প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পর্ব : সত্যমেব জয়তে

অশ্বত্থামার আশ্রমিক জীবন

অশ্বত্থামার আশ্রমিক জীবন

এইভাবে আচার্য সোমকের তপোবনে অশ্বত্থামার এক বৎসর কেটে গেল। এই এক বছরে অশ্বত্থামা আশ্রমিক জীবনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন। তিনি ব্রাহ্মণ তনয়। পূজা-প্রার্থনা জানতেন। বেদ যা পাঠ করেছেন তা এখনও মনে আছে। পাঠ করেছেন বললে ভুল হবে। তিনি শৈশবে খুবই মনোযোগী ছাত্র ছিলেন। তিনি পুঁথি পাঠ করতে আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু একবার কিছু শুনলে তাঁর কণ্ঠস্থ হয়ে যেত। বেদের শ্লোকগুলি তিনি কখনও বাবার কাছ থেকে, কখনও মাতুলের কাছ থেকে, কখনও অন্য ছাত্রদের সঙ্গে সমবেত আবৃত্তির মাধ্যমে কণ্ঠস্থ করে ফেলেছিলেন। বিশেষ করে অথর্ববেদ তাঁকে বেদান্তের চেয়ে বেশি করে আকর্ষণ করেছিল। কারণ অথর্ববেদের মধ্যে শুধু আধ্যাত্মকথা নয়, শুধু তত্ত্বজ্ঞান নয়, ব্যবহারিক জ্ঞানের কথা আছে। যা জীবনে নানা প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়। কুষ্ঠরোগের আরোগ্য লাভ থেকে শত্রু জয়, পাপক্ষয়ের মন্ত্র। সৌভাগ্যের পথ নির্দেশক মন্ত্র, শত্রুক্ষয়, পাপক্ষয়, সৌভাগ্যের আরাধনা, পুত্রলাভ, সুপ্রসব থেকে সর্পভয় নিবারণ, বাস্তু সংস্কার থেকে বাণিজ্যে শ্রীবৃদ্ধি লাভ, গৃহপ্রবেশ, চূড়াকরণ, জাতকর্ম, বিবাহ মন্ত্র। যজ্ঞের চতুর্বিধ কর্ম—হোত্, উল্লাহ, অধ্বর্ষ, ঋক যযু ও সামবেদ দ্বারা সম্পন্ন হলেও চতুর্থ অর্থাৎ ব্রহ্মকর্ম নিষ্পন্নের জন্য অথর্ববেদের শরণ নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। তাই অথর্ববেদ তাঁর প্রিয় ছিল।

.

অথর্ববেদ পড়াতে পড়াতে অশ্বত্থামার সঙ্গে বালক শিক্ষার্থীদের খুব হৃদ্যতা জন্মে গেল। এদের মধ্যে বারো বৎসরের একটি বালক কচীকের সঙ্গে অশ্বত্থামার খুব প্রীতি জন্মে গেল। পাঠের প্রথম দিনটিতেই কচীকের বুদ্ধিদৃপ্ত কথাগুলি তাঁকে খুব আকৃষ্ট করল। প্রথম দিন পড়াতে এসে অশ্বত্থামা সব ছেলেদের পরিচয় একে একে জিজ্ঞাসা করলেন।

বেশিরভাগ ছেলেই হস্তিনাপুর ও ইন্দ্রপ্রস্থ থেকে এসেছে। তবে সুদূর চেদি, মগধ, ও দ্বারকা থেকেও কয়েকটি ছেলে এসেছে। প্রথমে বেদব্যাসের কাছে তাদের পিতারা আবেদন করে। কিন্তু মূল আশ্রমে আর স্থান নেই বলে মহর্ষি দম্যক বনের এই আশ্রমে তাঁদের পাঠান। কচীক এসেছে মগধ থেকে। মগধের অনেক ছেলে মূল আশ্রমে আছে। কচীক পরে এসেছে বলে তাকে দম্যক বনে আসতে হল বলে সে প্রথমে খুব মনমরা হয়ে ছিল। কারণ বন্ধুরা সবাই ভাগীরথী তীরের মূল আশ্রমে। তাছাড়া ওই স্থানটি জনস্থান মধ্যবর্তী কিন্তু দম্যক বন লোকালয় বর্জিত, গভীর অরণ্যের মধ্যে।

আচার্য সোমক অশ্বত্থামাকে বলেছিলেন, কচীক ছেলেটি বড় মনঃকষ্টে থাকে। সে সতীর্থদের সঙ্গে মিশতে পারছে না। তার মধ্যে একটু অবসাদ এসেছে। এরকম অনেক ছেলেদেরই হয়। দশ বৎসর বয়সে তারা বাবা-মাকে ছেড়ে তপোবনে চলে আসে। অনেকের মধ্যে অবসাদ দেখা দেয়। আপনি একটু স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে চেষ্টা করুন কেউ যেন বিচ্ছিন্নতাবোধে না ভোগে। তাদের বলুন, নতুন নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারাটাই জীবনের ধর্ম। বিচ্ছিন্নতা এক ধরনের অসুস্থতা। বিচ্ছিন্নতার বন্ধন থেকে ওদের মুক্ত করুন। ওদের শেখান সবার সঙ্গই জীবনের সার্থকতা। বিচ্ছিন্নতা আসলে একটি মনোবিকার। কেউই বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। সবাই সবার সঙ্গে যুক্ত। সবার মধ্যে সেই একই ব্রহ্ম বিরাজ করছেন। সর্বখল্বিদং ব্রহ্ম। এটি অনুভবের ব্যাপার।

অশ্বত্থামা বললেন, সবার মধ্যে সমান অনুভব শক্তি থাকে না আচার্য। বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন ধরনের রুচি, চিন্তা, ভাবনা। বৈচিত্রই জীবনের স্বাভাবিক ঘটনা।

আচার্য সোমক বললেন, সেই বিভিন্ন ভাবনার মধ্যে সেতুবন্ধ ঘটাবার জন্যই তো তপোবন শিক্ষা। বৈচিত্র্যের মধ্যে একটা ঐক্যবোধ সর্বত্র জাগরুক রাখা চাই। তপোবন শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য হল সবার মধ্যে একটি ঐক্যবোধ জন্মে দেওয়া।

অশ্বত্থামা উত্তরে বললেন, ঐক্যবোধ চাপিয়ে দিয়ে লাভ কী। তা আপনা-আপনি গড়ে উঠুক। বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যই তো প্রকৃত ঐক্য। সে ঐক্য তো স্বতস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠে। মহাচার্য বললেন, আর্যপুত্র, মানুষের প্রবণতাই হল বিচ্ছিন্নতা। সে সব সময় কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায়। বিচ্ছিন্ন হতে হতে সে নিজের মধ্যে নিজেই আটকে পড়ে। তখন নিজেকে শ্রেষ্ঠ ও বিশিষ্ট করার জন্য তার মধ্যে অহংকার দেখা দেয়। কোনো মানুষই স্বয়ং সম্পূর্ণ নয়, হতে পারে না। একটি ফুল দিয়ে মালা গাঁথা যায় না। আপনি নিজেকে দিয়েই বিচার করুন। আপনি আচার্য দ্রোণের একমাত্র পুত্র। পরিবারের মধ্যে বাবা-মা মাতুলের স্নেহচ্ছায়ায় মানুষ হয়েছেন। আপনার পিতা আপনাকে ছত্রের মতো সমস্ত উত্তাপ থেকে আপনাকে ঢেকে রেখেছিলেন। আপনি আপনাতে পূর্ণ বিকশিত হতে পারেননি। কারণ আপনার জীবনের কোনো সংগ্রাম নেই। আপনি সব হাতে হাতে পেয়েছেন। আর্যপুত্র, হাতা অতিথিদের ব্যঞ্জন পরিবেশন করে। কিন্তু সে নিজে খায় না। সে ব্যঞ্জনের স্বাদ কটূ, কষায়, মিষ্ট না লবণাক্ত তা বলতে পারবে না।

আপনি যৌবনে পদার্পণের সঙ্গে সঙ্গে রাজার রাজসৈন্যবাহিনীতে উচ্চপদে আসীন হয়েছেন। আপনার জীবন সংগ্রামের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। আর আপনি তো নিজেই আমায় বলেছেন আপনি ‘সহজ মণি’ মস্তকে নিয়ে জন্মেছিলেন। কর্ণ যেমন কবচকুণ্ডল নিয়ে জন্মেছিলেন। কর্ণের কবচকুণ্ডল আর আপনার মস্তকের মণি ছিল আপনাদের ক্ষমতার উৎস। আপনি নিশ্চিন্ত ছিলেন আপনার নিরাপত্তা সম্পর্কে। তাই আর কোনোদিকে তাকাননি। নিজের গর্ব-অহংকারের মধ্যে আপনি বড় হয়েছেন। আপনি যদি এই ছেলেদের মতো আশ্রমে থেকে বড় হয়ে উঠতেন, তাহলে আপনি আত্মবিচ্ছিন্ন হতেন না। আপনার আত্মানুসন্ধানও সম্পূর্ণ নয়। এই তপোবন থেকে আপনারও নতুন করে অনেক কিছু শেখার আছে আর্যপুত্র। কোনো মানুষেরই শিক্ষা সম্পূর্ণ নয়। আমারও নয়। আমি এই তপোবনে এসে এই অরণ্য পরিবেষ্টিত নির্জনতার মধ্যে প্রতিদিন নতুন করে শিখছি। কে শেখাচ্ছেন? ঈশ্বর। সেই পরম ব্রহ্ম। যাকে আমি নিয়ত অন্তরে অনুভব করি। তিনি আমার ছাত্রের বেশ ধরে এসে আমায় শেখান। কখনও আমার সহকর্মীদের বেশ ধরে এসে আমায় শেখান।

অশ্বত্থামার হৃদয়তন্ত্রীতে কথাটা বারবার বাজতে লাগল। কত অক্লেশে মহাচার্য ‘আমার ঈশ্বর’ কথাটা বলতে পারলেন। অশ্বত্থামা এমন করে ঈশ্বরকে আপন করে নিতে পারছেন না কেন? তিনি তো পাণ্ডব শিবিরে প্রবেশের সময় তাঁর ঈশ্বর মহাদেবের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তিনি তো তাঁকে পাণ্ডব তনয়দের হননের অনুমতিই শুধু দেননি, তাঁকে একটি খঙ্গ তুলে দিয়েছিলেন। তিনি যা করেছেন মহাদেবের অনুমতি নিয়ে। তবে কৃষ্ণের অভিশাপ মহাদেব প্রতিহত করলেন না কেন? সবাই বলে এমনকী পিতামহ ভীষ্মও বলেন কৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান। কিন্তু অশ্বত্থামা পিতৃহত্তার ষড়যন্ত্রকারীকে ভগবান বলে মানতে পারবেন না।

.

শ্রেণিকক্ষে অশ্বত্থামা যখন অথর্ববেদের প্রথম কাণ্ড পড়াচ্ছিলেন, তখন চতুর্থ সূক্তের ব্যাখ্যা করছিলেন। এই সুক্তে ঈশ্বরের ব্যাখ্যা আছে, ঈশ্বর কোথায় থাকেন? ভক্তের হৃদয়ে। পাপীর হৃদয় কিন্তু ঈশ্বর বর্জিত। পাপীর সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ক নেই। জনগণ তপস্যার দ্বারা ঈশ্বরের পরমপদে অধিষ্ঠিত হন। তেমনি সকল অভীষ্ট পুরক ভগবানের স্থান ভক্তের হৃদয়ে।

ইদং অনাসো বিদ
মহদ ব্রহ্ম বদিষ্যতি।
ন তৎপৃথিবীব্যাং নো দিবি
যেন প্রাণান্ত বীরুষঃ

হে প্রার্থনাকারী জনগণ, তোমরা এ সত্য জানো—সত্যই মহৎ ব্রহ্মকে জানিয়ে দেয়। সে ব্রহ্ম কিন্তু এই পৃথিবীতে থাকেন না, ‘দিবি’ তথা স্বর্গেও থাকেন না। তিনি পুরুষের প্রাণের মধ্যে বাস করেন।

অশ্বত্থামার বলতে বলতে চোখ বুজে এল। তিনি বললেন, দেখো পঞ্চম সুক্তে অগ্নিগর্ভ বলে একটি শব্দ আছে—

যা অগ্নিগর্ভং দদিয়ে সুবর্ণান্তা
ন আপঃ শং স্যোমা ভবনু।’

যে দেবতা জ্ঞানাগ্নিকে আপন গর্ভে ধারণ করেন, যিনি শোভন বর্ণ যুক্ত জনহিত সাধক শুদ্ধ সত্ত রূপ—শুদ্ধ সত্তা বিশিষ্ট দেবতা, তিনি আমাদের শান্তি ও সুখ দান করুন। শান্তি ও সুখের প্রার্থনার জন্য আমাদের এই মন্ত্র। যুদ্ধের অবসান হলে নিশ্চয়ই তা শান্তি। কিন্তু মনের শান্তিই প্রকৃত শান্তি। তোমরা এখন থেকে মানসিক শান্তির জন্য সচেষ্ট হও।

ছাত্রদের মধ্যে একটি ছাত্র অপেক্ষাকৃত চঞ্চল। তার আয়ত চক্ষু প্রমাণ করে সে বুদ্ধিমান। সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, গুরুদেব, একটা প্রশ্ন করব। আপনি কুপিত হবেন না তো?

অশ্বত্থামা কৌতূহল ভরে জিজ্ঞাসা করলেন, মোটেই নয়। মাভৈ। তার আগে বলো, তোমার নাম কী?

বালক বলল, আমার নাম কচীক দেবশর্মা। আমি মগব থেকে আসছি। আমার প্রশ্ন, শৈশব থেকে আমরা পঞ্চপাণ্ডব, কর্ণ, মহারাজ দুর্যোধন ও আপনার পিতা ও আপনার বীরত্বের কথা শুনে আসছি। আপনাকে আমাদের আচার্য হিসাবে পাব ভাবিনি।

অশ্বত্থামা বললেন, তোমার প্রশ্নটি কী বলো।

কচীক বলল, আপনি কী কখনও কোনো দেবতাকে দর্শন করেছেন?

অশ্বত্থামা বললেন, আমার দেবতা মহাদেব। তাঁর প্রসাদে আমার জন্ম। আমার পিতা তাঁকে দর্শন করেছেন। আমি তাঁকে একবারই দেখেছি কিন্তু তাঁর শুদ্ধসত্ত্ব রূপে নয়—করাল রূপে। তিনি তো সংহারেরও দেবতা। সংহারের রূপেই তাঁকে দেখেছিলাম।

—আপনি অন্য দেবতাকে দেখেননি? শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে তো আপনার পরিচয় ছিল। কচীক বলল।

অশ্বত্থামা বললেন, যিনি মহাদেবের করুণা পেয়েছেন, তিনি অন্য কোনো দেবতাকে মানেন না। দেবাদিদেব মহাদেব অনিত্য ব্যক্ত ও অব্যক্ত। তিনি এক ও বহু। তিনি সকল কারণের কারণ। তিনিই সৃষ্টিকর্তা। তাঁর আদি নেই, অন্ত নেই। তিনি অচিন্ত্যনীয় জ্ঞানস্বরূপ ঐশ্বর্যসম্পন্ন ও পরমাত্মা। তিনি কোনো বীজ হতে উৎপন্ন হননি। কিন্তু তাঁর থেকেই সমস্ত বীজ উৎপন্ন হয়েছে। তাঁকে জানলে শোক-তাপ ত্রিরোহিত হয়ে যায়। তুমি কৃষ্ণের কথা বলছ। কৃষ্ণই তো মহাদেবের বরে বরীয়ান। কৃষ্ণই মহাদেবকে স্তব করে বলেছিলেন, ‘তুমিই ব্রহ্ম, রুদ্র, বরুণ, অগ্নি, মনু, ভব, ধাতা, বিধাতা ও সূর্য স্বরূপ। তোমা থেকেই স্থাবর জঙ্গম সমুদয় প্রাণীর সৃষ্টি হয়েছে। তুমি এই চরাচর ত্রিলোকের সৃষ্টি করেছ। মহর্ষিগণ তোমাকে সমুদয় মন পঞ্চপ্রাণ ও সপ্ত অগ্নির স্বরূপ এবং ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবা ও স্তবযোগ্য দেবতা হিসাবে শ্রেষ্ঠ। তুমি সমুদয় বেদ বেদজ্ঞ, সোমরস দক্ষিণা, অগ্নি ঘৃত যজ্ঞপ্রকরণ দ্রব্য, দান, অধ্যয়ন, ক্রোধ, লোভ, মন ও মৎসর স্বরূপ। তুমি সর্বভূতের হৃদয়ের জীবাত্মা।’ এই বলে মহাদেবকে স্তব করেছিলেন কৃষ্ণ। তখন মহাদেব কৃষ্ণকে বলেন, ‘আমি তোমার স্তবে সন্তুষ্ট হয়েছি। তুমি আমার কাছে আটটি বর প্রার্থনা করো।’ কৃষ্ণ কী কী বর চেয়েছিলেন জানো? ধর্মের দৃঢ়তা, রণস্থলে শত্রুনাশের ক্ষমতা, পরম যশ, বল, যোগ, লোকপ্রিয়তা আর মহাদেবের সন্নিকর্ষ ও অসংখ্য পুত্র। মহাদেব কৃষ্ণের প্রার্থনা শুনে বললেন, ‘বাসুদেব, তুমি যা প্রার্থনা করলে আমার বরে তুমি সবই পাবে।’ তখন মহাদেবপত্নী ভবানী কৃষ্ণকে বললেন, ‘শঙ্করের বরে তোমার ইচ্ছা অনুসারে শত পুত্র হবে। তুমি উৎকৃষ্ট ভোগ করবে। তুমি এবার আমার কাছে আরও আটটি বর চাও। আমি তোমায় প্রসন্ন মনে তা দেব।’ কৃষ্ণ তাঁর কাছে বললেন, ‘বেশ, আমাকে বর দিন—ব্রাহ্মণসুলভ প্রসন্নতা, পিতার অনুগ্রহ, শত পুত্র, উৎকৃষ্ট ভোগ, কুলানুরাগ, মাতার প্রসন্নতা, মানসিক শান্তি ও কার্যে পুণ্য।’ পার্বতী বললেন, ‘তথাস্তু। এছাড়াও তুমি অমর হবে। সত্যানুরাগী হবে। তোমার ষোলো হাজার পত্নী হবে। তুমি বন্ধুদের প্রীতি ও মনোহর শরীর পাবে। তুমি চির সুদর্শন থাকবে।

অশ্বত্থামা তাঁর বক্তব্য শেষ করে বললেন, বৎসগণ, তাহলে দেখলে তো কৃষ্ণের যা কিছু তেজ, যা কিছু বল, তা মহাদেবের বরে। একটা কথা তোমরা সব সময় মনে রাখবে, মানুষ হয় সৌভাগ্য নিয়ে জন্মায়, না হয় কোনো দেবতার আশীর্বাদ কিংবা বরে সে সৌভাগ্য অর্জন করে। মানুষের দুর্ভাগ্যও তাই। হয় বিধি নির্দিষ্ট, না হয় কারও অভিশাপের ফল। কচীক বলল, তাহলে তো দেবতার বর ছাড়া বা দৈব ছাড়া মানুষ এক পাও চলতে পারবে না। তাহলে আমরা এত কষ্ট করে জ্ঞান অর্জন করছি কেন?

অশ্বত্থামা বললেন, জ্ঞান তোমাকে দুঃখ সহ্য করার শক্তি দেবে। যারা কৃষ্ণের মতো দেবাদিদেবের আশীর্বাদ পায়নি অথবা কোনো দেবতার অভিশাপ পেয়েছে, তাদের অভিশাপ উপেক্ষা করেই বেঁচে থাকতে হবে। আর সেই উপেক্ষার শক্তি অর্জন করতে সাহায্য করবে জ্ঞান ও কর্ম। জ্ঞান তোমাকে আসক্তি বর্জন করতে শেখাবে। কর্ম তোমাকে দেবে আত্মশক্তি।

অশ্বত্থামা কথা বলতে বলতে দেখলেন ছেলেটি তাঁর কথা শুনছে না। সে বাইরের প্রকৃতির দিকে একমনে তাকিয়ে আছে। অশ্বত্থামা বললেন, বৎস কচীক, তুমি আজ সন্ধ্যায় প্রার্থনার পর আমার সঙ্গে আলাদা করে দেখা কোরো। তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে। আজ আমাদের পাঠ এখানেই শেষ হল।

অপরাহ্ণে অশ্বত্থামা যখন আশ্রমের নুড়িবিছানো পথ ধরে পদচারণা করছিলেন, সে সময় দেখলেন কচীক সলজ্জ ভঙ্গিতে একটি আমগাছের নীচে দাঁড়িয়ে আছে। অশ্বত্থামা তাকে দেখে এগিয়ে গেলেন। শিষ্টচার অনুসারে কচীক অশ্বত্থামাকে চরণ ছুঁয়ে প্রণাম করল। অশ্বত্থামা তার মাথায় হাত স্পর্শ করে বললেন, আয়ুষ্মান ভব।

—কচীক, তোমাকে ডেকেছিলাম এই কারণে আচার্যরা সবাই বলছেন, তুমি নাকি উদাসীন হয়ে পড়ছ। অধ্যয়নে মন দিচ্ছ না। তুমি সুদূর মগধ থেকে এসেছ। কতদূর থেকে বিদ্যাচর্চার জন্য তোমাকে তোমার পিতা মহর্ষির আশ্রমে নিয়ে এসেছেন। তোমার বেদচর্চার মন নেই কেন? তোমাকে এক একটি করে বেদ কণ্ঠস্থ করে চতুর্বেদী হতে হবে। তবেই তো তুমি পণ্ডিত সমাজে স্বীকৃতি পাবে।

কচীক বলল, গুরুদেব, আমার আশ্রমে থাকতে ভালো লাগে না। বাড়ি যাবার জন্য মন কেমন করে। আমার পিতা দু’ বছর আগে আমাকে মহর্ষির কাছে পৌঁছে দিয়ে সেই যে চলে গেলেন, অদ্যাবধি তাঁর আর কোনো সংবাদ পাইনি।

—বাড়িতে তোমার কে কে আছেন?

—আমাদের বৃহৎ পরিবার। আমার বাবার চার পত্নী। আমি তাঁর জ্যেষ্ঠপত্নীর সন্তান। আমরাই সব মিলিয়ে দশজন ভাইবোন। এছাড়া আমার পিতৃব্যদের ছেলে-মেয়েরা আছে। তাদেরও বহু বিবাহ। আমাদের বাড়িতেই পঁচিশজন শিশু। আমরা সবাই একসঙ্গে খেলাধুলা করে বড় আনন্দে ছিলাম। আমাদের পরিবারের ভূসম্পত্তি আছে। আমার পিতার অনেক যজমান আছে। তিনি ‘ধর্মগুরু’ বলে পরিচিত। মহর্ষি ব্যাসের কাছে যৌবনে দীক্ষা নিয়ে গুরুগিরি করেন। তাঁর ইচ্ছা আমিও ভবিষ্যতে তাঁর উত্তরাধিকারী হই। কিন্তু আমার যজন যাজন ভালো লাগে না। বেদচর্চাও নয়।

—তবে তুমি কী চাও?

—আমি আপনার মতো অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষা করতে চাই। আপনার পিতা প্রমাণ করেছেন ব্রাহ্মণরা ইচ্ছা করলে শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর হতে পারে। আপনিই তো তা হয়েছেন।

অশ্বত্থামা বললেন, আমার পিতা বলতেন, গুণ অনুসারে কর্ম বিভাগ হয়। কর্ম অনুসারে বর্ণের সৃষ্টি। কিন্তু একবার কর্ম বিভাগ হয়ে গেলে সেই গুণ বর্ণ তার পরিবারে বর্তায়। এক একটি জাতির এক একটি কর্মে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এর সুফল হচ্ছে বংশগতভাবে দক্ষতা পিতা থেকে সন্তানে গিয়ে বর্তায়। কিন্তু শিক্ষা শিক্ষণেরই ফলশ্রুতি। তবে প্রবণতা ছাড়া কোনো শিক্ষায় দক্ষতা জন্মায় না। পিতার শৈশব থেকে অস্ত্র চালনায় প্রবণতা ছিল তাই তিনি ক্ষাত্রধর্ম, যুদ্ধবিদ্যা সহজেই আয়ত্ত করতে পেরেছিলেন। আমারও ছোটবেলা থেকে অস্ত্রশিক্ষায় প্রবণতা ছিল। তাই পিতা আমাকে সে শিক্ষা দেন। বেদচর্চাও আমার রক্তের মধ্যে ছিল। এটি আমাদের বংশ পরম্পরার উত্তরাধিকার। যাকে আমরা বলি জাতকর্ম। কিন্তু তোমার পিতা একজন ধর্মগুরু। তিনি তো শাস্ত্রজ্ঞ। তবে তুমি উত্তরাধিকার সূত্রে শাস্ত্রজ্ঞান অর্জন করতে চাইছ না কেন?

কচীক বলল, আমার বাবা কিন্তু বেদজ্ঞ নন। তিনি বশীকরণ, মারণ, উচাটন, এইসব অলৌকিকত্বে বিশ্বাসী। তাঁর শিষ্যরা তাঁর অলৌকিক আচরণের জন্যই তাঁর কাছে আসে। তিনি প্রচুর অর্থ ও সম্মান পান। আধ্যাত্মিক ধর্মচর্চায় বা পাঠ-পঠন জ্ঞানচর্চায় তাঁর আগ্রহ নেই। আমার এই অলৌকিকত্বে বিশ্বাস নেই।

অশ্বত্থামা বললেন, আমি তোমাদের যে অথর্ববেদ পড়ানো শুরু করেছি, তাতে বিশটি কাণ্ড আছে। সবে তো প্রথম কাণ্ড শুরু করেছি। দেখবে অথর্ববেদ এই বশীকরণ, ও লৌকিক জীবনের নানা সমস্যা, সংকট ও অভিঘাতের চর্চাতেই ব্যয় করেছে। বিষ চিকিৎসা, শত্রু নিবারণ, এমনকী স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের প্রতি ক্রোধ নিবারণ, সর্পভয়, বৃশ্চিকভয় নিবৃত্তি, রাক্ষস-পিশাচ নিবারণ থেকে বিবাহের মন্ত্র সবই অথর্ববেদে আছে। অথর্ববেদে কর্মকাণ্ডই বেশিরভাগ জুড়ে। বিশেষ করে নানা রোগ-ব্যাধির চিকিৎসা থেকে শুরু করে শবদাহের অন্ত্যেষ্টি, যাবতীয় নিত্যকর্মের বিধান রয়েছে অথর্ববেদে। বেদের জ্ঞানকাণ্ড নিখাদ বুদ্ধি ও মননের চর্চা। সে চর্চা মনস্বীরা, সাধকেরা করুন। কিন্তু তোমার পিতার মতো অথর্ববেদীদের প্রয়োজনই তো সমাজে বেশি। অথর্ববেদ ঈশ্বর ও ধর্মকে লৌকিক ক্রিয়াকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এটি বেদের প্রায়োগিক দিক। আমাকে যদি বেদান্ত ভালো করে পড়াতে বলা হয়, আমি পারব না। আমি ব্যক্তিগত জীবনে খুব একটা অনুভবপ্রবণ নই। আমি বাস্তববাদী, সমস্যার দ্রুত সমাধানের পথ খুঁজি। যুদ্ধবিদ্যার মধ্যেও আমি দ্রুত ফলাফল খুঁজি। আশ্রমে রাজনৈতিকচর্চা নিষিদ্ধ। তবু তোমাকে বলি, আমি তো যুদ্ধবিদ্যায় এক নতুন পথ উদ্ভাবন করেছি—তার নাম সন্ত্রাসবিদ্যা। অতি দ্রুত যাতে শত্রু বিনাশ হয়।

—সেটি কী—এটি কি বেদে আছে?

—না বৎস। বেদে শুধু আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মতত্ত্ব, প্রার্থনা, মন্ত্র, এইসব আছে। আর আছে লৌকিক জীবনের নানা সমস্যার কথা। অথর্ববেদ তো অর্বাচীন। ঋক, যজুর্বেদ মানে তো শুধু যজ্ঞ আর আহুতি। কে কত ঘৃত আহুতি দিল, কত সমিধ ব্যবহার করল, আর অপার্থিব বিষয় নিয়ে তর্ক-যুদ্ধ করে বিপক্ষকে পরাজিত করল, তাই নিয়ে ঋষিদের বৌদ্ধিচর্চা। আমি কিন্তু খুবই বাস্তববাদী। তাই মনে করি যুদ্ধজয়ের সহজ প্রকৌশল ও অর্বাচীন বেদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। সেটি হল আমার এই ‘সন্ত্রাসবিদ্যা’।

তুমি যদি যুদ্ধবিদ্যায় আগ্রহী হও তাহলে প্রথাসিদ্ধ যুদ্ধ শিখে কী করবে? সন্ত্রাসবিদ্যা শত্রুকে তার অসতর্ক মুহূর্তে আক্রমণ করে তাকে বিনাশ করতে শেখায়। যুদ্ধ হবে সর্বত্র—শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়। শত্রুর সমস্ত সম্পত্তি এক একটি অতর্কিত আক্রমণে ধ্বংস করে ফেলতে হবে।

পিতামহ ভীষ্ম বলেন, শত্রুকে যে করে হোক বিনষ্ট করতে হবে। তীক্ষ্ণদত্ত পতঙ্গ যেবন বৃক্ষের সমুদয় ফল-পুষ্প ছিন্নভিন্ন করে দেয়, তেমনি শত্রুর সমস্ত পুরুষার্থ ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে হবে। মৎস্যঘাতী ধীবররা যেমন অসংখ্য মৎস্যের প্রাণনাশ করে, তেমনি অনেকের প্রাণ বিনাশ না করলে কেউ মহতী শ্রীলাভে সমর্থ হয় না।’

ভীষ্ম বলেছেন, ‘কাউকে নিধন করার ইচ্ছা হলে তাঁকে প্রিয় বাক্য বলবে। তার শিরচ্ছেদ করেও তার জন্য কান্নাকাটি করবে। বাইরে শোক দেখাবে। রাজার কাজ হচ্ছে শত্রুকে বিনাশ অর্থাৎ হত্যা করা, মার্গদূষণ (শত্রুর আগমন এ নির্গমনের পথ অচল করে দেওয়া), পররাষ্ট্র ধ্বংস করে দেওয়া। শত্রুর শেষ না করে ছাড়বে না। শত্রুর মাথা কেটে ফেলতে হবে। তাকে শুধু মারধর করে ছেড়ে দেওয়া নিতান্ত নিরর্থক।’*

[* মহাভারতে শান্তিপর্বে শত্রু দমনের জন্য ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে ‘যুগোচিত’ এই সব ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন।]

কথা বলতে বলতে অশ্বত্থামা সম্পূর্ণ অন্য মানসলোকে চলে গিয়েছিলেন। হঠাৎ চোখে পড়ল দূরে আচার্য সোমক দাঁড়িয়ে কার সঙ্গে কথা বলছেন। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর মনে হল এসব কী কথা বলছেন তিনি। যে সব কথা আর উচ্চারণ করবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, তাঁর মুখ দিয়ে সেই গর্হিত ও নিষিদ্ধ বচন বেরিয়ে আসছে কেন?

তিনি দ্রুত সম্বিৎ ফিরে পেয়ে, বললেন, বৎস, আমি তোমায় এতক্ষণ যে সব কথা বললাম, তা আমার কথা নয়—এসব অশিষ্ট জনের কথা। তুমি এ নিয়ে আর কিছু প্রশ্ন কোরো না। তুমি শাস্ত্র ধরবে না অস্ত্র ধরবে, রাজনীতি করবে না রাজসৈন্যদলে যোগ দেবে, না পিতৃবৃত্তি গ্রহণ করবে, তা স্থির করার সময় এখনও আসেনি। তুমি মহর্ষির এই আশ্রমে পড়ার যে দুর্লভ সুযোগ পেয়েছ তার সদ্ব্যবহার করো। বেদজ্ঞ হও। দ্বাদশ বর্ষ পরে যখন তুমি গার্হস্থ্যাশ্রমে প্রবেশ করবে, তখন তুমি তোমার বৃত্তি বেছে নেবে। যার যা প্রবণতা তার সেই বৃত্তি বেছে নেওয়াই ভালো। তোমার সাফল্য নির্ভর করবে যেমন তোমার নিজের উৎকর্ষের ওপর, তেমনি তোমার নিয়োগকর্তার ওপরও। তিনি তোমাকে যেটুকু সুযোগ দেবেন তুমি সেটুকুই কৃতিত্বের সঙ্গে সমাপ্ত করতে পারো। এটি তোমার দায়বদ্ধতা। এই দায়বদ্ধতা থেকে কেউ মুক্তি পেতে পারে না। যে এই দায়বদ্ধতার মূল্য দেয় না, সে নিজের কাছেই নিজে পরাজিত হয়। কিন্তু আমার আরও প্রশ্ন, যে জন্য তোমায় ডেকেছি। তুমি সবাইকে এড়িয়ে চলো কেন, বিচ্ছিন্ন থাকো কেন?

কচীক বলল, আজ দু’ বছর বাবা-মা কারও সংবাদ পাই না। তাঁদের সঙ্গে আমার কোনো সংযোগ নেই। আমার বড় মন কেমন করে।

অশ্বত্থামা বললেন, তোমার পিতার নাম ও দেশের ঠিকানা আমায় দিও। আমি মহর্ষির মাধ্যমে তোমার পিতার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করব। আচ্ছা, তুমি মগধ থেকে কীভাবে এসেছ? পদব্ৰজে না শকটে?

–সে দু’ বছর আগের কথা। পিতা আমায় পাটলিপুত্র থেকে নৌকাযোগে নিয়ে এসেছিলেন। পক্ষকাল সময় লেগেছিল। পিতা বলেছিলেন তিনি বৎসরে একবার এসে দেখে যাবেন। কিন্তু আর আসেননি। ভাগীরথী তীরের মহর্ষির আশ্রমে মগধের আরও চারটি ছেলে থাকে। তারা আমার ভালো বন্ধু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখানে কেউ আমার বন্ধু নেই। এরা অনেকে আমায় ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে। আমার অনেক সময় মনে হয়, আমি এখান থেকে পালিয়ে যাই। কিন্তু আমি একা কোথায় যাব? আপনি আমায় মাঝে মাঝে যুদ্ধবিদ্যার কথা শোনাবেন। আমার মনেও হনন ইচ্ছা জাগে। মনে হয় সব কিছু ধ্বংস করে দিই। সবার আগে আমার স্নেহশীল পিতাকে হত্যা করতে ইচ্ছা করে। পিতাকে কোথায় আর পাচ্ছি। তাই মনে হয় আপনার সন্ত্রাসবিদ্যা শিখি। যাকে সামনে পাই, তাকেই নিধন করি।

অশ্বত্থামা তাড়াতাড়ি তার মুখ চাপা দিয়ে বললেন, চুপ চুপ। আমাকে যা বলেছ বলেছ, আর কাউকে একথা বোলো না। হিংসা অন্যায়। অহিংসা পরম ধর্ম। বলো সত্যমেব জয়তে, নানৃতং সত্যেন পন্থা বিততো দেবায়নঃ। মাতৃদেব ভব। পিতৃদেব ভব। কখনও ভয় পাবে না। আনন্দ করো। আনন্দের সন্ধান করো এই তপোবনের মধ্যেই। দেখো পাখিরা কত আনন্দ করছে। আকাশের মেঘের রঙ বদলাচ্ছে। আনন্দেরই নানা রকমের রঙ। এই আমগাছে দেখো না, ফলে ফলে ভর্তি করে গেছে। আর একমাসের মধ্যে এই বৃক্ষ পক্ক সুমিষ্ট ফল দেবে। সে তার একটিও নিজে খাবে না। সবই নিঃশেষে দিয়ে আনন্দ পাবে। নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার আনন্দেই দিতে শেখো।

আনন্দহ ব্ৰহ্মণো
বিদ্বান ন বিভেতি কদাচন।

আনন্দই ব্রহ্ম। বিদ্বান আনন্দ ও ব্রহ্মের মধ্যে কোনো ভেদ করেন না। নিজেকে সবার আগে ভালোবাসতে শেখো। তাহলে সবাইকে ভালো লাগবে।

আত্মনস্ত কামায় সর্বং
প্রিয়ং ভবতি।

নিজেকে ভালোবাসো, দেখবে সবাই তোমার প্রিয় হয়ে উঠছে।

এ এক অন্য অশ্বত্থামা। তিনি যে এই সব কথা বলবেন, তা কিছুক্ষণ আগে ভাবেননি। এটি কি তাঁর রূপান্তর? ভাবনার দ্রুত পরিবর্তন? ভাবনা নাকি বায়ুর চেয়ে দ্রুতগামী। তাঁর ভাবনা কি দ্রুত বদলাচ্ছে? রাতে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সেদিন অশ্বত্থামা সেই পেচকের স্বপ্ন দেখলেন। রাতের অন্ধকারে সেই বিশালকায় উলুকটি সামনের আম্রবৃক্ষের ডালে বসে পাখির বাসা ভেঙে ছোট ছোট অসংখ্য পক্ষীশাবককে গ্রাস করছে। তিনি দাঁড়িয়ে বিস্মিত নয়নে সেই হত্যাকাণ্ড দেখছেন। কে যেন বলছে, ‘দ্রোণপুত্র, আপনি চোখের সামনে দাঁড়িয়ে এই হত্যাকাণ্ড দেখছেন, কিছু করতে পারছেন না?’ চমকে ফিরে তাকিয়ে অশ্বত্থামা দেখলেন তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আচার্য সোমক

সোমক যেন বলছেন, আপনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই হিংসা দেখছেন? কিছু করতে পারছেন না?

—হিংসার বিরুদ্ধে আমি কী করতে পারি আচার্যদেব। আমি নিরস্ত্র। দর্শক হয়ে দেখা অথবা স্থান ত্যাগ করা ছাড়া আমার কিছু করার নেই।

মহাচার্য বলছেন, সবল যখন দুর্বলের ওপর হিংসা করে, তখন আর একজন সবলের উচিত দুর্বলের প্রাণ রক্ষা করা। আর্ত সাহায্যপ্রার্থীর জীবন রক্ষা করা। আপনি লগুড়াঘাতে হোক, ইষ্টক দিয়ে হোক, আক্রমণকারীকে বধ করুন। শান্তির অর্থ দুর্বলের ওপর অত্যাচার সহ্য করা নয়। আমাদের সব দেবতা অস্ত্রধারী। দেবাদিদেব শিব নিজেই শূলপাণি। আক্রমণকারীকে প্রতিরোধ করে দুর্বলকে রক্ষা করাই ধর্ম।

সন্ত্রাসীরা দুর্বলকে আক্রমণ করে। রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত জীবকে হত্যা করে। তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে মানুষকে বাঁচানো প্রতিটি মানুষের অধিকার। আপনি আক্রমণকারী পেচককে হত্যা করুন। দুর্বল পক্ষীকুলকে বাঁচান।

অশ্বত্থামা তবু ইতস্তত করেন। -আমি বিভ্রান্ত মহাচার্য। আমি কী করব বুঝতে পারছি না। আমি তো অহিংসার মন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছি।

—গোপন হিংসাকে প্রতিরোধ করার জন্য হিংসার আশ্রয় নেওয়া, হিংসা নয়—আত্মরক্ষা।

—কিন্তু হিংসা দমন, শান্তিরক্ষা, এ তো রাজার দায়িত্ব।

—আত্মরক্ষা প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব। দুর্বল আত্মরক্ষা করতে পারে না। সেক্ষেত্রে যে কেউ সবল তার পাশে দাঁড়াতে পারে। রাষ্ট্রের দায়িত্বও প্রজাপালন। প্রজা বিপন্ন হলে রাষ্ট্রও হিংসার আশ্রয় নিয়ে হিংসা দমন করতে পারে। দমন করা উচিতও।

—কিন্তু আপনি যে বলেন, যুদ্ধ করা মানে হিংসা। যুদ্ধ কখনও শান্তি আনতে পারে না। হিংসা দিয়ে হিংসা বন্ধ করা যায় না।

—সে রাজায় রাজায় যুদ্ধের বেলায়। পরাক্রম দেখানোর জন্য একটি রাষ্ট্র তার দুর্বল প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে আক্রমণ করে। সেই আক্রমণ নিন্দনীয়। কিন্তু সেই দুর্বল রাষ্ট্রেরও আত্মরক্ষার অধিকার আছে। কিন্তু এখানে দেখছেন পেচকটি দুর্বল নিরীহ প্রাণীদের হত্যা করছে। এখানে আপনাকে হিংসা দিয়েই পেঁচককে নিবৃত্ত করে দুর্বলদের বাঁচাতে হবে। এই নিন, এই লোষ্ট্রখণ্ডগুলি দিয়ে আপনি আক্রমণকারী উলুকটিকে প্রহার করুন। তাকে নিধন করুন।

আচার্য অশ্বত্থামার হাতে একটি প্রস্তরখণ্ড তুলে দিলেন। মহাবাহু দিয়ে অশ্বত্থামা পেচকটিকে লক্ষ্য করে সেই প্রস্তরখণ্ড নিক্ষেপ করলেন। তাঁর লক্ষ্য ব্যর্থ হল না। পেচকটির ক্ষত-বিক্ষত দেহ মাটিকে পক্ক ফলের মতো ঝরে পড়ল। মহাচার্য তাকে আলিঙ্গন করে জড়িয়ে ধরে হঠাৎ বলে উঠলেন, আর্য, আপনার গায়ে এত উত্তাপ কেন? মনে হচ্ছে যেন তপ্ত কটাহে হাত পড়ল। আপনার শরীর কুশল তো?

অশ্বত্থামা বললেন, আমি সুস্থ আছি আচার্য। এই তপোবনে এসে আমি নতুন জীবন ফিরে পেয়েছি। আমি কৃষ্ণের অভিশাপ পরাহত করব। আমি চিরঞ্জীবী, মহাচার্য। এই তপোবনকে আমি শান্তিবন করে তুলব। এই বিদ্যালয়কে আমি মহা বিদ্যায়তনে পরিণত করব। আমি সুস্থ আছি মহাচার্য। আপনি আমার জন্য চিন্তা করবেন না।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। সহ আচার্য শারদ্বত তাঁকে প্রতিদিনের মতো গায়ে হাত দিয়ে ডাকছেন। রাত্রির তৃতীয় প্রহর। আশ্রমিকদের নিদ্রাভঙ্গের সময় হয়েছে। গাছে গাছে পাখিরা কূজন শুরু করে দিয়েছে।

অশ্বত্থামা ঘুম থেকে উঠে নিজের গায়ে হাত দিয়ে দেখলেন তাঁর কপাল উষ্ণ বোধ হচ্ছে। অন্যদিনের মতো আজ নিজেকে সতেজ মনে হচ্ছে না।

.

প্রার্থনা শেষ করে প্রাতরাশ খেয়ে অশ্বত্থামা একটি বৃক্ষের বেদিতলে বসলেন। প্রভাতের স্নিগ্ধ বাতাস বইছে। মহাচার্য ফুলের গাছে জল সিঞ্চন করছেন।

অশ্বত্থামার মনে হচ্ছে তিনি আজ অবসন্ন। মাথার ভেতর একটা যন্ত্রণা। ভেবেছিলেন প্রভাত সমীরে তা প্রশমিত হবে, কিন্তু তা হল না।

শারদ্বত দুটি কলস হাতে করে ছুটে এলো। –আচার্য চলুন, আমরা রওয়ানা হয়ে যাই। আজ আমাদের পানীয় জল আনার দিন। আপনি কি বিস্মৃত হয়েছেন?

অশ্বত্থামা লজ্জিত হয়ে বললেন, আমার শরীরটা সকাল থেকে ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে দেহে উত্তাপ বেড়েছে। হয়তো প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের ফল এটি। চলো, যাওয়া যাক।

অশ্বত্থামা উঠতে গিয়ে উঠতে পারলেন না। তিনি এত পরিশ্রান্ত বোধ করলেন যে আবার বসে পড়লেন।

শারদ্বত বললেন, আচার্য, আপনাকে দেখে কেমন যেন বোধ হচ্ছে। দেখি আপনার গাঁ। কপালে হাত দিয়ে শারদ্বত চমকিত হলেন। —আপনার গা তো পুড়ে যাচ্ছে। আপনি যে অসুস্থ, তা তো বলেননি। এই অবস্থায় আপনি কি করে পানীয় জল আনতে অতদূর যাবেন?

অশ্বত্থামা বললেন, আমি ঠিক পারব। তুমি ও নিয়ে চিন্তা কোরো না। একটু না হয় ধীরে চলব। কিন্তু পানীয় জল না এলে এতগুলো মানুষ পান করবে কি?

শারদ্বত বলল, না না, তা হয় না। এই অসুস্থ অবস্থায় আপনাকে দিয়ে আমি শ্রমসাধ্য কাজ করাতে পারি না। আমি মহাচার্যকে বলছি। আজ না হয় ছাত্রেরা পানীয় জল আনবে।

মহাচার্য সোমক শুনে তাড়াতাড়ি ছুটে এসে অশ্বত্থামাকে পরীক্ষা করে বললেন, হ্যাঁ, সত্যিই আপনি অসুস্থ। আপনি আজ পুরোপুরি বিশ্রাম করুন। আমাদের মধ্যে একজন ভিষকের কাজ জানেন। তিনি আপনাকে ঔষধ দেবেন। শারদ্বত, তুমি চারজন ছাত্রকে বেছে নিয়ে তাদের জল আনতে পাঠিয়ে দাও।

ছাত্রদেরও সপ্তাহে প্রতিদিনই পানীয় জল আনতে যেতে হয়। আচার্যরা যেমন দুটি করে বড় কলস বহন করেন, ছাত্রদের জন্য চারটি ছোট মাটির কলস আছে। তারা প্রত্যেকে একটি করে কলস নেয়। এতে তারা অভ্যস্ত।

শারদ্বত চারজন ছাত্রকে নির্বাচিত করলেন। ভরদ্বাজ, হিরণ্যবাহু, ভূতপতি—চতুর্থ একজনকে খুঁজছিলেন, কচীক কাছেই ছিল। সে এগিয়ে এসে বলল, গুরুদেব, আমি যাব। ছাত্রদের মধ্যে ভরদ্বাজ একটু সপ্রতিভ। বয়সেও সে একটু বড়। সে বলল, তুই কি পারবি? আগে তো কোনোদিন যাসনি। সে অনেক দূর পথ।

কচীক বলল, আমাকে তো এর আগে কোনোদিন এই কাজে পাঠানো হয়নি। সব সময় তোরা বলেছিস আমি পারব না। কিন্তু গুরুদেব আজ আমি নিজে আপনার সামনে বলছি, আমায় পাঠিয়ে দেখুন। আমি পারব।

শারদ্বত বললেন, কচীক, আমি খুব খুশি হয়েছি তুমি স্বউদ্যোগী হয়ে যেতে চাইছ। তুমি সর্বকনিষ্ঠ বলে তোমাকে এই শ্রমসাধ্য কাজে নিযুক্ত করা হয়নি। তুমি যখন বলছ পারবে, নিশ্চয়ই পারবে। সব কাজে তোমাকে এগিয়ে এসে বলতে হবে, আমি পারব। এটাই নেতৃত্বগুণ। সমস্ত দুরূহ কাজ স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসে করলে তোমার মনোবল বাড়বে, কর্মক্ষমতাও বেড়ে যাবে।

অশ্বত্থামা বাতায়ন দিয়ে দেখলেন চারটি বালক গল্প করতে করতে বনপথ ধরে চলে যাচ্ছে। যে পথ ধরে তাঁর ও শারদ্বতের আজ যাবার কথা ছিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *