবার তেমনি ছেপে দেবেন। শ্রোতারা লুফে নেবে।
আহ্লাদে গদগদ হয়ে ডেকে বললেন, ‘কোথা গেলি বাবা বলাই, এই মাদুলিটা তোকে দিলাম। মায়ের কাছে রেখে দে।’ আহা, বংশধর বলে কথা। ডাক্তারকে বললেন, ‘খেঁদুবাবা, আজ বড় সুখের দিন। তুমি দুপুরে খেয়ে যাবে।’
