প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পর্ব : সত্যমেব জয়তে

কচীকের মৃত্যু

কচীকের মৃত্যু

কচীক প্রায় ছ’মাস পরে আজ আশ্রমের বাইরে বেরলো। প্রতি বছর শীতকালে আশ্রমিক এবং আচার্যরা তপোবনের আশেপাশের গ্রামে বা অতি মনোরম স্থানে বেড়াতে যায়। ঝরনার ধারে, অথবা বেত্রবতী নদীতীরে অথবা তপোবনের থেকে কয়েক যোজন হাঁটা পথে একটি ছোট্ট রুক্ষ পাহাড় আছে, যা অরণ্যবেষ্টিত নয়। খাড়া শিলাস্তূপ ত্রিভুজের মতো ওপরে উঠে গেছে। সেখানেও একটি ঝরনা আছে। সারাদিন ধরে বালকদের পর্বতারোহণ চলে। শিলাখণ্ডগুলি এমনভাবে পরস্পর সম্পৃত্ত যে তা বেয়ে বেয়ে একদম চূড়ায় আরোহণ করা যায়। এখানে উঠলে মনে হয় নীল আকাশের তলায় কে এক বিরাট বিস্তৃত সবুজের গালিচা পেতে রেখেছে।

কচীকও পাহাড়ের দেশের ছেলে। তাদের গ্রামেও পাহাড় আছে, কিন্তু এখানকার মতো এত সবুজ নয়। তবে তাদের গ্রাম এত অরণ্য ঢাকা নয়, রুক্ষ প্রান্তরের মধ্যে জনপদ। তারপর আবার রুক্ষ প্রান্তর। তার আজ এই পাহাড়ি রাস্তা ভালোই লাগছে। এখানকার বাতাস আরও স্নিগ্ধ। রৌদ্র আরও মৃদু। ওরা বলছে আর একটু এগোলেই সেই ঝরনাধারা।

কচীক সবার আগে আগে এগিয়ে যাচ্ছিল পাহাড়ের চড়াই উতরাই পথ ধরে। সে যে ক্লান্ত নয়, উদ্দীপনায় ভরপুর সেটি বন্ধুদের কাছে প্রমাণ করার জন্য। তার সহপাঠীরা তাকে এতদিন দুর্বল ও সপ্রতিভ নয় বলে ভেবে এসেছে। তার মায়ের জন্য বড় মন কেমন করে। তার বাড়ি সর্বদা একগাদা সমবয়সি ছেলে-মেয়েদের কলরবে মুখরিত। কোথা থেকে সকাল থেকে রাত্রি কেটে যায়। সেই গৃহসুখ ছেড়ে দু’ বৎসর সে বহুদূর নির্বাসিত হয়ে আশ্রমে যেন বন্দিজীবন যাপন করছে। তার কথা বলার মতো, কথা শোনার মতো কোনো কেউ নেই, তার কোনো বন্ধু নেই। সে নিঃসঙ্গ। কিন্তু গতকাল অশ্বত্থামার সঙ্গে কথা বলে তার বড় ভালো লেগেছে। আচার্যের নাম সে মহর্ষির আশ্রমে থাকার সময়ই শুনেছে। শুনেছে আচার্য দ্রোণের কথা। পঞ্চপাণ্ডবদের বনবাসের কথা সে মগধে থাকতেই শুনেছে। তারপর তো তার দম্যক আশ্রমে বাসের সময়ই কুরুক্ষেত্রেই যুদ্ধ ঘটে গেল। সেই যুদ্ধের এক সেনাপতি অশ্বত্থামার সঙ্গে এভাবে দেখা হবে এবং তিনি তার সঙ্গে এত অন্তরঙ্গভাবে কথা বলবেন, সে কখনও ভাবেনি। অশ্বত্থামার সান্নিধ্য তার জীবনে পরিবর্তন এনেছে। সে চেষ্টা করবে তাঁর যোগ্য শিষ্য হয়ে উঠতে।

কচীক সবার আগে আগে এগিয়ে চলেছে। পিছনে তিনজন সহপাঠী। তারা নিজেদের মধ্যে উত্তেজিত হয়ে কী বলাবলি করছে। এমন সময় পাহাড়ের জঙ্গলের ভেতর থেকে বিরাট শব্দ হতে লাগল। হুড়মুড় করে কারা যেন এগিয়ে আসছে। চলমান শিলাখণ্ড যেন পাহাড় থেকে নিচে নামছে। তাদের পদাঘাতে কিছু গাছ, মাটি, শিলা খসে পড়ছে। হঠাৎ পিছনের বন্ধুরা চিৎকার করে উঠল, ‘হাতির পাল নামছে। কচীক, পালা পালা।’ এই বলে তারা মুহূর্তের মধ্যে উলটো দিকের পথ ধরে পালিয়ে গেল। কচীক কী করবে বুঝতে পারার আগেই দেখল পাহাড় থেকে হাতির পাল নামছে, যাদের সে এতক্ষণ শিলাখণ্ড মনে করেছিল। সামনে এক হস্তীযূথ। সংখ্যায় জনা দশেক তো হবেই। তারা বৃংহণ ধ্বনি করছে। সেই সমবেত ধ্বনি রণহুঙ্কারের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।

কচীক কী করবে ভাবার আগেই একটি অতিকায় হস্তী তার শুঁড় দিয়ে জড়িয়ে ধরল কচীককে। তারপর তার দেহটিকে সজোরে ছুড়ে ফেলে দিল খাদের দিকে। একটি লাটুর মতো ঘুরপাক খেতে খেতে কচীকের দেহটি রাস্তার নীচে খাদে পড়ে একটি গাছের নীচে আটকে গেল।

.

তিনটি ছেলে ভরদ্বাজ, হিরণ্যবাহু আর ভূতপতি শূন্য কলস নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে আশ্রমে ফিরে এলো প্রায় অর্ধমৃত হয়ে।

সব ছাত্র বেরিয়ে এল। বেরিয়ে এলেন আচার্যরা। অশ্বত্থামা এতক্ষণ শুয়েছিলেন। তাঁর কপালে ভিজে ন্যাকড়ার প্রলেপ দেওয়া জ্বর নিরসনের জন্য। তাঁর মাথা যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে। যুদ্ধে ক্ষত দেহ তখনও পুরোপুরি সারেনি। সারা পিঠ জুড়ে ক্ষত। সেগুলি ধীরে ধীরে শুকিয়ে আসছিল কিন্তু এখন আবার তা থেকে বিন্দু বিন্দু রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আর প্রবল যন্ত্রণা। তবু ছাত্রদের আর্তনাদ শুনে তিনি বেরিয়ে এলেন।

চারটি ছেলে যারা জল আনতে গিয়েছিল, তাদের তিনজন ফিরেছে। তারা বলছে তারা আজ পথে বন্য হস্তীর সামনে পড়েছিল। কোনোক্রমে প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছে। শুধু একজন ফেরেনি। তারা তাকে সতর্ক করে একসঙ্গে চলতে বলেছিল। কিন্তু সে আগে আগে চলছিল। হাতির দল তাকে শুঁড়ে করে জড়িয়ে পিষ্ট করে অতল খাদে নিক্ষেপ করেছে। অশ্বত্থামা শুনলেন, সে আর কেউ নয়—কচীক।

.

মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত আশ্রম বালকেরা সমবেত হয়ে মহাচার্যের কাছে গিয়ে বলল, মহাচার্য, আমরা ভাবতেও পারছি না, আমাদের সতীর্থ কচীক আর নেই। আপনি আদেশ করুন প্রভু, আমরা অস্ত্রশস্ত্র জোগাড় করে ওই ঘাতক হস্তীদের খুঁজে বার করি। তাদের নিধন না করা পর্যন্ত আমরা শান্ত হতে পারছি না।

সোমক শান্ত কণ্ঠে বললেন, বন্য হস্তী অতি ভয়ংকর প্রাণী। তাদের সংহার করা তোমাদের সাধ্যায়ত্ত নয়।

ছাত্ররা বলল, আমরা গ্রামবাসীদের সঙ্গে নেব। আমরা সবাই মিলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান করব।

সোমক বললেন, বন্য প্রাণীদের নিধন আমাদের কাজ নয়। এই অরণ্য তাদেরই আবাসভূমি। আমরাই বনের মধ্যে বসতি স্থাপন করে তাদের অধিকার হরণ করে নিয়েছি। অকস্মাৎ কচীক হয়তো কোনো মত্ত মাতঙ্গের সামনে পড়ে গিয়েছিল, তাই ভীত হয়ে কোনো কোনো কুরঙ্গ তাকে আঘাত করেছে। এমনটা সচরাচর হয় না। আমি তো দশ বৎসর ধরে এই আশ্রম চালাচ্ছি। এই বিগত দশ বৎসরে কোনো হস্তী আমাদের আশ্রম আক্রমণ করেনি। এমনকী প্রতিদিন রাতেই আমাদের সংলগ্ন সরোবরে শ্বাপদেরা জলপান করতে আসে। কতদিন আমি জ্যোৎস্না রাতে কাছ থেকে শার্দূলদের দেখেছি। তারা কিন্তু আশ্রমিকদের আক্রমণ করেনি। যে মুহূর্তে আমরা তাদের আক্রমণ করব, তারাও প্রতিশোধ নেবে। আমাদের আশ্রম তুলে দিতে হবে। অরণ্য আমাদের জননী। এই অরণ্য থেকেই মনুষ্যকুল উদ্ভূত হয়েছে। তাই অরণ্যকে আমাদের শ্রদ্ধা করেই যেতে হবে। অরণ্য নিধন করা যেমন অন্যায়, যেমন বৃক্ষচ্ছেদন করা মহাপাপ, তেমনি অরণ্যবাসীদের বিপর্যস্ত করে আমরা আমাদের তপোবনকে বিপন্ন করে তুলতে পারি না। কচীকের এই মৃত্যু খুবই দুঃখের। কিন্তু এই মুহূর্তে তার মৃতদেহ উদ্ধার করে উপযুক্ত সৎকার করা ছাড়া আমাদের দ্বিতীয় পন্থা নেই।

আশ্রম খালি করে আচার্য ও ছাত্রেরা চললেন কচীকের দেহ উদ্ধারের জন্য। অশ্বত্থামা কোনো বারণ শুনলেন না, তিনিও এই অসুস্থ শরীর নিয়ে তাদের যাত্রাসঙ্গী হলেন।

ততক্ষণে গ্রামবাসীরা খবর পেয়ে অনেকে এসে পৌঁছেছে। গ্রামবাসীরা ত্রস্ত ও বিপন্ন আজ দুদিন ধরে বন্য হস্তীর উপদ্রবে তারা পানীয় জল নিতে পারছে না। তারা শুনেছিল বীর অশ্বত্থামা এই তপোবনেই বাস করছেন। তারা এগিয়ে এসে বলল, হে বীর, আপনি বহু অশ্ব ও হস্তীকে নিয়ে যুদ্ধ করেছেন। আপনি হস্তী বিশারদ। বীরবাহু। আপনি হস্তীদের অত্যাচার থেকে আমাদের উদ্ধার করুন। এই অরণ্যে আগে প্রচুর হস্তী ছিল। যুদ্ধের আগে রাজসৈন্যরা এসে প্রচুর হস্তী ধরে নিয়ে যায়। অরণ্য প্রায় হস্তীশূন্য করে ফেলেছিল। কিছু অবশিষ্ট হস্তীযূথ তারপর থেকে গ্রামবাসীদের আক্রমণ করছে। প্রায় চার-পাঁচ ব্যক্তিকে তারা হতাহত করেছে। আপনি রাজপুরুষদের বলুন, বাকিদের বন্দি করে রাজহস্তিশালায় নিয়ে যেতে। নয়তো আপনি তাদের নিধন করুন।

মহাচার্য সোমক বললেন, তোমরা যে কথাগুলি বললে তা মোটেই যুক্তিপূর্ণ নয়। হস্তীদের জন্ম অরণ্যে। বাসও অরণ্যে। এই অরণ্যের ওপর তাদের অধিকার সর্বাগ্রে। রাজার লোকেরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য নিরীহ এই প্রাণীগুলিকে ধরে নিয়ে গিয়ে যুদ্ধের কাজে ব্যবহার করে। এজন্য তাদের জন্ম হয়নি। অরণ্যের পরিবেশ রক্ষার জন্যই আরণ্যপ্রাণীদের জন্ম। তাদের ক্রমাগত কুলক্ষয় দেখে তারা বিপর্যস্ত। হয়তো তারা ক্রুদ্ধ। হস্তীরা কখনও এক জায়গায় অবস্থান করে না। তোমরা দলবদ্ধভাবে এসে পানীয় জল সংগ্রহ করো। তোমাদের কোনো অসুবিধা হবে না।

গ্রামবাসীরা বলল, এই যুদ্ধে আমরা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। আমাদের গ্রামের পর গ্রামে যান কোনো যুবক খুঁজে পাবেন না। সবাই যুদ্ধে হত হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসা কিছু সৈনিকই গ্রামের একমাত্র জীবিত তরুণ।

কচীকের ক্ষত-বিক্ষত দেহ একটি গাছের গোড়ায় আটকে ছিল। অনেক লোক মিলে মৃতদেহটি উদ্ধার হল, তারপর একটি চালি তৈরি করে মৃতদেহটি বেঁধে ছাত্ররা কাঁধে করে সেই সংকীর্ণ অরণ্য পথ ধরে মৃতদেহটি বহে নিয়ে চলল। আশ্রমের ঈশান কোণে একটি উন্মুক্ত প্রান্তরে সেই বালকের দেহটি দাহ করা হল। হোমাগ্নির মতো চিতা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল।

অশ্বত্থামা অথর্ববেদ থেকে মন্ত্র পড়লেন-

শমগ্নে পশ্চাৎ তপ শং পুরস্তাচ্ছমুত্তরাচ্ছম ধরাৎ তপৈনম।
একস্ত্রেধা বিহিতো জাতবেদঃ সম্যগেনং ধেহি সুকৃতামু লোকে।।

হে অগ্নি পশ্চিম দিকে গার্হপত্য অগ্নিরূপে সুখে তুমি একে তাপ দাও। সেরূপ পূর্ব উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে একে দগ্ধ করো। (অথর্ববেদ, ১৮শ কাণ্ড। চতুর্থ অনুবাক। দ্বিতীয় সূক্ত।)

অসুস্থ শরীরে চিতায় হবি ঢালতে ঢালতে অশ্বত্থামা অবসন্ন হয়ে মাটিতে বসে পড়লেন। আচার্য সোমক এগিয়ে এসে বললেন, আর্যপুত্র আপনি একটু বিশ্রাম করবেন চলুন। আপনার অসুস্থ শরীর, তার ওপর এই পরিশ্রম আপনার পক্ষে সুখপ্রদ হচ্ছে না। আমরা সবাই আছি। আচার্যরা, আর্যপুত্রকে আপনারা ঘরে পৌঁছে দিয়ে আসুন।

অশ্বত্থামা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি ঠিকই আছি মহাচার্য। আমি কচীকের এই চিতাগ্নির সামনে একটি অঙ্গীকার করতে চাই, আমাদের ছাত্র ও আচার্যদের পক্ষে রোজ দুর্গম পথ ধরে এতদূর গিয়ে পানীয় জল আনা সত্যিই বড় কঠিন কাজ। তার চেয়ে আমরা আমাদের তপোবনের সংলগ্ন সরোবরটি আরও প্রশস্ত করি। এর ফলে সারা বৎসর এই সরোবরে স্বচ্ছ জল থাকবে। এই জলই আমরা পান করব। যেটি আমরা এখন শুধু বর্ষার সময় করি।

আচার্য বললেন, আচার্য অশ্বত্থামার প্রস্তাবটি উত্তম। কিন্তু এই সরোবর গভীরভাবে খনন করতে গেলে প্রচুর লোকবল লাগবে। আমাদের ছাত্ররা এটি পারবে না, তা অত্যন্ত শ্রমসাপেক্ষ। তাছাড়া খননের জন্য প্রচুর খনিত্র লাগবে। আমরা তা কোথায় পাব?

—এই তপোবন থেকে কিছু দূরে এই অঞ্চলের একজন ভূস্বামী থাকেন। তিনি অনেক দীঘিকা খনন করিয়েছেন। আমরা তাঁকে অনুরোধ করতে পারি যদি আমাদের খনন যন্ত্র ও খননকারী শ্রমিক দিয়ে সাহায্য করেন।

অশ্বত্থামা বললেন, তবে তাই হোক। মহাচার্য এই প্রস্তাবটি অনুমোদন করলে আমরা তাঁর কাছে যাব।

আচার্য সোমক বললেন, আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু আশ্রমের কোনো সঙ্গতি নেই যে শ্রমিক নিয়োগ করে। যদি গ্রামবাসীরা শ্রমদান করেন তাহলেই সেটি সম্ভব।

তার পরের দিনই অশ্বত্থামা ও চারজন আচার্যসহ মহাচার্য সোমক ভূস্বামী চারুদত্তর ভবনে গিয়ে দেখা করলেন।

গ্রামের মধ্যে এই একটিমাত্র ইষ্টক নির্মিত প্রাসাদ। অনেকটা জায়গা জুড়ে একটি উদ্যানের মধ্যে প্রাসাদটি।

তপোবন থেকে আচার্য ব্রাহ্মণরা এসেছেন শুনে ভূপতি চারুদত্ত তাঁদের পাদ্য অর্ঘ্য দিয়ে বসালেন। তিনি শশব্যস্ত হয়ে ছুটে এসে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে বললেন, আমি ধন্য, আপনারা আমার গৃহে পদার্পণ করলেন। আমি শুনেছি একটি আশ্রম বালককে একটি মত্ত হস্তী নিহত করেছে। আমি অত্যন্ত দুঃখিত। বালকের যথাবিহিত সৎকার হয়েছে তো? সোমক বললেন, হ্যাঁ। তার আগে আমাদের আচার্যদের সঙ্গে আপনার আলাপ করিয়ে দিই। ইনি দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা, এখন আমাদের একজন আচার্য।

চারুদত্ত সবিস্ময়ে বললেন, প্রণাম গুরুপুত্র। আপনি যে এই তপোবনে বাস করছেন আমি অবগত ছিলাম না। বলুন, আপনার জন্য কী করতে পারি। জানেন তো, আমি কৌরবপক্ষে ছিলাম। মহারাজ দুর্যোধন আমার পরম শ্রদ্ধের মহারাজা—আমাকে খুবই ভালোবাসতেন। দেশ এখন যুধিষ্ঠিরের শাসনে। আমার আগের মতো প্রতিপত্তি আর নেই। তবু আপনার জন্য আমি সব কিছু করতে পারি।

অশ্বত্থামা বললেন, আমাদের আশ্রমে অত্যন্ত জলাভাব। বহুদূর থেকে পানীয় জল আনতে গিয়েই দ্বাদশ বর্ষীয় বালকের মৃত্যু হল। আমরা আমাদের আশ্রমের নিকটবর্তী একটি জলাশয়কে গভীর সরোবরে পরিণত করতে চাই। তাহলে আমাদের জলাভাব মিটে যায়। আপনি এই জলাশয়টি খননের ভার নিন।

চারুদত্ত সব শুনে বললেন, আচার্যদেব, আপনাকে বলতে বড় খারাপ লাগছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ আমাদের গ্রামের পর গ্রাম নিঃশেষ করে দিয়েছে। এই সরোবর খননের কাজে শতাধিক শ্রমিক প্রয়োজন। কিন্তু আমার অধীনস্থ গ্রামগুলিতে দশজনের বেশি শ্রমিক পাওয়া যাবে না। সবাই যুদ্ধে মৃত। আমাদের নিত্যকর্মের জন্য কোনো শ্রমিক নেই। চাষবাসের জন্যও কৃষিকর্মী নেই। আমার এলাকা থেকে আমি মহারাজ দুর্যোধনকে পাঁচসহ সৈন্য পাঠিয়েছিলাম। কিছু পলাতক সৈন্য ছাড়া সবাই মৃত। গ্রামে শুধু চণ্ডাল যুবকেরা আছে। আর আছে ব্রাহ্মণ যুবকেরা। তারা কোনো শ্রমের কাজ করবে না। আর অর্থের দিক থেকেও আমি নিঃস্ব। আমার সর্বস্ব যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহের জন্য মহারাজের প্রতিনিধির হাতে তুলে দিয়েছি। আমি শুনেছি মহারাজ যুধিষ্ঠির অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করছেন। এর জন্য রাজপ্রতিনিধিরা আগে থেকে মোটা টাকা কর ধার্য করে বসেছেন। আমার এই প্রাসাদ দেখছেন, রক্ষীবাহিনী দেখছেন, তাদেরই নিয়মিত বেতন দিতে পারছি না।

অশ্বত্থামা কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বললেন, বেশ, আপনার হাতে যদি মানব সম্পদ না থাকে, আপনি আমাদের খনন যন্ত্রগুলি সাময়িকভাবে ব্যবহার করতে দিন। আমাদের ছাত্ররাই শ্রমদান করবে।

চারুদত্ত বললেন, আমি আমার প্রধান অমাত্যকে ডেকে বলে দিচ্ছি। তিনি আপনাদের যা যা প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি দেবেন। আপনাদের উপকারে লাগতে পারলে আমি ধন্য হব। আপনারা তো এতদিন আমার কাছে কিছু প্রার্থনা করেননি।

সোমক বললেন, আমাদের মহর্ষি বেদব্যাসের নির্দেশে অপ্রতিগ্রহ। সাত্ত্বিক ব্রহ্মচর্য জীবন যাপন করি। আমরা যেটুকু প্রয়োজন নিজেরা উৎপাদন করি। হেমন্তকালে নীবার ধান্য সঞ্চয় করে আমরা অতিরিক্ত ধান্য সংগ্রহ করি। তবু দু’ বছর আগে আপনি স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে আমাদের শীত নিবারণের জন্য কম্বল বিতরণ করেছিলেন। আপনারা তা না দিলে আমাদের ছাত্র ও আচার্যরা দুঃসহ শীত সহ্য করতে শিখত।

চারুদত্ত বললেন, সে কথা বলে আমায় লজ্জা দেবেন না। কুরুক্ষেত্রের আগে ক্ষুদ্র ভূপতিদের মধ্যে আমি সবচেয়ে ধনশালী ছিলাম। যুদ্ধ আমাকে আজ প্রায় পথের ভিখারি করেছে। তদুপরি সর্বদা ভয়ে ভয়ে থাকি। কৌরবপন্থী বলে পরিচিত হয়ে গিয়েছি। এখন কৌরবরা নিঃশেষ হয়ে গেছে। পাণ্ডবরাই রাজা। দেশবাসীও রাতারাতি নতুন রাজার প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছে। কিন্তু আমাকে কি মহারাজ যুধিষ্ঠির বিশ্বাস করবেন? আমি শুনেছি সব ভূস্বামী, সামন্তপ্রভু, অভিজাত নরপতিরা দলে দলে হস্তিনানগর যাচ্ছেন নতুন রাজার প্রতি আনুগত্য জানাতে। আমি যেতে ভয় পাচ্ছি। গুরুপুত্র অশ্বত্থামা আপনাকে দেখে আমার একটু ভরসা হল। আপনি আমাকে একটু অনুকম্পা করবেন?

অশ্বত্থামা বললেন, আমি রাজনীতির সঙ্গে সব সংশ্রব ত্যাগ করেছি। আমি একজন আচার্যমাত্র। তবে যুধিষ্ঠির সব রাজন্যবর্গকে ক্ষমা করেছেন। আমার মনে হয় না, তিনি কারও প্রতি বিরূপ হবেন। ক্ষমতায় স্থিত থাকার একমাত্র উপায় হল ক্ষমতাবানদের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন। তবে আনুগত্য পরিবর্তন একটি প্রাচীন পন্থা। মানুষ আত্মরক্ষার জন্য ক্ষমতাবানদের প্রতি অনুগত থাকে। তাদের বিরোধিতা করে না। রাজা সব সময় বশম্বদ মেরুদণ্ডহীন অধস্তনদের পছন্দ করেন। তিনি বন্ধুত্বও করেন স্তাবকদের সঙ্গে, তিনি সর্বদা হীনমন্যতা না হয় অহংবোধে ভোগেন। সেজন্য স্বাধীন ব্যক্তিত্বকে তিনি সন্দেহ করেন। তাঁর পছন্দের পাত্র হল অনুগ্রহপ্রার্থী, বিদূষক এবং তাঁর দুর্নীতির সমর্থকেরা। সৎ স্বাধীনচেতা ব্যক্তিমাত্রকেই তিনি সন্দেহ করেন কারণ তাঁর ভয় যাদের মেরুদণ্ড আছে তারা রাজদণ্ডকে ভয় করে না। তাই তিনি দুর্নীতিপরায়ণ অনুগ্রহপ্রার্থী দাস মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিদেরই পছন্দ করেন। কারণ পরভৃতিকার মতো তারা বনস্পতিকে গ্রহণ করে বেঁচে থাকে। তাদের মূল মাটিতে নেই। ওই বনস্পতির রসেই তারা পুষ্ট। তবু বনস্পতি তাতেই খুশি থাকে। অবশ্য রাজা যুধিষ্ঠির ধর্মপরায়ণ ও ন্যায় ও সত্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আপনি নির্ভয়ে তাঁর কাছে যেতে পারেন।

.

আশ্রমিকদের পুষ্করিণী খননের মতো শ্রমসাধ্য কাজে নিয়োগে সোমকের মত ছিল না। তিনি বললেন, এতে তাদের অধ্যয়নের ক্ষতি হবে।

কিন্তু অশ্বত্থামা বললেন, বিদ্যা যদি কায়িক শ্রম থেকে বিচ্যুত হয় তাহলে কর্মের সঙ্গে জ্ঞানের বিচ্যুতি ঘটে। বিদ্বান ব্যক্তির কায়িক শ্রমের প্রতি একটি বীতরাগ গড়ে ওঠে।

সোমক বললেন, আমাদের আশ্রমে সর্বদাই কায়িক শ্রমের ওপর জোর দিই। কিন্তু বিদ্যার বিনিময়ে নয়। বেদচর্চার জন্য অনেক সময়ের প্রয়োজন। ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ। যার জন্য আমরা রাজনৈতিক আলোচনাও আশ্রমে নিষিদ্ধ করে দিয়েছি। আশ্রমে একটি জ্ঞানের পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। যাদৃশী ভাবনাযস্য সিদ্ধির্ভবতি তাদৃশী। মানুষের ভাবনা অনুসারেই সিদ্ধিলাভ ঘটে। বিদ্যার্থীর ভাবনা হল স্বাধ্যায়প্রব চলাভ্যাং ন প্রমদিতব্যং। অধ্যয়ন থেকে কখনও বিচ্যুত হবে না। স্বাধ্যায়ই ছাত্রদের মন্ত্র। খনন চলুক—তবে অধ্যয়নের বিনিময়ে নয়।

ঠিক হল, প্রতিদিন ছাত্রেরা সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রার্থনার পর অর্ধপ্রহর পুষ্করিণী কাটার কাজে ব্যয় করবে। ঠিক হল বৈশাখী পূর্ণিমার দিন থেকে সরোবর খনন শুরু হবে।

ছাত্ররা দু’-তিন দিন ধরে ভূস্বামী চারুদত্তর বাড়ি থেকে প্রচুর খনিত্র নিয়ে এল। অশ্বত্থামা একটি ভূর্জ পাত্রের ওপর একটি মানচিত্র এঁকে দেখিয়ে দিলেন কীভাবে সরোবরটি সম্প্রসারণ করতে হবে। বর্ষা আসার আগে সরোবরের কর্দমাক্ত জল সেঁচে তুলে ফেলা হবে। তারপর সরোবরটি গভীর করে খনন করতে হবে। ঝুড়ি করে তার মাটি ফেলে দিতে হবে। এবং খননকাজের ফলে তাদের কর্দমাক্ত গাত্র ধৌত করার জন্য বেত্রবতী নদী পর্যন্ত যেতে হবে।

এই পরিকল্পনা মতো আশ্রমের কুড়িটি ছেলে ও আচার্যরা সবাই খননের কাজে নেমে পড়লেন। অশ্বত্থামা ইতিমধ্যে আরও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তবু তিনি ছাত্রদের সঙ্গে কাদায় নেমে হাত মিলিয়ে কাজ করতে চাইলেন। কিন্তু সবাই তাঁকে বাধা দিল 1

অশ্বত্থামা তখন সরোবরের পাড়ে বসে ছাত্রদের উৎসাহিত করার জন্য বলে চলেছেন, বিদ্যার্থীগণ, তোমরা মনে রাখবে পশুরাজ সিংহকেও কেউ শিকার ধরে এনে দেয় না। তাকে তার আহার নিজে সংগ্রহ করতে হয়। মেঘ কখনও আপনা-আপনি জলভারে পুষ্ট হয় না। তাকে সমুদ্র, নদী, হ্রদের বাষ্পাকৃত জল বহু কষ্ট করে সংগৃহীত করতে হয় বৃষ্টি দেবার জন্য। কেউ স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে জন্মায় না। শিশু জন্মাবার সময় নগ্নদেহ ছাড়া আর কিছুই নিয়ে আসে না। তাকে পরিশ্রম করে নিজেকে বিকশিত করতে হয়। তার সমস্ত সম্পদ, বিদ্যা, বুদ্ধি, বীরত্ব, সাহস, মহত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব সবই তার কঠোর শ্রমের ফসল। তোমরা পরিশ্রম করে এই জলাধার তৈরি করো। এটি হয়ে উঠবে তোমাদের সমবেত ইচ্ছার মূর্ত প্রতীক।

আকাশ তার বৃষ্টি দেবার জন্য তৈরি, কিন্তু তাকে ধারণ করার জন্য আধার চাই। আধার না থাকলে তা গড়িয়ে পড়ে নষ্ট হবে। তোমরা সেই আধার তৈরি করো। গভীরতা ছাড়া বিদ্যা, জ্ঞান, সম্পদ ধরে রাখা যায় না। তেমনি গভীরতা ছাড়া স্বর্গের শ্রেষ্ঠ দান বৃষ্টিকেও মানুষের মঙ্গলের জন্য ধরে রাখা যাবে না। তা অপ্রশস্ত স্থানে পড়ে নষ্ট হবে।

অশ্বত্থামা উচ্চৈস্বরে কথাগুলি বলছেন। বলতে বলতে অশ্বত্থামা হঠাৎ মাটিতে বসে পড়লেন। তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে অনর্গল শোণিত ধারা। তিনি কাশতে কাশতে দু’হাতে বুক চেপে ধরে মাটিতে শুয়ে পড়লেন।

বিদ্যার্থী ও আচার্যরা যারা সরোবরে কাজ করছিলেন, তাঁরা সবাই কর্দমাক্ত। তাঁরা কেউ অশ্বত্থামাকে স্পর্শ করতে পারছে না। অথচ মানুষটি তিরবিদ্ধ কবুতরের মতো ছটফট করছে। ছাত্ররা সবাই আচার্য সোমককে খবর দিতে ছুটল।

সোমক গিয়ে দেখলেন, প্রখর রৌদ্রের নীচে অশ্বত্থামা অচৈতন্যের মতো পড়ে আছেন। ছাত্ররা তাঁকে ধরাধরি করে আশ্রমে নিয়ে এলো।

.

অশ্বত্থামার এই আকস্মিক বিপর্যয়ে আশ্রমের আবাসিক ও আচার্যদের মধ্যে বিষাদের ছায়া নেমে গেল। সোমক বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। প্রায় এক বৎসর প্রতিক্রান্ত হয়ে গেছে অশ্বত্থামা এই আশ্রমে এসেছেন। তিনি এসে ছাত্র ও আচার্যদের সঙ্গে বেশ অন্তরঙ্গভাবে মিশে গিয়েছিলেন। যদিও অধ্যাপনায় তিনি খুব পটু ছিলেন না। কিন্তু অথর্ববেদকে খুব সহজ ভাষায় তিনি ছাত্রদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি ছাত্রদের বলতেন, আবৃত্তিকেই আমি বোধাদাপি গরীয়সী বলতে রাজি নই। এই বোধশক্তি একটি অন্তর্নিহিত শক্তি। আগে তোমাকে প্রতিটি শ্লোকের মর্মবাণী হৃদয়ে গ্রহণ করতে হবে। মগজ দিয়ে উপলব্ধি করতে হবে। তা না হলে শুধু উদ্ধৃতি দেবার জন্য বেদ মুখস্থ করার দরকার নেই। আর শুধু পুঁথিকীট হয়ে লাভ নেই। শরীর চালনায় অভ্যস্ত হতে হবে। এই যে তোমরা সরোবরের জন্য শ্রমদান করছ, তাতে তোমাদের দেহ ও মন উভয়ই পুষ্ট হচ্ছে। নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্য। বাহুবলকেও যুগপৎ সক্রিয় রাখো।

অশ্বত্থামা নিজে পরিশ্রম করতে পারতেন না। মহাচার্য সোমক ওকে পঠন-পাঠন থেকেও ছুটি দিলেন। অশ্বত্থামা পুষ্করিণীর পারে একটি গাছের ছায়ায় বসে ছাত্রদের খননকার্য তদারক করতেন আর তাদের উৎসাহিত করতেন। অবশেষে, দু’ বছরের চেষ্টায় সরোবরের খনন কাজ শেষ হল। বর্ষার জলে কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠল।

শেষের দিকে অশ্বত্থামা বেশিক্ষণ বসতে পারতেন না। কিন্তু যেদিন সরোবরটি বৃষ্টির জল ও ভূগর্ভস্থ জল মিলে কানায় কানায় ভরে উঠল, তখন ছাত্ররা সোল্লাসে চিৎকার করতে করতে অশ্বত্থামাকে তার শয্যা থেকে তুলে কাঁধে করে সরোবরের ধারে নিয়ে এসে বসিয়ে দিল।

অশ্বত্থামা সেসময় এক অপ্রত্যাশিত কাণ্ড ঘটালেন। সবাইকে বিস্মিত বিমূঢ় করে দিয়ে ওঁ স্বস্তি বলে সরোবরের জলে নেমে পড়লেন। অসুস্থ শরীরে অশ্বত্থামা অবগাহন করছেন দেখে সমস্ত ছাত্র ও আচার্যরা সরোবরের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে অশ্বত্থামাকে সন্তর্পণে সরোবর থেকে তীরে তুলল। তার গা মুছিয়ে দ্রুত শুকনো কাপড় পরিয়ে তাকে আশ্রমে নিয়ে গেল।

ছেলেরা বলতে লাগল, প্রভু, এ আপনি কী করলেন।

অশ্বত্থামা বললেন, আমার এত আনন্দ হয়েছিল যে আমি সব কিছু বিস্মৃত হয়েছিলাম। আজ আমার জীবনে সত্যিকারের বিজয় সমাপ্ত হল।

ছাত্ররা বলল, প্রভু, এই সরোবর আপনার পরিকল্পনা। এর একটি নাম করে দিন। অশ্বত্থামা বললেন, এর নাম হোক আনন্দ সরোবর। আনন্দাধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে। আনন্দেন জাতানি জীবন্তী।

ঠিক হল, আচার্য সোমক মহর্ষি বেদব্যাসের কাছে বার্তা পাঠাবেন আনন্দ সরোবর উদ্ঘাটন করার জন্য। কিন্তু অসুস্থ শরীরে জলে নেমে অবগাহন করার জন্য অশ্বত্থামা আরও অসুস্থ হয়ে পড়লেন।

আচার্য সোমক একজন সহ আচার্যকে মহর্ষি বেদব্যাসের কাছে পাঠালেন অশ্বত্থামার খবর দিয়ে। অনুরোধ করলেন আনন্দ সরোবরের কথা। এই সরোবর আশ্রনের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। মহর্ষি যদি স্বয়ং এসে সরোবরটি উদ্বোধন করেন।

কিন্তু আচার্য সোমকের দূত গিয়ে শুনল, মহর্ষি তাঁর আশ্রনে নেই। তিনি হস্তিনাপুর গিয়েছেন যুধিষ্ঠিরের অশ্বমেধ যজ্ঞে সাহায্য করার জন্য। এখন তিনি এত ব্যস্ত যে তাঁর

পক্ষে দম্যক বনে যাওয়া সম্ভব হবে না।

সোমক নিজেই অশ্বত্থামাকে দিয়ে সরোবরের উদ্বোধন করালেন। গঙ্গাপূজা করে স্বস্তিবাচন করে অশ্বত্থামা অথর্ববেদের মন্ত্র আবৃত্তি করলেন।

প্র নভস্ব পৃথিবি ভিম্বীদং দিব্যং নভঃ।
উদ্নো দিব্যস্য নো ধাতরীশানো বি ব্যা দ্যুতিম ॥*

[* হে বিস্তীৰ্ণ পৃথিবী, পর্জন্য (মেঘ) তোমার ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করুক, তুমি কিন্তু শিথিল না হয়ে দৃঢ় থাকো। অথর্ববেদ। ৭/২/৯/]

পূজা শেষে ছাত্ররা আবার মন্ত্রাচ্চারণের জন্য জলে ঝাঁপিয়ে পড়তে চেয়েছিল। অশ্বত্থামা ইঙ্গিতে তাদের বারণ করলেন। তিনি বললেন, এই সরোবর তোমাদের পানীয় জলের জন্য। আজ থেকে এখানে অবগাহন, সত্তরণ, কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। এই জল তোমাদের প্রাণ। এই পানীয় জল আনার জন্য তোমাদের সতীর্থ কচীক প্রাণ দিয়েছে। তার প্রাণের বিনিময়ে এই সরোবর তোমরা খনন করেছ। তোমরা তা কখনও বিস্মৃত হয়ো না। এই কথা বলতে বলতে অশ্বত্থামা মূর্ছিত হয়ে পড়লেন। ছেলেরা অতি দ্রুত তাঁর কাছে গিয়ে তাঁকে কাঁধে তুলে নিল।

অশ্বত্থামার দম্যক বিদ্যাশ্রম বাসের পর তিন বৎসর অতিক্রান্ত হয়েছে। এই তিন বৎসরে অশ্বত্থামার নাম জনগণের মন থেকে মুছে গিয়েছে। এমনকী, পাণ্ডবদের আর কেউ তাঁর প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন না। তাঁরা জানেন, শ্রীকৃষ্ণের অভিশাপে অশ্বত্থামা কোনো গভীর তারণ্যে চিরদিনের মতো হারিয়ে গেছে। সৌপ্তিক পর্বের এক জায়গায় আছে যুধিষ্ঠির বাসুদেবের কাছে অশ্বত্থামাকে ‘নরাধম’ বলে উল্লেখ করে জানতে চেয়েছিলেন তাঁর বীরপুত্রদের ও ধৃষ্টদ্যুম্নের মতো আর একজন মহাবীরকে কী করে নরাধম অশ্বত্থামা একা নিধন করতে সক্ষম হল? কৃষ্ণ তাঁকে বুঝিয়েছিলেন, মহাদেবের বরে অশ্বত্থামা অলৌকিক শক্তির অধিকারী হয়েছিলেন। যুধিষ্ঠির, দেবাদিদেব মহাদেব প্রসন্ন থাকলে সমস্ত জীব প্রসন্ন থাকে। দেবাদিদেব অশ্বত্থামার প্রতি প্রসন্ন হয়েছিলেন। তাই তিনি ক্ষণিকের জন্য বিপুল শক্তির অধিকারী হন।

যুধিষ্ঠির আর কোনো প্রশ্ন করেননি। অশ্বত্থামার দুঃসহ স্মৃতি তিনি মন থেকে মুছে ফেলে রাজকার্যে মনোনিবেশ করেন। অশ্বত্থামার কথা আর কোথাও উচ্চারিত হয়নি। অশ্বত্থামার ব্রহ্মশির অস্ত্র প্রয়োগের পর উত্তরা মৃত সন্তান (পরীক্ষিৎ) প্রসব করেন। কৃষ্ণ তাঁকে পুনর্জীবিত করে দেন। এই ঘটনা পরে বর্ণনা করছি। কিন্তু পরীক্ষিতের জন্মের পর অশ্বত্থামা যেন ইতিবাস থেকেই অপসারিত হলেন।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ৫৮ দিন পর শরশয্যায় শায়িত ভীষ্মের মৃত্যু হয়। ভীষ্মের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে একটি ইতিহাস শেষ হয়ে যায়। শুধু ভীষ্মের উপদেশগুলি আজও অমর হয়ে আছে। ভীষ্ম ধৃতরাষ্ট্রকে বলেছিলেন, ভাগ্যকে কেউ খণ্ডাতে পারে না। তুমি ভগবান বেদব্যাসের কাছে ধর্মরহস্য ভালো করেই শুনেছ। তুমি ধর্মপরায়ণ হয়ে আপন পুত্রের মতো পাণ্ডবদের প্রতিপালন করো। তোমার ছেলেরা কেউ মানুষ ছিল না, ক্রোধ, লোভ ও ঈর্ষার প্রতিমূর্তি ছিল তারা। তুমি তাদের জন্য বিন্দুমাত্র শোক কোরো না। সেই সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণকে বলে গেলেন, তুমি দেবদেবেশ, শঙ্খ-চক্র-গদাধারী বাসুদেব তুমি হিরণ্যাত্মা পরমপুরুষ। তুমি আমাকে পরিত্রাণ করো। পাণ্ডবদের পরিত্রাণ করো। যেখানে কৃষ্ণ সেখানেই ধর্ম। যেখানে ধর্ম সেখানেই জয়।

ভীষ্ম তাঁর শরশয্যা পাশে সমবেত এবার সবাইকে সম্বোধন করে বললেন, সত্য থেকে তোমাদের বুদ্ধি যেন কখনও ভ্রষ্ট না হয়। সত্যের তুল্য পরম বল আর কিছু নেই। তোমরা সংযতাত্মা হও।

ভীষ্মের মৃত্যুর পর যুধিষ্ঠির শোকার্ত হয়ে পড়েন। তাঁর শোক এত তীব্রতর হয়ে ওঠে যে প্রায় অচেতন হয়ে থাকেন যুধিষ্ঠির। পাণ্ডব ভ্রাতাগণ ও ধৃতরাষ্ট্র শায়িত যুধিষ্ঠিরকে সান্ত্বনা দিতে থাকেন। ধৃতরাষ্ট্র তাঁকে বলেন, তোমার শোক করার কোনো কারণ দেখি না। আমার ও গান্ধারীর শতপুত্র বিনষ্ট হয়েছে। আমাদেরই শোক করা কর্তব্য।

মহর্ষি বেদব্যাস সে সময় ভীষ্মের পাশে উপস্থিত ছিলেন। তিনি যুধিষ্ঠিরকে বললেন, যুধিষ্ঠির, তুমি দেখছি এখনও কোনো জ্ঞান লাভ করতে পারোনি। কেউই নিজে নিজে কোনো কাজ সফল হতে পারে না। সকলেই সাধু-অসাধু যে কাজই করুক, ঈশ্বরই তাঁকে দিয়ে করান। অতএব, তোমার অনুতাপ পরিত্যাগ করাই দরকার। তুমি নিজেকে পাপী বলে মনে করছ। এটা তোমার অপরাধ সচেতন মনেরই পরিচয়। যে কাজ করলে মানুষের পাপ ধ্বংস হয়, তুমি সেই কাজ করো। তুমি রাজসূয় যজ্ঞ করেছ, এবার অশ্বমেধ যজ্ঞ করো। তুমি তোমার পূর্বে পিতামহ রাজা ভরতের মতো রাজসূয় যজ্ঞ করেছ। এবার তাঁর মতোই অশ্বমেধ যজ্ঞ করে পাপক্ষালন করো।*

[* বেদব্যাসের এই কথার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়, আধুনিক মনোবিজ্ঞান যাকে ‘অপরাধ সচেতনতা’ বলে তা একটি মানসিক বিপর্যয়। শেষ পর্যন্ত তা মনঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যাগযজ্ঞের মধ্য দিয়ে এই পাপবোধের স্খলন হয়। সুতরাং যজ্ঞের মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ব্যাস দিয়ে গেছেন।]

ব্যাসের পরামর্শ মতো যুধিষ্ঠির অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করলেন। শ্রীকৃষ্ণ ভীষ্মের মৃত্যুর পর দ্বারকায় চলে গিয়েছিলেন। অশ্বমেধ যজ্ঞ উপলক্ষে আবার কৃষ্ণ সুভদ্রা, প্রদ্যুম্ন, যুযুধান, চারুদেষ্ণ, শাম্ব, গদ, কৃতবর্মা, সারন, নিশঠ ও উন্মূককে নিয়ে হস্তিনাপুরে এসে উপস্থিত হলেন। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র মহাত্মা বিদুর ও যুযুৎসু যদুবীরদের স্বাগত জানালেন।

ঠিক সেই সময় পাণ্ডবদের প্রাসাদে উত্তরার গর্ভে মৃত পুত্র পরীক্ষিৎ ভূমিষ্ঠ হল। অশ্বত্থামার ব্রহ্মশির অস্ত্রক্ষেপণের ফল। সেই ব্রহ্মশির উত্তরার উদরে এসে তখনই অজাতক পরীক্ষিতের প্রাণ হরণ করেছিল। অবশেষে সেই মৃত পুত্র ভূমিষ্ঠ হল। সমগ্র পরিবারে শোকের ছায়া। অন্তঃপুরে কান্নার রোল।

কৃষ্ণ শশব্যস্ত হয়ে সূতিকাগারে ছুটে গেলেন। কুন্তী বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে তাঁকে বললেন, বৎস, তুমি আমাদের পরম গতি। তোমার প্রভাবেই এই কুল এখনও টিকে আছে। তোমার ভাগিনেয় অভিমন্যুর পুত্র মৃত অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়েছে। তুমি একে বাঁচাও। তুমি প্রতিজ্ঞা করেছিলে ওকে জীবনদান করবে।

সুভদ্রা কাঁদতে কাঁদতে ভ্রাতা কৃষ্ণকে বললেন, দাদা, আমি, দ্রৌপদী ও আর্যা কুন্তী, আমরা সকলে অবনত মস্তকে তোমার কাছে প্রার্থনা করছি, তুমি একবার আমাদের প্রতি কৃপাদৃষ্টি নিক্ষেপ করো।

উত্তরা উন্মত্তের ন্যায় কেঁদে চলেছেন। কাঁদতে কাঁদতে তিন মূর্ছিত হয়ে পড়লেন। সমগ্র অন্তপুর জুড়ে কৌরব রমণীদের ক্রন্দনধ্বনি উঠেছে। উত্তরা সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে মৃত পুত্রকে কোলে নিয়ে বলছেন, তুমি তোমার পিতামহের সামনে উপস্থিত হয়ে বলো, কাল পরিপূর্ণ না হলে কারও মৃত্যু হয় না। কিন্তু আমার পুত্রের কেন মৃত্যু হল? তুমি কৃষ্ণকে বলো, আমার জননী উত্তরা মৃত্যুকে প্রার্থনীয় জ্ঞান করেও শুধু আমার জন্য এতদিন প্রাণ ধারণ করেছিলেন। না না, তোমার ও কথা বলার দরকার নেই। আমি বিষ খেয়ে অথবা হুতাশনে আজই প্রাণ বিসর্জন দেব। হা পুত্র, তুমি একবার ওঠো। তোমার প্রপিতামহী কুন্তী, পিতামহী পাঞ্চালী ও সুভদ্রা এবং তোমার জননী আমি, আমরা সবাই তোমার শোকে ব্যাধবিদ্ধ হরিণীর মতো কাতর হয়ে আছি। তোমার পিতামহ ভগবান কৃষ্ণ আজ তোমার কাছে এসেছেন। তুমি উঠে ওঁর মুখকমল দর্শন করো।

উত্তরার বিলাপ শুনে বাসুদেব বলেছিলেন, বৎসে, আমাকে মিথ্যাবাদী মনে কোরো না। আমি যা প্রতিজ্ঞা করেছি তা পালন করব। আমার সমস্ত পুণ্যবলে অভিমন্যুর মৃত পুত্র অচিরে জীবন লাভ করুক।

বাসুদেবের এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে মৃত নবজাতক পরীক্ষিতের দেহে জীবনের স্পন্দন দেখা দিল। কৃষ্ণের আদেশে ব্রাহ্মণেরা স্বস্তিবাচন করতে শুরু করে দিলেন। মল্ল নট, দৈবজ্ঞ, সূত ও মাগধেরা জনার্দন কৃষ্ণের স্তুতি পাঠ করতে লাগলেন।

উত্তরা নবজাতককে মহামূল্য রত্নে ভূষিত করে বললেন, যখন কুল পরিক্ষীণ হবার সময় এই পুত্র জন্মগ্রহণ করেছে, তখন এর নাম রাখলাম পরীক্ষিৎ।*

[* পরীক্ষিৎ কুল পরিক্ষীণ অর্থাৎ যুদ্ধে একের পর এক মৃত্যুতে বংশক্ষয় কালে জন্মগ্রহণ করল। উত্তরা তাই তাঁর নাম পরীক্ষিৎ রাখলেন। পরীক্ষিতের পুত্র জনমেজয়।]

পরীক্ষিতের জন্মের একমাস পরে পাণ্ডবরা হিমালয় ভ্রমণ সেরে হস্তিনানগরে ফিরে এলেন। পাণ্ডবরা ফিরে আসার পর কৃষ্ণবংশীয় যাদবরা পাণ্ডবদের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। বিবিধ মালা, বিচিত্র পতাকা, ও ধ্বজ দিয়ে রাজধানী সাজানো হল। নগরীর অধিবাসীরা যুদ্ধকালে ভীতি, সন্ত্রাস ও শোকের মধ্যে দিন কাটিয়েছিল। সেই শোকার্ত পরিবেশ কেটে গিয়ে নগরী আবার উৎসবমুখর হয়ে উঠল।

বেদব্যাস হস্তিনানগরে এসে যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে দেখা করলেন। বেদব্যাস তাঁকে পাপভার লাঘবের জন্য অশ্বমেধ যজ্ঞ করতে বললেন। সে যজ্ঞও মহাধুমধাম করে সম্পন্ন হল। অশ্বমেধ যজ্ঞ সাম্রাজ্য বিস্তারেরই একটি দিক। দেখা গেল এই অশ্বমেধ যজ্ঞকে কেন্দ্ৰ করে পাণ্ডবরা দক্ষিণে ছেদি রাজ্য থেকে পশ্চিমে গান্ধার ও পূর্বে মণিপুর, প্রায় সমগ্র ভারতই পাণ্ডবরাজ্যের অধীনে নিয়ে আসেন।

যুধিষ্ঠির কিন্তু এই যজ্ঞে তাদের অধিকৃত সমস্ত রাজ্য মহর্ষি ব্যাসকে দান করে দিলেন। তিনি বললেন, আমি অশ্বমেধ যজ্ঞে সমগ্র পৃথিবী আপনাদের দান করব ঠিক করেছিলাম।* এখন অর্জুন দ্বারা বিজিত ধরণী আপনাদের দান করছি। আমি এরপর বনবাসে যাব। রাজ্যে আমার কোনো বাসনা নেই।

[* মহাভারতে বহুবার পৃথিবী মেদিনী শব্দ দুটি ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু এই পৃথিবীর সীমা ও আয়তনের কোনো ভৌগোলিক রূপরেখার পরিচয় পাওয়া যায় না। ধরে নেওয়া যায় ভারতের কিছু প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমাকেই পৃথিবী বলা হত। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কম্বোজের রাজা যোগ কেন। এই কম্বোজ কী কাম্বোডিয়া?]

যুধিষ্ঠিরের এই স্বেচ্ছায় রাজ্য ত্যাগে দ্রৌপদী ও অন্যান্য পাণ্ডবেরাও সম্মতি দিয়েছিলেন। তখন বেদব্যাস যুধিষ্ঠিরকে বললেন, মহারাজ, আমি তোমার দেওয়া ‘পৃথিবী’ তোমাকেই দিয়ে দিচ্ছি। তুমি এটি নিয়ে এর পরিবর্তে ব্রাহ্মণদের সুবর্ণ দান করো।

যুধিষ্ঠির ইতিমধ্যেই ব্রাহ্মণদের সহস্র কোটি সুবর্ণমুদ্রা দান করেছিলেন। তিনি দানের পরিমাণ তিনগুণ অর্থাৎ তিন হাজার কোটি স্বর্ণমুদ্রা করে দিলেন। ব্রাহ্মণদের অর্থ দেওয়ার পর যজ্ঞস্থলে যে সমস্ত সুবর্ণময় পাত্র অবশিষ্ট থাকল, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র ও ম্লেচ্ছদের মধ্যে তা বণ্টন করে দেওয়া হল।

ভগবান বেদব্যাস তাঁর সুবর্ণমুদ্রার অংশ কুন্তীকে দান করলেন।

.

শিক্ষা বিস্তারে ব্যাসদেব

অশ্বমেধ যজ্ঞ শেষ হবার পর ব্যাস তাঁর বিদ্যাশ্রমগুলির উন্নয়নের কাজে জড়িয়ে পড়লেন। যুধিষ্ঠির তাঁকে ডেকে বললেন, পিতামহ ভীষ্ম চলে যাওয়ার পর কৌরব কুলের আপনিই আমাদের অভিভাবক। আপনার ওপর আমি বেদশিক্ষা বিস্তারের দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চাই। আপনি আপনার আশ্রমের বিভিন্ন দেশে শাখা গড়ে তুলুন। কোথায় কোথায় বেদচর্চা প্রতিষ্ঠানগুলি আছে তার খোঁজ নিন। যে সমস্ত ঋষিকুল তপোবন প্রতিষ্ঠিত করে সবার অলক্ষে তাঁদের মতো করে শিক্ষাবিস্তার করে যাচ্ছেন, তাদের একটি তালিকা করে আচার্যদের কী কী প্রয়োজন আমাকে জানান। শিক্ষা ছাড়া সনাতন ধর্ম ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতে পারে না। যে রাজা শিক্ষার জন্য ব্যয় করতে কুণ্ঠা প্রকাশ করে থাকেন, সেই রাজা নিষ্ঠুর এবং পাপী। দেশবাসীর মধ্যে শিক্ষার আলো এসে না পড়লে সে জাতির অধঃপতন ঘটতে বিলম্ব হয় না। আপনি এই গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করে ভারতকে মহাভারতে পরিণত করুন।

বেদব্যাস যুধিষ্ঠিরের অভিপ্রায় অনুসারে ভারতের অনেকগুলি রাজ্য পরিভ্রমণ করেন ও কয়েকটি বেদ শিক্ষাকেন্দ্র তৈরি করে দিয়ে আসেন। তাঁর নিজের ভাগীরথীর আশ্রমটি সম্প্রসারিত করেন। সেটি একটি জাতীয় শিক্ষাকেন্দ্রের রূপ নেয়। তারপর তাঁর মনে আসে দম্যক আশ্রমের কথা। এই আশ্রমটির জন্য আচার্য সোমক প্রাণপাত করে তাকে প্রতিষ্ঠিত ও সম্প্রসারিত করেছেন। আশ্রমিকদের স্বেচ্ছাশ্রমে সেখানে একটি সরোবর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জেনে তিনি খুব খুশি। কিন্তু তিনি তার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যেতে পারেননি। এখন তিনি একটু সময় পেয়েছেন দম্যক আশ্রমটি ঘুরে দেখার। আর অশ্বত্থামার সঙ্গে দেখা করার।

অশ্বত্থামা যে ক্রমশ আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তা তিনি শুনেছেন। এবার তিনি ইচ্ছা করলেন তিনি নিজে দম্যক আশ্রমে যাবেন। অশ্বত্থামার সঙ্গে দেখা করবেন। আশ্রমের পুনর্বিন্যাসের একটি পরিকল্পনাও তিনি করেছেন। তাঁর অভিপ্রায় দম্যক আশ্রমটিকে তিনি অথর্ববেদ মতে ‘চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যয়ন কেন্দ্রে পরিণত করবেন। এখানে ছাত্রেরা শিখবে রোগ নিবারণ মন্ত্র ও প্রকরণ, সর্পাঘাতে মৃত্যুর চিকিৎসা। তৃষ্ণা রোগে আর্ত পুরুষের চিকিৎসা, জ্বরের চিকিৎসা, কৃমির চিকিৎসা, রাজযক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা, গণ্ডমালা ব্রুণের চিকিৎসা, এছাড়াও বিভিন্ন অসুখ ও তার চিকিৎসা সম্পর্কে গবেষণা করবেন ছাত্ররা।

স্বয়ং রাজযক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত একজন রোগী আশ্রমেই রয়েছেন। ছাত্ররা তাঁকে নিয়ে ও গবেষণা করতে পারবেন। ভাগীরথী আশ্রমে অথর্ববেদ পারদর্শী ও রোগ নিরাময়ে আগ্রহী একজন তরুণ আচার্যকে পেয়েছেন বেদব্যাস। তিনি গৌতম। তাঁকে তিনি দম্যকের মহাচার্য পদে বসাবেন। দম্যকের মহাচার্য সোমককে ভাগীরথী আশ্রমের প্রধান আচার্য করে নিয়ে আসবেন।

দম্যক তপোবনকে অধিগম্য করার জন্য বেদব্যাস যুধিষ্ঠিরকে বলে অরণ্যের সর্পিল পথটিকে প্রশস্ত করে তা রথ চলার উপযোগী করে দিয়েছেন। সন্নিহিত গ্রামগুলিতে আরও কয়েকটি পুষ্করিণী খনন করা হয়েছে। বেত্রবতী নদীটির সংস্কারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

মহর্ষির ভাগীরথী তীরবর্তী মূল আশ্রমটি এখন বৃহৎ আকার ধারণ করেছে। মহর্ষি একশত ছাত্র ধারণের উপযোগী একটি ছাত্রাবাস গড়ে তুলছেন। তার নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। এবার তিনি অপেক্ষা করছেন সোমককে মূল আশ্রমে নিয়ে এসে গৌতমের হাতে সব ভার তুলে দেবার জন্য।

সম্প্রসারিত বনপথ ধরে দুই অশ্বের একটি রথে করে মহর্ষি বেদব্যাস দম্যক আশ্রমে এসে পৌঁছলেন। তাঁর সঙ্গে এসেছেন আচার্য গৌতম তাঁকে পরামর্শ দেবার জন্য মূল আশ্রমে ডেকেছিলেন। তিনি প্রস্তুত হয়ে এসেছেন দম্যক আশ্রমের ভার নেবেন বলে। আচার্য সোমকও তৈরি মহর্ষির সঙ্গে ভাগীরথী আশ্রমে চলে যাবার জন্য। আশ্রমের যে এই পরিবর্তন হতে চলেছে তা সবাই অবগত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *