দিব্যেন্দু পালিত : লোকসভা, বিধানসভা
লেকের জলে এক ডুব দিয়ে উঠে মাথা ঝাড়তে ঝাড়তে পরী দেখল অল্প দূরে গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে তার চান করা দেখছে এক বাবু। প্যান্ট শার্ট পরা, লম্বাও নয়, বেঁটেও নয়, মাথাভর্তি চুল, গায়ের রঙ তারই মতো ময়লা, কিন্তু কেমন ছোকরা-ছোকরা চেহারা। চোখাচোখি হতে মুখ ফিরিয়ে নিল। দূর থেকে মাথায় গাঁটরি নিয়ে এগিয়ে আসছে একটা মেয়েমানুষ, তার পিছনে একটা সাইকেল। কিছুই জানে না এমন ভঙ্গি করে এখন এ সবই দেখছে।
আর একটা ডুব দেবার আগে লোকটাকে খুঁটিয়ে দেখল পরী এবং ভাবল, তাকেই দেখছিল এটা সে বুঝল কী করে। আশপাশে চান করছে রেললাইনের ওপারের বস্তি থেকে আসা আরও তিন-চারজন মেয়েমানুষ। তবে ওদের কেউই তার মতো জোয়ান নয়। খানিকটা তফাতে গামছা পরে গায়ে জল থাবড়াচ্ছে একটা রিকশাওলা। আরও দূরে মাটি শুঁকতে শুঁকতে ঘোরাফেরা করছে দু-তিনটে ছাগল, মুখে কী যেন কামড়ে ধরে একটা নেড়ি হেঁটে গেল ছাগলগুলোর পাশ দিয়ে। সে যখন চান করতে নামে তখন লোকটা ছিল বলে মনে পড়ছে না। তারপর হঠাৎ-ই। এই ভোটের দিনে, যখন চারদিক শুনশান, মেয়েমদ্দরা কখনও জোড়ে, কখনও দল বেঁধে ছুটছে ইস্কুলবাড়িতে ভোটের লাইন দিতে, তখন কাজকম্ম ফেলে এই লোকটা নিশ্চয়ই ওই বুড়ি মেয়েমানুষগুলোকে, রিকশাওলাকে কি ছাগলগুলোকে দেখতে লেকের পাড়ে হঠাৎই দাঁড়িয়ে পড়েনি! যৈবন আলাদা জিনিস।
ঘন্টি বাজাতে বাজাতে চলে গেল সাইকেলের লোকটা। পিছনে পিছনে মাথায় শুকনো ডালপালার গাঁটরি নিয়ে মেয়েমানুষটাও। লোকটা আবার মুখ ফিরিয়েছে এদিকে। তার সঙ্গে চোখাচুখি হতে সিগারেটে টান দিয়ে জল দেখতে লাগল। পরী দাঁড়িয়েই থাকল। কোমরজলে নেমে একটা বড় ডুব দেবার পর সাপটানো শাড়ির তলায় জলে ভিজে বিজবিজ করছে বুক। পাড়ে রাখা আছে আর একটি শাড়ি আর বেলাউজ। এই কাপড়ের জল নিংড়ে, গা মুছে, শুকনো জামাকাপড় পরে ঝুপড়িতে ফিরবে সে। ভিজে শাড়িটা শুকলে মা আসবে চান করতে। যা গরম! মনে হয় মেয়েছেলে না হলে গা উদোম করে ঘুরে বেড়াতে পারত।
আজকের দিনটা খারাপ। সকালে দুটো পাউরুটি আর গোটাতিনেক আধপচা পেয়ারা ভাগাভাগি করে খেয়েছে পাঁচজনে, এক প্রস্থ ভাঁড়ের চা খেয়েছে সে আর তার মা শকুন্তলা, দেখতে দেখতে বেলা গড়িয়ে গেল। সকাল থেকে চল্লিশ পয়সার বেশি ভিক্ষে না জোটায় গুলেকে কাঁখে তুলে বাজারে তরকারি কুড়োতে গেছে মা। যাবার আগে লেকে চান করতে পাঠাল তাকে। বলল বিষ্টুদার দোকান ঘুরে যেতে। এ সব ধান্দা দিব্যি বোঝে পরী, শকুন্তলা তাকে রোজগারে পাঠাল। ফেরার আগে দু-পাঁচ টাকা হাতে পেয়ে গেলে ভাল হত। অন্তত চালটা ডালটা কেনা যেত তাতে। কিন্তু এই শুনশানের বাজারে দেবে কে টাকাটা?
লোকটাকে কি অস্থির লাগছে একটু? তা না হলে যে-সিগারেটটা ফুঁকছিল সেটা জলে ছুঁড়ে দিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে পকেট থেকে প্যাকেট বের করে আর একটা ধরাল কেন? কী মনে করে বসে পড়ল বেঞ্চিতে?
ফেলে দেওয়া সিগারেটের টুকরোটা এদিক ওদিক ভাসতে ভাসতে এখন এগিয়ে আসছে তারই দিকে। সেটাকে আর লোকটাকে লক্ষ্য করতে করতে আর ডুব দিল না পরী। দুহাতে জল সরিয়ে জায়গামতো সরে এসে হাওয়া লাগতে দিল বুকে। দেখতে চাইলে দেখুক। মনে হচ্ছে ঠিকই ভেবেছে। মতলব না থাকলে কেউ এদিকে এসে এভাবে তিত্থির কাকের মতো বসে থাকে। অন্যদিন এ সময় এদিকটা এমন চুপচাপ থাকে না। চান করতে নামে আরও বেশি পুরুষ মেয়েমানুষ। উল্টোদিকের পাড়ে কাপড় কাচে ধোপারা। এদিক ওদিক করে ছুটকো ছাটকা লোকজন, সাইকেল। আর গাছের ছায়ায় বসে ঢলাঢলি জুমাচুমা করবার জন্যে বগলদাবা করে ছুকরি নিয়ে আসে দু-একটা ছোঁড়া। আজ একেবারে শুনশান। বিষ্টুদা বলেছিল বলেই জানে আজ মে মাসের কুড়ি তারিখ, সোমবার। সকাল থেকে আকাশ মেঘলা, একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে গুঁড়িগুঁড়ি। সেজন্যে নয়। সব ভোটের জন্যে। ও বাবু, তোমার ভোট নাই নিকি গো! প্যাঁট প্যাঁট করে দেখছ কি!
পেটের ভিতর খিদে পাবার জায়গাটা খলবল করে উঠল রঙ্গ-তামাশায়। সামান্য হাসিতে কেঁপে উঠল ঠোঁটদুটো। ভিক্ষে করতে করতে একসময় হাত পাতলেই বুঝতে পারত কোন মানুষটা ভিক্ষে দেবে, কে দেবে না। নিজেকে মেয়েমানুষ হিসেবে চিনতে পারার পর থেকে শিকারও চিনতে শুরু করেছে পরী। মুখচোরা, হাবভাব, হাঁটাচলার ভঙ্গি দেখেই বুঝতে পারে কোন পুরুষটার মতলব কি। কখনও এ পাড়ায় কখনও ও পাড়ায়, ফুটপাথে আর ঝুপড়িতে থাকতে থাকতে আস্তে আস্তে শিখে গেছে সব। ইজের-পরা বয়স থেকে ফ্রক-পরা বয়সে পৌঁছনো পর্যন্ত এ ফুটপাথ থেকে ও ফুটপাথে দৌড়োদৌড়ি করে ট্রাফিকে দাঁড়ানো গাড়ির বাবুদের কাছে হাত পেতে ঘ্যানঘেনে গলায় দিব্যি ভিক্ষে চাইত সে। শাড়ি ধরার পর শকুন্তলা আর তাকে করতে দেয় না ওসব। তার বদলে এখন সে কর্পোরেশনের ছাইগাদায় গিয়ে ময়লা কাগজ, টিনের কৌটো, শিশি-বোতল আর পাঁশ কুড়োয়। বস্তা বোঝাই করে সেসব বিক্রি করে আসে বিষ্টুদার রদ্দির দোকানে। এখন গাড়ি ধরে ভিক্ষে চায় বোন সুন্দরী। দাদা আঁটুল মোটর গ্যারেজে কাজ পাবার পরেও কিছুদিন আসত, তারপর একদিন টাকাপয়সা নিয়ে মার সঙ্গে চিল্লাচিল্লি হল খুব। আঁটুল মাকে ‘খানকি’ বলল, শুনে ছাই ঘাঁটার লোহা হাতে তেড়ে গেল মা, ‘ওরে খানকির বাচ্চা— আয়— আজ খুন করব তোকে—’ বলল এই সব। সেই থেকে আঁটুল নাপাত্তা। আর দুভাই বাঁটুল, শাঁটুল এখনও ছোট, যখন যেমন পায় ভিক্ষে করে, খবরের কাগজ কুড়োয়, রাস্তার দেওয়াল থেকে পোস্টার ছিঁড়ে জড়ো করার জন্যে তক্কে তক্কে থাকে। ভালমন্দ খাবার ইচ্ছে হলে বাজারের হোটেলের সামনে কাঁদুনি গেয়ে ঝোলটা, আলুটা, মাছের কাঁটাটা নিয়ে আসে অ্যালুমিনিয়ামের পুরনো বাটিতে। দেড় দু-বছর আগে ফুটপাথে শুয়েই পাংচার সারানো গাড়ির চাকায় হাওয়া ফোলার মতো আবার পেট ফুলতে শুরু করল মার, দেখতে দেখতে বেরিয়ে এল গুলে। মানুষের বাচ্চা তো নয়, যেন ওল্টানো আরশোলা। আকাশ-চাওয়া হয়ে কখনও হাসে, কখনও কাঁদে।
পরী জানে না তার বাপ কে, কে-ই জন্ম দিল সুন্দরী, বাঁটুল, শাঁটুলকে। আগে বুঝত না, এখন বোঝে ফুটপাথে গাদাগাদি করে শুয়ে এমনি এমনিই পেট ফোলে না মা-র। গুলের জন্মের আগে কিছুদিন রিকশাওলা গঙ্গারামের সঙ্গে খুব মাখামাখি হয়েছিল শকুন্তলার, নীল পাড়ের কোরা শাড়ি পেয়ে এমন ভাব দেখাত যেন গববে পা পড়ে না মাটিতে। সিঁদুরও পরত কিছুদিন। গঙ্গারাম একদিন তাদের রিকশায় চড়িয়ে ঘোরাল এক চক্কর। ফুটপাথ থেকে তাকেও ফ্রক কিনে দিয়েছিল একটা। লোকটাকে খারাপ লাগত না। গুলের জন্মের পরেও বেশ আদিখ্যেতা ছিল মার সঙ্গে। তো একদিন রাতে গঙ্গারাম তার ওপর চড়াও হবার পর সে চিল্লাচিল্লি শুরু করতে ঘুম ভেঙে ব্যাপারটা টের পেয়ে শকুন্তলাও গেল খেপে। গঙ্গারামকে তাড়াল, তাকেও শাড়ি ধরাল। হা রে বুদ্ধি! শাড়ি ধরালেই বুঝি রক্ষে পায় ফুটপাথের মেয়েমানুষ! তার পেট নেই? হোক ছেঁড়া, গা-গতর ঢাকবার জন্যে মাঝেমধ্যে শাড়ি বেলাউজের দরকার নেই? আর শুধু গঙ্গারামেরই বুঝি দোষ! ওই যে একদিন ফুটপাথ সাফাইয়ের নামে হললা গাড়িতে তুলে নিয়ে গিয়েছিল তাদের— শকুন্তলাকে ছাড়লেও তাকে ছাড়ল না সহজে, সে কি এমনি-এমনি নাকি! তারপর এই যে সেদিন বিষ্টুদার দোকানে দশ টাকা ধার চাইতে গিয়েছিল শকুন্তলা, বিষ্টুদা নাকি বলল, এখন যা, দুপুরে পরীকে পাঠাস— তো তাকেই পাঠাল শকুন্তলা, আর তাকে দোকানের আলমারির পিছনে নিয়ে গিয়ে আদর করল বিষ্টুদা, জুমাচুমা করল, তারপর লোক আসায় হাতে দশ টাকা গুঁজে দিয়ে বিদেয় করে দিল, এসব কি এমনি-এমনি নাকি! ছিয়া যা, ছিয়া যা। পরী জানে, সেও শকুন্তলার মতো খানকি হয়ে যাচ্ছে। শকুন্তলাও জানে, না হলে বিষ্টুদার দোকান ঘুরে চান করতে যেতে বলবে কেন! তা বিষ্টুদাও থাকলে তো! গিয়ে দেখল দোকানের ঝাঁপ ফেলা। আশপাশও কানা। চটপট একটা ডুব দিয়ে পরী ভাবল, আর চান করে কাজ নেই। লোকটা গরম থাকতে থাকতেই একটা কিছু করে ফেলা দরকার। কেটে গেলেই ফক্কা। মনে হচ্ছে এ বাবুটারও ভোট নেই তাদের মতো, কিন্তু খিদে আছে শরীরে।
এতক্ষণ মজা পাচ্ছিল, জল ঠেলে পাড়ের দিকে এগোতে এগোতে শরীরে রাগ টের পেল পরী। ভোটের জন্যেই নাকি আজ সব ছুটি। আর এমনই ছুটি যে দোকানপাট সব বন্ধ, রাস্তায় বাস মিনিবাস নেই বললেই হয়, ট্রাম চলছে অনেকক্ষণ পরে পরে। তাও ফাঁকা ফক্কা। আর রাস্তায় মোটর আর ট্যাক্সি এতই কম যে হুসহাস করে বেরিয়ে যাচ্ছে সব। জ্যাম হচ্ছে না কোথাও। সকাল থেকে গাড়ি ধরার জন্যে অনেকবার ছুটোছুটি করেছে সুন্দরী— একবার তো চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে গেল, কিন্তু একটাও গাড়ি দাঁড়ায়নি। দশটা নয়া পয়সা পর্যন্ত ভিক্ষে দেয়নি কেউ। দিন তিন-চার হল বাঁটুল শাঁটুলেরও পোস্টার ছেঁড়া বন্ধ। কদিন আগে সিনেমার পোস্টার ছিঁড়তে ছিঁড়তে একটা ভোটের পোস্টারও ছিঁড়ে ফেলেছিল বাঁটুল, সঙ্গে সঙ্গে হইহই কাণ্ড, তিন-চারজন দৌড়ে এসে চড়চাপড় মারল বাঁটুলকে। সেই থেকে ভয়ে আর কোনও পোস্টারেই হাত দেয়নি ওরা। কাজকাম নেই, এখন ফুটপাথে ইটের টুকরো ছুঁড়ে ছুঁড়ে কংগ্রেস-বি জে পি- ছি পি এম-গঙ্গারাম-লোকসভা-বিধানসভা খেলে। তবে আজ বিকেল পাঁচটায় ভোট শেষ হয়ে যাবার পর আর কেউই পোস্টার, ঝোলানো কাগজের লম্বা দড়ি নিয়ে মাথা ঘামাবে না। কদিন খুব চিল্লাচিল্লি করেছে সব, মিছিল করেছে, মিটিং করেছে, ভোট ফিরি করেছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে। রাতের দিকে বোমা-টোমাও ফাটিয়েছে দু-একটা। আজ সব ক্লান্ত, হাল-বেহাল, গা-ছাড়া হয়ে থাকবে। তখনই সুযোগ। বিষ্টুদা বলেছে আগে থেকেই ভোটের কাগজ কুড়নোর জন্যে তৈরি থাকতে, ইস্কুলবাড়িতে ভোটের গেট বন্ধ হলেই ঝাঁপিয়ে পড়তে। বলেছে, ‘আশপাশের রাস্তায় যত যা আছে কুড়িয়ে বস্তা বোঝাই করবি। কাল নিয়ে আসবি এখানে, ওজন করে দাম দিয়ে দেব। লোকসভা বিধানসভা মিলিয়ে এবার তো এলাহি কাণ্ড রে! ভোটে তোদেরই বরাত খুলে গেল দেখছি!’
বিষ্টুদা বললেও পরী জানে কাজটা সহজ হবে না। আশপাশে তাদের মতো খানকির বাচ্চা কম নেই। আছে পাড়া, বে-পাড়া। ধান্দাটা সকলেই জানে। এই তো গেল বছর— নাকি তার আগের বছর? — ভোটের শেষে একটা কাগজ ঝোলানো ইয়া লম্বা দড়ির দখলদারি নিয়ে বে-পাড়ার কয়েকটা কাগজ-কুড়ুনের সঙ্গে তাদের দলের রক্তারক্তি লেগে গিয়েছিল আর কি! তাছাড়াও আছে খচড়া। পোস্টারে এমন এঁটেল লেই মারে আজকাল যে ছিঁড়তে গেলে দেওয়াল ছাড়ে না, ছিঁড়ে যায়। ছেঁড়া কাগজের দামও কমে যায়। এত সব খচড়া সামলে কতটা কী বস্তায় উঠবে শেষপর্যন্ত তা কে জানে! পরী নিঃশ্বাস চাপল। ঝটপট গা মুছে ভিজে শাড়ি ছেড়ে গায়ে জড়াল শুকনোটা, বেলাউজটাও। না, লোকটা নড়েনি। আড়ে তাকিয়ে দেখল, আবডালে চোখ রেখেছে তার ওপর। মুখ ফিরিয়ে নিল। লোকটা একা নয়। দেখছে ওই রিকশাওলাটাও। শালা আর একটা গঙ্গারাম যেন। এতক্ষণ জলের থাবড়া মারছিল গায়ে, এইবার জলে নামল। ভিজে শাড়িটা নিংড়োতে নিংড়োতে খর চোখে বেঞ্চিতে বসে থাকা লোকটাকে দেখল পরী। তারপর আশপাশে কে আছে না আছে দেখে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
‘ও বাবু গো, একা কেন! ভোট নাই নাকি?’
লোকটা ঘাবড়ে গেল কেমন। হাতে সিগারেট ছিল তখনও, সেটা ফুঁকবে না ফেলে দেবে ভাবতে ভাবতে বলল, ‘কী চাই?’
পরী হাসল। তার আবার লজ্জা কিসের! আরও একটু এগিয়ে এসে বলল, ‘চল, ওদিকে গাছের তলায় বসবে। দশ টাকা দিও।’
‘যাও, ভাগো এখান থেকে—।’ লোকটা খেপে গেল এবার, ‘বদমাইশি করতে হলে অন্য জায়গায় যাও—’
‘ভাগব কেন! এটা তোমার জায়গা নাকি!’
‘ওহ! যত্ত সব—!’
লোকটা উঠে দাঁড়াতে এবং তারপর জায়গা ছেড়ে হাঁটা দিতে মুহূর্তের জন্যে থমকে গেল পরী। বোধহয় লোক চিনতে ভুল করেছিল সে। বোধহয় এমনিই এসে বসেছিল লোকটা, চোখ আছে বলে তাকিয়ে ছিল, ওই করতে গিয়ে তার চান করাও দেখেছে। কিন্তু এই লোকটা কেটে গেলে শূন্য হাতে ফিরতে হবে তাকে। বিষ্টুরও ঝাঁপ বন্ধ, বিকেলের আগে খুলবে মনে হয় না। আদৌ খুলবে কিনা কে জানে!
পরী মরিয়া হয়ে উঠল। লোকটা চলে যাচ্ছে, যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখান থেকেই দেখল দূরে একটা লোক এগিয়ে আসছে এদিকে, হয়ত আর কেউও এসে যাবে এর মধ্যে। তখনই ফন্দি এঁটে দৌড়ে গিয়ে পিছন থেকে লোকটার হাত টেনে ধরল সে।
লোকটা দাঁড়িয়ে পড়ল। থমকানো ভাব, কথা ফুটল না মুখে।
হাতটা ছেড়ে দিল পরী।
‘ঠিক আছে, পাঁচ টাকা দিয়ে যাও। মায়ের দিব্যি, সারাদিন খাওয়া হয়নি, বাবু—’
‘ফাজলামি!’ লোকটা আবার এগিয়ে গেল, ‘এক পয়সাও দেব না।’
‘না দিলে চিল্লাব।’ আবার লোকটার গায়ে গায়ে এঁটে এল পরী, যেভাবে আগে ভিক্ষে চাইতে মোটরগাড়ির সঙ্গে সঙ্গে হাঁটত। বলল, ‘ওই দ্যাখ, লোক আসছে। বলব খারাপ লোক, গায়ে হাত দিয়েছিল—’
লোকটা আবার দাঁড়িয়ে পড়ল। মুখ ফ্যাকাশে। খুব ভয় পেয়ে গেছে যেন। তারপর হঠাৎই মুখ ঝুঁকিয়ে বুক পকেট হাতড়ে একটা দু টাকার নোট বের করে ছুঁড়ে দিল ওর মুখের ওপর। তারপরেই হাঁটতে শুরু করল হনহন করে।
টাকাটা খামচে ধরে পরী ভাবল আবারও পিছু ধরে। তারপর ভাবল, থাক, তবু ভয় পেয়ে দুটাকা দিল। বাবুটা তো সত্যিই খারাপ কিছু করেনি। দেখল, দূর থেকে আরও দূরে যেতে যেতে লোকটা পিছন ফিরে তাকাল একবার। তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল অন্য রাস্তার বাঁকে।
পরী ফিরতে লাগল। দুটাকায় আর কিছু না হোক, মুড়ি খেয়ে কাটানো যাবে দুপুরটা। শকুন্তলাও হয়ত কিছু জোগাড় করে আনবে এর মধ্যে। ভোট কি আর রোজই হচ্ছে! আর ভোট না হলেই বা কী! খানকির বাচ্চারা যেন মানুষের বাচ্চার মতো রোজই দুবেলা পেট ভরে খেতে পাচ্ছে!
এসব ভেবে মেঘলা আকাশের দিকে তাকাল পরী। কাঁধের ওপর জল নিংড়ানো শাড়ি, হাতের মুঠোয় টাকা। সামান্য জ্বালা করে উঠল চোখদুটো।
