প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পর্ব : সত্যমেব জয়তে

দ্বারকার পথে

দ্বারকার পথে

পরদিন সকালে আশ্রমের পরিচারক অশ্বত্থামাকে প্রাতরাশ দিতে এসে দেখেন ঘর শূন্য। ভাবলেন, অশ্বত্থামা বুঝি প্রাতভ্রমণে বেরিয়েছেন।

সমাবর্তন উৎসব শুরু হয়ে গিয়েছে। তাঁকে নিয়ে যাবার জন্য মহাচার্য সোমক নিজেই তাঁর ঘরে এসে দেখলেন ঘর তখনও শূন্য।

ব্যাসদেবের কথামতো সেদিন ভোর হবার আগে অশ্বত্থামা একবস্ত্রে দম্যক তপোবন ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন দ্বারকার উদ্দেশে। দ্বারকায় তিনি বহু বছর আগে একবার গিয়েছিলেন, তখন তিনি যুবক। সেবার তিনি গিয়েছিলেন সুসজ্জিত রথে। এবার তিনি পদব্রজে বেরিয়ে পড়লেন। প্রথমে ভেবেছিলেন, পারবেন না। গত ৩৬ বছর ধরে তিনি আশ্রমের বাইরে যাননি। যদিও তিনি রাজব্যাধি যক্ষ্মা থেকে মুক্ত হয়েছেন। কিন্তু তাঁর সর্বাঙ্গে বিস্ফোটক। সেগুলি সবসময় যন্ত্রণা দেয়। তারপর তিনি দীর্ঘকাল গৃহবন্দি। পদব্রজে এই দীর্ঘপথ তিনি অতিক্রম করতে পারবেন কি?

কিন্তু দ্বারকার কাছাকাছি জামনগরীতে এসে তাঁর মনে হল, মানুষের প্রবল ইচ্ছাশক্তির কাছে সমস্ত বাধাই নির্মূল হয়ে যায়। তিনি পারলেন। এই দীর্ঘপথ পরিক্রমায় পরিব্রজক তীর্থযাত্রী ব্রাহ্মণ হিসাবে তিনি সর্বত্র আতিথেয়তা পেয়েছেন। কখনও পান্থশালায়, কখনও স্থানীয় মানুষের গৃহে থেকেছেন। কোথাও এক রাত্রির বেশি বাস করেননি। কারণ লক্ষ্যে পৌঁছতে তাহলে বিলম্ব হয়ে যাবে। কখনও সৌজন্য দেখিয়ে যাত্রীবাহী শকট চালক তাঁকে তুলে নিয়েছে। অবশেষে জামনগরী পান্থাবাসে তিনি এসে শুনলেন দ্বারকা আর মাত্র দুদিনের পথ।

এই পান্থশালায় এসে তিনি দেখলেন পান্থশালায় প্রচুর শরণার্থীর ভিড়। কোথা থেকে আসছে তারা? আসছে দ্বারকা থেকে। দ্বারকা নাকি এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপন্ন নগরী। আর কিছুদিনের মধ্যে সমুদ্র প্লাবন নগরীকে গ্রাস করতে ধেয়ে আসছে। ভীত-এস্ত নাগরিকেরা তাই দ্বারকা ছেড়ে পালাচ্ছে।

অশ্বত্থামার মুখে চিন্তার ছায়া ঘনাল। দ্বারকাবাসীদের বিপর্যয়ের জন্য নয়। এই দুর্বিপাকের মধ্যে তিনি কীভাবে কৃষ্ণের দেখা পাবেন এবং দেখা পেলেও কীভাবে তাঁর কথাগুলো বলার সুযোগ পাবেন?

এই পাংশালায় এক শরণার্থীর সঙ্গে আলাপ হল। তাঁর নাম বললেন, সুদত্ত। তিনি এক প্রবীণ নাগরিক, দশজনের গোটা পরিবার নিয়ে দ্বারকা ছেড়ে বেরিয়েছেন। যাবেন পঞ্চনদ। সেখানে তাঁর এক ছেলে বাস করে। তার কাছে সবাই চলে যাচ্ছেন।

অশ্বত্থামা নিজের নাম গোপন করে সুদত্তকে বললেন, আমার নাম অশ্বরথ। আমি পরিব্রাজক সন্ন্যাসী। আসছি সুদূর ইন্দ্রপ্রস্থ থেকে। প্রভাস তীর্থে যাব। তার আগে দ্বারকায় কয়েকদিন থাকব।

সুদত্ত অবাক হয়ে বললেন, আপনি বোধহয় অবগত নন। দ্বারকা এখন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কবলে। এই বলে তিনি দ্বারকার বর্তমান বিপর্যয়ের কাহিনি অশ্বত্থামার কাছে তুলে ধরলেন। বললেন, যাদের বাইরে আত্মীয়স্বজন আছে, তারা সবাই দ্বারকা ত্যাগ করছেন। বিশ্বস্ত সূত্রে তিনি জানতে পেরেছেন, দ্বারকানগরী শীঘ্রই প্লাবিত হয়ে যাবে।

অশ্বত্থামা বললেন, আমি তো কিছুই জানতাম না। আপনি যা বলছেন, এ তো ভীষণ উদ্বেগের কথা। কিন্তু আমি দ্বারকা হয়ে প্রভাস তীর্থ যাব ঠিক করেছিলাম।

সুদত্ত বললেন, আপনি অন্য পথ ধরে প্রভাসে যান। দ্বারকায় প্রবেশ করবেন না। দ্বারকা এখন বিপর্যস্ত নগরী। এই বলে তিনি দ্বারকার বর্তমান অবস্থা এবং নাগরিকদের বিপন্নতার কথা সব খুলে বললেন।

অশ্বত্থামা বললেন, আমি যৌবনে একবার দ্বারকায় এসেছিলাম। তখন হস্তিনানগরের থেকেও দ্বারকা সুন্দর ছিল। কিন্তু কৃষ্ণ, যিনি দ্বারকার প্রতিষ্ঠাতা, তিনি এখন কোথায়?

সুদত্ত বললেন, কৃষ্ণ এখন দ্বারকাতেই আছেন। এই সেদিনও দ্বারকা অত্যন্ত ঐশ্বর্যশালী নগরী ছিল। কিন্তু এখন তা মৃত নগরী।

অশ্বত্থামা বারবার জানতে চাইছিলেন কৃষ্ণ এখন দ্বারকায় আছেন কি না। অশ্বত্থামা নিশ্চিন্ত হলেন কৃষ্ণ এখনও দ্বারকায় আছেন। দ্বারকা উৎসন্নে যাক, অশ্বত্থামার কিছু যায় আসে না। তিনি কৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে চান

সুদত্ত লোকটি বৃষ্ণিবংশীয়। কৃষ্ণের জ্ঞাতিদের অন্যতম। তাঁরা একদা মথুরায় থাকতেন। তাঁর শৈশবে জরাসন্ধের আক্রমণ থেকে বাঁচতে কৃষ্ণ মথুরাবাসীদের দ্বারকায় নিয়ে আসেন। শৈশবেও উদ্বাস্তু হয়ে তিনি দ্বারকায় এসেছিলেন। তাঁর চোখের সামনেই দ্বারকা প্রতিষ্ঠিত হল এবং একটি সেরা রাজ্যে পরিণত হল। সেই দ্বারকা ছেড়ে যেতে হচ্ছে এই বৃদ্ধ বয়সে।

সেদিন রাতে সুদত্ত অশ্বত্থামাকে কৃষ্ণকথা শোনালেন। অশ্বত্থামা কৃষ্ণকে দ্বারকার মুকুটহীন রাজা হিসাবেই দেখেছেন। দেখেছন একজন বীর ও যুদ্ধ বিশারদ হিসাবে। ক্ষত্রিয়রাই শুধু বীর হয় না—ব্রাহ্মণ ও যাদবেরাও বীর হতে পারে।

কৃষ্ণের প্রতি অশ্বত্থামার ঘৃণামিশ্রিত এক ধরনের শ্রদ্ধা আছে। কৃষ্ণ অসীম বীর, বিরাট সংগঠক, কুশলী রাজনীতিবিদ সব তিনি মানেন কিন্তু তিনি ভুলতে পারেন না। কৃষ্ণই তাঁর পিতার হত্যাকারীদের মন্ত্রণাদাতা। কৃষ্ণই তাঁকে অভিশাপ দিয়ে তার জীবন বিপর্যস্ত করে দিয়েছেন। আজ দু’মাস ধরে তিনি হাঁটছেন শুধু কৃষ্ণদর্শনের জন্য। দ্বারকা ডুবে যাক, আর আগে যেন তাঁর কৃষ্ণদর্শন হয়।

সুদত্ত খুবই সদালাপী ব্যক্তি। দেব দ্বিজে তাঁর অপরিসীম ভক্তি। তিনি জানতে চাইলেন, তিনি এত তীর্থ থাকতে প্রভাস তীর্থে যাচ্ছেন কেন?

অশ্বত্থামা বললেন, আমি দীর্ঘকাল চর্মরোগে ভুগছি। আমি শুনেছি প্রভাস তীর্থে গিয়ে সমুদ্রস্নান করলে চর্মরোগ সেরে যায়। আমি তো দ্বারকার বিপর্যয়ের কথা কিছু জানতাম না। তবে আপনার কথামতো আমি অন্য পথ ধরে প্রভাস গিয়ে পৌঁছব। আমি কৃষ্ণভক্ত। আপনি আমাকে কৃষ্ণকথা শোনান। কীভাবে কৃষ্ণ দ্বারকা প্রতিষ্ঠিত করে দ্বারকার অধিপতি হলেন একটু বলুন।

সুদত্ত বললেন, কৃষ্ণ কখনই দ্বারকার রাজা হননি। মথুরার রাজা উগ্রসেন কৃষ্ণের মাতামহ। তিনি দ্বারকা প্রতিষ্ঠিত হবার পর কৃষ্ণ তাঁকেই রাজা করেন। উগ্রসেনের কন্যা দেবকীর সঙ্গে বসুদেবের বিবাহ হয়।

অশ্বত্থামা বললেন, কংস কে? কৃষ্ণ যাকে নিধন করেছিলেন?

সুদত্ত বললেন, কংস উগ্রসেনের রূপবতী পত্নী পদ্মাবতীর অবৈধ পুত্র। সে এক ইতিহাস। রাক্ষসরাজ ভ্রমিল একদা পদ্মাবতীকে দেখে কামাসক্ত হন। তিনি উগ্রসেনের রূপধারণ করে পদ্মাবতীর সঙ্গে মিলিত হন। তাঁদের মিলনে অর্ধরাক্ষস কংসের জন্ম হয়। কংস যৌপনপ্রাপ্ত হয়ে উগ্রসেনকে বন্দি করে মথুরার রাজা হন। এ সময় তিনি দৈববাণী শোনেন, দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তান কংসকে বধ করবে। তখন ভীত হয়ে কংস দেবকী ও বসুদেবকে কারাগারে বন্দি করে রাখেন। একে একে তাঁদের সাতটি সন্তান হয়। কংস সাতটি সন্তানকে হত্যা করেন। অষ্টম গর্ভের সন্তান কৃষ্ণ যেদিন জন্মালেন, সেদিন ছিল এক দুর্যোগের রাত। বসুদেব নবজাতককে সন্তর্পণে কারাগার থেকে বৃষ্টির মধ্যে কোলে করে নিয়ে গিয়ে গোকুল গ্রামে নন্দ ঘোষের বাড়ি নিয়ে যান। নন্দর পত্নী যশোদা সে সময় এক কন্যার জন্ম দিয়েছেন। এই কন্যা ঈশ্বর প্রেরিত যোগমায়া। বসুদেব অচেতন যশোদার কোলে কৃষ্ণকে শুইয়ে রেখে সেই শিশুকন্যাকে নিয়ে আবার কারাগারে প্রবেশ করেন। কংস একটু পরেই দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তান মনে করে সেই কন্যাকে কেড়ে নিয়ে মাটিতে আছড়ে ফেলে হত্যা করেন। সেই কন্যা যোগমায়া অন্তর্হিত হয়ে কংসকে দৈববাণী শোনান, ‘তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে।’

কৃষ্ণ বড় হয়ে বৃন্দাবন থেকে মথুরায় গিয়ে কংসকে হত্যা করেন। মাতামহ উগ্রসেনকে কারাগার থেকে মুক্ত করে তাঁকে আবার মথুরার রাজা করেন। মথুরা রাজ্য আবার সুশাসিত হয়।

কিন্তু শ্বশুরের জামাতা জরাসন্ধ জামাতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবার জন্য বারবার মথুরা আক্রমণ করে মথুরার মানুষদের ওপর নির্যাতন চালাতে থাকে। তখন কৃষ্ণ মথুরা থেকে তাঁর রাজ্য সরিয়ে দ্বারকায় নিয়ে যান।

অশ্বত্থামা জানতেন, কৃষ্ণ খুবই সুচতুর এবং কৌশলী। তিনি নিজে রাজা হননি, কিন্তু সবাই জানে তিনি রাজা। তাঁর অঙ্গুলি হেলনেই উগ্রসেন চলেন।

অশ্বত্থামা জিজ্ঞাসা করলেন, আচ্ছা, সত্যি করে বলুন তো। দ্বারকার বিপর্যয় কি একমাত্র প্রাকৃতিক বিপর্যয়? আর কোনও বিপর্যয় নয়?

সুদত্ত বললেন, সেই সঙ্গে সামাজিক অবক্ষয় আছে। কৃষ্ণ চেয়েছিলেন মানুষের সুখী জীবন যাপনের জন্য বিলাস বিনোদনও দরকার। মুক্ত সমাজই সুখী সমাজ। তিনি তাই ঐহিক জীবনকে ভোগবর্জিত করতে বলেননি। মদ্যপানকেও বৈধতা দিয়েছিলেন। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার সুযোগ দিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন নারী স্বাধীনতার একটি আবশ্যিক শর্ত নারী ঘোমটা পরে গৃহবন্দি হয়ে থাকবে না। পুরুষের সঙ্গে সমান তালে হাঁটবে। নর-নারীর প্রেমের অধিকারও তাদের স্বাধিকার। কিন্তু দ্বারকাবাসী সীমারেখা টানতে শিখল না। এমন হয়ে উঠল মদ্যপান এখন জীবন সংস্কৃতি, উৎকোচ গ্রহণ যেন একটি শিল্প। কাজ না করে ভোগ ও বিলাস ব্যসনে নারী, পুরুষ, শিশু, সবাই মত্ত হয়ে উঠল। এখানে চারটি উপজাতি নিয়ে কৃষ্ণের যদুবংশ। বৃষ্ণি, অন্ধক, ভোজ আর কুকুর এই চারটি প্রধান উপজাতি নিয়ে যদুবংশ। আমরা সবাই কিন্তু যাদব। কিন্তু আমাদের গোষ্ঠীনেতারা কৃষ্ণের ‘কাছের মানুষ’। হবার জন্য প্রতিযোগিতা করছে। আমাদের গোষ্ঠীনেতারাই কার্যত রাজ্য শাসন করছে। এক গোষ্ঠীর মানুষ অপর গোষ্ঠীকে দেখতে পারে না। প্রায়ই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এখন আইন শৃঙ্খলার সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কৃষ্ণ স্ত্রী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি অবাধ মেলামেশায় আপত্তি করেননি। কৃষ্ণ নিজেও বলতেন কাজের সময় কাজ করো, বিনোদনের সময় বিনোদনে গা ভাসাও। উৎসবে মদ্যপান করো। কিন্তু বাকি সময় সংযমের জীবন যাপন করো। ইন্দ্রিয় পরতন্ত্র হয়ো না। কিন্তু মদ্যপানের ওপর বিধি নিষেধ তুলে দেওয়ায় লোকে মদ্যপানকেই প্রধান করে তুলল। দ্বারকায় নারী, পুরুষ, বালক, সবাই মদ্যপানে অভ্যস্ত। কৃষ্ণ তরুণদের সবার সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতে বললেন। কিন্তু জনসাধারণ সেই বাণী গ্রহণ না করে অগ্রজদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করতে লাগল।

অশ্বত্থামা বললেন, বলেন কী? কৃষ্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না?

সুদত্ত বললেন, কৃষ্ণ যাদবদের ঐক্যবদ্ধ করার বহু চেষ্টা করেছেন। তাঁর ছেলেরাই কেউ তাঁর যথার্থ উত্তরাধিকার গ্রহণ করতে পারল না। এখন তো ঋষিদের অভিশাপে যদুকুল ধ্বংস হয়ে যাবে। মহাপ্রলয় আসন্ন। দেখছেন না বহু সম্পন্ন নাগরিক দ্বারকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন!

—কোথায় যাচ্ছেন তাঁরা?

—পার্শ্ববর্তী যে কোনো রাজ্যে। অনেকে সুদূর কোশল-পাঞ্চালেও চলে যাচ্ছেন। শুনেছি দ্বারকা নাকি শীঘ্রই ধ্বংস হয়ে যাবে। এখন দ্বারকায় শ্রেণিভেদ, গোষ্ঠীভেদ পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শান্তি ও সমৃদ্ধির ফলে মানুষ ক্রমশ আলস্যপরায়ণ, কর্মবিমুখ ও ভোগবাদী হয়ে উঠেছে। তারা কিছু না করেই সমস্ত ভোগজসামগ্রী পেতে চায়। দেশে কেউ কর্মহীন নেই। কিন্তু কর্মে কারও উৎসাহ নেই। তারা কর্ম না করেই সব কিছু ভোগ করতে চায়।

অশ্বত্থামা মনে মনে পুলকিত হলেন। কৃষ্ণের মতো ব্যক্তিও তাহলে ব্যর্থ হন! রাজনীতি আর রাষ্ট্র শাসন দুটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বিষয়। শুধু দার্শনিক তত্ত্ব দিয়ে রাষ্ট্র শাসন হয় না। শাসককে নির্মম হতে হয়। কঠোর হতে হয়। প্রজারা ভয় করে শুধু তরবারিকে। রাজাজ্ঞা লঙ্ঘনকারীদের নির্মমভাবে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে তবেই বাকিরা ভয়ে বশীভূত হয়। প্রজাদের কখনও প্রশ্রয় দিতে নেই।

কৃষ্ণ আসলে একজন তত্ত্ববাদী, প্রজারঞ্জক। রাজধর্ম হল নিপীড়নের ধর্ম। শুধু শিষ্টের পালন নয়—শিষ্টদের মধ্যেও বিশিষ্টদের খুঁজে বার করতে হয়। শিষ্টের পালন মানে এই অনুগত বিশিষ্টদের পালন। অশিষ্ট মানে যারা প্রতিবাদী। যারা প্রতিবাদী, রাজ আজ্ঞা লঙ্ঘন করে, তাদের নির্মমভাবে সরিয়ে দেওয়াই রাজনীতি। কৃষ্ণের পক্ষে তা সম্ভব নয়। কারণ তিনি ভগবান, ভাবমূর্তিকে বাঁচিয়ে রাখতে চান। কিন্তু অশ্বত্থামা মনে করেন রাজার উচিত তাঁর ছায়াকেও বিশ্বাস না করা।

.

তিনদিন পর এক দ্বিপ্রহরে অশ্বত্থামা দ্বারকার তোরণদ্বারে পৌঁছে গেলেন। দ্বারকার তোরণদ্বারে সারি সারি বহির্মুখী শকট দাঁড়িয়ে আছে। শকটগুলি শিশু, নারী, বৃদ্ধে ভর্তি। যুবকেরা শকট থেকে নেমে তোরণ দ্বারে প্রহরীদের কার্যালয়ে গিয়ে অনুমতিপত্রের জন্য ভিড় জমিয়েছে।

প্রহরীরা তাদের ছাড়পত্র দিতে চাইছে না। তারা বলছে, এভাবে দ্বারকা ত্যাগ করে যাওয়া যাবে না। রাজা উগ্রসেন আদেশ দিয়েছেন, আগামীপরশু সমস্ত নাগরিকদের রাজার তত্ত্বাবধানে প্রভাস নিয়ে যাওয়া হবে। ব্যক্তিগতভাবে নাগরিকদের রাজ্য ত্যাগ নিষিদ্ধ।

এইভাবে নাগরিকদের সঙ্গে প্রহরীদের বিতণ্ডা চলছে। অবশেষে একটি রফায় আসলেন তাঁরা সবাই। বহির্গামী শকট পিছু প্রত্যেককে একশো স্বর্ণমুদ্রা দিতে হবে। এতে বেশ কিছু লোক স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে তাদের শকট অবাধে তোরণ পেরিয়ে মহাসড়কে গিয়ে মিলিয়ে গেল। যাঁদের অত অর্থ নেই, তাঁরা বাধ্য হয়ে তাঁদের বাড়ির দিকে শকটের গতি ঘোরালেন।

নগরে প্রবেশ করার সময় প্রহরীরা অশ্বত্থামাকে আটকাল।

—কে তুমি? কোথায় যাবে?

অশ্বত্থামা বললেন, আমি ব্রাহ্মণ সন্ন্যাসী এক চরণিক। তীর্থে তীর্থে ঘুরি। দ্বারকা পরিভ্রমণে এসেছি। দ্বারকা হয়ে প্রভাস তীর্থ যাব।

প্রহরী বলল, দ্বারকায় রাজা জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। কোনো বিদেশির আগমন নিষিদ্ধ।

—কী জন্য জানতে পারি প্রভু? আমি হস্তিনাপুর থেকে আসছি। সেনাপতি কৃতবর্মা আমার পুরাতন বন্ধু।

—তোমার কাছে কোনো অভিজ্ঞান আছে?

—আমি সন্ন্যাসী ব্রাহ্মণ। এই দেখুন আমার উপবীত। এই উপবীতই আমার অভিজ্ঞান।

প্রহরীরা তাদের অধ্যক্ষকে ডাকল। তিনি সব শুনে বললেন, আপনি এই সময় দ্বারকায় ঢুকবেন না বিপ্র। নগরীর অবস্থা ভালো নয়। দেখছেন না মধ্যাহ্নে অন্ধকার নেমেছে। রাস্তায় অসংখ্য মূষিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। অবাধে লুঠপাট চালাচ্ছে দুষ্কৃতীরা। আপনি বিকল্প পথ ধরে প্রভাসে চলে যান।

অশ্বত্থামা বললেন, আমার বন্ধু কৃতবর্মা, আমি ফিরে গেছি শুনে দুঃখিত হবেন। আমি যদি তাঁকে আপনার নামে অভিযোগ করি, আপনি কিন্তু ছাড় পাবেন না।

অধ্যক্ষ কী ভেবে বললেন, তাহলে আপনি নিজের ঝুঁকি নিয়ে চলে যান।

অশ্বত্থামা বললেন, ধন্যবাদ। আমি কৃতবর্মাকে আপনার সহৃদয়তার কথা বলব। আচ্ছা, দ্বারকায় রাত্রিবাসের কোনো ব্যবস্থা আছে? অতিথি আবাস অথবা পান্থশালা?

অধ্যক্ষ বললেন, এখান থেকে সোজা গেলে পথের ডানদিকে একটি পান্থশালা পাবেন।

অশ্বত্থামা এই পান্থশালায় উঠেছেন। কিন্তু নগরীর তোরণদ্বার থেকে পান্থশালা যাবার সময় নগরীর রূপ দেখে অবাক হয়ে গেলেন। একে তো সূর্যালোক নেই। ঘন কুয়াশার আস্তরণে আকাশ ছেয়ে গেছে। রাজপথে একটিও লোক নেই। শুধু মাঝে মাঝে সীমান্তগামী শকট চলেছে। পরিবারের লোকজনে ভর্তি। তারা নগরী থেকে নিষ্ক্রান্ত হচ্ছে। বড় বড় হর্ম্যগুলি গায়ে কুয়াশা মেখে প্রেতের মতো দাঁড়িয়ে আছে। কোনো গৃহ থেকেই জীবনের স্পন্দন আসছে না।

তাঁর প্রথম যৌবনে দেখা সেই দ্বারকাপুরী এখন হতশ্রী। মৃত্যুপুরীর মতো নির্জন। অশ্বত্থামা আজ ভিক্ষুকের মতো যে নগরীতে প্রবেশ করলেন, প্রথম যৌবনে তাঁর দেখা দ্বারকার সঙ্গে এখনকার দ্বারকার কোনো মিল খুঁজে পেলেন না।

এ কোন নগরীতে তিনি এলেন। যৌবনে তিনি দ্বারকায় এসে কয়েক মাস অতিবাহিত করে গেছেন। সে ছিল এক সুশৃঙ্খল মনোহর শৃঙ্খলাবদ্ধ নগরী। সুবেশ নর-নারী পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সুসজ্জিত বিপণিতে নাগরিকদের ভিড়। দু’ধারে তরুশোভিত মসৃণ রাজপথ জুড়ে চলছে অশ্ব ও গজারোহীরা। চলছে সুবর্ণ শোভিত রথ, যাত্রীবাহী অশ্বশকট। এই একটি রাজ্য কৃষ্ণ একে বহিরাগতদের আক্রমণ থেকে নিরাপদ রেখেছেন। নগরবাসীরা কেউ প্রকাশ্যে মদ্যপাদ করেন না। নারীরা সুরক্ষিত। তাঁরা স্বাধীনভাবে যত্রতত্র বিচরণ করেন। কেউ তাঁদের অবমাননা করে না।

অশ্বত্থামা তখন নব্য যুবক। তিনি কৌরব সেনাপতি দ্রোণের পুত্র। তিনি আসছেন জেনে নগরপাল তাঁকে নগরীর প্রবেশদ্বারে অভ্যর্থনা করে তাঁকে সযত্নে রাজঅতিথিশালায় নিয়ে তুলেছিলেন। সে সময় পাণ্ডবেরা বনবাসে। অশ্বত্থামা বরাবরই অস্থির প্রকৃতির। পিতা দ্রোণ তাঁকে অস্ত্রশিক্ষা দিয়ে অর্জুনের সমপর্যায় বীর করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অশ্বত্থামা অতখানি একনিষ্ঠ ও মনোযোগী ছাত্র ছিলেন না। শস্তায় বাজিমাত করার দিকে তাঁর বরাবর অভিসন্ধি গড়ে উঠেছিল। অশ্বত্থামার লোভ ছিল পিতার ব্রহ্মশির অস্ত্রটির প্রতি। এই অস্ত্র দ্রোণ মহাদেবের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। এটি একটি ভয়ঙ্কর অস্ত্র। এই অস্ত্র পৃথিবী ধ্বংস করে দিতে পারে। দ্রোণ এই অস্ত্র অতি সন্তর্পণে লুকিয়ে রেখে দিয়েছিলেন। কিন্তু অশ্বত্থামা তা জানতে পেরে পিতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতেন এই অস্ত্রটি তাঁকে দেবার জন্য।

অশ্বত্থামা দ্রোণের একমাত্র পুত্র। শৈশবে তাকে দুধ কিনে দেবার পয়সাও তাঁর ছিল না, তাই তিনি একটু বেশ আদরে প্রশ্রয় দিয়ে ছেলেকে মানুষ করে তুলেছেন। অশ্বত্থামার মধ্যে দ্রোণ কোনও বড় রকমের সম্ভাবনা দেখেননি। যদিও দ্রোণের শিক্ষায় ও উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি একজন বাহুবলী হয়ে উঠেছিলেন। বেদও কিছুটা পড়েছিলেন। কিন্তু দ্রোণ পুত্রকে বলেছিলেন, তুমি আমার সুনাম ধ্বংসের কারণ হবে।

একটা-দুটো কথায় পিতা-পুত্রের মধ্যে অশান্তির সৃষ্টি হল। পিতার মুখে এই অপ্রিয় কথা শুনে অশ্বত্থামা তখন বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল তিনি ব্রহ্মশির অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী অস্ত্র অধিগত করে পিতাকে দেখিয়ে দেবেন ব্রহ্মশিরের চেয়ে আরও শক্তিশালী অস্ত্র তাঁর হাতে আছে। তিনি কৃষ্ণের সুদর্শন চক্রের কথা শুনেছিলেন। এই অস্ত্র এখনও পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। অশ্বত্থামা কৃষ্ণের কাছ থেকে এই অস্ত্র হস্তগত করার মনস্থ করলেন।

বারবার বিরক্ত করায় দ্রোণ একদিন তাঁকে ব্রহ্মশির অস্ত্র দিয়ে বলেছিলেন, বৎস, এই অস্ত্র পৃথিবী ধ্বংস করে দিতে পারে। তুমি আক্রান্ত হলেও এই অস্ত্র ব্যবহার কোরো না।

অশ্বত্থামা বলেছিলেন, ঠিক আছে পিতা। আমি এই অস্ত্র ব্যবহার করব না। এই অস্ত্র আমার কাছে আছে, এটি লোকে জানলেই যথেষ্ট। তখন সবাই আমাকে সমীহ করে চলবে।

দ্রোণ তাঁর চপলমতি পুত্রকে চিনতেন। বললেন, আমার আশঙ্কা কি জানো, তুমি কোনোদিন সৎ পথে থাকবে না। তোমার প্রবণতা হল, সৎ পথে বা অসৎ পথেই হোক, যে কোনো যুদ্ধে সুলভে জয়লাভ করা। আমার আশঙ্কা তুমি ধর্ম থেকে বিচ্যুত হবে। এতে অশ্বত্থামার জেদ আরও বেড়ে গেল। তিনি কৃষ্ণের সুদর্শন চক্র অধিকার করার তীব্র সঙ্কল্প করলেন। এই উপলক্ষেই তাঁর সেবার দ্বারকা গমন।

অশ্বত্থামা কৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করার জন্য দ্বারকায় চলে এলেন। কৃষ্ণ তাঁর উদ্দেশ্য জানতেন না। দ্রোণপুত্র তাঁর রাজ্যে এসেছেন, এই মনে করে তিনি তাঁকে রাজ-অতিথি করে রাখার আদেশ দেন। অশ্বত্থামা কৃষ্ণের সাক্ষাৎপ্রার্থী হতে চাইলে কৃষ্ণ সানন্দে তাঁর সাক্ষাৎকারের আবেদন মঞ্জুর করেন। তারপর একদিন দ্বারকার রাজপ্রাসাদে কৃষ্ণ-অশ্বত্থামার সাক্ষাৎ হয়।

কৃষ্ণ কুন্তীর ভ্রাতুষ্পুত্র। কিন্তু তিনি শুধু বাবার কাছে কুন্তীপুত্র পাণ্ডবদের কথা শুনেছেন। তাঁদের চোখে দেখেননি। হস্তিনাপুরে তাঁর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় অকস্মাৎ তিনি পাণ্ডবভ্রাতাদের সঙ্গে মিলিত হন। তখন থেকেই তিনি অর্জুনের গুণমুগ্ধ। দুই ভাইয়ের বন্ধুত্ব একটি প্রবাদে পরিণত হয়। তারপর থেকে কৃষ্ণ পাণ্ডবদের সখা ও পরামর্শদাতা হয়ে ওঠেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ জয়ের পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ কৃষ্ণ। কিন্তু অশ্বত্থামা যে সময় কৃষ্ণর সঙ্গে দেখা করেন, তখন পাণ্ডবেরা বনবাসে। সিংহাসনে দুর্যোধন।

কৃষ্ণ অশ্বত্থামাকে বলেন, আচার্যপুত্র, দ্বারকা আপনার কেমন লাগছে? আপনি এখানে আনন্দে আছেন তো? আপনার সেবা-যত্নের কোনো ত্রুটি হচ্ছে না তো? দ্বারকা রাজ্যে অনেক মনোহর দর্শনীয় স্থান আছে। আপনি যেখানে যেতে চান, আদেশ করলেই রাজকীয় রথ আপনাকে সেখানে নিয়ে গিয়ে ঘুরিয়ে আনবে। এ রাজ্যে আপনি নিরাপদ। আমাদের সব শত্রু—চেদিরাজ শিশুপাল ও মগধরাধ জরাসন্ধ এই মুহূর্তে সীমান্তে কোনো আক্রমণ হানছেন না।

অশ্বত্থামা বললেন, আর্য, আমার কাছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এক অস্ত্র আছে। পিতা তা আমাকে দিয়েছেন। আমি এই অস্ত্রটি আপনাকে উপহার দিতে চাই। এই অস্ত্রবলে আপনি যে কোনো শত্রুকে, তারা যত শক্তিশালী হোক, তাদের সমূলে বিনাশ করতে পারবেন।

কৃষ্ণ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কী সে অস্ত্র? আপনি তা আমাকে দিতে চান কেন?

অশ্বত্থামা বললেন, আর্য, আপনাকে সত্য কথা বলতে কোনো দ্বিধা নেই। এই অস্ত্রের নাম ব্রহ্মশির। পিতা আমাকে এই অস্ত্র দিয়েছেন। পিতা এই অস্ত্র দেবার সময় বলেছিলেন, এটি তুমি মানুষের বিরুদ্ধে কখনও প্রয়োগ করবে না। মানুষের বিরুদ্ধে প্রয়োগ না করলে এই অস্ত্র দিয়ে আমি কী করব? আপনি বরং এটি গ্রহণ করুন। আমার কোনো শর্ত নেই। এটি আপনি আপনার শত্রুদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করুন।

এই বলে অশ্বত্থামা তাঁর তৃণ থেকে ব্রহ্মশির অস্ত্রটি বার করলেন।

কৃষ্ণ অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, এটি আমায় দিচ্ছেন কেন? একদিন হয়তো কোনো বৃহত্তর বিপদের সময় আপনাকে এই অস্ত্র ব্যবহার করতে হবে।

অশ্বত্থামা বললেন, এই অস্ত্র আপনাকে দেব, আপনাকে তার বিনিময়ে আপনার সুদর্শন চক্রটি দিতে হবে। আপনি কিছুই হারাচ্ছেন না আর্য, শুধু একটি অস্ত্রের বিনিময়ে সমপরিমাণ শক্তিশালী আর একটি অস্ত্র নিচ্ছেন। আমি শুধু পিতার কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি তা থেকে মুক্ত হব।

কৃষ্ণ মনে মনে ঈষৎ হাস্য করে অশ্বত্থামাকে বললেন, বেশ তো, আপনি চক্রটি গ্রহণ করুন।

অশ্বত্থামা দ্রুত বামহাত দিয়ে সুদর্শন চক্রটি মাটি থেকে তুলতে গেলেন, তুলতে পারলেন না।

তখন অস্থিরচিত্ত অশ্বত্থামাকে সম্বোধন করে কৃষ্ণ বললেন, আমার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি, যিনি দেবলোক ও মনুষ্যলোকে মহাবীর বলে সকলের প্রিয়পাত্র বলে গণ্য হয়েছেন, যিনি শিতিকণ্ঠ, শঙ্করকে পরাজিত করে সন্তুষ্ট করেছেন, জগতে তাঁর চেয়ে প্রিয় পুরুষ আমার আর নেই। যাঁর কাছে আমার অদেয় কিছু নেই, সেই অর্জুনও আমার কাছে সুদর্শন চক্র চাননি, যা আপনি চাইলেন।

আমি হিমালয়ের পাশে গিয়ে দ্বাদশ বর্ষ তপস্যা করে এই সুদর্শন চক্র লাভ করেছি। আমারই তুল্য বিশাল অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন আমার পুত্র, যিনি রুক্মিণীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছেন, সেই প্রাণাধিক প্রদ্যুম্নও এই চক্র প্রার্থনা করেননি। মূঢ় ব্রাহ্মণ, আপনি এই চক্র প্রার্থনা করলেন অথচ তার ধারণের ক্ষমতা আপনার নেই। এই চক্র মহাবলী বলরাম, আমার পুত্র শাম্ব এবং গদও প্রার্থনা করেননি। দ্বারকাবাসী বৃষ্ণিবংশীয় ও অন্ধকবংশীয়রাও কেউ এই চক্র চায়নি। আপনি এটি চাইলেন। আপনি মহাত্মা দ্রোণের পুত্র। বৃষ্ণিবংশীয়রা সবাই আপনাকে সমর্থন করে। আপনি এখন এই চক্র চাইছেন। তার আগে বলুন, এই চক্র নিয়ে আপনি কী করবেন? এই চক্র দিয়ে কার সঙ্গে যুদ্ধ করতে চান?

অশ্বত্থামা বললেন, এই চক্র ধারণ করলে আমি সকলের কাছেই অজের হব। বুদ্ধ না করলেও লোকে আমায় ভয় করবে। ঠিক আছে, আপনি যখন সুদর্শন চক্র দিতে চাইছেন না, আমি এই চক্র না নিয়েই ফিরে যাব। আপনি মহাশক্তিধর বীর বলেই এই চক্র ধারণে সমর্থ হয়েছেন, এখন আমি উপলব্ধি করেছি। এখন আপনি অনুমতি দিন, আমি হস্তিনানগরে প্রত্যাবর্তন করি।

কৃষ্ণ তাঁকে যাবার সময় বহু অশ্ব, নগদ অর্থ ও নানাবিধ রত্ন উপহার দেন। কিন্তু সুদর্শন চক্র তিনি পাননি। ব্রহ্মশির অস্ত্র তিনি কখনও প্রয়োগ করেননি। একদম শেষে মরিয়া হয়ে উত্তরার গর্ভপাতের উদ্দেশে প্রয়োগ করেছিলেন!

অশ্বত্থামা যখন দ্বারকায় এসে পৌঁছলেন তখন দ্বারকায় একটি নতুন নাটকের অভিনয় হচ্ছে। মহাভারতকার যার নাম দিয়েছিলেন ‘মুষল পর্ব। এই মুষল পর্বেই মহাভারতের সমাপ্তির সূচনা। তার পরেই মহাপ্রস্থানিক পর্ব। যুধিষ্ঠিরের স্বর্গারোহণ।

অশ্বত্থামা কুরুক্ষেত্র ইন্দ্রপ্রস্থ হয়ে চলছিলেন দক্ষিণ-পশ্চিমমুখী অধুনা রাজস্থানের মধ্য দিয়ে আরও পশ্চিমে কচ্ছ উপসাগরের দিকে। এই পথে তিনি প্রথম যৌবনে এসেছেন তাঁর নিজস্ব রথ চালিয়ে। তখন তিনি যৌবনতেজে দীপ্ত। সিংহাসনে দুর্যোধন, তাঁর পরম সখা। তিনি তাঁর সেনাপতি ও আচার্য দ্রোণের পুত্র। তিনি ইচ্ছা করলে তাঁর এই ভ্রমণকে সেদিন রাজকীয় সফরে পরিণত করতে পারতেন। কিন্তু একাই পথে রথচালনা করে বিশ্রাম করতে করতে দু’মাসের মধ্যে এই পথ অতিক্রম করেছিলেন। কচ্ছ উপসাগরের তীরে বৃদ্ধাঙ্গুলের মতো দ্বীপসদৃশ এক অপূর্ব জনপদ দ্বারাবর্তী বা দ্বারকা। একদিকে বিশাল আরব মহাসাগর। দ্বারকার উত্তর প্রান্তে সেই মহাসাগর কচ্ছ উপসাগর হয়ে দ্বারকার পূর্বদিকে ঢুকে ভেতরে চলে গিয়ে কান্দলার কাছে শেষ হয়েছে। কচ্ছ উপসাগরের পশ্চিমে ভুজ, লাখপত প্রভৃতি রাজ্য।

জরাসন্ধের ক্রমাগত আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য কৃষ্ণ মথুরা থেকে তাঁর রাজধানী নিয়ে যান সুদূর দ্বারকায়। কারণ দ্বারকা একটি দ্বীপের মতো। দুদিকেই সুমদ্রবেষ্টিত। জরাসন্ধকে কৃষ্ণ ভীমকে দিয়ে নিহত করে তার রাজ্য নিষ্কণ্টক করেছিলেন। শত্রু শিশুপালকে তিনি নিজে বধ করেন।

কৃষ্ণের যাদববংশ। বৃষ্ণি, অন্ধক, ভোজ ও কুক্কুর এই চার জাতিদের পরস্পরের মধ্যে খুব হৃদ্যতার সম্পর্ক ছিল। কৃষ্ণ তাদের ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। যাদবদের সর্বাঙ্গীণ উন্নয়ন ও তাদের নিরাপত্তা সুদৃঢ় করার জন্য তিনি নিজে রাজা না হয়ে মাতামহ ভোজবংশীয় উগ্রসেনকে রাজা করেছিলেন। দ্বারকাকে তিনি একটি সমৃদ্ধ নগরীতে পরিণত করেছিলেন। কৃষ্ণ একাধারে শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ, অসাধারণ যোদ্ধা। আধ্যাত্মতত্ত্ব ও ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞান। চিকিৎসাবিদ্যা, সঙ্গীতবিদ্যা থেকে অশ্ব পরিচর্যাবিদ্যা তাঁর আয়ত্ত ছিল।

বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর কৃষ্ণচরিত্র গ্রন্থে কৃষ্ণের কার্যকারিণী বৃত্তি, সাহস, ক্ষিপ্রকারিতা, এবং সর্বধর্মে তৎপরতার পরিচয় দিয়ে লেখেন, ‘তিনি আত্মীয়স্বজন, জাতি, গোষ্ঠীর কিরূপ হিতৈষী তাহা দেখিয়াছি, আত্মীয় পাপাচারী হইলে তিনি তাহার শত্রু। তাঁহার অপরিসীম ক্ষমাগুণ দেখিয়াছি যে সময় উপস্থিত হইলে তিনি অযোনি নির্মিত হৃদয়ে অকুণ্ঠিতভাবে দণ্ড বিধান করেন। ‘

সবাই জানত কৃষ্ণই দ্বারকার প্রকৃত রাজা। কৃষ্ণ রাজকীয় জীবন যাপন করতেন। তাঁর কথামতোই উগ্রসেন রাজকার্য পালন করতেন।

কিন্তু কৃষ্ণ একা কিছু করতেন না। তাঁর এক অনুগামী গোষ্ঠী ছিল। এতে ছিলেন তাঁর কিছু বন্ধু ও জ্ঞাতিরা। এঁরা হলেন আহুক, অক্রূর, উদ্ধব, সাত্যকি, কৃতবর্মা। বিশেষ করে আহুক ও অক্রূরকে কৃষ্ণ খুবই ভালোবাসতেন। কিন্তু কৃষ্ণ কাকে বেশি পছন্দ করেন তা নিয়ে কৃষ্ণ অনুগামীরা পরস্পরের প্রতি ঈর্ষা প্রকাশ করতেন। আহুক আড়ালে কৃষ্ণকে নিন্দা করতেন যে তিনি কৃষ্ণের এত অনুগত, কিন্তু কৃষ্ণ অক্রূরকে বেশি স্নেহ করেন এবং অঙ্কুরের প্রতি তাঁর পক্ষপাতিত্ব আছে। আবার অক্রুরও আড়ালে তাঁর পরিচিত মহলে বলে বেড়াতেন যে আমি কৃষ্ণর জন্য এত করি, কিন্তু বিনিময়ে কিছু পাই না। কৃষ্ণ আহুককেই বেশি পছন্দ করেন।

শেষ জীবনে কৃষ্ণ তাঁর জ্ঞাতি যাদবদের গোষ্ঠীবিরোধ, পারস্পরিক ঈর্ষা ও চরিত্রভ্রষ্ট আচরণ ও দুর্নীতির পাঁকে ডুবে যাওয়া যাদবদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে ও জাতিবৈরিতায় ধৈর্যের শেষ সীমায় এসে পৌঁছলেন।

অহিংসা ও সাম্যের ভিত্তিতে বিবদমান কতগুলি জাতিকে নিয়ে কৃষ্ণ একটি ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্যই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তাঁর অংশ নেওয়া। সেখানে দুর্যোধনকে নিহত করে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে সিংহাসনে বসিয়ে তিনি দ্বারকায় ফিরে এসেছিলেন। প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন একটি সুখরাজ্য তৈরি করার। কৃষ্ণ তাঁর রাজ্যে ঐহিক ভোগের সাধ অপূর্ণ রাখেননি। তাঁর রাজ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণের সুযোগ ছিল। মদ্যপান এবং সম্ভোগের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কৃষ্ণের আটজন মহিষী ছিলেন (মতান্তরে ১৯)। প্রধানাদের নাম রুক্মিণী, সত্যভামা, জাহ্নবী, গান্ধারী (ইনি অন্য গান্ধারী), শৈব্যা, তাস্বসিনী ও ব্রতিনী। এছাড়া তাঁর রক্ষিতা ছিলেন ষাট হাজার রমণী। এদের তিনি নরকাসুরের অত্যাচার থেকে উদ্ধার করে প্রাগ জ্যোতিষপুর থেকে এনে দ্বারকায় ‘রক্ষিত’ করে রেখেছিলেন।*

[* রক্ষিত অর্থে এদের ভরণপোষণ, মর্যাদা ও নিরাপত্তার সমস্ত ভার কৃষ্ণ নিয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্ৰ লিখেছেন, এই যোলো হাজার নারীকে কৃষ্ণ বিবাহ করেন।[

কিন্তু ক্রমে ক্রমে যাদবদের মধ্যে গোষ্ঠীবৈরিতা দেখা দিতে লাগল। একজন যাদব আর একজনকে সহ্য করতে পারত না। বিভিন্ন জাতির মধ্যে ঈর্ষা এবং অসাধুতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে লাগল। দুর্নীতি প্রবল হয়ে উঠল। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার সুযোগে তরুণ প্রজন্ম ইন্দ্রিয়পরায়ণ ও ভোগবাসনায় লিপ্ত হয়ে পড়ল। কৃষ্ণ যে নৈতিক উপদেশ প্রচার করতে চেয়েছিলেন তাঁর প্রজারা উদ্যমী ও চরিত্রবান হোক তা হল না। তারা ক্রমশ ভোগী, দুর্নীতিপরায়ণ ও শ্রদ্ধাহীন হয়ে উঠতে লাগল। এমনকী, কৃষ্ণপুত্র শাম্বও দেখা গেল ইন্দ্রিয়পরায়ণ, প্রগলভ এবং মুনি-ঋষিদের প্রতি শ্রদ্ধাহীন হয়ে উঠেছে। কৃষ্ণের কানে সব সংবাদই আসছিল। যুধিষ্ঠিরের অশ্বমেধ যজ্ঞের পর তিনি আর হস্তিনানগরে যাননি। তিনি দ্বারকাতেই থেকে নাগরিকদের বৈষয়িক ও নৈতিক উন্নতির জন্য কাজ করে যাচ্ছিলেন। ভেবেছিলেন আর্থিক সমৃদ্ধি ঘটাতে পারলে উন্নয়নের বন্যা বইয়ে দিতে পারলে দ্বারকার জনগণ তাঁর কথামতো এক ধর্মরাজ্য তৈরি করে দেবে। যেমন যুধিষ্ঠির একটি ধর্মরাজ্য পরিচালনা করছেন।

দ্বারকা দ্বিতীয় হস্তিনানগর হবে। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন ধীরে ধীরে রূঢ় বাস্তবের আঘাতে খান খান হয়ে যেতে লাগল। এদিকে তাঁর বয়স ক্রমশ বাড়ছে। তিনি শতবর্ষ অতিক্রম করেছেন। এখন তাঁর বয়স ১০৬ বছর। তিনি যাদবদের আচরণ ও অকৃতজ্ঞতা দেখে মনে মনে ভীষণ বেদনা অনুভব করছেন। কৃষ্ণের মনোবেদনা চরমে উঠল একটি ঘটনায় সেটি শাম্বের মুষল প্রসবের ঘটনা।*

তিনি চারিদিকে যা ঘটছিল তা নিয়ে অত্যন্ত অসুখী ছিলেন। বুঝতে পারলেন এবার গান্ধারীর অভিশাপ ফলার সময় এসে গেছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ৩৬ বছর পর এই অভিশাপ ফলবে বলে গান্ধারী তাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন। তিনি হিসাব করে দেখলেন ৩৬. বছর পূর্ণ হয়ে গেছে।

কৃষ্ণ তাই মনে মনে নিজের প্রতিজ্ঞার কথা স্মরণ করলেন। যদুবংশ ধ্বংস হবার আগে তিনি নিজহাতে আপন সৃষ্টিকে বিধ্বস্ত করবেন।

* মহাভারতে এর উল্লেখ পাইনি।

কালকূট তার ‘শাম্ব’ উপন্যাসে লিখেছেন অতিরিক্ত নারী লোলুপতার জন্য কৃষ্ণ শাম্বকে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হবার অভিশাপ দেন।

আমি মহাভারতের মুষলপর্ব অনুসরণ করেছি। তবে আগেই বলেছি, মুষলপর্বে অশ্বত্থামারও কোথাও উল্লেখ নেই।

শাম্বের উল্লেখ আছে তিনিই ঋষিদের অভিশাপে মুষল প্রসব করেছিলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *