প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পর্ব : সত্যমেব জয়তে

অসুখী কৃষ্ণ

অসুখী কৃষ্ণ

সমগ্র দ্বারকা রাজ্যে এখন সবচেয়ে অসুখী মানুষ হলেন কৃষ্ণ। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর ৩৬ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। তিনি বুঝতে পেরেছেন যদুবংশ ধ্বংস ও তাঁর মৃত্যু এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু তার মৃত্যু হবে আত্মীয়স্বজন পরিত্যক্ত অবস্থায়। একাকী। গান্ধারী তাঁকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের জন্য দায়ী করেছেন। কুরুবংশ নির্বংশ করার জন্য কৃষ্ণকেই দায়ী করেছেন।

কৃষ্ণ তাঁর সারাজীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝেছেন, তুমি যত কুশলী প্রাজ্ঞ ও সৎ সও না কেন, দৈব তোমার জন্য যা নির্দিষ্ট করে দেবে তোমাকে সেই পরিণতির দিকে এগোতেই হবে।

কৃষ্ণের মনে যে বিষাদ পুঞ্জিভূত হয়েছে তা তাঁর কোনো কৃতকর্মের জন্য নয়, তাঁর বিষাদ এই কারণে তিনি একটি আদর্শ নগর-রাষ্ট্র তৈরি করতে গিয়েছিলেন, পারলেন না। এর জন্য তিনি গান্ধারীর অভিশাপকে দায়ী করেন না। দায়ী করেন মানুষের অশুদ্ধ চিত্তকে। তিনি দেখেছেন দরিদ্রদের চেয়ে সঙ্গতিসম্পন্নরা বেশি লোভী, বেশি অসংযমী। তিনি অধ্যাত্মচিন্তায় সবাইকে দীক্ষিত করতে চাননি। একমাত্র বন্ধু অর্জুন ছাড়া আর কাউকে তাঁর দার্শনিক চিন্তার কথা ব্যক্ত করেননি। তিনি যাদের নিয়ে তাঁর ধর্মরাজ্য গড়তে চেয়েছিলেন, তারা তাঁর আপনজন। আপন জাতি। তাঁরা তাঁর আদর্শ কর্মধারা চিন্তাভাবনা সবই অবগত। এঁরা এক সময় সৎ ছিলেন, উদার ছিলেন, আদর্শনিষ্ঠ ছিলেন। অক্রুর, সাত্যকি, কৃতবর্মা, সবাইকে বলেছিলেন—

তস্মাদসক্তঃ সততং কার্য্যং কর্ম্ম সমাচর।
আসক্তো হ্যাচরণ কর্ম পরমাপ্নোতি পুরুষঃ।।

পুরুষ আসক্তি ত্যাগ করে কর্মানুষ্ঠান কালে মোক্ষলাভ করেন। তোমরা কর্তব্য কর্ম মনে করে রাজধর্ম পালন করে একটা আদর্শ রাষ্ট্র গড়ে তোলো। অর্জুন আসক্তি বর্জন করে যুদ্ধ করেছে। সিংহাসনে বসার কোনো অভিপ্রায় তার মধ্যে ছিল না। অর্জুন তোমাদের আদর্শ হোক।

তিনি ভেবেছিলেন তাঁর অনুগামীরাও তাঁর এই নীতির অনুসারী হবে। ঈশ্বর তো নৌকার কর্ণধারের মতো হাল ধরে এই বিশ্বসংসার চালান না। তিনি কতগুলি নিয়ম করে দেন। সেই নিয়মই হল মানবের জীবন সংহিতা। এই নিয়মগুলি পালনই ধর্ম। এগুলি পালন না করাই অধর্ম।

তিনি নিজে রাজা হননি। কারণ তিনি আসক্তি মুক্ত থাকতে চেয়েছিলেন। তাঁর মাতামহ উগ্রসেনই রাজা থাকবেন। ধর্ম, ন্যায়, ও নীতি অনুসারে সবাই রাজধর্ম পালন করবেন। উগ্রসেনও একচ্ছত্র ক্ষমতা হাতে নেননি। তিনি যাদব অমাত্যদের সবার সঙ্গে পরামর্শ করেই রাজ্য শাসন করতেন। কিন্তু যাদবরা কৃষ্ণকেই ঈশ্বর বলে মানলেন না। তাঁরা তাঁকে রাজনীতির কুশলী নেতা বলেই গণ্য করতেন। কৃষ্ণ নিজে থেকে কাউকে তাঁর স্বরূপ বলেননি। তিনি তাঁদের ডেকে কখনও বলেননি-

যে তু সর্বাণি কৰ্ম্মাণি ময়ি সংশস্য মৎপরাঃ।

তুমি সর্বকর্ম আমাতে ন্যস্ত করে সৎপরায়ণ হও। আমাতে মন নিবিষ্ট করো, বুদ্ধি নিবিষ্ট করো। তাহলে তুমি দেহান্তে আমার কাছেই ফিরে আসবে। আর যদি আমাতে চিত্ত স্থাপন না করতে পারো তবে তার জন্য বারবার চেষ্টা করতে হবে।

কৃষ্ণ অনৃশংসতায় বিশ্বাস করতেন। অহিংসার নীতিতেও বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি কোনো বস্তুগত লাভের জন্য; যশ বা সম্পদের লোভে অস্ত্র ধরেননি। অস্ত্র ধরেছেন অশিষ্টদের আচরণ যখন সীমা ছাড়িয়ে গেছে। শিশুপালের শত অপরাধ তিনি ক্ষমা করেছিলেন। তাকে শিষ্ট হবার ধর্মপথে চলার বারবার সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু শিশুপাল রাজসূয় যজ্ঞে সারা ভারত থেকে আগত রাজন্যবর্গর মাঝে তাঁকে অশালীন ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন। ক্ষমা যেখানে ক্ষীণ দুর্বলতা, কৃষ্ণ শুধু সেখানেই বিরল ক্ষেত্রে নিষ্ঠুর হয়েছেন। তাই তিনি শিশুপালকে বধ করেছিলেন। কৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু যুদ্ধ যখন অপরিহার্য, তখন তিনি ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি দুর্যোধনকে প্রচুর নারায়ণী সৈন্য দিয়েছিলেন, যারা কৌরবদের হয়ে যুদ্ধ করে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। তাঁর প্রিয় বিশ্বস্ত সেনাধ্যক্ষ কৃতবর্মাকে পাঠিয়েছেন দুর্যোধনের হয়ে যুদ্ধ করতে। কৃতবর্মা প্রাণপণে লড়াই করেছে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৃষ্ণ কোনো অন্যায় করেননি। শুধু ভীষ্মের তীব্র আক্রমণ থেকে অর্জুনকে বাঁচানোর জন্য বাধ্য হয়ে অস্ত্র ধরেছিলেন। কিন্তু তিনি ভীষ্মকে আঘাত করেননি। কর্ণের প্রতি তাঁর ক্রোধ ছিল। সেটি স্বাভাবিক ক্রোধ। দ্যূতসভায় কর্ণ দ্রৌপদীর প্রতি যে ব্যবহার করেছিলেন তা বীরোচিত নয়, অতি নিম্নরুচি সম্পন্ন মানুষের আচরণ। কৰ্ণ দ্রৌপদীকে বেশ্যা বলে সম্বোধন করেছিলেন। দুঃশাসন যখন দ্রৌপদীর শ্লীলতাহানি করছিল, তখন কর্ণ দুঃশাসনকে সমর্থন করেছিলেন। বলেছিলেন, পাণ্ডবরা বিনষ্ট হয়ে নরকগমন করেছে। তুমি অন্য পতি বেছে নাও।

নারীর সম্মানহানি কৃষ্ণ কখনও সহ্য করতে পারেন না। বিশেষ করে দ্রৌপদীকে তিনি নিজের বোনের মতো স্নেহ করতেন। তাই কুরুক্ষেত্রে যখন কর্ণের রথের চাকা বসে গিয়েছিল, তখন কর্ণ চাকা তুলবার জন্য মাটিতে নেমে অর্জুনের কাছে ক্ষমা চেয়ে যুদ্ধ স্থগিত রাখতে বলেছিলেন। কৃষ্ণ কিন্তু কর্ণকে ক্ষমা করেননি। তিনি বলেছিলেন, কপট দ্যূতক্রীড়ার সময় তোমার ধর্ম কোথায় ছিল? ভীমকে তোমার পরামর্শে দুর্যোধন বিষা খাইয়েছিল, তখন তোমার ধর্ম কোথায় ছিল? বারাণাবতনগরে পাণ্ডবদের পুড়িয়ে মারার জন্য জতুগৃহে যখন আগুন লাগানো হয়, তখন তোমার ধর্ম কোথায় ছিল? যখন অভিমন্যুকে সপ্তরথী পরিবেষ্টিত করে হত্যা করেছিলে, তখন কোথায় ছিল তোমার ধর্ম? তুমি মনে কোরো না ধর্মের নাম করে তুমি এখন মুক্তি পাবে।

অর্জুন কর্ণকে নিহত করেছিলেন। কৃষ্ণ অশ্বত্থামার মতো গুপ্তহত্যা করেননি। ঘুমন্ত রথীদের হত্যা করেননি। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধেও তিনি স্বহস্তে কাউকে নিধন করেননি। তবে তিনি পাণ্ডবদের এই যুদ্ধে জেতানোর জন্য কূটকৌশল অবলম্বন করতে বলেছিলেন। যে কোনো যুদ্ধেই অস্ত্রকৌশল ছাড়া নানা কূটকৌশল থাকে। তা যুদ্ধের সামরিক কৌশলের অন্তর্ভুক্ত। প্রেম ও যুদ্ধে নানা কৌশল সব পক্ষই অবলম্বন করে।

কৃষ্ণ জানতেন যুধিষ্ঠির ধার্মিক, কিন্তু গোঁড়া ধার্মিক। তিনি ধর্মের ব্যাপারে জেদি, অটল। কৃষ্ণ মনে করেন বুদ্ধিমান মানুষ সর্বদা পরিবর্তনশীল হবে। যখন যেমন, তখন তেমন আচরণ করবে। শঠের সঙ্গে ধর্মাচরণ করে কোনো লাভ নেই। যুধিষ্ঠিরকে তাই কৃষ্ণ ‘স্থূলবুদ্ধি’ বলে মনে করতেন। কৃষ্ণের মতে পাণ্ডবদের বিপর্যয়ের জন্য যুধিষ্ঠিরের স্থূলবুদ্ধিই দায়ী।

দ্বৈপায়ন হ্রদে দুর্যোধনকে খুঁজে বার করে যুধিষ্ঠির নির্বোধের মতো দুর্যোধনকে বলেন, তুমি আমাদের যে কোনো একজনকে বেছে নাও। তাকে পরাস্ত করতে পারলেই সমুদয় রাজ্য তোমার হবে। দুর্যোধন একজন শ্রেষ্ঠ বীর। নানা অস্ত্রে পারদর্শী। তিনি যদি যুধিষ্ঠির কিংবা নকুল বা সহদেবকে বেছে নিতেন, তাহলে তাঁরা নিঃসন্দেহে পরাজিত ও নিহত হতেন। কি ভাগ্যি দুর্যোধন ভীমকে বেছে নিয়েছিলেন। তার ওপর দুর্যোধন গদাযুদ্ধ বেছে নিয়েছিলেন। একমাত্র ভীমই গদাযুদ্ধে পারদর্শী। কৃষ্ণ জানতেন দুর্যোধনের কাছে পরাজয় মানে চিরদিনের মতো রাজ্য ত্যাগ করে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করা। এই গদাযুদ্ধে কৃষ্ণ ভীমকে দুর্যোধনের উরুতে আঘাত করে উরুভঙ্গ করতে ইঙ্গিত করেছিলেন। যুদ্ধের নীতি এখানে লঙ্ঘিত হয়েছিল। কিন্তু কৃষ্ণের কাছে পাণ্ডবদের জয়ই বড়। কারণ এটিই শেষ যুদ্ধ। অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সেনার রক্তে পাণ্ডবেরা আজ জয়ের প্রান্তে এসে উপস্থিত হয়েছেন। পরাজিত হয়ে আবার পথের ভিখারি হয়ে যেতেন তাঁরা। শত্রুরা তো কৃষ্ণকেই বিদ্রুপ করত তখন। পাণ্ডবরা ছাড়া অন্য কেউ হলে তারা তো একাকী দুর্যোধনকে প্রহার করেই নিধন করে ফেলত। দ্বন্দ্ব্বযুদ্ধের জন্য অপেক্ষা করত না।

কিন্তু তা বলে মৃতকল্প দুর্যোধনের মাথায় ভীমের পদাঘাত কৃষ্ণ সহ্য করেননি। যুধিষ্ঠির এই কুকার্য সমর্থন করেছিলেন কিন্তু কৃষ্ণ এতে বিরক্ত হয়ে বলেন, মৃতকল্প শত্রুর প্রতি কটুবাক্য বলাও সঙ্গত নয়। পদাঘাত তো গর্হিত অপরাধ। মুমূর্ষু দুর্যোধন কৃষ্ণকে বলেছিলেন, হে কংসদাসতনয়, তোমার কথামতোই বৃকোদর আমার উরু ভঙ্গ করেছে। তোমার অন্যায় উপায় দ্বারাই প্রতিদিন যুদ্ধে সহস্র নরপতি নিহত হয়েছেন। তুমি শিখণ্ডীকে সামনে রেখে পিতামহকে নিপতিত করেছ। অশ্বত্থামা নামে গজকে নিহত করে তুমিই আচার্য দ্রোণকে অস্ত্রশস্ত্র পরিত্যাগ করতে বাধ্য করো। তোমার সামনেই দুরাত্মা ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণকে হত্যা করে। তুমি তাকে নিষেধ করোনি। কর্ণ অর্জুন বিনাশের জন্য বহুদিন যত্ন সহকারে একটি মারণাস্ত্র রেখে দিয়েছিলেন। তুমি কৌশলে ঘটোৎকচকে কর্ণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পাঠাও যাতে অর্জুনের জন্য সংরক্ষিত অস্ত্রটি কর্ণ ঘটোৎকচের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করে। ঘটোৎকচের প্রাণের বিনিময়ে অর্জুন বেঁচে যায়।

কৃষ্ণের চোখের সামনে ভগ্নউরু দুর্যোধনের করুণ ছবিটি ভাসছে। দুর্যোধন বলছেন, সাত্যকি তোমার কথাতেই ছিন্নহস্ত ভুরিশ্রবাকে অনশনরত অবস্থায় হত্যা করে। ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ ও আমার সঙ্গে ন্যায়যুদ্ধ করলে কিছুতেই তোমরা আমাদের পরাজিত করতে পারতে না। তোমার তুল্য ঘৃণ্য পাপাত্মা, নির্দয় ও নির্লজ্জ আর কে আছে?

তারপর দুর্যোধন বলেছিলেন, আমি অধ্যয়ন করেছি। বিধি মেনে সাসগরা বসুন্ধরা শাসন করেছি। অত্যুৎকৃষ্ট ঐশ্বর্যলাভ করেছি। সব শেষে ধর্মপরায়ণ ক্ষত্রিয়দের প্রার্থনীয় অমর মৃত্যুলাভ করলাম। আমার তুল্য সৌভাগ্যশালী আর কে আছে? আমি স্বর্গে চললাম, তোমরা শোকাকুল চিত্তে মৃতকল্প হয়ে পৃথিবীতে বোঁচ থাকবে। এটিও তো দুর্যোধনের অভিশাপ। তিনি কি আজ সুখী? তিনি কি এখন মৃতকল্প নন?

কৃষ্ণের আজও মনে পড়ে, দুর্যোধনের অনেক অভিযোগই মিথ্যা। সাত্যকি ছিন্নবাহু ভুরিশ্রবাকে নিহত করেন কৃষ্ণের নিষেধ সত্ত্বেও। অর্জুন নিরস্ত্র অবস্থায় কর্ণকে হত্যা করেননি। পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধে কর্ণ নিহত হন। কৃষ্ণ ভীষ্মের সঙ্গে যুদ্ধে সামনে শিখণ্ডীকে খাড়া করেছিলেন। শিখণ্ডী গতজন্মে নারী ছিলেন। এ জন্মে তো নয়। এ জন্মে তিনি বীর যোদ্ধা। ভীষ্মের যদি শুচিবাই থাকে তাহলে কৃষ্ণ কী করতে পারেন। যুদ্ধে প্রতিপক্ষের দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া অপরাধ নয়।

কিন্তু কৃষ্ণের ভাগ্যে বরাবরই অপবাদ ও দুর্নাম। যৌবন থেকেই তাঁকে নানা অপবাদ শুনতে হয়েছে। কখনও তাঁর চরিত্র নিয়ে। কেউ তাঁকে লম্পট বলেছে, কেউ বলেছে অহংকারী, কুচক্রী এবং অন্যায় যুদ্ধের পরামর্শদাতা। কৃষ্ণই অন্যায় যুদ্ধে কৌরব রথীদের হত্যার জন্য দায়ী। তিনি সব অপবাদ উড়িয়ে দিয়েছেন কিন্তু পাপাত্মা দুর্যোধনের কথা বিশ্বাস করে দেবতারা যখন আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি করলেন, তখন কৃষ্ণ ব্যথিত হয়েছিলেন। সেসময় গন্ধর্বরা সুমধুর বাদ্য বাজাতে বাজাতে রাজা দুর্যোধনের যশোগান গাইতে লাগলেন। সুগন্ধ সমীরণ বইতে লাগল। গন্ধর্বরা বলতে লাগলেন ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, ভুরিশ্রবাকে অধর্ম যুদ্ধে বিনাশ করা হয়েছে। বিনাশকারীদের তাঁরা নিন্দা করতে লাগলেন।

মহাভারতে যাকে সর্বপাপাত্মার অধর্ম পাপাত্মা বলা হয়েছে, যাঁদের অধর্ম মহান ভারতের লজ্জা মহাভারতের ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে, সেই দুর্যোধন ও কর্ণের প্রশংসায় পঞ্চমুখ দেবতারা। তাদের লক্ষ্য করেই পুষ্পবৃষ্টি।

আর কৃষ্ণই প্রতিপন্ন হলেন অধার্মিক। তিনি অধর্মের সাহায্যে ভীষ্ম, কর্ণ, দুর্যোধনকে হত্যা করেছেন। অথচ কেউ একবার বলল না কৃষ্ণই ধৃতরাষ্ট্রের কাছে পাণ্ডবদের সঙ্গে সন্ধি করতে বলেছিলেন। দুর্যোধনকে বন্দি করে রাখতে বলেছিলেন। এজন্য দুর্যোধন তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্রও করেছিল।

একথা ঠিক কৃষ্ণ পাণ্ডবদের বলেছিলেন, দ্রোণকে সম্মুখ যুদ্ধে পরাস্ত করা সম্ভব নয়। যিনি দ্রোণকে পরাস্ত করতে পারতেন সেই অর্জুন আচার্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে অস্বীকার করেছেন। কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বলেছিলেন, দ্রোণ অস্ত্র পরিত্যাগ করলে তবেই মানুষ তাঁকে নিধন করতে সমর্থ হবে। তোমরা ধর্ম ত্যাগ করে দ্রোণকে নিহত করার চেষ্টা করো। একমাত্র অশ্বত্থামা নিহত একথা বললেই দ্রোণ অস্ত্র ত্যাগ করতে পারেন।

মিথ্যা কথা বলে দ্রোণকে হত্যা করার প্রধান পরামর্শদাতা বলে কৃষ্ণকে সবাই অপবাদ দেন। দুর্যোধন মৃত্যুর আগে তাঁকে এই কথা বলে গেছেন। অশ্বত্থামা তাঁকে পিতৃহত্যার জন্য দায়ী করেছেন। কিন্তু সেটি যে অর্ধসত্য তা তিনি কাকে বোঝাবেন।

দ্রোণকে যুদ্ধে পরাস্ত করার মতো একমাত্র অর্জুন ছাড়া পাণ্ডবপক্ষে কেউ ছিল না। দ্রোণ সহস্ৰ পাণ্ডবসৈন্যকে বধ করে এগিয়ে আসছিলেন। এই পরিস্থিতিতে কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে সমুচিত পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, দ্রোণকে তোমরা ধর্মযুদ্ধে পরাস্ত করতে পারবে না। অতএব অন্য পথে তাকে পরাস্ত করার চেষ্টা করো। তাঁর হাতে অস্ত্র থাকতে কেউ তাঁকে পরাস্ত করতে পারবে না। অতএব তোমরা আগে তাঁকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা করো। অশ্বত্থামার মৃত্যুসংবাদ তাঁকে দিলে তিনি হয়তো অস্ত্র ত্যাগ করতে পারেন।

কিন্তু এই মিথ্যা কথাটা কৃষ্ণ তো নিজে বলেননি। অর্জুনকে দিয়ে ওই মিথ্যা কথাটা বলানোর চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু অর্জুন মিথ্যা বলতে রাজি হলেন না। যুধিষ্ঠিরও মিথ্যা বলবেন না। তখন ভীম অশ্বত্থামা নামক একটি হাতিকে হত্যা করে যুধিষ্ঠিরকে বলতে বললেন। কথাটা অসত্য নয়—সত্যিই অশ্বত্থামা হত। ভীম গিয়ে দ্রোণকে চিৎকার করে শুনিয়ে বললেন, আর যুদ্ধে কাজ কী? অশ্বত্থামা হত হয়েছেন। দ্রোণ শুনে আনমনা হয়ে গেলেন। একথা তিনি বিশ্বাস করেননি। অশ্বত্থামার বীরত্বে তিনি আস্থাবান ছিলেন। তিনি ধৃষ্টদ্যুম্নের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগলেন। তারপর যুধিষ্ঠিরকে জিজ্ঞাসা করলেন, অশ্বত্থামা কি সত্যিই হত? যুধিষ্ঠির চেঁচিয়ে বললেন, হ্যাঁ, অশ্বত্থামা হত। তারপর সত্য রক্ষার জন্য খুব আস্তে যেন নিজের বিবেককে শুনিয়ে বললেন, ‘ইতি গজ’। তাতে কী হল? দ্রোণ বিমনা হয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। কিন্তু যুদ্ধে ক্ষান্ত দিলেন না। যুদ্ধ চালিয়ে যেতে লাগলেন। ধৃষ্টদ্যুম্নের রথ বিনষ্ট হল। দ্রোণের সঙ্গে যুদ্ধে তাঁর সব অস্ত্র বিনষ্ট হল। দ্রোণের হাতে তিনি মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। তখন ভীম গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করলেন।

ভীম দ্রোণকে উদ্দেশ করে বললেন, হে ব্রাহ্মণ, আপনি ব্রাহ্মণের ধর্ম হিংসা পরিত্যাগ না করে চণ্ডালের মতো অর্থলালসা চরিতার্থ করার জন্য প্রাণীগণের প্রাণ বিনাশ করছেন। আপনি কেন লজ্জিত হচ্ছেন না? তখন দ্রোণ অস্ত্র ত্যাগ করে যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাসনে বসে পড়লেন। যুধিষ্ঠির যখন বলেছেন অশ্বত্থামা হত, তখন অশ্বত্থামা আর নেই। প্রিয়তম পুত্র বিহনে তাঁর আর কীসের জন্য বেঁচে থাকা। তিনি যোগবলে প্রাণ ত্যাগ করলেন। ধৃষ্টদ্যুম্ন যখন তাঁর মুণ্ডচ্ছেদ করলেন, তখন দ্রোণের আত্মা পরমাত্মার সঙ্গে লীন হয়ে গেছে।

কৃষ্ণ তাঁর বিরুদ্ধে সব অপরাধ ঝেড়ে ফেলে দিয়েছেন। তিনি জানেন যিনি কাজ করেন, যিনি সক্রিয়, তিনি ভালো কাজ করলেও কিছু নেতিবাদী লোকের বিদ্রুপ ও নিন্দা শুনতে হয়। যিনি নিষ্ক্রিয়, তাঁর কোনো শত্রু নেই। বরং তাঁর ভাগ্যে প্রশংসা ও পুরস্কার জোটে। এর ওপর কৃষ্ণ মনে করেন প্রশংসা-নিন্দা দুটিই ভাগ্যের ব্যাপার। বহু মানুষ কুকাজ করেও প্রশংসিত হন। কিছু না করেও পুরস্কৃত হন। মনুষ্যপদবাচ্য নন এমন বহু মানুষ অযাচিতভাবে রাজসম্মান পেয়ে থাকেন। আবার বহু যোগ্য, উদার ও পরহিতব্রতী মানুষ সারাজীবন অবহেলিত থাকেন। প্রশংসা ও সম্মান লাভের মোহও একটি আসক্তি। কৃষ্ণ নিজের জীবনেই আসক্তি ত্যাগের দুর্জয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার চেষ্টা করেছেন। বড় কঠিন সে কাজ।

কিন্তু মানুষের ভালো-মন্দ, পাপ-পুণ্য, ন্যায়-অন্যায়ের একমাত্র বিচারক তার বিবেক। জনগণের বিচারে উত্তীর্ণ হলেও বিবেকের বিচারে সে উত্তীর্ণ নাও হতে পারে। অশ্বত্থামা হত ইতি গজ’ যুধিষ্ঠিরের এই অনৃতভাষণ আজ ৩৬ বছর ধরে তাড়া করে ফেরে কৃষ্ণকে। যুধিষ্ঠির সেদিন মিথ্যা না বললে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের গতি অন্যরকম হতে পারত।

তিনি যদি ইঙ্গিত না করতেন, অনুমোদন না দিতেন, তাহলে ‘অশ্বত্থামা হত’ কথাটা যুধিষ্ঠির বলতেন না। পাণ্ডব বিজয় অসম্ভব হয়ে উঠত। তিনি এক আজীবন শুদ্ধাচারী রাজ-অনুগত, হিতব্রতী শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণের মৃত্যুর জন্য দায়ী হয়েছেন। এই অপরাধেই তাঁর স্বপ্নের রাজ্য দ্বারকা ছারখার হয়ে গেল। তাঁর বিশ্বস্ত অনুগতেরা কেউ তাঁর আদর্শ গ্রহণ করল না। অসংখ্য গোষ্ঠীতে তারা ভাগ হয়ে গেল। অক্রূর, সাত্যকি, কৃতবর্মা, দারুক—এদের প্রত্যেককে তিনি এক একটি অর্জুন তৈরি করতে চেয়েছিলেন। বীর, শাস্ত্রজ্ঞ, ন্যায়পরায়ণ, পরহিতব্রতী এবং কৃষ্ণের প্রতি অনুগত, প্রজাদের প্রতি সংবেদনশীল এবং সর্বোপরি সৎ। কিন্তু তা হল কই? অর্জুনের মতো শিষ্য-সখা একজনই হয়।

তাই তিনি ঠিক করেছেন যদুবংশ নিজের হাতে ধ্বংস করে ফেলবেন। অথবা তারা নিজেদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে হানাহানি করে মারা যায় তার ক্ষেত্র আরও প্রস্তুত করে দেবেন। গত দশ বছর ধরে একটু একটু করে তাঁর মন ভেঙে যাচ্ছিল। সেই স্যমন্তক মণি আত্মসাতের দায় তার ওপর চাপানোর থেকে আইন-শৃঙ্খলার পতন, দ্বারকাবাসীর নৈতিক অবনতি, এসব দেখে একটু একটু করে তাঁর মন বিষাদে ভরে উঠছিল। তার ওপর ব্যাপকভাবে মদ্যপানাসক্তি এবং মদের খরচ জোগানোর জন্য ব্যাপক দুর্নীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। দ্বারকা আজ একটি উন্নত রাজ্য। রাজ্যের প্রতিটি নাগরিক উপার্জনশীল। কোথাও দারিদ্র্য নেই। নতুন ঝাঁ-চকচকে নগরী, সমুদ্র উপকূলের বালুকাময় পরিত্যক্ত জমি ও ঝাউবন কেটে বিশাল নগরী দ্বারাবতী তৈরি করেছেন। মথুরা বাসকালে তিনি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন বারবার বিদেশি রাজাদের আক্রমণ প্রতিহত করে। এর মধ্যে জরাসন্ধের বারবার আক্রমণ প্রতিহত করেছেন। শেষে জরাসন্ধকে হত্যা করে মথুরাকে নিষ্কণ্টক করেছেন। এই জরাসন্ধ নিধনের ব্যাপারেও সমালোচকরা বলেছেন অন্যায়ভাবে চোরের মতো মগধনগরীতে ঢুকে কৃষ্ণই জরাসন্ধকে হত্যা করেছেন। মিথ্যা। মিথ্য। জরাসন্ধ ভীমের হাতে মারা পড়েন মল্লযুদ্ধে। কেউ কিন্তু বলেন না জরাসন্ধ নৃশংস, অত্যাচারী, পররাজ্য লোভী। তিনি একশো রাজাকে ধরে এনে বন্দি করে দেবতার কাছে বলি দেবেন মনস্থ করেছিলেন। একশো পুরতে কিছু বাকি ছিল। সে সময় কৃষ্ণ গিয়ে না পড়লে, জরাসন্ধকে হত্যা না করলে, এই একশো রাজার রক্তে ভেসে যেত মগধ। আজ জরাসন্ধের পুত্ররা পাণ্ডবদের বন্ধু। তাঁরা পিতার মতো নৃশংস হয়নি।

কৃষ্ণ যে প্রাগজ্যোতিষপুর গিয়ে দৈত্য নরকাসুরকে বধ করে তাঁর ষোলো হাজার পত্নীকে দ্বারকায় নিয়ে আসেন, তাঁদের তিনি স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে দ্বারকায় তাদের প্রাসাদে রক্ষিত রাখেন। নরকাসুরের অত্যাচারে এই নির্যাতিতা রমণীদের উদ্ধার করা নিয়ে কৃষ্ণকে কম অপবাদ সহ্য করতে হয়নি।

কৃষ্ণের কাছে নারীর মর্যাদা সর্বাগ্রে। তিনি তাঁর বিবাহিত ধর্মপত্নীদের প্রত্যেককে সমদৃষ্টিতে দেখেন ও স্বামীর কর্তব্য যথাযথ পালন করেন। কিন্তু তা নিয়েও তাঁর প্রিয়তমা পত্নী সত্যভামার অনুযোগ আছে যে কৃষ্ণ তাঁকে যথার্থ ভালোবাসে না।

কৃষ্ণ জানেন বিবাহের পূর্বে প্রথম প্রেমের মতো মথুরা প্রেম তুলনাহীন। বৃষ্টির আগে আকাশে মেঘের যে ঘনঘটা প্রাণ-মনকে আকুল করে তোলে, বর্ষণ শেষের নীলাকাশের রামধনু কিন্তু অত হৃদয় চাঞ্চল্য জাগাতে পারে না। বিবাহের আগের প্রথম প্রেম ঝরনার মতো, সে ক্ষীণা কিন্তু তীব্র প্রবহমানা। নদীর সঙ্গমে মেলা না পর্যন্ত তার বিরতি নেই। বিবাহিত প্রেম স্বচ্ছ নিস্তরঙ্গ সরোবরের মতো। তা নিত্য ব্যবহারের জন্য স্বচ্ছন্দ কিন্তু সেখানে ঝিরিঝিরি ঝরনার আকুলতা কোথায়? কৃষ্ণ প্রেমিক, কিন্তু দার্শনিক। শ্রীরাধাকে তিনি ভোলেননি। ভুলতে পারবেন না।

কৃষ্ণের গভীর বিষাদের আরও বড় কারণ তাঁর পুত্রেরা যৌবনমদে মত্ত, প্রবীণের শাসন নাশন। মাতামহ উগ্রসেন বৃদ্ধ হয়েছেন। কৃষ্ণ সিংহাসন নেবেন না। তাঁর একটি ছেলেও যদি যোগ্য অধিকারী হত। প্রদ্যুম্ন তবু ভালো যোদ্ধা তৈরি হয়েছে। কিন্তু তার শাসক হবার অন্য যোগ্যতা নেই। কৃষ্ণের একমাত্র ভরসা ছিল তার প্রিয় পুত্র শাম্ব। অতি সুদর্শন। শাম্ব যখন পথ দিয়ে চলে তখন রাজপথের সমস্ত প্রাসাদের বাতায়ন খুলে যুবতীরা তাকে দেখার জন্য উদগ্র নয়নে তাকিয়ে থাকে।

কিন্তু শাম্ব ইন্দ্রিয়াসক্ত, ভোগী, অনিন্দ্যকান্তি যুবকের কাছে কামবিলাসী নারীরা মক্ষিকার মতো ভনভন করবে। তদুপরি নারীস্বভাব কামী। তাদের প্রবণতা সুন্দরের কাছে, বিশিষ্টজনের কাছে, বীরের কাছে আত্মসমর্পণ। কৃষ্ণ সারাজীবন নারীসঙ্গ করেছেন। তিনি প্রেমকে পূজায় পরিণত করতে জানেন। দেহের সীমানা ছাড়িয়ে প্রেমকে তিনি জীবাত্মা-পরমাত্মার মিলনে পরিণত করতে জানেন। তিনি যে ষোলো হাজার যুবতীকে এনে স্ত্রীর মতো করেই রক্ষিত করে রেখেছেন, তাদের কাউকে তিনি স্পর্শ করেননি। বৃন্দাবনেও তিনি গোপীদের সঙ্গে রাসলীলা করেছেন তা বিশুদ্ধ শিল্পচর্চা। নৃত্য-গীত সম্বলিত সাংস্কৃতিক বিনোদন। নৃত্য ও সংগীতের মধ্যেও সৃষ্টিসুখের উল্লাস আছে। নৃত্য তো চিত্ত দিয়ে সৌন্দর্যের পূজা। এক নান্দনিক উপলব্ধি, এক অলৌকিক মায়ার জগতে উত্তরণ।

কিন্তু শাম্ব নারীকে শুধু ভোগের সামগ্রী হিসাবেই দেখে। নিত্যনতুন নারীর পিছনে ছুটে বেড়ায়। এমনকী, কৃষ্ণের রক্ষিত ষোলো হাজার নারীর কারও কারও সঙ্গে তার দৈহিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। কৃষ্ণ এই সংবাদে বিচলিত হয়েছিলেন। নিজে প্রমাণও সংগ্রহ করেছিলেন। তারপর তাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন, তোমার কুষ্ঠ হবে। এই সুন্দর অঙ্গ বিকৃত হয়ে যাবে। নিজের প্রাণাধিক পুত্র বলে কৃষ্ণ তাকে ক্ষমা করেননি। আজ শাম্ব কোথায় কে জানে।

এই মিথ্যা অপবাদের বোঝা তো তাঁকে যৌবন থেকে বহন করতে হচ্ছে। একদিকে ঈশ্বর বলে তিনি জনগণের কাছে বন্দিত। অন্যদিকে তাঁর মাতুলের চক্রান্তে তিনি জন্ম থেকেই আপন মাতৃস্নেহ পরিত্যক্ত হয়ে গোকুলে পালিতা মাতা যশোদার কাছে মানুষ হয়েছেন। গোপনারীরা তাঁকে পছন্দ করত, তিনিও শৈশব থেকে নারীদের পছন্দ করতেন। নারী তাঁর কাছে স্নেহময়ী, অনন্ত শক্তি আধার, পুরুষের অনুপ্রেরণা। তিনি তাঁদের সঙ্গে অবাধে মিশতেন, নাচ-গান করতেন। তা নিয়ে কত অপবাদ শুনতে হয়েছে তাঁকে।

তিনি নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশায় বিশ্বাস করতেন। বিশ্বাস করতেন যৌন সম্পর্কের বাইরে নারী-পুরুষ প্রীতি অনুরাগের সম্পর্কে পরস্পরের প্রতি ঘনিষ্ঠ হতে পারে। নাচ-গান-ক্রীড়ার মধ্য দিয়ে পরমানন্দ লাভ করতে পারে। গোপরমণীর তাঁকে পছন্দ করত। তাঁর সঙ্গে মেলামেশায় আনন্দ পেত। সেই পরমানন্দ থেকে তিনি তাদের বঞ্চিত করেননি। কিন্তু বহু মানুষ তাঁকে ভুল বুঝেছে। হ্যাঁ, তিনি শ্রীরাধাকে ভালোবাসতেন। রাধা ছিল তাঁর হ্লাদিনী শক্তি। রাধার সঙ্গে তাঁর ছিল সত্যিকারের প্রেম। সে প্রেম তখন তাঁর কাছে এক পবিত্র জীবনীশক্তি, যা জীবনকে ঋদ্ধ করে, পরিশুদ্ধ করে, অনুপ্রাণিত করে। রাধা পরস্ত্রী ছিলেন। কৃষ্ণ তাই তাঁর প্রেমকে বেশিদূর নিয়ে যাননি। তাও তাঁর নামে অপবাদ দেওয়া হয়েছে রাধাকে তিনি বিবাহ করেছেন।

মথুরায় চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের প্রেমলীলার ওপর যবনিকা পড়েছে। কৃষ্ণ বিবাহিত জীবন যাপন করে এসেছেন তাঁর বিবাহিতা পত্নীদের নিয়ে।* তাঁকে নিয়ে বহু মিথ্যা সমাজে প্রচলিত হয়েছে। কৃষ্ণ মনে করেন নিন্দা-প্রশংসা সবই দৈবের বিধান।

[* কৃষ্ণের কতগুলি পত্নী ছিলেন তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত আছে। মহাভারতে মোট আটজন মহিযীর নাম পাওয়া যায়—রুক্মিণী, সত্যভামা, গান্ধারী (ইনি অন্য গান্ধারী, ধৃতরাষ্ট্র মহিষী নন।) শৈব্যা, হৈমবতী, জাম্ববতী, ব্রতিনী ও প্রজ্বাপিনী। বিষ্ণুপুরাণে আছে কৃষ্ণের ১৬ হাজার সাতজন পত্নী ছিলেন। বিষ্ণুপুরাণে আছে কৃষ্ণের এক লক্ষ আশি হাজার পুত্র ছিল।]

কৃষ্ণ দ্বারকার রাজপ্রাসাদে রাজা উগ্রসেনের সঙ্গে দেখা করে বললেন, মাতামহ, আমি জানতে পেরেছি এক বিরাট প্লাবন আসছে। দ্বারকা প্লাবিত হয়ে যাবে। আমি প্রভাস তীর্থে নাগরিকদের নিয়ে যেতে চাই। সেখানে একটি শিবির নগরী তৈরি করার আদেশ দিন। আর প্রভাস যাত্রা সব নাগরিকের আবশ্যিক করুন। যারা দ্বারাবতীতে থাকতে চান তাঁরা নিজের দায়িত্বে থাকবেন।

উগ্রসেন বললেন, তুমি রাজপরিবারের নারীদের নিয়ে যাবার কী ব্যবস্থা করেছ বৎস? কৃষ্ণ বললেন, আগে নাগরিকদের স্থানান্তর করি। রাজমহিষীদের আমি হস্তিনানগরে পাঠাতে চাই। সেখানে তারা আরও নিরাপদ।

—তুমি কি মহারাজ যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে কথা বলেছ?

—আমি অর্জুনকে একটি পত্র দিয়েছি আহুককে আমার রথ দিয়ে পাঠাচ্ছি। অর্জুন নিজে এসে তাঁদের নিয়ে যাবেন। আপনি চিন্তা করবেন না।

উগ্রসেন বললেন, অর্জুন তো বৃদ্ধ হয়েছেন। তিনি কী এই দায়িত্ব সামলাতে পারবেন? কৃষ্ণ বললেন, মাতামহ, আমিও তো বৃদ্ধ হয়েছি। অর্জুন আমার চেয়ে ছ’মাসের ছোট। সে চির তরুণ। আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। এখনও অর্জুন আগের মতোই গাণ্ডীবে টঙ্কার দিতে পারেন। বিগত ৩৬ বছর ধরে আর যুদ্ধবিগ্রহ হয়নি। অর্জুন যুদ্ধ করার সুযোগ পেলে খুশিই হবে।

কৃষ্ণ মনে মনে পরিকল্পনা করছেন, প্রভাস তীর্থই হবে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জীর্ণ দুর্নীতিগ্রস্ত যাদবদের যাত্রা। তারা আর কেউ ফিরে আসবে না। তিনি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন যদুবংশ গোষ্ঠী সংঘর্ষে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

ধ্বংস হয়ে গেলে নতুন যুগের নতুন মানুষদের নিয়ে তিনি নবদ্বারকা গড়ে তুলবেন। এবার আর ভুল করবেন না। তিনি কড়া হাতে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করবেন। তার আগে প্রভাস হয়ে উঠুক যাদবদের বধ্যভূমি। তাই তিনি ইঙ্গিত করলেন—চলো প্রভাস।

.

পরদিন মেঘাচ্ছন্ন দ্বিপ্রহরে প্রবল দমকা বাতাসের মধ্যে অশ্বত্থামা পথে বেরিয়ে পড়েছেন। ধর্মশালার বাইরে বেরিয়ে একটু দূরে দেখলেন অল্পবয়সি কিছু ছেলে জটলা করছে। অশ্বত্থামা এগিয়ে যেতেই ছেলেরা তাঁর দিকে এসে আঙুল দেখিয়ে কী বলতে লাগল। আর হা হা করে হাসতে লাগল।

একটি ছেলে এসে অশ্বত্থামার দাড়ি ধরে টানতে লাগল। অশ্বত্থামা তাঁর লাঠিটা নিয়ে ছেলেটির পিঠে একটি বাড়ি মারতেই ছেলেগুলি পালিয়ে গেল।

অশ্বত্থামা রাজপথে এসে দেখলেন মাথার ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে কাক উড়ছে। এক জায়গায় এসে দেখলেন শত শত ইঁদুর রাস্তা আটকে ছোটাছুটি করছে। তিনি লাঠি নিয়ে ইঁদুর তাড়াতে তাড়াতে চলতে লাগলেন। দেখলেন ঘোড়ার পিঠে চড়ে একদল লোক অস্ত্র হাতে কোথায় যাচ্ছে। এদের রাজসৈন্য বলে মনে হচ্ছে না। হয়তো লুঠেরা বা আক্রমণকারীর দল। কিছুদূর গিয়ে অশ্বত্থামা ক্লান্ত হয়ে একটি গাছের নীচে বেদীতে বসে পড়লেন। তিনি কৃষ্ণের প্রাসাদ খুঁজতে বেরিয়েছেন। কৃষ্ণ যদি মারা যান, তাহলে তাঁকে চার হাজার বছর অভিশাপের বোঝা নিয়ে বেড়াতে হবে। আবার তিনি প্রভাসে চলে গেলেও দেখা হবে না। অশ্বত্থামা বসে বসে ভাবতে লাগলেন।

[* কৃষ্ণের মৃত্যুর পর অর্জুন দ্বারকায় এসে দ্বারকার পুরবাসীদের প্রহরা দিয়ে হস্তিনাপুর নিয়ে যাচ্ছিলেন। পঞ্চনদের দেশে এসে অর্জুনকে পরাস্ত করে অসংখ্য নারীকে লুণ্ঠন করে নিয়ে যায়। বয়সের ভারে বৃদ্ধ অর্জুন তাঁর গাণ্ডীব তুলতেই পারেননি।]

অশ্বত্থামা উদ্ভ্রান্তের মতো তাকিয়ে। তাঁর সারা দেহ গৈরিক পোশাকে ঢাকা। শ্মশ্রুগুম্ফমণ্ডিত মুখের কিছুটা উন্মোচিত। হাতে লাঠি। অশ্বত্থামা মুখ তুলে চাইলেন। একজন নগররক্ষী তাঁকে বলছে—

—কে তুমি? বৃষ্ণি না অন্ধক? এখানে কী করছ? জানো না, রাজপথে নাগরিকের বার হওয়া নিষিদ্ধ। রাজা উগ্রসেন বারবার ঘোষণা করেছেন রাজপথে কোনো নাগরিককে দেখলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে বন্দি করা হবে। তোমার রাজ-আজ্ঞা লঙ্ঘনের দুঃসাহস হয় কী করে?

অশ্বত্থামা বললেন, আমি একজন সন্ন্যাসী পর্যটক। হস্তিনাপুর থেকে আসছি। আমি জানতাম না দ্বারকায় অশান্তি চলছে।

—তুমি কি উন্মাদ? সবাই জানে আর তুমি জানতে না দ্বারকায় এখন মহাসংকট চলছে? বহু মানুষ গৃহহীন। তারা আশ্রয় শিবিরে রয়েছে।

—প্রভু, আমায় একটা আশ্রয় শিবিরে নিয়ে চলুন। আমি ভীষণ ক্ষুধার্ত।

—তুমি বৃষ্ণি না অন্ধক কোন আশ্রয় শিবিরে যেতে চাও?

—আমি ব্রাহ্মণ। আর্যাবর্তের ব্রাহ্মণ। আমি আচার্য দ্রোণের পুত্র। আমি কৃষ্ণের সাক্ষাৎপ্রার্থী।

—তিনি তোমাকে চেনেন? তোমার কাছে কোনো অভিজ্ঞান আছে? তোমাদের রাজা তো যুধিষ্ঠির। তাঁর কোনো অনুজ্ঞাপত্ৰ আছে। অথবা কৃষ্ণের ভ্রাতা ও বন্ধু অর্জুনের কোনো পরিচয়পত্র?

অশ্বত্থামা মাথা নেড়ে বললেন, না, কৃষ্ণ আমাকে চেনেন। আমি ৩৬ বছর আগে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছি। আমি তখন রাজ-অতিথি হয়ে ছিলাম। আমাকে আপনারা কৃষ্ণের প্রাসাদে ছেড়ে দিন। আমি দ্বাররক্ষীকে বলে ঠিক তাঁর কাছে পৌঁছে যাব। আমি কৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে চাই।

এবার লোকটি ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলল, তোমার তো স্পর্ধা কম নয়? দেখে তো মনে হচ্ছে তুমি সন্ন্যাসী। তদুপরি অসুস্থ। কৃষ্ণ এখন অত্যন্ত ব্যস্ত। তিনি কখন কোথায় থাকেন কেউ বলতে পারে না। তোমাকে ত্রাণশিবিরে দিয়ে আসি চলো। এই শকটে ওঠো। তুমি বিদেশি, তায় বৃদ্ধ, তদুপরি অসুস্থ। নয়তো আমরা তোমায় বন্দি করতাম। চলো, শকটে ওঠো।

তারপর কী মনে ভেবে বলল, তুমি অর্জুনকে চেনো?

—তিনি আমার শৈশবের বন্ধু। আমরা একসঙ্গে যুদ্ধ করেছি।

সৈনিক বলল, তাঁর সৈন্যবাহিনী নিয়ে দ্বারকায় আসার কথা। কৃষ্ণ তাঁকে খবর পাঠিয়েছেন। তুমি জানো কিছু?

অশ্বত্থামা বললেন, না প্রভু। আমি ছ’মাস আগে পদব্রজে যাত্রা করেছি। আমি দ্বারকার গৃহযুদ্ধের কোনো সংবাদও জানতাম না।

—তোমার আগমনের কারণ কী? শুধু নগর দর্শন, না তুমি প্রভাস তীর্থে যাবে? কৃষ্ণ দ্বারকার সমস্ত নাগরিককে এখান থেকে অপসারণ করতে চান। দ্বারকা নিরাপদ নয়। এই আশ্রয় শিবিরও বন্ধ হয়ে যাবে।

অশ্বত্থামার মনে পড়ে গেল কৃতবর্মার কথা। কৃতবর্মা দ্বারকায় ফিরে গেছেন তিনি জানতেন। এখন তিনি কোথায়? তাঁর দেখা পেলেও তিনি তাঁর মাধ্যমে কৃষ্ণের কাছে যেতে পারেন।

অশ্বত্থামা বললেন, আমায় কৃতবর্মার কাছে পৌঁছে দেবেন? কৃতবর্মা আমার বিশেষ বন্ধু।

রাজসৈনিক তার শুনে তার দুজন সহকর্মীকে ডেকে বলল, এই সন্ন্যাসী বলছে সে হস্তিনানগর থেকে আসছে। দাবি করছে কৃতবর্মার বন্ধু। তার কাছে যেতে চায়।

তারা তিনজন নিজেদের মধ্যে কী কথা বলে নিল। তারপর বলল, বেশ তো, আমরা কৃতবর্মার প্রাসাদের দ্বারদেশে তোমাকে ছেড়ে দিচ্ছি। এর জন্য আমাদের একশত স্বর্ণমুদ্রা দিতে হবে।

অশ্বত্থামার আশার আলো নিভে গেল। তিনি বললেন, আমি একশো স্বর্ণমুদ্রা কোথায় পাব প্রভু? আমি ভিনদেশি সন্ন্যাসী।

রাজসৈনিকের নজরে পড়ে গেল অশ্বত্থামার আঙুলে একটি স্বর্ণাঙ্গুরীয় রয়েছে। সে বলল, বেশ, তাহলে ওই অঙ্গুরীয়টি আমায় খুলে দাও।

অশ্বত্থামা তাঁর অঙ্গুরীয়টি খুলে দিলেন। সৈনিকেরা অশ্বত্থামাকে অশ্ব শকটে করে নগরীর মধ্যস্থলে কৃতবর্মার প্রাসাদের তোরণের সামনে ছেড়ে দিয়ে চলে গেল।

দ্বারকায় এখন সূর্য ওঠে না। তাই সূর্য দেখে প্রহর বলা মুশকিল। তবে বোঝা যায় এখন দ্বিপ্রহর।

.

কৃতবর্মার সঙ্গে সাক্ষাৎ

কৃতবর্মা, সাত্যকি, অক্রূর ও কৃষ্ণের অন্যতম পুত্র প্রদ্যুম্ন বসে একটি বৈঠক করছিলেন। আগামীকাল প্রত্যুষে দ্বারকাবাসী প্রভাসে নিয়ে যাওয়া হবে। এক সহস্র অশ্ব শকটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একদিনে হয়তো সবাইকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। ঠিক হয়েছে, আরও দুদিন ধরে এই নির্গমন চলবে।

কৃতবর্মার কথা পাঠকদের মনে আছে? তিনি কৃষ্ণের নারায়ণী সেনার সেনাপতি হিসাবে করুক্ষেত্রের যুদ্ধে দুর্যোধনের পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন। পাণ্ডব শিশুহত্যায় তিনিও অশ্বত্থামার সাথী ছিলেন। কিন্তু কৃতবর্মা এবং কৃপাচার্য এজন্য কোনো শাস্তি ভোগ করেননি। কৃপাচার্য এখন যুধিষ্ঠিরের সৈন্যবাহিনী দেখাশোনা করেন। পরীক্ষিতকে তিনি অস্ত্রবিদ্যা শেখাতেন। আর কৃতবর্মা দ্বারকায় ফিরে যাওয়ার পরে উগ্রসেন তাঁকে রাজকীয় উপদেষ্টা করেছেন। এই উপদেষ্টাদের মধ্যে আছেন সাত্যকি, অক্রূর ও কৃতবর্মা।

বৈঠক শেষ হবার পর উপদেষ্টারা আপন গৃহে প্রত্যাবর্তন করবেন। প্রভাস যাত্রার সব আয়োজন প্রস্তুত। ঠিক হয়েছে নাগরিকরা তাঁদের প্রয়োজনীয় কিছু পরিধেয় বস্ত্র ছাড়া আর কিছু সঙ্গে নেবেন না। কারণ শকটে এত জায়গা নেই। কিন্তু সবাই দাবি তুলেছেন তাঁদের সঙ্গে কয়েকটি মদের বোতল নিয়ে যেতে দিতে হবে। দ্বারকায় উগ্রসেন মদ্যপান নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। কিন্তু প্রভাসে তো মদ্যপান নিষিদ্ধ নয়। সেখানে মদ্যপান ও দ্যূতক্রীড়া ছাড়া তাঁদের করারই বা কি আছে?

উগ্রসেন বলেছেন, কিছুতেই সেখানে মদ নিয়ে যাওয়া যাবে না। তিনি প্রভাসকেও মদ্যপান নিষিদ্ধ নগরী বলে ঘোষণা করবেন বলে মনস্থ করেছেন। কিন্তু নাগরিক প্রতিনিধি বসুপাল মুখের ওপর বলে দিয়েছেন, মদ্যপান যাদবদের জন্মগত অধিকার। তাঁরা দ্বারকায় মদ্যপান নিষেধ করার আদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছেন। প্রভাসে তো এই নিষেধাজ্ঞা কিছুতেই জারি করা যেতে পারে না। অতএব সঙ্গে মদ নিয়ে যেতে না দিলে তাঁরা কেউই প্রভাস যাবেন না।

প্রদ্যুম্ন অবশেষে নাগরিকদের দাবি মেনে নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রতিটি পরিবার মাত্র দুটি করে বোতল নিয়ে যেতে পারবেন, তার বেশি নয়।

এমন সময় প্রাসাদ তোরণের ভারপ্রাপ্ত রক্ষী এসে কৃতবর্মাকে খবর দিল, এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসী আপনার সাক্ষাৎপ্রার্থী। সে বলছে হস্তিনানগর থেকে আসছে। নাম বলছে অশ্বত্থামা। দাবি করছে সে আপনার পুরাতন বন্ধু।

কৃতবর্মা একটু অবাক হয়ে গেলেন। দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা তো নিরুদ্দেশের পথে যাত্রা করেছিলেন। তিনি এই সময় দ্বারকায়? তবে কি তাঁর শাপমোচন হয়েছে?

কৃতবর্মা বললেন, যাও, তুমি অশ্বত্থামাকে এখানে নিয়ে এসো।

কৃতবর্মা প্রথমে অশ্বত্থামাকে চিনতে পারলেন না। ৩৬ বছরে তার চেহারা অনেকটাই বদলেছে। তারপর বুঝতে পারলেন, হ্যাঁ অশ্বত্থামাই। তিনি বললেন, আচার্যপুত্র, আপনি? এ কি স্বপ্ন না মায়া? আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন, কী করছিলেন? এত যোজন পথ অতিক্রম করে দ্বারকায় কীভাবে এলেন?

অশ্বত্থামা বললেন, আর্য, এই বসুধাতে আশ্চর্য বলে কোনো বস্তু নেই। আমাকে তুমি চিনতে পেরেছ বলে আমি ধন্য মনে করছি। আমি কি একটু বসতে পারি?

কৃতবর্মা বললেন, এ আপনি কী বলছেন। আপনি একে ব্রাহ্মণ, তায় দ্রোণপুত্ৰ। আপনি আমার সেনাপতি। আপনাকে কি ভুলতে পারি?

—আমি আজ অভিশপ্ত, হতভাগ্য কৃতবর্মা। যে অপরাধের জন্য আমি অভিশপ্ত, সে অপরাধে তুমি ও আমার মাতুল কৃপাচার্য দুজনেই সমান দায়ী ছিলে। কিন্তু মাতুল আজ কুরুসেনাপতি, তুমি কৃষ্ণের উপদেষ্টা। আমিই অভিশাপ বহন করে জীর্ণ দেহে ঘুরে বেড়াচ্ছি।

কৃতবর্মা বললেন, আপনি আমার আলয়ে এসেছেন আচার্যপুত্র, আপনি আমার অতিথি। আপনি উপবেশন করুন। এখন আহারের সময়। আসুন আমরা সর্বাগ্রে স্নানাহার সারি। আপনি আগে স্নান সারুন, আহার করুন, তারপর আপনার কথা শুনব।

.

কৃতবর্মার গৃহে অশ্বত্থামা স্নানাহার সেরে একটু সুস্থবোধ করলেন। নইলে তিনি ক্ষুধার্ত ছিলেন। সকালে তিনি ধর্মশালা থেকে অভুক্ত অবস্থায় বেরিয়েছেন। তাঁর কাছে কোনো মুদ্রা নেই। সম্পদ বলতে একটি অঙ্গুরীয় ছিল তাও সৈন্যরা নিয়ে নিয়েছে। তিনি ক্ষুধার্ত। দ্বিপ্রহরে কোথায় আহার জুটবে তা জানতেন না। অভাবনীয়ভাবে তাঁর আজ রাজকীয় আহার জুটে গেল।

আহারের পর কৃতবর্মা বললেন, আমি আজ খুব ব্যস্ত আচার্যপুত্র। কাল প্রভাতে দ্বারকা থেকে কয়েক সহস্র লোককে প্রভাস নিয়ে যেতে হবে। দ্বারকার সামাজিক অবস্থা আপনি দেখেছেন। রাজনৈতিক অবস্থাও ভালো নয়। কৃষ্ণ বৃদ্ধ হয়েছেন। আপনি তাঁর পরাক্রম জানেন। তিনি হস্তিনাপুরে একটি বংশ ধ্বংস করে নতুন বংশ স্থাপন করেছেন। একাদশ অক্ষৌহিণী সৈন্যকে নির্মূল করে দিয়ে এসেছেন। সেই কৃষ্ণ নিজভূমিতে বড় অসহায়। তাঁর বিশ্বস্ত পরিষদেরাই কেউ তাঁকে মানেন না। মুখে সকলেই তাঁকে ভগবান বলে, কিন্তু অন্তরে তাঁকে চায় না। তাঁর প্রিয় পুত্র শাম্ব কন্দৰ্পকান্তি দেহ নিয়ে শুধু নারীপ্রিয় হয়ে রইল। প্রমোদে-বিলাসে যৌবন কাটিয়ে দিল। তার জন্যই আজ যদুবংশ অভিশাপগ্রস্ত। সে ব্রাহ্মণ ও সম্মাণীয়দের সম্মান দিতে শিখল না। নারী ও সুরাই তার কাছে প্রিয়।

অশ্বত্থামা বললেন, কৃষ্ণও তো নারী প্রিয়। তাঁর উনিশজন মহিষী*, ষোলো হাজার পত্নী।

[*কৃষ্ণের মহিষীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে।]

কৃতবর্মা বললেন, তুমি কৃষ্ণের দ্বারা শাপগ্রস্ত। কৃষ্ণের প্রতি তোমার ক্রোধ ও অভিমান আছে। কিন্তু কৃষ্ণ সমস্ত নারীকে সম্মান দিয়ে রেখেছেন। নারীর সম্মান তিনি প্রাণ দিয়ে রক্ষা করেন। বহুবিবাহ তো ধর্ম নিষিদ্ধ কোনো পাপাচার নয়। মুনি-ঋষিরাও অনেকে বহুবিবাহ করেছেন।

কিন্তু কৃষ্ণের শৌর্য, বীর্য, প্রজ্ঞা, অধ্যাত্মজ্ঞান, রাজনৈতিক দূরদর্শিতার সারা ভারতে জুড়ি খুঁজে পাওয়া ভার। দ্বারকার সমস্যা কৃষ্ণকে নিয়ে নয়, দ্বারকার প্রজাদের নিয়ে। এরা সংকীর্ণচেতা, বিভিন্ন গোষ্ঠীতে আবদ্ধ। প্রত্যেকেই তার গোষ্ঠীর স্বার্থ ভাবে, দেশের স্বার্থ নয়। একটি গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীকে ঘৃণা করে, তাদের সমৃদ্ধিতে হিংসা করে। দেশপ্রেম দেশ থেকে উবে গেছে। কৃষ্ণের পর দ্বারকার কী হবে? এই প্রশ্ন এখন উঠছে। খণ্ড খণ্ড হয়ে যাবে দ্বারাবতী। গৃহযুদ্ধের সূচনা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। বৃষ্ণি ও অন্ধকরা পরস্পরকে হত্যা করছে। কৃষ্ণ তাই দ্বারকার জনগণকে প্রভাসে নিয়ে গিয়ে সেখানে একটি সৎ ও যোগ্য মানুষদের একটি অভয়ারণ্য তৈরি করতে চান।

—দ্বারকার কী হবে?

—দ্বারকা কালের গর্ভে বিনষ্ট হয়ে যাবে। যে ভ্রষ্টাচারী মানুষেরা এখানে থাকবে তারাও বিনষ্ট হবে। কৃষ্ণ বারবার আমার কাছে দুঃখ করেছেন তাঁর বিশ্বস্ত লোকরা তাঁকে শুধু ব্যবহার করল, তাঁকে আদর্শ করল না। অথচ কৃষ্ণই আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থা ও আদর্শ মানব তৈরির জীবনদর্শন রচনা করেছেন। জ্ঞান, কর্ম, ভক্তির সমন্বয়ে গঠিত আদর্শ মানব গঠন তাঁর লক্ষ্য। কিন্তু একমাত্র অর্জুন ছাড়া কেউ তাঁকে বুঝল না। কিন্তু তুমি কেন এতদূর ছুটে এসেছ তা তো বলছ না।

অশ্বত্থামা বললেন, আমি কৃষ্ণর সঙ্গে দেখা করার জন্য ছুটে এসেছি। স্বয়ং মহর্ষি ব্যাস আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন কৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে। কৃষ্ণ আমাকে দুটি অভিশাপ দিয়েছিলেন। তিন হাজার বছর আয়ু আর মর্মন্তুদ সব ব্যাধি। এর মধ্যে রাজযক্ষ্মা থেকে আমি নিরাময় হয়ে উঠেছি। এখন আমি ভুগছি নানা বিস্ফোটক রোগে। কিন্তু আমি ব্যাধি থেকে মুক্ত হয়ে উঠব। আমি নিরাময়ের মন্ত্র জানি। উপযুক্ত ভেষজ প্রয়োগও শিখেছি। কৃতবর্মা বললেন, অশ্বত্থামা, আপনি আচার্য দ্রোণের একজন প্রতিভাধর পুত্র। আপনি আজও অপরাজিত। আপনি দুর্যোধনের শেষ সেনাপতি। আপনি অনর্থক শোক করবেন না। আপনি বলুন আমি আপনার জন্য কী করতে পারি?

অশ্বত্থামা মিনতি মাখা মুখে বললেন, যাদব বীর, আমাকে তুমি একবার কৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করিয়ে দাও। তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্যই আমি এতদূর ছুটে এসেছি।

কৃতবর্মা বললেন, আমি এখন কৃষ্ণের উপদেষ্টা। তাই কৃষ্ণের স্বার্থই বড় করে দেখব।

—কৃষ্ণকে আপনি কী বলতে চান? আপনি অনুতপ্ত। ক্ষমা করুন। এইসব? অশ্বত্থামা বললেন, না। আমি শুধু তাঁর কাছে একটি ভিক্ষাই চাইব—‘মৃত্যু ভিক্ষা’। বলব আপনি আমায় মৃত্যু দিন। তিন হাজার বছর বেঁচে থেকে এই রোগযন্ত্রণা আমি আর সহ্য করতে পারব না।

কৃতবর্মা বললেন, আচার্যপুত্র, একদিন আপনি আমার সেনাপতি ছিলেন। আপনার অন্যায় আদেশ আমি পালন করেছি। কারণ আমি কৃষ্ণের অনুগত সৈনিক। তিনি আমায় নারায়ণী সেনার সেনাপতি করে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু আজ আর আমি আপনার অধীনস্থ সৈনিক নই। আপনি যে কৃষ্ণকে হত্যা করতে আসেননি তা কী করে বুঝব? আমি আপনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আগে নিঃসন্দিহান হয়ে নিই।

অশ্বত্থামা বললেন, বলো আমি কীভাবে তোমার বিশ্বাস উৎপাদন করব। তুমি আমার দেহ অনুসন্ধান করে দেখতে পারো আমি কোনো গুপ্ত অস্ত্র বহন করছি কি না।

কৃতবর্মা বললেন, অস্ত্রবল না থাকলেও আপনার বাহুবল তো সর্বজনবিদিত।

অশ্বত্থামা তাঁর শীর্ণ বাহু বার করে দেখালেন, আমি চিরঞ্জীবী হলেও আমি বৃদ্ধ। জরা ইতিমধ্যেই আমাকে গ্রাস করেছে। অভিশপ্ত ব্যাধিতে আমি জর্জরিত। বাহুবলে আমি কৃষ্ণের কাছে একটি ছাগশিশু। তুমি বিশ্বাস করো কৃতবর্মা, গত ছত্রিশ বছর ধরে আমি শুধু ভেবেছি আর ভেবেছি। হিংসা বলো, অহিংসা বলো, পরিবর্তন কালচক্রের আবর্তনেই ঘটে থাকে। আমরা সেই চক্রের গতিটাকে বাড়াতে পারি মাত্র। যুদ্ধ হল দ্রুত পরিবর্তন। কিন্তু যেটি অস্বাভাবিক, তার ফল কখনও স্থায়ী হয় না। মায়াজালে মুহূর্তের মধ্যে একটা ভ্রান্তি সৃষ্টি করা যায় মাত্র। কিন্তু মায়ার জগৎ বাস্তবের জগৎ নয়। আমরা জোর করে ইতিহাস তৈরি করতে পারি না। ইতিহাস কালচক্রের দ্বারা আবর্তিত হয়। কালই ইতিহাস তৈরি করে। কৃষ্ণ এটি বোঝেন।

—কিন্তু আচার্যপুত্র, একদিন আপনিই আমাকে ও কৃপাচার্যকে অন্যায় যুদ্ধে প্ররোচিত করেছিলেন। মনে করুন পাণ্ডব শিবিরে সেই কালরাত্রির কথা। আপনি কী নৃশংস হয়ে উঠেছিলেন। আপনি বলতেন সন্ত্রাসই আগামীদিনের ধর্মযুদ্ধ। একদিন ঈশ্বরের নামে, ধর্মের নামে এই যুদ্ধ হবে এবং বহু তরুণ এই সন্ত্রাসকে গ্রহণ করবে।

অশ্বত্থামা বললেন, সেদিন আমি পরাজয়ের গ্লানিতে, প্রতিহিংসার উন্মাদনায় জর্জরিত হয়েছিলাম। আজ আমি বুঝতে পারলাম কোনো কিছুই স্থায়ী নয়। আমাদের মনের মধ্যে নিত্যনতুন ঢেউ জাগে, বাইরের ঝড় তাতে তুফান জাগায় মাত্র। আবার ঝড় প্রশমিত হলে সব কিছু শান্ত হয়। মনকে যদি চিরশান্ত হ্রদের মতো করে রাখা যায় তাহলেই চিরশান্তি। গত ৩৬ বছর নির্জন ঘরে একাকী বিচ্ছিন্নভাবে বাস করে আমি এই সিদ্ধান্তে এসেছি অশান্ত মন থেকেই হিংসা আসে। মনে শান্তি না থাকলে বাইরেও শান্তি আসতে পারে না।

কৃতবর্মা বললেন, তবে আপনি শান্তি না চেয়ে মৃত্যু চাইছেন কেন?

অশ্বত্থামা বললেন, কারণ একটা সময় আসে যখন মৃত্যুই শান্তি। জীবনের ধর্মই মৃত্যু। জীবন ধর্ম পালনের জন্যও কাল নির্দিষ্ট আছে। সেই কাল অতিক্রম করলে আর জীবনের ধর্ম পালন হয় না। তাই এখন মৃত্যুকে হাসিমুখে বরণ করতে চাই।

কৃতবর্মা বাধা দিয়ে বললেন, কিন্তু আপনিই আমাদের সন্ত্রাসযুদ্ধ শিখিয়েছিলেন। বলেছেন এই যুদ্ধে একটি শিশুও অংশ নিতে পারে। যখন প্রতি আক্রমণ শুরু করতে হবে তখন শিশুদেরও সৈনিক করে শত্রুর দিকে ঢাল করে এগিয়ে দিতে হবে। অথবা তারা নিজেদের মশালের মতো প্রজ্বলিত করে শত্রুর সব কিছু ধ্বংস করবে। তখনও আপনি মৃত্যুর কথা বলতেন, তবে অন্যের মৃত্যু।

অশ্বত্থামা বললেন, বিশ্বাস করো কৃতবর্মা, এখন আমি আর সন্ত্রাসের কথা বলি না। সন্ত্রাসযুদ্ধ নিয়ে তত্ত্ব রচনার কথাও ভাবি না। আমি শুধু সারা বিশ্বের জীবনের কথা ভাবি। সবাই সুখী হোক। সবাই বেঁচে থাক। কৃতবর্মা আমি কৃষ্ণের কাছে গিয়ে কী ভিক্ষা চাইব বলো তো? মৃত্যু। আমার মৃত্যু। আমি তাঁকে বলব আমি একশত বর্ষ বাঁচলাম। এবার আমায় মৃত্যুভিক্ষা দিন। আমাকে তিন হাজার বছর বাঁচার অভিশাপ ফিরিয়ে নিন।

একটু থেমে অশ্বত্থামা আবার বললেন, কাল কিন্তু শরীরকে ক্ষয় করে। যৌবন এবং জরা কালানুসারেই আসে। সেই কালকে অতিক্রম করে কৃত্রিমভাবে দেহটিকে বাঁচিয়ে রাখা একটি মৃতদেহকে বহন করে নিয়ে চলা।

কৃতবর্মা বললেন, আমিও তো নব্বই অতিক্রান্ত করলাম। কিন্তু আমার তো আরও বাঁচতে ইচ্ছা করে। আমি পানাসক্ত না হলেও মদিরা পান করে তৃপ্তি পাই। অনাবিল আনন্দ পাই। আমি আমার ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, আমার অতীত, শৌর্য-বীর্য নিয়ে নিজেই গর্ব অনুভব করি। এই গর্বই আমার বাঁচার আকাঙ্ক্ষা বাড়ায়।

অশ্বত্থামা বললেন, কিন্তু এই অবক্ষয়ের মধ্যে কৃষ্ণ বাঁচতে চান না। তুমি বাঁচতে চাও কেন? তুমিই তো বলছ দ্বারকা এখন মৃত্যুপুরী। এই মৃত্যুপুরীতে সবার আগে নিহত হয়েছে মানুষের শুভাশুভবোধ, কল্যাণ চেতনা, আত্ম বিনির্মাণের সব পথগুলি বন্ধ করে দেশের সম্পদ তরুণেরা নিজেদের চোখে নিজেরা ঠুলি পরিয়ে বসে আছে। এই চোখে ঠুলি পরা, মুখে মুখোশ আঁটা মানুষদের মধ্যে তুমি বাঁচতে চাও কেন?

কৃতবর্মা বললেন, আমি প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার সঙ্গে বেঁচে আছি বলে। আপনার মতো অভিশপ্ত ব্যাধিগ্রস্ত একাকী জীবন হলে আমি কি করতাম জানি না। আমার কাছে প্রভাব ও প্রতিপত্তিই জীবন। সাধারণ মানুষ যত ঠুলি পরে থাকবে ততই আমার লাভ। তারা দেখেও দেখবে না। শুনেও শুনবে না। কৃষ্ণ ভুল করেছিলেন, তিনি মানুষকে জ্ঞান দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি শুধু জবরদস্ত শাসক হলে কোনো অসুবিধা হত না। তিনি মানুষকে শিক্ষিত করতে চেয়েছিলেন। তিনি যে দার্শনিক। আমি আপনাকে বলছি আচার্যপুত্র, দার্শনিক ও শিক্ষকরা কোনোদিন শাসক হতে পারে না। হলে কেউ তাকে মানবে না। সবাই তাকে উপেক্ষা করবে। তাকে হতাশায় জর্জরিত হতেই হবে। কৃষ্ণ মানুষ তৈরি করতে চেয়েছিলেন। সেই জন্যই তিনি এত হতাশ। আমি কিন্তু মানুষ তৈরি করতে চাইনি। আমি শাসন করতে চেয়েছিলাম। মানুষ অমানুষ থাকলেই আমার সুবিধা। তাহলে সে আমার প্রভুত্ব মানবে।

অশ্বত্থামা বললেন, কৃতবর্মা, আমি এখন মনে করি কোনো মানুষকে যুক্তি-তর্ক দিয়ে পরিবর্তন করা যায় না। কারণ প্রতিটি মানুষ তার সহজাত প্রবৃত্তির দ্বারাই চালিত হয়। মানুষ দুর্বলের শাসনও মেনে নেয়, কারণ দুর্বল শাসক তাকে সবসময় পাইয়ে দিয়ে তাকে ক্রীতদাস করে রাখতে পারে। কিন্তু প্রাজ্ঞ রাজার অনুশাসন, প্রাজ্ঞ ব্যক্তির যুক্তি বিধান প্রজারা সহজে মেনে নেয় না। তাই তোমায় কোনো পালটা যুক্তি দেব না। সময়ই তোমার মনকে পরিবর্তিত করবে। তুমি সত্যের মুখ দর্শন করতে পারবে। তুমি শুধু কিছুক্ষণের জন্য আমাকে কৃষ্ণের সঙ্গে কথা বলিয়ে দাও। কৃষ্ণ যদি আমার প্রার্থনা মঞ্জুর করেন আমি এই দ্বারাবতীর সমুদ্রেই আত্মবিসর্জন দেব। আর যদি প্রার্থনা মঞ্জুর না করেন, আমি হিমালয়ে চলে যাব। আর দম্যক আশ্রমে ফিরব না।

কৃতবর্মা বললেন, আচার্যপুত্র, আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। আমি আপনার সঙ্গে কৃষ্ণের দেখা করিয়ে দেব। আপনি আজ রাত্রি আমার আবাসে অবস্থান করুন। কাল প্রভাতে আমাদের যাত্রা শুরু হবে। আপনি আমাদের সঙ্গে প্রভাস চলুন। আপনাকে আমার অতিথি আবাসে রেখে আসার জন্য বলছি। আজ আর আমার সঙ্গে দেখা হবে না। কাল প্রভাতে আপনার সঙ্গে মিলিত হবো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *