বিমল কর : হয়ত, হয়ত নয়

বিমল কর : হয়ত, হয়ত নয়

বাড়ি ফিরে আরতি পরপর দুটো অ্যাসপিরিন ট্যাবলেট খেয়ে নিয়েছিল। এত মাথা ধরলে মানুষ পারে! দুদিন যদি ভাল থাকল তিনদিনের দিন হয়ত সকাল থেকে, না হয় দুপুরে কলেজে থাকতে থাকতেই, বা সন্ধের গোড়ায় মাথাটা ধরে উঠল। প্রথমে অতটা যন্ত্রণা দেখা দেয় না, ধরা ধরা ভাব থাকে, তারপর আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। কপাল ছিঁড়ে যায় যেন, দুপাশের রগ দপদপ করে, মাথা ঘাড় টনটন করতে করতে একসময় অসহ্য যন্ত্রণায় আরতির মনে হয় তার মাথা বলে কিছু নেই— শুধু এক প্রচণ্ড যন্ত্রণা ঘাড়ের ওপর বসে আছে। আর তখন বমি বমি লাগে, চোখ খুলে তাকাতেও পারে না।

আরতির মাথা ধরার কারণ জানতে একের পর এক ডাক্তার দেখিয়েছে। সাধারণ ডাক্তার, চোখের ডাক্তার, নাক-কান গলার ডাক্তার, মায় গাইনি। পুরুষ গাইনি নয়, মেয়ে গাইনি। সুজাতাদি ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। তার চেনাজানা। মাঝারি বয়েস। আরতিদের কলেজের অনেককেই মহিলা দেখেন।

যে যা বলেছে আরতি করেছে। ওষুধপত্র খেয়েছে। কিছুতেই কিছু হয়নি। বরং দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে উপসর্গটা। এখন তো এক একদিন মাথার যন্ত্রণা তাকে পাগলের মতন করে দেয়।

আজ কলেজে একটা স্টাফ মিটিং ছিল। শুরু হবার কথা চারটেয়, শুরু হল প্রায় পাঁচটায়। এসব মিটিংয়ের কোনও মাথামুন্ডু নেই। বাজে গল্প করেই সময় কেটে যায়, না হয় ঝগড়া করে। মেয়েদের রেজাল্ট খারাপ হচ্ছে তো টিচারদের দোষ দিয়ে কী লাভ! টিচাররা কি মাথার ঘিলু তৈরি করে দেবে। মফসসলের মেয়ে কলেজ। একরাশ মেয়েই শুধু কলেজে আসে যায়, ঘুরে বেড়ায়, পড়াশোনা করার মতন মগজই নেই চোদ্দআনা মেয়ের।

মিটিং সেরে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ছটা। তখন জোর বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে। সাইকেল রিকশা থেকে নেমে মাথা বাঁচিয়ে যাও বাড়িতে ঢোকা গেল, পায়ের দিকের শাড়ি জলে কাদায় মাখামাখি, চটি জোড়া ন্যাতা। বাড়ির সামনে জলকাদা জমেছে।

মিছরির মা বাড়ি ফেরার জন্য ছটফট করছিল। সকালে আসে বিকেলে যায়। তার হাতেই সংসার।

বৃষ্টিবাদলার জন্যে ছটা বাজতেই অন্ধকার। মিছরির মা দাঁড়াল না। তার ছাতা টেনে নিয়ে পা বাড়াল দরজার দিকে। ‘আমি যাই দিদিমণি, যা বৃষ্টি নামল।’

মিছরির মা চলে গেল।

কাপড় ছাড়তে যেটুকু সময় গেল, তারপরই আরতি দু-দুটো অ্যাসপিরিন বড়ি খেয়ে ফেলল টপ টপ করে। কলেজে স্টাফ মিটিংয়ের সময় থেকেই সে বুঝতে পারছিল তার মাথা টিপটিপ করছে। বাদলা হাওয়া, বৃষ্টি— এসব যেন আর ধাতে সইছে না। যখন তখন মাথা ধরে যায়।

একটু ধাতস্থ হয়ে আরতি চায়ের জল বসাল। খিদে পেয়ে গিয়েছে। খালি পেটে অ্যাসপিরিন খাওয়া খারাপ। ডাক্তার বারণ করে দিয়েছে। এমনকী বলেছে, এই অ্যাসপিরিন খাবার অভ্যাসটা ছেড়ে দিন। ভাল নয়।

ভাল নয়— সে আরতিও বোঝে। কিন্তু মাথা ধরার সময় তার আর তর সয় না। খালি পেটেও খেয়ে ফেলতে হয়। অস্বস্তিও হয়। উপায় কি। মাথা ধরার গোড়ার দিকে ওষুধটা খেয়ে ফেললে তবু খানিকটা বাঁচা যায়, নয়ত একবার বাড়তে শুরু করলে বেড়েই যায় মাথার যন্ত্রণা।

মিছরির মা জলখাবার করে রেখে গিয়েছিল। সুজি, চিঁড়ে ভাজা।

খাবার আর চা গুছিয়ে নিয়ে ঘরে এল আরতি। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে তখনও। জোর ভাবটা কেটে গিয়ে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। মেঘ ডাকছে। আজ সারারাতই এইরকম চলতে পারে।

বিছানায় বসে আরতি চা জলখাবার খেতে শুরু করল। মাঝে মাঝে মাথা টিপে ধরছিল। কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু সেভাবে বাড়ছে না। যদি এই অবস্থায় থাকে এখন ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে নিতে পারলে হয়ত আরাম পেতেও পারে। ঠিক নেই কিছু।

আরতির এই ঘরটা মন্দ নয়। মাঝারি মাপের। দুটো জানলা। দেওয়াল অবশ্য খরখরে, বর্ষায় একটু সেঁতিয়ে থাকে, তাহলেও তার খারাপ লাগে না। একটা খাট, ছোট একটা আলমারি, আলনা, এমনকী ড্রেসিং টেবিল পর্যন্ত গুছিয়ে গাছিয়ে রেখে দিয়েছে। এইসব আসবাবপত্রের মধ্যে দুটো সে কলকাতা থেকে আনতে পেরেছিল, খাট আর আলমারি। বাকি এখানে থাকতে থাকতে কিনে নিতে হয়েছে। না কিনলে চলবে কেন? এ তো বদলির চাকরি নয়। আরতিকে কতকাল এখানে পড়ে থাকতে হবে কে জানে! হয়ত রিটায়ার করার সময় পর্যন্ত। মানে এখনও বছর আটাশ। একমাথা পাকা চুল, বাঁধানো দাঁত, বাত, হার্টের রোগ— কত কী সঙ্গে নিয়ে তবে না বিদায় নিতে পারবে এখান থেকে।

চা খাওয়া শেষ হয়েছে কি বাইরে কে দরজায় ধাক্কা দিল।

সামান্য অবাক হল আরতি। নিচের তলায় থাকে উপাধ্যায়। তার পরিবার বলতে স্ত্রী, দুটো ছেলেমেয়ে। উপাধ্যায় ব্যবসাপত্র করে। বাজারে তার দোকান। স্টেশনারি। বড় দোকান। উপাধ্যায়ের বউ আর ছেলেমেয়ে গিয়েছে রাঁচিতে। বউয়ের দাদার কাছে। দিন কয়েক থাকার কথা। নিচে এখন উপাধ্যায়ের এক বুড়ি কাজের লোক ছাড়া কারও থাকার কথা নয়। বুড়ি আবার রাতকানা গোছের। উপাধ্যায়ের ফিরতে ফিরতে রাত নটা দশটা।

‘কে?’ আরতি বলল।

কোনও সাড়া নেই প্রথমে। তারপর আবার দরজায় ধাক্কা। ধীরে ধীরে।

‘কে?’ আরতি সদরের কাছে এসে দাঁড়াল।

‘আমি।’

গলার স্বরটা চেনা না গেলেও মনে হল— লাইব্রেরির যোগেনবাবুর মতন। যোগেনবাবু এখানকার কলেজের লাইব্রেরিয়ান। কাছাকাছি পাড়াতেই থাকেন। আরতির ভাল লাগে যোগেনবাবুকে। মিশুকে নম্র স্বভাবের মানুষ।

‘যোগেনবাবু?’ আরতি দরজা খুলে দিল। বলতে যাচ্ছিল— এই বৃষ্টির মধ্যে? মুখের কথা মুখেই থেকে গেল, দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে যে লোকটা পা বাড়াল ভেতরে, তাকে চিনতে পারল না আরতি। ভয় পেয়ে গেল। উটকো, অচেনা লোক।

‘আমি সলিল। চিনতে পারছ না?’

সলিল! আরতি সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পেরে গেল। আদলে চিনল, নামে চিনল— কিন্তু মানুষটার চেহারা দেখে চট করে তাকে সলিল বুঝে নেওয়া মুশকিল।

আরতি কিছু বলার আগে সলিল দরজা ভেজিয়ে দিল।

প্রথম দিককার চমকানি কেটে যাবার পর আরতি যত অবাক হল, ততই ভয় পেয়ে গেল। সলিল এখানে? হঠাৎ? কী মনে করে হাজির হয়েছে এখানে? ভয় পেয়ে গেল; তার ওপর বিরক্তিও লাগছিল আরতির।

‘যেন চিনতেই পারছ না?’ সলিল বলল।

‘তুমি এখানে কেন?’

‘তোমার কাছে।’

‘আমার কাছে?’

সলিল আশপাশ তাকাল। প্যাসেজ, রান্নাঘর, বাথরুম। একটা বোধহয় এক চিলতে ভাঁড়ার ঘর, বা অন্য কিছু। প্যাসেজে বাতি জ্বলছিল। আলোয় জোর নেই।

‘এক গ্লাস জল খাওয়াবে?’

আরতির মনে হল বলে দেয়, না। কিন্তু জল খেতে চাইলে কাউকে না বলা যায় না। লোকটা ভিজেছে। মাথায় জল। গায়ের জামা স্যাঁতস্যাঁতে। পায়ের চটিও কাদায় মাখামাখি। অবশ্য এসব তার দেখার কথা নয়।

আরতি বাধ্য হয়েই জল আনতে গেল।

রান্নাঘর থেকে জন নিয়ে ফিরে এসে দেখল, সলিল পায়ের বাঁধা চটি খুলে একপাশে সরিয়ে রেখে দু-চার পা এগিয়ে এসেছে।

জলের গ্লাস এগিয়ে দিল আরতি।

প্রায় এক চুমুকে জল শেষ করে সলিল বড় করে শ্বাস ফেলল। বলল ‘তোমার এই বাড়ি খুঁজতে আমার ঘণ্টাখানেকের বেশি লেগে গেল। আট টাকা রিকশা ভাড়া বেরিয়ে গেল পকেট থেকে। কত দূরে থাক তুমি!’

আরতি বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। লোকটা এখানে এল কেমন করে? কী মতলবে এসেছে ও?

শক্ত গলায় আরতি বলল, ‘আমার বাড়ি খুঁজে আসার দরকার কী হল তোমার?’

সলিল গায়ে মাখল না কথাটা। তাকিয়ে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসল। যেন বোঝাতে চাইল, তোমায় খুঁজে বার করেছি কেমন দেখলে তো!

আরতির বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না সলিলকে দেখার। তবু দেখছিল। সামনে একজন দাঁড়িয়ে থাকলে চোখ বন্ধ করে থাকা যায় না। সস্তা জামা, বোধহয় হ্যান্ডলুমের, চেক কাটা। প্যান্টটার রঙ খয়েরি না কালো বোঝা যাচ্ছে না। সলিলের মুখ বসে গেছে। গালের হাড় ফুটে উঠেছে ধারালো ভাবে। মুখ আধ-কামানো দাড়ি। চোখ দুটো সামান্য লালচে। দাঁত বের করে হাসছে লোকটা। এখনও সেইরকম বড় বড় চুল।

কী বলতে গিয়ে সলিল থেমে গেল। তারপর হাঁচল। পরপর। পকেট থেকে ছিটকাটা রুমাল বের করে নাক মুখ মুছল। মুছে রুমালটা মাথায় ছোঁয়াল। ‘তখন থেকে ভিজছি। কী বৃষ্টি শুরু হল বল তো! বাইরে যা অবস্থা, হোল নাইট চলবে।’ বলে এদিক ওদিক তাকাল।

‘তোমার বাথরুম কোনটা বল তো পা দুটো ধুয়ে নিই। জলকাদায় একেবারে মাখামাখি হয়ে গেছে।’ বলে পায়ের দিকটা দেখাল।

আরতির মাথার মধ্যে যেন একটা শিরাটিরা ছিঁড়ে গিয়ে টনটন করে উঠল। রেগে উঠছিল সে। ‘পা ধোবার দরকার নেই। বৃষ্টিতে জলকাদা লাগেই।’

‘আরে, শুধু ধোব কেন— ইয়ে একটু—’ বলে পেটের দিকে দেখাল, ‘ফেটে যাবার যোগাড়।’

আরতির মাথা গরম হয়ে উঠল। ‘তুমি কি এখানে খুঁজে খুঁজে বাথরুম করতে এসেছ। যাও, রাস্তাঘাট পড়ে আছে।’

সলিল একই রকম মুখ করে হাসল। যেন বোঝাতে চাইল, আরতি যে কী আজেবাজে কথা বলছে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পা বাড়াল। ‘ওইটে বাথরুম না! মনে হচ্ছে…!’

সলিল একেবারে সোজা বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেল।

আরতি একেবারে থ দাঁড়িয়ে থাকল। ছুটে গিয়ে লোকটাকে ধরে টেনে হিঁচড়ে খামচে দরজার কাছে এনে ঘাড় ধরে বাইরে বার করে দেবে নাকি! এমন অসভ্য জানোয়ারকে আর কী করা যেতে পারে!

বাথরুমের দরজা আধ-ভেজানো ছিল। দরজা খুলে ভেতরে পা বাড়াবার আগে সলিল ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, ‘আলোটা জ্বেলে দাও প্লিজ!’

আরতি লোকটার স্পর্ধা দেখছিল। বলা নেই কওয়া নেই— অন্যের বাড়িতে ঢুকে এমন ভাব করছে যেন এটা তার নিজের বাড়ি। এমন নির্লজ্জ, বেহায়া, ইতর আর দেখা যায় না। বরাবরই এইরকম ছিল। গোড়ায় বোঝা যায়নি এমন করে, পরে বোঝা গিয়েছিল।

সুইচটা অন করে দিল আরতি। কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। একটা বেহায়ার সঙ্গে চেঁচামেচি করে কী লাভ!

সলিল ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল।

আরতি বুঝতে পারছিল না— কী করবে! সদর ভেজানো, ছিটকিনি তোলা নেই। মানুষটা যে বাথরুম থেকে ফিরে এসে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে তাও মনে হয় না। খুঁজে পেতে আট টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে বৃষ্টির মধ্যে এসেছে যখন— তখন অত সহজে যাবার পাত্র ও নয়।

এখন আরতি কী করতে পারে? এইভাবে প্যাসেজে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না বাথরুমের দিকে তাকিয়ে। বিশ্রী দেখায়! লোকটাকে তাড়াবেই বা কেমন করে? নিচে উপাধ্যায়ের বউ বাচ্চা নেই, যে বুড়িটা আছে সেটা রাতকানা। নয়ত বাড়িতে ঢোকার সদরটাই বন্ধ করে রাখত। অবশ্য এত সাত তাড়াতাড়ি নিচের সদর বন্ধ হয় না।

আরতি এখন কিছুই করতে পারে না। নিচে নেমে গিয়ে পাশাপাশি কোনও বাড়ি বা দোকান থেকে লোক ডেকে আনতে পারে না এই বলে যে, আমার বাড়িতে একটা বাজে লোক ঢুকেছে, বার করে দাও। না না, তাতে অসুবিধা আছে!

প্যাসেজে না দাঁড়িয়ে আরতি তার ঘরের দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। মাথায় যন্ত্রণা যাও বা কমের দিকে যাচ্ছিল আবার বাড়তে শুরু করল। ভুরুর ওপর দপদপ করছিল। কী ঝঞ্ঝাটে পড়া গেল।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল সলিল। গায়ের জামা খোলা। এক হাতে তোয়ালে। মাথাটা মুছে নিচ্ছে। অন্য হাতে জামা। ‘তোমাদের বাথরুমের কলে এখন জল থাকে না?… বালতিতে জল!… এখানে জল রাখার সেই পাওয়া যায় না—? প্লাস্টিকের বালতির চেয়ে বড় বড় ড্রামের মতন বালতি বেরিয়েছে— তাই কিনে নিও।… জামাটা শুকিয়ে নি। আমার আবার চট করে বুকে পিঠে ঠান্ডা লেগে যাচ্ছে আজকাল। লাগলেই ফ্লু, ব্রঙ্কাইটিস!’ বলতে বলতে সলিল এগিয়ে এসে তোয়ালেটা গায়ে জড়িয়ে আবার খুলে ফেলল। যেন গা মুছে নিতে গিয়ে খেয়াল হল, আগেই গা মুছে নিয়েছে। তোয়ালেটা কোথায় রাখবে দেখে নিয়ে প্যাসেজে টাঙানো প্লাস্টিকের দড়িতে রেখে দিল।

আরতি তাকিয়ে থাকল। সলিলের গায়ে গেঞ্জি নেই। খোলা বুকপিঠ! বুকে একটাও লোম নেই। কোনওদিনই ছিল না। তবে খানিকটা মাংসমেদ ছিল, পাতলা করে। এখন একেবারে হাড়।

‘কই চা বসিয়েছ?’ সলিল বলল।

‘চা?’ আরতি থ হয়ে গেল।

‘বাঃ! বৃষ্টিতে ভিজে কাদা। চা খাব না! তুমি যেন কেমন বাজে ব্যবহার করছ। কেউ বাড়িতে এলে এক কাপ চা খেতেও তো মানুষ বলে। অন্য কিছু না খাওয়ালে। এক কাপ চা যে কোনও ভদ্রলোকের প্রাপ্য!’

‘তুমি ভদ্রলোক?’

‘না হলে ছোটলোক! তবে ছোটলোকও এক কাপ চা পেতে পারে।’

‘না। আমার শরীর খারাপ। মাথার যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছি। তুমি যাও। আমায় জ্বালিও না আর।’

সলিল হাসল। ধূর্তের মতন হাসি। ‘বেশ, তুমি তাহলে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়। আমি চা তৈরি করে নিয়ে যাচ্ছি। দু-কাপ। চা আমি ভালই করতে পারি, তুমি জানো! যদি বলো তোমার মাথাও টিপে দিতে পারি।… কই তোমার পাখা কোথায়! ঘরে! প্লিজ সরো। জামাটা শুকিয়ে নি। ভিজে একেবারে সপসপ করছে।’

আরতি সরল না। ‘আমার ঘরে তুমি ঢুকবে না।’

সলিল একটু হাসল। ‘কী ছেলেমানুষি করছ! তোমার ঘরে আমি নতুন ঢুকছি না।’

আরতি আর মাথা ঠিক রাখতে পারল না। গলা চড়িয়ে রুক্ষভাবে বলল— ‘তুমি যাবে? না আমি লোক ডাকব?’

সলিল যেন কতই অবাক হয়েছে, ক’মুহূর্ত তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল আরতিকে। বলল, ‘লোক ডাকবে? কেন? আমি তোমার কী করেছি! বাড়িতে দেখা করতে এসেছি এটা দোষের হল?’

‘কে তোমায় দেখা করতে বলেছে?’

‘আমি নিজেই এসেছি।’

‘কেন?’

‘ধর তোমায় দেখতে।’

‘নাটক করো না।’

‘তুমি আরও বেশি করছ!… নাটক নয়, যাত্রা। শোনো আরতি, তুমি জোর করলে আমি চলে যাব। কিন্তু কাল তোমার কলেজে যাব দেখা করতে।’

আরতি চমকে গেল। বলে কী লোকটা! কলেজে যাবে দেখা করতে!

‘আমি তোমার কলেজে যাব দেখা করতে—’ সলিল বলল, ‘তোমাদের অফিসে কিংবা প্রিন্সিপালের ঘরে স্লিপ পাঠাব। তাতে নিজের নামের তলায় একটি পরিচয় তো লিখতেই হবে। যা সত্যি তাই লিখব।’

আরতি একেবারে পাথর হয়ে গেল! ক’মুহূর্ত যেন চোখেও কিছু দেখতে পেল না। মাথার মধ্যে টলমল ভাব এল। লোকটা শয়তান। বরাবরের শয়তান।

নিজেকে সামলে নিতে চাইছিল আরতি— তার আগেই সলিল তার পাশ কাটিয়ে সামান্য সরিয়ে দিয়ে ঘরে ঢুকল। ঢুকে গায়ের জামাটা শুকোতে দিল। পাখা চলছিল। বাড়িয়ে দিল পাখাটা।

আরতির যেন আর কিছু করার ছিল না। সলিলের কথা তাকে শুনতেই হবে। না শুনলে ক্ষতি যদি নাই হয়— তাকে লজ্জায় পড়তে হবে। মুখ নিচু করে মাথা হেঁট করে থাকতে হবে এখন। কতদিন তা সে জানে না। তাছাড়া বলাও যায় না, এই মফসসলের মেয়ে কলেজের কর্তারা, প্রিন্সিপাল, অন্য অন্য টিচাররা কী ভাববে। হয়ত তার আর চাকরি করাও চলবে না।

কিছু বলল না আরতি, চা করতে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।

চা নিয়ে ফিরে এসে, আরতি দেখল, সলিল আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছে। নিজের প্যান্ট খুলে পাখার তলায় ছড়িয়ে দিয়েছে। দিয়ে আরতির একটা শাড়ি দু-পাট করে পরে খালি গায়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সিগারেট খাচ্ছে।

আরতিকে আসতে দেখে সলিল উঠে বসল। সিগারেটটা জানলার দিকে ছুঁড়ে দিল। ‘বৃষ্টিতে নেতিয়ে গিয়েছে। …শুধু চা?’

‘ঘরে এখন কিছু নেই। বিস্কিটও নেই।’

‘দাও চা-টাই দাও।’

আরতি চা এগিয়ে দিল। ‘তুমি বাড়াবাড়ি শুরু করেছ। খেতে পেলে শুতে চায়…। আমায় ভয় দেখাতে এসেছ তুমি?’

‘না। বাই নো মিনস!….খাওয়াই দিলে না তো শোওয়া! তুমি ভেব না। তোমার শাড়ি খুলে রেখে যাব। প্যান্টটা একটু শুকিয়ে যাক।…বাঃ! বেশ চা করেছ!’

‘তুমি এখানে কেন এসেছ?’

‘কাজে। আমি এখন মোটরগাড়ির টায়ারের ব্যবসা করছি। টায়ার বেচার ব্যবস্থা করতে এসেছি। কলকাতায় আমাদের কারখানা আছে। আধপুরনো টায়ার সারিয়ে একেবারে নতুনের মতন করেছি। নতুন টায়ারের এখন অনেক দাম। বাস মিনিবাসের মালিকরা রিট্রেডিং টায়ার কিনতে চায়। দামে সস্তা পড়ে।… আরে তুমি বসো না।’

আরতি বসল। মন জুগিয়ে চললে যদি আপদ বিদেয় হয়।

‘তুমি নিজে কারখানা খুলেছ?’

‘না। পার্টনার আছে। তিনজনে খুলেছি।’

‘টাকা পেলে কোথায়?’

সলিল হাসল। শব্দ করে নয়। বলল, ‘আবার একটা বিয়ে করেছি। একটু বয়েস হয়েছে। দেখতে কালো। কিন্তু চেহারা মন্দ নয়। দারুণ বউ। এক্সপার্ট। তার গয়নাগাটি খুলে দিল। বলল, করো ব্যবসা। তবে টাকা উড়োবে না।’

আরতি যেন বেঁকা করে হাসল। ‘তোমার মনের মতন বউ!’

‘ভাল বউ। আমরা এখন বেলগাছিয়ায় থাকি। ভীষণ সামলে থাকি! যত পারি খরচ বাঁচাই। টাকাটা তুলতে হবে। …তাছাড়া—’

‘তাছাড়া?’

‘ওর বাচ্চাকাচ্চা হবে। আর মাস দুই…।’

আরতি তাকিয়ে থাকল। পলক পড়ছিল না চোখের।

চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল সলিল। আরতিকে দেখতে লাগল। খুব তীক্ষ্ণভাবে। শেষে একটু হাসল। ‘আমি বিয়ে করেছি বছর দুই। বউয়ের এখন এইটথ মান্থ।… আমি তোমায় একটা কথা বলতে এসেছি। তুমি বলতে আমি— আমার ফিজিক্যাল গোলমাল আছে। বাচ্চাকাচ্চার বাবা আমি হতে পারব না। বলতে কিনা!’

আরতির যেন বুকের মধ্যে কেমন অস্বস্তি হতে লাগল। শুকনো গলায় বলল, ‘ডাক্তাররা তাই বলেছিল।’

‘তোমার ডাক্তার।’

‘আমার ডাক্তার কেন! তোমার ডাক্তারও।’

‘সব শালা বাজে মাল! ফালতু!… তারা ধাপ্পা মেরেছিল। তুমি তাদের দিয়ে ধাপ্পা মারিয়েছ কিনা কে জানে!’

‘সলিল—!’

‘তুমি আমাকে বিয়ে করার পর এক বছরের মধ্যেই খেপামি শুরু করলে। গাছ লাগালেই ফল। আসলে… আমাকে তোমার পছন্দ হচ্ছিল না। আমার নোংরা বাড়ি, বুড়ি মা, আমার সামান্য রোজগার,…ও কে, সবই বুঝি। তুমি একটা বাজে ছুতো বার করে বিয়ে ভাঙলে। ভাঙলে তো বয়েই গেল। কিন্তু তুমি, আমার যে দোষ দেখিয়ে এলে সেটা সাংঘাতিক। এই আমি— সলিল লাহিড়ী— আমার একটা ছেলেপুলে থাক— এটা আমি তোমার চেয়েও বেশি করে চাইতাম। কে কোন জিনিস বেশি ভালবাসে— ভালবাসতে চায়— তুমি কি বুঝবে!’

আরতি কিছু বলতে যাচ্ছিল, বলতে পারল না।

সলিল উঠে পড়ল খাট ছেড়ে। প্যান্টটা দেখল। জামাটাও দেখে নিল। ‘তুমি আমাকে বেজায়গায় মেরেছিলে আরতি। আমাকে তোমার ভাল না লাগতে পারে। আমার সম্পর্কে তোমার ঝোঁক কেটে যেতে পারে। স্বাভাবিক। একসময় লাগত বলে বরাবর লাগবে— এমন কথা নেই। আমাদের বাড়ি, আমার মা, আমার রোজগার…’

আরতি বাধা দিল। বলল, ‘তুমি ঝগড়া করতে এসেছ?’

‘না। আমি বলতে এসেছি, তুমি মিথ্যে মামলা…’

‘মামলা?’

‘একই হল। … মিথ্যে কথা। যে কোনও পুরুষ মানুষের কাছে ব্যাপারটা লজ্জার। ওটা তুমি ঠিক বুঝবে না, ভেতরের একরকম নেকেডনেস। তার পৌরুষকে তামাশা করা।’

আরতির ইচ্ছে হল বলে, আমি মিথ্যে কথা বলিনি। যা জেনেছি বলেছি। তুমি আমি না-না করেও তিন চারজন ডাক্তার দেখিয়েছি। সবাই কি আমাদের ধাপ্পা দিয়েছিল। আমি বিশ্বাস করি না।

সলিল প্যান্টটা তুলে নিল। নিয়ে জানলার দিকে সরে গেল। তার পিঠ আরতির দিকে।

‘তুমি আজ রাত্তিরে আমায় থাকতে বলতে পার। বলবে নাকি?’

আরতি শিউরে উঠল! লোকটার কি মাথা খারাপ!

প্যান্ট পরার জন্যে তৈরি হতে হতে সলিল বলল, ‘লজ্জা করলে ঘরের বাইরে যেতে পার। অবশ্য তোমার লজ্জা পাওয়া উচিত নয়। তুমি…’

‘আমি আসছি।’

বাইরে এল আরতি। সলিল যা বলছে, ঠিক নয়। তার সত্যিই মাথায় গন্ডগোল আছে। এতগুলো ডাক্তার ভুল বলবে? তারা ভুল বলেনি। তবে হতে পারে, সলিলের দোষ শুধরে গিয়েছে। যদিও কেমন করে কে জানে! জগতে কতরকম আশ্চর্য কাণ্ড ঘটে। অদ্ভুত কিছু হতে পারে সলিলের। কে বলতে পারে!

সলিল ডাকল না, নিজেই বাইরে এসে দাঁড়াল। ‘তুমি এখানে আছ, কলেজে কাজ করছ, জগবন্ধু আমায় বলেছিল। আমাকেও কাজে এখানে এসে পড়তে হল। ভাবলাম, যাই দেখা করে সুখবরটা দিয়ে যাই। তুমি ভেবেছিলে তোমার কাছ থেকে কিছু হাতাতে এসেছি।’ হাসতে লাগল সলিল। ‘তোমার কাছ থেকে হাতাবার নতুন কী আছে!’

আরতি সলিলকে দেখছিল। গায়ের জামা এখনও শুকোয়নি। প্যান্ট ভিজেই আছে।

‘আমাকে দেখে তুমি একেবারে ভয়ে সাদা ছাই হয়ে গিয়েছিল, তাই না?’

জবাব দিল না আরতি।

‘তুমি কলেজে কী নামে আছ?’

‘আগের নামে।’

‘লাহিড়ী বাদ দিয়েছ। ভালই করেছ! চলি।’

সলিল দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে কাদামাখা চটিটা পায়ে গলিয়ে পরে নিল।

‘তোমাকে যথাসময়ে সুখবরটা দেব।’

‘সুখবর! ও!’

‘প্রভাকে দেখতে, এখন বড় ভাল লাগে।’

‘ও।’ বলেই আরতির কেমন খেয়াল হল— প্রভা! পাড়ার সেই বিধবা মেয়েটা! যাকে সবাই ঠাট্টা করে বলত, ‘রসবিধবা’।

সলিল দরজা খুলল। ‘চলি। আমি পরশু দিন কলকাতায় ফিরে যাচ্ছি। … তবে ভেব না, আবার উৎপাত করতে আসব! আসি।’

চলে গেল সলিল।

কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকল আরতি। সিঁড়ি দিয়ে নেমে গিয়েছে লোকটা। বাইরে কি বৃষ্টি হচ্ছে এখনও! আবার যদি ফিরে আসে!

দরজা বন্ধ করল আরতি।

সলিল কি এখানে নাটক করতে এসেছিল। তার আসা-যাওয়া নাটকের মতনই। সে বলল, সুখবর জানাতে এসেছে। কিসের সুখবর? তার বউয়ের বাচ্চাকাচ্চা হবে। মানে সলিল বাবা হতে যাচ্ছে। সে পৌরুষহীন নয়।

আরতির মনে হল, সলিলের পক্ষে এটা যে সুখবর নয়, সে জানে না। পিতৃত্ব অর্জনের ক্ষমতা তার নেই। অন্তত থাকার কথা নয়। অবশ্য সে অন্যের ধনে ধনী হতে পারে। প্রভা মেয়েটাকে আরতি জানে। দেখেছে। নিজের গায়ের গয়না খুলে স্বামীর ব্যবসায় দিয়েছে যখন তখন নিশ্চয় স্বামীঅন্ত প্রাণ। সতী লক্ষ্মী বিধবা। স্বামীর সুখের জন্যে সবই করতে পারে। হয়ত, কে বলবে, স্বামীকে সন্তান দেবার জন্যে সে আরও কত কী দিতে জানে! বা নিজে নিতে চায় বলে দিতে পারে।

ঘরে ফিরে এল আরতি। পাখা চলছে। বৃষ্টির মিহি শব্দ। আরতির শাড়িটা মেঝেয় পড়ে। সলিল পরেছিল।

বিছানায় বসার আগে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল আরতি। প্রভাকে তার স্পষ্ট করে মনে পড়তে লাগল। সলিলদের পাড়ার বাহান্ন কি তিপ্পান্ন নম্বর বাড়ির মেয়ে। বিধবা হয়ে বাপের বাড়িতে এসে থাকত। তার বাবার সোনার দোকান ছিল কোথায় যেন। বোধহয় গরানহাটায়। প্রভা পাড়ার পুরুষ মানুষদের কাছে ছিল ‘রসবিধবা’। তার খ্যাতি ছিল নানারকম। প্রভার মা আধ পাগলা তায় এক অঙ্গ অসাড়।

আরতি বুঝতে পারছিল না, সলিল এই প্রভাকে কেমন করে বিশ্বাস করল? আরতির যে সলিলকে, তাদের বাড়ির ব্যাপারস্যাপার, তার মা, অভাব, টানাটানি ভাল লাগেনি শেষ পর্যন্ত এটা সত্যি কথা। কিন্তু সলিলের ভেতরের দোষ সম্পর্কে সে মিথ্যে বলেনি।

তাহলে?

ব্যাপারটা ভোজবাজি, না প্রভার চালাকি, না স্বামীকে সুখী করার জন্যে কোনও ছলনা— আরতি বুঝতে পারছিল না।

পায়ে করে শাড়িটা মেঝে থেকে সরিয়ে একপাশে ফেলে রেখে আরতি বিছানায় বসল।

বসে বুঝতে পারল, তার মাথার এখন যা অবস্থা তাতে আবার দুটো অ্যাসপিরিন খাওয়া দরকার।

কিন্তু ও জিনিস বেশি খাওয়া উচিত নয়। খারাপ কিছু ঘটে যেতে পারে!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *