প্রফুল্ল রায় : মূকাভিনেতা

প্রফুল্ল রায় : মূকাভিনেতা

দুপুরে পারঘাটাটা একেবারে নিঝুম হয়ে যায়। আর তখনই জমজমাট আসর বসিয়ে ফেলে কেষ্টপদ আর তার একনম্বর সাকরেদ নাটকা। আজও তার হেরফের হল না।

এপারে নবীগঞ্জ, ওপারে মুকুন্দপুর। মাঝখানে বিরাট চওড়া নদীটা কাস্তের বাঁকানো ফলার মতো পড়ে আছে।

রোজ হাজার দুই মানুষ নদীর ওপর দিয়ে যাতায়াত করে থাকে। পারাপারের জন্য আগে ছিল এক জোড়া নৌকো, মাঝি। তাতে মাইল দেড়েক চওড়া এই জলস্রোতটি পেরুতে ঘণ্টাখানেক লেগে যেত। দু’ধারের মানুষের হাতে অপচয় করার মতো পর্যাপ্ত সময় নেই। তাই নৌকোর জায়গায় এসেছে দুটো ভটভটি, অর্থাৎ কিনা মোটর বোট।

নবীগঞ্জের দিকটায় জল ঘেঁষে কাঠের জেটি। ভটভটি থেকে নেমে জেটি পেরুলেই গাছের গুঁড়ির উঁচু উঁচু ধাপ। সেগুলো ভেঙে প্রায় তিরিশ ফুট ওপরে উঠলে ফুটিফাটা টিনের চালের কিছু দোকানপাট। কোনওটা চা-বিস্কুট আর সস্তা পাউরুটির, কোনওটা পান-বিড়ি-সিগারেটের, কোনওটা চাল-ডাল-তেল-মশলার।

পারঘাটের এই দোকানগুলোর সামনে দিয়ে মান্ধাতার বাপের আমলের একটা খোয়াওঠা রাস্তা চলে গেছে। রাস্তার ওধারে দোকানগুলোর মুখোমুখি ঝাঁকড়া-মাথা বিশাল ক’টা শিশুগাছ। গাছগুলোর ছায়ায় সারাক্ষণই ক’টা সাইকেল রিকশা দাঁড়িয়ে থাকে।

খোয়ার রাস্তা ধরে উত্তর দিকে বরাবর খানিকটা হাঁটলে প্রথমেই পড়বে অনেকগুলো করাতকল, ধানকল, লেদ মেশিনের ছোটখাটো কারখানা আর অগুনতি গুদাম। এরই ভেতর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান মেনে নিয়ে খাপরার ছাউনির তলায় দুনিয়ার সবচেয়ে ওঁচা একটা বেশ্যাপাড়া।

এ সবের পর সিকি কিলোমিটারের মতো জায়গা জুড়ে আগাছার জঙ্গল। জঙ্গল পেরিয়ে কয়েক পা গেলেই আসল শহর শুরু। নবীগঞ্জ ডিস্ট্রিক্ট টাউন হলেও রীতিমতো গমগমে শহর। এখানে প্রচুর মানুষ, রাস্তায় রাস্তায় থিকথিকে ভিড়। দেশভাগের পর নবীগঞ্জে পপুলেশন এক্সপ্লোশন, মানে প্রচণ্ড জনবিস্ফোরণ ঘটে গেছে।

জেটিটা যেখানে তার ডানদিকে নদীর কোলে শ্মশানঘাট। মস্ত ছড়ানো এক বটগাছের মাথায় সারাদিন ঝাঁকে ঝাঁকে শকুন বসে থাকে, নিচে ভাঙাচোরা টিন আর কাঠকুটো দিয়ে তৈরি ভগা ডোমের ঘর।

এই মুহূর্তে সূর্য খাড়া মাথার ওপর উঠে এসেছে। নদীতে এখন ভাটার টান। জ্যৈষ্ঠের গনগনে রোদে কাচের মতো স্বচ্ছ নীলাভ জল যেন ঝলকাতে থাকে। কোথাও এক ফোঁটা মেঘ নেই। অনেক উঁচুতে আকাশের নীল ছুঁয়ে ছুঁয়ে ক’টা চিল ডানা মেলে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।

ওপারে মুকুন্দপুর শহরটাকে আবছা ছবির মতো মনে হয়। ওখানে নদীর ধার ঘেঁষে প্রচুর ইটভাটা। সেগুলোর ঢ্যাঙা চিমনি সটান আকাশে গিয়ে বিঁধেছে।

নদীর জলস্রোত ছাড়া গোটা চরাচর আচ্ছন্নের মতো পড়ে আছে। সমস্ত কিছু স্তব্ধ, অনড়। ভরদুপুরে নেমে এসেছে ঘোর নিশুতি। এই সময়টা ঘণ্টা দুই নদী পারাপার বন্ধ থাকে। বেলা পড়ে এলে ফের ভটভটি চালু হবে।

অন্যদিনের মতো এই ঝিম-ধরা দুপুরে পারঘাটের মাথায় দোকানপাটের উল্টোদিকে শিশুগাছগুলোর ঠান্ডা ছায়ায় আসর জমাবার জন্য নাটকাকে নিয়ে তৈরি হচ্ছে কেষ্টপদ। রাস্তার ওধারে পান-বিড়ির দোকানটা তার, নাটকা তার ওখানে বিড়ি বাঁধে।

কেষ্টপদ ছটফটে মানুষ, হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা তার ধাতে নেই। দুপুরবেলা যখন খদ্দেরপত্তর থাকে না, সময়টা যাতে আলুনি না কাটে, ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে গাঁটে যাতে বাত না ধরে যায়, সেই উদ্দেশ্যে দু’ঘণ্টার জন্য দোকান ফেলে নাটকাকে নিয়ে রাস্তার ওধারে চলে যায়। প্রায় শুনশান পারঘাটে তখনও যারা থেকে যায়, তাদের সামনেই আসর বসিয়ে দেয়।

কেষ্টপদর বয়স তিরিশের কাছাকাছি। চেহারাটা হল বাজে-পোড়া তালগাছের মতো আখাম্বা ধরনের। পরনে খেলো কাপড়ের বেঢপ চাপা ফুলপ্যান্ট, তার ওপর সবুজে ডোরাকাটা লাল ফতুয়া। নাটকা হল বেজায় বেঁটে, তার মাথায় চুল কম। ছোট ছোট, পিটপিটে চোখ দুটো দেখলে বোঝা যায় সে একটি মিচকে শয়তান। কেষ্টপদর মতোই তারও পরনে একরকমের ফুলপ্যান্ট এবং ফতুয়া।

রোজই কেষ্টপদ নবীগঞ্জের এক-একটি লোককে নিয়ে তার হাবভাব, হাঁটাচলা নকল করে দর্শকদের মাতিয়ে দেয়। এই তামাশাতে কথা থাকে না, থাকে শুধু শব্দহীন অঙ্গভঙ্গি আর মুখচোখের নানা মজাদার খেলা।

আজ শিশুগাছের তলায় দাঁড়িয়ে চারপাশ একবার দেখে নেয় কেষ্টপদ। দর্শকদের ভেতর রয়েছে দোকানদারেরা, সাইকেল রিকশাওলারা। করাতকল আর ধানকলের ছুটকো ছাটকা কিছু ঠিকে মজুর যারা আজ কাজ জোগাড় করতে পারেনি, তারাও জুটে গেছে। শ্মশান থেকে এসেছে ভগা ডোম। আজ তার হাতে পোড়াবার মতো মড়া নেই। দোকানদাররা তাদের দোকান ফেলে চলে এলেও একজন কিন্তু আসেনি। সে হল নিশি। রাস্তার ওপারে একমাত্র চায়ের দোকানটা তার।

নিশির বয়স পঁচিশ,ছাব্বিশ,মাজা মাজা রঙ, ডাঁটো চেহারা, গোল মুখে দু-চারটে বসন্তের দাগ। শক্ত গড়নের শরীরটি জুড়ে তার অঢেল স্বাস্থ্য। দেখতে-শুনতে মোটামুটি ভালই।

বছর তিনেক আগে বিধবা হওয়ার পর পেট চালাতে পারঘাটায় চায়ের দোকান দিয়ে বসেছে, নতুন করে বিয়ে করেনি। পুরুষ খদ্দেরদের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি, হাসিঠাট্টা যে না করে এমন নয় কিন্তু ওই পর্যন্তই। তার বেশি এগুলে কিংবা গায়ে হাত-টাত দিতে চাইলে নিশির খর চোখ দপ করে জ্বলে ওঠে। হাতের কাছে সবসময় একটা ধারালো দা মজুত থাকে তার ধাঁ করে সেটা তুলে বাগিয়ে ধরে। সেই সঙ্গে মুখ থেকে তোড়ে বেরিয়ে আসে চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করা গালাগাল এবং খিস্তি। তবু তার দোকানে দুপুরবেলাটা ছাড়া সর্বক্ষণ ভনভনে মাছির ঝাঁকের মতো ভিড় লেগে থাকে। অন্যদের সম্বন্ধে নিশির শুচিবাই যত উগ্রই থাক, কেষ্টপদ গায়ে গায়ে বসলে সরে যায় না, দা-ও তোলে না। শুধু চোখ কুঁচকে আড়ে আড়ে পুরুষটাকে দেখতে দেখতে ঠোঁট কামড়ে চাপা গলায় শুধু বলে, ‘আঃ, মরণ—’

নিশি কোনওদিনই গাছতলায় আসে না। আজও সে নিজের দোকানে বসে রাস্তার এধারে তাকিয়ে আছে। তার দোকানের সামনে খদ্দেরদের জন্য গোটা দুই বাঁশের বেঞ্চি পাতা। একটা বেঞ্চিতে জুত করে বসে হাতে কাচের গেলাসে চা নিয়ে কেষ্টপদকে একদৃষ্টে দেখছে হরেন। বেঁটেখাটো মুগুরের মতো নিরেট চেহারার মধ্যবয়সী এই লোকটা অতি বজ্জাত, পয়লা নম্বরের ধুরন্ধর। গোটা নবীগঞ্জের মানুষ হরেনকে চেনে এবং এড়িয়ে চলে। তাকে আগে কোনওদিন দুপুরে পারঘাটায় দেখা যায়নি। আজ সে কোন মতলবে এখানে, বিশেষ করে নিশির চায়ের দোকানে হানা দিয়েছে, কে জানে!

দর্শকদের দেখতে দেখতে কেষ্টপদর চোখ কিছুক্ষণ হরেনের দিকে আটকে থাকে। তারপর নজরটা সরিয়ে নিয়ে বলে, ‘আজ তুমাদের অ্যামন একজনারে নকল কইরে দেখাব যারে তুমরা সক্কলে চেনো। নামটা তার আগে কইবনি। লোকটা কে, দেখি তুমরা ধরতে পার কিনা।’ বলে নাটকার দিকে ফেরে, ‘ওঠ রে পাটনার।’ পাটনার অর্থাৎ পার্টনার। দু-চারটে ইংরেজি বুলি শুনে শুনে মনে করে রেখেছে কেষ্টপদ, আখছার সেগুলো সে কথার ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে দেয়।

‘ঠিক হ্যায় গুরু’— নাটকা বসে ছিল, উঠে পড়ে। বোম্বাই ছবি আর টিভির কারণে কলকাতা থেকে দেড়শো কিলোমিটার দূরে এই নবীগঞ্জে হিন্দিটা চোরা বানের মতো ঢুকে পড়েছে। নাটকার দশটা কথায় দুটো হিন্দি থাকবেই।

এর পর শুরু হয়ে যায় তামাশা। মোটামুটি ব্যাপারটা এইরকম। একটা লোক অন্ধকার রাতে শুঁড়িখানায় গিয়ে আকণ্ঠ মদ গিলে প্রচণ্ড মাতাল হয়ে টলতে টলতে ড্রেনের ধারে হুড়মুড় করে ঘাড় গুঁজে পড়ে যাবে। তারপর তার সতীসাধ্ব স্ত্রী লণ্ঠন হাতে উদ্বিগ্ন মুখে খুঁজতে খুঁজতে শেষ পর্যন্ত স্বামীকে পেয়ে যাবে। স্বামীর সারা গা ড্রেনের ময়লায় মাখামাখি। টেনেহিঁচড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে পতিদেবতাকে বাড়ি নিয়ে যাবে সে।

এখানে স্বামীর ভূমিকাট বাঁটকুল নাটকার, স্ত্রী হয়েছে ঢ্যাঙা কেষ্টপদ।

গোটা তামাশাটায় একটি কথা নেই। নানারকম অঙ্গভঙ্গি, হাঁটার কায়দা, তাকানো, মুখের হাবভাব দিয়ে হাস্যকর দৃশ্যগুলি ফুটিয়ে তুলতে থাকে কেষ্টপদ আর নাটকা।

আসলে ব্যাপারটা হল বিশুদ্ধ মূকাভিনয়, যদিও এই শব্দটা মাসখানেক আগেও ছিল তাদের কাছে একেবারেই অজানা। অমলেশ সান্যাল কীভাবে, কার কাছ থেকে যেন কেষ্টপদ আর নাটকার এই গুণটার খবর পেয়ে বাড়িতে ডাকিয়ে নিয়ে তাদের অভিনয় দেখেছিলেন। অমলেশ নবীগঞ্জের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় মানুষ, বিদ্যার জাহাজ, কলকাতার বড় কলেজে পড়ান, ছুটিছাটায় বাড়ি আসেন। প্রথমটা তাঁর সামনে এসব দেখাতে রাজি হয়নি কেষ্টপদরা। সঙ্কোচে জড়সড় হয়ে বলেছে, ‘পারবনি। আপনারে কি এই লক্কড় লোংরা জিনিস দেখানো যায়?’ কিন্তু অমলেশ কোনও কথা শোনেননি। শেষ পর্যন্ত শব্দহীন মজার তামাশা দেখাতে হয়েছিল। অমলেশ এককথায় চমৎকৃত। বলেছিলেন, তোমরা জিনিয়াস হে। এমন মূকাভিনয় জীবনে দেখিনি। মূকাভিনয় এবং জিনিয়াস শব্দ দুটো কেষ্টপদরা সেই প্রথম শুনেছিল। জিনিয়াস কথাটার মানে তারা এখনও জানে না, তবে সেটা যে ভাল কিছু আন্দাজ করতে অসুবিধা হয়নি। অবশ্য মূকাভিনয় ব্যাপারটা পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন অমলেশ। তিনি আরও বলেছিলেন, কলকাতায় ওদের নিয়ে গিয়ে একটা বড় ‘শো’ করবেন, টিভিতেও ওদের মূকাভিনয় দেখানোর ব্যবস্থা করে দেবেন। কেষ্টপদরা, শুধু তারাই বা কেন, সারা নবীগঞ্জ জানে, মিথ্যে স্তোক দেওয়ার মানুষ নন অমলেশ। তবে কলকাতায় যেতে পারবে সেই আশায় দিন গুনে চলেছে তারা।

যাই হোক, মাতাল স্বামী আর পতিব্রতা স্ত্রীর দৃশ্যগুলো ক্রমশ জমে উঠতে থাকে। কেষ্টপদ আর নাটকার অভিনয় এমনই মজাদার যে পেটের ভেতর থেকে হাসি গবগবিয়ে বেরিয়ে আসে। দর্শকরা হেসে হেসে গড়িয়ে পড়ছিল আর বলছিল, ‘শালা কেষ্টা আর নাটকা কী খজড়ামোটাই না জানে! হেসিয়ে পেট ফাইটে (ফাটিয়ে) ফেলবে রে বাপ!’

ওদিকে নিশির দোকানের বেঞ্চিতে আর বসে থাকতে পারছিল না হরেন। হাসতে হাসতে সে ঠিকরে পড়ে যায়। ফের উঠে বসতে বসতে বলে, ‘শালোরা একেবারে বাপের ব্রেষোকাঠ (বৃষকাঠ)! মেরে ফেলবি নাকিন রে?’

নিশির কিন্তু অত উচ্ছ্বাস বা বাড়াবাড়ি নেই। ঠোঁট টিপে মুখ মচকে সে নিঃশব্দে হাসে আর বলে, ‘মরণ! মড়াখেগো দুটো করচে দ্যাখো!’

কেষ্টপদ আর নাটকার কিন্তু কোনওদিকেই নজর নেই। তামাশাটা এখন এই জায়গায় পৌঁছেছে। ড্রেনের ময়লা মেখে পড়ে আছে স্বামীরূপী নাটকা। আর স্ত্রী কেষ্টপদ লণ্ঠন তুলে স্বামীর মুখ দেখে চিনতে পেরে প্রথমে কপাল চাপড়ে কান্নার ভঙ্গি ফুটিয়ে তোলে। নিঃশব্দে কিছুক্ষণ বিলাপ করার পর কাল্পনিক আঁচল দিয়ে স্বামীর গা থেকে ড্রেনের ময়লা মুছে তাকে টেনে টেনে নিজেদের বাড়ির দিকে নিয়ে যেতে যেতে আচমকা দর্শকদের উদ্দেশে বলে ওঠে, ‘তুমরা চিনতে পেরেচ কার মাগ (স্ত্রী) কোন শালো মালখোর মাতালকে টেনে নে চলেচে?’

সবাই সমস্বরে জানায়— পেরেছে। মাতালটা হল করাতকলের মালিক কামাখ্যা কুণ্ডু। প্রায় রোজ রাতেই সে আর তার ধর্মপত্নী এইরকম কাণ্ড করে থাকে।

যারা এই তামাশার নায়ক-নায়িকা তাদের যখন চেনা গেছে তখন সার্থকতা সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। পরিতৃপ্ত কেষ্টপদ বাকি অংশটুকু সুচারুভাবে সম্পন্ন করে বসে পড়ে। তারপরও অনেকটা সময় নবীগঞ্জের নিঝুম পারঘাটা দমফাটা হাসিতে তোলপাড় হয়ে যেতে থাকে।

হাসির তোড় একটু কমলে নিশির চায়ের দোকান থেকে উঠে সোজা গাছতলায় চলে আসে হরেন। মুরুব্বিয়ানা চালে কেষ্টপদকে বলে, ‘জবর জমিয়ে দিয়েছিলি রে ব্যাটাচ্ছেলে! তোর আর এই নাটকা হারামিটার পেটের ভেতর এত সব মাল রয়েছে, আগে তো মালুম পাইনি। তা তোর সনগে এট্টা জরুরি কথা ছেল।’

হরেন কোন উদ্দেশে এখানে হাজির হয়েছে, বোঝা যাচ্ছে না। লোকটা একসময় ছিল মারাত্মক ক্রিমিনাল। তার বিরুদ্ধে কত যে খুন আর ডাকাতির কেস ছিল তার ঠিকঠিকানা নেই। দু-চারবার পুলিস টানাটানি করে হাজতেও ঢুকিয়েছে কিন্তু বেশিদিন আটকে রাখতে পারেনি, অদৃশ্য কারও ইঙ্গিতে সব মামলা চাপা পড়ে গেছে।

হরেন অবশ্য আজকাল ভদ্রলোক হয়েছে। খুনখারাপি মাস্তানির লাইনে আর নেই। পলিটিক্যাল পার্টির নেতাদের সঙ্গে এখন তার সারাক্ষণ ঘোরাফেরা। তাদের হয়ে কী সব কাজ টাজ করে দেয়। নিজের হাতে ছোরা কি পিস্তল টিস্তল না চালালেও, যারা ওসব চালায় তারা তার কথায় ওঠে, বসে। অতএব নবীগঞ্জের মানুষ পারতপক্ষে তার ধারেকাছে ঘেঁষে না। সেই হরেনের তার কাছে কী দরকার থাকতে পারে বুঝতে না পেরে ভীষণ ঘাবড়ে যায় কেষ্টপদ। উঠে দাঁড়িয়ে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কী কথা হরেনবাবু?’

হরেন কেষ্টপদর কাঁধে একখানা হাত রেখে খানিকদূরে তাকে নিয়ে গিয়ে বলে, ‘সবার সামনে কওয়া যাবে নি, তাই এখেনে লিয়ে এলাম। শোন, কাল সনঝে বেলা ঝামেলা রাখবি নি। আমি এইসে তুকে এক জায়গায় লিয়ে যাব।’

‘কুথায়?’

‘সে গেলেই বুজতে পারবি।’

‘কিন্তুক—’

হরেন যা বলবে চোখকান বুজে সেটা তামিল করাই নবীগঞ্জে নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে। কেউ তার মুখের ওপর কথা বলে না। কাজেই হরেনের কপাল কুঁচকে যায়। বিরক্ত গলায় সে বলে, ‘কিন্তুকটা আবার কী?’

ঢোক গিলে কেষ্টপদ বলে, ‘সনঝে বেলায় অনেক খদ্দের আসে। দু-চারটে পয়সা ত্যাখন রোজগার হয়। বুঝতেই পারচেন, আমি গরিব লোক—’

‘এই কথা!’ হেসে সস্নেহে কেষ্টপদর ঘাড়ে গোটাকয়েক চাপড় মেরে হরেন বলে, ‘বিড়ি বেচে ক’পয়সা আর পাবি! আমার সনগে গেলে এক সনঝেতে তোর একমাসের রোজগার হয়ে যাবে রে শালো! তৈরি হয়ে থাকিস। কাল সনঝেয় আসচি। আর হ্যাঁ, ওই নাটকা খজড়াটাকেও সনগে লিবি। আমি যে তোকে লিয়ে যাব, কোনও শালা য্যানো টের না পায়।’ বলে আর দাঁড়ায় না হরেন, একটা সাইকেল রিকশাওলাকে ডেকে তার রিকশায় চেপে চলে যায়।

হরেন কেন এসেছিল সেটা জানার জন্য গাছতলায় সবাই দম আটকে বসেছিল। সে ফিরে আসতেই তারা প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। ‘ত্যামন কিছু লয়, এমনি ডেকে নে গেছল হরেনবাবু—’ এইরকম ভাসা ভাসা জবাব দিয়ে এড়িয়ে যায় কেষ্টপদ। হরেন যখন বারণ করে গেছে, আসল কথাটা গলা দিয়ে বার করা যাবে না।

বিকেলে ভটভটি চালু হবার পর ফের যখন কেনাবেচা শুরু হয়, এক ফাঁকে দোকানের দায়িত্ব নাটকাকে দিয়ে নিশির কাছে চলে আসে কেষ্টপদ। চায়ের দোকানটা এখন মোটামুটি ফাঁকাই রয়েছে। নিশির কাছ ঘেঁষে বসে চাপা গলায় সে বলে, ‘তুমার সনগে এট্টা পরামশশো আচে গ মেয়েমানুষ—’

কেষ্টপদ যে পরামর্শের জন্য তার কাছে আসবে, তা যেন জানাই ছিল নিশির। হরেন যখন কেষ্টপদকে দূরে টেনে নিয়ে গিয়ে গুজগুজ করছিল তখন সে আন্দাজ করেছিল লোকটা কোনও অভিসন্ধি নিয়ে এসেছে। হরেন চলে যাবার পর সবাই যখন হামড়ে পড়েছিল, নিশি চুপচাপ তার দোকানে বসে ছিল। কোনওরকম কৌতূহল যে তখন দেখায়নি তার কারণ একটা অদৃশ্য বঁড়শি সে অনেক আগেই কেষ্টপদর নাকে আটকে রেখেছে। তাকে না জানিয়ে কিছু করে, সাধ্য কী ওই আখাম্বা লোকটার?

নিশি চোখের কোণ দিয়ে কেষ্টপদকে দেখতে দেখতে বলে, ‘কী কইল মড়াখেগোটা?’ মড়াখেগো তার কথার মাত্রা।

কোন উদ্দেশ্যে হরেনের আগমন, জানিয়ে দেয় কেষ্টপদ।

নিশির কপালে ভাঁজ পড়ে। বোঝা যায় সে বেশ চিন্তিত। বলে, ‘যমের অরুচিটা য্যাখন যেতে বুলেচে, যেতেই হবে। কিন্তুন হুঁইশার (হুঁশিয়ার)। তুমারে য্যানো ফেঁসিয়ে না দ্যায়।’

‘হুঁ।’ আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে কেষ্টপদ। বলে, ‘হুঁইশার তো থাকতেই হবে।’

পরদিন সন্ধেবেলায় দোকান যখন খদ্দেরে খদ্দেরে সরগরম, বিকিকিনি রীতিমতো জমে উঠেছে, সেই সময় জিপ নিয়ে আসে হরেন। অগত্যা দোকানের ঝাঁপ ফেলে নাটকাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হয়। দূর থেকে চোখের ইশারায় নিশি কেষ্টপদকে নতুন করে সতর্ক করে দেয়।

কেষ্টপদদের নিয়ে হরেনের জিপ একসময় নবীগঞ্জের আরেক মাথায় ভবেশ্বর চৌধুরিদের বাড়ি পৌঁছে যায়। বিশ বিঘে জমির মাঝখানে থামওলা সাবেক আমলের তেতলাটা দূর থেকে এতকাল দেখেছে কেষ্টপদরা। এই প্রথম ভেতরে ঢুকল। সামনের দিকে মস্ত ফুলের বাগান, নকল পাহাড়, ফোয়ারা, টেনিস খেলার কোর্ট— কী নেই?

হরেনের পেছনে পেছনে কেষ্টপদ আর নাটকা যেখানে গিয়ে হাজিক হল, তেমন জায়গায় কস্মিনকালেও যাওয়া তো দূরের কথা, স্বপ্নেও ভাবেনি ওরা। এটা একটা বিশাল হলঘর। প্রায় বিশ হাত উঁচু সিলিং থেকে দুই সারিতে দশটা করে বিশটা একই মাপের একই চেহারার ঝাড়বাতি, মাঝখানে রয়েছে ওগুলোর তিনগুণ আরও একটা। সবগুলোতেই নানারঙের আলো জ্বলছে। মস্ত মস্ত জানালায় খড়খড়ি আর রঙিন কাচের পাল্লা। দেওয়ালে দেওয়ালে বাঘ আর হরিণের শিংসুদ্ধু মাথা আটকানো। সেগুলোর ফাঁকে ফাঁকে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড অয়েল পেন্টিং। মেঝেতে দামি লাল কার্পেট পাতা। চারিদিকে কত যে ভেলভেটে মোড়া সিংহাসনের ধরনের সোফা সাজানো রয়েছে, গুনে শেষ করা যায় না। আর রয়েছে একদিকের গোটা দেওয়ালটা জুড়ে গদি-মোড়া ফরাস। মাথার ওপর শুধু ঝাড়লণ্ঠনই নেই, কম করে দশ বারোটা ঝকঝকে নতুন ফ্যানও ঝুলছে।

দেখতে দেখতে চোখের তারা কপালে উঠে গিয়েছিল কেষ্টপদ আর নাটকার।

ভবেশ্বর চৌধুরিরা ছিলেন এই জেলার সবচেয়ে বড় জমিদার, সবচেয়ে বড়লোক। জমিদারি আর নেই, আইন করে তুলে দেওয়া হয়েছে। তবু এখনও তাদের হাতে কত পয়সা রয়েছে, সেটা এ বাড়িতে না ঢুকলে টের পাওয়া যায় না। কেষ্টপদরা শুনেছে, জমিদারি উঠে যাবার পর ইদানীং কী সব ব্যবসা ট্যাবসা করছেন ভবেশ্বরবাবুরা। হলঘরটা ফাঁকা নেই। ফরাসের ওপর তাকিয়ায় ঠেসান দিয়ে কাত হয়ে আছেন স্বয়ং ভবেশ্বর চৌধুরি। বয়স ষাট বাষট্টি। টকটকে গায়ের রঙ। অঢেল আরামে থাকা চেহারা। এই বয়সেও দু-একটার বেশি চুল পাকেনি। মাথার মাঝখান দিয়ে সিঁথি। পরনে ফিনফিনে ধুতি আর পুরনো ধাঁচের সিল্কের বেনিয়ান। পোশাকের দিক থেকে সাবেক চালটি বজায় রেখেছেন ভবেশ্বর চৌধুরি।

ভবেশ্বরকে এতকাল দূর থেকে দেখেছে কেষ্টপদরা, এই প্রথম এত কাছে এল।

ভবেশ্বর ছাড়াও নবীগঞ্জের বেশ কিছু গণমান্য মানুষকেও সোফায় বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। এঁরা হলেন নবীগঞ্জ জয়তারা উইমেন্স কলেজের প্রিন্সিপাল তারকনাথ রাহা, মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান হরিপদ তরফদার, বড় উকিল সহায়রাম পুততুণ্ড, ইত্যাদি। এঁদের সবাইকেই চেনে কেষ্টপদরা।

হরেন সোজা ফরাসের সামনে নিয়ে আসে কেষ্টপদদের। ভবেশ্বরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। দুজনে কোমর অনেকখানি ঝুঁকিয়ে সসম্ভ্রমে নমস্কার করে।

কেষ্টপদদের বিনয়ে খুশিই হন ভবেশ্বর। বলেন, ‘বসো বসো’—

কেষ্টপদ আর নাটকা নিচে কার্পেটের ওপর বসে পড়ে।

ভবেশ্বর বলেন, ‘আরে আরে, ওখানে কেন? ওপরে উঠে বসো।’

কেষ্টপদরা হাতজোড় করে জানায়, ভবেশ্বরের মতো এত বড় একজন মানুষের সামনে উঁচুতে বসা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

এ নিয়ে আর পীড়াপীড়ি করেন না ভবেশ্বর। বলেন, ‘শুনলাম তোমরা নাকিন বড় আর্টিস্ট হে। কী সব মজার মজার ব্যাপার অ্যাক্টিং করে দেখাও।’ তাঁর কথায় আঞ্চলিক একটু টান আছে।

কেষ্টপদ আর নাটকা চমকে ওঠে। আর্টিস্ট কথাটা তারা জানে কিন্তু অ্যাক্টিং শব্দটা এই প্রথম শুনল। তবে ভবেশ্বর যে তাদের মূকাভিনয়ের কথা বলছেন সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। কেষ্টপদ মুখ নিচু করে বলে, ‘ও কিচু লয়। দুকুরবেলা সময় কাটানোর তরে (জন্য) এই এট্টু— কথা শেষ না করেই সে থেমে যায়।

‘কিছু নয় বললেই তো হবে না। তোমাদের কথা আমি অনেক শুনেছি। তা হরেনকে দিয়ে তোমাদের কেন ডাকিয়ে এনেছি জানো?’

‘এজ্ঞে না’।

‘তোমার অ্যাক্টিং দেখাতে হবে।’

মাথা আরও নিচু হয়ে যায় কেষ্টপদর। সেদিন অমলেশ সান্যাল খাতির করে বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে তাদের তামাশা দেখেছেন। আজ ডাকিয়ে আনলেন ভবেশ্বর চৌধুরি। এই সব মান্যগণ্য লোকেরা হঠাৎ তাদের মধ্যে পেলেনটা কী? ভরদুপুরে শিশুগাছের তলায় তারা যা করে তা কি ভদ্রলোকদের দেখানোর জিনিস? মুখ আরও নামিয়ে হাত নেড়ে নেড়ে সে সমানে ‘না না’ করতে থাকে।

কিন্তু অমলেশের মতো ভবেশ্বর চৌধুরিও ঘোর নাছোড়বান্দা। অগত্যা নিরুপায় হয়েই রাজি হতে হয় কেষ্টপদকে। বড় মানুষের খেয়ালকে তার মতো গরিবেরা কতক্ষণ আর ঠেকিয়ে রাখতে পারে! সে বলে, ‘কী দেখাব বুইলে দ্যান—’

ভবেশ্বর বলেন, ‘ব্যোমকেশ মজুমদারকে চেনো?’

এবার মুখ তোলে কেষ্টপদ। নবীগঞ্জে বেশ কয়েকজন ব্যোমকেশ মজুমদার আছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে যিনি বিখ্যাত তিনি সাত আটটা ধানকল, অনেকগুলো লেদ মেশিনের কারখানা আর ডজনখানেক বিরাট বিরাট আড়তের মালিক, ভবেশ্বর তাঁর কথাই বলছেন কিনা জানার জন্য জিজ্ঞেস করে, ‘কোন ব্যোমকেশ মজুমদার? ওই যার আড়ত, কারখানা— এই সব আচে?’

‘হ্যাঁ।’ আস্তে মাথা দোলাতে দোলাতে ভবেশ্বর বলেন, ‘ওই আড়তওলার কথাই কইচি। ওকে নিজের চোখে দেখেচ?’

‘অনেক বার।’

‘চেহারাটা কেমন?’

‘মোন্দ লয়। এট্টু মোটা— এই যা। আর ডান পা’টা বাঁ পায়ের চাইতে খাটো।’

ভবেশ্বর দুই হাতের তালু উল্টে দিয়ে গলা সামান্য চড়িয়ে বলেন, ‘অত ভাল ভাল কথা কইতে হবে না। বল ল্যাংড়া ব্যোমকেশ।’ পরক্ষণে কণ্ঠস্বর ঝপ করে অনেকখানি নামিয়ে বলে ওঠেন, ‘লোকটার খুব বদনাম জানো কী? সারা শহরে তার নামে ঢি ঢি পড়ে গেছে?’

কেষ্টপদ কিছু জবাব দিতে যাচ্ছিল, তার আগেই ফের ভবেশ্বর বলতে থাকেন, ‘মেইন বাজারের ওধারে একটা ফ্ল্যাটে রক্ষিতা রেখেছে ল্যাংড়াটা। রোজ রাত্তিরে সেজেগুজে লুকিয়ে লুকিয়ে সে মেয়েমানুষটার কাছে যায়। বাড়ি ফেরে ভোরবেলায়। এ খবরটা রাখো?’

কেষ্টপদ হকচকিয়ে যায়। ভবেশ্বর যা বললেন, সেটা নবীগঞ্জের অনেকেই জানে। সে কার্পেটের দিকে তাকিয়ে রুদ্ধশ্বাসে বসে থাকে। তার সামনে ভবেশ্বর চৌধুরির মতো একজন মানুষ যে এ জাতীয় আলোচনা করতে পারেন, শুনেও যেন বিশ্বাস হয় না।

ভবেশ্বর এবার বলেন, ‘নেংচে নেংচে, কাছাকোঁচা সামলাতে সামলাতে রক্ষিতার বাড়ি গিয়ে মজা লোটে এবার সেটা দেখাবে। হরেনের সঙ্গে যাও, তুমি আর নাটকা ড্রেসটা পালটে এসো।’

কেষ্টপদদের উঠতেই হল। হরেনের সঙ্গে পাশের ঘরে গিয়ে মিনিট পনেরো বাদে যখন তারা ফিরে এল, নাটকার গায়ে সিল্কের শাড়ি আর ব্লাউজ, চোখে কাজল, সারা শরীর থেকে ভুরভুর করে গন্ধ বেরুচ্ছে। কেষ্টপদ পরে এসেছে চুনোট করা ধুতি, গিলে-করা ধবধবে পাঞ্জাবি, পায়ে দামি চটি। এই সাজসজ্জাতেই সারাক্ষণ ব্যোমকেশকে দেখা যায়।

এরপর ঝুঁকে ঝুঁকে, খাটো পা নেংচে নেংচে, থুতনিটা সামনের দিকে অনেকটা বাড়িয়ে চোরের মতো কিভাবে রক্ষিতার কাছে যায় ব্যোমকেশ এবং মেয়েমানুষটি কেমন করে তার সঙ্গে খুনসুটি করে, কোন প্রক্রিয়ায় ছেনালপনা করে সোনার গয়না আদায় করে— মনে মনে এসব এঁকে নিয়ে অভিনয় করে দেখায় কেষ্টপদ আর নাটকা।

বাঞ্ছিত ফলটি হাতে-হাতেই পাওয়া যায়। হাসতে হাসতে ভবেশ্বর এবং নবীগঞ্জের গণ্যমান্য মানুষগুলির ফরাস আর সোফা থেকে উল্টে পড়ে যাবার জোগাড়। তাঁদের গলার ভেতর থেকে হিক্কার মতো আওয়াজ বেরুতে থাকে। সবাই প্রায় সমস্বরে বলে ওঠে, ‘ফার্স্ট ক্লাস। কিন্তু হেসে হেসে একেবারে মরে গেলাম।’

খানিক ধাতস্থ হয়ে ভবেশ্বর, কলেজের প্রিন্সিপাল, মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান ইত্যাদি বিশিষ্ট অতিথিদের জিজ্ঞেস করেন, ‘কী মনে হচ্ছে? — চলবে?’

প্রিন্সিপাল তারকনাথ বলেন, ‘চলবে মানে? অপোনেন্টকে কাত করার জন্যে এর চেয়ে পাওয়ারফুল অস্ত্র আর হয় না। হাসতে হাসতে ছুরি চালানো যাকে বলে, সেটা এই মাইম আর্টিস্টদের দিয়েই হবে।’

ভবেশ্বর বলেন, ‘যা বলেছেন। এদের দিয়ে শুরুতেই গোড়া মেরে দিতে চাই।’

মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান হরিপদ চাকলাদার বলেন, ‘সেটা পারবেন চৌধুরিমশায়।’

কেষ্টপদর দিকে ফিরে ভবেশ্বর বলেন, ‘আমরা খুব খুশি হয়েচি। আজ অনেক খেটেচ দুজনে। এবার ছুটি। যে জামাকাপড় পরে অ্যাক্টিং দেখালে ওগুলো তোমাদের দিলাম। যত্ন করে রেখো, পরে দরকার হবে। শিগগিরই তোমাদের হরেনকে দিয়ে খবর দেব, চলে এসো।’

একবার তামাশা দেখিয়ে তা হলে নিস্তার নেই! ঢোক গিলে কেষ্টপদ বলে, ‘ফের আসতে হবে?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, একবার নাকি? অনেকবার। তোমাকে দিয়ে বহু জরুরি কাজ করিয়ে নেবার প্ল্যান করেছি যে।’

নিজের অজান্তেই, যেন কেষ্টপদ জিজ্ঞেস করে বসে, ‘কী কাজ?’

ভুরু কুঁচকে রহস্যময় হেসে ভবেশ্বর বলেন, ‘দেশের কাজ। এই ধর—’ বলে পকেট থেকে একশো টাকার দু-খানা নোট বার করে কেষ্টপদর দিকে বাড়িয়ে দেন।

বিমূঢ়ের মতো কেষ্টপদ বলে, ‘কিসের টাকা?’

বড় উকিল সহায়রাম পুততুণ্ড বলেন, ‘আমাদের কম আনন্দটা দিলে নাকি হে। তার একটা মজুরি নেই?’

আধঘণ্টা তামাশা দেখানোর জন্য? কড়কড়ে দু-শো টাকা! কেষ্টপদর চোদ্দ পুরুষে কেউ এটা ভাবতেও পারে না।

ভবেশ্বর আদরের গলায় বলেন, ‘নাও হে, নাও— বিহ্বলের মতো কেষ্টপদ টাকাটা নিলে ফের বলেন, ‘এখন যাও। হরেন তোমাদের পৌঁচে দিয়ে আসবে।’

হরেন যখন জিপে করে পারঘাটায় কেষ্টপদদের নামিয়ে দিয়ে যায় তখন অনেক রাত। ভটভটি বন্ধ হয়ে গেছে। নিশির চায়ের দোকানটা ছাড়া আর কোনও দোকান খোলা নেই।

রাতে ভটভটি বন্ধ হলে নিশি এক মুহূর্তও পারঘাটে থাকে না, সাইকেল রিকশা ডেকে শহরে চলে যায়। সেখানে সে আর তার বুড়ি মা থাকে। ওই মা ছাড়া জগৎসংসারে তার আর কেউ নেই। আজ যে সে নিঝুম পারঘাটায় একা বসে আছে তার কারণ কেষ্টপদ আর নাটকা। হরেনের মতো একটা প্রাক্তন খুনি ওদের জিপে করে তুলে নিয়ে গেছে, এটা সাংঘাতিক দুশ্চিন্তার ব্যাপার। কেষ্টপদরা ফিরে এসে সব না বলা পর্যন্ত সে শহরে যায় কী করে? তা ছাড়া রাতে কেষ্টপদ আর নাটকা পারঘাটা ছেড়ে কোথাও যায় না। আসলে তাদের আর কোথাও যাবার জায়গা নেই। কেষ্টপদ তার দোকানেই রাতে পড়ে থাকে। আর নাটকা শোয় নিশির দোকানে। নাটকার হাতে দোকানের চাবিটাও তো দিতে হবে।

কেষ্টপদর মুখে সব শুনে দুর্ভাবনাটা বেড়েই যায় নিশির। সে বলে, ‘আমার মন বড্ড কু গাইছে গ। মড়াখেগোরা কী ফেরে ফেলে দেবে, কে জানে?’

কেষ্টপদ অন্যমনস্কর মতো বলে, ‘হ্যাঁ, সে ভয়টা তো রয়েচেই। তবে কিনা ভাল জামাকাপড় আর দুশো ট্যাকা দেছে। দু’মাস খাটলেও অতগুলো ট্যাকা রোজকার করতে পারবনি।’

নিশি ঝাঁঝিয়ে ওঠে, ‘ওগুলোন ধুয়ে ধুয়ে জল খাও।’ একটু চিন্তা করে আবার বলে, ‘দু-চারদিন দেখা যাক, হরেন ঢ্যামনা আর আসে কিনা। তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করতে হবে। তবে ফের হুঁইশার করে দিচ্চি।’ বলতে বলতে আকাশের দিকে তাকিয়ে চঞ্চল হয়ে ওঠে, ‘ঢের রাত হল। এখন উঠি। আমাকে এট্টু এইগে (এগিয়ে) দে এসো।’

ধানকল করাত কলের দিকটা নির্জন হয়ে গেছে। তবে বেশ্যাপাড়া এখন জমজমাট। যত রাজ্যের খুনি, মাতাল, চোর, ছ্যাঁচড়া মিলে জায়গাটাকে একেবারে নরকের খাসমহল বানিয়ে ফেলেছে।

নিশির দুর্দান্ত সাহস, তা ছাড়া কোমরে একখানা দা না গুঁজে সে পথে বেরোয় না। তবু এটা তো ঠিক, সে একটা মেয়েমানুষ। একা একা ওই রকম জঘন্য একটা এলাকার ভেতর দিয়ে যাওয়াটা ঠিক না। কেষ্টপদ আর নাটকা তাকে বেশ্যাপাড়া পার করে নবীগঞ্জের বড় রাস্তায় একটা সাইকেল রিকশায় তুলে দিয়ে আসে।

সেই যে হরেন এসেছিল, তারপর দিনকয়েক আর তার পাত্তা নেই। কাজেই কেষ্টপদদের, বিশেষ করে নিশির দুশ্চিন্তাটা অনেক ফিকে হয়ে এসেছে। ওদের মনে হয়েছে, হঠাৎ বড়লোকের মাথায় খেয়াল চেপেছিল, তাই ডেকে নিয়ে তামাশা দেখেছিল। পরে ব্যাপারটা বেমালুম ভুলে গেছেন ভবেশ্বর চৌধুরিরা।

কিন্তু দিন সাতেক কাটতে না কাটতেই আরেকটা মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যায়। রাতে নদী পারাপার আর পারঘাটার দোকানপাট তখন বন্ধ হয়ে গেছে, খাওয়াদাওয়া চুকিয়ে বিড়ি টানছে কেষ্টপদ আর নাটকা, বিড়িটা শেষ হলেই ওরা শুয়ে পড়বে। এই সময় একটা টকটকে লাল রঙের মোটর এসে থামে ওদের সামনে। গাড়ি থেকে নামে নবীগঞ্জের চার মস্তান— ঝন্টে, লেটো, গাল-কাটা মজিদ আর পল্টা।

হরেন হল প্রাচীন কালের খুনি। আর ঝন্টেরা এখনকার সুপারস্টার। ওদের দেখে আঁতকে ওঠে কেষ্টপদ আর নাটকা। তাদের হাত থেকে বিড়ি খসে পড়ে।

ঝন্টেরা কিন্তু কোনওরকম ঝামেলা বাধায় না। ছোরাছুরি বা রিভলভারও বার করে না। উল্টে ভারি নরম গলায় বলে, এই যে মহালায়কেরা, কষ্ট করে তুমাদের একবার যেতে হচ্চে যে। তুমাদের জন্যে গাড়ি লিয়ে এইচি। উঠে পড়।’

হরেনের মতো ঝন্টেদের হুকুমও অমান্য করা অসম্ভব। তবু সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে বলে, ‘কুথায় নে যাবে?’

‘আরে বাবা, খারাপ জায়গায় লয়।’ তর্জনীতে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ঠেকিয়ে টাকা বাজাবার মুদ্রা ফুটিয়ে তোলে ঝন্টে, ‘গেলে এইটি মিলবে। লাও ভাই, জলদি কর।’

‘সারাটা দিন জব্বর খাটনি গেছে, বড্ড ঘুম পাচ্ছে। কখন ফিরতে পারব?’

‘যত জলদি গাড়িতে চড়বে, তত তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে দিয়ে যাব।’

সুতরাং দোকান লাগিয়ে ঝন্টেদের সঙ্গে লাল মোটরে উঠে বসতেই হয়।

কিছুক্ষণের ভেতরে তারা নবীগঞ্জ টাউনের মাঝখানে যে ঝকঝকে বিশাল আনকোরা চারতলা বাড়িটায় এসে পৌঁছয় সেটা কেষ্টপদ আর নাটকার অচেনা নয়। বাড়িটা ধানকল, করাত কল ইত্যাদির মালিক ব্যোমকেশ মজুমদারের। হৃৎপিণ্ডটা হঠাৎ থমকে গিয়ে প্রচণ্ড জোরে লাফাতে শুরু করে কেষ্টপদদের। ভয়ে তারা এমনই ঘেমে ওঠে যে মুহূর্তে জামা-প্যান্ট ভিজে সপসপে হয়ে যায়। কেষ্টপদর কানের কাছে মুখ এনে চাপা, ভীত গলায় নাটকা বলে, ‘আমরা ফিনিশ গুরু। ভবেশ্বরবাবুর বাড়ি যে গিয়েছিলাম, শালারা বুঝিন ট্যার পেয়ে গেচে। আমাদের জবাই করবে।’

কেষ্টপদর গলা দিয়ে আওয়াজ বেরতে চায় না। কোনওরকমে সে শুধু বলে ‘হু’।

ঝন্টেরা কিন্তু যথেষ্ট খাতির টাতির করেই বিরাট একটা ঘরে নিয়ে এল। ঘরটা হাল আমলের আসবাব, ল্যাম্প শেড, সোফা, ডিভান ইত্যাদি দিয়ে সাজানো। দেওয়ালে দেওয়ালে এয়ারকুলার লাগানো আছে।

একটা বড় সোফায় ব্যোমকেশ মজুমদার তার লম্বা এবং খাটো দুই পা ঝুলিয়ে বসে ছিলেন। তাঁকে ঘিরে নবীগঞ্জের বেশ কিছু বিশিষ্ট মানুষকে দেখা যাচ্ছে। ক’দিন আগে ভবেশ্বর চৌধুরির বাড়িতে যা দেখে এসেছিল এখানেও প্রায় একই দৃশ্য।

ঝন্টেরা পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে করিয়ে দিলে যথেষ্ট তোয়াজ করেই ব্যোমকেশ বলেন ‘তুমাদের কথা আগেই শুনেচি। নবীগঞ্জে এমন দুটি শিল্পী আচে, ভাবতেও আনন্দ হয়। তুমরা আমাদের গৌরব হে। সে যাক, একটা জরুরি কাজে তুমাদের আনাতে হল। এই রাত্তিরে কষ্ট করে যে এসেচ, এতে বড্ড খুশি হয়েচি। কী জন্যে ডাকিয়েচি, আঁচ করতে পারচ?’

‘এজ্ঞে না—’ আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে কেষ্টপদ।

‘না জানারই কথা। ব্যাপারখানা ভীষণ গোপন কিনা। তুমাদের আনিয়েচি দেশের কাজের জন্যে।’

দেখা যাচ্ছে তারা যে ভবেশ্বর চৌধুরির বাড়ি গিয়েছিল এবং তাঁকে নকল করে তামাশা দেখিয়ে এসেছে, সেটা টের পাননি ব্যোমকেশ। হৃৎপিণ্ডের লাফালাফিটা থামে ঠিকই, কিন্তু অন্যদিক থেকে বিস্ময় এবং দুর্ভাবনাটা বেড়ে যায়। ভবেশ্বর তাদের দিয়ে দেশের কাজ করাতে চায়। তাজ্জবের ব্যাপার, ব্যোমকেশের উদ্দেশ্যও অবিকল এক। হতভম্বের মতো কেষ্টপদ বলে, ‘দেশের কাজ!’

‘হ্যাঁ। তুমরা তো পারঘাটায় নবীগঞ্জের নানান জনাকে নকল করে অ্যাক্টো কর, শুনেচি।’

‘ওগুলোন আপনাদের কাচে বলার মতোন লয়।’

‘আরে বাবা, অত লজ্জাটা কীসের! যা কর, তা তো ভাল জিনিস, যাকে বলে আর্ট— শিল্প। তা হ্যাঁ, হে, ভবেশ্বর চৌধুরিকে নিশ্চয়ই তুমরা চেনো।’

ভবেশ্বর চৌধুরির কথায় স্থানীয় টান সামান্যই আছে। তার কারণ ফি মাসে অনেকগুলো দিন তিনি কলকাতায় কাটান। কিন্তু ব্যোমকেশ মজুমদার এ শহর ছেড়ে ক্বচিৎ বাইরে বেরোন, তাই কথা বলার ভঙ্গিতে আঞ্চলিক ছাপটা স্থায়ীভাবে পড়ে গেছে।

কেষ্টপদর বুকের ধড়ফড়ানি ফের বেড়ে যায়। সে ঝাপসা গলায় বলে, ‘চিনি’।

ব্যোমকেশ বলেন, ‘এই লোকটার পয়েগা হারামজাদা দুনিয়ায় খুব বেশি জন্মায়নি। তুমরা কি জানো, ভবেশ্বর মাস্তান দিয়ে জুলুম করে গরিব লোকজনকে উৎখাত করে দেয়। তাদের জমিন, বাড়িঘর দখল করে সেখানে বিরাট বিরাট ফ্ল্যাট বাড়ি তৈরি করে লাখ লাখ টাকা লুটচে? তাছাড়া স্মাগলিংটাও চালিয়ে যাচ্ছে?’

এই খবর জানত না কেষ্টপদ। সে বিভ্রান্তের মতো তাকিয়ে থাকে।

ব্যোমকেশ থামেননি, ‘তুমাদের জন্যে ড্রেস করিয়ে রেখিচি। ঝন্টের সঙ্গে গিয়ে সেগুলো পরে এসো।’

পাশের ঘর থেকে ধাক্কাপাড়ের মিহি ধুতি আর সিল্কের বেনিয়ান পরে আসে। নাটকার জন্য ব্যবস্থা হয়েছে থান কাপড়ের। সে বিধবা সেজে এসেছে।

ব্যোমকেশ এবার জানিয়ে দেন, কেষ্টপদদের কী করতে হবে। মাঝরাতে দলবল নিয়ে বন্দুক হাতে স্বয়ং ভবেশ্বর এক বিধবার বাড়ি চড়াও হবেন এবং অসহায় মহিলাটিকে বার করে দিয়ে বাড়িটার দখল নেবেন, সেটা ভেঙেচুরে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে বিরাট ফ্ল্যাটবাড়ি তৈরি করবেন। এই মূকাভিনয়ে ভবেশ্বরের চরিত্রটি করতে হবে কেষ্টপদকে, আর বিধবার ভূমিকায় থাকবে নাটকা।

কাঁদো কাঁদো বিপন্ন মুখে কেষ্টপদ বলে, ‘কিন্তন বাবুমশাই, আমরা তো ভবেশ্বর বাবুমশাইকে কারও ঘর ভাঙতে দেখি লাই। নকল করব কী করে?’

ব্যোমকেশ সস্নেহে হেসে হেসে বলেন, ‘আহা তুমরা হলে গে আর্টিস্ট মানুষ। মাথা খেটিয়ে, মনে মনে জিনিসটা ভেবে লাও, তারপর করে ফ্যালো।’

কেষ্টপদ জানে, একবার যখন টেনে এনেছে তখন আর সহজে পার পাওয়া যাবে না। নাটকার সঙ্গে পরামর্শ করে ব্যোমকেশের ফরমাশ মতো অভিনয় করে দেখায় দুজনে।

ব্যোমকেশ ঘরের অন্য সবাইকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কী, চলবে?’

সবাই একসঙ্গে বলে ওঠেন, ‘চলবে মানে! এ তো চমৎকার। এ জিনিস দু-চারবার দেখাতে পারলে আপনার জিত ঠেকায় কে?’

পকেট থেকে তিনখানা একশো টাকার নোট বার করে কেষ্টপদকে দিতে দিতে ব্যোমকেশ বলেন, ‘তুমাদের আমার খুব দরকার কেষ্টপদ। পরে আবার ঝন্টেদের পাঠাব, চলে এসো। অনেক রাত হয়েছে, এখন গিয়ে শুয়ে পড়। আর আজ এখানে যা করলে সেটা ভারি গোপন ব্যাপার, কাকপক্ষীতে য্যানো টের না পায়।’

ভবেশ্বর দিয়েছিলেন দুশো, ব্যোমকেশ দিলেন তিনশো। তাদের ঘিরে যে কড়কড়ে নোটের হরির লুট শুরু হয়েছে, তাতে কেষ্টপদরা খুব একটা খুশি না, উল্টে তাদের দুর্ভাবনা বেড়েই চলেছে। ভবেশ্বর এবং ব্যোমকেশ যে পরস্পরের ঘোর শত্রু সেটা আন্দাজ করে নিয়েছে কেষ্টপদরা। দুজনেরই অঢেল পয়সা এবং হাতে প্রচুর মস্তান। এদের মাঝখানে উলুখাগড়ার মতো প্রাণটা না চলে যায় তাদের।

পরদিন নিশিকে ব্যোমকেশের ব্যাপারটা জানাতে সে ভীষণ ঘাবড়ে যায়। বলে, ‘খুব বিপদ। এক কাজ কর বেটাছেইলে—’

কেষ্টপদ জিজ্ঞেস করে, ‘কী?’

‘সেই কলেজে পড়ায় অমলেশবাবু, বড্ড ভাল মানুষ, তেনার পরামশশো লাও। তেনি যা কইবেন সেই মতোন চল।’

সত্যিই তো, অমলেশের কথাটা আগেই মাথায় আনা উচিত ছিল। কেষ্টপদ দোকানপাট ফেলে তৎক্ষণাৎ নবীগঞ্জে অমলেশের বাড়ি চলে যায়। সেখানে যা খবর পাওয়া গেল তাতে বুকের ভেতরটা ভীষণ দমে যায়। অমলেশবাবু নবীগঞ্জে নেই, কলকাতা থেকে ফিরবেন দিন পনেরো বাদে। ততদিন হরেন আর ঝন্টেদের মিঠে কথায় ঠেকিয়ে রাখা ছাড়া উপায় নেই।

দেখতে দেখতে আরও কদিন কেটে যায়।

এর মধ্যে বেশ কয়েকবার ঝন্টেরা আর হরেন এসে কেষ্টপদদের সঙ্গে গল্পসল্প করে গেছে। একই সময়ে এসে যে হাজির হয়নি, এই যা রক্ষে। দু’পক্ষই তার আর নাটকার অভিনয়ের তারিফ করেছে। ওদের যাঁরা পোষেন সেই ভবেশ্বর আর ব্যোমকেশ যখন তাকে আর নাটকাকে এত খাতির করছেন, তখন ওরা তো করবেই।

কথায় কথায় কায়দা করে কেষ্টপদ এত খাতিরের কারণটা হরেনদের কাছে একদিন বার করে ফেলে। মাসকয়েক বাদে ভোট আসছে। ব্যোমকেশ আর ভবেশ্বর এবার নির্বাচনে টিকিট পেয়েছেন। দুজনেই চান জিতে বিধানসভায় যাবেন। বিরুদ্ধ পক্ষকে খতম করার জন্য তাঁরা যে রণকৌশল ঠিক করেছেন তা এইরকম। নির্বাচনী মিটিংয়ে বক্তৃতা-বক্তৃতার আগে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হবে। সেই ফাংশানে নাটকা আর কেষ্টপদকে দিয়ে মূকাভিনয় করিয়ে ভবেশ্বর ভোটারদের বুঝিয়ে দেবেন ব্যোমকেশ কী জঘন্য চরিত্রের মানুষ, ব্যোমকেশের উদ্দেশ্যও হুবহু এক। অর্থাৎ কিনা প্রতিপক্ষের চরিত্রহননের জন্য কেষ্টপদদের দিয়ে কাদা ছেটানো।

দিন পনেরো আকণ্ঠ উদ্বেগে কাটানোর পর অমলেশের সঙ্গে দেখা হয় কেষ্টপদর। সমস্ত শোনার পর মুখ শক্ত হয়ে ওঠে তাঁর; বলেন, ‘ওই দুটো বদমাশ। ওদের মতো অসৎ লোক নির্বাচনে জিতলে দেশের ক্ষতি। তুমি আপাতত ওদের এড়িয়ে চল। আমি তোমাকে অন্যভাবে কাজে লাগাব।’

ভীরু গলায় কেষ্টপদ জানতে চায়, ‘কীভাবে?’

‘এবার এখান থেকে নারায়ণ সেন ভোটে দাঁড়াচ্ছে। খুব পরোপকারী সৎ মানুষ।’

‘জানি। মানুষের তরে খুব করেন।’

‘ওকে জেতাতে হবে। ওর হয়ে কাজ করার জন্যে মাস দুয়েকের ছুটি নিয়ে এসেছি। আসচে সপ্তাহে নারায়ণের প্রথম নির্বাচনী মিটিং হবে। আমার কাছে খবর আছে ভবেশ্বর কি ব্যোমকেশ এখনও মিটিং টিটিংয়ের কথা ভাবেনি। ওরা শুরু করার আগে আমরা আরম্ভ করে দেব। সেখানে তোমাকে দিয়ে মূকাভিনয় করাব। দুজনের স্বরূপ নবীগঞ্জের লোককে তুমি দেখিয়ে দেবে।’

কেষ্টপদ চমকে ওঠে, ‘কিন্তু ওদের হাতে ঢের মস্তান আচে।’

অমলেশ বলেন, ‘কোনও ভয় নেই। দেশটা এখনও মগের মুলুক হয়ে যায়নি।’

‘ওরা যে ট্যাকা দিয়েছে—’

‘তুমি তো আর ভিক্ষে চাইতে যাওনি। যদি ফেরত চায় দিয়ে দেবে। নারায়ণের মতো মানুষের পাশে আমাদের সবার থাকা উচিত।’

নারায়ণ সেনের নির্বাচনী জনসভায় কেষ্টপদ আর নাটকা নিঃশব্দ অভিনয়ে বুঝিয়ে দেয় ভবেশ্বর আর ব্যোমকেশ কী সাংঘাতিক চরিত্রের মানুষ।

দেখতে দেখতে জনতা একেবারে চমৎকৃত। তাদের হাততালি আর থামতে চায় না।

এরপর তিনটে দিনও কাটে না। হঠাৎ মাঝরাতে আগুন লেগে পারঘাটের দুটো দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ও দুটোর ভেতর ঘুমিয়ে ছিল কেষ্টপদ আর নাটকা।

দুই মূকাভিনেতাকে যখন ছাইয়ের স্তূপ থেকে বার করা হল তখন আর চেনা যাচ্ছিল না।

খবর পেয়ে ছুটে এসেছিলেন অমলেশ। তাঁকে উদভ্রান্তের মতো দেখাচ্ছিল। একধারে দাঁড়িয়ে বিড় বিড় করে বলছিলেন, ‘এ আমি ভাবতে পারিনি। আমারই জন্যে—’

চারদিকে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অগুনতি মানুষ। তার ভেতর নিশি একটানা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে, ‘এ কী হল গ… এ কী হল?’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *