• Skip to main content
  • Skip to header right navigation
  • Skip to site footer

Bangla Library

Read Bengali Books Online (বাংলা বই পড়ুন)

  • Login/Register
  • Account

অশ্বত্থামা হত – ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়

লাইব্রেরি » পার্থ চট্টোপাধ্যায় » অশ্বত্থামা হত – ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়
অশ্বত্থামা হত - ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়
লেখক: পার্থ চট্টোপাধ্যায়বইয়ের ধরন: উপন্যাস

সূচিপত্র

  1. অশ্বত্থামা হত – ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়
  2. কথারম্ভ

অশ্বত্থামা হত – ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়

মহাভারতের পটভূমিকায় এক অভিশপ্ত চরিত্রকে নিয়ে জীবন উপন্যাস
প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ২০২৪, মাঘ ১৪৩০
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ : রঞ্জন দত্ত

.

তথাগত, গার্গী, শ্রমণ বৈশালী, আশুতোষ, ও ভিভান-কে

‘তুম যব জগমে আয়ে জগ হসে তুম রোয়ে।
এয়সী করনিকর চলো কি তুম হসে জগ রোয়ে।‘

তুমি যখন জন্মেছিলে তখন সবাই হেসেছিল, তুমি কেঁদেছিলে। তুমি এমন কাজ করে যাও যাতে তুমি যখন চলে যাবে তখন তুমি হাসবে সবাই কাঁদবে।

-তুলসী দাস

ফ্ল্যাপের লেখা –

ড. চট্টোপাধ্যায় গল্প-উপন্যাস দিয়ে সাহিত্যজীবন শুরু করেছিলেন। ২০০২ থেকে তিনি সাহিত্যে একটি নতুন ধারার প্রবর্তন করেন জীবনবাদী সাহিত্য। যা জীবনের বিভিন্ন পর্যায়গুলিকে নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক পর্যালোচনা ও মোটিভেশন। দীর্ঘকাল পরে ২০২১ সালে তিনি অষ্টাদশ শতাব্দীর কলকাতার পটভূমিতে ভারতের প্রথম সাংবাদিক জেমস অগস্টাস হিকিকে নিয়ে উপন্যাস লেখেন ‘হিকি সাহেবের গেজেট’। এই উপন্যাসটি উচ্চ প্রশংসিত হয়। ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয় রামায়ণের প্রান্তিক চরিত্র শম্বুক-কে নিয়ে একটি বহু প্রশংসিত উপন্যাস ‘শম্বুক’। ২০২৪ সালে প্রকাশিত হল মহাভারতের উপেক্ষিত চরিত্র নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘অশ্বত্থামা হত’। অশ্বত্থামার জীবনের ট্র্যাজেডির সঙ্গে লেখক তুলে ধরেছেন যুদ্ধের বীভৎসতা, সন্ত্রাসবাদের উৎস আর অভিশপ্ত শ্রীকৃষ্ণ জীবনের ট্র্যাজেডি। এই উপন্যাসে তুলে ধরেছেন কিছু সত্য যা আজও প্রাসঙ্গিক।

.

অশ্বথামা হত একটি প্রবল জিজ্ঞাসার মুখে আমাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছে সেটি হল দীর্ঘ জীবন অথবা অমরত্ব অভিশাপ না আশীর্বাদ? অশ্বত্থামা কৃষ্ণের কাছে মৃত্যুবর চেয়েছিলেন। মৃত্যুশয্যায় শায়িত কৃষ্ণ চেয়েছিলেন আরও কিছুদিন বাঁচতে। দ্বারকায় তিনি ধর্ম ও ন্যায়ের রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। পারেননি। আপন হাতে আপনার সৃষ্টিকে ধ্বংস করে তিনি নতুন প্রজন্ম বিনির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। সফল হননি। অশ্বথামা ও শ্রীকৃষ্ণ এই দুই পুরুষের স্বপ্ন অভিশাপের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। প্রতিশোধ, সন্ত্রাস, যুদ্ধ ও গৃহযুদ্ধের ধ্বংস স্তূপের ওপর মূল্যবোধের ভিতের ওপর নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্ন সফল হবে কি?

.

লেখকের কথা

মহাভারতের বিভিন্ন চরিত্র নিয়ে নানা যশস্বী লেখক বহু লেখা লিখেছেন। ‘অশ্বত্থামা হত?’ সে অর্থে নতুন উদ্যোগ নয়। কিন্তু মহাভারত কেন্দ্রবিন্দু হলেও যে দর্শন এই উপন্যাসে ফুটে উঠেছে তা সম্পূর্ণ নতুন এবং সমসাময়িক বিশ্বে খুবই প্রাসঙ্গিক।

এই উপন্যাসের মূল অভিমুখ—যুদ্ধ, হিংসা, ধর্ম, রাষ্ট্রগঠনে ব্যর্থতা। কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধেও দেখা গিয়েছে রণকৌশলের নামে সেখানে অপকৌশলকে অবলম্বন করেছে দু’পক্ষই। প্রমাণ হয়েছে যুদ্ধ জয় দিতে পারে কিন্তু বিজয়ী ও বিজেতা কাউকে শান্তি দিতে পারে না। এই উপন্যাস যুদ্ধবিরোধী। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সেনার মধ্যে মাত্র দশজন ছাড়া সবাই মৃত। অকুতোভয় বীর সৈনিকদের মৃতদেহ শিয়াল, কুকুর, শকুনেরা খাচ্ছে। এই মর্মান্তিক দৃশ্য যুদ্ধের ভয়াবহতা প্রমাণ করে। মহাভারতের কোনো চরিত্রই সুখী হতে পারেনি। না শতপুত্রের জননী গান্ধারী, না বিজয়ী ভারতবিজেতা ধর্মপুত্র শাস্ত্রজ্ঞ সূতচরিত্র যুধিষ্ঠির, না কৌরবপুরুষ ধৃতরাষ্ট্রতনয় দুর্যোধন এবং না স্বয়ং ভগবান কৃষ্ণ। মহাভারতের চরিত্রগুলির অন্তরালে যে অভিশাপ ও দুঃখ লুকিয়ে ছিল তা থেকে কেউই মুক্তি পাননি। মহাভারতেও রামায়ণের মতো ট্র্যাজেডিই মুখ্য অথবা অন্তর্নিহিত। এই মহাকাব্যের সবচেয়ে আকর্ষক দুটি ট্র্যাজিক চরিত্রকে নিয়ে আমার উপন্যাস। এ দুটি চরিত্র অশ্বত্থামা ও কৃষ্ণ। দুর্বার নিয়তি ও কর্মফলের চক্রে স্বয়ং সর্বশক্তিমান কৃষ্ণও বন্দি।

আমি এই উপন্যাসের মধ্যে দেখাতে চেয়েছি যুদ্ধের বীভৎসতা। যুদ্ধ একটি সমস্যার সমাধান করলেও একটা প্রজন্মকে নিঃশেষ করে দেয়। প্রতিশোধ বা দ্রুত বদলার রাজনীতি সন্ত্রাসবাদের জন্ম দেয় এবং সন্ত্রাসের যতই জয়গান গাওয়া হোক তা কোনোদিন মানুষের মান্যতা পায় না। একটি আদর্শ রাষ্ট্র একজন শ্রেষ্ঠ রাজনীতিকও গড়ে তুলতে পারে না যদি না দেশের মানুষ সৎ এবং মূল্যবোধে উদ্দীপ্ত হয়। কৃষ্ণের দ্বারকার মতো আধুনিক অনেক রাষ্ট্রই দুর্নীতি ও ভ্রষ্টাচারে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, কোথাও ভ্রষ্টচরিত্র নেতা জাতির ধ্বংসের কারণ, কোথাও ভ্রষ্ট জনগণ। কৃষ্ণের মতো মহান ব্যক্তিত্ব স্বপ্নের দ্বারকাকে গড়ে তুলতে পারেননি। শুধু উন্নয়ন করে, জনমোহিনী নীতি অবলম্বন করলেই ধর্মরাষ্ট্র গঠন করা যায় না। তার জন্য দেশের সমস্ত মানুষের সমবেত প্রচেষ্টার দরকার হয়। আন্তরিক ঐক্য ও সংহতির প্রয়োজন হয়। মুষল পর্বের এই অতি প্রাসঙ্গিক বিষয়টি এই উপন্যাসের বিষয় হওয়াতে শেষ দৃশ্যে কৃষ্ণের মৃত্যুশয্যায় অশ্বত্থামা ও কৃষ্ণের সংলাপের মধ্য দিয়ে একটা জিনিস স্পষ্ট যে রাষ্ট্রসাধনা যুদ্ধ ও প্রসাধনী উন্নয়নের চেয়ে আরও বড় ‘সত্যের ঐকান্তিক সাধনা।’ এটাই সফল রাষ্ট্রের সাধনা। প্রকৃত ধর্মরাষ্ট্র শুধু রাষ্ট্রের প্রয়াসে হয় না, চরিত্রবান নাগরিকদের যৌথ প্রচেষ্টারও প্রয়োজন।

উপন্যাসটি মহাভারতের বিনির্মাণ হলেও মহাভারতের অবয়ব এমনকী, তার ভাবা থেকেও আমি দূরে সরে যাইনি। কোথাও তার সুর বিকৃত করিনি, শুধু রাগ-রাগিণীর পরিবর্তন ঘটিয়েছি মাত্র।

সবশেষে বলি, এই উপন্যাসটি লিখে আমি খুবই আনন্দ পেয়েছি। কারণ দু’হাজার বছর আগের ঘটনাকে আমি বর্তমান যুগে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে পেরেছি। এখন পাঠকেরা যদি এর মর্মবাণী উপলব্ধি করতে পারেন তাহলে আমি বুঝব আমি ঠিক পথে চলেছি। আমার ‘শম্বুক’ পড়ে বহু পাঠক-পাঠিকা আমায় অভিনন্দন জানিয়েছেন। তাঁদের উৎসাহেই অশ্বত্থামা হত’ লেখার প্রেরণা।

এই উপন্যাসের মূল চরিত্র অশ্বথামা আজও জীবিত বলে অনেকের বিশ্বাস। অশ্বত্থামা জীবিত থাকুন কারণ কৃষ্ণের অভিশাপ তাঁর জীবনে শেষ পর্যন্ত আশীর্বাদে পরিণত হয়েছে। তিনি এখন ভারতাত্মার বাণী অহিংসাকে গ্রহণ করেছেন। প্রতিশোধ আর সন্ত্রাস আজ তাঁর উপাস্য নয়।

ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়
কলকাতা পুস্তকমেলা
২০২৪

কথারম্ভ

অবশেষে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ হল।

মহাশ্মশান ভূমি কুরুক্ষেত্রে এসে পৌঁছলেন ধৃতরাষ্ট্র আর গান্ধারী। কৃষ্ণ তাঁদের নিয়ে এসেছেন পথপ্রদর্শক হয়ে। এই মৃত্যু উপত্যকা কৃষ্ণের চেনা। আঠারো দিন ধরে তিনি অর্জুনের সারথি হয়ে গোটা কুরুক্ষেত্র দাপিয়ে বেড়িয়েছেন।

এখন এই কুরুক্ষেত্রের মহাশ্মশানে ইতস্তত পড়ে আছে আঠারো অক্ষৌহিণী বীরের মৃতদেহ। শুধুমাত্র পঞ্চপাণ্ডব, সাত্যকি, কৃষ্ণ আর কৌরবপক্ষের অশ্বত্থামা কৃপ আর কৃতবর্মা ছাড়া আর সবাই এখন মৃতদেহ। কিন্তু সেই মৃতদেহও অক্ষত নেই। গত কয়েকদিন ধরে গোমায়ু (শৃগাল) বক, বায়স (কাক) ভূত পিশাচ ও রাক্ষসরা* পরমানন্দে সেই সব দেহ ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়েছে। সেই অর্ধভুক্ত শবদেহের দুর্গন্ধে বাতাস কলুষিত, মানুষের চাপ চাপ রক্তে মাটি কর্দমাক্ত। সারা কুরুক্ষেত্র জুড়ে ছড়িয়ে আছে ভগ্ন রথের ধ্বজা, চক্র, নিশান, কাঠ, অসংখ্য অস্ত্র পড়ে আছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। হাজার হাজার অজ্ঞাতবীরের মৃতদেহের মধ্যে পড়ে রয়েছেন দ্রোণ, দ্রুপদ, অভিমন্যু, কর্ণ ও শল্য প্রমুখ সেনাপতির মৃতদেহ। কে তাঁদের সৎকার করবে? মাংসাশী প্রাণীরাই তাদের গতি। ছড়িয়ে রয়েছে কবচ, দিক, মণি, অঙ্গদ, কেয়ূর মালা, শক্তি, সুতীক্ষ্ণ খড়্গা, শর ও শরাসন। গান্ধারীর পিছনে পিছনে এসেছেন সহস্র সহস্র নিহত বীরের বিধবা পত্নীরা। তাঁরা উন্মাদের মতো তাঁদের পতিদের মৃতদেহ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। হিংস্র গৃধিনি ও শৃগালদের সরিয়ে দিয়ে, তাঁরা তাঁদের স্বামী-পুত্রদের খুঁজে বার করার চেষ্টা করছেন। কেউ হয়তো মুণ্ডহীন দেহ পেয়েছেন। অসংখ্য কাটামুণ্ডর মাঝখান থেকে তাঁর প্রিয়জনের মুণ্ড খুঁজে নিয়ে মুণ্ডহীন দেহর সঙ্গে জোড়া লাগিয়ে দেখছেন এই মুণ্ডটি প্রকৃতই এই দেহের কি না। আর সারা কুরুক্ষেত্র জুড়ে শুধু ক্রন্দনরোল, দূর থেকে সমুদ্র গর্জনের মতো মনে হচ্ছে।

[* মহাভারতে নরখাদক ভূত পিশাচ ও রাক্ষসদের অনেক উল্লেখ আছে।]

গান্ধারী শেষে দুর্যোধনের মৃতদেহের কাছে গিয়ে পৌঁছলেন। গান্ধারী বিলাপ করতে করতে বললেন, যে দুর্যোধন ক্ষত্রিয়দের অগ্রগণ্য ছিল আজ সে ধূলিশয্যায় শুয়ে। আগে যাকে রমণীগণ চতুর্দিক বেষ্টন করে থাকত, এখন শিয়ালরা তাকে ঘিরে রয়েছে। আমার আর জীবনে প্রয়োজন কী? শুধু তাঁর পুত্রদের জন্য নয়, গান্ধারী অভিমন্যু, কর্ণ ও দ্রোণের জন্যও বিলাপ করলেন।

গান্ধারীর সমস্ত রোয এসে পড়ল কৃষ্ণের ওপর। তিনি বললেন, যখন কৌরব ও পাণ্ডবগণ পরস্পরের রোষানলে দগ্ধ হচ্ছিল তখন তুমি কী কারণে তাদের ক্রোধানল নির্বাপিত করোনি? তুমি ইচ্ছা করেই কৌরবদের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করেছ। আমি তোমাকে অভিশাপ দিচ্ছি তুমি যেমন কৌরব-পাণ্ডবদের জ্ঞাতি বিনাশ উপেক্ষা করেছ তা নিবারণের চেষ্টা করোনি, তেমনি তোমার জ্ঞাতিরাও তোমার হাতে বিনষ্ট হবে। তুমি জ্ঞাতি ও পুত্রহীন হয়ে, বন্ধু-বান্ধবহীন অবস্থায় কুৎসিতভাবে নিহত হবে।

কৃষ্ণ হেসে বললেন, দেবী, আমি ছাড়া যদুবংশীয়দের বিনাশ করতে কেউ পারবে না। আমি যে যদুবংশ ধ্বংস করব, তা বহুদিন আগে থেকে ঠিক করে রেখেছি। যাদবরা মানুষ বা দেব-দানবদের বধ্য নয়। সুতরাং তারা গৃহযুদ্ধে পরস্পরের দ্বারা নিহত হবে। এটাই তাদের বিধিলিপি।

গান্ধারী কৃষ্ণকে এই অভিশাপ দিয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। কৃষ্ণ তাঁকে বললেন, দেবী, আপনি উঠুন। শোক করা আর আপনার সাজে না। আপনার অপরাধে অসংখ্য বীর নিহত হয়েছেন। আপনার পুত্র দুর্যোধন অতি দুরাত্মা, পরশ্রীকাতর, নিষ্ঠুর ও গুরুজনের অবাধ্য ছিল। সে তার কৃতকর্মের ফল পেয়েছে।

.

গান্ধারী ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে মোট নিহতের যে হিসাব যুধিষ্ঠির ধৃতরাষ্ট্রকে দিয়েছিলেন তাতে জানা যায় এই যুদ্ধে একশো ছেষট্টি কোটি কুড়ি হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

ধৃতরাষ্ট্রের ইচ্ছায় এই সমস্ত মৃতদেহকে তখন দাহ করার উদ্যোগ নেওয়া হল। অর্ধভুক্ত, ছিন্নভিন্ন সৈন্য ও সেনাপতিদের মৃতদেহ সংগ্রহ করে শাস্ত্রীয় মতে তাদের দাহ করার ব্যবস্থা হল।

কুরুক্ষেত্রের প্রান্তর জুড়ে জ্বলে উঠল হাজার হাজার চিতা। কর্ণের মৃতদেহ যখন পুড়ছে তখন কুত্তী পাণ্ডবদের কাছে এই সর্বপ্রথম তার জীবনের একান্ত গোপন কথা জানিয়ে দিলেন, ‘পুত্রগণ, যে মহাবীর কর্ণ অর্জুনের হাতে নিহত হয়েছে, যাকে তোমরা সুতপুত্র বলে জানতে, সে তোমাদের জ্যেষ্ঠভ্রাতা। তার পারলৌকিক কাজ তোমরা সম্পন্ন করো।’ সেই মুহূর্তে বজ্রপাত হলেও পাণ্ডবেরা এত চমকিত হতেন না।

.

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ চলেছিল মাত্র আঠারো দিন। সাত অক্ষৌহিণী পাণ্ডব সৈন্য ধ্বংস হবার আগে একাদশ অক্ষৌহিণী কৌরব সৈন্যকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। নিহত হয়েছিলেন কৌরবপক্ষের একে একে ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, ধৃতরাষ্ট্রের ৯৯টি পুত্র। শেষ কৌরব বেঁচে রয়েছেন শুধু। দুর্যোধন। দ্রোণ ও কর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রেই মারা যান। কিন্তু শরশয্যায় শায়িত ভীষ্মের মৃত্যু হয় ৫৮ দিন পরে। কুরুক্ষেত্রের এক প্রান্তে খোলা আকাশের নীচে শরশয্যায় শায়িত হয়ে তিনি মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করেছেন। অপেক্ষা করেছেন মাঘ মাসে সূর্যের উত্তরারণের জন্য। সেই মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হলে তাঁর দেহ থেকে শত শত তীর অপনীত হয়ে গেল। প্রাণ ব্রহ্মরন্ধ্র ভেদ করে উল্কার মতো আকাশে উঠে গেল।

আমাদের এ কাহিনির নায়ক দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা। দীর্ঘদেহী, মহাভুজ, বয়সে প্রৌঢ়। শ্মশ্রুতে পাক ধরেছে। কিন্তু তিনি দিব্যকান্তি। তিনি ব্রাহ্মণপুত্র হয়েও পিতার মতো ক্ষাত্রধর্ম বেছে নিয়েছিলেন। পিতার মতোই একদিকে তিনি যেমন বেদজ্ঞ, অন্যদিকে শস্ত্রজ্ঞ।

পিতার সঙ্গেই তিনি কৌরবদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। কারণ কৌরবরা সবাই তাঁর বাল্যবন্ধু। দুর্যোধন তাঁর প্রিয়বন্ধু। তিনি আবাল্য রাজ অন্নে প্রতিপালিত। তাই শৈশব থেকে কৌরবদের প্রতি তাঁর যেন একটি দায়বদ্ধতা জন্মে গিয়েছে। তাছাড়া তিনিও কর্ণ এবং দুর্যোধনের মতো অর্জুনকে ঈর্ষা করেন। তিনি নিজেও মনে করেন দুর্যোধনের চেয়ে তিনি কোনো অংশে কম শৌর্যবান নন, অথচ সবাই অর্জুনের প্রশংসা করে। তাঁর অন্তরে অর্জুনের প্রতি একটি প্রবল বিদ্বেষ ধিকিধিকি জ্বলে।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সপ্তম দিনে পিতা দ্রোণ যখন অন্যায়ভাবে নিহত হলেন তখন অশ্বত্থামা প্রবল আক্রোশে পাণ্ডবদের ছিন্নভিন্ন করে দিতে চেয়েছিলেন। দিচ্ছিলেনও। তিনি বিধ্বংসী নারায়ণাস্ত্র প্রয়োগ করে পাণ্ডব সৈন্যদের বিপর্যস্ত করেছিলেন। দলে দলে পাণ্ডব সৈন্য নিহত হচ্ছিল। অর্জুন এভাবে দ্রোণ হত্যা সমর্থন করেননি। তিনি উদাসীন হয়ে ছিলেন। যুধিষ্ঠির নিজে মিথ্যা কথা বলে দ্রোণ হত্যার কারণ হওয়ায় তিনি নিজেও অনুতপ্ত। তিনি এতটা বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন যে সৈন্যদের ডেকে বলছেন, ‘হে সৈন্যগণ, তোমরা আর যুদ্ধ কোরো না। যুদ্ধের আর প্রয়োজন নেই। আমি ভ্রাতাদের সঙ্গে অগ্নিতে প্রবেশ করব। আমি আমাদের মঙ্গলকারী আচার্যকে যুদ্ধে নিধন করেছি। আমাদের আর যুদ্ধের প্রয়োজন নেই।’ কিন্তু তারপরেও আরও ১১ দিন যুদ্ধ চলেছে। নিহত হয়েছেন পরবর্তী সেনাপতি অপরাজেয় কর্ণও। কর্ণ নিহত হবার পর দুর্যোধন অশ্বত্থামাকে সেনাপতি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অশ্বত্থামা সবিনয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনিই দুর্যোধনকে বলেছিলেন, শল্যই হলেন সেনাপতি হবার উপযুক্ত ব্যক্তি। অশ্বত্থামা কৌরব সেনাপতি হয়েছিলেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পরে।

দ্বৈপায়ন হ্রদের তীরে মৃত্যুশয্যায় তাঁকে সেনাপতি পদে অভিষিক্ত করেছিলেন দুর্যোধন। শেষ কৌরব অধিপতি দুর্যোধন। অশ্বত্থামা তাঁর শেষ সেনাপতি। তখন তাঁর অধীনে সৈন্য সংখ্যা মাত্র দুজন। কৃপাচার্য আর কৃতবর্মা।

এই তিনজন মিলে কুরুক্ষেত্রের শেষ যুদ্ধটা লড়েছিলেন। সেটি অন্য যুদ্ধ। সন্ত্রাস যুদ্ধ। রাতের অন্ধকারে শিবিরে ঢুকে নিদ্রিত নিরীহ মানুষদের হত্যা, যাকে একটি দর্শনে পরিণত করেছিলেন অশ্বত্থামা। তাঁর সেই ঘৃণার দর্শন, ছলে বলে প্রতিশোধের দর্শন, রাষ্ট্রক্ষমতা লাভের দর্শন আজও বিশ্বে ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে মান্যতা পেয়ে থাকে। অশ্বত্থামাই সর্বপ্রথম একথা শুনিয়েছিলেন, উদ্যত খাই ক্ষমতার উৎস।’ মাতুল কৃপাচার্য ও যাদব সেনাপতি কৃতবর্মাকে নিয়ে তিনি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তিনজনের এক সৈন্যবাহিনী। স্বপ্ন দেখেছিলেন পাণ্ডবরা যেমন ভারতকে কৌরবশূন্য করেছে, তিনিও একে পাণ্ডবশূন্য করবেন। নতুন করে জোট বাঁধবেন। করতে পেরেছিলেন কী? এক বিপথচালিত প্রতিভাশালী মহাবীর সন্ত্রাসপন্থীর জীবনের চরম পরিণতি নিয়েই এই কাহিনি।

এই কাহিনির শুরু কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শেষ দিনটি থেকে। মহাভারতের কথন অনুসারেই আমি তা বর্ণনা করেছি।

Book Content

প্রথম পর্ব
শেষ কৌরব
অশ্বত্থামার সেনাপতি পদ প্রত্যাখ্যান
অশ্বত্থামার গল্প শুরু
দ্বৈপায়নে দুর্যোধন
দ্বৈপায়ন তীরে অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য ও কৃতবর্মা
দুর্যোধন ধৃত
দুর্যোধন-ভীম যুদ্ধ
নিষাদ পল্লিতে একদিন
সেনাপতি অশ্বত্থামা
কৃষ্ণের ধৃতরাষ্ট্র সাক্ষাৎকার
শেষ রাত্রির সন্ত্রাস
মণিহারা অশ্বত্থামা
কুরুক্ষেত্রে ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারী
দ্বিতীয় পর্ব : সত্যমেব জয়তে
অতঃপর অশ্বত্থামা
ব্যাসের আশ্রমে
প্রার্থনা সভায় অশ্বত্থামা
অশ্বত্থামার আশ্রমিক জীবন
কচীকের মৃত্যু
দম্যক আশ্রমে ব্যাসদেব
৩৬ বর্ষ পরে
দ্বারকার পথে
দুঃসময়ে দ্বারাবতী
অসুখী কৃষ্ণ
প্রভাসে দৈববশে
শেষ দৃশ্যে : শ্রীকৃষ্ণ

Reader Interactions

Comments

  1. Megh

    August 26, 2026 at 12:08 am

    Please upload ভূতচতুর্দশীর পর written by কৃশানু কুন্ডু

    Reply
  2. Megh

    August 26, 2026 at 12:16 am

    Please upload সেই মেয়েটা written by Anirban Mukherjee

    Reply
  3. Tamanna Tabassum

    August 26, 2026 at 3:35 am

    দুঃস্বপ্নের দ্বিতীয় প্রহর, মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, বইটা আপলোড করেন,প্লিজ।

    Reply
  4. Aurora

    August 26, 2026 at 3:36 am

    দুঃস্বপ্নের দ্বিতীয় প্রহর, মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, বইটা আপলোড করেন,প্লিজ।

    Reply

Leave a Reply Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লেখক

সিরিজ

বইয়ের ধরণ

বাংলা ডিকশনারি

বাংলা জোক্স

বাংলা লিরিক্স

বাংলা রেসিপি

বিবিধ রচনা

বাংলা হেলথ টিপস

Download PDF


My Account

Facebook

top↑

Login
Accessing this book requires a login. Please enter your credentials below!

Continue with Google
Lost Your Password?
এভারগ্রিন বাংলা লোগো
Register
Don't have an account? Register one!
Register an Account

Continue with Google

Registration confirmation will be emailed to you.