প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পর্ব : সত্যমেব জয়তে

দ্বৈপায়নে দুর্যোধন

দ্বৈপায়নে দুর্যোধন

দ্বৈপায়ন হ্রদের ভিতর লুকিয়ে ছিলেন দুর্যোধন। যুদ্ধ করতে করতে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে তাকিয়ে তিনি যখন দেখলেন একাদশ অক্ষৌহিণী সৈন্যের কেউই তাঁর পাশে নেই, মাতুল শকুনি ও তার পুত্র উলুকের মৃত্যুসংবাদ তিনি পেয়েছিলেন। কিন্তু কোথায় কৃপাচার্য ও কৃতবর্মা ও অশ্বত্থামা? তাদের কাউকেই তো দেখতে পাচ্ছেন না। মহারাজ দুর্যোধন এই যুদ্ধ জয় সম্পর্কে নিশ্চিন্ত ছিলেন। সারা ভারত থেকে আসা একাদশ অক্ষৌহিণী সেনা নিয়ে এসেছিলেন তার অনুগত রাজন্যবর্গ। ভীষ্ম, কর্ণ, দ্রোণ ও শল্যের মতো রথী তাঁর পক্ষে। তাঁর দলই সংখ্যাধিক্য। ভারতবর্ষের অধিকাংশ রাজা মহারাজা তার পক্ষে। তার রথীরা সবাই আশ্চর্য অস্ত্রে বলী। কিন্তু ভীষ্ম পতনের আগে পর্যন্ত কৌরবেরাই জিতছিল কিন্তু ভীষ্ম পতনের সময় থেকে কৌরবদের দুঃসময় শুরু হল। কিন্তু তাই বলে সত্যিই ভাবা যায়নি আঠারো দিনের মধ্যে এই পরাজয় নেমে আসবে।

দ্বিপ্রহরে গনগনে সূর্যের তাপে বিদ্ধ হয়ে দুর্যোধন শুনলেন একটি কোলাহল এগিয়ে আসছে। ভীমসেনের সিংহনাদ। দেখলেন পঞ্চপাণ্ডবেরা এগিয়ে আসছে তার দিকে, সঙ্গে বিশাল সৈন্যবাহিনী। দুর্যোধন শেষবারের মতো হাঁক দিলেন, অশ্বত্থামা, কৃতবর্মা, কৃপাচার্য তোমরা কোথায়? আমার দেহরক্ষীরা কোথায়? যদি একজনও জীবিত থাকো, তাহলে আমার কাছে চলে এসো। যুদ্ধ করে আমরা একসঙ্গে স্বর্গে যাই। কে আছ? কিন্তু পাণ্ডবদের সিংহনাদের কাছে তার কণ্ঠস্বর হারিয়ে গেল।

দুর্যোধন দেখলেন, তিনি একা। আর এক মুহূর্ত দেরি করলে পাণ্ডবেরা তাঁকে বন্দি করবে। বন্দিত্ব তিনি কোনোদিনও মেনে নেবেন না। তিনি ভারত সম্রাট। কারও কাছে মাথা নত করবেন না। তিনি আবার সময়ের কাছে আত্মসমর্পণ করবেন।

দুর্যোধন আর কাল বিলম্ব না করে একটি দ্রুতগামী ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিষ্ক্রান্ত হলেন। কিন্তু তাঁর পিছনে এগিয়ে আসছে পাণ্ডবদের এক বিশাল অশ্বারোহী বাহিনী। তিনি সামনে একটি হ্রদ দেখে আত্মরক্ষার জন্য সেখানে ঝাঁপ দিলেন।

.

প্রতিবেদক সঞ্জয়

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ সংবাদী সঞ্জয় প্রতিদিন একটি সুউচ্চ স্তম্ভ থেকে যুদ্ধ পরিদর্শন করতেন। আর সন্ধ্যায় ফিরে ধৃতরাষ্ট্রের কাছে একটি সারাদিনের প্রতিবেদন পেশ করতেন।

যুদ্ধ থেমে গেছে আর প্রতিবেদন লেখার কিছু নেই। তিনি দুর্যোধনকে পালাতে দেখে সে স্তম্ভ থেকে নেমে রথে চেপে হস্তিনাপুর প্রাসাদ অভিমুখে রওয়ানা দিচ্ছিলেন। রথে ওঠার সময় তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল সাত্যকির। সাত্যকি কৃষ্ণের সেনা। এখন পাণ্ডব সেনার একজন। সাত্যকি জানতেন সঞ্জয় এই যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ করে ধৃতরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দেন।

সাত্যকিকে দেখে একটু আশঙ্কিত হলেন সঞ্জয়। সাত্যকি কৃষ্ণের সৈন্যাধ্যক্ষ হলেও পাণ্ডবপক্ষের একজন সেনপতি। তিনি যাদববংশীয়।

সাত্যকি তাকে বললেন, আর্য, আপনি কোথায় চললেন?

সঞ্জয় জবাব দিলেন, যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল। আমি আর এই শূন্যক্ষেত্রে থেকে কী করব। আমি প্রাসাদে ফিরে যাচ্ছি। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রকে এখন যুদ্ধ শেষের প্রতিবেদনটি দিয়ে তবে আমার ছুটি। আপনিও নিশ্চয়ই দ্বারকায় ফিরে যাবেন।

—হ্যাঁ। তাই তো মনস্থ করেছি। তবে বাসুদেবের আজ্ঞার ওপর সব কিছু নির্ভর করছে।

সঞ্জয় বললেন, আমি যতদূর জানি এই যুদ্ধে দুর্যোধন ছাড়া কৌরবদের আর কেউ বেঁচে নেই।

সাত্যকি বললেন, আমরা কিন্তু অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য ও কৃতবর্মার মৃত্যুর কোনো খবর পাইনি। তাদের মৃত্যু হলে অন্তত জানতে পারতাম।

সঞ্জয় বললেন, আমি গতকাল তিনজনকেই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে চলে যেতে দেখেছি। তবে অশ্বত্থামা তার আগে গুরুতর আহত হয়ে শুশ্রূষা শিবিরে ভর্তি হয়েছিলেন। আপনারা কি কৌরবদের শুশ্রূষা শিবিরগুলি অনুসন্ধান করেছেন?

—না। এই তো সবে যুদ্ধ শেষ হল। নিয়ম অনুসারে শত্রুদের যাদেরই পাওয়া যাবে বন্দি করা হবে। শুশ্রূষা শিবিরে ভর্তি হয়েও কেউ পার পাবে না।

সঞ্জয় বললেন, এই যে হাজার হাজার মৃতদেহের স্তূপের ওপর আমরা দাঁড়িয়ে আছি, নিহত এই বীর যোদ্ধাদের কী যথারীতি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করা হবে, না এরা এমনভাবেই গৃধিনীদের খাদ্যে পরিণত হবে?

সাত্যকি বলল, সে দায়িত্ব তো আমার নয়। ধর্মরাজ নিশ্চয়ই তার যথাযথ ব্যবস্থা রেখেছেন। তবে আমি একজন যোদ্ধা, আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি। সন্ধ্যা হলে প্রতিদিন মৃতের আত্মীয়স্বজনরা এসে দেহ শনাক্ত করে নিয়ে চলে যায়। তবে এই যে সব দেহ ইতস্তত পড়ে থাকতে দেখছেন তা বেশিরভাগই বিভিন্ন রাজ্য থেকে আগত রাজা ও রাজসৈন্যদের। এদের মৃতদেহ শনাক্ত করার কেউ নেই। এমন অজস্র মৃতদেহ পাণ্ডবদেরও পাবেন। একবার ভাবুন না, আমরা নিয়মিত ক্ষয়-ক্ষতির গণনা করি পাণ্ডবপক্ষের সাত অক্ষৌহিণী সৈন্য ছিল। গতকাল রাত পর্যন্ত আমরা গণনা করে দেখেছি আমাদের আর মাত্র দু’ হাজার রথী সাতশত গজারোহী, সাত হাজার অশ্বারোহী জীবিত আছেন। কৃপ, অশ্বত্থামা ও কৃতবর্মা যদি জীবিত না থাকেন তাহলে এখন একজনমাত্র কৌরব জীবিত আছেন। তিনি রাজা দুর্যোধন। তবে আমি নিশ্চিত বৃকোদর যেভাবে ক্রুদ্ধ হয়ে আছেন, তিনি তাঁকে শীঘ্র ধরে ফেলে তাকে বিনাশ করবেন। তখন শত ভ্রাতাদের আর কেউ জীবিত থাকবে না।

যুদ্ধ থেমে গেছে আর প্রতিবেদন লেখার কিছু নেই। তিনি দুর্যোধনকে পালাতে দেখে সে স্তম্ভ থেকে নেমে রথে চেপে হস্তিনাপুর প্রাসাদ অভিমুখে রওয়ানা দিচ্ছিলেন। রথে ওঠার সময় তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল সাত্যকির। সাত্যকি কৃষ্ণের সেনা। এখন পাণ্ডব সেনার একজন। সাত্যকি জানতেন সঞ্জয় এই যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ করে ধৃতরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দেন।

সাত্যকিকে দেখে একটু আশঙ্কিত হলেন সঞ্জয়। সাত্যকি কৃষ্ণের সৈন্যাধ্যক্ষ হলেও পাণ্ডবপক্ষের একজন সেনপতি। তিনি যাদববংশীয়।

সাত্যকি তাকে বললেন, আর্য, আপনি কোথায় চললেন?

সঞ্জয় জবাব দিলেন, যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল। আমি আর এই শূন্যক্ষেত্রে থেকে কী করব। আমি প্রাসাদে ফিরে যাচ্ছি। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রকে এখন যুদ্ধ শেষের প্রতিবেদনটি দিয়ে তবে আমার ছুটি। আপনিও নিশ্চয়ই দ্বারকায় ফিরে যাবেন।

—হ্যাঁ। তাই তো মনস্থ করেছি। তবে বাসুদেবের আজ্ঞার ওপর সব কিছু নির্ভর করছে। সঞ্জয় বললেন, আমি যতদূর জানি এই যুদ্ধে দুর্যোধন ছাড়া কৌরবদের আর কেউ বেঁচে নেই।

সাত্যকি বললেন, আমরা কিন্তু অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য ও কৃতবর্মার মৃত্যুর কোনো খবর পাইনি। তাদের মৃত্যু হলে অন্তত জানতে পারতাম।

সঞ্জয় বললেন, আমি গতকাল তিনজনকেই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে চলে যেতে দেখেছি। তবে অশ্বত্থামা তার আগে গুরুতর আহত হয়ে শুশ্রূষা শিবিরে ভর্তি হয়েছিলেন। আপনারা কি কৌরবদের শুশ্রূষা শিবিরগুলি অনুসন্ধান করেছেন?

—না। এই তো সবে যুদ্ধ শেষ হল। নিয়ম অনুসারে শত্রুদের যাদেরই পাওয়া যাবে বন্দি করা হবে। শুশ্রূষা শিবিরে ভর্তি হয়েও কেউ পার পাবে না।

সঞ্জয় বললেন, এই যে হাজার হাজার মৃতদেহের স্তূপের ওপর আমরা দাঁড়িয়ে আছি, নিহত এই বীর যোদ্ধাদের কী যথারীতি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করা হবে, না এরা এমনভাবেই গৃধিনীদের খাদ্যে পরিণত হবে?

সাত্যকি বলল, সে দায়িত্ব তো আমার নয়। ধর্মরাজ নিশ্চয়ই তার যথাযথ ব্যবস্থা রেখেছেন। তবে আমি একজন বোদ্ধা, আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি। সন্ধ্যা হলে প্রতিদিন মৃতের আত্মীয়স্বজনরা এসে দেহ শনাক্ত করে নিয়ে চলে যায়। তবে এই যে সব দেহ ইতস্তত পড়ে থাকতে দেখছেন তা বেশিরভাগই বিভিন্ন রাজ্য থেকে আগত রাজা ও রাজসৈন্যদের। এদের মৃতদেহ শনাক্ত করার কেউ নেই। এমন অজস্র মৃতদেহ পাণ্ডবদেরও পাবেন। একবার ভাবুন না, আমরা নিয়মিত ক্ষয়-ক্ষতির গণনা করি। পাণ্ডবপক্ষের সাত অক্ষৌহিণী সৈন্য ছিল। গতকাল রাত পর্যন্ত আমরা গণনা করে দেখেছি আমাদের আর মাত্র দু’ হাজার রথী সাতশত গজারোহী, সাত হাজার অশ্বারোহী জীবিত আছেন। কৃপ, অশ্বত্থামা ও কৃতবর্মা যদি জীবিত না থাকেন তাহলে এখন একজনমাত্র কৌরব জীবিত আছেন। তিনি রাজা দুর্যোধন। তবে আমি নিশ্চিত বৃকোদর যেভাবে ক্রুদ্ধ হয়ে আছেন, তিনি তাঁকে শীঘ্র ধরে ফেলে তাকে বিনাশ করবেন। তখন শত ভ্রাতাদের আর কেউ জীবিত থাকবে না।

সঞ্জয় বললেন, আপনি ঠিক বললেন না। দুর্যোধনের এক ভ্রাতা যুযুৎসু পাণ্ডবপক্ষে যোগ দিয়েছেন। তিনি পাণ্ডবদের হয়েই এই ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে লড়েছেন। আমার ধারণা সেই বিশ্বাসহন্তা যুযুৎসু নিশ্চয়ই উপযুক্ত পুরস্কার লাভ করবেন।

সাত্যকি বললেন, রাজনীতিতে দলবদল, পক্ষবদল নৈমিত্তিক ঘটনা। বিশেষ করে কুরুক্ষেত্রের এই যুদ্ধটা ছিল কিন্তু ধর্ম বনাম অধর্মের বিরুদ্ধে। ধর্মের জয় হল। যুযুৎসু কৌরবপুত্র। বিবেকের তাড়নায় ধর্মের পক্ষে যোগ দিয়েছেন।

সঞ্জয় বলল, তাই যদি হয়, তাহলে ভারতের বেশিরভাগ রাজা ধর্মের পক্ষে যোগ না দিয়ে অধর্মের পক্ষে যোগ দিলেন কেন?

সাত্যকি বললেন, মনে রাখতে হবে যে কৌরবেরা শাসক শক্তি। ভারতের সার্বভৌম একচ্ছত্র শক্তি। সেই শক্তিকে তোষামোদ করার জন্য বহু রাজা মুখিয়ে আছেন। বরং যেসব রাজা হস্তিনাপুরের শাসকদের তোয়াক্কা না করে পাণ্ডবদের দলে যোগ দিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছেন তাঁদের মূল্য অনেক বেশি। তাদের সংখ্যা কৌরব সৈন্যদের তার অর্ধেক কিন্তু সত্যমেব জয়তে। সংখ্যাটা কোনো ব্যাপার নয়। পৃথিবীতে মানুষের চেয়ে ইতর প্রাণীদের সংখ্যা সব সময়ই বেশি। কিন্তু মানুষই পৃথিবী শাসন করছে। কিন্তু আমি অবাক হচ্ছি আপনি তো কৌরবপক্ষ অবলম্বনকারী যোদ্ধা নন। আপনি প্রতিবেদক। কিন্তু মনে হচ্ছে আপনি কৌরবপক্ষাবলম্বী।

সঞ্জয় বললেন, না আর্য, আমি অষ্টাদশ দিবস ধরেই যা ঘটেছে, যা দেখেছি, তারই বর্ণনা করেছি। আমি নিরপেক্ষ, নৈর্ব্যক্তিক প্রতিবেদক। আমি অভিমন্যু নিধনকে যেমন অনৈতিক বলেছি, তেমনি ভীষ্মবধ ও দ্রোণবধের অপকৌশলকেও নিন্দা করেছি। কর্ণের রথচক্র যখন বসে গিয়েছে সে সময় তাকে হত্যা করা বীরোচিত হয়নি, তাও বলেছি। অন্ধের মতো যদৃষ্টং তার বর্ণনা করিনি, আমি পটভূমিটিও বোঝাতে চেষ্টা করেছি। আমি কোনো পক্ষাবলম্বী নই। মহাশয়, আমি শুধু আমার নিয়োগকর্তা মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের আদেশে এই যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ করে তাঁকে দিতে এসেছিলাম। আমি কোথাও মিথ্যাচারণ করিনি। ঘটনা বিকৃত করিনি। আপনাকে আমার যে মন্তব্য করলাম তা আমার নিজস্ব অভিমত মাত্র। হস্তিনাপুর প্রাসাদে রাজকর্মে আমার জীবন কেটে গেল। রাজনীতির কতগুলি ঘাত-অভিঘাত আছে। কৌশল আছে। যুদ্ধ যুদ্ধই। একে ‘ধর্মযুদ্ধ’ বলে চিহ্নিত করার প্রয়োজন কী? যুদ্ধ আপনারা করেছেন। যুদ্ধ আপনাদের ক্ষাত্রধর্ম। আমি যোদ্ধা নই। একজন রাজকর্মচারী। এক অন্ধ রাজা তার পুত্র-পৌত্র, আপনজনের মধ্যে একটি গৃহযুদ্ধ যা মহাযুদ্ধের রূপ নিয়েছিল তার প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ সংগ্রহ করতে আমায় পাঠিয়েছিলেন। আমি তা করেছি। এ যুদ্ধ ধর্মযুদ্ধ হোক, অধর্মযুদ্ধই হোক তা দেখার আমার দরকার নেই। আমার কাজ প্রতিবেদন পেশ করা। তা আমি করেছি। যুদ্ধ শেষ। তার ফলাফল নিয়ে আপনি ভাবুন। যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে আমার রথ অপেক্ষা করছে। দুর্যোধন নিখোঁজ হবার সংবাদ আমাকে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

সঞ্জয় চলে যাবার উদ্যোগ করছেন এমন সময় তাঁর পথরোধ করে দাঁড়ালেন ধৃষ্টদ্যুম্ন। ধৃষ্টদ্যুম্ন সঞ্জয়কে দেখেই বললেন, আরে, এ তো সঞ্জয়। ধৃতরাষ্ট্রের চর। এতক্ষণ এর সঙ্গে কী কথা বলছিলে সাত্যকি?

সাত্যকি বলল, যুদ্ধের ধর্ম নিয়ে কথা হচ্ছিল। সঞ্জয় বলছিলেন, যুদ্ধে কোনো নীতি থাকে না। সুতরাং ধর্মযুদ্ধ বলে কোনো যুদ্ধকেই আখ্যা দেওয়া যায় না।

ধৃষ্টদ্যুম্ন ক্রুদ্ধস্বরে বললেন, কৌরবদের চরের কাছ থেকে আমাদের ধর্মের ব্যাখ্যা শুনতে হবে? সাত্যকি, ওকে এতক্ষণ বাঁচিয়ে রেখেছ কেন? ওকে সংহার করো। তুমি না পারো, আমি করছি। কোনো কৌরবকে আমি কুরুক্ষেত্র থেকে বেঁচে ফিরতে দেব না। এই বলে এক হাতে সঞ্জয়ের চুলের মুঠি ধরে অন্য হাতে খড়্গ নিষ্কাশন করলেন দ্রুপদপুত্র ধৃষ্টদ্যুম্ন

সঞ্জয় সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ছিলেন। তিনি প্রাণের আশঙ্কা করে চোখ বুজলেন। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর বর্ণনা করেছেন। সেই মৃত্যু যে তাঁকেও আক্রমণ করবে তা তিনি ভাবেননি।

এমন সময় শোনা গেল এক প্রবীণ শ্মশ্রুধারী সাধুপুরুষ দূর থেকে তা দেখে তিষ্ঠ তিষ্ঠ বলে চেঁচাচ্ছেন আর দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছেন। সঞ্জয় চিনতে পারলেন। তিনি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস!

ব্যাসদেব ধৃষ্টদ্যুম্নকে বললেন, তুমি ওকে ছেড়ে দাও। একে বধ করা তোমার কর্তব্য নয়। এ যোদ্ধ নয়, প্রতিবেদক মাত্র।

ধৃষ্টদ্যুম্ন সঞ্জয়কে ছেড়ে দিলেন, সঞ্জয় তাঁর কাঁধে হাত দিয়ে দেখলেন শাণিত খঙ্গ তাঁর কাঁধে ঠেকাতেই চর্ম কেটে কাঁধ থেকে রক্ত ঝরছে।

ব্যাস বললেন, তুমি এখন নির্বিঘ্নে গমন করো।

সঞ্জয় বেদব্যাসকে প্রণাম করে শোণিত লিপ্ত কলেবরে ধীরে ধীরে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করলেন। তাঁকে তাঁর রথ ধরার জন্য আরও কিছুক্ষণ এইভাবেই হাঁটতে হবে।

সঞ্জয়ের একটি অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। তিনি শ্রুতিধর। শ্রীকৃষ্ণের মুখে অষ্টাদশ অধ্যায় গীতার শ্লোকগুলি তিনি একবার শুনেই কণ্ঠস্থ করে ফেলেছিলেন। অর্জুনের সংলাপ ও তার উত্তরে গীতার বাণী তাঁর কানে এখনও বাজে। চলতে চলতে শ্রীকৃষ্ণের কয়েকটি কথা তাঁর মনে পড়ছিল—

দুঃখেম্বনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেসু বিগতস্পৃহঃ।
বীতরাগ ভয়ক্রোধঃ স্থিতধীর্মুনিচ্যতে ॥

সমস্ত দুঃখে যার চিত্তে কোনো উদ্বেগ জাগে না, কোনো প্রকার সুখে যার স্পৃহা নেই, যার চিত্ত থেকে আসক্তি, ভয়, ক্রোধ দূর হয়ে গেছে, এমন আত্মমননশীল ব্যক্তিকে স্থিতধী ব্যক্তিত্ব বলা হয়।

সঞ্জয় ভাবলেন প্রতিবেদককেও এমন স্থিতধী হতে হয় বুঝি। চোখের সামনে অসংখ্য হত্যাকাণ্ড দেখে স্থির থাকতে হয়, এমনকী, মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও অবিচল থাকতে হয়। যেমন কিছুক্ষণ আগেও তিনি ছিলেন।

সাত্যকি বললেন, চলুন সঞ্জয়, আপনাকে রথ পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি। আপনি ভাগ্যবান যে একটুর জন্য বেঁচে গেলেন। ব্যাসদেব ভাগ্যক্রমে না এসে পড়লে ধৃষ্টদ্যুম্নের হাত থেকে আমি আপনাকে বাঁচাতে পারতাম না। ধৃষ্টদ্যুম্ন বীর। ওর ভগিনী পাঞ্চালির নতো যজ্ঞের অগ্নি থেকে ওরও জন্ম। দ্রুপদরাজ দ্রোণ নিধনের জন্য যজ্ঞ করে তার ফলস্বরূপ ওকে পেয়েছেন। হত্যার উদ্দেশ্যেই ওর জন্ম। জিঘাংসা ওর অস্তিত্ব জুড়ে। ও অক্লেশে দ্রোণের মাথাটা কেটে নিয়েছিল। হত্যা ওর কাছে কিছুই নয়।

সঞ্জয় বলল, আমি দৈবে বিশ্বাস করি সাত্যকি। জন্ম-মৃত্যু সবই দৈবের হাত। এমনকী, এত অহংকারী, তেজী ধৃষ্টদ্যুম্নও তার ব্যতিক্রম নয়। এই যে আমার রথ। আসি সাত্যকি, বিদায়।

সঞ্জয়-র রথ ছেড়ে দিল।

.

সঞ্জয়ের দুর্যোধন সাক্ষাৎকার

হস্তিনানগর যেতে গেলে দ্বৈপায়ন হ্রদের পাশ দিয়ে যেতে হয়। তখন বেলা দ্বিপ্রহর। কুরুক্ষেত্র থেকে এক ক্রোশ দূরে অশ্বদের জলপান করার জন্য সারথি একটু সময় চেয়ে নিল। হ্রদে এসে রথ থামিয়ে চারটে অশ্বকে নিয়ে সারথি ওদের ঘাটে গেল জলপান করাতে। উদ্ভ্রান্তের মতো সে সময়টা হ্রদের তীরে পায়চারি করতে করতে সঞ্জয়ের চোখে পড়ে গেল হ্রদের মধ্য থেকে একটি মানুষের মুণ্ড বারবার ভেসে উঠছে আবার ডুবে যাচ্ছে। কেউ কি সন্তরণ করছে নাকি। হ্রদ এখন নির্মল। লোকালয় থেকে বহু দূরে। অরণ্যের মধ্যে এই হ্রদে এখন সন্তরণ করবে কে? সঞ্জয় এগিয়ে এলেন। লোকটি আবার মুখ তুলতেই সঞ্জয় দেখলেন, এ তো আর কেউ নয়—দুর্যোধন। দুর্যোধন কি দ্বৈপায়নে ডুবে আত্মহনন করতে এসেছেন? তিনি কুরুক্ষেত্র থেকে পলায়ন করেছেন সঞ্জয় তা দেখেছেন। কিন্তু তিনি যে দ্বৈপায়ন হ্রদে তা সঞ্জয় জানবেন কী করে।

দুর্যোধন সন্তরণপটু। তিনি অনেকক্ষণ জলে ডুবে থাকতে পারেন। কিন্তু নিশ্বাস নেবার জন্য তিনি বারবার ভেসে উঠছেন। আর একবার উঠতেই সঞ্জয় ছুটে কাছে পাড়ে গিয়ে ডাকলেন, মহারাজ দুর্যোধন, আমি সঞ্জয়। আপনি নির্ভয়ে উঠে আসুন।

দুর্যোধন সঞ্জয়ের কণ্ঠস্বর শুনে হ্রদ থেকে সিক্ত কলেবরে উঠে এসে সঞ্জয়কে দেখে অবাক হলেন।

—সঞ্জয়, তুমি এখানে?

সঞ্জয় বলল; মহারাজ আমিও আপনাকে এখানে দেখব ভাবিনি। আমি কুরুক্ষেত্র থেকে আসছি। হস্তিনাপুর ফিরে যাচ্ছি। আপনি এখানে এই হ্রদের মধ্যে কতক্ষণ লুকিয়ে থাকবেন। পাণ্ডব সৈন্যরা আপনাদের পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমি মহাত্মা ব্যাসের কৃপায় বেঁচে গেছি। এই দেখুন আমার স্কন্ধদেশ দিয়ে এখনও রুধির ঝরে পড়ছে।

দুর্যোধন জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি জীবিত কৌরবপক্ষীও কাউকে দেখলে? অশ্বত্থামা, কৃতবর্মা, কৃপাচার্য?

—না মহারাজ, কাউকে দেখিনি। কৌরব শিবিরগুলি শূন্য। আরোগ্যশালায় কিছু আহত সৈনিক হয়তো থাকতে পারে। পাণ্ডব সৈন্যরা সেখানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। গৃধিনিরা নরমাংসের জন্য অপেক্ষা করছে। কিছু দুর্বৃত্ত মৃত সৈনিকদের অলংকার চুরি করছে। পথকুকুরেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। মহারাজ, আপনি দ্বৈপায়ন হ্রদ ছেড়ে আমার সঙ্গে চলুন। এ জায়গাটি আপনার পক্ষে নিরাপদ নয়। পাণ্ডবেরা এলো বলে। তারা আপনাকে বন্দি করবে।

—তুমি আমায় কোথায় যেতে বলো?

—আপনি আমার সঙ্গে হস্তিনানগরে চলুন। আপনাকে মাতা গান্ধারীর কাছে পৌঁছে দিই। পাণ্ডবেরা কখনওই মাতা গান্ধারীর কাছ থেকে আপনাকে কেড়ে নিতে পারবে না। দুর্যোধন শান্ত কণ্ঠে বললেন, না, তা হয় না। আমি আজ পরাজিত। আমার ৯৯টি ভ্রাতা এই যুদ্ধে নিহত হয়েছে। আমার গুরু দ্রোণও নেই। পিতামহ ভীষ্মকে হারিয়েছি। প্রাণাধিক প্রিয়, আমার সবচেয়ে বড় বান্ধব কর্ণ আমার জন্য প্রাণ দিয়েছেন। জয়দ্রথ, মদ্ররাজ শল্য সবাই নিহত। আমার একাদশ অক্ষৌহিণী সৈন্য যেন বিরাট প্লাবনে ভেসে গেছে। আমার মা গান্ধারী আমাকে বহুবার নিবৃত্ত করতে চেয়েছেন। বিদুর আমাকে বহুবার উপদেশ দিয়েছেন। আমি কারও কথা শুনিনি।

—কেন শোনেননি মহারাজ? আপনি তো বীর, প্রাজ্ঞ, শাস্ত্রজ্ঞান আপনার অজ্ঞাত নয়। ভূকম্পন হওয়ার আগে পাখিরাও কিচিরমিচির করে সবাইকে সতর্ক করে। আপনাকে সবাই সতর্ক করেছে। তবু আপনি কেন শোনেননি?

সিক্ত দুর্যোধন তীরে দাঁড়িয়ে দখিনা বাতাসে শিরশির করে কাঁপছেন। আশ্চর্য তার মুখে কোনো ক্লান্তির রেখা নেই। তিনি শুধু বললেন, আমি জয়ী হতে চেয়েছিলাম সঞ্জয়। ক্ষত্রিয়ের একমাত্র ধর্ম জয়ী হওয়া। জয়ের কোনো মানচিত্র নেই। ক্ষত্রিয়ের কাছে ‘জয়’ শব্দটি কোনো পাঠ্য পুঁথিতে লেখা থাকে না। জয়ীকে সবসময় তার মানচিত্র নিজে তৈরি করে নিতে হয়। তার নিজের নির্দেশিকা নিজে রচনা করে নিতে হয়। বিজয়ের যাত্রায় একদিনের জন্য বিরাম নিলে চলে না। প্রতি প্রহর তাকে বিজয়ের জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়। রাজার ধর্ম বিজয়। রাজার কর্তব্য তার সিংহাসনকে চিরায়ত করা, নিশ্চিত করা। তার মাথায় সবসময় প্রতিদ্বন্দ্বীর খঙ্গ ঝুলছে। একটু অসতর্ক হলে সে খার আঘাতেই তার মৃত্যু হবে। প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিশ্চিহ্ন করাও তার ব্রত। ওই খঙ্গ দিয়েই তাকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিনাশ করতে হয়।

—কিন্তু সে খঙ্গ থেকে সতর্ক হতে গেলে তাকে তো সব সময় বেপরোয়া দুঃসাহসী ও অনৈতিক হলে চলে না মহারাজ। নৈতিকতাই তো মানুষকে সতর্ক রাখে। তার মানসিক শক্তি বাড়ায়। তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। দুর্নীতিপরায়ণ রাজার আত্মবল থাকে না।

—এসব ব্রাহ্মণদের কথা। ব্রাহ্মণেরা নৈতিকতার কথা তুলে নিজেদের দুর্বলতাকে চাপা দেয়। আমি একে ক্ষত্রিয়, তদুপরি আমি রাজা। আমি মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র। আমার পিতা জ্যেষ্ঠ। জ্যেষ্ঠরাই রাজ্যলাভের একমাত্র অধিকারী। আমার পিতা অন্ধ বলে, শারীরিক প্রতিবন্ধী বলে তাকে রাজ্যলাভে বঞ্চিত করা হয়েছিল। এ অতি অমানবিক। পিতা অন্ধ হলেও জ্ঞানী, বিচক্ষণ, শাস্ত্রজ্ঞ, রাজকার্যে সুপণ্ডিত। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার জন্য কাউকে বঞ্চনা করা অমানবিকতা। আমি রাজপুত্র। যুবরাজ। পরবর্তী মহারাজ হবার জন্যই ঈশ্বর আমাকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। কোন অংশে আমি কার চেয়ে কম? সারা ভারত আমার পদানত। আমি ভারত ঈশ্বর। মহাভারত গড়া আমার স্বপ্ন। আমাকে যারা বঞ্চিত করতে চায় তাদের বঞ্চনা করার পূর্ণ অধিকার আমার আছে।

সঞ্জয় বলল, কিন্তু মহারাজ আপনি ভুলে যাবেন না, আপনি পরাজিত। তাই বলছি আপনি এখানে নিরাপদ নন। আমার সঙ্গে হস্তিনাপুরে ফিরে চলুন। আপনার বৃদ্ধ পিতা এখনও জীবিত। তাঁর সব পুত্র নিহত। এক পুত্র তাঁকে ছেড়ে চলে গেছে। শুধু আপনিই জীবিত। আপনি ফিরে চলুন। কালান্তর ঘটতে চলেছে দেশের রাজনৈতিক জীবনে। এই ভ্রাতৃবিরোধ ইতিহাসের একটি শিক্ষা। এখনও সময় আছে মহারাজ। যুধিষ্ঠির আপনার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। আপনি তাঁর কাছে ক্ষমাভিক্ষা করুন। আপনার পিতা-মাতার মুখ চেয়ে তিনি আপনাকে ক্ষমা করবেন। আপনিই সম্রাট থাকবেন। আপনার মায়ের কাছে পরামর্শ চান। আপনার প্রধান পরামর্শদাতা মাতুল শকুনি আজ পরলোকে। আপনাকে আপনার মাতা গান্ধারী ছাড়া আর পরামর্শ দেবার মতো কেউ নেই। আমি আপনাকে প্রাসাদে পৌঁছে দিচ্ছি মহারাজ। আপনার বৃদ্ধ পিতা-মাতা বড় শান্তি পাবেন। আপনার রানিরা আবার বর্ষা সমাগমে মরালের মতো যত কানায় কানায় পূর্ণ সরোবরে মহাসুখে বিচরণ করবে। আপনাকে উপদেশ দেবার মতো শক্তি আমার নেই মহারাজ। আর আমার মতো একজন প্রতিবেদক, একজন সামান্য রাজকর্মচারীর উপদেশ আপনি শুনবেনই বা কেন। কিন্তু আপনি আপনার মহীয়সী মায়ের উপদেশ শুনুন। প্রতিবেদকরাই বিভিন্ন ঘটনা প্রত্যক্ষভাবে দর্শন করে সহজাত জ্ঞান অর্জন করেন। আমি সেই প্রত্যক্ষ জ্ঞান থেকেই আপনাকে বলছি মহারাজ। যুদ্ধের প্রারম্ভে বাসুদেব যখন অর্জুনকে উপদেশগুলি দিচ্ছিলেন তা আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে। নারী সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন,

কীর্তিঃ শ্রীর্বাকচ নারীণাং স্মৃতিমেধ্য ধৃতিঃ ক্ষমা।

নারীর মধ্যেই আছে কীর্তি লাভের শক্তি, লক্ষ্মীর ঐশ্বর্য লাভের ক্ষমতা, সরস্বতীর বিদ্যা লাভের শক্তি। মেধা, ধৈর্য ও ক্ষমা শক্তি নারীর সহজাত। আপনার মাতা গান্ধারীর মধ্যে এই সর্বশক্তি রয়েছে। আপনি বাকি জীবনটা তাঁর শরণাপন্ন হয়ে কাটিয়ে দেবেন। আবার আপনি সব ফিরে পাবেন। কিছুই হারায় না মহারাজ। সবই সাময়িক। তীব্র আলো না থাকলে আপনার নিজের ছায়াও অদৃশ্য হয়ে যায়। ধনমান যৌবন দীর্ঘস্থায়ী না হলেও জীবন দীর্ঘস্থায়ী। আর জীবন থাকলে মানুষ বৃদ্ধ বয়সেও যুবকের মতো ধন ও প্রতিপত্তি অর্জন করতে পারে। সব দিন আকাশে চাঁদ থাকে না, কোনোদিন অর্ধচন্দ্র ওঠে কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে পূর্ণ চাঁদের দিন শেষ হয়ে গেল।

দুর্যোধন একটু রাগত স্বরে বললেন, তুমি আমার মায়ের নাম একদম করবে না সঞ্জয়। আমার মা আমায় কোনোদিন ভালোবাসেননি। তিনি নীতিবাগীশ। নীতি নিয়ে আচ্ছন্ন হয়ে আছেন। এ তাঁর মানসিক বিকার। কোনোদিন তিনি আমাকে রাজপুত্রের মতো দেখতে চাননি। ব্রাহ্মণপুত্রের মতো করে গড়ে তুলতে চেয়েছেন। একমাত্র আমার পিতাই আমায় বোঝেন। আমার কাছে তিনিই বড় চক্ষুষ্মান। তুমি যাও সঞ্জয়। আমি যাব না। আমি মহাকালের কাছে আত্মসমর্পণ করেছি। তিনি যা করবেন তাই হবে।

এই কথা বলে দুর্যোধন আবার দ্বৈপায়ন হ্রদে ঝাঁপ দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে জলে আলোড়ন তুলে তাঁর দেহ মিলিয়ে গেল।

সঞ্জয় তীরে দাঁড়িয়ে একটু অপেক্ষা করলেন। দুর্যোধনের মাথা আর ভেসে উঠল না। সঞ্জয় শুনেছিলেন দুর্যোধন মায়াবলে জলের নীচে অনেকক্ষণ ডুবে থাকতে পারেন এবং জলের তলদেশে বসে বাইরের শব্দ শুনতে পান।

সঞ্জয় অদৃশ্য দুর্যোধনের উদ্দেশে বললেন, আমি চললাম মহারাজ। ঈশ্বর আপনাকে রক্ষা করুন।

সঞ্জয় তাঁর রথের দিকে এগিয়ে চললেন।

.

সঞ্জয়ের রথ কিছুদূরে এক বনপথ দিয়ে যেতে সঞ্জয়ের চোখে পড়ল তাঁর রথ আসতে দেখে তিনজন পথচারী অতি দ্রুত পথ থেকে সরে একটি গাছের আড়ালে চলে গেল। এই পথচারীদের পরনে যুদ্ধের পোশাক। প্রথমে ভেবেছিলেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কৌরব ও পাণ্ডবপক্ষের অনেক সেনাই পলাতক হয়েছেন। তারা ইতস্তত ভ্রাম্যমাণ। অনেকে যুদ্ধপোশাক পরিবর্তন করে জনারণ্যে মিশে গিয়ে নিজেদের রাজ্যের দিকে পদব্ৰজে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু অদূরে চলমান যে তিনজনকে সঞ্জয় দেখলেন তাঁদের মধ্যে একজন দীর্ঘদেহী মানুষকে দেখে সঞ্জয়ের চিনতে অসুবিধা হল না। সে নিশ্চয়ই অশ্বত্থামা না হয়ে যায় না। কারণ অশ্বত্থামা অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সৈন্যদের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘদেহী। এই অস্বাভাবিক দীর্ঘতার জন্য তিনি তাঁর আত্মপরিচয় লুকোতে পারেন না। শ্মশ্রুগুম্ভমণ্ডিত গৌরবর্ণের মুখাবয়ব। উন্নত কপাল। দীর্ঘ কেশ। কিন্তু আর একটি দৈহিক বৈশিষ্ট্য তাঁর চোখে পড়ার মতো। সেটি তাঁর উন্নত কপালে বসানো রয়েছে, একটি উজ্জ্বল বৈদুর্য মণি। এই মণি নিয়েই তিনি জন্মেছেন। যেমন কর্ণ কবচকুণ্ডল নিয়ে জন্মেছিলেন। এই মণির প্রভাবেই তিনি অপরাজেয়। বিপুল শক্তির অধিকারী।

সঞ্জয়ের রথ থামতেই সেই তিনটি মানুষ ভীত হরিণীর মতো ছুটতে লাগল। সঞ্জয় দ্রুত রথ থেকে নেমে সেই অরণ্য মধ্যে তাদের পিছনে পিছনে ছুটতে লাগলেন। চিৎকার করে বলতে লাগলেন, অশ্বত্থামা, পালিও না। তোমার কোনও ভয় নেই। আমি সঞ্জয়। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের সচিব সঞ্জয়। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রতিবেদক সঞ্জয়। তোমাদের গুরুত্বপূর্ণ খবর দেবার আছে। তোমরা ফিরে এসো।

সঞ্জয়ের উচ্চ কণ্ঠস্বর পলায়মান ত্রয়ীর কানে পৌঁছতে তারা ঘুরে দাঁড়াল। তারপর সঞ্জয়ের দিকে নিরীক্ষণ করতেই সঞ্জয় আবার বলল, আমি এখন সবাইকেই চিনেছি। গুরুপুত্র অশ্বত্থামা, গুরু কৃপাচার্য আর যাদব সৈনাধ্যক্ষ কৃতবর্মা। আমাকে ভালো করে দেখুন। আমি পাণ্ডবপক্ষের কেউ নই। আমি সঞ্জয়। আপনাদের হিতাকাঙ্ক্ষী। ওই তিনজন এবার ধীরে ধীরে সঞ্জয়ের দিকে এগোতে লাগলেন। একটি পিপুল গাছের নীচে তাঁরা মিলিত হলেন।

কৃপাচার্য বললেন, ওহ তুমি সঞ্জয়। তুমি তো যুদ্ধের সংবাদ প্রতিদিন মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রকে শোনাতে। তুমি এখানে কেন?

সঞ্জয় বললেন, যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। আমি তাই হস্তিনাপুর ফিরে যাচ্ছি। আমি কৃপাচার্য ও কৃতবর্মাকে দেখিনি। কিন্তু অশ্বত্থামাকে দেখেছি, অদ্য প্রভাতকালে আপনি যুদ্ধযাত্রা করে যুদ্ধে না গিয়ে অশ্ব নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে বাইরে নিষ্ক্রান্ত হলেন।

অশ্বত্থামা বললেন, হ্যাঁ, ঠিকই দেখেছেন। আমি গতকাল যুদ্ধে প্রচণ্ড আহত হয়েছিলাম। আমাকে আমার সারথি সেবাকেন্দ্রে ভর্তি করে দেন। সেখানে সারারাত কাটে।

সঞ্জয় বলল, বলুন, তারপর পলায়ন করলেন। আমি কৌরবপক্ষের একজন রাজকর্মচারী মাত্র। কিন্তু আমি একজন প্রতিবেদক। আমি যুদ্ধের ভালো-মন্দ সম্পর্কে কিছু বলব না। কিন্তু এটুকু বলতে পারি যে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন কাপুরুষের কাজ। ক্ষত্রিয়ের পক্ষে নিদারুণ অধর্ম। আপনারা তিনজনই দক্ষ সেনাপতি। আচার্যদেব তো অস্ত্রগুরু। অশ্বত্থামা একজন দীর্ঘদেহী মানুষ শুধু নয়, একজন শ্রেষ্ঠ রথী। দুর্যোধন কর্ণবধের পর আপনাকেই সেনাপতি করতে চেয়েছিলেন। আপনি হননি।

অশ্বত্থামা বললেন, সঙ্গত কারণেই হইনি। আমি সেনাপতি হলে মদ্ররাজ শল্য হয়তো অপমানিত বোধ করতেন। যুদ্ধ করতেন না। আমি স্বেচ্ছায় এই সম্মান ত্যাগ করেছি। আজ আমার সকালে উঠতে একটু দেরি হয়ে যায়। যুদ্ধের ভেরী তখন বেজে গেছে। আমি সারথিকে খুঁজে পাইনি। একটি অশ্ব নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে মহারাজ দুর্যোধনের সঙ্গে যোগ দেবার জন্য যাত্রা করি। কিন্তু কিছুদূর গিয়ে শুনলাম মহারাজ কিছুক্ষণ আগে পলায়ন করেছেন। আমি শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। শুনলাম কৌরবপক্ষের আর কেউই এখন যুদ্ধ করার জন্য বেঁচে নেই। আমি তাই আমার কর্তব্য ঠিক করার জন্য যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিষ্ক্রান্ত হলাম।

সঞ্জয় বলল, আপনি সেনাপতি হলে যুদ্ধের গতি ঘুরে যেত আচার্যপুত্র।

অশ্বত্থামা বললেন, তুমি জানো, আমাদের সেনাপতিদের মধ্যে কিছু মিথ্যা অহংবোধ ছিল। ভীষ্মের সেনাপতিত্ব কর্ণ মেনে নেননি। ভীষ্মের সেনাপত্যকালে তিনি অস্ত্র ধরেননি। আমার পিতার প্রতিও কর্ণের অবজ্ঞা ছিল।

—আমি যতদূর নিরপেক্ষভাবে যুদ্ধ দর্শন করেছি অশ্বত্থামা, আপনিও সর্বদা আপনার শ্রেষ্ঠতম অস্ত্রবিদ্যার নিদর্শন দেখাননি।

অশ্বত্থামা প্রতিবাদ করে উঠলেন। আমি অর্জুন ও বাসুদেবকে অস্ত্রাঘাতে অবসন্ন করে দিতে পেরেছিলাম। আমি নারায়ণী অস্ত্র প্রয়োগ করে অর্জুনের রথ ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছি। কয়েক সহস্র পাণ্ডব সৈন্যকে আমি যমালয়ে পাঠিয়েছি।

সঞ্জয় বললেন, কিছু মনে করবেন না আচার্যপুত্র। সে আপনার পিতা নিহত হবার পর আপনি তখন প্রতিশোধস্পৃহায় মেতে উঠে আপনার বীরত্ব প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তার আগে পর্যন্ত আপনার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য ছিল না।

অশ্বত্থামা বললেন, সঞ্জয়, নিন্দা-প্রশংসা সবই ভাগ্য, দৈবের নির্বন্ধ। কেউ কিছু না করেই প্রশংসা পায়, সামান্য কিছু অবদানের জন্যও অনেককে পুরস্কৃত হতে দেখেছি। রাজ খেতাবও অর্জন করতে দেখেছি। আবার কত মহৎ কাজ মানুষের চোখে পড়েনি। কত অপূর্ব বিদগ্ধ প্রস্থ ও সাধারণ মানুষ কেন, বিদ্বজ্জনেরাও পড়েননি। যে যেমন প্রচারের আলো পাবে জনসাধারণের চোখে সে তেমনভাবেই দৃষ্ট হবে। নয়তো আমি ঘটোৎকচের মায়াজাল ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছি। মহাবীর ঘটোৎকচ যখন সিংহ-শার্দুলের বিক্রম নিয়ে অশ্বারোহী, গজারোহী রাক্ষস সৈন্যদের নিয়ে আমাকে নিধন করতে এসেছিল আমি আমার পাশে কাউকে পাইনি। দুর্যোধন ভীত হয়ে পড়েছিলেন। আমি তাঁকে অভয় দিয়ে বলেছিলাম, মহারাজ তোমাকে আমার সাহায্যে আসতে হবে না। তুমি তোমার জায়গাতেই অবস্থান করো। আমি একাই তোমার শত্রুদের সংহার করব। তখন আমার কথা শুনে দুর্যোধন যা বলেছিলেন, আজও আমার তা মনে আছে। বলেছিলেন, ‘অশ্বত্থামা, তোমার মনের এই ঔদার্য ও আমার প্রতি তোমার এই ভক্তির আমি প্রশংসা করি।’

সঞ্জয় বলল, আচার্যপুত্র, আমি একজন শ্রুতিধর প্রতিবেদক। গোটা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সেনাপতিদের গুরুত্বপূর্ণ সব কার্যকলাপই আমার এখনও চোখে ভাসছে। দুর্যোধন সে সময় শকুনিকে বলেছিলেন, ‘অর্জুন লক্ষ রথীর সঙ্গে একসঙ্গে যুদ্ধ করছে। তুমি ষাট হাজার সৈন্য নিয়ে তাকে প্রতিরোধ করো। তোমার সঙ্গে কর্ণ, বৃষসেন, কৃপ, কৃতবর্মা, ছয় অযুত পদাতিক নিয়ে তোমার অনুগমন করবেন। তোমরা পাণ্ডবদের বিনাশ করো। আর অশ্বত্থামা ঘটোৎকচকে সামলাক।”

অশ্বত্থামা বললেন, আমি কি সে সময় এক অক্ষৌহিণী রাক্ষস সেনাকে ধ্বংস করে দিইনি? আমি কিন্তু তখন ভীমসূতের শরপ্রহারে জর্জরিত ও ব্যথিত। তাও আমি লড়াই চালিয়ে গিয়েছি। অসংখ্য রাক্ষসসেনা আমাকে মুখব্যাদান করে গিলতে আসছে। তারা আমার প্রতি সহস্র সহস্র শতঘ্নী, পরিখ, অশনি, শূল, পট্টিশ, খড়্গ, গদা, মুঘল, অসি, কৃপাণ নিক্ষেপ করছে। আমি তা ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছি। সেই রাক্ষসী সেনা আমি সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছি। এই রাগে ঘটোৎকচ ফিরে এসে আমার সঙ্গে দ্বৈরথ সমর করেছে। আমার প্রতি দেবনির্মিত অশনি নিক্ষেপ করেছিল। আমি সেই অশনি গ্রহণ করে আবার তাকে ছুড়ে মেরেছি। যখন আমার সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ চলছে তখন ভীমসেন তিনশো হাতি ও ছ’ হাজার অশ্বারোহী নিয়ে আমাকে বধ করতে চলে এলেন। আমি এক অক্ষৌহিণী রাক্ষসসেনাকে বধ করেছি। দ্রুপদপুত্র সুরথকে নিধন করেছি। শ্রুতায়ুকে শমন সদনে পাঠিয়েছি। তারপর স্বয়ং ঘটোৎকচকে নিধন করেছি। ধৃষ্টদ্যুম্ন ঘটোৎকচকে সাহায্য করতে এসেছিল, ঘটোৎকচের পতন দেখে সে পালাবার পথ পায়নি। ঘটোৎকচ বধ কি আমার একটি কীর্তি নয়? অপরাজেয় এক অক্ষৌহিণী রাক্ষসীসেনাকে আমি নিঃশেষ করে দিয়েছি। তুমি কী করে বললে, আমি আমার শ্রেষ্ঠ বীরত্ব কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে প্রয়োগ করিনি?

সঞ্জয় বললেন, গুরুপুত্র, তুমি আমার কথায় রাগ কোরো না। আমি তোমার সমস্ত বীরত্ব প্রদর্শনের কাহিনি যথাযথভাবে রাজা ধৃতরাষ্ট্রের কাছে তুলে ধরেছি। একথা ঠিক তোমার গৌরব সাধারণ্যে যতটা বিস্তৃত হওয়া উচিত ছিল, ততটা হয়নি। সে তোমার অসাধারণ পিতার অসামান্য খ্যাতির জন্য। ভরদ্বাজ মুনির পুত্র দ্রোণাচার্যের জ্ঞান ও দক্ষতা সারা ভারত ব্যাপী। তুমি গুরুপুত্র বলেই খ্যাত হয়েছ। তোমার পিতার গৌরবে বেশি গৌরবান্বিত হয়েছ। গুরুপুত্র তুমি জানো, যশঃভাগ্য বড় বিচিত্রগামী। আকাশের অসংখ্য তারকাদের দ্যুতিও পূর্ণিমার পূর্ণ চাঁদের পাশে নিষ্প্রভ হয়ে যায়। বটবৃক্ষের তলায় যার একটি বটবৃক্ষের জন্ম হয় না। এমনকী, বটবৃক্ষ তার সমস্ত রস নিঃশেষ করে দিয়েও তার শাখার ওপর কিছু শিকড়হীন পরগাছা ছাড়া আর কিছুর জন্ম দিতে পারে না।

কৃপাচার্য সঞ্জয়কে থামিয়ে দিয়ে বললেন, অশ্বত্থামা, এখন যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। আমাদের আর এ যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করার কিছু নেই। জীবন একটি বহতা নদীর মতো। তার স্রোত নিত্য প্রবাহিত হচ্ছে। এক জলে কেউ দুবার স্নান করতে পারে না। কারণ নদীর জলধারা তো প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তিত হচ্ছে। একেই বলে কালস্রোত। এই সর্বহানিকর যুদ্ধে অযুত অযুত মানুষ নিঃশেষ হয়ে গেছে। এগারো অক্ষৌহিণীর মধ্যে আমরা এই তিনজন এখন জীবিত। কৌরব যুযুৎসু এখনও জীবিত বলে শুনেছি। কিন্তু তিনি পাণ্ডবপক্ষে ছিলেন বলেই বেঁচে গেছেন। এই যুদ্ধ থেকে তুমি কী শিখলে সেটাই বড় কথা। আমি শিখেছি আনেক। আমিও তোমার মতো ব্রাহ্মণ সন্তান। ব্রাহ্মণের ধর্ম যজন-যাজন, অধ্যয়ন ও পবিত্র জীবন যাপন ও অহিংসা। কিন্তু ভরদ্বাজ মুনির পুত্র দ্রোণাচার্যকে অস্ত্রগুরু হতে দেখে, পরশুরামকে দেখে, আমারও অস্ত্রগুরু হতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু আমি মনে-প্রাণে যুদ্ধকে ঘৃণা করি। হিংসাকে নিন্দা করি। আমাদের শাস্ত্র শিখিয়েছে অহিংসা পরম ধর্ম। যুদ্ধ হয় রাজায় রাজায়। তাদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য। তার পিছনে থাকে রাজার লোভ, পররাজ্য গ্রাসের লোভ। লোভ থেকেই হিংসা আসে। যেমন ব্যক্তিগত জীবনের হতাশা থেকে আসে ক্রোধ। যেখানে ক্রোধ প্রকাশে কেউ অক্ষম হয়, বিকৃত কামের মধ্য দিয়ে তার হতাশার বিস্ফোরণ ঘটে। আর হতাশা থেকে আসে মোহ আর মাৎসর্য। আত্মঅহংকার। নিজের শ্রেষ্ঠত্বকে নির্লজ্জভাবে প্রকাশ করার ইচ্ছা। আর এই অহংকারের কারণেই একটি মহান জীবন নষ্ট হয়ে যায়। যেমন কর্ণের জীবন। কী বিয়োগান্ত পরিণতি এক মহান জীবনের।

অশ্বত্থামা বললেন, মাতুল, কর্ণ আপনাকে অপমান করেছিল তারপর থেকে ওই দুর্বিনীত বীরকে আমি ঘৃণা করতাম। সে কাউকে মানুষ বলে মনে করত না। শুধু আপনাকে কেন, সে কাকে অপমান করতে বাকি রেখেছে। সে বীর আমি মানি। কিন্তু যেহেতু সে মহারাজ দুর্যোধনের প্রিয়পাত্র ছিল, তার প্রশ্রয় পেয়েছিল, সেজন্য সে ভীষ্মের মতো মানুষকেও অবজ্ঞা করে এসেছে। নয়তো কেউ সভামধ্যে কুলবধূ দ্রৌপদীকে বেশ্যা বলে। তার বস্ত্রহরণে পৈশাচিক আনন্দ পায়?

কৃপাচার্য বললেন, সে সময় আমরা কেউ প্রতিবাদ করিনি। কারণ আমরা রাজার চাকরি করি। আমরা প্রতিবাদে চাকরি ছেড়ে দিতে পারতাম, ছাড়িনি। এই অন্যায় চিরকাল হয়ে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। কিন্তু অন্যায় করার চেয়ে অন্যায় মেনে নেওয়া আরও পাপ। অন্তত ব্রাহ্মণরা সদাচারী থাকবেন, এটাই বিধি। কিন্তু তোমার পিতা এবং আমি, এই দুই ব্রাহ্মণ, আমরা কেউই অন্যায়ের প্রতিবাদ করিনি। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ প্রমাণ করেছে পাপ কখনও কাউকে ক্ষমা করে না। দ্রোণাচার্যের মতো ঈশ্বরতুল্য ব্যক্তির কী নিদারুণ পরিণতি হল। এই যে কর্ণ আমাকে নিদারুণভাবে অপমান করেছিল, আমি যে আজ পরাজিত হয়ে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি, তা আমার সেই পাপের ফল। কারণ আমি সতী রমণীর অপমান দেখেও সভা পর্যন্ত ত্যাগ করিনি, দ্রৌপদীর বিবস্ত্রা হওয়ার জন্য সভাস্থলে বসে অপেক্ষা করছিলাম, এ তারই পাপ।

সঞ্জয় তুমি জানো যে কর্ণ মুখে বড় বড় কথা বলত—মুখেন মারিতং জগৎ। এমন অনেক লোক আছে যারা কাজের চেয়ে বেশি বড় বড় কথা বলে—হ্যান করব, ত্যান করব। কর্ণ দুর্যোধনকে প্রায়ই বলত এই আমি সমস্ত পাঞ্চাল ও পাণ্ডুতনয়দের বিনষ্ট করে দেব। আমি অর্জুনকে শেষ করে একে একে সমস্ত পাণ্ডবপক্ষকে বিনাশ করে সারা পৃথিবী তোমাকে উপহার দেব। সেদিনও সে আমার সামনেই দুর্যোধনকে এসব কথা বলছিল। আর তোমরা তো জানোই দুর্যোধন কর্ণের কথা শুনে এমন মোহিত হয়ে যেত যে সে মনে করত কর্ণের সমান আর কোনো বীর নেই। আমি তাই থাকতে না পেরে কর্ণকে বলেছিলাম, বাপু হে, তুমি আত্মশ্লাঘা না করে কাজটা একবার করে দেখাও। আর এই সব প্রলাপবাক্য বন্ধ করো। তুমি সব সময় অর্জুন, কৃষ্ণ ও যুধিষ্ঠিরের নিন্দা করো। মনে রেখো, দেবতা, গন্ধর্ব, যক্ষ ও মনুষ্য সবার অজেয় অর্জুন। যুধিষ্ঠির সত্যবাদী, সর্বশাস্ত্র বিশারদ, ধর্মপরায়ণ প্রাজ্ঞ যশস্বী ও যেকোনো গুরুতর কাজ করার সামর্থ্য রাখেন। তাঁর সহায় স্বয়ং বাসুদেব। তাঁর অন্য বান্ধবরাও কম যান না। মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন, শিখণ্ডী, দুর্মুখপুত্র জনমজেয়, চন্দ্রসেন, রুদ্রসেন, শ্রুতানীক, বীরভদ্র, সুদর্শন। আরও অনেকের নাম বলেছিলাম। এরা সবাই প্রখ্যাত বীর। কর্ণকে বলেছিলাম, তুমি কীভাবে এদের হারাবে? তুমি বলছ কৃষ্ণের সঙ্গে যুদ্ধ করবে। আগে তো একটা বালতি ওলটাও। তারপর তো কৃষ্ণকে ওলটাবে।

কৃপ বললেন, আমি কি অন্যায় বলেছিলাম বলো? কর্ণ আমাকে বলেছিল, আমি নাকি তাকে অপমান করেছি। সে আমাকে বলেছিল, আর একবার বললে, তোমার জিভ ছিঁড়ে ফেলব। আমাকে সে ‘পুরুষাধর্ম’ বলে সম্বোধন করে বলে আমি নাকি পাণ্ডবদের স্তব করছি।

অশ্বত্থামা কৃপাচার্যের কথার মধ্যে বললেন, সেসব কথা থাক মাতুল। যা হবার তা হয়ে গেছে। কর্ণ দুর্যোধনকে বলেছিল কৃপাচার্যকে পরিত্যাগ করতে তারপর সে তোমাকে দেখে নেবে। দুর্যোধন অবশ্য কর্ণকে বলেছিলেন, ‘আপনি প্রসন্ন হয়ে কৃপকে ক্ষমা করে দিন। ওর কথায় কিছু মনে করবেন না।’ কিন্তু তার আগে আমি অসি হাতে কর্ণের দিকে ধেয়ে গিয়েছিলাম তার শিরচ্ছেদ করতে। দুর্যোধন ও কৃপাচার্য আমাকে নিবৃত্ত না করলে তখনই কর্ণের কাটা মুণ্ড মাটিতে পড়ে থাকত।

সঞ্জয় বললেন, আপনারা আর পুরোনো বিবাদের কথা এখনই টেনে আনবেন না। আমি রথ থেকে আপনাদের দেখে আপনাদের ডাকলাম একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ দেওয়ার জন্য। মহারাজ দুর্যোধন দ্বৈপায়ন হ্রদে লুকিয়ে রয়েছেন। আমি এইমাত্র তাঁর সঙ্গে দেখা করে এলাম। আপনারা যদি চান তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারেন। তিনি এখন জীবিত। দৈবের কী নির্দেশ বলতে পারি না। যদিও তিনি আজ একক, নিঃসঙ্গ, নিঃসহায়। তাঁর সঙ্গে কোনও অস্ত্র পর্যন্ত নেই। তার এই অসহায় অবস্থায় আপনারা যদি তাঁর পাশে দাঁড়ান তাহলে তিনি মনোবল ফিরে পেতে পারেন। আর অর্ধমৃত মানুষকেও মনোবল দিয়ে পুনর্জীবন দান করা যায়। শাস্ত্র বলছে মানুষকে অভয় দান করলে অশ্বমেধ যজ্ঞের পুণ্য হয়।

কৃপাচার্য বললেন, বলেন কী? দুর্যোধন দ্বৈপায়ন হ্রদে লুকিয়ে? তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ সংবাদটি দেওয়ার জন্য। আমরা এখনই তার কাছে যাচ্ছি।

অশ্বথামা কৃপাচার্য ও কৃতবর্মা দ্রুত দ্বৈপায়নের দিকে তাঁদের অশ্বমুখ ঘোরালেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *