সেনাপতি অশ্বত্থামা
ওঁরা যখন দ্বৈপায়ন পৌঁছলেন তখন ত্রয়োদশীর চাঁদের হালকা আলোয় দ্বৈপায়নের নিস্তরঙ্গ জলকে মনে হচ্ছে বহুদূর বিস্তৃত একটি সাদা চাদর কে পেতে রেখেছে। পাখিরা সব কুলায়। ঝিঁঝি পোকার ডাক ভেসে আসছে অনেক দূর থেকে ভেসে আসা সমুদ্র গর্জনের মতো।
তিন অশ্বারোহী অশ্ব থেকে নেমে যখন দ্বৈপায়ন তীরে পৌঁছলেন তখন চারজন বার্তাবহ* মুমূর্ষু দুর্যোধনকে ঘিরে রয়েছে। তাদের অশ্বগুলি অদূরে বাঁধা। ওদের এগিয়ে আসতে দেখে বার্তাবহরা উঠে দাঁড়াল। বার্তাবহরা ওদের দিকে এগিয়ে এলো। তাদের পরিচয় দিয়ে বলল, আমরা বার্তাবহ। অশ্বত্থামার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি কি অশ্বত্থামা?
[*এই পেশাদার বার্তবহদের কথা মহাভারতে উল্লেখ করা আছে। তাঁর প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারা সংবাদ সংগ্রহের জন্য নিযুক্ত হতেন।]
—হ্যাঁ। আমাকে কীভাবে চিনলেন?
—আপনার উচ্চতা দেখে। আমরা শুনেছি অশ্বত্থামা দ্রোণাচার্যের পুত্র। তিনি ও কৃপাচার্য ও আর এক কৌরব সেনাপতি জীবিত আছেন। আর দ্রোণাচার্যপুত্র দীর্ঘতম ব্যক্তি।
অশ্বত্থামা সে কথার উত্তর না দিয়ে বললেন, দুর্যোধন এখন কেমন আছেন?
—ওই তো অদূরে ধূলিশয্যায় শুয়ে মৃত্যুর অপেক্ষা করছেন। আমাদের কাছে তাঁর মৃত্যুকালীন বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, মানুষের কাছে আমার এই কথা পৌঁছে দিন, অধর্ম যুদ্ধে ওরা আমায় হত্যা করেছে।
—আর কী বলেছেন? কৃপাচার্য প্রশ্ন করলেন।
—আরও বলেছেন, তোমরা সবাইকে গিয়ে বলো কৃষ্ণই কুরুবংশকে ধ্বংস করেছে, কৃষ্ণের নির্দেশে অন্যায় যুদ্ধে ভীম আমার উরুভঙ্গ করেছে। কৃষ্ণের নির্দেশে যুধিষ্ঠির মিথ্যা কথা বলে দ্রোণকে হত্যা করেছে। কর্ণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমি নির্দোষ। কৃষ্ণের ষড়যন্ত্রের। কথা সবাইকে জ্ঞাত করুণা।
অশ্বত্থামা বললেন, এখন কী উনি কথা বলতে পারছেন?
—জানি না। আপনারা গিয়ে দেখুন। আর কিছুক্ষণের মধ্যে ওর মৃত্যু ঘনিয়ে আসবে।
আমরা আর বেশিক্ষণ থাকতে পারছি না। উনি অচেতন ছিলেন বলে এতক্ষণ আমরা ওঁর মুখ থেকে কিছু শুনব বলে অপেক্ষা করছিলাম। এখন আমরা বিদায় নিচ্ছি।
তারপর একজন বার্তাবহ জিজ্ঞাসা করল, আপনারা তো পলাতক। আপনারা কী এরপর আত্মসমর্পণ করবেন?
অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য ও কৃতবর্মা তিনজনই সমস্বরে বললেন, না, কখনওই নয়। -তাহলে কী করবেন?
অশ্বত্থামা দৃঢ় স্বরে বললেন, আমি চিরঞ্জীবী। আমি আমার পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেব। ধর্মপুত্র অধর্মের আশ্রয় নিয়ে আমার পিতাকে হত্যা করেছেন। দুর্যোধন যা বলেছেন ঠিক বলেছেন।
বার্তাবহদের একজন বলল, কুরুক্ষেত্রর যুদ্ধকে পাণ্ডবেরা ধর্মযুদ্ধ বলেছেন। আপনার মতে এটি ‘ধর্মযুদ্ধ’?
অশ্বত্থামা বললেন, একবারেই নয়। আমার পিতা দ্রোণকে সম্পূর্ণ প্রতারণা করে হত্যা করা হয়েছে। ভীষ্মকে, কর্ণকেও অসাধু উপায়ে নিধন করা হয়েছে। যুদ্ধের কোনো নিয়ম মানা হয়নি।
—আপনি এখন কী করবেন?
—আমি এর প্রতিশোধ নেব। আর আমি কিছু বলতে চাই না। আমাকে দুর্যোধনের কাছে যেতে দিন।
বার্তাবহরা আর কথা বাড়ালেন না। তাঁরা তাঁদের নিজ নিজ অশ্বের সন্ধানে চলে গেলেন।
.
অশ্বত্থামা শেষ সেনাপতি
বার্তাবহরা চলে গেলে ওরা তিনজন দুর্যোধনের কাছে গেলেন। পূর্ণ চাঁদ নয়, ত্রয়োদশীর হালকা জ্যোৎস্না এসে পড়েছে দ্বৈপায়ন তীরে। আকাশে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে সপ্তর্ষি ধুলার ওপর পড়ে রয়েছেন দুর্যোধন। তাঁর দেহ রক্তাক্ত। পোশাক ছিন্নভিন্ন। ভীমের গদাঘাতে রক্তাক্ত মুখ। তিনি আকাশের দিকে মুখ তুলে চোখ বুজে শুয়ে আছেন। তাঁর আশেপাশে চাপ চাপ রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে। অশ্বত্থামা গিয়ে দুর্যোধনের শিয়রে বসলেন, কৃপাচার্য ও কৃতবর্মা দাঁড়িয়ে। অশ্বত্থামা দুর্যোধনের মুখটি নিজের কোলে তুলে নিলেন দুর্যোধন অস্ফুট কণ্ঠে বললেন, কে?
অশ্বত্থামা বললেন, মহারাজ আমি অশ্বত্থামা। আপনার যে এই অবস্থা হবে তা কখনও ভাবিনি। আমি কিন্তু সকালেই আপনাকে বলেছিলাম আপনি এই স্থান ত্যাগ করুন। আপনি শোনেননি। আজ সন্ধ্যায় খবর পেয়ে আমরা ছুটে আসছি। কিন্তু এ কী হল মহারাজ। আমরা যে আপনাকে নিয়ে নতুন করে রাজ্য গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু এ কী দেখছি। আপনি শুষ্ক সাগরের মতো তুষারে ঢাকা সূর্য-চন্দ্রের মতো বিপাটিত মহীরুহের মতো ধূলিশয্যায় শুয়ে রয়েছেন। আপনি সসাগরা ধরিত্রীর অধীশ্বর হয়েও পথকুকুরের মতো ধুলায় লুটোপুটি খাচ্ছেন। আমি ও মাতুল দুজনেই আপনাকে কুরুক্ষেত্র প্রান্তরে বলেছিলাম আমাদের জিতবার আশা ক্ষীণ। ভীষ্ম, দ্রোণ ও কর্ণের মতো শাল্মলী বৃক্ষেরা নিপতিত হয়েছে। এখন আপাতত আপনি যুদ্ধবিরতি করুন। তারপর কিছুদিন পরে আবার সৈন্য সংগ্রহ করে আমরা শত্রুকে আঘাত হানব। আজ সকালেও আপনাকে বললাম আমাদের সঙ্গে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে। আপনি শুনলেন না। পাণ্ডবেরা ঠিক আপনাকে খুঁজে বার করল। মানুষ তার কর্মফল ভোগ করবেই। প্রবল দুর্ভাগ্য মানুষকে ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্রের মতো তাড়না করে বেড়ায়।
দুর্যোধন ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, অশ্বত্থামা, ভীম অধর্ম যুদ্ধে আমাকে বিনাশ করেছে। আমিও দলভ্রষ্ট পথিকের মতো মহাবীর দ্রোণ, কর্ণ, শল্য, বৃষসেন, শকুনি, জগদত্ত, সোমদত্ত, জয়দ্রথ, লক্ষ্মণ, দুঃশাসনতনয় এবং দুঃশাসন ও আমার ভ্রাতাবর্গ ও অন্যান্য বীরদের অনুগমন করছি। আমার বোন দুঃশলা, ভ্রাতৃগণের ও তার স্বামীর নিধন বৃত্তান্ত শুনে কীভাবে জীবনধারণ করবেন জানি না, আমি এখন আমার কলেবর ত্যাগ করে শাশ্বত সেই চিরায়ত অমরলোকে যাত্রা করব।
কৃপ বললেন, এটা খুবই দুঃখের কথা যে ভারত সম্রাট দুর্যোধন এই জনহীন হ্রদতীরে একাকী নিঃসঙ্গ অবস্থায় প্রাণত্যাগ করছেন। আমরা তো কাছাকাছি কোনো পাণ্ডব সৈনিককে দেখতে পাচ্ছি না। তারা সবাই আপনাকে মৃত ভেবে এই জনহীন অরণ্যে পরিত্যাগ করে চলে গেছে।
কৃতবর্মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, মহারাজ তুমি সর্বলোকের অধীশ্বর হয়েও আজ ধূলি ধূসরিত গাত্রে ভূমিশয্যায় পড়ে আছো। কালের কী আশ্চর্য মহিমা। তোমার যে শ্বেতচ্ছত্র, নির্মূল ব্যজন ও একাদশ অক্ষৌহিনী সৈন্য আজ কোথায়? কার্যকারণের গতি নিতান্ত দুৰ্জ্জেয়। মনে হচ্ছে লক্ষ্মী চিরদিন কারও কাছে স্থিরভাবে থাকেন না।
দুর্যোধন বললেন, আমি কোনো সমরে পরাঙ্মুখ হইনি। পাপাত্মারা ছল করে আমাকে নিপতিত করেছে। আজ আজি তোমাদের তিনজনকে দেখে খুব প্রীত হলাম যে এই লোকক্ষয়কারী ভীষণ সংগ্রাম থেকে তোমরা তিনজন অন্তত বেঁচে রয়েছ। তোমরা আমার নিধনে কিছুমাত্র অনুতাপ কোরো না। যদি বেদবাক্য যথার্থ হয় তাহলে নিশ্চয়ই আমি স্বর্গলোকে যাব। আর অমিততেজ বাসুদেবের প্রতাপ তো তোমরা বিলক্ষণ অবগত আছো। তিনি আমাকে ক্ষত্রিয়ধর্ম থেকে ভ্রষ্ট করেননি। আমার জন্য শোকের প্রয়োজন নেই। তোমরা তোমাদের আপন আপন পরাক্রমের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছ। কিন্তু শত্রুদের হারাতে পারলে না। কি করবে, দৈব অতিক্রম করা কারও সাধ্য নয়।
এই কথা বলে দুর্যোধন কিছুক্ষণের জন্য চুপ করে রইলেন। দ্বৈপায়ন হ্রদ থেকে উড়ে আসা ঠান্ডা দমকা বাতাস এসে অশ্বত্থামার মুখে-চোখে ঝাপটা দিয়ে গেল।
দুর্যোধন আবার বলে চললেন, শত্রুর কাছে পদানত নয়। শত্রুকে ধ্বংস করো। ইন্দ্র যেমন বৃত্রাসুরকে ধ্বংস করেছিলেন, ইন্দ্রই শক্তি। ইন্দ্ৰই দেবতা। ইন্দ্ৰ তুমি আমাকে সাহস দাও।
ভগ্ন উরু মুমূর্ষু দুর্যোধন ক্ষীণ কণ্ঠে বলে চলেছেন, আমার মৃত্যুতে তোমরা কোনো দুঃখ কোরো না। আমার কোনো দুঃখ নেই, অনুতাপ নেই, অনুশোচনা নেই। আমি রাজার কর্তব্য পালন করেছি। ক্ষত্রিয়ের ধর্ম পালন করেছি। আমি নিশ্চয়ই অক্ষয় স্বর্গবাস করব। তোমরা তোমাদের কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করেছ। জয়লাভের জন্য যা যা প্রয়োজন সব করেছ। তবু তোমরা জয়লাভ করতে পারলে না। কি করবে দৈব অতিক্রম করা কারও সাধ্য নয়।
একটু থেমে নিশ্বাস নিয়ে দুর্যোধন বললেন, একটু জল দিতে পারো?
অশ্বত্থামা সঙ্গে সঙ্গে হ্রদে ছুটলেন। চারিদিকে টলটল করছে জল। কিন্তু কীভাবে আনবেন, সঙ্গে কোনো পাত্র নেই। তিনি দ্রুত তার উষ্ণীষ খুলে জলে চুবিয়ে সেই জল নিয়ে নিঙড়ে ধরলেন দুর্যোধনের মুখে। কিছু জল মুখে গেল, বেশিরভাগই গড়িয়ে পড়ল।
দুর্যোধন এবার বললেন, কালক্রমে সবারই বিনাশ হয়, আমারও হল। এটাই মর্ত্যধর্ম—জন্মালেই মরতে হবে। কিন্তু মৃত্যুর আগে একটা কথা আমি বলে যাচ্ছি, আমি কিন্তু কোনো বিপদেই যুদ্ধ পরাঙ্মুখ হইনি। যুধিষ্ঠির আমায় যুদ্ধে আহ্বান করার সঙ্গে সঙ্গে আমি যুদ্ধে রাজি হয়েছি। আমি স্বধর্মে নিধন হয়েছি, এটাই আমার গর্ব। অশ্বত্থামা, আচার্যদেব, আপনারা দুজনই চিরঞ্জীবী। আপনারা ঈশ্বরের আশীর্বাদপুষ্ট। আপনাদের মৃত্যু নেই। কিন্তু মৃত্যুর আগে আমার এই উপলব্ধির কথা বলে যাচ্ছি, জীবনের মতো মৃত্যুরও দরকার আছে।
অশ্বত্থামা বললেন, আমি একথা মানতে পারছি না মহারাজ। জীবনের দরকার আরও বড়। কারণ জীবন থাকলে তবেই না বারবার চেষ্টা করতে পারে মানুষ। পরাজয়ের গ্লানিকে মুছে ফেলে আবার জয়ী হতে পারে। পরাজয় শেষ কথা নয়—বারবার চেষ্টা করা, দুর্ভাগ্যকে বারবার মাড়িয়ে জীবনকে গৌরবান্বিত করে তোলাই বড় কথা।
দুর্যোধন শুধু বারবার বলতে লাগলেন, নিয়তিই একমাত্র শেষ কথা বলতে পারে গুরুপুত্র। আর কেউ নয়। মানুষ শুধু তার ধর্ম পালন করে যেতে পারে মাত্র।
কৃপাচার্য বললেন, মহারাজ, সময়ে সতর্ক থাকাও ধর্ম। আপনি আপনার অভিপ্রায় মতো সব কাজ করে গেছেন। আপনার পছন্দের লোকদেরই মন্ত্রণা গ্রহণ করেছেন। শুধু যুদ্ধ করাই ক্ষত্রিয়দের ধর্ম নয়, এর ওপরে জীবনধর্ম আছে। গুরুজন এবং সুধীজনদের উপদেশ গ্রহণও জীবনধর্মের মধ্যে পড়ে। জীবনধর্ম সর্বদা বলে জীবনকে কতগুলি সুচারু নির্দেশের বাঁধনে বাঁধো। পথ চলতে গেলে আপনাকে পথ চলার নিয়ম-নীতি মেনে চলতে হবে। আপনি নিজেই আপনার নীতি লঙ্ঘন করেছেন। কোনও একক ব্যক্তি সম্পূর্ণ নয় মহারাজ। সে সমগ্রের অংশ। ভাগ্য তার হাতে রাজদণ্ড তুলে দিয়েছে বলেই সে সেই দণ্ড খুশিমতো ব্যবহার করতে পারে না। একমাত্র উন্নয়ন প্রজাপালন ও ব্রাহ্মণ ও অর্থীদের অনুদান দেওয়াই উত্তম শাসন নয়। রাজাকেও আত্মশাসন করতে হয়। রাজধর্ম মানে রাজার আত্মধর্ম পালন। আমাকে মার্জনা করবেন মহারাজ। পরাজয়ের গ্লানি আমার বুকে বাজছে না। কারণ যুদ্ধে এক পক্ষের পরাজয় হবেই। কিন্তু আপনার এই করুণ পরিণতি দেখে আমার মনে হচ্ছে চিরঞ্জিবী হয়ে বেঁচে থাকা আমার অভিশাপ। সেই অভিশাপ ভোগ করার জন্যই আমি বেঁচে রইলাম। আমাকে আজ এই করুণতম দৃশ্য দেখতে হল।
অশ্বত্থামা তখন যেন অন্য গ্রহে বিচরণ করছেন। মাতুল কৃপাচার্যের কিছু কথা তার কানে গেল কি না তাও তিনি বুঝে উঠতে পারলেন না। মাতুলকে থামিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, আঃ মাতুল। এখন কি এসব নীতিকথা বলার সময়? এখন শুধু প্রতিশোধের সময়। প্রতিজ্ঞার সময়। তারপর দুর্যোধনের মুখের সামনে মুখ নিয়ে গিয়ে দু’হাতে তাঁর মস্তক স্পর্শ করে অশ্বত্থামা বললেন, মহারাজ আপনাকে স্পর্শ করে আমি দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা শপথ নিচ্ছি, যেভাবেই হোক আমি পাণ্ডব ও পাঞ্চালদের বংশ নির্মূল করবই। আমি ‘ইষ্টাপুত্ত’* দান ধর্ম ও সুকৃত্যের নামে শপথ করছি। আপনি আমাকে শুধু অনুমোদন করুন।
[* ইষ্টাপুত্ত অর্থ যজ্ঞ ও পথ-ঘাট নির্মাণের দ্বারা পুণ্য অর্জন। রাজাদের পুণ্য কাজ ছিল যজ্ঞ আর উন্নয়ন বলতে মুখ্যত বোঝাত পথ, ঘাট ও জলাশয় নিৰ্মাণ।]
অশ্বত্থামা বেশ উচ্চৈস্বরে তাঁর কথাগুলি বলছিলেন। নিস্তব্ধ রাত্রির এলোমেলো হাওয়ায় তাঁর এই কঠিন কঠোর সঙ্কল্পের শব্দগুলি যেন আকাশের তারায় তারায় ছড়িয়ে পড়ল। কৃপ ও কৃতবর্মা বাক্যহীন। দুর্যোধনের যন্ত্রণাকাতর ঠোঁটের কোনায় মৃদু হাসির রেখা শিল্পীর আঁচড়ের মতো ফুটে উঠল। অকস্মাৎ ক্ষত-বিক্ষত বীভৎস সে মুখ যেন স্বর্গীয় আভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল। দুর্যোধন বললেন, আচার্য একটি জলপূর্ণ কলস নিয়ে আসতে পারেন?
কৃপাচার্য সেই প্রায়ান্ধকার তীর ধরে খুঁজতে লাগলেন যদি কোনো পরিত্যক্ত কলস পাওয়া যায়। খুঁজতে খুঁজতে পাওয়া গেল। সসৈন্য পাণ্ডবেরা ভীম-দুর্যোধনের যুদ্ধের সময় যখন দর্শকেরা এখানে বসেছিলেন তখন তাদের পানের জন্য কয়েকটি মাটির জলকলস আনা হয়েছিল। সেগুলি মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। তার একটি কৃপ তুলে নিয়ে হ্রদ থেকে জল ভরে নিয়ে এলেন।
দুর্যোধন তাঁকে বললেন, হেদ্বিজ শ্রেষ্ঠ যদি আপনি আমার হিতসাধন করতে চান তাহলে অবিলম্বে গুরুপুত্রকে আমার সেনাপতি পদে অভিষিক্ত করুন। বিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলেন, রাজ অনুজ্ঞা থাকলে ব্রাহ্মণদের পক্ষে যুদ্ধ করা নীতিবিগর্হিত নয়। আমি একদা অশ্বত্থামাকে সেনাপতি পদে বরণ করেছিলাম। কিন্তু তখন তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে শল্যকে এই পদ দিতে বলেন। আজ আর কোনো বাধা নেই। আজ এই মুহূর্তে আমি অশ্বত্থামাকে সেনাপতি পদে বরণ করলাম।
মন্ত্রচালিত মানুষের মতো অশ্বত্থামা দুর্যোধনের রুধিরলিপ্ত মুখটি বারবার চুম্বন করে চকিতে দাঁড়িয়ে তার কোষবদ্ধ তরবারি শূন্যে তুলে সিংহনাদ করে উঠলেন, জয় মহারাজ দুর্যোধনের জয়’।
সঙ্গে সঙ্গে কৃপ ও কৃতবর্মা দাঁড়িয়ে তাঁদের খঙ্গ উন্মোচন করে বললেন, ‘জয় মহারাজ দুর্যোধনের জয়’। তারপর অশ্বত্থামার দিকে তাকিয়ে সামরিক অভিবাদন করলেন। পরস্পরের তরবারি স্পর্শ করলেন।
নির্জন দ্বৈপায়ন তীরে কুরুক্ষেত্রর প্রান্তর থেকে দূরে নির্জন হ্রদের তীরে এক অপূর্ব রুদ্ধশ্বাস জীবননাট্যের প্রথমাঙ্ক যেন শুরু হয়ে গেল। বিনা উপচারে সেই রাত্রিতে কৌরবদের শেষ সেনাপতি অশ্বত্থামার অভিষেক হল। উপবীত বার করে কৃপাচার্য স্বস্তিবাচন করে যজুর্বেদের সপ্তদশ অধ্যায় থেকে পঞ্চাশতম সুক্তটি আবৃত্তি করলেন। তার আগে বললেন, আমি দুঃখিত কুরু সেনাপতির জন্য হোমাগ্নি প্রজ্জ্বলিত করতে পারলাম না। এখানে সমিধ নেই। হবি নেই, যজ্ঞের উপচার নেই। কিন্তু আকাশের এই চন্দ্র-নক্ষত্র, ঊর্ধ্ব আকাশের এই জ্যোতির্লোক দ্বৈপায়নের স্বচ্ছ নীরবিন্দু আর এক কুরুবংশের শেষ রাজন মহান রাজাধিরাজ দুর্যোধন তোমার ললাটে ধূলিতিলক পরিয়ে দিন। যদি মুছে যায় যাক, পৃথিবীর সব তিলক চিহ্নই তো এক সময় মুছে যায়। কিন্তু হৃদয়ের তিলক মোছে না। কৃতবর্মা দ্রুত তাঁর তরবারি বার করে আঙুল কেটে রক্ততিলক পরিয়ে দিয়ে অশ্বত্থামাকে বললেন, হে সেনাপতি, ধূলিতিলক নয়, আমার রক্ততিলকে তোমার অভিষেক হোক। এই বলে অশ্বত্থামার কপালে দীর্ঘ রক্ততিলক এঁকে দিলেন। কৃপাচার্য যজুর্বেদের মন্ত্র আবৃত্তি করে চলেছেন–
‘প্রেতা জয়তা ইন্দ্রো বঃ শর্মযচ্ছতু
উগ্রা বঃ সন্তুঃ বাহবো হনাধৃয্যা যথাহ সথ’
হে আমাদের যোদ্ধাগণ তোমরা শত্রু সৈন্যদের দিকে এগিয়ে যাও, বিজয় লাভ করো। ইন্দ্র তোমাকে জয়রূপ সুখ দিক। অন্যের অধৃষা (অপরাজিত) হয়ে তোমাদের বাহু উগ্র হোক। মুণ্ডিত মস্তক চঞ্চল বালকগণের মতো শত্রুর নিক্ষিপ্ত বাণগুলি যে যুদ্ধে পতিত হচ্ছে সেখানে ইন্দ্র বৃহস্পতি অদিতি সর্বদা আমাদের সুখ দিক।
‘স্যোনো পৃথিবি, নো ভবনে
ক্ষরা নিবেশিনী। যচ্ছা নঃ শৰ্ম
সপ্রথাঃ অপ নঃ শোশুচদঘম্।’
হে পৃথিবী তুমি আমাদের সুখ স্বরূপ হও, তুমি জনগণের প্রতিষ্ঠাতা, সকল দিকে বিস্তৃত। তুমি আমাদের আশ্রয় দাও।*
[* যজুর্বেদ, কাণ্ড ২২, মন্ত্ৰ ২৮।]
এতক্ষণ নির্বাক নিস্পন্দের মতো মুমূর্ষু দুর্যোধনের ডানহাতটি ধরে বসেছিলেন অশ্বত্থামা। এই দমকা বাতাস যেন মহাকাশ থেকে কেউ তাঁকে বার্তা দিয়ে গেল, ওঠো, জাগো। অশ্বত্থামা তোমার জীবনের চরম সন্ধিক্ষণ এসে গেছে। অশ্বত্থামার কানে ভেসে এলো সেই বেদমন্ত্র—পিতা যা তাকে শৈশব থেকে শিখিয়ে এসেছেন। অথর্ববেদের বিংশতম কাণ্ডে সর্ব শক্তিমান ইন্দ্রের কাছে শত্রু বিনাশের জন্য প্রার্থনা-
মা নো নিদে চ রক্তবেহর্ষো রন্ধীর রাবুণে
ত্বে অপি ক্রতুমম।।
ত্বং বর্মসি সপ্রথঃ পুরোয়োধশ্চ বৃত্র হন
ত্বয় প্রতি রুধে যুজা।*
[* হে প্রভু ইন্দ্র, যারা আমাদের নিন্দাকারী কঠোরভাষী শত্রু, আমাকে তার অধীন করে দিও না। আমাদের নিন্দক শত্রুদের হাতে আমাকে যেন বশ্যতা স্বীকার না করতে হয়। হে বৃত্রসংহারকারী ইন্দ্র এই মহান সংগ্রামে তুমি আমার বর্ম স্বরূপ। তোমার সাহায্যে আমি শত্রুদের বিনাশ করবই করব।]
দুর্যোধন পরম আনন্দে ধূলিশয্যায় শায়িত। তার চক্ষু মুদে এসেছে। অশ্বত্থামা তাঁর দেহ স্পর্শ করে আবার বললেন, মহারাজ, আমি আপনার শেষ সেনাপতি প্রতিজ্ঞা করছি আপনার এই সহায় সম্বলহীন সেনাপতি মহাভারতে ইতিহাস সৃষ্টি করবে। তারপর হঠাৎ তাঁর মনে হল দুর্যোধন নিথর নিস্পন্দ হয়ে গেছেন। নাকের নীচে হাত দিয়ে দেখলেন, না দুর্যোধন জীবিত। নিশ্বাস পড়ছে। কিন্তু খুব ধীরে।
দুর্যোধন যে জীবিত আছেন তাতেই তিনি উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। দুর্যোধনের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে অশ্বত্থামা বললেন, আপনি আর একটা দিন আমার জন্য বেঁচে থাকুন মহারাজ। আমি শত্রুদের বিনাশ করে আপনার কাছে বিজয় সংবাদ এনে দেব।
দুর্যোধন বিড়বিড় করে কী বললেন, বোঝা গেল না। শুধু তাঁর ঠোঁটদুটি নড়ে উঠল। গলা দিয়ে ক্ষীণ অস্ফুট আওয়াজ বেরুল। তাঁর দুর্বল ডানহাতটি অশ্বত্থামার মাথায় ঠেকালেন। অশ্বত্থামা তৎক্ষণাৎ কৃপ ও কৃতবর্মাকে বললেন, আর সময় নষ্ট করে লাভ নেই। চলুন, আমরা নিষ্ক্রান্ত হয়ে যাই।
—কোথায় যাবে এত রাতে? কৃপ বললেন।
অশ্বত্থামা তখনও কিছু ঠিক করেননি। তাঁর মাথায় ঘুরছে আজ রাতের মধ্যে দুঃসাহসিক কিছু করে তিনি দুর্যোধনকে দেখাবেন। তিনি যোগ্য সেনাপতি হিসাবে তাঁকে বিজয় উপঢৌকন দিতে পেরেছেন।
অশ্বত্থামার মনের ভেতর তীব্র অভিমান জমা ছিল। তিনি ভেবেছিলেন কর্ণ নিহত হবার পর দুর্যোধন তাঁকেই সেনাপতি করবেন। বিনয়বশত তিনি দুর্যোধনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে শল্যের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু দুর্যোধন তা শুনবেন না। অশ্বত্থামা তাঁর বাল্যবন্ধু। তদুপরি গুরুপুত্র। সর্বোপরি অশ্বত্থামার মতো যোগ্য বীর আর কে আছে। কিন্তু দুর্যোধন তার সেনাপতি পদ প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে সঙ্গে আর দ্বিরুক্তি না করে শল্যকে সেনপতি পদে বরণ করে নিলেন।
কিন্তু তাঁর কপালের লিখন খণ্ডাবে কে? যুদ্ধ শেষ হয়ে তিন জীবিত সেনানীর মধ্যে তাঁকে সেনাপতি বরণ করেছেন। তাঁর মাতুল অস্ত্রগুরু মহাধনুর্ধর কৃপাচার্যকে না করে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকেই সেনাপতি পদে বরণ করেছেন।
দুর্যোধনকে তিনি পাণ্ডবদের ছিন্ন মুণ্ড এনে উপহার দেবেন। সেটি অবশ্যই ভীমসেনের মুণ্ড। যদি নাও হয়, পঞ্চপাণ্ডবদের কারও না কারও হতে পারে। অন্তত একটি মুণ্ড আজ রাতে চাই। তারপর মুণ্ডমালা পরার জন্য আগামী দিনগুলি তো আছেই।
অশ্বত্থামা চকিতে ঘুরে দাঁড়িয়ে কৃপাচার্যকে বললেন, চলুন আমরা সবাই কুরুক্ষেত্রের দিকে রওয়ানা দিই।
কৃপ বললেন, এই রাতে? না, আমার মত নেই। আমি খুব ক্লান্ত। আমার নিদ্রা আসছে। এখন চলো কোথাও ঘুমোনোর উপযুক্ত স্থান আছে কি না অনুসন্ধান করি। কাল সকালে উঠে যা হোক কিছু করা যাবে।
অশ্বত্থামা বললেন, আমি মহারাজকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তিনি জীবিত থাকতে শত্রুর ছিন্ন মুণ্ড উপহার দেব। আপনারা দুজন এই প্রতিজ্ঞা পালনে আমার সঙ্গে সহমত তো?
কৃপ বললেন, হঠকারী কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। আমরা একটু ভাবি। বিষয়টি এত সহজ নয়। এখন তো রাত্রি গভীর হয়েছে। আমরা চলো রাত্রিটা কোথাও বিশ্রাম করি। কাল প্রভাতে উঠে কিংকর্তব্য নির্ধারণ করা যাবে।
কৃতবর্মা বললেন, আমাদের ভোরের আগেই এই স্থান ত্যাগ করতে হবে। কারণ পাণ্ডব শিবির থেকে কাল নিশ্চয়ই যুধিষ্ঠিরের সৈন্যরা আসবে। দুর্যোধনের মৃত্যু হয়েছে কি না দেখতে। আমরা ধরা পড়ে যাব। আমাদের এই স্থান ত্যাগ করে আবার নিষাদদেরই অতিথি হতে হবে কিছুদিন।
অশ্বত্থামা বললেন, আর কিছুর দরকার নেই। আমরা তিনজনই পাণ্ডবদের আক্রমণ করব।
কৃতবর্মা বললেন, সে তো আত্মহত্যা হবে সেনাপতি। পাণ্ডব শিবিরে এখনও যথেষ্ট সৈন্য আছে। তাছাড়া পাণ্ডবেরা পাঁচ ভাই সবাই জীবিত। ধৃষ্টদ্যুম্ন ও পাণ্ডবপুত্ররা জীবিত। শিখণ্ডীও জীবিত। তিনি কম বীর নন। আপনারা দুজন না হয় অমর। আপনাদের মৃত্যু নেই। কিন্তু অসম যুদ্ধে আমার মৃত্যু অনিবার্য।
অশ্বত্থামা বললেন, আপনি মৃত্যুকে ভয় পান?
কৃতবর্মা বললেন, না সেনাপতি। কোনো যাদব মৃত্যুকে ভয় পায় না। মৃত্যুভয়কে জয় করেই তবে সৈনিক হওয়া যায়। কিন্তু যোদ্ধা জয়ের জন্য প্রাণ দেয়। পরাজয়ের জন্য নয়।
অশ্বত্থামা প্রতিবাদ করলেন, এটি ভুল। ‘পরাজয়’ বলে কোনো শব্দ ক্ষত্রিয়ের শাস্ত্রে লেখা নেই। যুদ্ধে জয় ও পরাজয়কে একতুল্য মূল্যে বিচার করা হয়। মহারাজ দুর্যোধনকে দেখলেন না। এত যন্ত্রণাতেও তিনি কাতর হননি। মৃত্যুকেই তিনি অপরাজয়ের তৃপ্তি বলে মেনে নিলেন।
কৃতবর্মা বললেন, আমাকে মার্জনা করবেন সেনাপতি, আপনি ও আচার্যদেব অমর বলে এত আত্মবিশ্বাসী। আপনারা যে কোনো পরীক্ষা বারবার করতে পারেন। কিন্তু আমার একটাই জীবন। সে জীবন আমি মহাৎ কাজে, জয়ের জন্য উৎসর্গ করতে চাই।
কৃপাচার্য বললেন, ঠিক আছে। এটি নিয়ে আর একটু ভাবা যাবে। আমরা রাত্রিটা কোথাও নিদ্রা যাই। শেষ রাতে উঠে আমরা এ স্থান পরিত্যাগ করব।
ওরা অশ্বের সন্ধানে দ্বৈপায়নের তীর ধরে পদব্রজে হাঁটতেই একটি বটবৃক্ষ চোখে পড়ল। তার বেদিটা বাঁধানো। হয়তো পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য এইভাবে বাঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওঁরা তিনজন সেখানে চলে এলেন। এটি হ্রদের পশ্চিম পাড়।
কৃপাচার্য বললেন, তোমরা এখানেই বিশ্রাম করো। এত রাতে এর চেয়ে ভালো জায়গা পাবে না।
কৃপাচার্যের কথামতো ওঁরা সেই বেদিতে শুয়ে পড়লেন।
কৃপ ও কৃতবর্মার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুম এসে গেল। কিন্তু অশ্বত্থামার চোখে ঘুম নেই। দুর্যোধন তাঁর ওপর যে ভার ন্যস্ত করেছেন, তিনিও যে প্রতিজ্ঞা করেছেন তা পালন না করা পর্যন্ত তাঁর নিদ্রা আসবে না। অশ্বত্থামা শয্যা থেকে উঠে বসলেন। বিরাট বটবৃক্ষের শাখার ফাঁক দিয়ে ম্লান জ্যোৎস্নার আলোক এসে বেদিতে পড়েছে। অশ্বত্থামা ঊর্ধ্বপানে চেয়ে আছেন। কী দেখছেন কে জানে। নির্দিষ্ট কিছুর প্রতি তাঁর দৃষ্টি নেই। তিনি চতুর্বেদ পাঠ করেছেন। কিন্তু অবাঙমনসগোচর ব্রহ্মের প্রতি তাঁর তেমন বিশ্বাস নেই। তিনি চিরজীবী, পরলোক নিয়েও তাঁর আগ্রহ নেই। পিতার কাছে যেটুকু অধ্যয়ন করেছিলেন, আলাদা করে আর শাস্ত্র অধ্যয়ন করেননি। শুধু অস্ত্রের ঝনঝনানির মধ্যে তাঁর শৈশব ও যৌবন কেটেছে। অস্ত্রই তাঁর জীবন। লক্ষ্যভেদই তাঁর শিক্ষা। জয়ই তাঁর জীবনের মহামন্ত্র। যে কোনো পরীক্ষায় তিনি দ্বিতীয় হবার জন্য লড়তে রাজি নন। কিন্তু তাঁর পিতা তাঁকে ‘দ্বিতীয়ই’ করে রেখেছেন। অর্জুন ছাড়া আর কাউকে তিনি প্রথম করবেন না। এমনকী নিজের একমাত্র পুত্রকেও নয়। পিতার এই একদেশদর্শিতা নিয়ে তার চিরকালের অভিমান। শুধু মাতা কৃপী তাকে বুকে টেনে নিয়ে সান্ত্বনা দিতেন। বলতেন, অর্জুন রাজপুত্র। তোমার পিতার প্রভুদের পুত্র। তিনি তাঁদের বেতনভূক শিক্ষক। শিক্ষক তাঁর পুত্রকে প্রথম করলে সবাই কী বলবে? বলবে স্নেহান্ধ পক্ষপাতি পিতা। তাঁর সুনাম নষ্ট হবে। তাছাড়া অর্জুন তো যোগ্য। তাকে তুমি হিংসা করো কেন?
—পিতা আমাকে স্নেহ করেন না। যা কিছু শ্রেষ্ঠ সেটা উনি অর্জুনকে দেন। এইজন্যই তো দুর্যোধন ও আমার রাগ পিতার ওপর। অভিমানে তিনি বারবার গৃহত্যাগ করেছেন।
—ছি ছি। তোমার পিতাকে ভুল বুঝো না। তিনি উন্নত শির, ধর্মজ্ঞ, এবং অস্ত্রশিক্ষক হিসাবে ভারতে অদ্বিতীয়। তাঁকে বলেছেন মা কৃপী
মা, লোকে পিতাকে ঘৃণা করে। বলে পিতা নিষাদপুত্র একলব্যের হাতের আঙুল গুরুদক্ষিণা হিসাবে কেটে নিয়েছিলেন। কারণ একলব্য অর্জুনকে অস্ত্রবিদ্যায় ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আমার নিজের কথা বাদ দিচ্ছি, কিন্তু কর্ণ অর্জুনের চেয়ে অনেক বড় বীর। পিতা কর্ণকে অস্ত্রশিক্ষা দেননি সূতপুত্র বলে। অথচ পিতা যথেষ্ট উদার। তাঁর ছুৎমার্গ থাকার কথা নয়। তিনি বেদজ্ঞ। বেদে তো কোথাও বৈষম্যের কথা নেই। শিক্ষা সার্বজনীন অধিকার। কর্ণ যে প্রকৃত সূতপুত্র নন, কুন্তীপুত্র, স্বয়ং সূর্য তাঁর পিতা, তিনি পিতার মতো মহাতেজী তা বড় হয়ে আমরা জেনেছি। পিতা তা অনবগত নন। কিন্তু তিনি কর্ণকে শিক্ষা দেননি, শুধু অর্জুনের জন্য। সেই অর্জুনের ভ্রাতা যুধিষ্ঠিরের সহযোগিতায় নিরস্ত্র পিতার মুণ্ডচ্ছেদ করল অর্জুনেরই শ্যালক ধৃষ্টদ্যুম্ন। পিতার সহপাঠী অভিন্ন হৃদয়বন্ধু দ্রুপদ রাজা হয়ে কি অপমানই না করেছে দরিদ্র পিতাকে। তা রাজাই সর্বসুখের অধিকারী। এইজন্যই মানুষ রাজা হবার জন্য তার দুহাত রক্তে রঞ্জিত করে, দুর্নীতির পঙ্কে ডুবেও রাজা হতে চায়, বিপক্ষকে নির্বিচারে হত্যা করতে চায়। কিন্তু পিতা তো রাজ্যলাভ করেও রাজপদে অভিষিক্ত হননি। অর্জুনকে পিতা ভালোবাসায় কোনো ঘাটতি দেখাননি। তাঁকে অস্ত্রবিদ্যায় মহাবীর করে তুলেছেন। তিনি আশা করেছিলেন পিতার মৃত্যুর পর কর্ণকে সেনাপতি না করে গুরুপুত্রের উত্তরাধিকারী হিসাবে দুর্যোধন তাঁকেই সেনপতি করবেন। কিন্তু কর্ণও তাঁকে পছন্দ করতেন না। কর্ণ বীর, কিন্তু অহংকারী। দুর্যোধনের প্রশ্রয়ে তিনি আরও অহংকারী হয়ে উঠেছেন। নয়তো তিনি কী করে বলেন যে ভীষ্ম যতদিন সেনাপতি থাকবেন, ততদিন তিনি যুদ্ধ করবেন না। কী ঔদ্ধত্য। সাধে কি লোকে সূতপুত্র বলে। ক্ষত্রিয়ের বীর্য থাকলেই হল না, উদারতা চাই। তাঁর পিতা ও তাঁর মাতুল প্রমাণ করেছেন ব্রাহ্মণেরাই পারে একই সঙ্গে ক্ষত্রিয়ের বীরত্ব আর ব্রাহ্মণের, নির্লোভ আসক্তিহীনতার সমন্বয় ঘটাতে। জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তির মিলন ঘটাতে।
অশ্বত্থামা উঠে বসে আছেন। বস্ত্রের শিরোস্ত্রাণটি উপাধানের মতো করে পেতে রেখেছেন। কিন্তু ভিজে বলে তাতে মাথা দেননি। তাঁর মাথায় ঘুরছে আগামী যুদ্ধের পরিকল্পনা। প্রথমে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ। তারপর পাণ্ডবদের পরাজিত করে, নির্মূল করে নতুন ভারত গঠন। পাণ্ডবমুক্ত ভারত। আর তার জন্য সবার আগে নিধন করা দরকার চক্রী শ্রীকৃষ্ণকে। শিশুপাল, জরাসন্ধ কেউ পারেনি। তিনি পারবেন।
হঠাৎ একটা তীব্র ডানা মেলে কৃষ্ণকায় এক বস্তু মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ায় অশ্বত্থামা চমকে ওপরে তাকালেন। একটি বৃহদাকার পেচক গিয়ে বটগাছের ডালে বসল, আর সেই ডালে কতগুলি কাক বাসা বেঁধেছিল। পেচকটি গিয়ে প্রতিটি বাসা ঠুকরে ঠুকরে ভেঙে শিশু শাবক কাকগুলিকে ঠুকরে ক্ষত-বিক্ষত করে বৃক্ষ থেকে ফেলে দিল। তাদের কয়েকটিকে ভক্ষণ করতে লাগল। কাকরা মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকারে উড়ে পালাতে গিয়ে বটফলের মতো মাটিতে পড়ে যেতে লাগল। কাকেদের আর্তনাদে মধ্যরাত্রির নিস্তব্ধতা খান খান হয়ে ভেঙে গেল।
অশ্বত্থামা তাড়াতাড়ি কৃপ ও কৃতবর্মাকে ঘুম থেকে তুললেন। তারা সচকিত হয়ে উঠে বসে বললেন, কী হয়েছে? কোনো নতুন বিপদ? পাণ্ডব সৈন্যরা কি এসে পড়েছে?
অশ্বত্থামা কোনো কথা না বলে পেঁচকটির দিকে আঙুল তুলে দেখান। কৃপ ও কৃতবর্মা দেখলেন একটি পেঁচক একটি কাককে হত্যা করে গোগ্রাসে তাকে খাচ্ছে। তার পালক খসে খসে পড়ছে মাটিতে।
অশ্বত্থামা বললেন, মাতুল, আমি আমার সূত্র পেয়ে গিয়েছি। এখনই আমাদের রওয়ানা হতে হবে। এখন রাত্রি তৃতীয় প্রহর। এটাই প্রকৃষ্ট সময়। এই উলুক আমায় পথ দেখিয়ে দিল।
কৃপাচার্য বললেন, কী হয়েছে বলবে তো। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। বসন্তের বজ্র নির্ঘোষের মতো অশ্বত্থামা বললেন, ‘প্রতিশোধ’। আমরা এখনই রাত্রি থাকতে থাকতে পাঞ্চাল শিবির আক্রমণ করে ঘুমন্ত পাঞ্চালদের সবাইকে হত্যা করব।
কৃপ বললেন, এ অন্যায় আচরণ, অশ্বত্থামা। এ গুপ্তহত্যা। যুদ্ধে গুপ্তহত্যার কোনো স্থান নেই। যুদ্ধ হয় সামনাসামনি সমযোদ্ধাদের সঙ্গে। তার নীতি আছে, বিধি আছে, আচরণ আছে।
—আপনি থামুন, নীতিকথা শোনাবেন না। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে দুর্নীতি কী আমরা দেখিনি? এই কিছুক্ষণ আগে পথের ধূলায় এক বীর যোদ্ধার মৃত্যু কি আমরা স্বচক্ষে দেখে আসিনি? অশ্বত্থামা রুক্ষ স্বরে বললেন।
—দুর্যোধনের কথা বলছেন? কৃপ প্রশ্ন করলেন।
তারপর বললেন, হ্যাঁ, তার মৃত্যু গভীর দুঃখের কিন্তু লোভী অদূরদর্শী সেই মানুষটি আরও কিছু অসাধু প্রভাবশালী লোকদের মন্ত্রণায় পাণ্ডবদের সঙ্গে শত্রুতা করেছেন।
অশ্বত্থামা বললেন, কৃতবর্মা রাজনীতিতে দুর্নীতিই নীতি। কুরু-পাণ্ডব যারাই ক্ষমতায় থাকবে তাদের নীতি তাদের লক্ষ্যপূরণের অনুবর্তী হবে। একে আপনি দুর্নীতি বলুন আর যাই বলুন। মৎস্য যেমন পঙ্কের মধ্যে থাকে, রাজাকেও প্রয়োজনে পঙ্কের আশ্রয় নিতে হয়। দুর্নীতি তাই রাজার কণ্ঠহার। আমরা রাজার গুণাগুণ বিচার করতে যাব না। আমি রাজ সেনপতি, রাজার প্রতিভূ। আমি ও আপনি শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণকুলে জন্মে আমরা ক্ষাত্রধর্ম অবলম্বন করেছি। ক্ষত্রিয়ের ধর্মই আমার ধর্ম। রাজার অনুজ্ঞাই আমার নির্দেশিকা। আমি আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। তাছাড়া ক্ষত্রিয়ের মতো প্রতিহিংসাই আমার ধর্ম। এই কিছুক্ষণ আগে একটি পেচক আমাকে শিক্ষা দিয়ে গেল। ঘুমন্ত অবস্থায় আক্রমণ করলে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া সহজ। একজন উলুক এত কাককে বিনষ্ট করল। আমরা তিনজন তিনশত জনকে নিমেষের মধ্যে বিনষ্ট করতে সমর্থ। মাতুল, মহামতি দ্রোণ আমার যেমন পিতা, তেমনি আপনার যমজ ভগিনীর নাথ। তিনি আজ বিধবা হয়ে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছেন। আমি তাঁর হতভাগ্য পুত্র তার চোখের জল যদি না মুছে দিতে পারি তাহলে আমাকে ধিকা
কৃপ শান্ত কণ্ঠে বললেন, তুমি কী করতে চাও?
—আমি সমস্ত পাঞ্চাল বংশ নিশ্চিহ্ন করতে চাই। পঞ্চপাণ্ডবদের নির্বংশ করতে চাই। ভারতকে পাণ্ডবশূন্য করতে চাই।
কৃপ বললেন, কিন্তু এ তো গুপ্তহত্যা। এ তো সন্ত্রাস। ক্ষত্রিয়দের কাছে সন্ত্রাসের মতো নিন্দনীয় কাজ আর নেই। ক্ষত্রিয় সামনাসামনি লড়াই করে। জিতলে সুখভোগ করে। মারা গেলে অক্ষয় স্বর্গবাস করে।
—সন্ত্রাস কাকে বলে আমি জানি না। আমি জানি হত্যাই একমাত্র উদ্দেশ্য সাধনের উপায়। যুদ্ধে গজ ও অশ্বরা যুদ্ধ করে না, কিন্তু তারা মারা যায়। সারথিরা তিরবিদ্ধ হয়ে প্রাণ ত্যাগ করে।
—হিংসা আমাদের শাস্ত্রবিরোধী। অস্ত্র শুধু যুদ্ধে এবং গৃহে আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয়। বেদ বলেন অহিংসা পরম ধর্ম। সমস্ত মানুষ সুখে থাকুক, নিরাময়ে থাকুক।
অশ্বত্থামা বললেন, মানুষ সুখে সেইদিনই থাকতে পারে যখন সে শান্তিতে থাকতে পারে। ধর্মের নামে কপটচারীরা যেখানে রাজত্ব করে না।
কৃপ বললেন, দেখো অশ্বত্থামা, মানুষ চালিত হয় দৈব ও পুরুষাকার উভয়ের দ্বারা। উভয়ের একত্র সমাবেশ ঘটলে তবেই তার কার্যসিদ্ধি হয়। উৎকৃষ্ট অপকৃষ্ট সব কাজই এই দৈবের অধীন। মেঘকে শুধু বারিবর্ষণ করলেই হয় না, কর্ষিত ক্ষেত্রের ওপর বৃষ্টির জল পড়লে তবেই তা কার্যকরী হয়। তখন প্রচুর শস্য উৎপন্ন হয়। অনেক সময় দৈব পুরুষকারের ওপর নির্ভর না করেই নিজেই ফল দান করে। কিন্তু বিবেচক ব্যক্তিরা শুধু দৈবের ওপর নির্ভর করে বসে থাকে না।
অশ্বত্থামা মাতুলকে উদ্ধৃত স্বরে বললেন, আপনি আমাকে কী বোঝাতে চাইছেন?
কৃপ বললেন, প্রতিটি কর্মই অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা করে করবে। মানুষ দৈব ও পুরুষকারের অধীন। তার নিজের হাতে সবটা নেই। সুতরাং যা ঘটেছে তার জন্য তুমি কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে দায়ী করতে পারো না। তা দৈব নিয়ম অনুসারেই ঘটে গেছে। এ জন্য বিভ্রান্ত না হয়ে তুমি বৃদ্ধের উপদেশ গ্রহণ করো। লুব্ধ প্রকৃতি দুর্যোধন স্থিতবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিদের কথা শোনেননি। পাণ্ডবদের প্রতি স্বৈরাচার প্রদর্শন করেছেন। তুমি যে কোনো কাজ হঠাৎ ক্রোধের বশে করে বোসো না। চলো, আমরা কাল প্রভাতেই ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর কাছে গিয়ে বলি, তাঁদের কাছে আমাদের সুরক্ষা চাই। আমরা পুত্রহারা অন্ধ পিতার পাশে মানহারা ধার্মিক মাতার পাশে গিয়ে দাঁড়াই। তাঁরা আজ সর্বহারা। তাঁদের সোনার সংসার ছারখার হয়ে গেল। তোমার বৃদ্ধ পিতা স্বর্গে গিয়ে মঙ্গললোকে বাস করছেন কিন্তু একবার বৃদ্ধ ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর কথা ভেবে দেখো
অশ্বত্থামা বললেন, ব্যক্তিমাত্রেরই বুদ্ধিবৃত্তি পৃথক পৃথক। সবাই নিজেকে অন্যদের থেকে বুদ্ধিমান ভাবে। পরবুদ্ধির নিন্দা করে। এক বিষয়ে কেউ যদিও ঐক্যমত্য হয়, অন্য বিষয়ে বিপরীত মত পোষণ করে। মানুষের চিত্ত বৈচিত্র্যই তাদের পৃথক বুদ্ধির কারণ। সুবিজ্ঞ বৈদ্য যেমন ব্যাধির কারণ বুঝে তাঁর নিজস্ব বুদ্ধি অনুযায়ী রোগ নিরাময়ের ঔষধ দেন তেমনি মানুষও তাঁদের নিজস্ব বুদ্ধি অনুসারে তাঁদের সমস্যা সমাধান করেন। সবার যে একরকম বুদ্ধি হবে তার কোনো মানে নেই। এক ব্যক্তিরই বুদ্ধি সব সময় সমান থাকে না। মানুষ যৌবনকালে যে বুদ্ধির প্রভাবে বিমোহিত হয়, প্রৌঢ় অবস্থায় তার সে বুদ্ধি থাকে না। প্রৌঢ় অবস্থায় যে বুদ্ধির দ্বারা সে চালিত হয়, বৃদ্ধ বয়সে সে বুদ্ধি থাকে না। মানুষ মাত্রই তার নিজের বুদ্ধি অনুসারে কাজ করে যায়। আত্মহনন তো অতি নিন্দনীয় কাজ। তাও তো লোকে করে। কারণ তার বুদ্ধিই তাকে ওই কাজে এগিয়ে দেয়।
অশ্বত্থামা আবার বললেন, এখন দুঃখ প্রভাবে আমার মনে এই সন্ত্রাসের বুদ্ধি দেখা দিয়েছে। এই বুদ্ধি কু বা সু কি না জানি না। তবে এটি বুঝছি এই কাজটা করলে আমার শোক বিনষ্ট হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমি ওদের হত্যা করতে না পারব আমি শান্তি পাব না।
কৃতবর্মা এতক্ষণ কোনো কথা বলছিলেন না। তিনি এখন বললেন, দেখো, সন্ত্রাস ক্ষত্রিয়ধর্ম বিরোধী। আমি এই প্রস্তাবে সায় দিতে পারছি না।
অশ্বত্থামা বললেন, জাতি-ধর্মের কথা বললে আর প্রতিশোধ নেওয়া সম্ভব নয়। পাণ্ডবেরাও কি ক্ষাত্রধর্ম যথাযথভাবে পালন করলে এ যুদ্ধ জিততে পারত? প্রজাপতি ব্রহ্মা ব্রাহ্মণকে বেদ, ক্ষত্রিয়দের তেজ, বৈশ্যকে দক্ষতা, শূদ্রকে সর্ব বর্ণের অনুকূলতা দিয়েছেন। অতএব অসংযমী ব্রাহ্মণ, নিস্তেজ ক্ষত্রিয়, অদক্ষ বৈশ্য ও প্রতিকূলচারী শূদ্রদের কাজও নিন্দনীয়। আমি সাধুপূজিত ব্রাহ্মণকুলে জন্মগ্রহণ করেছি বটে কিন্তু ভাগ্যদোষে আমাকে ক্ষাত্রধর্ম গ্রহণ করতে হয়েছে। এখন একবার ক্ষাত্রধর্ম গ্রহণ করে আমি যদি ব্রাহ্মণের মতো আচরণ করি তাহলে আমাকে নিন্দনীয় হতে হবে। পিতৃবধের প্রতিশোধ নেওয়াই ক্ষত্রিয়ের ধর্ম। প্রতিশোধ না নিলে আমি লোকসমাজে মুখ দেখাব কী করে?
কৃপ বললেন, অশ্বত্থামা, প্রতিশোধ ও ভালোবাসা দুটোই চার অক্ষরের শব্দ। কিন্তু দুটির মধ্যে অর্থের কত তফাত। ভালোবাসা কিন্তু সবার ধর্ম। তা মানবধর্ম। কোনো জাতির ধর্ম মানবধর্মের বাইরে হতে পারে না। মানবধর্মের সঙ্গে যেখানে জাতিগত ধর্মের বিরোধ সেখানে মানবধর্মই জীবনে স্থান পাবে।
অশ্বত্থামার চোখ দিয়ে আগুন ঝরে পড়ল। তিনি বললেন, মানবধর্ম বলে কিছু নেই। প্রতিটি মানুষের অধিকার আছে আঘাত হানলে প্রত্যাঘাত করার।
কৃপ বললেন, তেমনি ক্ষমা করাও মানুষেরই অধিকার। অশ্বত্থামা, এখনও বলছি চলো, কাল সকালেই আমরা হস্তিনাপুর যাত্রা করি।
অশ্বত্থামা বলল, না, তা হয় না মাতুল। আমি এখনই পাঞ্চাল শিবিরে গিয়ে পাণ্ডবদের নিদ্রিত সন্তান-সন্ততিদের হত্যা করতে চাই। নিদ্রিত ধৃষ্টদ্যুম্নের মস্তক ছেদন করতে চাই।
কৃপাচার্য তখনও শান্ত। অশ্বত্থামার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, তুমি এখন এমন উত্তেজিত যে স্বয়ং পুরন্দরও তোমায় শান্ত করতে পারবেন না। আমার অনুরোধ আজ রাত্রিটার জন্য তুমি নিরস্ত্র হও। কাল দিনটা না হয় আমরা নিষাদদের গৃহে অবস্থান করে ঠান্ডা মাথায় ঠিক করি কী করা যায়। দ্রোণতনয়, আজ রাত্রির শেষ প্রহরটি আমাকে একটু ঘুমোতে দাও। আমি বড় ক্লান্ত। দুর্যোধনের মৃত্যু দেখে আমি এখনও বিহ্বল আছি। বেশ তো, কাল যদি নিষাদগৃহে কাটাতে না চাও, কালই আমরা যা করার দিনের বেলা করি, তস্করের মতো রাত্রিকালে নয়। কৃতবর্মার মতো অসাধারণ ধনুর্ধর তোমার পাশে থাকবে, আমিও তোমার সঙ্গে থাকব। আমরা তিনজনই শত্রুদের বিনাশ করার পক্ষে যথেষ্ট। হয় আমরা পাণ্ডবদের সঙ্গে পাঞ্চালদের বিনাশ করব, না হয় তাদের হাতে নিধন হব।
কৃপ তখন শান্ত কণ্ঠে বলে চলেছেন, এখন একটু ঘুমিয়ে নাও অশ্বত্থামা। কালকের জন্য শক্তি সঞ্চয় করো।
অশ্বত্থামা বললেন, মাতুল দুঃখে অমর্ষিত (বিপন্ন) ক্রুদ্ধ ও চিন্তায় আকুল কোনো ব্যক্তি কি ঘুমোতে পারে? আমি চোখের পাতা এক করতে পারিনি। ইহলোকে পিতৃবধের কথা বারবার স্মরণে আসায় আমার কাছে আর কি কষ্টকর বস্তু থাকতে পারে? আমার হৃদয় অহোরাত্র দগ্ধ হচ্ছে। ধৃষ্টদ্যুম্নকে বিনাশ না করা পর্যন্ত আমার শান্তি হবে না। ভগ্ন উরু দুর্যোধনের যন্ত্রণা দেখে আপনি যেমন কাতর, আমিও সমান দুঃখ পেয়েছি। এখন আমায় এই ক্রোধ থেকে মুক্ত করতে পারে এমন কিছু খুঁজে পাচ্ছি না। সুতরাং আমি যে হত্যার সঙ্কল্প করেছি, সেটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। আজ রাতে শত্রু বিনাশ করে তারপর মহাসুখে নিদ্ৰা যাব।
কৃপাচার্য একটু হতাশার সুরে বললেন, বুদ্ধিহীন ব্যক্তি শাস্ত্রজ্ঞ ও জিতেন্দ্রিয় হলেই ধর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারে না। রন্ধনের দর্বী (হাতা) যেমন নিয়ত ব্যঞ্জনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তার রসাস্বাদ গ্রহণ করার ক্ষমতা নেই, তেমনি জড় ব্যক্তিরা নিত্য পণ্ডিতদের সান্নিধ্যে থাকলেও ধর্মজ্ঞ হতে পারে না। কিন্তু বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা ঠিক জিহ্বার মতো। জিহ্বা স্পর্শ করা মাত্রই রূপ-রস আস্বাদন করতে পারে। তেমনি বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা গুলি ও পণ্ডিতদের সান্নিধ্য থেকে ধর্মের মর্মার্থ গ্রহণ করতে পারেন। আর দুর্বিনীত পাপাত্মারা সজ্জনের কল্যাণকর উপদেশ উপেক্ষা করে মহাপাপে লিপ্ত হয়। সুহৃদদের বাক্য উপেক্ষা করে পাপ কাজ থেকে বিরত না হলে তাকে শ্রীভ্রষ্ট হতে হয়। তার বিপর্যয় অনিবার্য
হয়ে পড়ে। বন্ধুদের কথা না শুনে পাপ কাজে প্রবৃত্ত হলে তাকে দুঃখ পেতে হয়। হে দ্রোণতনয়, তুমি আত্মদমন করো। আমার কথা শোনো। তা না হলে তোমায় পরে অনুতাপ করতে হবে। কখনও নিদ্রিত, অস্ত্রত্যাগী, রথহীন, বাহনহীন, শরণাগত ও শিরস্ত্রাণ বর্জিত মুক্তকেশ ব্যক্তিদের মাথায় আঘাত কোরো না।
—কিন্তু পাণ্ডবেরা তাই তো করেছে।
—অন্যায় কখনও ন্যায়ের উদাহরণ হতে পারে না। ওরা অন্যায় যুদ্ধ করেছিল অতএব আমরাও করবো এই কুকর্ম কখনই উদাহরণ হতে পারে না। ধর্মই ধর্মের উদাহরণ, অধর্ম দিয়ে ধর্মের প্রতিষ্ঠা করা যায় না। প্রতিহিংসা দিয়ে হিংসাকে জয় করা যায় না। ইতিবাচক উদাহরণই দৃষ্টান্ত বলে গণ্য হয়। তুমি যদি হিংসা করো, হিংসাই ফিরে পাবে। নচেৎ ঘৃণা। শুধু তাই নয়, তুমি নিজেও সারাজীবন অনুতাপ অনলে দগ্ধ হবে।
অশ্বত্থামা বললেন, কিন্তু অধর্ম করেও তো পাণ্ডবদের জয় হল। আমার পিতা অস্ত্রত্যাগ করার পরই ধৃষ্টদ্যুম্ন তাকে হত্যা করেছে। মহাবীর কর্ণের রথচক্র যখন বসে গিয়েছে তখন রথহীন কর্ণকে হত্যা করেছে অর্জুন। শিখণ্ডীকে সামনে রেখে অস্ত্রত্যাগ করিয়ে ভীষ্মকে হত্যা করেছে অর্জুন। প্রায়োপবিষ্ট ভুরিশ্রবাকে ভীম অন্যায়ভাবে হত্যা করে। কোমরের নীচে আঘাত করে দুর্যোধনকে নিহত করেছে ভীম। এত অন্যায় করেও তো পাণ্ডবেরা বীরের সম্মান পাচ্ছে। পাপ তো তাদের স্পর্শ করছে না। যত নীতি শুধু আমার বেলা? যেহেতু আমি রাজপুত্র নই। দরিদ্র ব্রাহ্মণপুত্র। যেহেতু আমার স্তাবক নেই, প্রচারক নেই। যেহেতু আমি সর্বদা ন্যায্য কথা বলি, দরকারে কঠোর কথা বলি। একজন বেতনভুক পেশাদার সেনাপতি মাত্র। রাজাদের কোনও দোষ স্পর্শ করে না। এটিও হয়তো দৈব। আমার পাশে স্বয়ং অসীম প্রভাবশালী বাসুদেব নেই। কর্ণের মতো মহাবীরও আপন গৌরবে গৌরবান্বিত হতে পারেননি। তিনি সারাজীবন অবহেলিত সূতপুত্রই থেকে গেছেন। আমিও ধর্মত্যাগী ব্রাহ্মণপুত্র থেকে গেলাম। সমগ্র জীবনব্যাপী অস্ত্রসাধনা ও রাজসেবা করে আমি, আপনি, আমার পিতা কি প্রতিষ্ঠা পেলেন? তাঁর শিষ্যরাই মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে তার বিনাশ ঘটাল। পিতার ছাত্র ধৃষ্টদ্যুম্ন, পিতা যাকে বন্ধুপুত্র বলে স্নেহ করতেন, সেই ধৃষ্টদ্যুম্নই পিতার মুণ্ড কেটে নিল।
কৃপ তাঁকে শেষবারের মতো বোঝাবার চেষ্টা করলেন, ধর্ম পালন, কর্তব্য পালনকে কোনো শর্তের অধীনে রেখো না। এই বটবৃক্ষের দিকে তাকিয়ে দেখো। এ কিন্তু কারও পরিচর্যা, শুশ্রূষা ও পুরস্কারের আশা না করে নিজের ধর্মেই বৃহৎ বনস্পতি হয়েছে। কত পাখি এসে এই বৃক্ষে আশ্রয় নেয়। বৃক্ষ কাউকে কোনো শর্ত দেয় না। সে পেচককে আশ্রয় দেয়, আবার কাককেও আশ্রয় দেয়। সে যে অজস্র ফল দেয় তার একটিও সে খায় না। তুমি তোমার ধর্ম অনুসারেই কর্তব্য করে গেছ। দৈবই তোমাকে অক্ষত রেখেছে। তোমার অবস্থাও দুর্যোধনের মতো হতে পারত।
অশ্বত্থামা সে কথায় কর্ণপাত না করে বললেন, আমি এখন কৌরব সেনাপতি। আমি আপনাদের দুজনকে আদেশ করতে পারি আমাকে অনুগমন করার। কিন্তু তা আমি করব না। আমি একাই যাচ্ছি আমার উদ্দেশ্য পূরণে। বিদায়। আর দেখা হবে কি না জানি না।
অশ্বত্থামা তাঁর অশ্বে উঠলেন। কৃপ আর কৃতবর্মা আর নিজেদের সম্বরণ করতে পারলেন না। কৃপ বললেন, একটু দাঁড়াও। আমি বর্মটা পরে নিই।
তারপর তিন যোদ্ধাকে নিয়ে রাতের অন্ধকারে তিন অশ্বারোহী পাণ্ডব শিবিরের দিকে রওয়ানা হল।
