কৃষ্ণের ধৃতরাষ্ট্র সাক্ষাৎকার
ভগ্নউরু মুমূর্ষু দুর্যোধনকে দ্বৈপায়ন তীরে শায়িত রেখে পঞ্চপাণ্ডব ও শ্রীকৃষ্ণ শিবিরে ফিরে এসেছেন। দুর্যোধনের মৃত্যু নিশ্চিত। যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুতর আহত ও মৃতদের সেখানেই ফেলে আসা হয়। শৃগাল, কুকুর, বন্য জন্তুরা তাদের দেহ ছিড়ে ছিড়ে খায়। এই গ্রন্থের প্রথমে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রের যে বর্ণনা দিয়েছি সেখানে দেখিয়েছি রাশি রাশি মৃতদেহ শৃগাল গৃধিনিরা ভক্ষণ করছে। সুতরাং ভারতসম্রাট দুর্যোধনেরও এই পরিণতি হবে বলে সবাই ধরে নিয়েছেন। শিবিরে ফিরে শ্রীকৃষ্ণ দেখলেন যুধিষ্ঠির বিষণ্ণ, চিন্তাগ্রস্ত। দুর্যোধনের পতনের পর যুধিষ্ঠিরের জীবনে চরম আনন্দ নেমে আসা উচিত ছিল। আজ তিনি বিজয়ী। চতুর্দশ বর্ষ বনবাস ও এক বৎসরের অজ্ঞাতবাসে গ্লানি ভোগ করেছেন। সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে বারবার বেঁচে এসেছেন। যে রাজাধিরাজ রাজসূয় যজ্ঞ করে সসাগরা পৃথিবীর অধীশ্বর হয়েছিলেন সেই তিনি দৈব প্রভাবে কি দুঃখই না পেয়েছেন। কিন্তু এ দুঃখ তিনি একা বহন করলে দুঃখ অত দুঃসহ হত না। কিন্তু তাঁর মা ও ভাইদেরও এ দুঃখ-যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে। এ জন্য ভাইরা সবাই তাঁকে দায়ী করেছে। ভীম, অর্জুন, এমনকী দ্রৌপদীও তাঁকে বহু কটুবাক্য বলেছেন। তিনি নীরবে সহ্য করেছেন কারণ যুধিষ্ঠির যা করেছেন সত্য ও ধর্ম পালনের জন্যই করেছেন বলে তিনি মনে করেন।
দ্যূতক্রীড়ায় তিনি যোগ দিয়েছিলেন তা ‘রাজোচিত কর্ম’ বলেই। রাজা যে কেউ আনুষ্ঠানিক দ্যূতক্রীড়ায় আহ্বান করলে তা যুদ্ধে যোগদানের আহ্বানের মতোই। ক্ষত্রিয়ের তা পালন করতে হয়। এখন কারও যদি অসাধু উদ্দেশ্য থাকে তা তিনি কী করে জানবেন। তিনি তো কোনো অসাধুতা করেননি। তিনি একজন কুশল দ্যুতক্রীড়াবিদ বলে তাঁর অহঙ্কার আছে। সৎপথে তাঁকে হারানো কারও সাধ্য নয়। সততা মানুষকে মুক্ত মনের অধিকারি করে। সৎ মানুষদের মন জটিলতা মুক্ত হয়। সৎ মানুষ অন্যকেও সৎ ভাবে। সে সমদর্শী। সে কাউকে ঘৃণা করে না, অকারণে সন্দেহ করে না। সে সবাইকে বিশ্বাস করে। তিনি তাই সবাইকে বিশ্বাস করতেন। বিশ্বাস করে ঠকেছেন বলে আর কৌরবদের বারবার বিশ্বাস করেননি। শান্তির সমস্ত চেষ্টা করেছেন। রাজত্বের দাবি বিসর্জন দিয়ে পাঁচ ভাইয়ের জন্য পাঁচটি মাত্র গ্রাম চেয়েছিলেন কিন্তু দুর্যোধন বিনা যুদ্ধে সুচাগ্য মেদিনীও দিতে চাননি। তাই তাকে যুদ্ধ করতে বাধ্য হতে হয়েছে।
রাজধর্ম হল ন্যায়পরায়ণতা। সমদর্শিতা। শুধু পথঘাট জলাশয় নির্মাণ ও বিশাল সৈন্যবাহিনী গড়ে তুলে প্রতিরক্ষা সুদৃঢ় করা বা যুদ্ধজয় করা নয়, প্রজাদের বিনা আয়াসে সব কিছু পাইয়ে দেওয়াও নয়। রাজ্যে স্থায়ী শান্তি আনা। দস্যু-তস্করদের উপদ্রব থেকে নাগরিকদের প্রাণ-সম্পত্তি রক্ষা করা। নারীর সম্ভ্রম রক্ষা করা। সুপাত্রে দান করা। সাম দান দণ্ড ও ভেদ নীতি সুচারুভাবে প্রয়োগ করা। তিনি যখন ক্ষমতায় ছিলেন এই সব ধর্মই পালন করেছেন। কিন্তু দুর্যোধনের রাজ্য অপশাসন ও কুনীতিতে ভরা ছিল। রাজার অনুগ্রহভাজন শকুনির মতো লোকজন দুঃশাসনের মতো ভ্রাতা যে নাকি দুর্যোধনের মুখপাত্র ছিল সে রাজকুলে জন্মগ্রহণ করলেও একজন সমাজবিরোধী। দুর্যোধনের হয়ে বকলমে রাজ্য চালাত হস্তিনাপুরের মাতুল শকুনি এবং রাজভ্রাতা দুঃশাসন। লোকে বলত মামা-ভাগ্নের রাজত্ব। এই দুঃশাসনের অবসান ঘটেছে। এ জন্য কয়েকটি ক্ষেত্রে নিয়ম বহির্ভূত কাজ করতে হয়েছে।
কিন্তু প্রেম ও যুদ্ধে কোনো নীতি খাটে না। তাছাড়া স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের সব নীতিই অনুমোদন করেছেন। তিনি নিজে কোনো অনিয়ম করেননি। ‘অশ্বত্থামা হত’ এই কথাটা উচ্চারণ করেছিলেন তাতে মিথ্যা ছিল না। অশ্বত্থামা নামে একটি হস্তী তো হতই হয়েছিল। শ্রীকৃষ্ণ তো অর্জুনকে বলেছেন স্বধর্ম পালনই তোমার কর্ম। আর কর্মেই তোমার অধিকার। কর্ম করে যাও। পরিণতি নিয়ে কিছু ভেবো না। আত্মীয়স্বজনকে হত্যা করতে হচ্ছে বলে দুঃখ কোরো না। কারণ জন্ম হলেই মৃত্যু অনিবার্য। প্রতিটি মানুষই মরণশীল। যুদ্ধ করে মৃত্যু হলে অক্ষয় স্বর্গ। এই অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সৈন্য সবাই নিহত হয়ে স্বর্গে গেছে।
কৃষ্ণ ও যুধিষ্ঠির একই রথে কুরুক্ষেত্রে ফিরছিলেন। যুধিষ্ঠিরকে চিন্তিত দেখে কৃষ্ণ জিজ্ঞাসা করলেন, মহারাজ, আপনি এত চিন্তিত কেন? আপনার পঞ্চদশ বর্ষের জীবন সংগ্রামের আজ অবসান। শেষ কৌরবও পরাজিত এবং মৃত্যুশয্যায় শায়িত। কিন্তু আপনাকে দেখে প্রফুল্ল মনে হচ্ছে না। এদিকে নগরবাসী আপনার জয় উদযাপন শুরু করে দিয়েছে। সর্বত্র ধ্বনি উঠছে পাণ্ডবদের জয়। জয় ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির।
যুধিষ্ঠির বললেন, হে বাসুদেব, এই জয় আপনারই। আপনি না থাকলে মাত্র সাত অক্ষৌহিণী সৈন্য নিয়ে একাদশ অক্ষৌহিণীর সঙ্গে যুদ্ধে জয়লাভ সম্ভব ছিল না।
কৃষ্ণ বললেন, প্রাকৃতিক বিচার বলে একটি বিচারই সবচেয়ে বড় বিচার। প্রকৃতি তার নিজের নিয়মে চলে। ঠিক সময় মতো সূর্য-চন্দ্ৰ ওঠে, অস্ত যায়। ঋতুচক্র আবর্তিত হয়। তেমনি ধর্মের জয় হবে। অধর্মের জয় সাময়িক। অন্যায়কারীরা বাহুবলে সাময়িক জয়লাভ করতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধর্মই জেতে। আপনি বিন্দুমাত্র দুঃখ করবেন না মহারাজ। আনন্দ করুন। প্রজারা আপনার প্রতীক্ষায় রয়েছে। আপনি আবার তাদের পালন করুন। এই পৃথিবী এখন আপনার। আপনি গো-ব্রাহ্মণ প্রতিপালক হয়ে মহাসুখে আবার রাজত্ব করুন।
যুধিষ্ঠির বললেন, বাসুদেব, আমার মাথায় এখন একটিই চিন্তা। ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর সামনে আমি কেমন করে দাঁড়াবো? বিশেষ করে গান্ধারীর অভিশাপকে আমি বড় ভয় পাচ্ছি। সেই শত পুত্রহারা জননী আমাদের তো ক্ষমা করবেন না। গান্ধারীকে আমি যতটুকু জানি, তিনি ক্রুদ্ধ হলে ত্রিলোক দগ্ধ করে দিতে পারেন। হে কেশব, তুমি আমাদের জন্য কত কঠোর অস্ত্রের আঘাত সহ্য করেছ। আজ দুর্যোধন নিহত হওয়ায় তোমার সেই আঘাত সহ্য করা সার্থক হল। এখন এই জয়লাভের ফলে আমার মধ্যে সংশয় দেখা দিচ্ছে যে গান্ধারী এখন তপস্যা করে করে ক্ষীণ কলেবর হয়েছেন, এখন পুত্র-পৌত্রদের বধের সংবাদ পেয়ে আমাদের যে ভস্ম করে দেবেন তাতে সন্দেহ নেই। আমার মতে তাঁকে প্রসন্ন করাই শ্রেয়। তুমি ছাড়া আর কেউ গান্ধারীকে শান্ত করতে পারবে না। অতএব তুমি আর বিলম্ব না করে তাঁর কাছে গমন করো। দুর্যোধনের নিধন সংবাদও তাঁকে দাও। যুক্তি দিয়ে একমাত্র তুমিই গান্ধারীকে বোঝাতে সমর্থ হবে। হে কৃষ্ণ, তুমি আমাদের সর্বদাই হিত করে থাকো, অতএব গান্ধার দুহিতার ক্রোধ শান্ত করা তোমার অবশ্য কর্তব্য।
কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরের কথা শুনে সারথিকে বললেন, রথ থামাও।
শ্রীকৃষ্ণের রথ পথের মধ্যে থেমে যেতেই নিছনে রথের সারি থেমে গেল। কৃষ্ণ বললেন, আমি আমার রথে এখনই হস্তিনাপুর রওয়ানা হয়ে যাচ্ছি। এই বলে যুধিষ্ঠিরের রথ থেকে তিনি অবতরণ করলেন। তার পরেই শ্রীকৃষ্ণের নিজস্ব খালি রথ তাঁর সারথি চালিয়ে আনছিল। শ্রীকৃষ্ণ তাঁর রথে উঠে সারথিকে বললেন, হস্তিনাপুর চলো। যুধিষ্ঠিরকে বললেন, কাল দেখা হবে।
.
ধৃতরাষ্ট্র-গান্ধারী সকাশে কৃষ্ণ
কৃষ্ণের রথ যখন হস্তিনাপুরের মহাতোরণ পেরিয়ে নগরীর ভেতর প্রবেশ করল তখন অপরাহ্ণ শেষ হতে চলেছে। তবে এখনও রাজপথে আলো জ্বালা হয়নি। রাজপথ শুনশান। বড় বড় বিপণিগুলি বন্ধ। দু’পাশের গৃহগুলি স্তব্ধ। রাজপথের মোড়ে মোড়ে প্রহরীরা প্রহরারত। শ্রীকৃষ্ণের রাজকীয় পতাকা শোভিত দুই অশ্বের রথ দেখে তারা উষ্ণীষে হাত ঠেকিয়ে কৃষ্ণকে অভিবাদন জানাল।
কিছুক্ষণ পরে প্রাসাদের তোরণ দ্বারা এসে কৃষ্ণের রথ থামল। সারথি বলল, শ্রীকৃষ্ণ বাসুদেব এসেছেন, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর সঙ্গে দেখা করবেন।
এই বিশাল প্রাসাদ এতদিন গমগম করত। শতপুত্র, তাদের কয়েকশত পুত্রবধূ। রাজকন্যা দুঃশলার তখনও বিবাহ হয়নি। ধৃতরাষ্ট্রেরও একাধিক পত্নী ছিল। এক পত্নীর পুত্র যুযুৎসু। এছাড়া সহস্রাধিক দাস-দাসী, প্রতিহারিতে পরিপূর্ণ। পাণ্ডবদের প্রাসাদ, ভীষ্মের প্রাসাদ, বিদুরের গৃহ সমস্তই কাছাকাছি। কর্ণ প্রায় প্রতিদিনই এই প্রাসাদে আসতেন। যুধিষ্ঠির পিতৃব্যকে খুবই মান্য করতেন। গান্ধারীও পঞ্চপাণ্ডবদের স্নেহ করতেন। শুধু দুর্যোধন ও দুঃশাসনের ঈর্ষাই তাঁদের সংসারে অগ্নিকাণ্ড ঘটাল। এই পরিবারে আত্মীয় এবং একজন হিতৈষী হিসাবে শ্রীকৃষ্ণ সারাজীবন ধরে চেষ্টা করে এসেছেন তাদের বিরোধ মিটিয়ে সুখে-শান্তিতে দিনগুলি অতিবাহিত করতে।
সঙ্গে সঙ্গে পাঁচজন অশ্বারোহী সৈন্য এসে শ্রীকৃষ্ণকে অভিবাদন করে বলল, আসুন মহারাজ।
তাঁরা পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল। ধৃতরাষ্ট্র অলিন্দে বসে ছিলেন। রথের ঘর্ঘর ধ্বনি শুনে বুঝতে পারলেন বাসুদেবের রথ। কিছুক্ষণ পরে প্রতিহারী এসে খবর দিল শ্রীকৃষ্ণ বাসুদেব এসেছেন।
শ্রীকৃষ্ণের কাছে এই প্রাসাদ অতি পরিচিত। বহুবার তিনি এসেছেন। প্রতিহারী তাঁকে মহারাজের বিশাল, শয়নকক্ষে বসালেন। সেখানে কয়েকটি আরামপ্রদ আসন পাতা। কক্ষটিতে কয়েকটি বড় বড় গবাক্ষ রয়েছে। তার ভেতর দিয়ে সূর্যাস্তের রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছে।
কৃষ্ণ দেখেছিলেন, ভারতবর্ষের এখন খুব দুর্দিন। বিভিন্ন রাজা স্বেচ্ছাচারে মত্ত। কারও সঙ্গে কারও সম্প্রীতি নেই। অথচ চতুর্বেদের মতো মহান আধ্যাত্মিক দর্শনের প্রবর্তন করে গেছেন এদেশের ঋষিরা। রামায়ণের মতো অমর মহাকাব্য রচিত হয়েছে। কিন্তু এদেশের মহান আধ্যাত্মিকতার মর্মবাণী কেউ বুঝল না। সবাই স্বার্থমগ্ন। বিমুখ মহাভারতের উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে। তিনি তাই চেষ্টা করে যাচ্ছেন ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য। যুধিষ্ঠিরের মতো একজন মানুষকে পেয়েছেন। যিনি সত্যনিষ্ঠ, দুর্নীতিমুক্ত, লোভ বিবর্জিত। তাঁকে দিয়ে তিনি মহাভারত গড়ে তোলার স্বপ্ন সার্থক করে তুলবেন। তাঁর সেই স্বপ্ন সার্থক হয়েছে। ভারতবর্ষ আজ নিষ্কণ্টক। তিনি সাধুদের পরিত্রাণের জন্য, দুষ্কৃতীদের বিনাশের মহান কর্তব্য হাতে তুলে নিয়েছেন।
এখন শুধু গান্ধারী ও ধৃতরাষ্ট্রের কোপ সংহত করতে হবে। অপ্রিয় কাজ। আর বৃহত্তর স্বার্থে সমস্ত অপ্রিয় কাজই তিনি করেছেন। এই যে নিজের রাজ্যপাট ছেড়ে দিনের পর দিন তিনি যে কুরুক্ষেত্রে পড়ে রয়েছেন, এতবড় একটি যুদ্ধে তিনি নিজে অস্ত্রাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন, তা কীসের জন্য? শুধু একটি আদর্শ প্রজাহিতকর মঙ্গলদায়ক ঐক্যবদ্ধ মহাভারত তৈরির জন্য। বিবিধের মাঝে মহামিলনের সেতুবন্ধ তৈরির জন্য।
.
পরপর দুটি সিংহাসনে বিশাল শয়নকক্ষে এক প্রান্তে বসেছিলেন ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারী। অসংখ্য দীপালোকে উজ্জ্বল সেই কক্ষ, পদশব্দ শুনে ধৃতরাষ্ট্র বললেন, কে? বাসুদেব? উপবেশন করো। এখন কোথা থেকে আসছ?
—কুরুক্ষেত্র থেকে।
—আমি বার্তাবহ মারফত সংবাদ পেয়েছি, পুত্র দুর্যোধনকে ভীম গুরুতর আহত করেছে। সে কি জীবিত?
কৃষ্ণ উপবেশন করে বললেন, জীবিত মহারাজ। তবে তাঁর অবস্থা খুব খারাপ। আঘাত গুরুতর। জীবনের আশা কম।
—তাকে অন্যায়ভাবে উরুভঙ্গ করেছে ভীম। এই তাহলে তোমাদের ধর্ম। ধৃতরাষ্ট্র ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন।
কৃষ্ণ বললেন, কালের গতি আপনি অবগত আছেন মহারাজ। তার গতি অতি কুটিল যে যেমন কর্ম করে কাল তাকে সেই অনুসারে ফল দেয়। পাণ্ডবগণ কুলক্ষয় রোধের জন্য অতিশয় চেষ্টা করে গেছেন। কিন্তু কৃতকার্য হতে পারেনি। আমার কি কম দুঃখ মহারাজ। আমি কী কম অসুখী? আমারও সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে মহারাজ। এই তথাকথিত জয় কি আমার জীবনেরও কম ব্যর্থতা?
বলতে বলতে কৃষ্ণ অশ্রু সম্বরণ করতে পারলেন না। শিশুর মতো কাঁদতে কাঁদতে গিয়ে ধৃতরাষ্ট্রের শীর্ণ হাতদুটি ধরলেন। ধৃতরাষ্ট্রও কাঁদতে লাগলেন। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে কৃষ্ণ বললেন, আমি পাণ্ডবদের জন্য মাত্র পাঁচখানি গ্রাম চেয়েছিলাম মহারাজ। কিন্তু আপনিও সেসময় নিয়তির নির্বন্ধে আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সম্মত হননি। আপনি জ্ঞানবান হয়েও মোহে আচ্ছন্ন হয়েছিলেন। লোভের বশে তাতে সন্মত হননি। আপনার অপরাধেই আজ ক্ষত্রিয়কুল নির্মূল হয়েছে।
মহাবীর ভীষ্ম, সোমদত্ত, বহ্লীক, কৃপ, দ্রোণ, অশ্বত্থামা ও ধীমান বিদুর সন্ধি স্থাপনের জন্য আপনাকে বারবার অনুরোধ করেছিল। আপনি সম্মত হননি।
হায়, কাল ও অদৃষ্ট সবচেয়ে বলবান। মহারাজ, আপনি পাণ্ডবদের প্রতি দোষ দেবেন না। এ ব্যাপারে ধর্মত-ন্যায়ত তাঁদের কোনো দোষ নেই। এই কুলক্ষয় আপনার দোষেই উৎপন্ন হয়েছে। এটি বিবেচনা করে আপনি পাণ্ডবদের প্রতি অসূয়াশূন্য হোন। এখন আপনার কুলরক্ষা, পিণ্ডদান, পুত্রকর্তব্য, সমস্ত কিছুই পাণ্ডবদের ওপর নির্ভর করছে। অতএব আপনি পাণ্ডবদের ওপর রোষ না করে নিরাপদে তাঁদের প্রতিপালন করুন। আপনি ও আর্যা গান্ধারী শোকাবেগ সম্বরণ করুন। আপনার প্রতি ধর্মরাজের স্বভাবত যেমন স্নেহ ও ভক্তি আছে তা আপনার অনবদিত নয়। তিনি এখন সমগ্র শত্রু বিনাশ করে দুঃখানলে দিবারাত্র দগ্ধ হচ্ছেন। আপনি ও গান্ধারীর জন্য তিনি অনবরত শোক করছেন। তার মনে সুখের লেশমাত্র নেই। আপনি পুত্রশোকে ব্যাকুল বলে তিনি আপনার সামনে এসে দাঁড়াতে লজ্জা পাচ্ছেন।
কৃষ্ণ এবার গান্ধারীর উদ্দেশে বললেন, ইহলোকে আপনার তুল্য নারী আর আমার চোখে পড়েনি। আপনি আমার সামনেই আপনার ছেলেদের ধর্মসম্মত উপদেশ দিয়েছিলেন কিন্তু আপনার পুত্ররা কেউ তাকে কর্ণপাত করেনি। আপনি দুর্যোধনকে বলেছিলেন যেখানে ধর্ম সেখানে জয়। এখন আপনার সেই বাক্য ফলেছে। আপনি কখনও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেননি। দুর্বৃত্তকে বীরের সম্মান দেননি। যেখানে ধর্ম সেখানেই জয় চেয়েছেন। আপনার কথাই ফলেছে। ধর্মের জয় হয়েছে।
কৃষ্ণ আবার গান্ধারীর উদ্দেশে বলতে লাগলেন, আপনি সব কিছু চিন্তা করে শোক পরিত্যাগ করুন। হে মহাভাগে, আপনি মনে করলে তপোবলে আপনার ক্রোধানল দিয়ে এই বিশ্বচরাচর ধ্বংস করতে পারেন। কিন্তু অনুগ্রহ করে পাণ্ডবদের বিনাশ সাধন করবেন না।
গান্ধারী চুপ করে সব শুনলেন। কৃষ্ণ তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখলেন সেই রূপবতী, দীর্ঘযৌবনা, সেই নারী আর নেই। এখন তিনি কৃশ থেকে কৃশতমা। মাথার সমস্ত কেশ সাদা হয়ে গেছে। বয়স, ক্লান্তি আর শোকের ছাপ সর্বাঙ্গে। এখনও তিনি দুই চক্ষু বেঁধে রাখেন। পৃথিবীর আলো তাঁর চোখে প্রবেশ করে না। কিন্তু যখন কথা বললেন, তখন মনে হল সেই ভারত মহিষী, শতপুত্রের জননী, জাহ্নবীর মতো পুণ্যসলিলা-সতেজা সেই নারীটিই আছেন।
গান্ধারী বললেন, হে কেশব, তোমার কথা শুনে আমি শান্তভাব অবলম্বন করলাম। দারুণ শোকাবেগে আমার মন বিচলিত হয়েছিল। রাজা একে অন্ধ। তার ওপর সবকটি পুত্রকে যুদ্ধে হারালেন। তুমিও পাণ্ডবদের দিকে চলে গেলে। আজ আমাদের কেউ নেই। এই বলে গান্ধারী তাঁর বাকি কথা আর শেষ করতে পারলেন না। কান্নায় তাঁর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো।
কৃষ্ণ অত্যন্ত বিব্রত হয়ে গান্ধারীকে অনেক উপদেশ দিলেন। ধৃতরাষ্ট্র বললেন, বাসুদেব, তুমি পথশ্রমে ক্লান্ত। এই গৃহ তোমারই। আজ যদিও এই রাজপুরী শ্মশানভূমিতে পরিণত। তুমি আজ রাতে বিশ্রাম করো। কাল প্রভাতে যাত্রা করবে।
কৃষ্ণ যখন কথা বলছিলেন তখন রাত্রি হয়ে গেছে। হঠাৎ তিনি মনশ্চক্ষে দেখতে পেলেন পাণ্ডবদের অজানা বিপদ ঘনিয়ে আসছে। তার মনশ্চক্ষে ভেসে উঠল এক দীর্ঘদেহী ব্রাহ্মণের ক্রূর মূর্তি, হাতে তার উদ্যত খঙ্গ
বিচলিত কেশব সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, মহারাজ, আপনি শোক করবেন না। আমি পাণ্ডবদের সমূহ বিপদের পূর্বাভাস পাচ্ছি। আমাকে এখনই কুরুক্ষেত্র রওয়ানা হতে হবে। আপনি কাউকে বলুন আমার সারথিকে রথ নিয়ে আসতে বলতে।
ধৃতরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, হে কেশব, তুমি এখনই তাহলে চলে যাও। পাণ্ডবদের রক্ষা করো। আবার তাড়াতাড়ি এসো কিন্তু। এখন তুমি ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই। শ্রীকৃষ্ণ গিয়ে বৃদ্ধ মহারাজকে আলিঙ্গন করলেন। তার একটু পরে কৃষ্ণের রথ আবার কুরুক্ষেত্রের দিকে রওয়ানা হয়ে গেল। তখন অনেক রাত।
কৃষ্ণ উদ্বিগ্ন হলেন, কিন্তু বিচলিত হলেন না। জীবনে প্রথম বিচলিত হয়েছিলেন যেদিন তিনি কৌরব সভায় দ্রৌপদীর লাঞ্ছনার দৃশ্য মনশ্চক্ষে দেখতে পেয়েছিলেন। এটি কিন্তু কখনও তাঁর ভাবনার মধ্যে ছিল না। সেসময় তিনি হস্তিনাপুরে ছিলেন না। হঠাৎ দ্রৌপদীর কাতর আর্তনাদ তাঁর কানে ভেসে এলো। সেই সঙ্গে করুণ প্রার্থনা। এক অসহায়া মানহারা মানবীর বস্ত্র হরণ করে তাকে নগ্ন করার চেষ্টা হচ্ছে সভা মধ্যে। যে অর্জুন দ্রৌপদীকে দুর্লভ অস্ত্রপরীক্ষা জিতে লাভ করেছিলেন, সেই অর্জুন নত মুখে। পঞ্চপাণ্ডব থেকে ভীষ্ম, দ্রোণ, সবাই অধোবদন। অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্রও সেদিন নির্বাক। শুধু প্রতিবাদ করছেন বৃকোদর আর গান্ধারীর শতপুত্রের একজন বিকর্ণ। এমন দৃশ্য তিনি কল্পনাতেও কোনোদিন আনতে পারেননি। তাঁর মনে হয়েছিল যদি আকাশপথে তখনই উড়ে দ্যূতসভায় গিয়ে পৌঁছে সুদর্শনচক্র দিয়ে একে একে সবাইকে নিধন করে দ্রৌপদীকে উদ্ধার করেন। কিন্তু তাঁর পক্ষে তা সম্ভব নয়। তাই তিনি সেই মুহূর্তে যতটুকু করণীয় করেছিলেন। মায়াশক্তি প্রয়োগ করে দ্রৌপদীকে শাড়ির পর শাড়ি সরবরাহ করেছিলেন যাতে দুরাত্মা দুঃশাসন শাড়ি টেনে শেষ না করতে পারে। স্তূপাকৃতি শাড়ি টানতে টানতে দুঃশাসন ক্লান্ত হয়ে রণে ক্ষান্ত দিয়েছিল।
রথ মহাসড়কে এসে পড়েছে। কৃষ্ণের মন অদ্ভুতভাবে আন্দোলিত হতে শুরু করেছে। তিনি দিব্যচক্ষে দেখছেন অশ্বত্থামা হাতে উন্মুক্ত খঙ্গ নিয়ে পাণ্ডব শিবিরে ঢুকে পড়েছে। এমন সময় সারথি অশ্ব থামিয়ে দিল। উদ্বিগ্ন শ্রীকৃষ্ণ বললেন, কী হল?
সারথি নেমে বললেন, মনে হচ্ছে একটি রথচক্র কোনোক্রমে আলগা হয়ে গেছে। আমি একটু দেখে নিচ্ছি মহারাজ। আপনি নিশ্চিন্তে বলুন।
যদিও আকাশে ত্রয়োদশীর চাঁদের মৃদু জ্যোৎস্না। তবু রথচক্র দেখার পর তা যথেষ্ট নয়। সারথি একটি ছোট মশাল জ্বালল। কৃষ্ণ রথ থেকে নেমে বললেন, আমি আলো ধরছি, তুমি দ্রুত কাজ করো। আমাকে যত দ্রুত সম্ভব পৌঁছতেই হবে।
কৃষ্ণ মনে মনে দেবাদিদেব মহাদেবকে স্মরণ করে বললেন, হে প্রভু, তুমিই সংহারের দেবতা। তুমি পাণ্ডবদের রক্ষা করো।
কিছুক্ষণ পরে রথচক্র আবার ঠিক করে রথ চলল। কিন্তু রাতের প্রায়ান্ধকার অশ্বের গতি তোলা বেশ কঠিন। তবু তারা যতখানি দ্রুতগতিতে ছোটা সম্ভব ছুটতে লাগল।
রাত্রি প্রায় শেষ হতে চলেছে। দু’পাশে গ্রামগুলি নিঝুম। বনপথ জুড়ে এক গভীর নিস্তব্ধতা। শুধু ক্ষীণ জ্যোৎস্নালোকে পটচিত্রের মতো দু’পাশের বৃক্ষগুলি নিথর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অশ্ব খুরের শব্দগুলিকেই যেন অস্ত্রের ঝনঝন শব্দ বলে মনে হচ্ছে। একটা অশুভ চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে কৃষ্ণের মন।
