সমরেশ বসু : কুসুমের পথ
‘ফটিক আর কোনও দিনই ফেরেনি।’
মিসেস মুখার্জি যখন এই শেষ কথাটি উচ্চারণ করলেন তখন তাঁর স্বরে বেজে উঠল করুণ সুর। সুরের মধ্যে যেমন তরঙ্গ থাকে, যেন মনে হয় সেই তরঙ্গের দোলায় সুর ধীরে, দূরে ভাসতে ভাসতে আস্তে মিলিয়ে যায়। আর সেই মিলিয়ে যাওয়ার অনুরণনের মধ্যে ভিন্ন একটা সুরের অচেনা ধ্বনি র সঙ্কেত শোনা যায়। তার করুণ স্বরে কি তেমনি ঈষৎ বিদ্রুপের ধ্বনি ছুঁয়ে গেল? স্বরের করুণ সুরের মতোই তাঁর ঠোঁটের হাসিতেও ছিল তারই প্রতিচ্ছায়া। তাঁর ঠোঁটে যদি ঈষৎ বক্রতা দেখা দিয়ে থাকে, তাতেও আশ্চর্যের কিছু নেই। এবং তাঁর চোখের করুণ দৃষ্টিতে কিন্তু ছিল একটা হতাশা।
স্বাভাবিক। তাঁর স্বর, সুর, দৃষ্টি, করুণা, ঈষৎ বিদ্রুপ, হতাশা, সমস্ত অভিব্যক্তিগুলোই অত্যন্ত স্বাভাবিক। কারণ, কুসুমকে তিনি ভালবেসেছিলেন। ভালবেসেছিলেন, শুধু এ কথা বললে কুসুমের প্রতি তাঁর স্নেহের পরিমাপ করা যায় না। মিসেস মুখার্জি, কুসুমকে তাঁর কন্যার ন্যায় মনে করতেন, বা তাঁর একমাত্র কন্যার মতোই কুসুমকে দেখতেন। মিসেস মুখার্জির কথাবার্তার মধ্যে, আদৌ সেরকম কোনও মিথ্যা সেন্টিমেন্টের উচ্ছ্বাস ছিল না। তিনি তো কারোর মন ভেজাবার জন্য কুসুমের কথা বলেননি, বা তিনি ওই শ্রেণীর গল্পলেখিকাও নন। তিনি যথেষ্ট বুদ্ধিমতী বাস্তববাদী মহিলা।
বুদ্ধিমতী বাস্তববাদী মহিলাদের মনে যদি স্নেহ ভালবাসা থাকতে পারে, তাহলে তাঁদের মনে একটা প্রত্যাশাও থাকতে পারে। আর সেই প্রত্যাশার কিছুমাত্র মূল্য না দিয়ে যদি কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে মনে আঘাতও লাগে বইকি। বুদ্ধিমতী বাস্তববাদী মহিলারা তো আর হৃদয়হীন নন। কারোর প্রতি স্নেহ ভালবাসা মনে আপনিই একটা প্রত্যাশা জাগিয়ে তোলে। বিশেষত সেই স্নেহ ভালবাসা যখন কেউ সাগ্রহে সুখে বিগলিত হয়ে গ্রহণ করে। মিসেস মুখার্জি কুসুমকে নিশ্চয়ই তাঁর কন্যার মতো দেখতেন না। অবিশ্যি তাঁর কন্যার সঙ্গে কুসুমের এমনিতেই বিস্তর ফারাক। তাঁর কন্যা কুসুমের থেকে। কয়েক হাজার বছরের বড়। মেধাবী, কলেজে পড়া, নিরহঙ্কারী উজ্জ্বল একটি মেয়ে। ধনী বাবা-মায়ের এক কন্যা হিসেবে, তাঁদের মেয়েটি কোনওরকম বিলাস-আলস্যে অভ্যস্ত হয়নি।
অবিশ্যি, মিসেস মুখার্জি কুসুমের কথা বলতে গিয়ে, তাঁর কন্যার কথা একবারও তোলেননি। দরকারও মনে করেননি তুলনা দেবার। কুসুমের প্রতি তাঁর স্নেহ-ভালবাসার কথা বলতে গিয়েই কন্যার প্রসঙ্গ এসে পড়ল।
কুসুম কে? একটি অবস্থাপন্ন ভদ্র মার্জিত পরিবারে এক চৌদ্দো-পনেরো বছরের কিশোরী পরিচারিকা। আপাতত, এছাড়া কুসুমের আর কোনও পরিচয় নেই। মধ্য কলকাতার সব থেকে অভিজাত পাড়ায়, আকাশচুম্বী বিশাল ফ্ল্যাটের, ছোট্ট পরিবারের কিশোরী পরিচারিকা বললেও, ওর ভূমিকাটা তার চেয়ে অনেকখানি আলাদা। রান্নার জন্য আছে এক প্রৌঢ়া বাঙালি স্ত্রীলোক। বছর চল্লিশ বয়সের অবাঙালি বেচন, যাকে ঘরগেরস্থালির প্রায় সবরকমের কাজ করতে হয়। কিন্তু বেলা দুটোয়, মিসেস মুখার্জির সঙ্গে বেচন রোজ অফিসে চলে যায়। ডিরেক্টর হিসাবে মিসেস মুখার্জি, রোজই বেলা দুটোয় অফিসে যান। ফেরেন প্রায় রাত্রি আটটায়। ফেরার সময়, স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গেই ফেরেন। বেচনও তখনই ফেরে। ফেরার পরেও বেচনের বেশ কিছু কাজ থাকে। কিন্তু অফিসে বেচনের কাজ খুব সামান্য। বাড়ির কাজই ওর আসল। অফিসে যৎসামান্য কাজের জন্য, তার মাইনের অঙ্কটা বেশি।
রান্নার যাবতীয় কাজ একজনকেই করতে হয়। এবং খাদ্য পরিবেশনও তার কাজ। কাজের হিসাবে দেখলে, কুসুমের সবথেকে বড় কাজ কাপড় কাচা। গৃহের কর্তা গিন্নি ও কন্যার, বাড়িতে ব্যবহারের প্রত্যহের ছেড়ে রাখা জামাকাপড় ওকে কাচতে হয়। আর ওর নিজেরটা। সব মিলিয়ে পরিমাণ সামান্যই। এ ছাড়া, ওর দ্বিতীয় বড় কাজ, বাসন মাজা।
বাসন মাজা বলতে, এখানে পাঁজা পাঁজা বা কাঁড়ি কাঁড়ি বাসন ভাবলে ভুল হবে। এ ক্ষেত্রেও কুসুমের দায়িত্ব গৃহের কর্তা গিন্নি ও কন্যার ব্যবহৃত চীনে মাটির বা স্টিলের হালকা বাসন, চামচ ইত্যাদি, আধুনিক কোনও কেমিক্যাল পাউডার দিয়ে ঝকঝকে করে মাজা। ওর নিজের থালা-বাসনও ওকে ধুতে হয়। সব মিলিয়ে, এ পরিমাণটাও মোটেই বেশি নয়। ওর তৃতীয় আবশ্যিক কাজ হল, তিন ঘরের তিনটি বিছানা, সকালে নিজের হাতে গোছানো। বলা বাহুল্য, এ কাজটাও তেমন পরিশ্রমসাধ্য নয়।
কুসুম যখন প্রথম এসেছিল, দশ বছরের একটি গ্রাম্য মেয়ে। হাত-পা অপরিচ্ছন্ন। ময়লা একটা ফ্রক গায়ে। স্বাস্থ্যও মোটেই ভাল ছিল না। মিসেস মুখার্জির পছন্দ হয়নি। তিনি চেয়েছিলেন একটি কাজের মেয়ে। বাচ্চা মেয়েই চেয়েছিলেন। তিনি অবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে, গৃহের কাজের লোকেদের স্ট্যাটাস বাড়াতে চাননি। সেদিক থেকে, মোটামুটি মধ্যবিত্ত চিন্তা ধ্যানধারণা অনুযায়ীই সংসার চালাতেন। অন্যথায় হয়ত কুসুমের বয়সী কোনও মেয়েকে সংসারের কাজে লাগাতেন না। কিন্তু কুসুমরাই বা যাবে কোথায়? এ দেশে, গরিব ঘরে, ওই বয়সী ছেলেমেয়েদের নিজের ভরণপোষণের দায় নিজেদেরই নিতে হয়।
মিসেস মুখার্জি কুসুমের মতো মেয়ে আগেও রেখেছেন। বড় হয়েছে, চলে গিয়েছে। আবার নতুন এসেছে। আজকাল অবিশ্যি অনেক গৃহেই অবিবাহিতা তরুণীদের কাজ করতে দেখা যায়। তবে সব পরিবার, ওই বয়সের মেয়েদের দায়িত্ব নিতে চায় না। বিবাহিতা তরুণী বা যুবতীরা তখনই কাজে আসে, যখন স্বামী ভরণপোষণে অসমর্থ বা অনিচ্ছুক হয়। কিন্তু তাদের নিয়ে বড় অসুবিধা দেখা দেয়। তাদের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে। অধিকাংশ বিবাহিতা মেয়েরাই, কোলে বাচ্চা নিয়ে আসে। গৃহস্থ মাত্রেই বোঝেন, বাচ্চা-সহ একটি মেয়ের পক্ষে কাজ করা কতখানি অসুবিধাজনক। সে অসুবিধাও গৃহস্থরা ভোগ করতে চান না।
যাই হোক, মিসেস মুখার্জি দশ বছরের সেই স্বাস্থ্যহীন কুসুমকে প্রথম দর্শনেই বাতিল করে দিয়েছিলেন। কিন্তু যে-লোকটি (মুখার্জি সুপার প্রাোজেক্টস-এর একজন নিম্ন বেতনের পিয়ন) কুসুমকে নিয়ে এসেছিল, সে মিসেস মুখার্জিকে কাতরভাবে বলেছিল, ‘এখন দেখছেন রোগা পটকা। দু-দিন আপনার কাছে থাকতে পেলেই দেখবেন, গায়ে গতত্তি লেগেছে। এ বয়সের ছেলে-মেয়েরা পেট ভরে দুটো খেতে পেলেই, কচি লাউডগার মতন ডগডগিয়ে বেড়ে ওঠে। তখন দেখবেন, কাজও ঠিক করছে।’
লোকটির কথা শুনে মিসেস মুখার্জি দ্বিতীয়বার কুসুমের দিকে দেখেছিলেন। কোনও সন্দেহ ছিল না। মেয়েটির বড় বড় দুই চোখে, চোখের কোণের কালিমায়, শীর্ণ মুখে, ডিগডিগে রোগা শরীরে, না খেতে পাওয়া অপুষ্টি অত্যন্ত স্পষ্ট। সেটা তাঁর চোখে প্রথমেই পড়েছিল, এবং সেই কারণেই তিনি কুসুমকে বাতিল করেছিলেন। লোকটির কথায় একটা যুক্তি ছিল, যা তাঁর মনকে সজাগ করেছিল। তাছাড়া, সেই অপুষ্ট স্বাস্থ্যহীন, রক্তহীন ফ্যাকাশে সাদা সাদা বড় কুসুমকে তাঁর অভিজ্ঞ চোখ দ্বিতীয়বার দেখে বুঝেছিল, মেয়েটি দেখতে খারাপ না। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষের সামনে, কুসুমের স্বাস্থ্যহীন বড় বড় ভীরু চোখদুটিতে কিঞ্চিৎ বুদ্ধির ছাপও দেখেছিলেন। কুসুমের মাথায় তখন ঘাড় অবধি, ঘন চুলের গোছা। মিসেস মুখার্জি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তোমার মাথায় উকুন আছে, না?’
কুসুম মাথা নেড়ে মুখ নিচু করেছিল। মিসেস মুখার্জি গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কী করে জানলে নেই?’
‘আমার মাথার চুলের গোড়া যে তেতো।’ কুসুম অকপট সারল্যে বলেছিল, ‘আমার মাথায় উকুন থাকে না। পালিয়ে যায়।’
মিসেস মুখার্জি প্রথমে ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেও, হাসি চাপতে পারেননি। কথাটা যে তিনি নতুন শুনেছিলেন, তা না। প্রথমত কথাটা শুনলেই তাঁর হাসি পেত। তিনি তাঁর মা দিদিমার কাছে, ছেলেবেলাতেই শুনেছিলেন, কোনও কোনও মানুষের চুলের গোড়ার স্বাদ নাকি তিক্ত হয়। যার ফলে, তাদের মাথায় উকুন কখনও বাসা বাঁধে না। কুসুমের বলার ভঙ্গিতেও তাঁর হাসি পেয়েছিল। তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কে বললে, তোমার মাথার চুল তেতো?’
‘আমার মা বলেছে।’ মিসেস মুখার্জিকে হাসতে দেখে, ঠিক বুঝতে পারেনি, উনি আসলে অবিশ্বাসে ঠাট্টা করে হাসছিলেন কি না। তবু একবার ঢোঁক গিলে বলেছিল, ‘আমিও জানি।’
মিসেস মুখার্জি যেন একটু মজাই পেয়ে গিয়েছিলেন। জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কী করে জানলে?’
‘আমি যে মাথার চুল তুলে, গোড়াসুদ্ধ চুষে দেখেছি।’ কুসুম অকপট সারল্যেই স্বীকার করেছিল।
মিসেস মুখার্জি হেসে উঠেছিলেন। কুসুমকে কিছু না বলে, লোকটিকে বলেছিলেন, ‘ও এখন তাহলে থাক। সেরকম বুঝলে, তোমাকে অফিসে খবর দেওয়া হবে। এসে নিয়ে যেও।’
লোকটি নত হয়ে, করজোড়ে নমস্কার করে, বিদায় নিয়েছিল। এই হল কুসুমের কাজে নিয়োগের বৃত্তান্ত। তারপর থেকে বলতে গেলে, মিসেস মুখার্জি নিজেই কুসুমকে ওর কাজ শিখিয়েছেন। এক বছরের মধ্যে। সত্যি কুসুমকে যেন আর চেনা যেত না। সেই লোকটির কথা মতোই। কচি লাউডগার মতো ডগডগিয়ে উঠেছিল। চেহারার মধ্যে বেশ সুন্দর একটি চটক ছিল। চোখে মুখে ছিল শ্রী। স্বাস্থ্যের সঙ্গে, সেই শ্রীও যেন নতুন রূপ পেয়েছিল। নিজেকে কুসুমের পরিচ্ছন্ন করার দরকার হয়নি। দশ তলার ধূলিহীন, ঝকঝকে ফ্ল্যাটে ও এমনিতেই যথেষ্ট পরিচ্ছন্ন হয়ে উঠেছিল। মিসেস মুখার্জি ওকে নিজের পছন্দ মতো জামা কিনে দিতেন। বাইরে বেরোবার জন্য পায়ে পরার দু-তিন জোড়া স্যান্ডেল কিনে দিয়েছিলেন। অবিশ্যি কুসুমকে বিল্ডিংয়ের বাইরে একলা কখনও যেতে হত না। এগারো তলার ওপরে, সার্ভেন্টসদের থাকবার ব্যবস্থা ছিল। বিশেষত, সাত-আট তলার ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের সার্ভেন্টস কোয়ার্টার ছিল ওপরেই। সেখানেই তাদের ব্যবহারের বাথরুমও। কুসুমকে একমাত্র বাথরুমে যাবার জন্যই বাইরে যেতে হত।
মিসেস মুখার্জিকে ও মা বলে ডাকত। মিঃ মুখার্জিকে বাবা। তাঁদের কন্যাকে দিদি। বছর খানেকের মধ্যেই কুসুম সুবর্ণার প্রতি বেশি অনুরক্ত হয়ে পড়েছিল। সুবর্ণা মুখার্জি পরিবারের একমাত্র কন্যা। মা যে কুসুমকে ভালবাসেন, সুবর্ণা তা বুঝতে পারত। ওরও কুসুমকে ভাল লেগেছিল। ও কুসুমের ব্যবহারের জন্য মাথার তেল, পাউডার, ক্রিম ইত্যাদি কিনে দিত। স্কুল থেকে (প্রথম দিকে, পরে কলেজ থেকে) ফেরার পথে লজেন্স চকোলেট নিয়ে আসত প্রায় রোজই। কুসুম রাত্রে মিসেস মুখার্জিকে প্রতিটি কথা বলত।
কুসুমের উন্নতির সব থেকে যেটা লক্ষণীয় বিষয় হয়ে উঠেছিল, তা ওর অবিশ্বাস্য লেখাপড়া শেখা। সেটা সম্ভব হয়েছিল সুবর্ণার জন্যই। তিন বছরের মধ্যে মোটামুটি ভাল বাংলা পড়তে ও লিখতে শিখেছিল। যুক্তাক্ষরেও মোটেই পিছিয়ে ছিল না। এমনকী, ওর লিখিত বাক্যের গঠনও খুব খারাপ ছিল না।
কুসুমের সর্বাঙ্গীণ উন্নতিতে, মিসেস মুখার্জি বিশেষ করে খুবই খুশি ছিলেন। প্রায় ঘরের মেয়ের মর্যাদাই ওকে দিতে শুরু করেছিলেন। সুবর্ণা বড় বোনের মতো, একটু গম্ভীরভাবে প্রয়োজনে শাসনও করত। কিন্তু মনে মনে খুবই ভালবাসত। ওর আর মায়ের হাতেই, মেয়েদের যথার্থ বড় হয়ে ওঠা বলতে যা বোঝায়, কুসুম তাই হয়ে উঠেছিল। বড় হবার— অর্থাৎ বয়স হলে, যে শিক্ষা পাওয়া দরকার, মিসেস মুখার্জি ওকে সে-শিক্ষাও দিয়েছিলেন।
মিঃ মুখার্জি একটু গম্ভীর মানুষ। কথাবার্তা কম বলেন। তাছাড়া, তাঁকে সারাদিন নানাভাবে ব্যস্ত থাকতে হয়। বংশগত কোনও ব্যবসার দ্বারা তিনি কোটিপতি হননি। যাকে বলে, ‘সেলফ মেড ম্যান’ তিনি তা-ই। এবং তাঁর জীবনের পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের সঙ্গে মিসেস মুখার্জির অধ্যবসায় ও অবদান কিছু কম নেই। মিঃ মুখার্জি মুখে বেশি কিছু না বললেও, সামান্য দু-একটি কথা বা ঈষৎ হাসিতেই বোঝা যায়, কুসুমকে তিনিও মনে মনে স্নেহ করেন।
কুসুমের দিনগুলো ভালভাবেই কাটছিল। গত চার বছরের মধ্যে, ও দু-বার দক্ষিণ জেলার দেশের বাড়িতে গিয়েছিল। কিন্তু বেশিদিন থাকতে ভাল লাগেনি। ওর মা দিদিরা বলত, কলকাতার সাহেব বাড়িতে তো চিরকাল কাটবে না। শেষ পর্যন্ত গ্রামে এসেই থাকতে হবে। অতএব, কুসুমের উচিত, গ্রামে এসে মাঝে মাঝে থাকা।
কুসুম তা বিশ্বাস করত না। মিসেস মুখার্জির কথা শুনে ওর মনে কেমন একটা প্রত্যাশা জেগেছিল। জীবনটা ওর কলকাতাতেই কেটে যাবে। মিসেস মুখার্জিই হয়ত ভাল অবস্থাপন্ন কোনও ছেলে দেখে ওর বিয়ে দেবেন। অনেক টাকা খরচ করবেন। বস্তুতপক্ষে, কুসুম খুব একটা ভুল ভাবত না। মিসেস মুখার্জির মনে সেরকম একটা ইচ্ছা ছিল।
কুসুমের রূপে যেমন একটা চটক ছিল, তেমনি দেখতে দেখতে ও শরীর স্বাস্থ্যেও চোখে পড়বার মতো বেড়ে উঠেছিল। বয়স তেরো পেরোবার আগেই, মিসেস মুখার্জি ওকে শাড়ি পরিয়েছিলেন। কুসুম যেমন অল্প কাজ করেও, সকলের স্নেহ ভালবাসা পেয়েছিল, তেমনি সব থেকে বেশি কাজের লোক বেচনের কর্তৃত্ব ছিল অনেক বেশি। একদিক থেকে বিচার করতে গেলে কুসুমের ওপর বেচনের হিংসে হবারই কথা। কিন্তু বেচন কুসুমকে নিজের মেয়ের মতোই দেখত। কুসুমের বয়সী মেয়েও ছিল তার দেশের বাড়িতে। একমাত্র, পাচিকা স্ত্রীলোকটি কুসুমকে দু-চোখে দেখতে পারত না। বাড়ির সকলের স্নেহ-ভালবাসা দেখে সে মনে মনে জ্বলে যেত। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারত না। পারত না, মানে সাহস পেত না। আর পারতপক্ষে সে কুসুমের সঙ্গে কথাই বলত না।
কুসুমের তাতে কিছুই আসত যেত না। ও ছিল ওর নিজের জগৎ নিয়ে। মিসেস মুখার্জি বেলা এগারোটার সময় খাওয়া সেরে নিয়ে, বিশ্রাম করতেন। বেলা দুটোয় ড্রাইভার এসে জানাত যাবার সময় হয়েছে। তিনি বেচনকে নিয়ে বেরিয়ে যেতেন। মিঃ মুখার্জি তো রোজ বেরিয়ে যেতেন সকাল নটা বাজতেই। সুবর্ণা যেত কলেজে। বিশাল সেই গোটা ফ্ল্যাটের মধ্যে, বলতে গেলে কুসুমের একলাই কাটত। কারণ পাচিকা স্ত্রীলোকটি দুপুরেই একটু বেরবার সুযোগ পেত। নানা ফ্ল্যাট ঘুরে ঘুরে, তার চেনা-জানা মানুষদের সঙ্গে গল্প করত। কুসুম খবরের কাগজ, আরও নানা বাংলা পত্র-পত্রিকা আর, গল্পের বই পড়ে সময় কাটাত।
কিন্তু সময়টা যেন কাটতে চাইত না। পত্র-পত্রিকা বই পড়ে, ওর মনে কোথায় একটা শূন্যতা বোধ জেগে থাকত। ও জানলা দিয়ে, কখনও উঁচু থেকে, ব্যস্ত লোকজন, গাড়িঘোড়া চলার ছবি দেখত। কখনও দেখত, কলকাতার সবুজ ময়দান। তবুও মনটা কেমন স্থির শান্ত থাকত না। কী যে চায়, ও নিজেও তা বুঝতে পারত না।
একদিন হঠাৎ ওর চোখের সামনে নতুন একটা দরজা খুলে গেল। সেদিকে তাকিয়ে দেখল, ওর অজানা চাওয়াটা রয়েছে সেই নতুন দিগন্তে। তখন ও চতুর্দশী। সেই নতুন দিগন্ত আসলে দুটো চোখ। যুবক পুরুষের চোখ। অনেক ভালভাবে খেয়ে পরে, স্নেহ যত্নে থেকে এবং ভবিষ্যতের অনেক আশার মধ্যেও, সেই যুবক যেন চতুর্দশী কুসুমের চোখের সামনে খুলে দিল জাদুকরী জগৎ। ওর রক্তে জাগিয়ে দিল একটা স্বপ্নিল নেশা।
যুবকের নাম ফটিক। দশ তলার ঠিক মুখোমুখি ফ্ল্যাটে, ফটিক এসেছিল কাঠের কাজ করতে। ছুতোরের কাজটা তার বংশগত ছিল না। চীনাদের কাছে ও কাঠের কাজ শিখেছিল। কয়েকটি মুসলমান অল্পবয়সী ছেলেকে নিয়ে, ও নিজেই একটা ফার্ম খুলেছিল। হাতে ভাল কাজও পেত। বয়স ওর তিরিশ-বত্রিশের মধ্যে। ছুতোর মিস্ত্রির কাজ করলে কী হবে, ফটিক রীতিমতো জিনস পরা, স্বাস্থ্যবান, চটপটে, চালাক-চতুর যুবক। চেহারাটাও তার বেশ ভাল। হাসি খুশি কইয়ে বলিয়ে। যাকে বলে স্মার্ট, ফটিক তাই।
কুসুম দেখল, ফটিকের চোখে এক সুখের জগতের সুদূর ডাক। সেই ডাকে সাড়া দেবার জন্য ওর শরীর মন ব্যাকুল হযে উঠল। এই একটি জায়গায়, কুসুমের থেকেও অনেক বেশি শিক্ষা পাওয়া, যুক্তিতে বিশ্বাসী মানুষও নিজেকে হারিয়ে ফেলে। কুসুমও হারিয়ে গেল। সুযোগটা নিল ও বিশাল জনশূন্য ফ্ল্যাটে। ওর মন কেমন করা খা খা দুপুরে। ফটিকের সাহসও কিছু কম ছিল না। সে তার আকাঙ্ক্ষা মিটিয়ে, কুসুমকে রোজ দিয়ে যেত ভবিষ্যতের আশা।
আশা না, স্বপ্ন। ফটিক বিবাহিত, কয়েকটি সন্তানের জনক। তার জীবন যাপনের চেহারাই আলাদা, কুসুম তার কিছুই জানত না। এরকম ক্ষেত্রে যা হয়, ঠিক তাই ঘটেছিল। ও ফটিককে বিশ্বাস করেছিল। তখন ফটিকের থেকে বিশ্বাসী আপনজন ওর আর কেউ ছিল না। কেবল একটা ব্যাপারে ও ফটিককে সাবধান করে দিয়েছিল, সে যেন ফ্ল্যাটের ঘরে ঢুকে কোনও জিনিসে হাত না দেয়। ফটিক তা কোনওদিন দেয়নি। এমনকী, ফটিকের সঙ্গে ও কোনও ঘরের বিছানায় শোয়নি।
কুসুমের তখন নিজের দিকে তাকিয়ে দেখবার অবকাশ ছিল না। ওর যে চেহারায়, চোখেমুখে, চলাফেরা, কথাবার্তা, হাসিতেও একটা পরিবর্তন দেখা দিচ্ছিল। ও তার কিছুই বুঝত না। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মিসেস মুখার্জির ভ্রূকুটি চোখে ফুটে উঠেছিল অবাক জিজ্ঞাসা। তাঁর সারাদিনের কর্মক্লান্ত কপালের রেখায় ফুটে উঠেছিল চিন্তার ছায়া। তিনি আচমকা কুসুমকে এক-আধটা প্রশ্ন করতেন। যা শুনে কুসুম চমকে উঠত। আর মিথ্যা হাসি দিয়ে নিজেকে গোপন করার চেষ্টা করত। কিন্তু সেভাবেই বা কতদিন চলতে পারে?
কুসুম ফটিককে ফ্ল্যাটের মধ্যে নিয়ে আসার সাহস হারিয়েছিল। কিন্তু ফটিকের ভাল ব্যবস্থা ছিল। এগারোতলায় ওর জানাশোনা এক বন্ধু ছিল। সেও এক ফ্ল্যাটের বাবু চাকর। ফটিককে সে তার ঘর ছেড়ে দিয়েছিল। কুসুম দুপুরে ঠিক সময় বুঝে, ফ্ল্যাটের প্রধান দরজা বন্ধ করে দিয়ে এগারোতলায় চলে যেত। যার ফলে, ফটিকের সঙ্গে মেলামেশার ব্যাপারটা আর গোপন রাখা যাচ্ছিল না। তার চেয়েও বড় কথা, দশ তলার সেই মুখোমুখি ফ্ল্যাট, কাঠের কাজ কত কাল ধরেই বা চলতে পারে। তবু তো চলতে হবে। প্রায় ছ-মাস ধরে গোটা ফ্ল্যাটের কাঠের কাজ হয়েছে। এবং একদিন তার অবসান হল।
ইতিমধ্যে মিসেস মুখার্জি কুসুমের সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি কুসুমকে ঘরে ডেকে, দরজা বন্ধ করে স্পষ্টই সব জিজ্ঞেস করলেন। কুসুমের স্বীকার করা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। ও তখন পাঁচ মাসের গর্ভবতী। মিসেস মুখার্জির মুখে ফুটে উঠেছিল তীব্র ঘৃণা আর অবিশ্বাস। মনে আঘাতও পেয়েছিলেন। জানিয়ে দিয়েছিলেন যে-লোকটি কুসুমকে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল, তাকে ডেকে তার সঙ্গেই কুসুমকে চলে যেতে হবে।
কুসুম বলেছিল, ‘সেই লোকের সঙ্গে আমি আর যাব না। আমার যা মাইনে পত্তর পাওনা হয়েছে, দিয়ে দিন। আমি ওর সঙ্গে চলে যাব। শিগগিরই আমাদের বে হবে।’
মিসেস মুখার্জির ইচ্ছা হয়েছিল, কুসুমকে সজোরে থাপ্পড় মেরে, সামনে থেকে সরিয়ে দেন। পারেননি। তিনি ঘটনা সবই জেনেছিলেন। ঘটনার নায়ক ফটিককেও চিনতেন। সুবর্ণা ওর কঠিন মুখ একেবারে ফিরিয়ে নিয়েছিল। কুসুমের সঙ্গে কথাও বলত না। কেবল মিঃ মুখার্জি ছিলেন নির্বিকার। বুঝলেও কোনও মন্তব্য করেননি। মিসেস মুখার্জি কুসুমের সমস্ত পাওনা টাকাপয়সা মিটিয়ে দিয়েছিলেন। কুসুম ওর সমস্ত শাড়ি জামা জিনিসপত্র নিয়ে, এগারোতলায় চাকরদের সেই ঘরটিতে গিয়ে উঠেছিল। ফটিক বলে গিয়েছিল, ও যত তাড়াতাড়ি পারে, কুসুমকে ওখান থেকে নিয়ে যাবে। কুসুম যেন অপেক্ষা করে। অবিশ্যি এসব কথা বলে যাবার সময়, কুসুমের কাছ থেকে সে, মিসেস মুখার্জির দেওয়া সব নগদ টাকাই নিয়ে গিয়েছিল।
তারপরে দু-মাস কেটে গিয়েছে। কুসুম এখনও সেই এগারোতলার এক ভৃত্যের ঘরে। ফটিকের অপেক্ষায় কাটাচ্ছে। মিসেস মুখার্জি বেচনের মারফত সব খবরই রাখেন। আর ভিতরে ভিতরে অস্থির হয়ে ওঠেন।
‘ফটিক আর কোনওদিন ফিরবেও না।’ মিসেস মুখার্জির স্বরের দৃঢ়তায় একটা ক্ষোভের সুরও ছিল।
আমরা কয়েকজন বসে বসে বিষয়টি শুনছিলাম। তিনি যে মিথ্যা বলছেন না সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ ছিল না। কিন্তু আমরা কেউ কোনও মন্তব্য করিনি। মিসেস মুখার্জি এবার মিঃ মুখার্জির দিকে ক্ষুব্ধ স্বরে বললেন, ‘এর একটা ব্যবস্থা কি করা যায় না? কুসুম তো একটা আন্ডার এজেড মেয়ে। ফটিককে কেন বাধ্য করা হবে না, কুসুমের দায়-দায়িত্ব নিতে? কেন ও পালিয়ে যাবে?’
মিঃ মুখার্জি শান্ত হেসে বললেন, ‘তুমি চাও আমরা ফটিক-কুসুমের ব্যাপারে জড়িয়ে পড়ি?’
মিঃ মুখার্জি শান্ত হেসে কথাটা বললেও, মিসেস মুখার্জি তৎক্ষণাৎ কোনও জবাব দিতে পারলেন না। মিঃ মুখার্জি আমাদের মুখের দিকে তাকালেন। কিন্তু আমরা কেউ কোনও জবাব দিতে পারলাম না। মিঃ মুখার্জিই আবার শান্ত হেসে বললেন, ‘তা হলে ফটিকের নামে আমাকে পুলিসের কাছে অভিযোগ জানাতে হয়। তারপরে কুসুমের অভিভাবক হিসাবে, ফটিকের বিরুদ্ধে মামলা লড়তে হবে। ফটিক যদি অস্বীকার করে, তার প্রমাণ করার দায়িত্বও স্বভাবতই আমাদের নিতে হবে। গৃহপরিচারিকা নিয়ে এই মামলাটি যখন খবরের কাগজে বেরবে, আমাদের নামও অবশ্যই প্রকাশ পাবে। কিন্তু কেন এসবের মধ্যে আমি বা আমাদের পরিবার জড়াতে যাব, তার কোনও যুক্তি নেই।’
‘তাহলে কুসুমের কী হবে?’ মিসেস মুখার্জি তাঁর স্বামীকে জিজ্ঞাসা করলেন।
মিঃ মুখার্জি হেসে বললেন, ‘সে জবাব তোমার আমার কারোরই জানা নেই। কুসুমকে আমরা সবাই ভালবাসতাম। কিন্তু কী করে ভুলব, ও কোন সমাজ আর পরিবেশ থেকে এসেছে। কোন কোয়ালিটিটিভ চেঞ্জ ওর কাছ থেকে আমরা আশা করতে পারি? সেটা কি এতই সহজ? কথাটা শুনতে খারাপ লাগতে পারে, কিন্তু এটা তো সত্যি, কুসুমকে আমরা ওর শিকড় থেকে তুলতে পারি না। তার জন্য যে আমূল পরিবর্তন সমাজে দরকার, আর সেই পরিবর্তন যাঁরা করবেন বলে, রোজ খবরের কাগজে, রেডিওতে, টিভি-তে বক্তৃতা করছেন সবই, আর সবাইকেই তোমরা জানো চেনো। সত্যি কথা বলতে কি…’
মিঃ মুখার্জি থেমে সকলের মুখের দিকে তাকালেন। আমরাও সবাই জিজ্ঞাসু চোখে তাঁর দিকে তাকালাম। তিনি একটু গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘আমার তো মনে হয়, কুসুমকে আমরা যেভাবেই রেখে থাকি, তাতে ওর জীবনে যে পরিবর্তনই আমাদের চোখে পড়ে থাকুক, কুসুম তার ঠিক রাস্তাতেই গেছে। ওর আর কী-ই বা করার ছিল? দেশে নিজের সমাজে পরিবারে থাকলে, এর মধ্যেই একটা বিয়ে দিয়ে দিত। কলকাতায় থেকে, বিয়ের বদলে একটি পুরুষের গ্রাসে পড়েছে। তার যা পরিণাম হওয়া উচিত, তাই হয়েছে। আমাদের ফ্ল্যাটের সার্ভেন্ট কোয়ার্টারেই বা ও আর কতদিন থাকবে? যার ঘর সে ওকে তাড়াল বলে। তারপরে হয়ত কুসুমকে কেউ উপদেশ দেবে, ফটিকের বিরুদ্ধে নালিশ আর মামলা করতে। তার পরিণামেই বা কুসুম কী পাবে? যে ফটিক ওইরকমভাবে ওকে নিঃস্ব করে ফেলে রেখে চলে গেছে, তার কাছ থেকে কুসুমের কী আদায় হবে? আমাদের কোন সমাজ আর রাষ্ট্র এর জবাব দেবে? বেচারি ছেলেমানুষ কুসুম, অনেক অসংখ্য কুসুমের মধ্যে একটা নতুন সংখ্যার সংযোজন।’
শেষ পর্যন্ত কুসুমের এই পরিণাম? মিসেস মুখার্জির স্বরে উদ্বিগ্ন জিজ্ঞাসা।
মিঃ মুখার্জি স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ‘তোমার ব্যক্তিগত করুণা ওর জীবনে অন্য পরিণাম এনে দিতে পারে।’
স্বামী-স্ত্রী দুজনই নির্বাক হয়ে দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মিঃ মুখার্জির হাসিও যেন এখন করুণ। আর কোটিপতির স্ত্রী মিসেস মুখার্জির চোখে নারীত্বের চিরকালের এক অসহায় ছায়া ঘনিয়ে আসছে।
