দুর্যোধন ধৃত
সঞ্জয় আবার রথে উঠে হস্তিনাপুরের পথে যাত্রা শুরু করেছেন। অরণ্যপথ পার হয়ে জনপদ পড়তেই তিনি দেখতে পেলেন রাস্তায় বৃহৎ জনতা। তাদের সামনে সারি সারি রথ দাঁড়িয়ে আছে পথ রোধ করে। আর জনতা নেমে পড়েছে পথে। তারা চিৎকার করছে ‘মহারাজ যুধিষ্ঠিরের জয়’। আন্দোলিত করছে পাণ্ডবদের পতাকা।
সারথি নেমে গিয়ে দেখতে গেল। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে বলল, সামনের রথগুলি হস্তিনাপুর যাচ্ছে। এতদিন যুদ্ধের জন্য রাজপথে সাধারণ যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। শেষ হওয়ায় তখন তা খুলে দেওয়া হয়েছে। জনতা তল্লাশি চালাচ্ছে কোনো কৌরব সেনা এদের মধ্যে আছে কি না তা দেখার জন্য। বিশেষ করে তাদের কাছে খবর আছে মহারাজ দুর্যোধন ছদ্মবেশে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করেছেন। তাকে ধরতে পারলে প্রচুর পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। তারা খুঁজে খুঁজে দেখছে দুর্যোধন আছে কি না।
সঞ্জয় রথ থেকে নেমে এগোতে লাগলেন। এটিও একটি ঘটনা। ধৃতরাষ্ট্রের কাছে এটি পেশ করতে হবে। আজ তো যুদ্ধের খবর কিছু নেই। তিনি এগোচ্ছেন। প্রতিটি রথ বিচিত্র বস্ত্রের দ্বারা আচ্ছাদিত। ভেতরে পাঁচজন করে আরোহী। তাদের দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু ভেতর থেকে নারীকণ্ঠের কান্নার রোল আসছে। হয়তো যুদ্ধে নিহত বীরদের বিধবা রমণীরা কোনো কোনো রথে আছেন। তাঁরা শোক করছেন। তাঁরা আজ সবাই স্বামীহারা। তাদের সমবেত কান্নার রোল আর জনতার কোলাহল মিলে সমগ্র এক যোজন পথ জুড়ে প্রচণ্ড বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে। ভিড় ঠেলে এগিয়ে যেতেই কয়েকজন যুবক এসে সঞ্জয়কে আটক করল।
—আপনি কে? আপনি কি কুরুক্ষেত্র থেকে আসছেন?
—হ্যাঁ। আমার নাম সঞ্জয়। আমি মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের দ্বারা নিয়োজিত একজন বার্তাবহ। সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন যুবক এসে তার দুটি হাত ধরল। আপনি কৌরবদের লোক। আপনাকে আমরা ছাড়তে পারব না। সমস্ত কৌরব পুরুষকে আমরা বন্দি করব। আমরা পলাতক রাজা দুর্যোধনের সন্ধান চাই।
সঞ্জয় বলল, আমি যোদ্ধা নই। কৌরবদের হয়ে লড়াই করিনি। আমি সমর সংবাদী। যুদ্ধের খবর যথাযথভাবে সংগ্রহ করে তা মহারাজার কাছে হুবহু বিবৃতি করা আমার কাজ। যাকে বলে বার্তাবাহকের কাজ। আমরা দূতের মতোই অবধ্য। তাছাড়া আমি তো গত সতেরো দিন ধরে এই পথ দিয়ে রোজ যাতায়াত করি।
একজন বলল, আপনি কি জানেন না, কৌরবদের পতন হয়েছে। এই মুহূর্তে কৌরবরা আর রাজা নয়।
সঞ্জয় বলল, হ্যাঁ, কুরুক্ষেত্রে কৌরবেরা হেরে গেছেন। কিন্তু এই সব রথে বিধবা পুরনারীরা রয়েছে। তারা সব কিছু হারিয়ে ঘরে ফিরে যাচ্ছে। আপনারা কি প্রতিটি রথ থেকে সমবেত ক্রন্দনধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন না? এই শোকার্ত রমণীদের আটক করেছেন কেন?
একজন বলল, আমরা অনুসন্ধান করে দেখব এই সব রথের মধ্যে কৌরবদের কোনও যোদ্ধা পালিয়ে যাচ্ছে কি না। পালিয়ে গেলে আমরা তাদের ধরে মহারাজ যুধিষ্ঠিরের হাতে তুলে দেব। অবশ্য রমণীদের কাউকে আমরা বিরক্ত করব না।
সঞ্জয় যখন কথা বলছে তখন চার-পাঁচজন লোক একজন যোদ্ধাকে টানতে টানতে নিয়ে এল। তারা বলল, এই রথীকে আমরা একটি রথ থেকে পেলাম। ইনি কৌরবপক্ষের একজন কোনও সেনাপতি হবেন। এঁর পোশাকই সে পরিচয় বহন করছে।
সঞ্জয় এক মুহূর্তে ওই বীর যোদ্ধার দিকে তাকিয়ে বললেন, এ আপনারা করেছেন কী? কাকে আপনারা বন্দি করেছেন? জানেন ইনি কে? ইনি ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র যুযুৎসু। জনতা হইহই করে উঠল। আমরা ঠিক ব্যক্তিকেই ধরেছি। এই তো স্বয়ং কৌরব ভ্রাতাকে জীবন্ত পেয়েছি। ইনি যুদ্ধ অপরাধী। আমরা এঁকেও মহারাজ যুধিষ্ঠিরের কাছে পৌঁছে দেব।
সঞ্জয় বললেন, আপনারা ভুল করছেন। যুযুৎসুই একমাত্র মান্য কৌরব যিনি যুদ্ধের প্রথম দিনই কৌরবপক্ষ ছেড়ে পাণ্ডবদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। তবে ইনি গান্ধারীর পুত্র নন। দুর্যোধনের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা। গত সপ্তদশ দিবস ধরে উনি ওঁর ভ্রাতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন।
একজন বলল, তাহলে উনি পাণ্ডব শিবিরে থেকে বিজয় উৎসবে যোগ না দিয়ে হস্তিনাপুর ফিরে যাচ্ছেন কেন?
সঞ্জয় বলল, রাজকুমার যুযুৎসু, আপনি বলুন কেন হস্তিনাপুর যাচ্ছেন?
যুযুৎসু এতক্ষণ বেশ বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন। উন্মুক্ত জনতার হাতে পড়া তাঁর অভ্যাসে নেই। তিনি সশস্ত্র প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধ করতে শিখেছেন। কিন্তু উন্মত্ত জনতার রোয নিবারণের কোনও কৌশল তাঁর জানা নেই। সঞ্জয়কে দেখে তিনি একটু ভরসা পেলেন। বললেন, যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে আমি মহারাজ যুধিষ্ঠিরের কাছে অনুমতি চাইলাম। বললাম, মহারাজ, রাজা দুর্যোধন নিখোঁজ। আমিই জীবিত ধৃতরাষ্ট্রপুত্র। সমস্ত পুত্রের সংহারে মাতা গান্ধারী ও পিতা ধৃতরাষ্ট্র কী দারুণ শোকমগ্ন হয়ে পড়েছেন তা আমি বুঝতে পেরেছি। আমি ন্যায় ও ধর্মের সমর্থনে যুদ্ধের প্রথম দিনই যুধিষ্ঠিরের আহ্বানের সাড়া দিয়ে পাণ্ডবপক্ষে যোগ দিই। সেদিন আমার বিরুদ্ধে কৌরব সৈন্য ও আমার রথী-মহারথীরা সবাই আমায় ধিক্কার দিয়েছিলেন। আমি আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম যে ভ্রাতা বিকৰ্ণ যে দ্যূতসভায় দ্রৌপদীর অবমাননা দেখে একমাত্র প্রতিবাদের সাহস দেখিয়েছিল সেও কৌরবপক্ষ ত্যাগ করতে সাহস করেনি। দ্যূতসভায় আমি ছিলাম না। থাকলে আমি প্রতিবাদ করতাম। একথা বলতে আমার লজ্জা নেই যে আমার জ্যেষ্ঠভ্রাতা দুর্যোধন খুবই দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি। রাজা হিসাবে তিনি যে অসফল তা বলব না। তিনি অনেক উন্নয়ন করেছেন। তাঁর অনেক দান আছে। আইনশৃঙ্খলা ও তথা সাম দান দণ্ড ভেদ-প্রশাসনের এই চারটি স্তম্ভ তিনি ভালো বোঝেন। কিন্তু ব্যক্তি হিসাবে নীতি-জ্ঞান বর্জিত, ক্রোধী, দুর্মুখ ও অতিমাত্রায় উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তিনি কপট দ্যূতক্রীড়ায় পাণ্ডবদের রাজ্য কেড়ে নিয়েছেন। তাঁদের ন্যূনতম দাবি পাঁচটি গ্রামও দিতে চাননি। সুতরাং এই যুদ্ধ ধর্মযুদ্ধ মনে করে আমি ধর্মের পক্ষে ছিলাম। যুদ্ধ শেষে আমি যুধিষ্ঠিারের কাছে অনুমতি চাইলাম, এইবার আমার বিদায় দিন। আমি স্বগৃহে ফিরে যাই। আমাকে দেখে অন্তত এক পুত্র জীবিত আছে মনে করে মাতা সান্ত্বনা পাবেন।
তখন যুধিষ্ঠির বললেন, তাহলে এক কাজ করুন। আমি কৌরব পুরনারীদের মুক্তি দিচ্ছি। শুধু তাদের দাসীরা আমাদের নারীদের সেবা করার জন্য থাকবে। তুমি এদের সঙ্গে করে হস্তিনাপুর পৌঁছে দাও। সেই মতো চারশো অশ্বযান প্রস্তুত করা হল। আমি আমার রথে চেপে যাত্রা শুরু করলাম। সারা পথ নারীরা ক্রন্দন করতে করতে এসেছে। এছাড়া তাদের অলংকার আভরণ সব পাণ্ডবরা রেখে দিয়েছে। এতেও ওরা শোকার্ত। ভোরে ওরা যাত্রা শুরু করে। কিন্তু এই জনপদের কাছে এসে আমরা আটকে আছি। সূর্য এখন মধ্যগগনে। এতক্ষণ আমরা পৌঁছে যেতাম। এই সব নারীদের মধ্যে অনেকের শিশুরাও আছে। তারা ক্ষুধার্ত। অথচ আপনারা শোকার্ত নারীদের আটক করে রেখেছেন। এটি মানবতা বিরোধী কাজ।
সঞ্জয় বললেন, আপনারা যে রাজা বদলে খুশি হয়েছেন ও ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরকে নতুন রাজা হিসাবে মেনে নিয়েছেন এতে আমি খুশি। তবে যুদ্ধ শুরুর সময় আমি কিন্তু নগরবাসীদের সবাইকে দুর্যোধনকে সহায়তা করতে দেখেছিলাম। যুদ্ধের যাবতীয় সরবরাহ তাঁরা সংগ্রহ করে দিয়েছেন। পাণ্ডবদের এই রসদ সংগ্রহ করতে বিশেষ বেগ পেতে হয়েছে। এখন আপনাদের কাছে অনুরোধ আমাদের যেতে দিন। অবরোধ তুলে নিন। বুঝতেই পারছেন, এই রাষ্ট্রবিপ্লবে দেশে আরক্ষা ব্যবস্থা বলতে কিছুই নেই। সন্ধ্যার মধ্যে না পৌঁছতে পারলে এই পুরনারীরা পথে নানা বিপদে পড়তে পারেন। এদের সুরক্ষা দেবার মতো সঙ্গে কোনো সশস্ত্র প্রহরার ব্যবস্থা নেই। শুধু আমি ও আমার দেহরক্ষীরা আছি। তারা কয়েকজন মাত্র।
এমন সময় অশ্বপৃষ্ঠে এক ব্যক্তি এসে খবর দিল, রাজা দুর্যোধন ধরা পড়েছে।
—কোথায়? সবাই প্রশ্ন করল।
—বেশি দূরে নয়। মাত্র এক ক্রোশ দূরে দ্বৈপায়ন হ্রদে লুকিয়ে ছিল দুর্যোধন। পাণ্ডবরা গিয়ে তাকে বন্দি করেছে। দলে দলে গ্রামবাসী দ্বৈপায়নে জড়ো হচ্ছে। তোমরা সেখানেই যাও।
অশ্বারোহী লোকটি গ্রামের একজন নেতৃস্থানীয় কেউ বলে মনে হল। সে বলল, তোমরা এত রথ আটক করেছ কী ব্যাপার?
তারা বলল, আমরা ভেবেছিলাম এই সব রথের মধ্যে দুর্যোধন লুকিয়ে পালাচ্ছে। এই তোমরা অবরোধ তুলে নাও। সবাই দ্বৈপায়নে চলো।
মুহূর্তের মধ্যে পথ ফাঁকা হয়ে গেল। যুযুৎসু সঞ্জয়কে আলিঙ্গন করলেন। বললেন, চলুন, আমরা একই রথে একসঙ্গে কথা বলতে বলতে যাই। আপনি তো এতদিন ধরে যুদ্ধের সবটুকু দেখলেন। আমার সঙ্গে আপনার অভিজ্ঞতা বিনিময় করুন।
সঞ্জয় বললেন, বিদায় রাজকুমার। আমি সংবাদ প্রতিবেদক। আমার দায়িত্ব একটু বেশি। আপনারা নির্বিঘ্নে চলে যান। আর কোনো বিপত্তি হবে না। আমি চললাম।
যুযুৎসু বললেন, আপনি কোথায় যাবেন? আপনি হস্তিনানগর যাবেন না?
সঞ্জয় বললেন, না। দুর্যোধন বন্দি হয়েছেন। এটি বিরাট সংবাদ। আমাকে মহারাজের কাছে এর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিতে হবে। আপনার সঙ্গে আগামিকাল হস্তিনানগর প্রাসাদে দেখা হবে।
যুযুৎসু বললেন, আপনাকে আর একটা সংবাদ দিই। আগামিকাল বাসুদেব স্বয়ং হস্তিনানগর আসছেন। তিনি আমার বাবা-মা উভয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
সঞ্জয় বললেন, আপনি ভালো সংবাদ দিলেন। আমি আজ রাতেই মহারাজকে এই খবরটা দেব। আচ্ছা বিদায়।
সঞ্জয় সারথিকে তার রথের গতি আবার দ্বৈপায়নের দিকে ঘোরাতে বললেন।
এইবার দ্বৈপায়নে যাওয়ার পথে সঞ্জয় দেখলেন, মুহূর্তের মধ্যে সংবাদটি কীভাবে চালু হয়ে গেছে। এখানে প্রতি জনপদেই বৃত্তিধারী বার্তাবাহরা আছেন। তাঁদের কাজ বিভিন্ন এলাকার যাবতীয় ঘটনাবলি কানে আসামাত্র তা গিয়ে প্রত্যক্ষ করে আসা এবং অতি দ্রুত রাজপুরুষদের সে সম্পর্কে অবহিত করা। এরা খুবই সজাগ ও সচেতন।
সঞ্জয় দেখলেন দ্বৈপায়নের চারপাশে জনতার ভিড় জমে গেছে। সারি সারি রথ দাঁড়িয়ে। সারথি অশ্বদের জলপান করাচ্ছে। কুরুক্ষেত্রে বড় জলাভাব। তারা অশ্বদের জলপানের সুযোগ পেয়েছে।
সঞ্জয় রথ রাখার জায়গা পেলেন না। তাঁর রথ অনেক দূরে রেখে তাঁকে অনেকটা হেঁটে দ্বৈপায়ন হ্রদের তীরে পৌঁছতে হয়েছে। তাড়াতাড়ি ছুটলেন যুধিষ্ঠিরের কাছে। যুধিষ্ঠির তখন হ্রদের পশ্চিম তীরে দাঁড়িয়ে দুর্যোধনকে আহ্বান জানাচ্ছেন জল থেকে উঠে আসার জন্য।
