প্রচেত গুপ্ত : ভালবাসার বাড়ি

প্রচেত গুপ্ত : ভালবাসার বাড়ি

এই মুহূর্তে কেউ যদি আমাদের বাড়িতে ঢোকে তাহলে থমকে দাঁড়াবে। কপালে ভাঁজ পড়বে। ঠিকানা কি ভুল হল? অন্য বাড়িতে ঢুকে পড়েছে? নাকি এ বাড়িতে হঠাৎ কোনও শোকের ঘটনা ঘটেছে? এত চুপচাপ কেন। এরকম তো হওয়ার কথা নয়।

আমি ঘরে চুপ করে শুয়ে আছি। সারি ঘরে বেশ কয়েকবার আসা যাওয়া করছে। খুটুরখুটুর করছে। একবার আলমারিটা খুলে বন্ধ করল। একবার আলনার কাপড় পাট করল। মনে হয়, মেয়েটা আমাকে কিছু বলতে চায়। আমার বোন আমাকে যেমন ভালবাসে তেমন ভয়ও করে। ভয় করবার কোনও কারণ নেই। হালকা পলকা শাসন করলেও আমি কখনও বকাঝকা মারধর করিনি। এখন তো বড়ই হয়ে গেছে। সম্ভবত আমাদের বয়সের পার্থক্যের কারণে এমনটা হয়েছে। সারি এবার খাটের পাশে এসে দাঁড়াল।

‘দিদি, অ্যাই দিদি।’

আমি সাড়া দিলাম না। বাঁ হাতটা যেমন আড়াআড়ি ভাবে চোখের ওপর চাপা দিয়ে শুয়েছিলাম তেমনই রইলাম। সারি ফিসফিস করে উঠল, ‘মাথা ধরেছে? টিপে দেব?’

আমি হাত না সরিয়ে বললাম, ‘কী বলবি তাড়াতাড়ি বল। বলে ঘর থেকে যা।’

সারি বালিশ সরিয়ে আমার মাথার কাছে বসল। গায়ে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল, ‘দিদি, তিনশোটা টাকা দেবে?’ এবার হাত সরিয়ে অবাক চোখে তাকালাম। তেরো বছরের মেয়ে একসঙ্গে তিনশো টাকা চাইলে অবাক হবারই কথা। অভাবের সংসারে বেশি অবাক হবার কথা। তাছাড়া সারি তো জানে এখন অনেকগুলো টাকা খরচ হচ্ছে!

‘তিনশো টাকা! এত টাকা কীসে লাগবে?’

জানলা দরজা বন্ধ রাখবার কারণে ঘর ছায়া ছায়া। আজ আমি উঠেছি খুব ভোরে। তখনও ঠিক ফোটেনি। তখন আকাশ ছিল মেঘলা। ফট করে মাথাটা ধরে গেল। জোরে ধরা না, টিপটিপে ধরা। এই মাথা ধরা খুব বিশ্রী। ঘ্যানঘ্যানে বৃষ্টির মতো। সহজে ছাড়তে চায় না। মা বলল, ‘চা খেয়ে আবার খানিকক্ষণ শুয়ে থাক। চন্দনারা এলে উঠবি।’

আমি বিরক্ত মুখে বললাম, ‘এসব ঝামেলার কী দরকার ছিল?’

মা রান্নাঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, ‘যা নিয়ম তা তো করতেই হবে।’

‘এই জন্যই তো আমি নিয়ম টিয়ম কিছু চাইনি।’

মা কল খুলে সসপ্যানে জল ভরতে ভরতে শান্ত গলায় বলল, ‘শুধু তোর চাওয়াই তো সব নয়, অন্যের চাওয়াচায়িও আছে। সমাজে থাকতে হলে সেগুলোও কিছু কিছু শুনতে হয়।’ মা একটু থেমে বলল, ‘যা, চা খেয়ে একটু ঘুমো। মাথা ধরা ছেড়ে যাবে।’

‘তোর চাওয়া’ বলে মা আমাকে খোঁচা দিল। কথা বাড়ালাম না। উঠোনে নেমে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। বাইরের বাতাসে যদি মাথা ব্যথাটা ছাড়ে। অনেক দূরে, জল জল আকাশ দিয়ে কটা পাখি উড়ে গেল। এরা কি রাত জাগা পাখি? বাড়ি ফিরছে?

আমাদের এই বাড়িটা পুরনো দিনের। কলকাতায় এ ধরনের বাড়ি চট করে আর চোখে পড়ে না। মফসসল শহরে এখনও আছে। বাড়ির সামনে লম্বা বারান্দা। বারান্দার পাশাপাশি ঘর। বারান্দা থেকে নামলে উঠোন, তারপর গেট। গেটের সামনে একফালি জায়গা। জায়গাটা গোটা বর্ষাকাল জল কাদায় মাখামাখি হয়ে থাকে। ইট পেতে দিতে হয়। বেশি বৃষ্টি হলে নর্দমা উপচে সেই ইটও ডুবে যাবে। ক’দিন বৃষ্টি হয়নি বলে বাঁচোয়া। একটা সময় বাড়ির সামনেটা বে-আব্রু গোছের ছিল। রাস্তা থেকেও দেখা যেত। একদিন মা বাবাকে বলল, ‘বাড়িওলাকে বল না, বারান্দায় গ্রিল লাগিয়ে দিক।’

বাবা ঝাঁঝ নিয়ে বলল, ‘ইস মামাবাড়ির আবদার। বাড়িওলাকে বললেই হল, এসে গ্রিল দিয়ে মুড়ে দিয়ে যাবে। কত খরচ হবে বলো তো? ধারণা আছে? ওই কটা টাকা তো ভাড়া দিই। এই ভাড়ায় ভদ্রলোকের মতো বাড়ি জুটবে? এর ওপর গ্রিল, গরাদ, কপাট, সিংহদরজা সব চাই, ঘাড় ধরে বের করে দেবে।’

একটা সময় আমাদের সংসারে দাপট ছিল বাবার। যে কোনও নড়বড়ে বা ভুল যুক্তি বাবা জোরের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করত। যা বলবে সেটাই ঠিক, সেটাই হবে। বেশিরভাগ সময়েই এটা হত অর্ডারের কায়দায়। অর্ডার মানতে হবে। কোনও প্রশ্ন তুললে ধমক। আমরা তো ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতাম। কথা না শোনায় বা কথা শুনতে দেরি হওয়ায় চড় চাপড়ও খেয়েছি। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি, বাবার সামনে মাও কেমন গুটিয়ে থাকতে অভ্যস্ত। তবু সেদিন মুখ খুলেছিল।

‘ভাড়া কম বলে এখন হাটখোলা বাড়িতে থাকতে হবে?’

বাবা রাগের সঙ্গে বিস্ময় মিশিয়ে বলল, ‘এতদিন তো রইলে! আর হাটখোলা মানে? খোলা আকাশের তলায় তোমাদের রেখেছি নাকি?’

মা গলা নামাল, কিন্তু তর্ক থামাল না। নিচু গলায় বলল, ‘মানি বড় হচ্ছে। ছেলেরা বাড়ির সামনে ঘোরাঘুরি করে।’ আমি যে বড় হচ্ছি, এটা সম্ভবত বাবার খেয়াল ছিল না। একটু যেন থতমত খেয়ে গেল। চুপ করে রইল কয়েক মুহূর্ত। তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, ‘গ্রিল দিলে ছেলেদের ঘোরাঘুরি বন্ধ হবে?’

মা বলল, ‘আঃ আস্তে বল। মেয়ে শুনতে পাবে।’ ঘরে বসে আমি সব শুনেছি। খানিক পরেই যুক্তি খুঁজে বাবা কঠিন গলায় বলল, ‘গ্রিল দিয়ে কী হবে? মেয়ে তো আর সবসময় গ্রিলের ভিতর থাকবে না। সে তো বাইরেও বেরোবে। মেয়েকে সামলে সুমলে রাখতে হবে। শুধু ছেলে ছোকরাদের দোষ দিলে হবে কেন? তারা কেন বাড়ির সামনে ঘুরছে দেখতে হবে। সাহস পাচ্ছে কোথা থেকে? মেয়েকে শাসন কর।’

আসলে বাবা বাড়িওলাকে বলতে চায়নি। ভদ্রলোক কলকাতায় থাকেন। এই বাড়ি মেরামত টেরামত যেমন করেন না, তেমন ভাড়াও বাড়ান না। এমনকি ভাড়া দিতে দেরি হলে তাগাদাও দেন না। বাবাও ভদ্রলোককে ঘাঁটায় না। ঘাঁটাবে কেন? আজকালকার দিনে শহরে কেন, বনেবাদাড়েও এত কম টাকায় দুখানা ঘর, বাথরুম, রান্নাঘরের বাড়ি পাওয়া যাবে না। ছাদের চাবিও আমাদের কাছে। তবে শেষ পর্যন্ত বাবাকে গ্রিলের কথা বলতে হল। আমার জন্যেই হল। এক আধা বিকেল আধা সন্ধেবেলা পাড়ার মন্টু না ঝন্টু নামের এক বখা টাইপ ছোকরা ফট করে বাড়ি পর্যন্ত চলে এলও। আমি আর মা বারান্দায় বসে চা-মুড়ি খাচ্ছিলাম। ছেলেটা গেট খুলে উঠোন পেরিয়ে একেবারে উঠে আসে আর কী!

‘মাসিমা, এক গ্লাস জল পাওয়া যাবে?’

রাতে বাবা বাড়ি ফিরে এসে শুনল। চাপা গলায় হুঙ্কার দিল, কালই বেয়াদব ছেলেকে খুঁজে বের করব। ধরে কান টেনে ছিঁড়ে ফেলব। এত বড় সাহস! ছেলের নাম কী বললে?’

মা শান্ত গলায় বলল, ‘নাম জেনে কী হবে? কী বলবে? কেন জল চাইতে গিয়েছিলি? কতজনের কান ছিঁড়বে? এখন বিকেল বিকেল এসেছে, এরপর রাতে আসবে। হয় বাড়ি বদলাও, না হয় আগল দাও।’

বাড়িওলা গ্রিলের কথায় রাজি হলেন না। হবার কথাও নয়। অনেক খরচ। তবে বাবাকে বললেন, ‘আপনি যদি পারেন ব্যবস্থা করে নিন।’

বাবা ফ্যাক্টরি থেকে লোন নিল। বারান্দায় খানিকটা ইটের গাঁথনি, একটা সেকেন্ড হ্যান্ড জানলা, খানিকটা গ্রিল আর একটা কোলাপসেবল বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। গ্রিলে চটের বড় বড় ঝোলা পর্দা। দড়ি দিয়ে টেনে ওপরে তুলতে হয়। বাইরের আলো বাতাস কমে গেলেও, বারান্দার একটা দিক একটা ঘরের মতো হয়ে গেছে। বারান্দা-ঘর। টিউব লাইট, টেবিল ফ্যান হয়েছে। বেতের চেয়ার, মোড়া, নিচু টেবিল হয়েছে। বাইরের লোকজন এলে বারান্দা ঘরে বসে। আমি একসময় পড়াশোনা করেছি। এখন সারি পড়ে। ঘরটা হবার পর মাকে মজা করে বলেছিলাম, ‘ভাগ্যিস মেয়ে হয়ে জন্মেছিলাম, আমার জন্য দুম করে একটা ঘর পেয়ে গেলে বল। যদি ছেলে হতাম, বাবা অমন ঝামেলা করে বারান্দা ঘিরত? দেখেছ তো মেয়ে হবার কেমন সুবিধে? অবশ্য এর খানিকটা ক্রেডিট ওই ছেলেটারও রয়েছে।’

মা অবাক হয়ে বলে, ‘ছেলেটার! কার?’

‘সে কী মা! এর মধ্যে ভুলে গেলে? কী অকৃতজ্ঞ রে বাবা! ওই যে মন্টু না ঝন্টু। সেদিন জল খেতে যদি বাড়ি পর্যন্ত চলে না আসত, ভাবছি, দেখা হলে একটা ধন্যবাদ দেব। ডেকে এনে বারান্দা ঘরে বসিয়ে চা-বিস্কুট খাওয়াতেও পারি।’

মা হেসে বলেছিল, ‘একটা চড় খাবি।’

সকালবেলা চা করে মা যখন আমাকে দিতে এল, দেখি মায়ের চোখে জল। আমি কাপ হাতে নিয়ে বললাম, ‘আবার শুরু করলে?’

মা বিড়বিড় করে বলল, ‘ভাল থাকিস বুলি। সাবধানে থাকিস।’

আমার মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। নিজেকে সামলে, বানানো ধমক দিয়ে বললাম, ‘তুমি থামো তো। একে মাথা ধরেছে, তারপর আবার প্যানপ্যানানি শুরু করলে। ক’দিন ধরেই তো চলছে।’

মা আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল। নিশ্চয় রান্নাঘর বা বাথরুমে গিয়ে খানিকক্ষণ কাঁদবে। কাঁদুক। এ কান্না থামানোয় আমার কোনও ভূমিকা নেই। এটা মায়ের নিজের কান্না।

চা খেতে ভাল লাগল না। গা কেমন পাক দিল। তাও খেলাম। মা করেছে বলেই খেলাম। চায়ের কাপ রান্নাঘরে নামিয়ে ঘরে এসে শুয়ে পড়েছি। আধো তন্দ্রার মধ্যেই বুঝতে পারলাম সারি ঘরে ঢুকেছে। সে টাকার কথা বলায় আমি অবাক হলাম।

‘কীরে চুপ করে আছিস কেন? বল টাকা কীসে লাগবে?’

সারি আমার ঘাড়ের কাছে মুখ নামিয়ে বলল, ‘চুল বাঁধব।’

আমি গা থেকে সারির হাত সরিয়ে দিয়ে বললাম, ‘মানে!’

‘সন্ধ্যাদির পার্লারে চুল বাঁধতে অনেক টাকা নেয়, হাজার, দু’হাজার… আমাকে বলেছে, তোকে তিনশো টাকায় করে দেব।’

আমি জোর ধমক দিতে গিয়েও নিজেকে সামলালাম। আজ ছোট বোনকে ধমক দেওয়ার দিন নয়। আর ছোট মানে, সারি তো আমার থেকে দুই, তিন বা পাঁচ বছরের ছোট নয়, ডবলের থেকেও বেশি ছোট। সে যখন হয় তখন আমার একদম ভাল লাগেনি। কীভাবে যেন স্কুলে খবর রটে গেল মা প্রেগন্যান্ট। বন্ধুরা আমার দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসত। মনে আছে, আশাবরী নামের একটি মেয়ে একদিন আমাকে সিরিয়াস মুখ করে বলেছিল, ‘বল্লরি, রাতে তুই কোথায় শুস?’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘মানে! কোথায় আর শোব, ঘরে শুই।’

আশাবরী জেরা করবার ভঙ্গিতে বলল, ‘একা ঘরে শুস?’

আমি বললাম, ‘না তো! আমি শুই মায়ের কাছে, বাবা আলাদা ঘরে। আমাদের তো দুটো ঘর। সেই ছোটবেলা থেকেই এরকম।’

আশাবরী বন্ধুদের দিকে মুখ ফিরিয়ে গম্ভীর ভাবে মাথা নাড়ল। বলল, ‘তাহলে তো খুবই রহস্যের ব্যাপার। বাবা-মা আলাদা শোয়, তারপরেও বল্লরির কীভাবে ভাই হচ্ছে? চিন্তার বিষয়।’

সবাই ‘হো হো’ করে হেসে উঠল। প্রথমটায় বুঝতে না পারলেও, কয়েক মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পারি, ওরা কেন হাসছে। মুখ লাল হয়ে যায় লজ্জায়। রাগে, অপমানে চোখ ফেটে জল আসতে চায়। সেই রাগ অপমান যেমন মায়ের ওপর ছিল, জন্মের পরও বেশ কিছুদিন সারির ওপরও ছিল। আর আজ আমি যে তাকে কতই না ভালবাসি! সারির ভাল নাম সারণী। এই নাম আমারই দেওয়া। সারির গালে হাত রাখলাম। হেসে বললাম, ‘এত টাকা দিয়ে চুল বাঁধবার কী খুব দরকার আছে?’ সারি নাক কুঁচকে আবদারের ঢঙে বলল, ‘খুব দরকার আছে। আমি চাই, আজ আমাকেও তোমার মতো সুন্দর লাগুক।’

‘কই আমি তো কোথাও সাজতে যাচ্ছি না!’

‘তুমি তো খুব সুন্দর দিদি। এত সুন্দর যে না সাজলেও চলে।’

সারির পুরো কথাটা না হলেও অনেকটাই ঠিক। মনে হয়, বেশিটাই। সবাই বলে, আমাকে সুন্দর দেখতে। গায়ের রঙ ফর্সা না হলেও এক ধরনের জৌলুস আছে। কারও কারও মতে কটকটে ফর্সা ভাল না। বোকা বোকা লাগে। আমার মতো ভাঙা রঙ নাকি মেয়েদের আকর্ষণীয় করে আবার কঠিনও করে। আমার গড়নটাও ছিপছিপে। অথচ মা-বাবা দুজনেই মোটার দিকে। জিন তত্ত্ব অনুযায়ী আমারও উচিত ছিল তাদের মতো হওয়া। হইনি। ছিপছিপে থাকবার জন্য আজকাল সবাই কত টাকা খরচ করে। আমার দরকার হল না। শুনি, আমার চোখও সুন্দর। মেয়েদের চোখ হয় মায়ামাখা। আমার চোখে বলে মায়া আর বুদ্ধি দুই রয়েছে। খুব বেশি লেখাপড়া শেখা হয়নি। অভাবের কারণেই হয়নি। তবে যেটুকু শিখেছি মন দিয়েছি। নইলে কাজ জুটত না। আমার সুন্দর এবং স্মার্ট উপস্থিতি কাজে দিয়েছে ঠিকই। কিন্তু আজকাল আর শুধু রূপ দিয়ে মেয়েদের চাকরি হয় না। আমি একটা ট্যুর কোম্পানির ফ্রন্ট ডেস্কে বসি। কাজটা পেয়েছি বছর খানেক। নিজের দৌড় পুরী পর্যন্ত কিন্তু কাজের জন্য দুনিয়ার ট্যুরিস্ট স্পটের খবর রাখতে হয়। মজার ব্যাপার। এর আগেও একটা চাকরি পেয়েছিলাম। টেকেনি। বস একদিন ফট করে গায়ে হাত দেওয়ায় দুম করে চড় মেরে দিলাম। অথচ সেই সময় কাজটার খুব প্রয়োজন ছিল। সবে বাবার কারখানা বন্ধ হয়েছে আর আমরা পড়েছি অথৈ জলে।

আমি উঠে বসলাম। সারির চুল এলোমেলো করে দিয়ে বললাম, ‘তোকে আমার থেকে অনেক অনেক বেশি সুন্দর দেখতে। কারণ তোর মনটা সুন্দর। আজ আমি নিজে হাতে তোর চুল বেঁধে দেব। হবে?’

‘তুমি সময় পাবে? আমার কথা মনেই থাকবে না। এরপর আমাকে ভুলে যাবে।’

আমি বললাম, ‘এমন বলতে পারলি সারি! আমি তোকে ভুলে যাব? ঠিক আছে, যা আমি টাকা দিয়ে দিচ্ছি। পার্লারে গিয়ে চুল বেঁধে আয়।’

সারণী আমার দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফুঁপিয়ে উঠে বলল, ‘না, না, দিদি, আমি তোমার কাছেই চুল বাঁধব, তোমার কাছেই শাড়ি পরব…।’

আমি সারির পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বললাম, ‘বোঝো কাণ্ড! একটু আগে মা কাঁদল, এবার বোন কাঁদছে। আজ কি সকাল থেকে এ বাড়িতে শুধু কান্নাকাটিই চলবে? যা, কত কাজ আছে, মাকে হেল্প কর গিয়ে।’

সারণী আমাকে ছাড়ল না। জড়িয়ে ফোঁপাতে লাগল। পাগল একটা। এরা কি ভুলে গেল আজ বাড়িতে একটা বিয়ে হবে।

হ্যাঁ, আজ আমার বিয়ে।

সব আয়োজন হয়ে গেছে। আয়োজন আর কী, এলাহি ব্যাপার কিছু নয়। বেকার বাবার মেয়ের বিয়ে। নহবতও বসছে না, শয়ে শয়ে লোকও খেতে আসছে না। গেটের পাশের একফালি জায়গাটায় ক’টা বাঁশ কাপড় দিয়ে ঘেরা হয়েছে। চারটে টিউবলাইট, একটা দাঁড়ানো পাখা এসেছে। এখানেই চেয়ার টেবিল পেতে গেস্টদের খাওয়ানো হবে। গেস্ট বলতে বিশ বাইশ জন। মেনু অতি সংক্ষিপ্ত। তারপরেও বাবার আপত্তি। বলেছে, ‘এত লোককে বলবার কী হয়েছে?’

মা চোখ কপালে তুলে বলল, ‘এত লোক কোথায়! মেয়ের বিয়েতে বিশজন কোনও লোক হল? পাড়ার ক’জন, আত্মীয়স্বজন, ছেলের বাড়ির থেকে তো আসবে মোটে পাঁচ। মেয়ের অফিস-টফিস তো সব বাদ। এইটুকু না করলে চলবে কী করে?’

বাবা রাগ রাগ গলায় বলে, ‘বিশজনকে গেলানোর পর সংসার চলবে কী করে ভেবে দেখেছ একবার? দেনা মেটাতেই তো জিভ বেরিয়ে যাবে।’

মা নিচু গলায় বলে, ‘এমনি যেন সংসার খুব ভাল চলছে…। জিভ তো বেরিয়েই আছে… বাড়ির পুরুষমানুষের ঠিকমতো রোজগারপাতি না থাকলে এমনই হবে… লোক খাওয়ালেও হবে, না খাওয়ালেও হবে…।’

বাবা চিৎকার করতে গিয়ে গলা ফ্যাসফ্যাসে করে ফেলে। বলে, ‘কী বললে! আমি রোজগারপাতি করি না? আমি ঘরে বসে খাই?’

মা ঠান্ডা গলায় বলল, ‘রোজগারপাতি করো না তো বলিনি। কুড়িয়ে বাড়িয়ে যা করো তাতে সংসার চলে না। এতে এত রেগে যাবার কী হয়েছে? তা ছাড়া… তা ছাড়া… বুলির বিয়ের খরচ তো আমি জোগাড় করেছি, বুলি নিজে খানিকটা লোন নিয়েছে… নতুন কাজ বলে বেশি টাকা পায়নি… তুমি চিন্তা করছ কেন?

‘চিন্তা করছি কারণ ধার তো শোধ করতে হবে।’

মা মুখ ঘুরিয়ে বাবার দিকে তাকায়। বিদ্র+পের গলায় বলে, ‘নিজের ধার আগে সামলাও।’

কাজকর্ম চলে যাওয়ার পর বাবার দাপট কমেনি, দাপটের এফেক্ট কমেছে। মা আর গুটিয়ে থাকে না। প্রথম প্রথম ভয় পাবার ভান করত। যেন সব আগের মতো আছে। ভান আর কতদিন চলবে? মাও এখন তর্ক করে। নিজের মতো সিদ্ধান্তও নেয়। প্রথম চাকরি ছাড়বার পর বাড়ি ফিরে এসে যখন বললাম, বাবা আমার কিশোরীবেলার মতোই দাপট দেখাল। একই ভঙ্গিতে বলল, ‘কালই তোর অফিসে যাব হারামজাদার কান টেনে ছিঁড়ে ফেলব। এত বড় সাহস আমার মেয়ের গায়ে হাত দেয়।’ পরদিন মুখ গোমড়া করে সারাদিন ভাঙা বেতের চেয়ারে বসে বাসি কাগজ পড়ল।

বিয়ের খাওয়াদাওয়া নিয়ে মায়ের ধাবড়ানিতে সেদিনও বাবা চুপ করে যায়। গায়ে পাঞ্জাবি গলিয়ে, পায়ে চটি ফটফটিয়ে বেরিয়ে পড়ে।

এই ফাঁকে বলে নিই, মায়ের কথায় তথ্যগত ভুল নেই। কারখানা বন্ধ হয়ে যাবার পর বাবা যে একেবারে কোনও রোজগার করে না, এমন নয়। এটা সেটা করে তিন-চারমাস অন্তর কিছু টাকা আনে। তবে কখনই তা খুব বেশি নয়। গেলবার পুজোর সময় জামাকাপড়ের ব্যবসা করতে গিয়ে বিশ হাজার টাকা লোকসান করে একেবারে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। মায়ের হাতের চুড়ি ভাঙিয়ে সেই ধারের খানিকটা শোধ করতে হয়েছে। বিয়েতে মায়ের সোনাদানা প্রায় কিছুই নিচ্ছি না। নেওয়ার মতো নেইও। যেটুকু যা আছে সারণীর জন্য রেখে যাচ্ছি। এখনও গরিব ঘরের অ-সুন্দর মেয়েদের বিয়ে দিতে বেশি সোনা লাগে। আমি হলফ করে বলতে পারি, যারা এটা শুনে বলবে, ন্যাকা সেন্টিমেন্ট, তারা বেশি করে নেয়। মেয়েদের হারামজাদা বলতে নেই। নইলে এদের হারামজাদাই বলতাম।

রাত দশটা বেজে ছাপ্পান্ন মিনিটে লগ্ন। আমার পিঁড়িতে বসবার কথা এগারোটা বাইশে। পরশু পুরুতমশাই ফাইনাল মিটিংয়ে এসেছিলেন। বাবা বিরক্ত মুখে, ভুরু কুঁচকে বলল, ‘কেন! এগারোটা বাইশে কেন? দশটা ছাপ্পান্নতে লগ্ন শুরু, দশটা ছাপ্পান্নতেই মেয়ে বিয়ের জন্য বসে যাবে।’

আমার গোটা বিয়ে পর্বটা জুড়েই বাবা ভুরু কুঁচকে রয়েছে। বিয়েতে পিতা কন্যাকে নানাভাবে পার করে। উজ্জ্বল মুখে, ছলছল চোখে। আমার বাবা আমাকে ভুরু কুঁচকে পার করছে। বেশ মজার লাগছে। ভুরু কুঁচকে থাকবার নানান কারণের একটা হল, বাবার পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করছি না। শুধু বাবার নয়, ছেলে আমাদের সবার পছন্দের ছিল। যে পার্টনারের সঙ্গে জামাকাপড়ের ব্যবসা করে বাবা ধাক্কা খেল, তার ভাইপোর সঙ্গে আমার সম্বন্ধ এসেছিল। ভাল চাকরি। গাড়ি, ফ্ল্যাট। আমাকে দেখে ছেলের বাড়ির খুব পছন্দ হল। ছেলেটিও ভাল। আমাকে দেখতে এসে বারান্দা ঘরে মাথা নামিয়ে ম্যাগাজিন পড়ছিল। আমার দিকে একবারও মুখ তুলে তাকায়নি। সারি বলেছিল, ‘দিদি, কী হ্যান্ডসাম! আর ভদ্র! তাই না?’ হ্যাঁ, তাই। একদিন আমাকে অফিস থেকে তুলে কফি খাওয়াতে নিয়ে যায়। সেখানেও তার আচরণ মুগ্ধ করবার মতো। অল্প হাসে। অল্প সিরিয়াস। ঘণ্টাখানেক কোথা থেকে যে কেটে গেল! তারপরও রাতে খেতে বসে বাবাকে বললাম, ‘বাবা, এই বিয়ে আমি করব না।’

‘কেন?’

‘জানি না, কিন্তু করব না।’

বাবা থালা সরিয়ে রেখে বলল, ‘তুই কি পাগল! এত ভাল ছেলে… এত ভাল ছেলে… এমন সম্বন্ধ আর আসবে… আসবে আর? তুই কি পাগল…।’

আমি চুপ করে রইলাম। বাবা হুঙ্কার দিয়ে উঠল, ‘নিজেকে কী ভাবিস? সুন্দরী? পরী? কী ভাবিস নিজেকে? গরিবের মেয়ের এত দেমাক কীসের? ফুটো চাকরি করিস… শুনছ, শুনছ তোমার মেয়ে কী বলছে… শুনছ…।’

আমি চুপ করে খেয়ে উঠে গেলাম। বাবা ক’দিন মাথা পাগলের মতো করল। আমাকে ধমকায়, মাকে ধমকায়, সারণীকে ধমকায়। বারান্দায় পায়চারি করে। একসময়ে হাল ছেড়ে দিয়ে ফটফটিয়ে বেরিয়ে যায়। মাও জানতে চেয়েছিল, এমন সুন্দর ছেলেকে আমি কেন বিয়ে করলাম না। হেসে বললাম, ‘এখন বিয়ে করব না মা। ইচ্ছে করছে না।’

এখন যে বিয়ে করছি, সেটাও আমার ইচ্ছেতে হচ্ছে এমন নয়। আরও কিছুদিন অপেক্ষা করে, আরও খানিকটা গুছিয়ে নিয়ে করতে পারতাম। তবে ওই যে, সব কি নিজের ইচ্ছেমতো হয়? বিয়ে করছি কল্যাণের জন্য। কল্যাণের মায়ের অসুখ খুব কঠিন জায়গায় পৌঁছেছে। ডাক্তাররা হাল ছেড়ে দিয়েছেন। কল্যাণ চমৎকার ছেলে। চাকরি সামান্য। আমাদের ট্যুর কোম্পানির ম্যানেজার একজন। পার্টি নিয়ে কাশ্মীর, সিমলা, কুলু, মানালি যায়। সবসময় হাসিমুখ। সৎ আর পরিশ্রমী বলে কম বয়সেই সুনাম কুড়িয়েছে। হঠাৎ একদিন রোটাংপাস থেকে ফোন করে জানাল, মায়ের ওষুধ লাগবে। এমারজেন্সি। কাউকে ফোনে পাচ্ছে না। আমি কি কিনে তার বাড়িতে একটু পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারি? কলকাতায় ফিরেই দাম দিয়ে দেব। আমি ভেবেছিলাম, ওষুধের মতো বিষয় অন্য কার হাতে ছাড়ব? নিজে যাই। এরপর থেকে আমি মাঝেমাঝেই এই দায়িত্ব পালন করেছি। নিজে থেকেই করেছি। কল্যাণ আর তার বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে। কল্যাণের বাবা নেই। সংসারের সব দায়িত্ব তার। কম বেতনের চাকরিতেই হাসিমুখে ম্যানেজ করে। গত মাসে হঠাৎ ভাইজ্যাক থেকে ফোন।

‘বল্লরি, মনে হচ্ছে না মা আর বাঁচবে। মায়ের খুব ইচ্ছে, মৃত্যুর আগে ছেলের বউ দেখে যায়। আজকের দিনে খুব বোকা ইচ্ছে। তা আমি ঠিক করেছি, মৃত্যুর মুখে দাঁড়ানো মায়ের বোকা ইচ্ছের দাম দেব। ফট করে একটা বিয়ে করে ফেলব। কাজটা ভুল হবে। কিন্তু কি আর করা।’

আমি উৎসাহ নিয়ে বললাম, ‘ভাল তো করে ফেল। আমি খাটাখাটনি করে দেব।’

কল্যাণ হেসে বলল, ‘খাটাখাটনি আর কী হবে? আয়োজন তো অতি সামান্য হবে। পকেট তো ঢুঁ ঢুঁ। তার ওপর মায়ের আজ মরে কাল মরে অবস্থা। বিয়েতে ঢাক ঢোল পেটানোর চান্স নেই।’

‘একটু পেটাতে পার। ধার দেব।’

কল্যাণ জোরে হেসে বলল, ‘এটাই বলতে চাইছিলাম। লজ্জা পাচ্ছিলাম। ধারের টাকা তিনমাসে ফেরত হবে। অন গড। আর একটা ছোট অনুরোধ আছে।’

আমি বললাম, ‘ধানাইপানাই না করে বলে ফেল। ফোনে বিল উঠছে।’

কল্যাণ একটু থেমে বলল, ‘বল্লরি, তুমি কি আমাকে বিয়ে করতে পার? নাকি সেটা অসম্ভব? তোমাকে বাইরে থেকে দেখে বলছি না, সেদিন রাতে হঠাৎ মনে হল, তোমার মনের ভেতরটাও দেখে ফেলেছি। খুব সুন্দর একজন মানুষ। ভাবলাম, একবার না বলে পরে খুঁতখুঁতানি হবে। রাগ কোরো না।’

এরপর আমি কী করব? ‘হ্যাঁ’ না বলে পারি? এই ভালবাসা তুচ্ছ করবার মতো ক্ষমতা কোনও মেয়ের আছে?

বাবা শুনে খেপে আগুন। রাজকুমার ছেড়ে ভিখিরিকুমার। ছি ছি। মেয়ে তো না খেয়ে মরবে। এসব মেয়ের গালে থাপ্পড় কষিয়ে গাল লাল করে দিতে হয়। মায়ের প্রপার শাসন না থাকলে মেয়েদের এমনটাই হয়। এ তো বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে। তারপর থেকেই বাবার ভুরু কুঁচকে গেছে।

ছোটমাসি, চন্দনাদি, পাশের বাড়ির বউদি এসে গেছে। সবাই ছাদে। আমার গায়ে হলুদের ব্যবস্থা হচ্ছে। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি বাবা আমাদের বারান্দা ঘরে বসে। পায়জামা, হাতাওলা গেঞ্জি, গালে না কামানো দাড়ি। নিঃসঙ্গ, অসহায়, মন খারাপ করা একটা মানুষ। বহুদিন পরে বাবার জন্য খুব মন কেমন করে উঠল। আমি এগিয়ে গেলাম।

‘কী হয়েছে বাবা? শরীর খারাপ।’

বাবা মুখ নামিয়ে বলল, ‘না কিছু হয়নি।’

আমি মোড়াটা নিয়ে বাবার পাশে গিয়ে বসলাম। বাবা নরম গলায় বলল, তুই বসিস না মা। ছাদে যা, সবাই অপেক্ষা করছে।’

আমি কথার জবাব না দিয়ে বাবার হাত ধরলাম। বললাম, ‘আজ উৎসবের বাড়িতে সবাই মুখ গোমড়া করে আছে কেন? মনে হচ্ছে, মরা বাড়ি। দাড়িও কামাবে না?

বাবা মলিন হাসল। বলল, ‘এই যাব।’

আমি বাবাকে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলাম। আহা! কতদিন পরে বাবার গায়ে গন্ধ পাচ্ছি!

‘এত চিন্তা কোর না বাবা। আমি ভুল করছি না। তোমার রাজপুত্র পাত্র বলেছিল, সব ঠিক আছে, কিন্তু বিয়ের পর চাকরি করা চলবে না। সুন্দরী মেয়ে সংসার করবে। আর বিয়ের আয়োজন করতে হবে ঘটা করে। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনকে দেখানোর ব্যাপার আছে না? তবে চিন্তা নেই সব খরচই সে দিয়ে দেবে। কেউ জানবে না। আমি রাজি হইনি বাবা। আমি রোজগার না করলে এই ভালবাসার মানুষগুলোকে কে দেখবে? সারিকে বড় হতে হবে। তোমাকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে। তাই না? বাবা কল্যাণ খুব ভাল ছেলে। এত ভাল ছেলে তুমিও দেখনি। সে আমাকে তোমাদের থেকে কেড়ে নেবে না। সে ভালবাসা কী, জানে।’

বারান্দা ঘরের আবছায়াতে বসে এক পিতা আর তার কন্যা গুজগুজ করে গল্প করছে আর ঘন ঘন চোখ মুছছে। আহা, কাঁদুক। মেয়েটা কাল চলে যাবে দুজনে মিলে একটু কাঁদবে না? এই কান্না দুঃখের নয়, ভালবাসার। ছাদে শাঁখ বেজে উঠল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *