৩৬ বর্ষ পরে
কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসের দম্যক আশ্রম পরিদর্শনের পর আরও তেত্রিশ বছর কেটে গেছে। এই তেত্রিশ বছর ধরে ব্যাস মহাভারত রচনার উপাদান সংগ্রহ এবং যুধিষ্ঠিরের স্বপ্ন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বেদ বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য এত ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে তিনি এই তেত্রিশ বছরে আর দম্যক আশ্রমে যেতে পারেননি। আশ্রমের মহাচার্য গৌতমই তাঁর কাছে নিয়মিত এসেছেন।
শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের জন্য অর্থের কোনো অভাব রাখেননি যুধিষ্ঠির। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর যুধিষ্ঠির যখন রাজ্যভার নিলেন, তখন হস্তিনাপুরের রাজকোষ প্রায় শূন্য। শুধু তাই নয়। রাজার বিশাল সৈন্যবাহিনী, হাজার হাজার অশ্ব, হস্তী, রথ সব বিধ্বস্ত। টিমটিম করছে কিছু সৈন্য আর প্রাসাদের প্রহরীরা।
শুধু ধৃতরাষ্ট্রের কোষাগারে কিছু নিজস্ব স্বর্ণমুদ্রা ও মণি-মুক্তার ভাণ্ডার ছিল। কিন্তু বলতে গেলে তারপর দৈববলেই যুধিষ্ঠির অপরিমিত ধন-রত্নের অধিকারী হন। কীভাবে? ব্যাসদেবই যুধিষ্ঠিরকে এক গুপ্তধনের সন্ধান দেন। তিনি যুধিষ্ঠিরকে পরামর্শ দেন, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর মানসিক অবসাদ কাটানোর জন্য অশ্বমেধ যজ্ঞ করতে। আর সন্ধান দেন, মরুত্তরাজের সঞ্চিত গুপ্তধনের। যা হিমালয়ের এক গহন প্রদেশে মাটির নীচে চাপা পড়ে আছে।
ধৃতরাষ্ট্রতনয় যুযুৎসুর ওপর রাজ্য রক্ষার ভার দিয়ে যুধিষ্ঠির তাঁর ভাইদের সঙ্গে নিয়ে ও বিরাট সৈন্যবাহিনী নিয়ে সেই গুপ্তধন উদ্ধার করতে যান। সঙ্গে ছিলেন রাজপুরোহিত ধৌম্য।
মরুত্তরাজার ধন ছিল হিমালয় রাজ্যে। অসংখ্য নদী, বন, উপবন অতিক্রম করে সেখানে যেতে হয়। তাঁদের বিশাল বাহিনী সেখানে পৌঁছে খনন করতে থাকেন। বহুদিন ধরে খননের ফলে সেই গুপ্তধন উদ্ধার হয়।
যুধিষ্ঠির খুব আশাবাদী ছিলেন। ধন সংগ্রহ করে নিয়ে আসার জন্য ৬০ লক্ষ উট, ১২০ লক্ষ ঘোড়া, এক লক্ষ হস্তী, এক লক্ষ রথ, এক লক্ষ শকট, এক লক্ষ হস্তিনী, অসংখ্য খননকারী শ্রমিককে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে কী পরিমাণ ধন-রত্ন তাঁরা এনেছিলেন, তাঁর একটি বিবরণ মহাভারতকার দিয়েছেন অশ্বমেধিক পর্বে।
প্রত্যেকটি উটের পিঠে ছিল আট হাজার, প্রতি শকটে ষোলো হাজার, প্রত্যেক গজে চব্বিশ হাজার করে সুবর্ণমুদ্রা। এছাড়া গর্দভ ও ভারবাহী মজুরদের মাথায় চাপিয়ে এসেছিল আরও লক্ষ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা। এই ভার নিয়ে প্রতিদিন দুই ক্রোশের বেশি তাঁরা হাঁটতে পারতেন না। এই গুপ্তধন ছাড়াও অশ্বমেধ যজ্ঞে পরাজিত রাজারা সবাই লক্ষ লক্ষ মুদ্রা উপঢৌকন দিয়েছিলেন। তার ফলে যুধিষ্ঠির ভারতের শ্রেষ্ঠ ধনী রাজায় পরিণত হন। কিন্তু যুধিষ্ঠিরের ধনের প্রতি কোনও লোভ ছিল না। অশ্বমেধ যজ্ঞে তিনি ব্রাহ্মণদের সহস্র কোটি স্বর্ণমুদ্রা দান করেন। বেদব্যাসকে দান করেন ‘সমগ্র পৃথিবী।
তখন বেদব্যাস যুধিষ্ঠিরকে বলেন, এই পৃথিবী আমি তোমাকেই ফেরত দিচ্ছি। ব্রাহ্মণেরা ধনেরই অভিলাষ করেন। তুমি আমাকে পৃথিবীর পরিবর্তে ধনদান করো।
তখন যুধিষ্ঠির ব্রাহ্মণদের বলেন, ব্যাসদেব যখন গ্রহণ করলেন না, এই পৃথিবী চার ভাগে ভাগ করে আপনাদের দক্ষিণ স্বরূপ দিচ্ছি। আপনারা তা গ্রহণ করুন।
যুধিষ্ঠির তাঁর সমগ্র রাজ্য যখন বেদব্যাসকে দান করে দিলেন তখন আকাশ থেকে দেবতাদের সমবেত কণ্ঠ শোনা গেল, সাধু সাধু।
বেদব্যাস দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন, যুধিষ্ঠির করছেন কী! তিনি জানতেন যুধিষ্ঠির একে নির্লোভ, অন্যদিকে আবেগপ্রবণ। তিনি তাই তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বললেন, মহারাজ, আমি তোমার দত্ত পৃথিবী আবার বিপ্রদের হয়ে তোমাকেই দান করছি। তুমি গ্রহণ করো।
তখন যুধিষ্ঠির বিপ্রদের দক্ষিণার পরিমাণ আরও তিনগুণ বাড়িয়ে দিলেন। অশ্বমেধ যজ্ঞের জন্য ব্যবহৃত অলঙ্কার, যূপ, ঘট, ইষ্টক, স্বর্ণপাত্র, শুধু ব্রাহ্মণ নয়, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র, ম্লেচ্ছদের দান করলেন। আমন্ত্রিত রাজাদের মধ্যে অসংখ্য হস্তী, বস্ত্রালঙ্কার, রত্ন ও স্ত্রী দান করা হল।
অশ্বমেধ যজ্ঞের পর যুধিষ্ঠির ব্যাসকে বলেন, বেদবিদ্যা প্রসারের জন্য আপনি সারা পৃথিবী (ভারত) পরিভ্রমণ করুন। প্রজাদের শুভাশুভ নির্ধারণ করুন ও বেদচর্চাকেন্দ্র স্থাপন করুন। আপনি জানেন আমি এখন অপরিমিত বিজ্ঞের অধিকারী। এই অর্থ দিয়ে আমি কী করব যদি না প্রজাদের জ্ঞান দান করতে পারি। আপনি যে মহাগ্রন্থ রচনা করার অভিপ্রায় প্রকাশ করেছেন, তা যেন শুধু রাজকাহিনি না হয়। তাতে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ, পিতামহ ভীষ্ম, বিদুর এবং স্বয়ং আপনার মূল্যবান উপদেশগুলি যেন তাতে সংকলিত হয়। আপনার গ্রন্থই হোক ভারতাত্মার মর্মকথা। সনাতন ধর্মের নির্দেশিকা।
দম্যক আশ্রম থেকে ফিরে ব্যাস তাঁর আশ্রম বিদ্যালয় স্থাপন পরিকল্পনাকে কাজে পরিণত করার দিকে সবিশেষ দৃষ্টি দেন। তারপর তিনি ভারত পরিক্রমায় বার হন। ব্যাস দেখেন ভারতের সর্বত্র দুটি শ্রেণি গড়ে উঠেছে—অভিজাত শ্রেণি আর দরিদ্র শ্রেণি। অভিজাত বা ভূস্বামী বহু জমির মালিক। এদের মধ্যে অধিকাংশই ক্ষত্রিয়। বহু ধনী বৈশ্য আছেন যাঁরা সওদাগর, সমুদ্রপথে ও স্থলপথে বাণিজ্য করেন। শস্য কিনে গুদামজাত করেন। তাঁরা রাজধানীতে বড় বড় বিপণির মালিক। গ্রামগুলি স্বয়ং সম্পূর্ণ। সেখানকার মানুষ কৃষি ও হস্তশিল্প করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু তাঁরা খুবই গরিব, দীনভাবে কাটান। যেখানে কৃষি-জমি উর্বরা নয়, অথা অতিবৃষ্টি বা খরাপ্রবণ যে সব অঞ্চল, সেখানে সাধারণ মানুষ অতিদরিদ্র।
ধনীরা ধর্মপরায়ণ ও উদার। গ্রামের গরিবরা তাঁদের নানা কাজে নিযুক্ত হন। বিনিময়ে খাদ্য পান, সামান্য মজুরি পান। গরিব মানুষেরা গরিব হলেও যথেষ্ট সৎ, ধর্মপরায়ণ। তাঁদের কোনো উচ্চাশা নেই। দু’বেলা আহার জুটলেই তারা খুশি। মেয়েদের অবস্থা খুবই খারাপ। বহু নারীর শৈশবেই বিবাহ হয়। অকাল বৈধব্য অভিশাপ। নারীরা শুধু গৃহকাজই করে। সংসারের ভেতরেই তাদের কায়িক শ্রম করে যেতে হয়। একটু সম্পন্ন পরিবার হলেই নারীকে সপত্নীর ভয়ে ত্রস্ত থাকতে হয়। শৈশব থেকে নারী শেখে পতিব্রতা হওয়াই নারীর ধর্ম। স্বামী গুরুর মতো। তার আদেশ অমান্য করা অধর্ম। স্ত্রীকে স্বামীর অনুরাগভাজিনী হতে হয়। যে স্ত্রী স্বামীকে যত আকৃষ্ট করতে পারে, তাকে সমাজে সবাই পুণ্যবতী বলে। সমাজে বিধবা নারী খুব দুঃখে দিন কাটায়। ব্যাস সহস্র একাকিনী বিধবা নারীকে তীর্থক্ষেত্রে দেখেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তাদের স্বামীর নিহত হয়েছে বলে বিধবা ও অনাথ শিশুতে সারা দেশ ভরে উঠেছে। এই বিধবারা অধিকাংশই তরুণী। বয়স আঠারোর মধ্যে। অনেকের দু-তিনটি করে সন্তান।
এই যুদ্ধ শিশুদের প্রতি বহু মানুষ ব্যাসের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বহু বিধবা নারী বাধ্য হয়ে তীর্থে চলে গেছেন কারণ প্রতিটি তীর্থে বিনামূল্যে আহার, বাসস্থানের ব্যবস্থা আছে। শিশুরা সেখানে ভিক্ষা করে। তাদের মায়েরাও ভিক্ষা করে। বহু নারী অর্থাভাবে গণিকাবৃত্তি গ্রহণ করেছে। গণিকাবৃত্তি কিন্তু সমাজে স্বীকৃত পেশা। ব্যাস দেখেছেন, সমাজে ব্রাহ্মণদের প্রতি সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা আছে। ব্রাহ্মণদের সঙ্গে কেউ কুবাক্য বলতে সাহস করে না। রাজাও ব্রাহ্মরদের গুরুতর অপরাধেও মৃত্যুদণ্ড দেন না। ব্রাহ্মণকে সমীহ করেন। মুনি, ঋষি, সন্ন্যাসীরও দেশে অভাব নেই। বিশেষ করে তীর্থভূমিতে সন্ন্যাসীরা বড় বড় আশ্রম করে বাস করেন। এঁরা কিন্তু সবাই বেদচর্চা করেন না। কিন্তু এক একটি ছোটখাটো ধর্ম সম্প্রদায় চালান। তাঁরা হোমাগ্নি জ্বালিয়ে ভস্ম মেখে বসে থাকেন। কিন্তু ধনী থেকে সাধারণ মানুষ তাঁদের কাছে আসেন। প্রবচন শোনেন ও দক্ষিণা দান করেন।
সারা দেশে সর্বজনীন শিক্ষার কোনো প্রচলন নেই। ঋষিরা তপোবনে গুরুকুল বিদ্যালয় চালান। কিন্তু ছাত্রেরা অধিকাংশ ব্রাহ্মণ। কিছু ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য ছাত্র আছে। শূদ্রদের লেখাপড়ার অধিকার নেই। শূদ্ররা প্রধানত শ্রমের কাজ করেন। বেশিরভাগই ভূমিহীন কৃষিশ্রমিক। অনেকে ধনী ও সম্পন্ন পরিবারে নানা ধরনের গৃহকাজের সঙ্গে যুক্ত।
দেশে অসবর্ণ বিবাহ প্রথা চালু আছে। ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য কন্যাকে বিবাহ করতে পারত। কিন্তু শূদ্রাণীর গর্ভে জাত ব্রাহ্মণ সন্তান চণ্ডাল নামে অভিহিত হত। চণ্ডালরা অস্পৃশ্য। দেশবাসীর সামান্য অংশই শিক্ষিত। ব্রাহ্মণদের মধ্যেও অসংখ্য নিরক্ষর ও অল্পশিক্ষিত ব্রাহ্মণ আছেন। তাঁরাও সম্পন্ন ভূস্বামী ও রাজন্যভাতা, পূজা, যজন-যাজন থেকে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের জীবিকা অর্জনের জন্য গ্রামাঞ্চলে বহু লৌকিক দেবতার মন্দির গড়ে উঠেছে। তাঁরা সেখানে নিত্যপূজা করেন। বহু অশিক্ষিত ব্রাহ্মণপুত্ৰ খেয়েদেয়ে, ঘুমিয়ে, আড্ডা দিয়ে দ্যূতক্রীড়া করে কাটিয়ে দেয়। বেদজ্ঞ পণ্ডিত ব্রাহ্মণেরা রাজসম্মান পান। অর্থ, জমি, গো-ধন—কিছুরই অভাব নেই।
যাঁরা সংসার থেকে দূরে অরণ্যের মধ্যে তপস্যা করার জন্য তপোবন তৈরি করে বাস করেন তপস্যা ও বেদচর্চাই তাঁদের ব্রত। তাঁরা মুনি নামে পরিচিত। তাঁরা অরণ্যবাসী কিন্তু গৃহী। তাঁরা অনেকে এক পত্নী অথবা একাধিক পত্নীসহ তপোবনে বাস করেন।
দ্বৈপায়ন ব্যাস কিন্তু অকৃতদার ব্রহ্মচারী। তিনি রাজা শান্তনুর পত্নী সত্যবতীর অবৈধ পুত্র। কিন্তু মুনিপুত্র। মুনির ঔরসে জন্ম। তিনি অকৃতদার হলেও যে নারীস্পর্শ বর্জিত তা বলা যায় না। একদা মাতৃ আজ্ঞায় সন্তান উৎপাদনের জন্য তিনি শান্তনুপুত্র বিচিত্রবীর্যের বিধবা দুই স্ত্রীর সঙ্গে উপগত হয়েছিলেন। তাঁরই পুত্র ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডু। কৌরব ও পাণ্ডবেরা তাঁর পৌত্র। তাই তিনি সর্বদা ধৃতরাষ্ট্র ও কুন্তীপুত্রদের হিতকামী। বিশেষ করে ভীষ্মের মৃত্যুর পর এখন তিনি হস্তিনানগরের অভিভাবক হিসাবে চিহ্নিত হয়েছেন।
ব্যাস সারা ভারত ঘুরে এই সিদ্ধান্তে এসেছেন, শিক্ষার প্রসার ছাড়া ভারতবাসীর আত্মিক মুক্তি অসম্ভব। বৈদিক শিক্ষা দিয়েই শিক্ষা আন্দোলন শুরু হোক। বেদের মূল বাণী সাম্য, সমতা আর অহিংসা। কালপ্রবাহে বহু শাস্ত্রজ্ঞ ও ধর্মজ্ঞের সৃষ্টি হবে। তাঁরা নানা বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করবেন; জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখার সৃষ্টি হবে। আধ্যাত্মাদর্শন নিয়ে নানা আলোচনা থেকে নতুন নতুন চিন্তার জন্ম দেবে।
ব্যাসদেব আশাবাদী যে নারীশিক্ষারও একদিন প্রচলন হবে। এখন বহু মুনি তাঁদের তনয়াদের গৃহে শিক্ষিত করে তোলেন। তাঁদের অনেকে এত প্রতিভাময়ী যে বেদের সূক্ত রচনা করেছেন। কিন্তু তাঁদের সংখ্যা সীমিত। রাজপরিবারের কন্যারা নানা শাস্ত্র পারঙ্গম হয়। দ্রৌপদীই তো একজন বিদূষী নারী। গান্ধারীও শিক্ষিতা। কন্যা দুঃশলাকেও তিনি সুশিক্ষিতা করেছিলেন। তবে কেন সাধারণ পরিবারে লক্ষ লক্ষ নারী অশিক্ষিতা হয়ে পড়ে থাকবে?
ব্যাস মনে করেন, কাল সব কিছু নির্দিষ্ট করে রেখেছে। কালের প্রভাবে সব কিছু পরিবর্তন হতে বাধ্য। এই যে প্রজা হিতৈষণার জন্য শিক্ষা প্রসারের পরিকল্পনা যুধিষ্ঠির যেমন ভাবছেন, তাঁর আগে তেমন করে কেউ তো ভাবেনি।
.
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর পনেরো বছর যুধিষ্ঠির রাজা হয়ে ধৃতরাষ্ট্রকেই ভারতের অলিখিত রাজা করে রেখেছিলেন। ধৃতরাষ্ট্রের পরামর্শ ছাড়া তিনি এক পাও চলতেন না।
মনে মনে যুধিষ্ঠির ভীষণ আত্মগ্লানিতে ভুগছিলেন। সেই গ্লানি হল, ধৃতরাষ্ট্রের শতপুত্র যে নিহত হল, কৌরবপক্ষের বীর যোদ্ধারা নিহত হয়ে তাদের বংশে বাতি দিতে যে কেউ থাকল না। এর জন্য যুধিষ্ঠির নিজেকেই দায়ী করতেন। সতত অবসাদে ভুগতেন। বারবার মনে হত পুত্রহারা ধৃতরাষ্ট্রের ও গান্ধারীর অভিশাপ তাঁকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ব্যাস তাঁকে বলেছিলেন অশ্বমেধ যজ্ঞ করলে তিনি শান্তি পাবেন। কিন্তু শান্তি পেলেন না।
ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারী কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর শুধু কোনোক্রমে জীবন ধারণ করেছিলেন।
ধৃতরাষ্ট্র এই পনেরো বছর দিনের শেষ প্রহরে সামান্য কিছু আহার করতেন। কোনো কোনো দিন দিনেও কিছু মুখে তুলতেন না। রাত্রির অষ্টম ভাগে যৎকিঞ্চিৎ আহার করতেন। তিনি রাজশয্যা থেকে নেমে এসে মাটিতে শয়ন করতেন। এইভাবেই তিনি শোক পালন করে এসেছেন।
যুধিষ্ঠির তাঁর ভাইদের বলে রেখেছিলেন যে, ধৃতরাষ্ট্র যাতে দুঃখ পান এমন আচরণ তারা যেন না করেন। কিন্তু ভীমসেন ও ধৃতরাষ্ট্র পরস্পরকে দেখতে পারতেন না। ধৃতরাষ্ট্র ভীমকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। তারপর থেকে ভীম ধৃতরাষ্ট্রকে ক্ষমা করেননি। ধৃতরাষ্ট্রও পুত্রহত্তা বলে ভীমের প্রতি বিরূপ ছিলেন। পাণ্ডবদের চার ভাইকে ক্ষমা করলেও ভীমকে ক্ষমা করেননি।
একদিন ভীম প্রাসাদের মধ্যে তাঁর বন্ধুদের সামনে হাতের পেশী দেখিয়ে আস্ফালন করেন, এই যে দেখছ পরিখার মতো আমার দুটি পেশীবহুল হাত। এই হাত দিয়ে আমি ধৃতরাষ্ট্রের ছেলেদের হত্যা করেছি। এই কথাটি কানে গেলে ধৃতরাষ্ট্র খুব ব্যথা পেলেন। তিনি ঠিক করলেন প্রবজ্যা নেবেন। অর্থাৎ বনবাসে যাবেন। আর প্রাসাদে নয়।
ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডবদের ডেকে বললেন, কুরুবংশ ধ্বংসের জন্য আমিই দায়ী। কৌরবগণ আমার পরামর্শেই যুদ্ধ করেছিল। বিদুর, ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপাচার্য, বেদব্যাস, সঞ্জয় ও গান্ধারী, সবাই আমাকে হিতোপদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি কারও কথা শুনিনি। পাণ্ডবদের পিতৃরাজ্য ফিরিয়ে দিইনি। এই পাপ আজ আমাকে সহস্র সহস্র শল্যের মতো বিদ্ধ করছে। যুধিষ্ঠির, তুমি ধার্মিকদের অগ্রগণ্য। তুমি আমায় বনগমনের অনুমতি দাও, বনগমন করাই আমার কুলোচিত কর্তব্য।
যুধিষ্ঠির প্রবলভাবে তাঁর আপত্তি জানিয়েছিলেন। যুধিষ্ঠিরের বহু অনুরোধ সত্ত্বেও ধৃতরাষ্ট্র বনগমনের অভিলাষ থেকে বিরত হলেন না। তিনি যাবার আগে যুধিষ্ঠিরকে রাজ্যশাসন সম্পর্কে কতগুলি গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দিয়ে গেলেন। তার মধ্যে প্রধান উপদেশ উৎকোচজীবী (যারা ঘুষ খেয়ে বাঁচে), অন্যের স্ত্রীকে অপহরণকারী, মিথ্যাবাদী, অন্যের অনিষ্টকারী, পরধন অপহরণকারী, অসৎ কর্মরত ব্যক্তি, সভাভঙ্গকারী ও বর্ণদূষণকারী (জাতিনাশকারী বা বর্ণভেদ প্রথা ভঙ্গকারী) তাদের অবশ্যই দণ্ড দেবে। ধৃতরাষ্ট্র বনে যাবার আগে বিদুর মারফত যুধিষ্ঠিরের কাছে বলে পাঠান, ভীষ্ম প্রমুখ পূর্বপুরুষদের শ্রাদ্ধাদি কাজের জন্য ধৃতরাষ্ট্র কিছু অর্থ চেয়েছেন। ভীমসেন তা নিয়েও ব্যঙ্গ করেন। কিন্তু অন্য ভাইরা সবাই মিলে ভীমকে বোঝান যে একদা মহাপ্রতিপত্তিশালী ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডবদের কাছে অর্থ চাইছেন মৃত জ্ঞাতিদের পারলৌকিক ক্রিয়ার জন্য। এ তো মহা গৌরবের যিয়ে। এতে তবে আপত্তির কী আছে।
ধৃতরাষ্ট্র-গান্ধারীকে বন গমন থেকে পাণ্ডবেরা কেউ নিরস্ত করতে পারলেন না। তাঁরা বনযাত্রায় সম্মতি দিলেন। কিন্তু তখনও তাঁরা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি কুন্তীও তাঁদের অনুগামিনী হবেন।
পুত্রদের বহু মিনতি সত্ত্বেও কুন্তীও তাঁর প্রতিজ্ঞায় অনড় রইলেন। তিনিও প্রিয় পুত্রদের ছেড়ে ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর অনুগমন করতে চাইলেন।
কুন্তী বনগমনের সময় যুধিষ্ঠিরকে বলে গিয়েছিলেন, বৎস, তুমি সহদেবকে তাচ্ছিল্য কোরো না। সে তোমার ও আমার প্রতি একান্ত অনুরক্ত, আর পূর্বে দুর্বুদ্ধিবশত যে মহাবীরকে তোমাদের বিপক্ষে সংগ্রাম করতে অনুমতি দিয়েছিলাম, সেই মহাত্মা কর্ণকে তুমি ভুলো না। আমার মতো হতভাগিনী আর কেউ নেই। কর্ণকে না দেখে আমার হৃদয় বিদীর্ণ হচ্ছে না। আমি বুঝলাম আমার হৃদয় লোহা দিয়ে তৈরি। আমি পূর্বে তার পরিচয় তোমাকে দিইনি। এখন ভাবি তার বধের জন্য আমিই অপরাধিনী। এখন তোমরা ভাইরা মিলে জ্যেষ্ঠভ্রাতার সম্মতির জন্য বিবিধ ধনদান করবে। আর একটা কথা বলি, কখনও দ্রৌপদীর প্রতি অপ্রিয় আচরণ কোরো না। তোমার জ্যেষ্ঠতাত ও গান্ধারীকে আমি অরণ্যমধ্যে যথোচিত সেবা করব। তুমি সর্বদা ভীম, অর্জুন ও নকুলের রক্ষণাবেক্ষণ করবে।
যুধিষ্ঠির কুত্তীকে কোনোমতেই বনবাসে পাঠাতে চাননি। তিনি বারবার কুন্তীকে প্রতিনিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছেন।
যুধিষ্ঠির কুন্তীকে বলেছিলেন, মা, আমায় পরিত্যাগ করা আপনার উচিত হচ্ছে না। রাজ্য ছেড়ে, আমাদের ছেড়ে আপনি কীভাবে বনবাসী হবেন? আপনি প্রসন্ন হোন। আপনার যদি মনে ছিল আপনি আমাকে পরিত্যাগ করে চলে যাবেন, তাহলে আমাদের দ্বারা পৃথিবী বীরশূন্য করলেন কেন? আপনি আমাদের বন থেকে ফিরিয়ে নিয়ে এসে নিজে বনগমন করছেন। মা, আপনি যাবেন না। ধর্মরাজের বাহুবলে অর্জিত এই রাজ্য আপনি উপভোগ করুন।
কুন্তী উত্তরে বললেন, বৎসগণ, তোমাদের কপট দ্যুতক্রীড়ায় পরাজিত করেছিল জ্ঞাতিরা। তোমরা দুঃখিত ও অবসন্ন। আমি তোমাদের যুদ্ধে উৎসাহিত করেছিলাম এই কারণে যে তোমরা পাণ্ডুর পুত্র। তোমাদের নাশ বা যশোহানি হওয়া অনুচিত। তোমরা ইন্দ্রতুল্য, পরাক্রমশালী। তোমাদের শত্রুর বশীভূত হওয়া কখনও উচিত নয়। যখন দুরাত্মা দুঃশাসন দাসীর মতো দ্রৌপদীর কেশ আকর্ষণ করেছিল, তখন আমার চৈতন্য বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। আমি এই জন্যই তোমাদের তেজবর্ধনের জন্য উৎসাহ দিয়েছিলাম। আমি যুদ্ধে তোমাদের উৎসাহিত করেছি আমার সুখসাধনের জন্য নয়, তোমাদের হিতসাধনের জন্য। এখন রাজ্যভোগের বাসনা পরিত্যাগ করে মহাত্মা পাণ্ডুর পবিত্রলোকে যাওয়াই আমার বাসনা। তোমরা আমাকে নিবৃত্ত কোরো না।
সবাইকে অশ্রুজলে ভাসিয়ে ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী ও কুন্তী বনগমন করলেন। যুধিষ্ঠির ও পাণ্ডব ভ্রাতারা তাঁদের সঙ্গে বেদব্যাসের ভাগীরথী আশ্রম পর্যন্ত আসেন। সেখানে যুধিষ্ঠির ধৃতরাষ্ট্রকে প্রস্তাব দেন যে ভাইরা হস্তিনাপুর চলে যাক। আপনি আমাকে পরিত্যাগ করবেন না। আমি আপনার সঙ্গে থেকে যাব।
গান্ধারী যুধিষ্ঠিরকে বলেন, বৎস, তুমি কৌরববংশের জ্যেষ্ঠপুত্র। তুমি ফিরে না গেলে আমার শ্বশুরের জল-পিণ্ডদান হবে না।
যুধিষ্ঠির কুত্তীকে বললেন, মাতঃ, রাজা ও যশস্বিনী গান্ধারী আমাকে রাজধানী ফিরে যেতে বলছেন। কিন্তু আমি আপনাকে পরিত্যাগ করে কেমন করে ফিরে যাব? এখন আর আমার আগের মতো রাজ্য অভিলাষ নেই, আমি এখন সম্পূর্ণভাবে তপস্যায় অনুরক্ত হয়েছি। পৃথিবী যুদ্ধে লোকশূন্য হওয়াতে’ এই পৃথিবী প্রতিপালনে আমার আর বিন্দুমাত্র স্পৃহা নেই।
আমাদের বান্ধবেরা সবাই মৃত। আমাদের পরম মিত্র পাঞ্চালদের বংশ লোপ হওয়ায় তারা একদম উৎসন্নে গিয়েছে। আমাদের সৈন্য সংখ্যাও যুদ্ধে শেষ হয়ে গিয়েছে। নতুন করে আর বড় সৈন্যবাহিনী গড়ে তুলতে পারিনি। চেদি ও মৎস্যবংশও যুদ্ধে শেষ হয়ে গেছে। একমাত্র দ্বারকার কৃষিবংশই অবশিষ্ট আছে। তাদের দেখার জন্য আমার রাজধানীতে থাকতে ইচ্ছা করে। কিন্তু মা, আমি যে আপনার দর্শন পাব না। আমি আপনার সঙ্গেই যেতে চাই।
তখন মহাবাহু সহদেব যুধিষ্ঠিরকে বললেন, আপনি রাজধানী ফিরে যান। আমি মাকে দেখার জন্য এখানে থেকে যাচ্ছি।
কুন্তী তখন বললেন, দেখো, তোমরা আমার সঙ্গে থাকলে তোমাদের স্নেহপরশে আমার তপস্যার ব্যাঘাত ঘটবে। ইতিমধ্যেই আমার উৎকৃষ্ট তপস্যা ক্ষীণ হয়ে এসেছে। আমার পরলোকগমনের আর অধিক বিলম্ব নেই। তোমরা রাজ্যে ফিরে গিয়ে পরম সুখে থাকো। শেষ পর্যন্ত পাণ্ডবেরা মাতা কুন্তী ও ধৃতরাষ্ট্র-গান্ধারীকে রেখে রাজধানী ফিরে গেলেন। এই ঘটনার ছ’মাস পরে ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী ও কুন্তী বনে গিয়ে অকস্মাৎ দাবানলে দগ্ধ হয়ে মারা যান। তার আগে জননী গান্ধারী ও কুন্তী কীভাবে অরণ্যের দিন-রাত্রিগুলি অতিবাহিত করছেন তা দেখার জন্য পাণ্ডবেরা উৎসুক হয়ে উঠলেন।
পাণ্ডবেরা বিবিধ যান শকট ও শিবিকা প্রস্তুত করে রাজ্য মধ্যে ঘোষণা করে দিলেন যে সমগ্র পাণ্ডব রাজপরিবার ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী ও কুন্তীকে দেখার জন্য বনগমন করবেন। তার আগে পাচক ও খাদ্যদ্রব্য বহন করে শকট রওয়ানা হয়ে যাবে। পরদিন রাজপরিবাররা যাবেন। পরদিন বিশাল বিশাল সুসজ্জিত রথ পরিবারের সবাইকে নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেল। বহু নগরবাসীও পৃথক পৃথক রথে তাঁদের অনুসরণ করলেন।
ধৃতরাষ্ট্রকে অরণ্যমধ্যে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন পঞ্চপাণ্ডব, দ্রৌপদী, সুভদ্রা, অর্জুনের পত্নী চিত্রাঙ্গদা, ভীমসেনের কলত্র কালী, জরাসন্ধের কন্যা, সহদেবের পত্নী, নকুলের পত্নী রেণুমতী, অভিমন্যুর বিধবা স্ত্রী উত্তরা। সেই সঙ্গে ধৃতরাষ্ট্রের শত পুত্রের বিধবা পুত্রবধূগণ। সবাই মিলে গিয়ে ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী ও কুন্তীকে দেখে এলেন। সমগ্র বনভূমি উৎসবমুখর হয়ে উঠল।
ব্যাসদেব সেই দলে ছিলেন। তিনি দেখলেন, জীবনের শেষ প্রহরে পৌঁছে ধৃতরাষ্ট্রের মন থেকে সব দোলাচলের অবসান হয়েছে। তিনি আজ উপলব্ধি করেছেন, দুর্যোধনের পথ ঠিক পথ ছিল না। ছিল অসূয়া, লোভ, ও অহংকারের পথ। প্রতিপক্ষের প্রতি একবুক ঘৃণা নিয়ে কখনও রাজ্যশাসন করা যায় না। শাসককে অনৃশংস ও ন্যায়পরায়ণ হতে হয়।
ধৃতরাষ্ট্র বেদব্যাসকে বলেছিলেন, ভগবন, আজ আমার জীবন সফল। আমার ইষ্টগতি লাভে কিছুমাত্র সংশয় নেই। আর পরলোকের ভয় নেই। আজ আমি আপনাদের দর্শন করে পবিত্র হলাম। মন্দবুদ্ধি দুর্যোধনের কথা মনে করে আমার নিতান্ত দুঃখ হচ্ছে। ওই পাপাত্মা অকারণে নিরপরাধ পাণ্ডবদের কষ্ট দিয়েছে। মহাত্মা রাজন্যবর্গ তারই আহ্বানে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সমবেত হয়ে প্রাণ দিয়েছে। যে সমস্ত বীর আমার, আমাদের সাহায্য করার জন্য তাদের পিতা, মাতা, পুত্র, কলত্রদের ছেড়ে চলে গেলেন, তাঁদের কী গতি লাভ হয়েছে তা জানি না। আমি প্রবল পরাক্রান্ত ভীষ্ম ও দ্রোণকে স্মরণ করে দিবারাত্রি দুঃখানলে দগ্ধ হচ্ছি। কোনোভাবেই আমার শান্তিলাভ হচ্ছে না। আপনি দয়া করে আমার শান্তিলাভের ব্যবস্থা করুন।
বেদব্যাসের মনে অরণ্যের এই দিনগুলির স্মৃতি আজও রয়ে গিয়েছে। তিনি বলেন, শোকের আগুন চিতার আগুনের মতো। চিতা নেভার সঙ্গে সঙ্গে তা প্রশমিত হতে থাকে। ঝড়-বৃষ্টি যেমন আকস্মিক আসে, তেমন চলে যায়। কিন্তু আকাশ কিছু মনে রাখে না। আবার নিত্যদিনের মতো রৌদ্রালোকিত আকাশ ঝলমল করে।
কিন্তু ব্যাস দেখলেন, যুদ্ধ শুধু যোদ্ধাদের ধ্বংস করে না, নিহত যোদ্ধাদের পরিজনকেও চিরতরে ধ্বংস করে দিয়ে যায়। পরাজিত ধৃতরাষ্ট্র ও বিজয়ী যুধিষ্ঠির দুজনেই এ যুদ্ধে তাদের সব কিছু হারিয়েছেন। হারিয়েছেন মানুষের পক্ষে যা মূল্যবান সেই আত্মবিশ্বাস। সাত রাজার ধন এক মানিক তার প্রাণভোমরার মতো মূল্যবান সে বস্তুটিকে দুজনেই হারিয়ে ফেলেছেন। আজ পনেরো বছর ধরে সে যন্ত্রণা বহন করে চলেছেন পুত্র ও স্বামী শোকাতুরা এই নারী গান্ধারী আর অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র। তেমনই অপরাধপ্রবণতায় ভুগছেন যুধিষ্ঠিরও। তবে ব্যাস আজ প্রথম অকপট স্বীকারোক্তি দেখলেন ধৃতরাষ্ট্রের কথায়। শোক যেন গভীর উপলব্ধি হয়ে ঝরে পড়ছে। পাপাত্মা দুর্যোধনই কুরুক্ষয়ের মূল। বেদব্যাসও যেন নতুন করে শিখলেন অনেক কিছু। রাজার নীচাশয়তা, তার প্রতিপক্ষের প্রতি অসূয়া, হিংসা, সম্পদের প্রতি লোভ, তার বঞ্চিত করে উত্তরাধিকারী হয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভোগ সুখ উপভোগ করার জন্য যে কোনো হিংসার পথ গ্রহণ করার প্রবণতা। লক্ষ লক্ষ পরিবারের জীবনে যে বিপর্যয় তার উৎস তো সেই লোভ। ক্ষমতার উৎস বলে তরবারিকে ঘোষণা করা। অশ্বত্থামা এই হিংসাকে তত্ত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত করে অমর হতে চান। ধৃতরাষ্ট্র আজ অনুতপ্ত। কিন্তু দুর্যোধন বেঁচে থাকলে কি এমন অনুতপ্ত হতেন? মনে হয় না। বেদব্যাস তার সুদীর্ঘ জীবনে দেখেছেন কিছু কিছু মানুষ শয়তান হয়েই জন্মায়। তাদের কেউ পরিবর্তন করতে পারে না। নয়তো ভীষ্মের মতো মহান মানুষের শৈশব থেকেই যে সংস্পর্শে এসেছে, বিদুর যার পিতৃব্য, কী করে সে এমন নরাধম হতে পারে? এই সব মানুষের বিনাশই শ্রেয়। কৃষ্ণ জরাসন্ধ ও শিশুপালকে বধ করেছিলেন। নিকৃষ্ট মানুষদের ভালো করার চেষ্টায় সময় নষ্ট না করে উৎকৃষ্ট মানুষদের আরও উৎকৃষ্ট করার চেষ্টায় নিরত থাকা উচিত। তাঁর বারবার মনে হচ্ছে অশ্বত্থামার কথা। দিব্যচক্ষে তিনি তার মানসলোকে প্রবেশ করে দেখছেন অভিশাপে বিপর্যস্ত একটি মানুষ এখনও তাঁর অনুতাপ স্বীকার করেনি। কী লাভ হচ্ছে এত বছর ধরে এক যুদ্ধাপরাধীকে বাঁচিয়ে রেখে?
ধৃতরাষ্ট্রের অকপট উক্তিতে ব্যাস যেন আশ্বস্ত হলেন। আজ ষোলো বছর ধরে বৃদ্ধ-অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র নিদ্রা যেতে পারেননি। কারণ তিনি প্রিয় পুত্রের দোষ দেখেননি। আজ কি তিনি সুখে নিদ্রা যেতে পারবেন।
ব্যাস যেদিকে তাকান সেদিকেই শোকার্ত মুখ। দ্রৌপদী, সুভদ্রা পুত্রশোকে জর্জরিত। ভুরিশ্রবার ভার্যার নামটি ব্যাসদেব জানেন না। ভুরিশ্রবা যুদ্ধে নিহত। তিনিও সমশোকাতুরা। ভুরিশ্রবা ও তাঁর পিতা সোমদত্ত দুজনেই যুদ্ধে বীরের সম্মতি লাভ করেছেন। সবাই ব্যাসকে বলছেন, আমরা ষোলো বছর ধরে এই শোক বহন করে চলেছি। পিতামহ, আপনি বলুন কীভাবে আমরা মুক্ত হতে পারি।
এবার অগ্রবর্তিনী হলেন রাজমাতা কুন্তী। ঝড় যখন সমস্ত প্রদীপ নিভিয়ে দেয়, তখন জ্বলতে থাকা একটিমাত্র প্রদীপ ভীত কম্পমান হয়ে তার ক্ষীণ দ্যুতির জন্য ম্রিয়মান হয়ে থাকে। নিহত শত পুত্রের জননী গান্ধারীর পাশে কুত্তী সদা সঙ্কুচিত। তাঁর পুত্ররা সকলে জয়ী। তিনি তাই মরমে মরে আছেন। তাঁর মনে অব্যক্ত বেদনা আছে প্রথম পুত্র কর্ণের জন্য। কর্ণের শোচনীয় মৃত্যু তাঁর প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র অর্জুনের হাতে। ভাই ভাইকে হত্যা করেছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধই তো ভ্রাতৃঘাতী। কিন্তু এ পর্যন্ত সহোদরকে কেউ হত্যা করেনি। কর্ণ সেই সহোদরের হাতেই মৃত্যুবরণ করলেন। এর জন্য তো তিনি দায়ী। তিনি কানীন পুত্রের জন্ম দিয়েছেন। জন্মের পর তাঁকে জলে ভাসিয়ে দিয়েছেন। সেই মুহূর্তেই তো সে মারা যেতে পারত। খরস্রোতে হারিয়ে যেতে পারত সদ্যোজাত অবস্থাতেই। তিনিই তো তাঁর সদ্যোজাতকে হত্যা করতে গিয়েছিলেন। সে বেঁচে আছে জেনেও একদিনও মাতৃপরিচয় দিয়ে তার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলেননি, আমি তোর মা।
এতদিন তাঁর প্রথম পাপের কথা কাউকে বলতে পারেননি। আজ কুন্তী এই অরণ্যমধ্যে জীবনের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে শত শত শোকাকুলা নারী পুরুষের মাঝে বেদব্যাসের পা জড়িয়ে ধরে বললেন, পিতা, আপনি মহাদেবের তুল্য। আমার শ্বশুর। আপনাকে আমার পূর্ব বৃত্তান্ত খুলে বলছি।
দুর্বাসা মুনি আমাকে বর দিয়েছিলেন, দেবতাদের মধ্যে তুমি যাঁকে স্মরণ করবে তিনি তোমার কাছে চলে আসবেন। তারপর তুমি তার মিলনে এক দেবপুত্রের জননী হবে।
একদিন আমি রাজপ্রাসাদের অলিন্দ থেকে নবোদিত সূর্যকে দেখে কৌতূহলবশত তাকেই আহ্বান করে বসলাম। সঙ্গে সঙ্গে দেখি সেই তেজপুঞ্জ কলেবর দিবাকর আমার সামনে দাঁড়িয়ে। তিনি নিজের দেহকে দ্বিধাবিভক্ত করে এক অর্ধ দিয়ে মর্তভূমিতে তাপ প্রদান করতে লাগলেন। অন্য অর্ধ দিয়ে আমার সামনে এসে বললেন, হে বরাঙ্গনে, তুমি আমায় ডেকেছ। বর প্রার্থনা করো।
আমি ভীত হয়ে বললাম, ভগবান, আমার প্রার্থনা আপনি অচিরে স্বস্থানে প্রস্থান করুন। তিনি বললেন, ভদ্রে, তোমাকে অবশ্যই বর নিতে হবে। আমার আগমন নিরর্থক হতে পারে না। তুমি বর না নিলে তোমাকে ও তোমার বরদাতা ব্রাহ্মণ (দুর্বাসা)-কে ভস্ম করে ফেলব। আমি তখন দুর্বাসা মুনিকে রক্ষা করার জন্য বললাম, আমায় এই বর দিন। আমার যেন আপনার মতো পুত্র হয়। এই কথা বলামাত্র দিবাকর আমায় মুগ্ধ করে আলিঙ্গন করে বললেন, শোভনে, তুমি আমার মতোই এক পুত্র লাভ করবে।*
* সূর্যের সঙ্গে কুন্তীর যথার্থ যৌনমিলন হয়েছিল কি না তা মহাভারতে উল্লিখিত নেই। ব্যাসের মতে দেবতারা সঙ্কল্প, বাক্য, স্পর্শ, দৃষ্টি ও প্রীতি উৎপাদনের দ্বারাই পুত্রোৎপাদন করতে পারেন।
সূর্যদেব স্বর্গে গমন করার পর আমার এক সুকুমার নবকুমার জন্মাল। আমি তাকে গোপনে জলে ভাসিয়ে দিয়ে চলে এলাম। সূর্যদেবের কৃপায় আমি আবার কন্যকা অবস্থা (কুমারী) প্রাপ্ত হলাম।
আমি একবার শেষবারের মতো মৃত পুত্রকে দর্শন করতে চাই। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রও আপনার কাছে সেই বাসনা প্রকাশ করেছেন। তাঁর শত পুত্রদের একবার দেখবেন। আপনি আমাদের মনোবাসনা পূর্ণ করুন।
বেদব্যাস কুন্তীকে বললেন, কুন্তী, তুমি মানবী। দেবতার দ্বারা পুত্র উৎপাদনে তোমার কোনো পাপ হয়নি। তোমরা সবাই তোমাদের পুত্র, ভ্রাতা ও বন্ধু-বান্ধবদের সুপ্তোত্থিতের মতো দর্শন করবে। কুন্তী কর্ণকে, সুভদ্রা অভিমন্যুকে, দ্রৌপদী পঞ্চপুত্রকে ও পিতা ও ভাইকে দেখতে পাবে।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যে সব বীর নিহত হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে কেউ গন্ধর্ব, কেউ অপ্সরা, কেউ পিশাচ, কেউ কেউ গুহ্যক, কেউ কেউ রাক্ষস, যক্ষ, সিদ্ধ, কেউ দেবতা, কেউ দানব ছিলেন। তাঁরা মানুষ হয়ে জন্মে তাঁদের কাজ শেষ করে পুনরায় স্বর্গালোকে চলে গেছেন। এখন তোমরা সবাই আমার সঙ্গে ভাগীরথী তীরে চলো। সেখানেই তোমরা যুদ্ধে নিহতদের দেখবে। তখন তাঁরা সবাই উৎকণ্ঠিত চিত্তে ভাগীরথী তীরে উপস্থিত হলেন।
বেদব্যাস ভাগীরথীর পুণ্য জলে অবগাহন করে সংগ্রামে নিহত বীরদের উদ্দেশ করে আহ্বান জানালেন। কিছুক্ষণের মধ্যে জল থেকে মাথা তুললেন। মহারাজা বিরাট, দ্রুপদ ও দ্রৌপদীনন্দনগণ, সুভদ্রাতনয় অভিমন্যু, মহাবীর ঘটোৎকচ, কর্ণ, শকুনি, দুর্যোধন, দুঃশাসন, জরাসন্ধপুত্র, মহাবীর জগদত্ত, জরাসন্ধ, ভুরিশ্রবা, শল্য, শাল্ব, বৃষসেন, দুর্যোধনপুত্র লক্ষ্মণ, ধৃষ্টদ্যুম্নের পুত্র, শিখণ্ডীর পুত্রগণ, ধৃষ্টকেতু, বৃষক, নিশাচর, অলায়ুধ, মহারাজ সোমদত্ত, তারা সকলেই নিরহঙ্কার, শত্রুহীন। সকলেই দিব্যবস্ত্র, দিব্যকুণ্ডল দিব্যমাল্য পরে আবির্ভূত হলেন। বেদব্যাস ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীকে দিব্যচক্ষু দিলেন। তাঁরা প্রাণভরে প্রিয়জনদের দেখতে লাগলেন। সেই নিষ্পাপ ক্রোধমাৎসর্যবিহীন কুরু-পাণ্ডববংশীয় যোদ্ধারা পুলকিত চিত্তে উপস্থিত জীবিত আত্মীয়দের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন।
পুণ্যসলিলা ভাগীরথী সাক্ষ্য থাকল জীবিত ও মৃতদের এই স্বর্গীয় মিলন সন্ধ্যার। আবার সন্তানহারা তাদের সন্তান ফিরে পেলেন। স্বামীহারা ফিরে পেলেন স্বামীকে। ক্ষণকালের জন্য, তবু রাতের তারারা কয়েক প্রহর ধরেই ঝিকিমিকি জ্বলছিল। স্বর্গীয় সুষমায় আকাশ ভরে উঠেছিল।
ব্যাসদেব দেখলেন সারারাত তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলে গেলেন। হিংসা,
অসূয়া, ক্ষাত্র তেজ, গর্ব, অহঙ্কার যা কিছু জীবনকে কলুষিত করে মৃত্যু তাদের ধুয়ে মুছে দিয়ে সমান করে দেয়। যে স্বর্গে তারা চলে যায়, সে যেন এক স্বপ্নভূমি—অহিংসার অমৃতলোকে তা ভরা।
ব্যাস মনে মনে ভাবছিলেন, জীবনকে এই অমৃতলোকে কেন পৌঁছে দেওয়া যাবে না? মর্ত্যলোককে কেন ব্রহ্মলোক, বরুণলোক, কুবেরলোক ও সূর্যালোকে পরিণত করা যাবে না? ভোরের আলো ফুটবার আগে এই নিহত বীরেরা তাঁদের স্ব-স্ব লোকে ফিরে যাবেন যেখানে চিরশান্তি। কিন্তু ওই মর্ত্যলোককে কেন চিরন্তন দিব্যলোকে পরিণত করা যাবে না?
রাত্রি শেষ হতে চলল। বিধবা পত্নীরা আসন্ন বিচ্ছেদব্যথায় কাতর হয়ে ব্যাসদেবকে মিনতি করছেন, প্রভু প্রভাতসূর্যকে কী আর একটু বিলম্বে উঠতে অনুরোধ করা যায় না? ব্যাস বললেন, তোমরা কি তোমাদের স্বামীদের সঙ্গে আনন্দলোকে যেতে চাও?
স্বামীহারা রমণীরা একস্বরে বলল, হ্যাঁ প্রভু।
—তোমরা তাহলে এই জাহ্নবী জলে অবগাহন করো।
এই কথা শুনে রমণীরা ঝুপ ঝুপ করে ভাগীরথী জলে নেমে পড়লেন। প্রাণভরে অবগাহন করতেই অত্যাশ্চর্য কাণ্ড ঘটে গেল।
কালীপ্রসন্ন সিংহ মহাভারতের আশ্রমবাসিক পর্বে তা বর্ণনা করেছেন এইভাবে-
“এইরূপ সেই বীর সমুদয় অদৃশ্য হইলে কুরুকুল হিতৈষী ধর্মপরায়ণ মহাত্মা বেদব্যাস বিধবা রমণীদের সম্বোধন করিয়া বলিলেন, “হে সীমন্তিনীগণ, তোমাদের মধ্যে যাঁহার পতিলোক লাভে বাসনা আছে তাঁহারা অবিলম্বে এই জাহ্নবী জলে অবগাহন করো।’
বেদব্যাস একই কথা কহিবামাত্র পতিব্রতা কৌরব কামিনীগণ সে গঙ্গাজলে অবগাহন করিয়া অচিরাৎ মানুষ-দেহ হইতে মুক্তিলাভ ও দিব্যমূর্তি ধারণ পূর্বক দিব্যমাল্যে ভূষিতা হইয়া বিমান আরোহণে পতিলোকে প্রস্থান করিলেন।”
—
* কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর ভারতের জনসংখ্যা ভীষণভাবে কমে গিয়েছিল।
.
দম্যক আশ্রমে আবার ব্যাসদেবের আগমন
এই ঘটনার বিশ বছর পর দম্যক আশ্রমের সামনে ব্যাসদেবের রথ এসে থামল। ব্যাস এসেছেন ‘দম্যক আয়ুষ মহাবিদ্যাপীঠের’ তৃতীয় সমাবর্তন উৎসবে যোগ দিতে। সঙ্গে আচার্য সোমক।
তেত্রিশ বছর পরে ব্যাস এই আশ্রম বিদ্যাপীঠে এলেন। যদিও এর কাজকর্মের গতি, উন্নয়ন সম্প্রসারণের প্রতিটি পর্যায়ের সঙ্গে তিনি পরিচিত। মহাচার্য সোমক দম্যক তপোবন বিদ্যাপীঠের সমস্ত উন্নয়ন কার্য তদারক করে আসছেন। কিন্তু যার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না সেটি হল তেত্রিশ বছর আগে দেখা দম্যক অরণ্যের সঙ্গে এই স্থানের আজ কোনো মিল নেই। অরণ্য কেটে একটি বিশাল জায়গা নিয়ে জনপদ গড়ে উঠেছে। গড়ে উঠেছে সারি সারি কুটিরঘেরা এক একটি পল্লি। মহাচার্য সোমক বললেন, এই যে কুটিরগুলি দেখছেন, এগুলি সব স্থানীয় অধিবাসীদের নবনির্মাণ। গত দশ বৎসরের মধ্যে এই নতুন গ্রামগুলি গড়ে উঠেছে। গ্রামের প্রত্যন্ত প্রদেশে যে সব উপজাতিরা বাস করতেন তাঁদের তরুণ প্রজন্ম এখানে পুনর্বাসন পেয়েছেন। এঁদের পিতারা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে নিহত। বিধবা মাতাদের জন্য রাজ প্রতিনিধিরা এসে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এই এলাকা সমতল। অরণ্য নির্মূল করে সব পরিবারদের চাষযোগ্য জমি দেওয়া হয়েছে। এখানকার তরুণ প্রজন্ম এখন সবাই কৃষিকর্মে নিযুক্ত। এই অঞ্চলটি হিংস্র শ্বাপদে পরিপূর্ণ ছিল। আজ তারা কোথায় পালিয়েছে।
বেদব্যাস আগের দম্যক বিদ্যাপীঠকেও আর চিনতে পারলেন না। ইট সুরকি দিয়ে সুরম্য অট্টালিকা, সারি সারি আবাসন। এ কোন পুরীতে এলেন তিনি। আগে দূরের পাহাড়গুলি গাছপালার আড়াল থেকে দেখতে হত। এখন সেখানে শুধু আবাসন, ফাঁকা মাঠ। তার মধ্য দিয়ে অসংখ্য ছোট ছোট সরণি। এতক্ষণ যে শাল্মলী তরু পরিবৃত তারণ্যপথ ধরে আসছিলেন, দুপাশে সবুজ অরণ্যানীর বুক চিরে পথটি ধরে তিনি সেবার এসেছিলেন। সেই পথটি আরও প্রশস্ত হয়েছে।
তিনি লক্ষ্য করলেন, আগে যখন এই পথ ধরে দু-তিনবার এসেছিলেন, তখন দুপাশের অরণ্যে কত দলবদ্ধ মৃগদের দেখেছেন। দেখেছেন হাতির সার রাস্তা পার হচ্ছে। সারথি রথ থামিয়ে অপেক্ষা করেছে। তারা চলে গেলে আবার যাত্রা শুরু করেছেন। কখনও রাস্তার ওপর বিচিত্র বর্ণের ময়ূরীরা দাঁড়িয়ে যেন কোনো পথসভা করছিল। রথের অশ্বখুরের শব্দে তাঁর ধীর গতিতে বনের মধ্যে দেহ লুকিয়েছে। এবার একটি বন্য জন্তু ও চোখে পড়ল না, শুধু কিছু হনুমানের দল ছাড়া। সেবার সারা পথে কোনো যানবাহন কিংবা পদাতিককে চোখে পড়েনি। এবার দেখলেন মাঝে মাঝেই যাত্রীবাহী অথবা মালবাহী শকট চলছে। একটি-দুটি রথও চোখে পড়ল।
আচার্য সোমক তাঁর সহযাত্রী। তিনি প্রতি বছর একবার করে দম্যক বনে আসেন। উন্নয়নের কাজ তদারক করেন। তিনি এই অঞ্চলের উন্নয়নের গতিবিধির খোঁজ রাখেন। ব্যাসকে বললেন, এই অঞ্চলের যে উন্নয়ন দেখছেন, তা সবই আমাদের দম্যক আয়ুষ বিদ্যাপীঠকে কেন্দ্র করে। প্রভু, মনে পড়ে, এই বিদ্যাপীঠের জন্য আপনি দশ সহস্ৰ স্বর্ণমুদ্রা এনে দিয়েছেন। সে তপোবন বিদ্যাপীঠ আর নেই। আপনি যখন আমাকে যুদ্ধের চার বৎসর আগে তপোবন তৈরির জন্য এখানে পাঠিয়েছিলেন, তখন কোনো পথই ছিল না। অরণ্যের মধ্য দিয়ে একটি পায়ে চলা পথ ধরে আমি ও শারদ্বত গিয়েছিলাম। শারদ্বত এই অঞ্চলের অধিবাসী ছিল। তার নির্দেশমতো অরণ্যের পার্শ্ববর্তী পল্লীতে এক ব্রাহ্মণের কুটিরে একমাস ছিলাম। তারপর কয়েকজন গ্রামবাসীর সহায়তায় এই ক্ষীণকায়া সরোবরের পাশে আমরা দুটি কুটির নির্মাণ করে আশ্রম গড়ে তুলি। গ্রামগুলি থেকে চারটি ছাত্র জোগাড় করে আমরা বিদ্যাপীঠ গড়ে তুলি। রাত্রে শ্বাপদের ভয়ে, সর্পভয়ে আমরা খুবই সন্ত্রস্ত থাকতাম। তারপর যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসাবে রাজা দুর্যোধনের নির্দেশ এই অরণ্য থেকে প্রচুর হাতি ধরা শুরু হয়। ওই হাতি ধরার দল আমাদের সঙ্গে থাকত, তারা চারটি অস্থায়ী কুটির নির্মাণ করে। তারা চলে যাওয়ার পর কুটিরগুলি আমাদের দিয়ে যায়।
আমরা ওই কুটিরগুলিতে প্রথম পঠন-পাঠন শুরু করি। তারপর আপনি ছাত্রদের আশ্রমে পাঠান। তিনজন আচার্যকেও পাঠান। আমরা পঠন-পাঠন শুরু করতেই যুদ্ধ বেধে যায়। গ্রামকে গ্রাম উজাড় করে যুবকদের জোর করে নিয়ে যাওয়া হয় যুদ্ধে যোগ দিতে। গ্রামের হস্তশিল্পগুলি লোকাভাবে নষ্ট হয়ে যায়। কৃষিকর্মের জন্য লোক পাওয়া বিরল হয়ে ওঠে। আপনি আমাদের অর্থসাহায্য করেছিলেন। কিন্তু অর্থ দিয়ে কী করব? আমাদের লোকবল কোথায়? তারপর যুদ্ধ শেষ হলে আপনি অশ্বত্থামাকে পাঠালেন। কিন্তু তখন আমাদের আর্থিক অবস্থা এত খারাপ যে তাকে যথোচিত যত্ন করতে পারিনি।
বেদব্যাস ও তাঁর সহযোগী মহাচার্য সোমককে নিয়ে রথ থেকে নামলেন। গ্রামবাসীরাও সুরমা অট্টালিকা, সারি সারি আবাসন। এ কোন পুরীতে এলেন তিনি। আগে দূরের পাহাড়গুলি গাছপালার আড়াল থেকে দেখতে হত। এখন সেখানে শুধু আবাসন, ফাঁকা মাঠ। তার মধ্য দিয়ে অসংখ্য ছোট ছোট সরণি। এতক্ষণ যে শাল্মলী তরু পরিবৃত অরণ্যপথ ধরে আসছিলেন, দুপাশে সবুজ অরণ্যানীর বুক চিরে পথটি ধরে তিনি সেবার এসেছিলেন। সেই পথটি আরও প্রশস্ত হয়েছে।
তিনি লক্ষ্য করলেন, আগে যখন এই পথ ধরে দু-তিনবার এসেছিলেন, তখন দুপাশের অরণ্যে কত দলবদ্ধ মৃগদের দেখেছেন। দেখেছেন হাতির সার রাস্তা পার হচ্ছে। সারথি রথ থামিয়ে অপেক্ষা করেছে। তারা চলে গেলে আবার যাত্রা শুরু করেছেন। কখনও রাস্তার ওপর বিচিত্র বর্ণের ময়ূরীরা দাঁড়িয়ে যেন কোনো পথসভা করছিল। রথের অশ্বক্ষুরের শব্দে তাঁর ধীর গতিতে বনের মধ্যে দেহ লুকিয়েছে। এবার একটি বন্য জন্তুও চোখে পড়ল না, শুধু কিছু হনুমানের দল ছাড়া। সেবার সারা পথে কোনো যানবাহন কিংবা পদাতিককে চোখে পড়েনি। এবার দেখলেন মাঝে মাঝেই যাত্রীবাহী অথবা মালবাহী শকট চলছে। একটি-দুটি রথও চোখে পড়ল।
আচার্য সোমক তাঁর সহযাত্রী। তিনি প্রতি বছর একবার করে দম্যক বনে আসেন। উন্নয়নের কাজ তদারক করেন। তিনি এই অঞ্চলের উন্নয়নের গতিবিধির খোঁজ রাখেন। ব্যাসকে বললেন, এই অঞ্চলের যে উন্নয়ন দেখছেন, তা সবই আমাদের দম্যক আয়ুষ বিদ্যাপীঠকে কেন্দ্র করে। প্রভু, মনে পড়ে, এই বিদ্যাপীঠের জন্য আপনি দশ সহস্ৰ স্বর্ণমুদ্রা এনে দিয়েছেন। সে তপোবন বিদ্যাপীঠ আর নেই। আপনি যখন আমাকে যুদ্ধের চার বৎসর আগে তপোবন তৈরির জন্য এখানে পাঠিয়েছিলেন, তখন কোনো পথই ছিল না। অরণ্যের মধ্য দিয়ে একটি পায়ে চলা পথ ধরে আমি ও শারদ্বত গিয়েছিলাম। শারদ্বত এই অঞ্চলের অধিবাসী ছিল। তার নির্দেশমতো অরণ্যের পার্শ্ববর্তী পল্লীতে এক ব্রাহ্মণের কুটিরে একমাস ছিলাম। তারপর কয়েকজন গ্রামবাসীর সহায়তায় এই ক্ষীণকায়া সরোবরের পাশে আমরা দুটি কুটির নির্মাণ করে আশ্রম গড়ে তুলি। গ্রামগুলি থেকে চারটি ছাত্র জোগাড় করে আমরা বিদ্যাপীঠ গড়ে তুলি। রাত্রে শ্বাপদের ভয়ে, সর্পভয়ে আমরা খুবই নম্রস্ত থাকতাম। তারপর যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসাবে রাজা দুর্যোধনের নির্দেশ এই অরণ্য থেকে প্রচুর হাতি ধরা শুরু হয়। ওই হাতি ধরার দল আমাদের সঙ্গে থাকত, তারা চারটি অস্থায়ী কুটির নির্মাণ করে। তারা চলে যাওয়ার পর কুটিরগুলি আমাদের দিয়ে যায়।
আমরা ওই কুটিরগুলিতে প্রথম পঠন-পাঠন শুরু করি। তারপর আপনি ছাত্রদের আশ্রমে পাঠান। তিনজন আচার্যকেও পাঠান। আমরা পঠন-পাঠন শুরু করতেই যুদ্ধ বেধে যার। গ্রামকে গ্রাম উজাড় করে যুবকদের জোর করে নিয়ে যাওয়া হয় যুদ্ধে যোগ দিতে। গ্রামের হস্তশিল্পগুলি লোকাভাবে নষ্ট হয়ে যায়। কৃষিকর্মের জন্য লোক পাওয়া বিরল হয়ে ওঠে। আপনি আমাদের অর্থসাহায্য করেছিলেন। কিন্তু অর্থ দিয়ে কী করব? আমাদের লোকবল কোথায়? তারপর যুদ্ধ শেষ হলে আপনি অশ্বত্থামাকে পাঠালেন। কিন্তু তখন আমাদের আর্থিক অবস্থা এত খারাপ যে তাকে যথোচিত যত্ন করতে পারিনি।
বেদব্যাস ও তাঁর সহযোগী মহাচার্য সোমককে নিয়ে রথ থেকে নামলেন। গ্রামবাসীরাও ভিড় করেছিল তাঁকে দেখার জন্য। এরা অধিকাংশই তরুণ প্রজন্ম। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর জন্ম। অনেকেরই পিতা যুদ্ধে মৃত। তখন তারা শিশু। কিছুই বুঝত না। কিন্তু কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কথা এখন লোককথায় পরিণত হয়েছে। কুরু-পাণ্ডবদের নিয়ে লোকগীত রচনা হয়েছে। মাঝে মাঝে গীতি সহকারে তা অভিনীতও হয়। ব্যাসদেব তাঁদের কাছে পরিচিত চরিত্র। কিন্তু তাঁকে তারা কেউ দেখেনি। তাই ব্যাসদেব আসছেন শুনে বহু মানুষ তাঁকে দেখার জন্য ছুটে এসেছেন। ব্যাস রথ থেকে নামামাত্র তাঁরা শঙ্খ বাজিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাল। ধ্বনি উঠল, ‘জয় ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের জয়। জয় মহর্ষি ব্যসদেবের জয়। জয় মহাচার্য সোমকের জয়।’
গ্রামবাসীরা শুনেছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আর একজন জীবন্ত চরিত্র দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা এই বিদ্যাপীঠে বাস করেন। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম কেউ তাঁকে দেখেনি। কারণ তিনি একদম আশ্রমের ভিতরে তাঁর নিজস্ব ঘরে থাকেন। তিনি অসুস্থ, তাই ঘর থেকে বার হন না। তবে কেউ কেউ নাকি তাঁকে প্রভাতকালে আশ্রম মধ্যে প্রাতঃভ্রমণ করতে দেখেছে।
আচার্য গৌতম এগিয়ে এসে পাদস্পর্শ করে প্রণাম করলেন। তিনি এখন বৃদ্ধ হয়েছেন। তিনি সন্ন্যাস নিয়েছেন। মুণ্ডিত মস্তক। গায়ে গৈরিক বসন। গৌতম বললেন, প্রভু, হস্তিনাপুরের সংবাদ কিছু বলতে পারেন? আমরা শুনলাম মহারাজ যুধিষ্ঠির নাকি সিংহাসন ত্যাগ করে প্রব্রজ্যা নেবেন?
ব্যাস বললেন, যুধিষ্ঠির তো ৩৬ বর্ষ রাজত্ব করলেন। দেশ এখন সুশাসিত। রাজ্যও সুশাসিত। কিন্তু তিনি সারাজীবন ধরে অবসাদে ভুগছেন। বিশেষ করে তাঁর মাথায় ঢুকেছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সৈন্যের নিধনের জন্য তিনিই দায়ী। তিনি সব সময় বলেন এইবার প্রব্রজ্যা নিয়ে মহাপ্রস্থানের পথে যাত্রা করবেন। সংসার পরিত্যাগ করবেন। তুমি যেমন সন্ন্যাস নিয়েছ, তেমনি তিনিও সন্ন্যাস নেবেন।
গৌতম বললেন, প্রভু, আমি তো সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাস নেবার জন্যই আপনার কাছে গিয়েছিলাম। আপনি আমায় বললেন, কর্মই সন্ন্যাস। শিক্ষকের কাছে জ্ঞান অর্জন ও বিতরণই কর্ম আর নির্মোহ হয়ে সেই কর্মে লিপ্ত থাকাই সন্ন্যাস। আমি তো কর্ম ত্যাগ করিনি।
ব্যাস বললেন, আমরা ঋষিরা কিন্তু কেউ সংসার ত্যাগ করি না। কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ থেকেই তপস্যা করি। এই তপস্যাও সাময়িক। নির্দিষ্ট সিদ্ধিলাভের জন্য। সিদ্ধিলাভ হয়ে গেলে তপস্যা ভঙ্গ করি। কিন্তু জীবনের একটি সৎ উদ্দেশ্য থাকবেই। সেই উদ্দেশ্য পূরণের জন্যই তপস্যা। ছাত্রদের যেমন অধ্যয়ন তপস্যা, শিক্ষকদের তেমন স্বাধ্যায় ও পাঠন তথা শিক্ষণই তপস্যা। তুমি এমনভাবে ছাত্রদের অনুপ্রাণিত করছ যাতে তাদের অধীত বিদ্যা সমাজের হিতসাধন করতে পারে। তুমি শিক্ষক তাই শিক্ষকের তপশ্চর্যার জন্য তুমি সন্ন্যাস নিয়েছ, ভালোই করেছ। তুমি আসক্তি মুক্ত হয়েছ। কিন্তু সন্ন্যাসীও হিতকর্ম করতে পারে। নিষ্ক্রিয় থাকাই একমাত্র সন্ন্যাস নয়। অনেক আচার্যকে দেখেছি তাঁরা বিদ্যা বিক্রি করেন। সূর্যদেব যদি তাঁর কিরণ বিক্রি করতেন, তাঁকে আমরা বড়জোর একজন বড় সওদাগর বলতাম। দেবতা বলতাম না।
গৌতম বললেন, মহর্ষি, আপনার অনুপ্রেরণাই আমার জীবন পাথেয়। আপনার নির্দেশিত পথেই আমি চলেছি। সন্ন্যাস গ্রহণের অভিপ্রায়ও আপনাকে জানিয়েছিলাম। আপনি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।
ব্যাস বললেন, তুমি যদি বিদ্যার্থীদের দেবদ্বিজে ভক্তি করতে শেখাও, প্রাজ্ঞ ব্যক্তির পূজা, শুচিতা, ঋজুতা, ব্রহ্মচর্য, অহিংসা, সত্যপ্রিয় ও হিতকর বাক্য শেখাতে পারো, তাদের চিত্তশুদ্ধি ঘটাতে পারো, অক্রুরতা, মৌনতা ও আত্মনিগ্রহের মতো ভাবশুদ্ধি তথা মানসিক তপস্যা শেখাতে পারো, তবেই তোমার সন্ন্যাস গ্রহণ সার্থক।
গৌতম বললেন, চেষ্টা তো করে যাচ্ছি প্রভু। আপনি যখন এসেছেন সমাবর্তন ভাষণে, আপনি শিক্ষক ও ছাত্রদের কিছু মূল্যবান উপদেশ দেবেন। এই প্রতিষ্ঠান এখন বড় হয়ে যাওয়ায় নানা প্রান্ত থেকে নানা মতের শিক্ষক ও আচার্য এসেছেন। মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা বড় কঠিন। যত মানুষ তত মত। বন্যার জল যখন আপনা-আপনি না সরে যায়, ততক্ষণ তা নিয়ন্ত্রণ করা বড় দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিটি মানুষ তার সহজাত মৌলিক সংস্কারে অটল। শাস্ত্রজ্ঞান তার ওপর প্রলেপ মাত্র। আমাদের ছাত্ররা মেধাবী। আচার্যরাও জ্ঞানী। তাঁরা এককভাবে অনন্য। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধের সঙ্গে তাঁরা নিজেদের মেলাতে পারেন না। এর ফলে অনেকের মধ্যে আত্মচেতনার সংকট দেখা দেয়।
গৌতম মহর্ষি ব্যাস ও আচার্য সোমকের সঙ্গে হেঁটে চলছিলেন অতিথি নিবাসের দিকে। মূল প্রবেশদ্বার থেকে অনেকখানি হাঁটা পথ। দুজন আচার্য রথ থেকে নামিয়ে তাদের জিনিসপত্রগুলি নিয়ে আসছিল। দুজনের পোশাক সম্বলিত দুটি পুঁটলি। একটি কাঠের বাক্স ভৰ্তি কিছু পুঁথি।
মহর্ষি আগে একটি ছোট ঘরে ছিলেন। সোমক সে সময় সে ঘরটি ব্যবহার করতেন। তিনি আচার্যের জন্য তাঁর ঘরটি ছেড়ে দিয়েছিলেন। এবারের অতিথি নিবাসটি কয়েকটি সুসজ্জিত কুটির। একটি টিলার ওপর অবস্থিত। পিছনে দেখা যায় ত্রিভুজাকৃতি শিলাময় পাহাড়টি। তার উচ্চ চূড়া গাছ দিয়ে ঢাকা। আর সামনের বাতায়ন খুলে দিলে চোখে পড়ে প্রশস্ত সেই আনন্দ সরোবর। কানায় কানায় পরিপূর্ণ জলে পদ্মফুও ফুটে আছে। মরাল চলছে জল কেটে কেটে। দূর থেকে মনে হচ্ছে চলমান শ্বেতপদ্মের সারি। আনন্দ সরোবরের তীর জুড়ে প্রশস্ত কানন। ফুটেছে অজস্র বিচিত্র বর্ণের ফুল। দেখে মহর্ষির মন ভরে গেল। নান্দনিক দৃশ্য মানুষের মনকে বড় প্রভাবিত করে।
অতিথি আবাসটিতে একটি খাট। সাদা চাদর পাতা বিছানা। ঘরের মধ্যে দেওয়ালে টাঙানো কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের একটি পটচিত্র। সপ্তরথী পরিবেষ্টিত অভিমন্যু।
ব্যাস জিজ্ঞাসা করলেন, এই আলেখ্য অঙ্কন করল কে?
গৌতম বললেন, আমাদের একজন প্রাক্তন ছাত্র চিত্রসেন। সে উপাধি পেয়ে তার দেশ কোশল রাজ্যে ফিরে গেছে। ছেলেটি অঙ্কনে পটু ছিল।
ব্যাস বললেন, দেখো, এই সব বিষাদ উদ্রেককারী চিত্র স্মৃতিপথে না আনাই শ্রেয়। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শুধু তো ধ্বংস নয়, তার মধ্যে অর্জুনের প্রতি শ্রীকৃষ্ণের উপদেশগুলিও আছে। আমি সঞ্জয়ের কাছ থেকে পুরো উপদেশগুলি সংগ্রহ করেছি। কিছুটা অর্জুনের স্মৃতিতে এখনও আছে। এগুলি হচ্ছে মহাভারতের মর্মবাণী। অথবা শরশয্যায় শায়িত পিতামহ যুধিষ্ঠিরকে যে উপদেশগুলি দিচ্ছেন। ইতিহাস কোনটিকে বাঁচিয়ে রাখবে, আত্মঘাতী এক রক্তাক্ত যুদ্ধের বিভীষিকাকে, না মানুষের চিরকালের বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা শ্রীকৃষ্ণের অমৃতকথাকে? শ্রীকৃষ্ণ যে কুরুক্ষেত্রের মহাশ্মশানে জীবনের যে জয়গান গেয়েছেন সেটাই সারা বিশ্বের মানুষের বেঁচে থাকার উজ্জীবনী মন্ত্র।
আচার্য গৌতম বললেন, সেটি কী ভগবন? আমাকে একটু বলবেন?
ব্যাস বললেন, আমি আমার মহাভারতে তা উদ্ধৃত করব। সমস্ত কাজ তোমাকে আসক্তি ত্যাগ করে করতে হবে। ব্রহ্মকেই (ঈশ্বর) সমস্ত কর্মফল অর্পণ করতে হবে। পদ্মা পাত্রে জল যেমন লিপ্ত হয় না, তেমনিভাবে তোমাকে নির্লিপ্তভাবে সব কাজ করে যেতে হবে।
ব্রহ্মসাধ্যায় কর্মানি সঙ্গংত্যক্ত করোত্রি যঃ
নিতে ন ম পাপেন পদ্মপাত্রনিম্ভাস্য।
কর্ম ত্যাগ করে সন্ন্যাস নেওয়ার চেয়ে কর্মযোগী হয়ে কাজ করে যাওয়াটাই বড় তপস্যা।
গৌতম তাঁকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলেন। একদিকে ছাত্রাবাস। আচার্যদের কুটির। একটি সেবাকেন্দ্র, তা গ্রামবাসীদের জন্য উন্মোচিত। বিদ্যালয়ের আচার্য ও ছাত্ররা সেটি পরিচালনা করেন। তাতে দশটি শয্যা আছে। গ্রামের মানুষদের এর আগে কোনো সেবাকেন্দ্র ছিল না। অসুস্থ হলে স্থানীয় ওঝাদের কাছে লোকে যেত। তারা নানা তুকতাক ও মন্ত্র পড়ে রোগ সারাত। বীভৎস যন্ত্রণাদায়ক নানা প্রক্রিয়া। আহতদের সচেতন অবস্থায় তীক্ষ্ণ ছুরিকা দিয়ে অঙ্গচ্ছেদ করা হত। এখন আয়ুষ বিদ্যাপীঠে গবেষণা চলছে কীভাবে শল্য চিকিৎসায় যন্ত্রণা কমিয়ে আনা যায়।
তেত্রিশ বছর পরে অশ্বত্থামার সঙ্গে আবার দেখা হবে বেদব্যাসের। অশ্বত্থামা এখন যে ঘরে থাকেন, সেটিও নবনির্মিত। তবে মূল আবাসন বিন্যাস থেকে একটু দূরে। তাঁর জন্য স্বতন্ত্র আবাস তৈরি করা হয়েছে। অশ্বত্থামা সংক্রামক রোগে আক্রান্ত জেনে আশ্রমের কেউ তাঁর কাছে আসেন না বলে ব্যাস তাঁর নবনির্মাণ পরিকল্পনায় অশ্বত্থামার জন্য একটি আলাদা বাসস্থান নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। এটি একটি প্রাচীরঘেরা ইষ্টক নির্মিত কুটির। কুটিরটির চারপাশে ফুলের গাছ। দুটি ঘর। একটি শয়ন ঘর।
তপোবন ভিষক বিদ্যালয় সেবাকেন্দ্রটি ঠিক তার পাশে। এখানে দশটি শয্যা। কিন্তু কখনও তিন-চারটির বেশি রোগী পাওয়া যায়নি। গ্রামেরা মানুষ অসুখ হলে লৌকিক চিকিৎসা করতেই আগ্রহী। ঝাড়ফুঁক, জলপড়া এবং প্রাকৃতিক চিকিৎসা করে যতটুকু নিরাময় হয়। গ্রামে সর্পাঘাত উদরাময় ও শিশুদের অপুষ্টিজনিত মৃত্যুর সংখ্যাই বেশি। নারীরাই বেশি রোগক্রান্ত হয়। কিন্তু তাদের কাউকে সেবাকেন্দ্রে এলে চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। ধাত্রীরাই নারীর গৃহ চিকিৎসা করে প্রসব করায়। চিকিৎসাবিদ্যার ছাত্রদের ভেষজ প্রয়োগ ও চিকিৎসা প্রণালী শিখতে হয়। ভেষজ প্রয়োগ করে পরীক্ষা করার মতো কোনো রোগী এখন সেবাকেন্দ্রে নেই। অশ্বত্থামাই তাঁদের একমাত্র রোগী। যাঁর ওপর ভেষজ প্রয়োগ করে যক্ষ্মাকে নিরাময় করে ফেলেছেন ভিষকাচার্য ও ছাত্রেরা।
অশ্বত্থামার মুখ দিয়ে রক্ত পড়া বন্ধ হয়েছে। বুকের প্রদাহ আর নেই। কিন্তু তার বদলে, তারা সারা দেহ বিস্ফোটকে ভর্তি হয়ে গেছে। সেগুলি থেকে দারুণ যন্ত্রণা হয়। কৃষ্ণের অভিশাপের মধ্যে এই বিস্ফোটকের কথা ছিল। কৃষ্ণ অভিশাপ দিয়েছিলেন নিদারুণ মারী গুটিকায় তার অঙ্গ ভরে উঠবে। আর দুঃসহ প্রদাহ দেখা দেবে।
অশ্বত্থামার রাতের ঘুম অনেকদিন চলে গেছে। তিনি বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করে রাত্রি তিন ঘটিকায় আশ্রমিকদের সঙ্গে উঠে পড়েন। আশ্রমিকরা যখন প্রার্থনায় বসে, তখন তিনি অন্ধকারের মধ্যে একটি লাঠি নিয়ে প্রাঙ্গণে পদচারণা করেন আর ভোরের আলো ফুটলে অরণ্যপথ ধরে লাঠি হাতে এগিয়ে চলেন। আগে এসময়টা বন্য প্রাণীদের দেখতে পেতেন, এখন দু-একটি বিষাক্ত সাপ ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না। হাতি, ভলুক, শার্দূলরা এখন অরণ্যের আরও গভীরে চলে গেছে। অশ্বত্থামা ভাবেন, মানুষ মূক পশুদের অরণ্যের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। এর ফল কিন্তু মঙ্গলদায়ক হবে না।
অশ্বত্থামা প্রাতঃভ্রমণ থেকে ফিরে এসে কিছুক্ষণ ধ্যান করেন। কিন্তু ধ্যানের মধ্যে বারবার পাণ্ডব শিবিরে সেই ভয়াবহ রাত্রিটির কথা মনে আসে। নিদ্রিত ধৃষ্টদ্যুম্নকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তিনি তাকে পদাঘাতে পিষ্ট করছেন। পিতৃহন্তা ধৃষ্টদ্যুম্নকে বারবার পদাঘাতে ধরাশায়ী করেও তাঁর আশ মিটছে না। কখনও কখনও নিদ্রিত পাণ্ডবপুত্রদের মুণ্ডহীন দেহগুলি কবন্ধের আকারে তার সম্মুখে উদিত হয়। তা দেখে তিনি সমস্ত রোগযন্ত্রণা ভুলে যান। গর্বে তাঁর বুক ফুটে ওঠে। তিনি পিতৃহন্তকদের যথোচিত শাস্তি দিতে পেরেছেন। তাঁর কোনো অনুতাপ হয় না, বরং তৃপ্তিতে মন ভরে আসে।
এখনকার ছাত্রদের মধ্যে অশ্বত্থামাকে নিয়ে বিক্ষোভ আছে। তাদের বক্তব্য, অশ্বত্থামার মতো এক অসুস্থ বৃদ্ধের চিকিৎসার জন্য আশ্রম এত ব্যয়ভার বহন করছে কেন? সে একজন যুদ্ধাপরাধী। বহু শিশু ও বীরকে নিদ্রিত অবস্থায় হত্যা করেছে। সে পাপী। তাকে এইভাবে রাজকীয় সম্মান দিয়ে রেখে দেওয়া কেন? তাকে একটি স্বতন্ত্র বাসগৃহ, চিকিৎসা, পথ্য দেওয়া হচ্ছে। তার জন্য সেবক রাখা হয়েছে। তারা শুনেছে, অশ্বত্থামা অভিশপ্ত। অভিশপ্ত একজন পাপীকে এভাবে পরিচর্যা করে বাঁচিয়ে রাখার অর্থ কী? তাছাড়া আশ্রমের ভেতর একজন সংক্রামক রোগীকে রেখে দেওয়াও ছাত্রদের নিরাপত্তার পক্ষে সমীচীন নয়। বিপজ্জনক একজন রোগীকে আশ্রমে রেখে দেওয়া কর্তৃপক্ষের অনুচিত কাজ হচ্ছে।
কিন্তু মহাচার্য গৌতম ছাত্রদের নিরস্ত করে বলেছেন, তোমরা হয়তো জানো না অশ্বত্থামার পরিচয়। মহাবীর তিনি। আচার্য দ্রোণের পুত্র। অস্ত্র এবং শাস্ত্রে তাঁর একদা সমান ব্যুৎপত্তি ছিল।
কিন্তু ছাত্ররা শুনেছে তিনি রাতের অন্ধকারে পাণ্ডবপুত্রদের হত্যা করেছেন। তিনি শাস্ত্রবিরোধী কাজ করেছেন। ধর্মবিরোধী কাজ করেছেন। মানবতাই ভারতের ধর্ম। যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়া অন্যত্র হত্যা—সম্পূর্ণ ধর্মবিরোধী। তা দস্যুতা। ভারতের ধর্ম সত্য, ন্যায়, অহিংসা। বেদ সেই সত্যের কথাই বলে। আর ওই লোকটি বেদজ্ঞ হয়ে উত্তরার গর্ভপাত ঘটিয়েছিল। যুবরাজ পরীক্ষিৎ যে মৃত অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন এবং কৃষ্ণের অলৌকিক প্রভাবে প্রাণ ফিরে পেয়েছেন, সেই খবর লোকমুখে সর্বত্র প্রচারিত হয়েছে। তাই এখনকার ছাত্রদের কারোই অশ্বত্থামার ওপর কোনো সহানুভূতি নেই। মহর্ষি যে কেন এই অপরাধী ব্যক্তিত্বকে এত সমীহ করেন, তা তারা বুঝতে পারে না।
মহর্ষি বিশ্রাম সেরে গৌতমকে বললেন, অশ্বত্থামা কেমন আছে? আমি তাঁকে দেখতে চাই।
মহাচার্য গৌতম বললেন, মহর্ষি, আপনি পথশ্রমে ক্লান্ত। এখন একটু বিশ্রাম নিন। অশ্বত্থামার সঙ্গে সন্ধ্যার পর দেখা করবেন।
মহর্ষি বললেন, কাল সকালেই সমাবর্তন সেরে আমাকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। যুধিষ্ঠির আমাকে গুরুতর পরামর্শের জন্য ডেকেছেন। শ্রীকৃষ্ণের অনেকদিন কুশল সংবাদ পান না। দ্বারকা থেকে নানা দুঃসংবাদ আসছে। সেখানকার অবস্থা ভালো নয়। যুধিষ্ঠির খুব উদ্বিগ্ন। আমাকে ডেকেছেন পরামর্শের জন্য।
মহাচার্য বললেন, দ্বারকায় কী হয়েছে? আমাদের পাঁচটি ছাত্র দ্বারকা থেকে এসেছে। কই, তারা তো কিছু বলেনি।
—এই অরণ্যে -বাইরের কোনো সংবাদ আসে না। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সংবাদ গ্রামে এসে পৌঁছত না। একমাত্র রাজকীয় গুপ্তচরেরাই বহির্রাজ্যের সংবাদ নিয়ে আসে। এইরকম সংবাদে জানা যাচ্ছে, দ্বারকায় রাষ্ট্রবিপ্লব আসন্ন।
—সে কী, স্বয়ং কৃষ্ণ যেখানে অধীশ্বর।
—মনে রেখো, কৃষ্ণ দ্বারকার প্রতিষ্ঠাতা ও সমাজনেতা মাত্র। দ্বারকার রাজা কৃষ্ণের মাতামহ উগ্রসেন। যদুবংশের মধ্যে অবক্ষয়ের লক্ষণ দেখা দিয়েছে। এই অবক্ষয় থেকেই জাতির বিনাশ আসন্ন। উগ্রসেন-কৃষ্ণ কিছুতেই তা নাকি সামাল দিতে পারছেন না।
গৌতম বললেন, অবক্ষয়ের কারণ কী মহর্ষি?
মহর্ষি বললেন, কালের প্রভাবে নবীন জীর্ণ হয়। শ্রীকৃষ্ণ বলেন দেহও পুরাতন বস্ত্রের মতো জীর্ণ হয়ে একদিন তা পুরাতন দেহ ত্যাগ করে নতুন দেহ ধারণ করে। তাই জীর্ণ পুরাতন কাল এভাবেই ধ্বংস হয়। আবার অনেক সময় সমাজ দেহও নানা গ্লানিতে ভরে ওঠে। তখন আর সে সমাজকে সংস্কার করে নেওয়া যায় না। সমাজ একটি অট্টালিকার মতো। নিয়মিত সংস্কার না করলে তা জীর্ণ হয়ে ভেঙে পড়ে। অনেক সময় অট্টালিকায় নির্মাণে যদি ত্রুটি থেকে যায়, যদি নিম্নমানের সরঞ্জাম দিয়ে তা তৈরি হয়, যদি তার ভিত্তি মজবুত না হয়, সে অট্টালিকা কাল উত্তীর্ণ হবার আগেই জীর্ণ হয়ে যায়। তখন সেই অকাল জীর্ণ অট্টালিকাকে ভেঙে ফেলতে হয়।
গৌতম বললেন, ধর্মের গ্লানি বলতে আপনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন মহর্ষি? ধর্ম তো ভাগীরথীর জলের মতো পবিত্র, পুণ্যসলিলা। তা গ্লানিতে আচ্ছন্ন হয় কী করে?
ব্যাস বললেন, পবিত্র বলেই তাকে বেশী করে দূষণমুক্ত রাখতে হয়। পানীয় জলের সরোবরকেই বেশি করে প্রহরা দিতে হয়। কেউ যেন তা কলুষিত করতে না পারে।
গৌতম বললেন, ধর্ম তাহলে কী?
–ধর্ম আসলে কতগুলি মূল্যবোধ। সদ আচরণবিধি। তাকে ধারণ করতে হয় বলেই আমরা তাকে ধৰ্ম বলি।
ব্যাসদেব বললেন, এগুলি হল দান, দম, যজ্ঞ, স্বাধ্যায়, তপ, ঋজুতা, অহিংসা, সত্য, অক্রোধ, ত্যাগ, শান্তি, প্রাণীর প্রতি দয়া, আলোলুপতা, মৃদুতা, হ্রী, অচপলতা, তেজ, ক্ষমা, ধৃতি, শৌচ।* এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধর্ম হল অহিংসা। এই ধর্মগুলি যখন সমাজের বেশিরভাগ মানুষ পালন করে না, তখনই তাকে বলে ‘ধর্মের গ্লানি’, সামাজিক অবক্ষয় তখন প্রাকৃতিক নিয়মেই সমাজ ও রাষ্ট্র ভেঙে পড়ে। ভূকম্পন যেমন প্রকৃতিতে বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে পরিবর্তন আনে, ধর্মের গ্লানি আনে সামাজিক অবক্ষয়। অবক্ষয় আবার নতুন প্রজন্ম সৃষ্টি করে। ধর্মকে সর্বদা প্রদীপের মতো অন্তরে জ্বালিয়ে রাখতে হয়। ছাত্রদের বলো, মূল্যবোধহীন শিক্ষা, স্রোতহীন নদীর মতো। তার ভেতরে ক্রমাগত পলি জমতে জমতে একসময় তখন চড়া পড়ে যায়। জীবনকে বহতা নদীর মতো করতে গেলে মূল্যবোধের নিরন্তর প্রবাহ চাই। জীবনধর্মই প্রকৃত ধর্ম। এ জীবন ব্রহ্মের অংশ। জীবনকে আমরা রক্ষা করব ধর্ম পালন করে, ঈশ্বরের নির্দেশগুলিকে অন্তরে ধারণ করে। দ্বারকায় যে ধর্মসংকট উপস্থিত হয়েছে, তা কোথায় গিয়ে শেষ হবে কেউ বলতে পারে না। আমাদের এখানে এমন কেউ নেই যে ধর্মসংকট হলে তা থেকে আমাদের মুক্ত করবে। পাণ্ডবভ্রাতারা সবাই বৃদ্ধ হয়েছেন। অর্জুন আর গাণ্ডীব ধরেন না। যুবরাজ পরীক্ষিৎ সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ। যুধিষ্ঠির তাঁর হাতে রাজ্যভার দিয়ে প্রবজ্যা নিতে পারেন। এখন আমাদের আচার্যদের মূল কাজ হবে ছাত্রদের মধ্যে ধর্মচেতনা, মূল্যবোধ, মৌলিক সদগুণগুলিকে বিকশিত করে তোলা। আমি আগামিকাল সমাবর্তনে ছাত্রদের এসব কথাই বলব। আমি আজ রাতে অশ্বত্থামার সঙ্গে সাক্ষাৎকার করে তারপর শয্যা গ্রহণ করব।
—প্রভু, আবার কবে আপনার সাক্ষাৎ পাব? একজন আচার্য প্রশ্ন করলেন। ব্যাস বললেন, কথা দিতে পারি না বৎস। ঈশ্বর আমাকে এখন বাঁচিয়ে রেখেছেন শুধু মহাভারত রচনার জন্য।
[* এই মূল্যবোধগুলির কথা কৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছিলেন মহাভারতের ভীষ্মপর্বে। দম = ধৈর্য। মৃদুতা = নমনীয়তা, হ্রী = লজ্জা, শৌচ = পবিত্রতা।]
.
আবার ৩৩ বছর পরে অশ্বত্থামার মুখোমুখি হলেন মহর্ষি বেদব্যাস। অশ্বত্থামা বললেন, গত তেত্রিশ বছর ধরে আপনার প্রতীক্ষায় আছি মহর্ষি।
—তুমি কেমন আছ অশ্বত্থামা? মহর্ষি সস্নেহে জিজ্ঞাসা করলেন।
অশ্বত্থামা বললেন, আমি কুশলে আমি মহর্ষি। আপনাকে কী পাদস্পর্শ করে প্রণাম করতে পারি? আশ্রমে সবার কাছে আমি অচ্ছুৎ। শুধু আপনিই তেত্রিশ বছর আগে আমাকে সরোবরের তীরে জড়িয়ে ধরেছিলেন। আমার মনে হয় সেটি যেন গতকালের ঘটনা।
মহর্ষি বললেন, তুমি একজন যক্ষ্মারোগী। তাই লোকে তোমায় স্পর্শ করতে ভয় পায়। কিন্তু বাস্তব জীবনে সকলের অজান্তে কত যক্ষ্মারোগী পথে-ঘটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। লোকে তাদের জড়িয়ে ধরে। অজানাকে ভয় পায় না, জানাকেই অকারণে ভয় পায়। আমি তপঃপ্রভাবে আত্মশক্তিতে অভেদ্য। তুমি আজও আমায় প্রণাম করতে পারো। আমি সবার প্রণাম গ্রহণ করি কারণ আমি মনে করি প্রণাম শুধু গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন নয়। যে প্রণাম করে সে-ই নিজেকে শ্রদ্ধা করে। কারণ আত্মশ্রদ্ধাপরায়ণ ব্যক্তি ছাড়া কেউ অপরকে শ্রদ্ধা করতে পারে না।
অশ্বত্থামা এসে সাষ্টাঙ্গে প্রণত হলেন। ব্যাস তাঁকে ধরে তুলতে গিয়ে তাকিয়ে দেখলেন অশ্বত্থামার পেশীবহুল হাত আজ শীর্ণ। তাঁর শ্মশ্র গুম্ফের আড়াল থেকে দুটি প্রদীপের মতো জ্বলন্ত চক্ষুর জ্যোতি যেন নিষ্প্রভ।
ব্যাস বললেন, আমি শুনলাম চিকিৎসা তোমার রাজযক্ষ্মা সারিয়ে তুলেছে। আর্ত ও রোগাক্রান্ত মানুষের সেবার জন্য এই ভিযক বিদ্যাপীঠ গঠন করেছিলাম। তা যে সার্থক তা তোমায় দিয়ে প্রমাণিত হল। আমি আগামীকাল আমার সমাবর্তন ভাষণে সে কথা বলব।
অশ্বত্থামা বললেন, মহর্ষি, আপনি আমার যক্ষ্মা নিরাময় করেছেন। কিন্তু কৃষ্ণের অভিশাপ কে খণ্ডাবে? আমার সারা দেহ বিস্ফোটকে ভরে গেছে। এগুলির প্রদাহ বড় তীব্র। আমি রাতের পর রাত ঘুমোতে পারি না। আপনার কাছে আমার প্রথম প্রশ্ন, আমায় বলে দিন আমার ঘুম কী করে আসবে? নিদ্রাহীনের মতো দুর্ভাগা কেউ নেই।
ব্যাস বললেন, তোমার ভুল চিন্তাই নিদ্রাহীনতার কারণ। আত্মঅবমাননাকর চিন্তাই ভুল চিন্তা। অর্থাৎ নেতিবাচক চিন্তা। তুমি সব সময় ভাবো আমি একা, অসহায়, দুর্বল ও বন্ধুহীন। এই হীনম্মন্যতা তোমাকে কুরে কুরে খায়।
—তাহলে আমার সঠিক চিন্তা কী হওয়া উচিত প্ৰভু?
—ইতিবাচক চিন্তা। অতীতের ভুলের ওপর চেপে না বসে তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। তুমি প্রতিদিন ইতিবাচক চিন্তা করো। নিজেকে বারবার বলো, আমি সঙ্কল্পচ্যুত হবো না।
ইহাসনে শুষ্যতুমে শরীরং
ত্বগস্থি মাংসং প্রলয়ঞ্চ ধাতু।
অপ্রাপ্য বোধিং বহুকল্প দুর্লভ্যং
নৈবাসনৎ কায়ম প্ৰচনিষ্যতে।।
আমার শরীর শুকিয়ে যাক, ত্বক, অস্থি, মাংস, ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় হোক। তবু বহুকল্প দুর্লভ বোধিলাভ না করে আমার দেহ এই আসন ত্যাগ করবে না।
—বোধি কী প্রভু?
—মিথ্যার মায়াজাল উন্মোচন করে সত্যধর্মকে দর্শন করতে সমর্থ হওয়াই বোধি। তুমি শ্রদ্ধার সঙ্গে ভগবানের নাম স্মরণ করো। সচেতনভাবে ঈশ্বরকে গ্রহণ করো। ভক্তির মাধ্যমেই তাঁকে পাওয়া যায়। তুমি ভক্তিপরায়ণ হও। ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ করো। ভাবো, আমার ঈশ্বর আমার হৃদয়ে আছেন। আমার কোনো ভয় নেই।
—ঈশ্বরকে পাব কোথায়?
—কৃষ্ণই ভগবান। তিনিই ঈশ্বর। তিনিই তোমাকে শান্তি নিতে পারেন। তাঁকে তুমি স্মরণে, মননে, তোমার কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো। তিনিই তোমায় অভিশাপ দিয়েছেন। সে অভিশাপ প্রত্যাহার করতে পারবেন তিনিই।
—এ আপনি কী বলছেন মহর্ষি? তিনিই তো আমাকে এই অভিশপ্ত জীবন দিয়েছেন। আমি দ্রোণপুত্র। আমি কোনও অন্যায় করিনি। আমি পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিয়েছি। তিনি আমার মনোভাব উপলব্ধি না করেই আমায় অভিশাপ দিয়েছেন। আমি যাব তাঁর কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করতে?
ব্যাস বললেন, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের বড় বিজয় হল বিজয়ী বিজেতা সবার মনোভাব বদলেছে। ধৃতরাষ্ট্র তাঁর মৃত্যুর আগে তাঁর ভুল বুঝেছেন। তিনি অক্ষয় স্বর্গবাস করছেন।
অশ্বত্থামা, দুর্বলকে কেউ সাহায্য করে না। সাহায্য পাওয়ার জন্য ভগবানের কৃপালাভের জন্যও তোমাকে শক্তিশালী হয়ে উঠতে হবে। বনে যখন আগুন লাগে, বাতাস বন্ধু হয়ে এসে সেই বাতাসের তীব্রতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। দাবানল তীব্র হয়ে ওঠে। ওই বাতাসই আবার প্রদীপ শিখাকে এসে নিভিয়ে দেয়। সেই প্রবল বাতাস দুর্বল প্রদীপকে জ্বলে থাকার জন্য সাহায্য করে না। তুমি আজ দুর্বল বলে তোমায় কেউ সাহায্য করছে না। সবাই তোমায় পরিহার করছে। মানুষ তোমায় সাহায্য করবে না কারণ তুমি দুর্বল। এখন একমাত্র ভগবান কৃষ্ণই তোমার সহায় হতে পারেন কারণ তিনি অগতির গতি। দীনের প্রতি দায়বদ্ধ। যুধিষ্ঠিরও তাঁর ভুল উপলব্ধি করেছেন। একমাত্র তুমিই ছত্রিশ বছর ধরে তোমার পাপের বোঝা বহন করে চলেছ। এই দুঃসহ যন্ত্রণা লাঘব করতে পারছ না। তুমি এখনও মনে করছ হত্যা পাপ নয়, তা ধর্ম।
অশ্বত্থামা বললেন, সন্ত্রাস তত্ত্ব যা আমি প্রচার করতে চেয়েছিলাম, আমি সে তত্ত্ব প্রণয়নে ক্ষান্ত দিয়েছি মহর্ষি। এ নিয়ে আমি আর ভাবি না। তবে আমি একথা আপনাকে বলে যাচ্ছি, আপনি যাকে নেতিবাচক চিন্তা বলছেন, আগামীদিনে বহু জ্ঞানী-গুণী বুদ্ধিজীবী এই চিন্তা করে ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে থাকবেন। যিনি অহিংসার সপক্ষে কথা বলবেন, মানুষ তাঁকেই অবহেলা করবে। উপহাস করবে। হিংসাকেই লোকে বীরত্ব বলবে, অহিংসাকে নয়।
অশ্বত্থামা বলে চললেন, অহিংসা একটি তত্ত্বমাত্র হয়ে থাকবে আর সন্ত্রাসতত্ত্বই বুদ্ধিমানেরা প্রয়োগ করে লাভবান হবে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যারা কথা বলবে লোকে তাদেরই নিন্দা করবেন। আপনি দেখবেন রাষ্ট্র নিজেই একদিন সন্ত্রাসবাদী হয়ে উঠবে।
ব্যাস বললেন, দস্যুরা তো চিরকালই থাকবে। শিক্ষিত দস্যুরা দস্যুতাকে চিরকালই গৌরবান্বিত করে এসেছে। দ্রৌপদীর শ্লীলতাহানিকেও ভবিষ্যতে সমর্থকের অভাব হবে না। দুর্যোধনের পক্ষেও তো ভারতের বেশিরভাগ রাজারা ছিল। সংখ্যা দিয়ে হয়তো একদিন মানুষের মানবিক গুণগুলিকে মাপা হবে। কিন্তু শাশ্বত সনাতন ধর্মই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে। এখন তোমার মনোগত অভিপ্রায় আমাকে নিশ্চিন্তে বলতে পারো।
অশ্বত্থামা, তুমি আমার পুত্রপ্রতিম দ্রোণের পুত্র। তিনি মহাত্মা ছিলেন। তাঁকে আমি সম্মান করি। তাঁর নিধন পদ্ধতিকে আমি নিন্দা করি। ‘অশ্বত্থামা হত’ যুধিষ্ঠিরের মুখে এই অনৃতভাষণটি . এমন একটি মিথ্যা যা ইতিহাসে গভীর প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে। পরবর্তীকালে এইভাবে অর্ধসত্যের আশ্রয় নেবে বহু জ্ঞানী-গুণী, বহু রাজন্যবর্গ। এই উক্তি ন্যায়-নীতি ও ধর্মের প্রতি একটি আঘাত। কিন্তু তার পরিণতি হিসাবে তোমার যে ভূমিকা তার যে কী বিধ্বংসী প্রতিক্রিয়া হবে তা তুমি বুঝতে পারছ না। যুদ্ধ হিংসার বৈধকরণ আর সন্ত্রাস অবৈধ নৃশংসতার বৈধকরণ।
অশ্বত্থামা বললেন, আমায় ক্ষমা করবেন মহর্ষি। বৈধ আর অবৈধ হিংসা বলে কিছু নেই। যে কোনো প্রহার ও নিধনই হিংসা। এই হিংসা প্রকৃতির বিধান। প্রাণী হিংসা ব্যতীত আমরা জীবন ধারণ করতে পারি না। আমাদের প্রতি নিশ্বাসে বহু সংখ্যক জীবাণু আমরা গ্রহণ করছি। তারা আমাদের দেহের মধ্যেই মারা যাচ্ছে। একটি গাছের পাতা বা একটি বেগুনের সঙ্গে আমরা বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবাণুকে ভক্ষণ করছি। প্রাণ যাদের আছে, তারাই প্রাণী। এই সব অণু পরিমাণ জীবনেরও প্রাণ আছে। আমরা বিশ্বাস করি বৃক্ষেরও প্রাণ আছে। বৃক্ষছেদনও তো হিংসা। যে বিষধর সর্প বা বৃশ্চিক আমার গৃহে বা শয্যাতলে আশ্রয় নেয়, আমি যদি তাকে বিনাশ না করি সে আমার বিনাশ করবে। তাকে বিনাশ করাই আমার ধর্ম। বিচারকের ধর্ম যে অপরাধী অন্যকে হত্যা করেছে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া।
মহর্ষি বললেন, কিন্তু বিচারকও তাঁর খুশিমতো মৃত্যুদণ্ড দিতে পারেন না। তিনি লিখিত সংহিতা অনুসারেই মৃত্যুদণ্ড দেন। ঘোষণা করেই যুদ্ধ হয়। দুই প্রতিপক্ষকে শক্তি প্রদর্শনের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি নেওয়ার সময় দেওয়া হয়। অসতর্ক আক্রমণই সন্ত্রাস। নিরীহ সাধারণ নাগরিকদের হত্যা করাই সন্ত্রাস। রাতের অন্ধকারে ঢুকে হত্যা করাটাই সন্ত্রাস। অহিংসা বলতে আমরা কখনও বলিনি বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণ। যুদ্ধকে পরিহার করা মানে পররাজ্য আক্রমণ না করা। যে কোনও ব্যক্তির বেঁচে থাকার অধিকারকে সুরক্ষিত করা। তোমার পিতৃহত্যাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে গেলে তুমি যুদ্ধক্ষেত্রে হত্যাকারীকে যে কোনো উপায়ে হোক নিধন করো। কিন্তু শিবিরে গভীর রাতে হানা দিয়ে তুমি তাকে হত্যা করবে কেন? দ্রৌপদীর পুত্রদের তুমি হত্যা করবে কেন? তারা তো তোমার পিতাকে হত্যা করেনি। সেদিন রাতে কত নিরীহ মানুষকে তুমি হত্যা করেছ। কত অশ্ব, হস্তী, সারথি নিহত হয়েছে। কী অপরাধ করেছিল তারা? অহিংসা পরম ধর্ম, ভারতের এই সনাতন ধর্মের নীতি তোমার মাথায় গত ৩৬ বছর ধরে ঢোকাতে পারছি না। আক্রান্ত হলে আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ অহিংসা। কিন্তু নির্বিচারে নিরপরাধদের হত্যা হিংসা।
তুমি নিজে একটা অন্যায় করে সে অন্যায় সমর্থনের জন্য একটি তত্ত্ব খাড়া করতে চাইছ। তুমি নিজের বিবেক যন্ত্রণায় দগ্ধ হচ্ছ। তোমার লক্ষ্য স্থির নেই। তোমার প্রকৃত ধর্ম কী, লক্ষ্য কী? সে সম্পর্কে কৃত নিশ্চয় নও। এখনও তুমি দোলাচলে। এই দোলাচল কাটিয়ে ওঠো।
মহর্ষি দেখলেন অশ্বত্থামা নীরবে মাটির দিকে চেয়ে কী ভাবছেন। তিনি আবার বলে চললেন, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে মাত্র দশজন ছাড়া অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সৈন্য মারা পড়ল। তুমি শুধু তোমার পিতার কথা ভাবছ? যুদ্ধ যে মানুষের বিবেক, মানবতা, মূল্যবোধকে নিহত করে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি করে, এই বৃহত্তম ক্ষতি তুমি দেখছ না। তুমি শুধু পিতৃশোকে কাতর হয়ে আছ।
অশ্বত্থামা বললেন, মহর্ষি, আমি কিন্তু সন্ত্রাসের পক্ষে কোনো তত্ত্বকথা প্রচার করিনি। শুধু আমার মনোভাব ব্যক্ত করেছি মাত্র। একথা ঠিক, গত ৩৬ বছর ধরে আমার মন দোলাচলে ডুবে রয়েছে। কিন্তু আমি সন্ত্রাসচিন্তা মন থেকে বিসর্জন দিয়েছি। আমি শুধু বারবার ভেবেছি কীভাবে রোগাক্রান্ত এই ভগ্নস্তূপের মতো মন নিয়ে আমি তিন হাজার বছর বেঁচে থাকব। এই আশ্রমের আশ্রমিকরা এখনই আমায় পরিত্যাগ করেছে। তিন হাজার বছর কি এই আশ্রম থাকবে? সমস্ত সৃষ্টিরই লয় আছে। আমি তিন হাজার বছর ধরে এই ভগ্ন শরীরে বনে, জঙ্গলে, পর্বতে কীভাবে একা একা ঘুরব?
মহর্ষি বেদব্যাস বললেন, কী চাও তুমি অশ্বত্থামা?
—মৃত্যু। আমি দীর্ঘ জীবন চাই না মহর্ষি। আপনি শুধু আমায় মৃত্যুবর দান করুন।
ব্যাস বললেন, আমি তা পারি না অশ্বত্থামা। স্বয়ং কৃষ্ণ তোমায় তিন হাজার বছর আয়ু দিয়েছেন। আমি কী করে তা ফিরিয়ে নেব? তুমি দ্বারকায় কৃষ্ণের কাছে গিয়ে এই বর প্রার্থনা করো। তিনি দয়ালু। তোমার প্রার্থনা মঞ্জুর করতে পারেন।
—আপনি আমায় দ্বারকায় যাবার জন্য অনুমতি দিন মহর্ষি।
—বেশ, আমি অনুমতি দিলাম। কিন্তু সে বহু যোজন পথ। তোমার রথ নেই, অশ্ব নেই। তার ওপর তুমি অসুস্থ। তুমি যাবে কীভাবে?
অশ্বত্থামা বললেন, আপনি আমায় আশীর্বাদ করুন। আশীর্বাদই আমার প্রেরণা। আপনার আশীর্বাদ আমায় উৎসাহ দেবে। আর নাতুৎসাহাৎ পরৎ বলং উৎসাহই পরম বল। সেই বল বুকে করে আমি ঠিক দ্বারকা চলে যাব।
—তাই যাও, কিন্তু দ্বারকায় এখন রাষ্ট্রবিপ্লব চলছে। দেখো, কৃষ্ণকে তুমি পাও কি না।
অশ্বত্থামা বললেন, দ্বারকায় আমি যৌবনে অনেকদিন কাটিয়েছি। আমার পরিচিত জায়গা। যাত্রীবাহী শকট চালকদের কাছে সাহায্য ভিক্ষা করবো। আমি ঠিক পৌঁছে যাব। আপনি আমায় বিদায় দিন মহর্ষি। আমায় যেন আর ফিরে না আসতে হয়। আমি যেন দ্বারকার সমুদ্র সলিলে এই ব্যর্থ প্রাণ বিসর্জন দিয়ে স্বর্গলাভ করে আমার পিতার সঙ্গে মিলিত হতে পারি।
মহর্ষি ব্যাস ধীরে ধীরে অশ্বত্থামার ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তখন রাত্রি গভীর। অরণ্যের নিস্তব্ধতা আর রাত্রির অন্ধকার দম্যক তপোবনের দিবসের কোলাহলকে গ্রাস করে নিয়েছে।
